সেবুতে আসিয়ান প্রতিরক্ষা আলোচনা শেষ, চীনের বাধা দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান ফিলিপাইনের

পড়তে 9 মিনিট
Philippines Rejects China's Obstruction Claim as ASEAN Defence Talks End in Cebu

অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে বিরোধে সেবুর বৈঠক শেষ

দুই দিনের বৈঠক ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর সেবুতে শেষ হওয়ার পর আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা আলোচনায় চীনের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো। ২০১০ সালে ফোরামটি শুরু হওয়ার পর এবারই সর্বনিম্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে চীন। ১৩তম আসিয়ান প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠক-প্লাসে (এডিএমএম-প্লাস) প্রতিরক্ষামন্ত্রী দং জুনের পরিবর্তে দূতাবাসের প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ইয়াং লেইকে পাঠায় দেশটি।

সূচিপত্র
  1. অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়ে বিরোধে সেবুর বৈঠক শেষ
  2. ফিলিপাইনের বিরুদ্ধে চীনের অভিযোগ
  3. আমন্ত্রণ ও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগের কথা বলছে ম্যানিলা
  4. চীনা প্রতিনিধির পদমর্যাদা কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল
  5. যেভাবে এগিয়েছে বিরোধ
  6. দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধই প্রধান বিভাজনরেখা
  7. যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে আলোচনা ম্যানিলার অংশীদারত্ব জোরদার করছে
  8. আগের বাক্যবিনিময়েও সম্পর্কে টানাপোড়েন ছিল
  9. টানাপোড়েনের পাশাপাশি আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা চলছে
  10. মূল বিষয়

চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাং শিয়াওগাং অভিযোগ করেন, ম্যানিলা একজন নাম না-জানা রাজনীতিককে দেশের সভাপতিত্বের অপব্যবহার করে বেইজিংয়ের পথে বাধা সৃষ্টি করতে দিয়েছে। তেওদোরো বলেন, ম্যানিলা চীনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, দেশটির প্রতিনিধি বক্তব্য দিয়েছেন এবং এ বিষয়ে অন্য কোনো আসিয়ান সদস্য তাঁর কাছে একই ধরনের উদ্বেগ জানায়নি।

বৈঠকে সভাপতিত্ব করা তেওদোরো আঞ্চলিক জোটের অবস্থান নিয়ে বেইজিংয়ের বর্ণনা প্রত্যাখ্যান করেন:

এটি চীনের অবস্থান; আসিয়ানের অবস্থান নয়।

কারা বৈঠকে অংশ নিয়েছিল, মতবিরোধটি শুধু তা নিয়েই ছিল না। ফোরামের নিয়ম ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ তুলেছে বেইজিং, অন্যদিকে বৈঠক কীভাবে পরিচালিত হবে তা নির্ধারণের আসিয়ানের কর্তৃত্বের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ম্যানিলা। দুই সরকারই বলেছে, চীন অংশ নিয়েছিল; তবে দেশটির সঙ্গে কী আচরণ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তাদের বর্ণনা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রস্তাব, সমুদ্রে চীনের তৎপরতা নিয়ে জাপানের সঙ্গে আলোচনা এবং ২০১৬ সালের দক্ষিণ চীন সাগরবিষয়ক সালিশি রায়ের প্রতি ফিলিপাইনের নতুন করে সমর্থনের বিষয়ও উঠে আসে। ২০২৭ সালের জন্য আসিয়ানের প্রতিরক্ষা কর্মসূচির নেতৃত্ব সিঙ্গাপুরের হাতে তুলে দিয়ে বৈঠক শেষ করে ম্যানিলা।

ফিলিপাইনের বিরুদ্ধে চীনের অভিযোগ

ঝাং বলেন, ফিলিপাইনের পদক্ষেপ আসিয়ানের আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছানোর নীতি, বৈঠকে উন্মুক্ততা ও অন্তর্ভুক্তির অঙ্গীকার এবং মৌলিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছে। তিনি আরও বলেন, এসব পদক্ষেপ অংশগ্রহণকারী হিসেবে চীনের অধিকার ক্ষুণ্ন করেছে।

চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে ঝাং কথিত আচরণের বর্ণনা দেন এভাবে:

এ ধরনের পদক্ষেপ আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছানোর আসিয়ান নীতিকে গুরুতরভাবে লঙ্ঘন করে এবং এডিএমএম-প্লাসের উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনার পরিপন্থী।

ঝাংয়ের অভিযোগ, কয়েকটি আসিয়ান দেশ ম্যানিলার পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এবং এর বিরোধিতা করেছে। তেওদোরো এর বিপরীত বক্তব্য দিয়ে বলেন, কোনো সদস্যই তাঁর কাছে এ ধরনের উদ্বেগ জানায়নি। তাদের পরস্পরবিরোধী বর্ণনায় আসিয়ানের অভ্যন্তরীণ অবস্থানই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

বিজ্ঞাপন

রাজনীতিকটির পরিচয় বা কথিত বাধাগুলো কী ছিল, তা নির্দিষ্ট করে জানায়নি চীন। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিনিধি দলের আকার কমানোর সঙ্গে ফিলিপাইনের পদক্ষেপকে যুক্ত করেছে। তবে ধারণা করা হচ্ছিল, দং বেইজিংয়ে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একটি বৈঠকেও অংশ নেবেন। ওই বৈঠকে তাঁর উপস্থিতির বিষয়টি সেবুর সমাবেশের বিবরণে নিশ্চিত করা হয়নি।

তা সত্ত্বেও, একজন প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্তকে আসিয়ানের আঞ্চলিক নিরাপত্তায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা এবং অব্যাহত প্রতিরক্ষা সংলাপের প্রতি সমর্থন হিসেবে তুলে ধরেছে বেইজিং। ঝাং সতর্ক করে বলেন, ফিলিপাইনের এই দৃষ্টিভঙ্গি জোটের ভেতরে আস্থা ও ঐক্যের ক্ষতি করবে।

আমন্ত্রণ ও বক্তব্য দেওয়ার সুযোগের কথা বলছে ম্যানিলা

ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা চীনা প্রতিপক্ষকে বিষয়টি জানিয়ে ফোরামে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। জবাবে তেওদোরো চীনের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ এবং কার্যক্রম পরিচালনায় আসিয়ান সদস্যদের কর্তৃত্বের ওপর জোর দেন।

সেবুর লাপু-লাপু সিটিতে সমাপনী সংবাদ সম্মেলনে তেওদোরো আলোচনাটিকে খোলামেলা মতবিনিময় হিসেবে বর্ণনা করেন:

আমরা মতবিনিময়কে প্রাণবন্ত হতে দিয়েছি, আর আমার মনে হয় সেটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল—নিজের কথা বলার সুযোগ।

আলোচনায় চীন দক্ষিণ চীন সাগরের প্রসঙ্গ তুলেছিল বলে নিশ্চিত করেন তেওদোরো। তিনি বলেন, চীনের অবস্থান আগের বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল; তবে অন্য অংশগ্রহণকারী দেশগুলো কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে, তা প্রকাশ করতে চাননি।

তেওদোরো আরও বলেন, সংলাপের অংশীদারদের কীভাবে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত আসিয়ানের নিজস্ব। সংলাপের অংশীদার হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জোটের বাইরের যেসব দেশ সহযোগিতামূলক ফোরামে অংশ নেয়। আলোচনায় তাদের স্থান আছে, আর জোটের নিজস্ব প্রক্রিয়া পরিচালনা করে আসিয়ান সদস্যরা।

চীনা প্রতিনিধির পদমর্যাদা কেন গুরুত্বপূর্ণ ছিল

ইয়াং লেইয়ের উপস্থিতির ফলে সেবুর বৈঠকে চীনের প্রতিনিধিত্ব বজায় ছিল, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া তাদের প্রতিরক্ষাপ্রধানদের পাঠিয়েছিল। দূতাবাসের প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে হলেন স্বাগতিক দেশে প্রতিরক্ষা সম্পর্কের দায়িত্বে থাকা সামরিক কর্মকর্তা; তিনি জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতির দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর সমপর্যায়ের নন।

পদমর্যাদার এই পার্থক্য বিরোধের আরেকটি বিষয়ে পরিণত হয়। ইয়াংকে তিনি নিজে কেন অভ্যর্থনা জানাননি, এ প্রশ্নের জবাবে তেওদোরো বলেন, একজন আন্ডারসেক্রেটারি তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন, কারণ কূটনৈতিক অভ্যর্থনা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পদমর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।

পদমর্যাদা ও অবস্থানের কথা উল্লেখ করে তেওদোরো তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করেন:

পদমর্যাদা ও অবস্থানে কিছুটা সমতা থাকা উচিত। তাই একজন আন্ডারসেক্রেটারি একজন অ্যাটাশেকে অভ্যর্থনা জানালে, সেটি যথেষ্ট সৌজন্যপূর্ণ আচরণ।

এডিএমএম-প্লাসে আসিয়ানের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সঙ্গে আটটি সংলাপ-অংশীদার দেশ অংশ নেয়: অস্ট্রেলিয়া, চীন, ভারত, জাপান, নিউজিল্যান্ড, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। যেসব সরকারের অবস্থান প্রায়ই পরস্পরবিরোধী, তাদের মধ্যে নিরাপত্তা সংলাপ ও ব্যবহারিক সহযোগিতা বজায় রাখাই এর উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞাপন

তাই চীনের সিদ্ধান্তটির কূটনৈতিক গুরুত্ব ছিল। দেশটির আসন খালি থাকেনি, তবে আগের বছরগুলোর তুলনায় নিম্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিল চীন; আগের বছরগুলোতে দং অংশ নিতেন। এতে সেবুতে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও তাঁর প্রতিপক্ষদের মধ্যে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ কমে যায়।

যেভাবে এগিয়েছে বিরোধ

কয়েকটি ঘোষণা ও বৈঠক ঘিরে প্রকাশ্য মতবিরোধটি তৈরি হয়। ঝাং ও তেওদোরোর সমাপনী বাক্যবিনিময়ের আগেই চীনের প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

  • ২৭ অক্টোবর: সেবুতে ১৩তম এডিএমএম-প্লাসে দূতাবাসের প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে চীনের প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে ঘোষণা দেয় চীন।
  • ২৮ অক্টোবর: দুই দিনের প্রতিরক্ষা বৈঠক শুরু হয় এবং আসিয়ানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন কাঠামোর প্রস্তাব দেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।
  • ২৯ অক্টোবর: চীনের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তোলে ঝাং। তেওদোরো অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, চীন তাদের অবস্থান তুলে ধরতে পেরেছে।
  • সমাপনীতে: পরবর্তী বছরের জন্য আসিয়ানের প্রতিরক্ষা কর্মসূচির নেতৃত্ব ফিলিপাইন সিঙ্গাপুরের হাতে তুলে দেয়।

এর ফলে মূল আলোচনা শেষ হলেও প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিরোধটি প্রকাশ্যে অমীমাংসিত থেকে যায়। সমুদ্রে নিরাপত্তা নিয়ে সদস্য ও অংশীদারদের মতপার্থক্যের মধ্যেও প্রতিরক্ষা ফোরামকে কার্যকর রাখার দায়িত্ব পাবে সিঙ্গাপুর।

দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধই প্রধান বিভাজনরেখা

বিতর্কিত জলসীমায় বছরের পর বছর ধরে সংঘাত এবং সাম্প্রতিক সময়ে তেওদোরোর ওপর চীনের নিষেধাজ্ঞার পর সেবুর বৈঠকে অংশ নেয় চীন ও ফিলিপাইন। দক্ষিণ চীন সাগরের বড় অংশজুড়ে বিস্তৃত চীনের নাইন-ড্যাশ লাইন ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ব্রুনাই ও ইন্দোনেশিয়ার দাবিকৃত সামুদ্রিক এলাকার সঙ্গে মিলে গেছে।

এসব এলাকার কয়েকটি উপকূলীয় দেশের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে উপকূলীয় রাষ্ট্র মাছ ও সমুদ্রের জ্বালানিসহ সম্পদের ওপর অধিকার পায়; সাধারণত উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এ অঞ্চল বিস্তৃত হয়। সমুদ্রে পরস্পরবিরোধী দাবির কেন্দ্রে রয়েছে সম্পদের এই অধিকার।

২০১৬ সালে একটি আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনাল রায় দেয়, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনে অনুমোদিত অধিকারের বাইরে নাইন-ড্যাশ লাইনের মধ্যে সম্পদের ওপর চীনের ঐতিহাসিক অধিকারের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। বেইজিং ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে। সেবুতে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে, দক্ষিণ চীন সাগরের অন্যান্য দাবিদার দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও, তেওদোরো রায়টির প্রসঙ্গ তোলেন।

তেওদোরোর যুক্তি, রায়টির পেছনের নীতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অংশ এবং তা শুধু ফিলিপাইনের জন্যই প্রাসঙ্গিক নয়। তাঁর অবস্থান ম্যানিলার তাৎক্ষণিক সংঘাতকে প্রতিবেশী উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলোর বৃহত্তর একটি প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে: সামুদ্রিক সম্পদে প্রবেশাধিকার কোন নিয়মে পরিচালিত হবে।

বিজ্ঞাপন

ম্যানিলা তাদের বর্ধিত সমুদ্রতল দাবির মাধ্যমে আলাদা একটি আইনি প্রক্রিয়াও চালিয়েছে। ২৮ জুলাই জাতিসংঘের একটি কমিশনে পেশ করা ওই আবেদনে পশ্চিম পালাওয়ানের কাছে প্রচলিত একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের বাইরে সমুদ্রতল ও তার নিচের স্তরের ওপর অধিকার স্বীকৃতির দাবি জানানো হয়েছে, যা বেইজিংয়ের সঙ্গে মতবিরোধের আরেকটি বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সঙ্গে আলোচনা ম্যানিলার অংশীদারত্ব জোরদার করছে

২৮ অক্টোবর সেবুর বৈঠকে হেগসেথ যুক্তরাষ্ট্র-আসিয়ান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি উচ্চাভিলাষী কাঠামোর প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি তিনি অঙ্গীকার করেন, ওয়াশিংটন তার নিজের স্বার্থ এবং মিত্র ও অংশীদারদের স্বার্থ রক্ষা করবে। ফিলিপাইন যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। সমুদ্রে চাপের জবাব হিসেবে নিরাপত্তা-সম্পর্কের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে ম্যানিলা।

সমাপনী সংবাদ সম্মেলনে প্রস্তাবিত কাঠামোর বিষয়বস্তু বিস্তারিত জানানো হয়নি। এর রূপরেখা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তেওদোরো আসিয়ানের কর্মীগোষ্ঠীগুলোর চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে তাকাতে বলেন। ফলে প্রস্তাবটির বাস্তব অঙ্গীকার ও সময়সীমা অনির্দিষ্টই থাকে।

জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি ও তেওদোরো বিতর্কিত জলসীমায় চীনের কথিত জবরদস্তিমূলক তৎপরতার মাত্রা ও ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের আলোচনা বৃহত্তর আঞ্চলিক বৈঠকের সঙ্গে ম্যানিলার তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা উদ্বেগকে যুক্ত করে।

ফিলিপাইনের অংশীদারত্ব আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ন করছে—এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেন তেওদোরো। অন্য দেশগুলোও একই ধরনের চাপের মুখে পড়লে প্রতিরোধ করবে বলে কেন তিনি মনে করেন, তা ব্যাখ্যা করে বলেন:

ফিলিপাইন যে মাত্রার পদক্ষেপের মুখে পড়ছে, অন্য আসিয়ান দেশগুলোও যদি একই ধরনের পরিস্থিতির শিকার হতো, তাহলে আমি নিশ্চিত, তারা নিজেদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে প্রতিরোধ করত।

আগের বাক্যবিনিময়েও সম্পর্কে টানাপোড়েন ছিল

সামরিক শক্তি নিয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত জিং ছুয়ানের মন্তব্য ঘিরে তীব্র কূটনৈতিক বাদানুবাদের পর সেবুর বিরোধটি সামনে আসে। ১৫ অক্টোবর ফিলিপাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জিংয়ের মন্তব্যের প্রতিবাদ জানায়। জিং বলেছিলেন, ফিলিপাইনের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিলে চীন সহজেই জিততে পারে; তবে শান্তিকে গুরুত্ব দেওয়ায় বেইজিং তা করবে না।

চীনা রাষ্ট্রদূতের প্রতি ওই তিরস্কার দেখিয়েছে, প্রতিরক্ষা বৈঠকের আগেই সামরিক শক্তির উল্লেখ কীভাবে সম্পর্কে আরও অবনতি ঘটাচ্ছিল। পরে ফিলিপাইনের সিনেটররা রাষ্ট্রদূতকে পারসোনা নন গ্রাটা ঘোষণার আহ্বান জানান। কূটনীতিতে এ পদবির অর্থ, সংশ্লিষ্ট দূতকে দেশ ছাড়ার দাবি জানানো।

বিজ্ঞাপন

বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরের বাইরেও আঞ্চলিক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ছিল। ২৮ অক্টোবর তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মহাসচিব জোসেফ উ একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন। তাতে দক্ষিণ জাপান থেকে ফিলিপাইনের পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত জলসীমায় চীনের ৫৩টি নৌবাহিনী ও অন্যান্য সরকারি জাহাজের অবস্থান দেখানো হয়।

আঞ্চলিক জাহাজ মোতায়েনে ছিল নৌবাহিনীর ৩৪টি যুদ্ধজাহাজ এবং কোস্টগার্ড ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার ১৯টি জাহাজ। চীনের বিমানবাহী রণতরী লিয়াওনিং ও তার বহর ফিলিপাইনের পূর্বে অবস্থান করছিল। বেইজিং রণতরীটির তৎপরতাকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ বলে বর্ণনা করেছে; অন্যদিকে তাইওয়ান নিজেদের পাশাপাশি জাপান ও ফিলিপাইনকেও প্রভাবিত করা চাপের বিষয়ে সতর্ক করেছে।

টানাপোড়েনের পাশাপাশি আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা চলছে

দক্ষিণ চীন সাগরের আচরণবিধি নিয়ে অগ্রগতির আহ্বান জানিয়ে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা নিয়েও কথা বলেন ঝাং। প্রেসিডেন্ট সতর্ক করেছিলেন, জেলে বা সেনাসদস্যদের সংশ্লিষ্ট কোনো ভুল পদক্ষেপ উত্তেজনা বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে সমুদ্রে থাকা মানুষের ঝুঁকিও কূটনৈতিক আলোচনায় উঠে আসে।

বিতর্কিত জলসীমায় পক্ষগুলোর আচরণ পরিচালনার উদ্দেশ্যে করা চুক্তিই আচরণবিধি। এর বাস্তব কার্যকারিতা নির্ভর করবে সরকারগুলো কী নিয়ম গ্রহণ করে এবং জাহাজ ও সদস্যদের মুখোমুখি অবস্থায় সেগুলো কীভাবে প্রয়োগ করে, তার ওপর।

ঝাং বলেন, আসিয়ানের সঙ্গে আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নিতে চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি যুক্তি দেন, সামুদ্রিক বিরোধের কারণে চীন-ফিলিপাইন সম্পর্কের পুরোটা নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বেইজিং তার সার্বভৌমত্ব ও সামুদ্রিক স্বার্থ রক্ষা করবে।

আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এর আগে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করার আশা প্রকাশ করেছিলেন। সেই লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সামনে সময়সীমা কাছাকাছি, আর সিঙ্গাপুর প্রতিরক্ষা কর্মসূচির দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেবুর বৈঠক শেষ হয়েছে আলোচনা চালানোর পথ খোলা রেখে, তবে সমুদ্রে আচরণ এবং বৈঠক পরিচালনা—দুই বিষয়েই চীন ও ফিলিপাইনের প্রকাশ্য মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

মূল বিষয়

  • সেবুতে ২৮-২৯ অক্টোবরের প্রতিরক্ষা বৈঠকে বেইজিংয়ের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়ার চীনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ফিলিপাইন।
  • প্রতিরক্ষামন্ত্রী দং জুনের পরিবর্তে প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে ইয়াং লেইকে পাঠিয়েছে চীন; ২০১০ সালে এডিএমএম-প্লাস শুরু হওয়ার পর এটি দেশটির সর্বনিম্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব।
  • আসিয়ান দেশগুলো ম্যানিলার পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে বলে অভিযোগ করেন ঝাং শিয়াওগাং; তেওদোরো বলেন, কোনো সদস্য তাঁর কাছে এ উদ্বেগ জানায়নি।
  • ম্যানিলা জানিয়েছে, চীন আমন্ত্রণ এবং দক্ষিণ চীন সাগরসহ নিজস্ব মতামত তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।
  • যুক্তরাষ্ট্র নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে; অন্যদিকে ফিলিপাইন ও জাপানের মন্ত্রীরা বিতর্কিত জলসীমায় চীনের তৎপরতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
  • ২০২৭ সালে আসিয়ানের প্রতিরক্ষা কর্মসূচির দায়িত্ব নেবে সিঙ্গাপুর। দক্ষিণ চীন সাগরের আচরণবিধি নিয়ে আলোচনা তখনও অঞ্চলের জরুরি কাজগুলোর একটি থাকবে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে