নিজেদের আদালতের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখার দাবি বিচারপতিদের
হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, হোটেলে বৈঠক এবং কথিত আর্থিক লেনদেনের তথ্য প্রকাশের পর প্রধান বিচারপতি মনোজ কুমার শর্মা ও বিচারপতি হরি প্রসাদ ফুয়ালকে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কথিত মধ্যস্থতাকারী ইনাম সাপকোটা এবং বিচার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন নেপালের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা।
সূচিপত্র
- নিজেদের আদালতের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখার দাবি বিচারপতিদের
- পূর্ণাঙ্গ আদালতের বৈঠকে কী হয়েছিল?
- রোহিত গুপ্তার আটক নিয়ে বার্তা
- ফুয়ালের দাবি, তিনিই সতর্ক করেছিলেন
- বিমানবন্দরে আটক থেকে দ্বিতীয় আদালতি মামলা
- আর্থিক অভিযোগ ও শর্মার অস্বীকার
- বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের দাবি আইনজীবীদের
- সংসদ কীভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে?
- রাজনৈতিক চাপ ও আদালতের বিদ্যমান টানাপোড়েন
- মূল বিষয়গুলো
শুক্রবার জরুরি পূর্ণাঙ্গ আদালত বৈঠকে বিচারপতিরা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে বিচার বিভাগের ভেতর একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। শর্মা ও ফুয়াল তাঁদের বক্তব্য তুলে ধরেন। আরও আলোচনার জন্য সোমবার আবার বৈঠকে বসতে সম্মত হন বিচারপতিরা। কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত ঘোষণা না করে তদন্তের প্রস্তাব দিয়েই বৈঠক শেষ হয়।
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে—সাপকোটা প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ও অন্য প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি ব্যবহার করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেছিলেন কি না। প্রকাশিত এক হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনে ব্যবসায়ী রোহিত গুপ্তার আটক থাকার প্রসঙ্গ ছিল: অভিযোগ, গুপ্তার মুক্তি চেয়ে করা আবেদন খারিজ করতে সাপকোটা ফুয়ালকে অনুরোধ করেছিলেন। পরে ফুয়াল বলেন, আদালত ২ কোটি রুপি জামিনের আদেশ দিয়েছিল।
সাপকোটার সঙ্গে যোগাযোগ ও তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা স্বীকার করেছেন ফুয়াল; তবে অসদাচরণ বা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। শর্মা সাপকোটাকে চেনা, তাঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ কিংবা কথিত লেনদেনে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
বেঞ্চে মামলা বণ্টনের জন্য লটারি তোলার আগে বিচারপতিরা বৈঠক করেন। বিচারকদের যে দল মামলা শুনে সিদ্ধান্ত দেয়, সেটিই বেঞ্চ। আলোচনা শেষে তাঁরা লটারি তোলেন এবং নিয়মিত শুনানিতে অংশ নেন। ফলে তাৎক্ষণিক প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপে তদন্তের দাবি এবং আদালতের দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে যাওয়া—দুটিই ছিল।
সাপকোটা কীভাবে সরকারি পদে থাকা ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাতেন, সে বিষয়ে বিচারক, আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতারা জবাব চাইছেন। সোমবারের আলোচনা এ বিষয়ে নির্ধারিত পরবর্তী পদক্ষেপ।
পূর্ণাঙ্গ আদালতের বৈঠকে কী হয়েছিল?
বৈঠকের শুরুতে সাপকোটার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেন ফুয়াল। তিনি বলেন, সাপকোটা প্রধানমন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে বিচারপতিদের কাছে যেতেন। তিনি আরও বলেন, সাপকোটার ইচ্ছা অনুযায়ী তিনি বা অন্য বিচারপতিরা কোনো রায় দেননি।
ফুয়াল আরও বলেন, বিচারপতিরা সাপকোটা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়কে জানিয়েছিলেন, যা তাঁর গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি তৈরিতে সহায়তা করে। তাঁর নিজের নাম ও প্রধান বিচারপতির নাম—দুটিই প্রকাশ্যে এই বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় তিনি আদালতের ভেতর থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের পক্ষে মত দেন।
বিচারপতি নিত্যানন্দ পাণ্ডে, মেঘরাজ পোখরেল, মহেশ শর্মা পৌডেল, শ্রীকান্ত পৌডেল ও শরণঙ্গ সুবেদী বক্তব্য দেন। অংশগ্রহণকারীরা বলেন, সংসদ যে পদক্ষেপই নিক না কেন, বিচার বিভাগকে নিজস্ব উদ্যোগেও অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখতে হবে।
প্রাথমিক বিবরণে বলা হয়েছিল, জ্যেষ্ঠ বিচারপতি স্বপ্না প্রধান মল্ল ছাড়া সব বিচারপতি উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তী বিবরণে আরও বলা হয়, ছুটিতে থাকায় বিচারপতি আবদুল আজিজ মুসলমানও অনুপস্থিত ছিলেন। মল্ল দেশের বাইরে ছিলেন। সব বিচারপতি উপস্থিত থাকলে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে—এ উদ্দেশ্যেই সোমবারের বৈঠকের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
রোহিত গুপ্তার আটক নিয়ে বার্তা
প্রকাশিত হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনটি শুরু হয় সাপকোটা ফুয়ালকে গুপ্তাকে নিয়ে করা একটি হেবিয়াস কর্পাস আবেদনের স্ক্রিনশট পাঠালে। গুপ্তা হিমালয়ান রিইনস্যুরেন্সের সাবেক পরিচালক। বিশেষ আদালতের আদেশের পর তাঁকে আটক রাখার বিরুদ্ধে ওই আবেদন করা হয়েছিল।
হেবিয়াস কর্পাস আবেদনের মাধ্যমে কাউকে আইনসম্মতভাবে আটক রাখা হয়েছে কি না, তা আদালতকে খতিয়ে দেখতে বলা হয়। আটক ব্যক্তি বা তাঁর পক্ষে অন্য কেউ এই আবেদনের মাধ্যমে আটক রাখার বিষয়ে বিচারিক পর্যালোচনা চাইতে পারেন।
তদন্তের আওতায় থাকা কথিত মধ্যস্থতাকারী সাপকোটা আবেদনটি খারিজের অনুরোধ জানাতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কথা উল্লেখ করেছিলেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে:
দয়া করে এটা থামান, স্যার। প্রধানমন্ত্রীও এ বিষয়ে আগ্রহী। দয়া করে আবেদনটি খারিজ করে দিন।
পরে ফুয়াল সাপকোটাকে জানান, তাঁকে নিয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ গুপ্তাকে আটক রাখার যথেষ্ট কারণ পায়নি এবং ২ কোটি রুপি জামিনে মুক্তির আদেশ দিয়েছে। তিনি আদেশের একটি লিংক পাঠিয়েছিলেন বলে জানা গেছে এবং পরদিন সন্ধ্যায় পুলচকের হোটেল হিমালয়ায় দেখা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
আইনি কার্যক্রম চলাকালে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পাওয়াকে জামিন বলে। ফুয়ালের বক্তব্য, সাপকোটার অনুরোধের ভিত্তিতে নয়, বরং গুপ্তার মামলার merits বিবেচনা করেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল।
ফুয়ালের দাবি, তিনিই সতর্ক করেছিলেন
সুপ্রিম কোর্ট থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের হোটেল হিমালয়ায় সাপকোটার সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান ও বৈঠকের কথা ফুয়াল স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষ্য, শর্মার নিয়োগের পর কয়েকজন বিচারপতিকে অভিশংসনের মুখে পড়তে হতে পারে—এমন গুঞ্জনের মধ্যে সাপকোটা প্রথমে নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের কথা পৌঁছে দেওয়া ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন।
ফুয়ালের ভাষ্য অনুযায়ী, সাপকোটার এক আত্মীয়—একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয়। পরে সাপকোটা নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ এবং ব্যবসায়ী দীপক ভাট্টাকে ঘিরে মামলাসহ বিচারাধীন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন।
ফুয়াল বলেন, তিনি ও অন্য বিচারপতিরা সন্দেহে পড়েন, সাপকোটার আচরণ নিয়ে আলোচনা করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে তথ্য ও যোগাযোগের বিবরণ পাঠান। তিনি আরও বলেন, পুলিশপ্রধান ও সেনাপ্রধানকেও উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছিল।
প্রস্তাবিত তদন্তে বৈঠক, বার্তা ও কর্মকর্তাদের সতর্ক করার সময়সহ এসব যোগাযোগের ধারাবাহিকতা পুনর্গঠন করতে হবে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ফুয়ালের ব্যাখ্যার ভিত্তি হলো—বিচারপতিরা প্রভাব খাটানোর সম্ভাব্য চেষ্টা শনাক্ত করে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিলেন।
বিমানবন্দরে আটক থেকে দ্বিতীয় আদালতি মামলা
সাবেক প্রধান বিচারপতি চোলেন্দ্র শমশের রানার ফোন পরীক্ষা করতে গিয়ে তদন্তকারীরা সাপকোটার সঙ্গে তাঁর ঘন ঘন ফোনালাপের তথ্য পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এরপর পুলিশের নজরদারিতে আসেন ৩০ বছর বয়সী সাপকোটা। ২৭ সেপ্টেম্বর ভারতে যাওয়ার প্রস্তুতিকালে ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে আটক করে পুলিশ।
পরে তদন্তকারীরা তাঁর ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করেন। তাঁদের সন্দেহ, অনুকূল আদালতি রায় পেতে আগ্রহী ব্যক্তি এবং পদোন্নতিপ্রত্যাশী কর্মকর্তাদের হয়ে তিনি মধ্যস্থতা করতেন। সম্ভাব্য অর্থপাচারের যোগসূত্রও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিবরণগুলোতে উল্লেখ করা প্রধান ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা:
- মে: সাংবিধানিক পরিষদ ফুয়ালসহ আরও জ্যেষ্ঠ তিন বিচারপতিকে ডিঙিয়ে শর্মাকে প্রধান বিচারপতি করে।
- ২৭ সেপ্টেম্বর: ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাপকোটাকে আটক করে পুলিশ।
- ৯ অক্টোবর: ফুয়াল ও বিচারপতি সুনীল পোখরেলকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ সাপকোটার আটকের বিরুদ্ধে তাঁর স্ত্রীর করা আবেদন খারিজ করে।
- বৃহস্পতিবার: হোয়াটসঅ্যাপ কথোপকথনের বিস্তারিত প্রকাশ্যে আসে।
- শুক্রবার: জরুরি পূর্ণাঙ্গ আদালত বৈঠকে বিতর্কটি নিয়ে আলোচনা করেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা।
- সোমবার: আরও আলোচনার জন্য আবার বৈঠকে বসতে সম্মত হন বিচারপতিরা।
সাপকোটার স্ত্রী কবিতা পাণ্ডে ৯ অক্টোবর হেবিয়াস কর্পাস আবেদনটি করেছিলেন। সাপকোটার সঙ্গে আগের যোগাযোগের কথা স্বীকার করায় ওই সিদ্ধান্তে ফুয়ালের অংশগ্রহণও এখন তদন্ত ও আলোচনার আরেকটি বিষয়।
আর্থিক অভিযোগ ও শর্মার অস্বীকার
সাপকোটার ফোন থেকে উদ্ধার করে প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো নথিতে শর্মা, রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির সংসদ সদস্য বিশ্বরাজ পোখরেল এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বংশীরাজ দাহালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কথিত আর্থিক লেনদেনের উল্লেখ রয়েছে।
নথিতে তিন মাসে মোট ১,৯৮,৩৩৩ জমা এবং আরও ৭,৫০০ ডলার চাওয়ার কথা আছে; প্রথম অঙ্কটির মুদ্রা উল্লেখ করা হয়নি। নেপাল ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংক হিসাবের কথা উল্লেখ রয়েছে। বলা হয়েছে, অর্থ সাপকোটার আত্মীয়দের নামে থাকা হিসাবে পাঠানো হয়েছিল। প্রথম অঙ্কটির মুদ্রা জানা না থাকায় এই অঙ্কগুলো একত্র করে অর্থবহ হিসাব করা সম্ভব নয়।
শর্মা সাপকোটাকে চেনা, তাঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ এবং কথিত লেনদেনে অংশ নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। অর্থের মালিকানা, উদ্দেশ্য ও প্রাপক কারা—এসব তদন্তে নির্ধারণ করতে হবে।
সাপকোটার সঙ্গে যোগাযোগ এবং সাবেক প্রধান বিচারপতি রানাকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর গভীর রাতে তাঁর কাছে যাওয়ার বিষয়ে তদন্তের পর দাহালকে ইতিমধ্যে বরখাস্ত করা হয়েছে।
প্রাথমিক পুলিশি অনুসন্ধানে সাপকোটার যোগাযোগের পরিধি তিন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব, সাবেক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক দান বাহাদুর কার্কির সঙ্গে যোগাযোগের কথাও প্রকাশিত হয়েছে। সাপকোটা কীভাবে এসব সম্পর্ক ব্যবহার করতেন, তা তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন।
বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের দাবি আইনজীবীদের
আইনজীবীদের প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয় সংগঠন নেপাল বার অ্যাসোসিয়েশন জনজবাবদিহি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকার—দুটিরই সুরক্ষা নিশ্চিত করে এমন তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। বিবৃতিতে সংগঠনটি তদন্তের মানদণ্ড তুলে ধরেছে:
এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে প্রমাণনির্ভর, নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করতে হবে।
অন্যায় প্রমাণিত হলে ব্যক্তির পদমর্যাদা যা-ই হোক, আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। অভিযোগ প্রমাণিত না হলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষা করতে হবে বলেও তারা জানিয়েছে। প্রত্যেককে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি বলরাম কেসি সংসদ অথবা আদালতকে তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর প্রস্তাবিত কমিটিতে কর্মরত বিচারপতি, বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি, সাবেক বিচারপতি ও নাগরিক সমাজের সদস্য থাকতে পারেন। প্রধান বিচারপতিকে ঘিরে অভিযোগ খতিয়ে দেখার ক্ষমতাও কমিটির থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
দৃশ্যত মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে বিচারপতিদের বৈঠক এবং তথ্য প্রকাশের পর তাঁদের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়ারও সমালোচনা করেছেন কেসি। তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী তদন্তে কর্মরত বিচার বিভাগের বাইরের ব্যক্তিরাও যুক্ত হবেন। শুক্রবারের বৈঠকে বিচারপতিরা মূলত আদালতের ভেতরে একটি কমিটি গঠনের বিষয়ে আলোচনা করেন।
সংসদ কীভাবে পদক্ষেপ নিতে পারে?
নেপালের সংবিধানের ১০১ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের জন্য অভিশংসন প্রক্রিয়ার বিধান রয়েছে। জেলা ও হাইকোর্টের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাথমিক অনুসন্ধান ও তদন্তে বিচার বিভাগীয় পরিষদের ভূমিকা থেকে এ প্রক্রিয়া আলাদা।
১০১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রতিনিধি সভার কর্মরত সদস্যদের অন্তত এক-চতুর্থাংশ অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন। সংবিধান বা আইন গুরুতরভাবে লঙ্ঘন, অসদাচরণ, অক্ষমতা কিংবা সততার সঙ্গে সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা—এর ভিত্তিতে প্রস্তাব আনা যেতে পারে।
প্রতিনিধি সভার ১১ সদস্যের একটি অভিশংসন সুপারিশ কমিটি অভিযোগের ভিত্তি পরীক্ষা করে তদন্তের পর অভিশংসনের সুপারিশ করতে পারে। প্রস্তাব পাসের জন্য সভার সব কর্মরত সদস্যের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। অর্থাৎ, প্রস্তাব জমা দিলে প্রক্রিয়া শুরু হয়; অপসারণের জন্য প্রয়োজন হয় আরও বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন।
১০১(৮) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণের পরও দায়িত্ব পালনকালে করা অপরাধের জন্য আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। আদালতের অভ্যন্তরীণ তদন্তের ভূমিকা আলাদা: এর মাধ্যমে আচরণ খতিয়ে দেখে প্রতিবেদন দেওয়া যায়। আর অভিশংসনের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের সাংবিধানিক ক্ষমতা সংসদের হাতে।
রাজনৈতিক চাপ ও আদালতের বিদ্যমান টানাপোড়েন
বুধবার ললিতপুরের বুধানীলকণ্ঠে রবি লামিছানের বাসভবনে প্রায় চার ঘণ্টার বৈঠকে বিতর্কটি নিয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী শাহ ও রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির সভাপতি লামিছানে। আলোচনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত বিবরণে পদক্ষেপ নেওয়ার গতি নিয়ে মতভেদের কথা বলা হয়েছে। শাহ দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে ছিলেন; আর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যক্রম শুরুর আগে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পক্ষে ছিলেন লামিছানে।
দলটির মুখপাত্র জগদীশ খারেল প্রকাশ্যে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারে দল সমর্থন করে। প্রধানমন্ত্রীর নীতি, প্রশাসন ও সুশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা সুদীপ ঢকাল বলেন, সংবিধান ও বিদ্যমান আইন যে ক্ষমতা দিয়েছে, সরকার সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে।
সুশাসন সংস্কারে সরকারের ১০০ দফার কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন ঢকাল। আইনজীবী ও রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির সংসদ সদস্য যজ্ঞমণি নিউপানে বিচার বিভাগসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য, সিদ্ধান্ত নিতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে।
নিয়োগ ও প্রশাসন নিয়ে আগে থেকেই বিভক্ত আদালতেও পৌঁছেছে এ বিতর্ক। মে মাসে শর্মাকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের সময় স্পষ্ট নির্বাচনী মানদণ্ড না জানিয়ে তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ তিন বিচারপতিকে ডিঙিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিচারপতি নিয়োগ, সাংবিধানিক বেঞ্চ, বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে মতপার্থক্যেও সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েছিল।
সেপ্টেম্বরে পুলিশ রানাকে তাঁর বাসা থেকে নিয়ে যাওয়ায় আরেকটি বিরোধ তৈরি হয়। পুলিশ প্রথমে একে গ্রেপ্তার বলে বর্ণনা করে, পরে জানায়, তাঁর নিরাপত্তার জন্য তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। এর পর পূর্ণাঙ্গ আদালতের এক বিবৃতিতে নির্বাহী বিভাগের স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপের নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে বিচারিক কার্যক্রমে বাইরের ও ভেতরের প্রভাব ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
সোমবারের বৈঠকে প্রাতিষ্ঠানিক এসব টানাপোড়েনের সঙ্গে বার্তা, বৈঠক ও অর্থ নিয়ে নির্দিষ্ট অভিযোগগুলোও আলোচনায় আসবে। শুক্রবার উত্থাপিত বাস্তব প্রশ্নটির মুখোমুখি হবেন বিচারপতিরা: আদালতের নিজস্ব নেতৃত্বের আচরণ খতিয়ে দেখতে সক্ষম তদন্ত কীভাবে গঠন করা যায়।
মূল বিষয়গুলো
- ইনাম সাপকোটার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্তের প্রস্তাব দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা এবং সোমবার আবার বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছেন।
- বিচারপতি হরি প্রসাদ ফুয়াল সাপকোটার সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান ও বৈঠকের কথা স্বীকার করেছেন, অসদাচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন বিচারপতিরা কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিলেন।
- প্রকাশিত বার্তাগুলোতে রোহিত গুপ্তার আটক থাকার প্রসঙ্গ ছিল। ফুয়াল বলেন, মামলার merits বিবেচনায় আদালত ২ কোটি রুপি জামিনের আদেশ দিয়েছিল।
- প্রধান বিচারপতি মনোজ কুমার শর্মা সাপকোটাকে চেনা বা কথিত আর্থিক লেনদেনে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
- ফুয়াল ও বিচারপতি সুনীল পোখরেল ৯ অক্টোবর সাপকোটার স্ত্রীর করা আটকের বিরুদ্ধে আবেদন খারিজ করেছিলেন।
- নেপাল বার অ্যাসোসিয়েশন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে, ১০১ অনুচ্ছেদে সংসদের অভিশংসন প্রক্রিয়া নির্ধারিত রয়েছে।






