নিরাপদ প্রসব বাড়লেও বিশেষজ্ঞ ও নিবিড় পরিচর্যার ঘাটতিতে নেপালের মাতৃসেবা হাসপাতাল

পড়তে 11 মিনিট
Nepal's Maternity Hospitals Face Specialist and Critical Care Gaps Despite Safer Births

প্রসবের ১৮ ঘণ্টা পর আকস্মিক ধসে মৃত্যু

ত্রিশের কোঠার শুরুর দিকে থাকা এক নারী কাঠমান্ডুর পরোপকার মাতৃ ও নারী হাসপাতালে ধসে পড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মারা যান। এতে নেপালের জাতীয় মাতৃসেবা রেফারেল কেন্দ্রে জরুরি সেবার ঘাটতি সামনে এসেছে। হাসপাতালটির পরিচালক জানান, মায়েদের জন্য সেখানে নিবিড় পরিচর্যার ১০টি শয্যা থাকলেও হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ, কিডনি বিশেষজ্ঞ বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ নেই।

সূচিপত্র
  1. প্রসবের ১৮ ঘণ্টা পর আকস্মিক ধসে মৃত্যু
  2. রক্তজমাটের দুই জরুরি ঘটনা, ভিন্ন পরিণতি
  3. মাতৃ নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে কী সেবা মেলে
  4. রেফারেল মানে আরেকটি বিপজ্জনক যাত্রা
  5. মৃত্যুর কিছু কারণ কেন অনিশ্চিত থেকে যায়
  6. নেপালে মাতৃমৃত্যুর হিসাব রাখার সূচনা
  7. স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসব বেড়েছে, মাতৃমৃত্যু কমেছে
  8. অগ্রগতির মাইলফলক ও পরবর্তী লক্ষ্য
  9. সরঞ্জামের বাইরেও বিনিয়োগ দরকার
  10. মূল বিষয়

নিরাপদ প্রসবসেবা পাওয়ার আশায় ওই নারীর স্বজনেরা তাঁকে ধাদিং থেকে থাপাথালির বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। সন্তান জন্ম দেওয়ার ১৮ ঘণ্টা পর তাঁকে হুইলচেয়ারে করে অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ওয়ার্ড থেকে সাধারণ ওয়ার্ডে নেওয়া হয়। বিছানায় ওঠার জন্য দাঁড়াতেই তিনি ধসে পড়েন।

হাসপাতালটির পরিচালক ডা. শ্রীপ্রসাদ অধিকারী তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতির বর্ণনা দেন:

কিন্তু হুইলচেয়ার থেকে উঠে বিছানায় শোয়ার সময় তিনি ধসে পড়েন এবং চিকিৎসকেরা তাঁর অবস্থা যাচাই করার আগেই কয়েক মিনিটের মধ্যে মারা যান।

হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে পালমোনারি এম্বোলিজমের কথা জানান, যা ফুসফুসের রক্তনালি আটকে দেওয়া রক্তজমাট। অবহেলার অভিযোগ তুলে তাঁর স্বজনেরা হাসপাতালে প্রতিবাদ করেন। ওই অভিযোগের তদন্তের কোনো ফলাফল জানানো হয়নি।

এই মৃত্যু নেপালে প্রসবকে নিরাপদ করার প্রচেষ্টার এক কঠিন পর্যায় তুলে ধরে। আরও বেশি নারী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যাচ্ছেন এবং মাতৃমৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবু রোগী হঠাৎ সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে প্রয়োজনীয় নানা বিশেষজ্ঞ, নার্সিং সেবা ও জরুরি চিকিৎসা দিতে হাসপাতালগুলো এখনো হিমশিম খায়।

রক্তজমাটের দুই জরুরি ঘটনা, ভিন্ন পরিণতি

পরোপকারে আরেক নারীর প্রসবের পর ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস হয়েছিল। তাঁকে বীর হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তরের পর তিনি বেঁচে যান। অধিকারী জানান, প্রাণঘাতী ধসের কয়েক সপ্তাহ পর এক রোববার সন্ধ্যায় ওই জরুরি ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞাপন

ডিপ ভেইন থ্রম্বোসিস হলো গভীর শিরায়, সাধারণত পায়ে, রক্তজমাট বাঁধা। পালমোনারি এম্বোলিজম হয় যখন রক্তজমাট ফুসফুসে রক্তপ্রবাহ আটকে দেয়; কখনো শরীরের অন্য কোনো স্থান থেকে রক্তজমাট সেখানে পৌঁছায়। গর্ভাবস্থা ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে রক্তজমাট বাঁধার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

অধিকারী বলেন, তাঁর দল বেঁচে যাওয়া রোগীকে অবিলম্বে বীর হাসপাতালে স্থানান্তর করে। এই দুই জরুরি ঘটনা দেখায়, মাতৃসেবা হাসপাতালগুলোকে কী ভিন্ন ধরনের চাহিদা সামলাতে হয়: নিরাপদে সন্তান প্রসব করানো এক কাজ, আর মায়ের ফুসফুস, হৃদ্‌যন্ত্র বা অন্য অঙ্গের আকস্মিক সংকটের চিকিৎসায় আরেকটি দল ও ভিন্ন মাত্রার নিবিড় পরিচর্যা লাগতে পারে।

তাই সন্তান জন্ম দেওয়ার পরও পরিবারের জন্য সময়টি বিপজ্জনক থেকে যেতে পারে, যদিও প্রসব নিজে নির্বিঘ্ন হয়েছে বলে মনে হয়। ধাদিংয়ের ওই নারী হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই, সন্তান জন্ম দেওয়ার মাত্র ১৮ ঘণ্টা পর অসুস্থ হয়ে পড়েন।

মাতৃ নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে কী সেবা মেলে

পরোপকারের মাতৃ নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটকে ক্যাটাগরি বি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা একে এমন রোগীদের জন্য মধ্যবর্তী স্তরের সেবা হিসেবে বর্ণনা করেন, যাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। তাঁদের মতে, সংকটাপন্ন রোগীদের জন্য ক্যাটাগরি এ ইউনিট দরকার, যেখানে ক্রিটিক্যাল কেয়ার চিকিৎসকেরা তাঁদের পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা দিতে পারেন।

হাসপাতালের জনবলসংকট শুধু আইসিইউর শ্রেণিবিভাগেই সীমিত নয়। অধিকারী বলেন, হৃদ্‌রোগের চিকিৎসার জন্য সেখানে হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ, কিডনির সমস্যার চিকিৎসার জন্য নেফ্রোলজিস্ট এবং সবচেয়ে সংকটাপন্ন রোগীদের চিকিৎসা সমন্বয়ের জন্য ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ নেই।

অধিকারী নার্সদের কাজের চাপ এবং বাইরে থেকে সহায়তা আনার প্রয়োজনীয়তার কথা জানান:

নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে একসঙ্গে ভর্তি ১০ জন রোগীর দেখভাল করতে হয় দুজন নার্সকে। জটিলতা দেখা দিলে অন্য হাসপাতাল থেকে বিশেষজ্ঞ ডাকতে হয়, আর চিকিৎসা পেতে দেরি হলে রোগীদের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

এই জনবল দিয়ে ১০টি শয্যাই পূর্ণ থাকলে প্রত্যেক নার্সকে পাঁচজন করে রোগীর দায়িত্ব নিতে হয়। বিশেষায়িত নিবিড় পরিচর্যার জন্য হাসপাতালটি প্রতি মাসে প্রায় এক ডজন সংকটাপন্ন মা ও প্রায় তিন ডজন শিশুকে অন্যত্র পাঠায়। ফলে পরোপকারে একটি শয্যা পাওয়া রোগীর জরুরি চিকিৎসার কেবল প্রথম ধাপ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

রেফারেল মানে আরেকটি বিপজ্জনক যাত্রা

পরোপকারের চিকিৎসকেরা জানান, অন্য সরকারি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যার শয্যা খুঁজে পাওয়া প্রায়ই কঠিন। শয্যা নিশ্চিত হলেও রোগীকে সেখানে পৌঁছানোর যাত্রা পার করতে হয়। চিকিৎসকদের মতে, নেপালের অধিকাংশ অ্যাম্বুলেন্সে যাত্রাপথে উন্নত জীবনরক্ষাকারী সেবা দেওয়ার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই।

উন্নত জীবনরক্ষাকারী সেবা বলতে সংকটাপন্ন রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস ও রক্তসঞ্চালনসহ জরুরি শারীরিক কার্যক্রম সচল রাখার সক্ষমতাকে বোঝায়। স্থানান্তরের সময় যার অবস্থা খারাপ হয়, গ্রহণকারী হাসপাতালে পৌঁছানোর পর নয়, বরং তখনই তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

সুরখেতের কর্ণালী প্রাদেশিক হাসপাতালও একই ধরনের চাপে রয়েছে। সন্তান জন্ম দেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে আরও চিকিৎসার জন্য কাঠমান্ডুতে নেওয়ার পথে হেলিকপ্টারেই বিশের কোঠার মাঝামাঝি বয়সী এক নারী মারা যান। চিকিৎসকেরা তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠিয়েছিলেন।

সুরখেত হাসপাতালে প্রতি সপ্তাহে জটিল প্রসবের দুই থেকে তিনটি ঘটনা আসে। সাম্প্রতিক জরুরি ঘটনাগুলোর বিবরণে উল্লেখ করা এক মঙ্গলবার দোলপা থেকে প্রসববেদনায় থাকা এক নারীকে আকাশপথে সেখানেও নেওয়া হয়েছিল। এসব যাত্রা দেখায়, চিকিৎসাসেবায় একাধিক ধাপ থাকতে পারে: দুর্গম জেলা থেকে প্রাদেশিক হাসপাতাল, এবং কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে সেখান থেকে কাঠমান্ডু।

অস্থিতিশীল অবস্থায় থাকা মায়ের জন্য প্রতিটি ধাপে গ্রহণকারী দল, উপযুক্ত শয্যা এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা সামলাতে সক্ষম পরিবহন দরকার। রেফারেল ব্যবস্থায় এই তিনটির সমন্বয় জরুরি।

মৃত্যুর কিছু কারণ কেন অনিশ্চিত থেকে যায়

সুরখেত হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান ডা. অমিত সিং বলেন, কোনো মা বা নবজাতকের মৃত্যু হলে তাঁর দল কখনো কখনো সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করতে পারে না। চিকিৎসকেরা যে সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন, তা তিনি এভাবে বর্ণনা করেন:

অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। আমরা শুধু অনুমান করতে পারি, হয়তো কোনো একটি বা অন্য কোনো জটিলতা এর কারণ ছিল।

নেপালে মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় উদ্ধৃত গবেষণাগুলোতে প্রসব-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা, রেফারেলে বিলম্ব ও অব্যবস্থাপনাকে মাতৃমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্য কারণের মধ্যে রয়েছে সংক্রমণ, গর্ভপাতজনিত জটিলতা, আগে থেকে থাকা হৃদ্‌রোগ এবং অ্যামনিওটিক ফ্লুইড এম্বোলিজম। এটি বিরল জরুরি অবস্থা, যাতে অ্যামনিওটিক তরল মায়ের রক্তপ্রবাহে প্রবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

বিজ্ঞাপন

প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া গর্ভাবস্থাসংশ্লিষ্ট একটি সমস্যা, যাতে উচ্চ রক্তচাপ এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। এক্ল্যাম্পসিয়ায় খিঁচুনি হয়। তীব্র রক্তক্ষরণ, যা প্রসব-পরবর্তী রক্তক্ষরণ নামেও পরিচিত, দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এসব অবস্থার চিকিৎসা একেক রকম; এ কারণেই জটিল জরুরি পরিস্থিতিতে শুধু প্রসূতিসেবার দক্ষতা যথেষ্ট নাও হতে পারে।

সিং বলেন, একটি ক্রিটিক্যাল কেয়ার সুবিধা বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তাঁর উদ্বেগে রোগীদের তাৎক্ষণিকভাবে বাঁচানোর প্রয়োজনের পাশাপাশি মৃত্যুর কারণ নির্ভুলভাবে বোঝার বিষয়টিও উঠে এসেছে, যাতে হাসপাতালগুলো চিকিৎসা বা রেফারেল ব্যবস্থায় কোথায় পরিবর্তন দরকার তা শনাক্ত করতে পারে।

নেপালে মাতৃমৃত্যুর হিসাব রাখার সূচনা

২০২১ সালের আদমশুমারির মাধ্যমে নেপাল জাতীয় আদমশুমারির সঙ্গে যুক্ত প্রথম মাতৃমৃত্যু গবেষণা শুরু করে। দেশটিতে ওই আদমশুমারি স্থানীয়ভাবে २०७८ সালের আদমশুমারি নামে পরিচিত। স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা মন্ত্রণালয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর সঙ্গে মিলে মৃত্যুর ঘটনা শনাক্ত ও তার কারণ অনুসন্ধানের কাজ করে।

গবেষণার পরিকল্পনায় আদমশুমারির কর্মীদের পরিবারগুলোকে জিজ্ঞেস করতে বলা হয়েছিল, আগের ১২ মাসে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী কোনো নারীর মৃত্যু হয়েছে কি না। এরপর স্বাস্থ্যকর্মীরা মৃত্যুর পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করবেন; যেমন মৃত্যু গর্ভাবস্থায়, প্রসবের সময়, নাকি সন্তান জন্ম দেওয়ার ছয় সপ্তাহের মধ্যে ঘটেছে।

পরিকল্পনায় ৮৪৭ জন জরিপকারী এবং মৌখিক ময়নাতদন্তের প্রশ্নমালা ব্যবহার করে অনুসরণমূলক সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা ছিল। মৌখিক ময়নাতদন্তে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নির্ণয়ে সহায়তার জন্য স্বজন বা পরিচর্যাকারীদের কাছ থেকে মৃত্যুর আগে দেখা দেওয়া উপসর্গ ও ঘটনাবলি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

তৎকালীন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ইন্দ্রমণি পোখরেল বলেন, নিরাপদ মাতৃত্বসেবা আরও উন্নত, সহজলভ্য এবং পাওয়া সহজ করতে মাতৃমৃত্যু ও তার কারণ শনাক্ত করাই এ কাজের লক্ষ্য। গবেষণা ঘোষণায় আরও বলা হয়, প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের মৃত্যুর ১২ শতাংশের জন্য মাতৃমৃত্যু দায়ী বলে অনুমান করা হয়েছিল।

স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের ২০২২ সালে প্রকাশিত নেপাল মাতৃমৃত্যু সমীক্ষা ২০২১-এ সাতটি প্রদেশই অন্তর্ভুক্ত ছিল। নেপাল স্বাস্থ্য গবেষণা কাউন্সিল ও স্বাস্থ্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে পরিচালিত এ সমীক্ষায় দেখা যায়, মাতৃমৃত্যুর প্রায় চারটির মধ্যে তিনটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে অথবা যাতায়াতের সময় ঘটে। এতে দুর্বল রেফারেল ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সীমিত সক্ষমতা এবং সময়মতো মানসম্মত সেবা পেতে বিলম্বকে চিহ্নিত করা হয়।

সমীক্ষায় আগের ১২ মাসে ২০২১ সালের আদমশুমারিতে নথিভুক্ত গর্ভাবস্থাসংশ্লিষ্ট মৃত্যুর তথ্য ব্যবহার করা হয়; পরে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীরা মৌখিক ময়নাতদন্ত করেন। গর্ভাবস্থাসংশ্লিষ্ট ৬৫৩টি মৃত্যুর মধ্যে ৬২২টিকে মাতৃমৃত্যু হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। এসব মৃত্যু এবং আদমশুমারিতে নথিভুক্ত ৪১২,৯৩৫টি জীবিত জন্মের ভিত্তিতে মাতৃমৃত্যুর অনুপাত প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে ১৫১ বলে অনুমান করা হয়। বাগমতীতে এই অনুপাত ছিল ৯৮, লুম্বিনীতে ২০৭ এবং কর্ণালীতে ১৭২। বিস্তারিত বিশ্লেষণে ৬১১টি মাতৃমৃত্যু অন্তর্ভুক্ত হয়, কারণ ১১টি মৃত্যুর তথ্য অসম্পূর্ণ ছিল। ক্লিনিক্যাল প্রতিবেদন নয়, মৌখিক ময়নাতদন্তের তথ্য থেকে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ করা হয়েছিল; ফলে স্মৃতিনির্ভর ও অন্যান্য তথ্যপ্রতিবেদনজনিত পক্ষপাতের সম্ভাবনা ছিল।

বিশ্লেষণ করা মৃত্যুর মধ্যে ৫৭ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে, ২৬ শতাংশ বাড়িতে এবং প্রায় ১৭ শতাংশ কোনো কেন্দ্রে যাওয়ার পথে বা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে যাতায়াতের সময় ঘটে। ৬১ শতাংশ মৃত্যু ঘটে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর। মাতৃমৃত্যুর ৩২ শতাংশের জন্য প্রসূতিসংক্রান্ত নয় এমন জটিলতা, ২৬ শতাংশের জন্য প্রসূতিসংক্রান্ত রক্তক্ষরণ এবং ১২ শতাংশের জন্য উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা দায়ী ছিল। প্রসবের সময় বা সন্তান জন্ম দেওয়ার পর মারা যাওয়া নারীদের ৭৬ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন, তবে মাত্র ৫৩ শতাংশ সুপারিশ করা চারটি প্রসবপূর্ব পরীক্ষাই করিয়েছিলেন।

নারীদের ৭৪ শতাংশ চিকিৎসা পেতে অন্তত এক ধরনের বিলম্বের শিকার হয়েছিলেন; ১৭ শতাংশের ক্ষেত্রে তিন ধরনের বিলম্বই ঘটেছিল: চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে এবং চিকিৎসা পেতে। চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তে বিলম্ব হয়েছিল ৫৭ শতাংশের, চিকিৎসা পেতে বিলম্ব ৪০ শতাংশের এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে বিলম্ব ৩৩ শতাংশের ক্ষেত্রে। উল্লেখিত সমস্যার মধ্যে ছিল সময়মতো রেফারেলের জন্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে দেরি, গ্রহণকারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রশাসনিক বিলম্ব, পরিবহনের ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর মধ্যে দুর্বল যোগাযোগ এবং সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত কর্মী, রক্ত ও ওষুধের ঘাটতি।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসব বেড়েছে, মাতৃমৃত্যু কমেছে

মাতৃসেবা সম্প্রসারণে নেপাল উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। ২০০৯ সালে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনা মূল্যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবসেবা চালু হয় এবং সারা দেশে ২,৮০০টিরও বেশি প্রসবকেন্দ্র খোলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিনা মূল্যে প্রসবসেবা চালুর সময়ের কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হার ছিল প্রায় ১৮ শতাংশ; ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৯০.৫ শতাংশে দাঁড়ায়। অর্থাৎ ৭২.৫ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে অধিকাংশ প্রসব এমন পরিবেশে হচ্ছে, যেখানে দক্ষ সেবা দেওয়ার কথা।

১৯৯৬ সালে প্রতি এক লাখ জন্মে মাতৃমৃত্যুর অনুপাত ছিল ৫৩৯, যা ২০১৬ সালে ২৩৯-এ নেমে আসে। সাম্প্রতিক হাসপাতাল-সংক্রান্ত বিবরণে উদ্ধৃত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু ১৪২। ডব্লিউএইচও আরও জানিয়েছে, ২০০০ সালের পর থেকে এ হার ৭০ শতাংশের বেশি কমেছে।

মাতৃমৃত্যুর অনুপাত বলতে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মের বিপরীতে গর্ভাবস্থা বা এর ব্যবস্থাপনাসংশ্লিষ্ট মৃত্যুর সংখ্যা বোঝায়। এতে শুধু মোট মৃত্যুর সংখ্যা না দেখে দেশ ও স্বাস্থ্যসেবাগুলো গর্ভাবস্থা ও প্রসবের ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

নেপালের ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা হলো ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু ৭০-এ নামিয়ে আনা। ডব্লিউএইচওর উদ্ধৃত ১৪২-এর হিসাব থেকে ৭০-এ পৌঁছাতে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মৃত্যুর সংখ্যা ৭২ কমাতে হবে, অর্থাৎ অর্ধেকের কিছু বেশি।

অগ্রগতির মাইলফলক ও পরবর্তী লক্ষ্য

নেপালের অগ্রগতি কয়েক দশক ধরে এগিয়েছে। প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, মৃত্যুর কারণ বোঝার চেষ্টা এবং জাতীয় লক্ষ্যের বাকি অংশের চিত্র তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো:

  • ১৯৯৬: প্রতি এক লাখ জন্মে মাতৃমৃত্যুর অনুপাত ছিল ৫৩৯।
  • ২০০৯: সরকার সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনা মূল্যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবসেবা চালু করে।
  • ২০১৬: প্রতি এক লাখ জন্মে মাতৃমৃত্যুর অনুপাত ছিল ২৩৯।
  • ২০২১: নেপাল জাতীয় আদমশুমারির সঙ্গে যুক্ত মাতৃমৃত্যু সমীক্ষা শুরু করে।
  • ২০২৫: স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হার বেড়ে ৯০.৫ শতাংশে পৌঁছায়।
  • ২০৩০: নেপালের লক্ষ্য প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু ৭০-এ নামিয়ে আনা।

সাম্প্রতিক মৃত্যু ও জরুরি স্থানান্তরের ঘটনাগুলো দেখায়, নারীরা সেবাকেন্দ্রে পৌঁছানোর পর গুরুতর জটিলতার চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতার ওপর এখন এই প্রচেষ্টার চাপ পড়ছে। ধাদিং বা দোলপার মতো জেলা থেকে রেফার হওয়া রোগীদের পরবর্তী হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসা পাওয়া যাবে কি না, তা তাঁদের পরবর্তী যাত্রার গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।

সরঞ্জামের বাইরেও বিনিয়োগ দরকার

মাতৃস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. পবন শর্মা বলেন, মৃত্যু আরও কমাতে ধারাবাহিক ব্যয় ও সরকারের অঙ্গীকার প্রয়োজন। শুধু যন্ত্রপাতি কিনলে কেন গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি থেকে যাবে, তা তিনি এভাবে ব্যাখ্যা করেন:

শুধু ব্যয়বহুল সরঞ্জাম দিয়ে মাতৃমৃত্যু কমানো যায় না। সীমিত উদ্যোগে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব, তবে আরও উন্নতির জন্য বড় বিনিয়োগ এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

পরোপকারের অভিজ্ঞতা জনবলসংকটকে স্পষ্ট করে। কোনো হাসপাতালে আইসিইউ থাকলেও বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ ডাকতে, অন্য কোথাও ক্রিটিক্যাল কেয়ারের শয্যা খুঁজতে এবং স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হতে পারে। যেসব রোগীর অবস্থা দ্রুত বদলে যেতে পারে, তাঁদের পর্যবেক্ষণের জন্য নার্সদেরও পর্যাপ্ত সক্ষমতা থাকা দরকার।

বিভিন্ন চিকিৎসা শাখার বিশেষজ্ঞেরা একসঙ্গে কাজ করেন, এমন হাসপাতালে মাতৃসেবা, হৃদ্‌যন্ত্র ও কিডনি-সংক্রান্ত দক্ষতা এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ার একই চিকিৎসাপ্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যায়। গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত মায়েদের ক্ষেত্রে এতে হাসপাতালগুলোর মধ্যে জরুরি যাতায়াতের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।

প্রসবের জন্য নেপাল ইতিমধ্যে অনেক বেশি নারীকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। পরবর্তী কাজ হলো, সন্তান জন্মের পরসহ নিয়মিত মাতৃসেবা জরুরি অবস্থায় পরিণত হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো যাতে তা সামাল দিতে পারে, সেই সক্ষমতা গড়ে তোলা।

মূল বিষয়

  • ধাদিংয়ের এক নারী সন্তান জন্ম দেওয়ার ১৮ ঘণ্টা পর পরোপকার মাতৃ ও নারী হাসপাতালে মারা যান; চিকিৎসকেরা তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে পালমোনারি এম্বোলিজমের কথা জানান।
  • প্রসব-পরবর্তী রক্তজমাটে আক্রান্ত আরেক রোগী বীর হাসপাতালে স্থানান্তরের পর বেঁচে যান।
  • পরোপকারের ক্যাটাগরি বি মাতৃ আইসিইউতে ১০টি শয্যা থাকলেও হৃদ্‌রোগ, কিডনি ও ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিশেষজ্ঞ নেই।
  • হাসপাতালটি প্রতি মাসে প্রায় ১২ জন সংকটাপন্ন মা ও প্রায় ৩৬টি শিশুকে অন্যত্র পাঠায়।
  • ২০২২ সালে প্রকাশিত নেপাল মাতৃমৃত্যু সমীক্ষা ২০২১-এ দেখা যায়, মাতৃমৃত্যুর প্রায় চারটির মধ্যে তিনটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বা যাতায়াতের সময় ঘটে; ৭৪ শতাংশ নারী চিকিৎসা পেতে অন্তত এক ধরনের বিলম্বের শিকার হন।
  • ২০২৫ সালে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হার ৯০.৫ শতাংশে পৌঁছায়; ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি এক লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্যু ৭০-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেপালের।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে