১২ মিনিটে চার গোলে ফাইনালের মোড় ঘুরল
নভেম্বর ৫, ২০২৬-এ জাপানকে ৪-১ গোলে হারিয়ে রেকর্ড ষষ্ঠবার পুরুষদের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জিতেছে ভারত। মোহালির অলিম্পিয়ান বলবীর সিং সিনিয়র আন্তর্জাতিক হকি স্টেডিয়ামে শুরুতে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ায় তারা। ৪২তম থেকে ৫৩তম মিনিটের মধ্যে চারটি গোল কঠিন ফাইনালকে একতরফা জয়ে পরিণত করে এবং সাত ম্যাচে সাত জয়ের অভিযান সম্পূর্ণ করে।
সূচিপত্র
সমতাসূচক গোলটি করেন শিলানন্দ লাকরা। এরপর শেষ কোয়ার্টারে গোল করেন দিলপ্রীত সিং, জুগরাজ সিং ও বিবেক সাগর প্রসাদ। কাজুমাসা মাতসুমোতোর তৃতীয় মিনিটের গোলে এগিয়ে থাকা জাপান প্রথমার্ধজুড়ে ভারতকে পিছিয়ে রেখেছিল। ফলে চূড়ান্ত স্কোর দেখে যতটা সহজ মনে হতে পারে, বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের কাজ ছিল তার চেয়ে অনেক কঠিন।
এই জয়ে ২০২৩ ও ২০২৪ সালের সাফল্যের পর টানা তৃতীয় শিরোপা পেল ভারত। অধিনায়ক হারমানপ্রীত সিং ১০ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন এবং হিরো অব দ্য টুর্নামেন্ট পুরস্কার পান। উদীয়মান গোলরক্ষকের পুরস্কার জেতেন গোলরক্ষক কৃষাণ বাহাদুর পাঠক।
বিজয়ী দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ৩০০,০০০ রুপি এবং সহায়তাকারী দলের প্রত্যেক সদস্যকে ১৫০,০০০ রুপি পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে হকি ইন্ডিয়া। উদ্যাপনের দিনটি মিডফিল্ডার হার্দিক সিংয়ের জন্যও ব্যক্তিগত মাইলফলক হয়ে ওঠে; ফাইনালে তিনি খেলেন নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
ভারতকে তাড়া করতে বাধ্য করে জাপান
তৃতীয় মিনিটে ব্যাকহ্যান্ড শটে জাপানকে আদর্শ সূচনা এনে দেন মাতসুমোতো। তাঁর গোলের পর সফরকারীরা লিড ধরে রেখে পাল্টা আক্রমণে ভারতকে হুমকির মুখেও ফেলতে থাকে।
জাপানের গোলরক্ষক ও ডিফেন্ডাররা বারবার ভারতের ফরোয়ার্ডদের আটকে দেন। হার্দিকের একটি শট ঠেকিয়ে দেন গোলরক্ষক, আর ফিরতি বলে আদিত্যের চেষ্টা ব্লক হয়। ভারতের আরেকটি আক্রমণে বলটি শুটিং সার্কেল পেরিয়ে গেলেও দুই ফরোয়ার্ডের কেউই গোলে নেওয়ার মতো স্পর্শ করতে পারেননি।
পেনাল্টি কর্নারের আবেদন ব্যর্থ হওয়ায় শুরুতেই একটি ভিডিও রেফারেল হারায় ভারত। রেফারেল ব্যবস্থায় কোনো সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার জন্য দল ভিডিও আম্পায়ারের কাছে আবেদন করতে পারে। পরে রাইকি ফুজিশিমার ওপর হারমানপ্রীতের চ্যালেঞ্জ পর্যালোচনা করে পেনাল্টি কর্নার পায় জাপান।
১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় জাপান। লিগ পর্বে ভারত তাদের ৪-১ গোলে হারিয়েছিল, কিন্তু ফাইনালের চ্যালেঞ্জ ছিল ভিন্ন: সংগঠিত রক্ষণভাগ ভেদ করে গোলের পথ খুঁজে বের করা, একই সঙ্গে আরও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি সামলানো।
ভিডিও পর্যালোচনার পর ব্যবধান ঘোচান লাকরা
৩৩তম মিনিটে প্রথম পেনাল্টি কর্নার পায় ভারত। হার্দিক বল বাড়ান হারমানপ্রীতের কাছে, কিন্তু তাঁর ড্র্যাগ ফ্লিক ঠেকিয়ে দেন জাপানের গোলরক্ষক। ড্র্যাগ ফ্লিক হলো এমন একটি কৌশল, যেখানে খেলোয়াড় বলটিকে স্টিকের সঙ্গে টেনে নিয়ে দ্রুতগতির উঁচু শট নেন।
আরেকটি পেনাল্টি কর্নার থেকে তৈরি হওয়া আক্রমণে ৪২তম মিনিটে সমতা ফেরান লাকরা। সরাসরি শট না নিয়ে পাসের ভিন্ন কৌশল বেছে নেন হারমানপ্রীত। এরপর বল এমন জায়গায় নিয়ে যায় ভারত, যেখান থেকে গোল করতে পারেন লাকরা।
আদিত্যের পাসটি লাকরা জালে পাঠানোর আগে হাঁটুর উচ্চতার ওপরে উঠেছিল বলে গোলটি ভিডিও পর্যালোচনার মুখে পড়ে। বলটি বিপজ্জনক ছিল কি না, তা পরীক্ষা করে ভিডিও আম্পায়াররা গোলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
১-১ সমতায় শেষ কোয়ার্টারে প্রবেশ করে ভারত। লাকরার গোলে দীর্ঘ সময়ের সমতাসূচক গোলের চেষ্টা সফল হয় এবং বিজয়ী নির্ধারণে দুই দলের হাতে থাকে ১৫ মিনিট।
তিন গোলে নিশ্চিত হয় জয়
শুটিং সার্কেলের ভেতরে হার্দিক জাপানের রক্ষণভাগকে চাপে ফেলার পর ৪৭তম মিনিটে ভারতকে এগিয়ে দেন দিলপ্রীত। এই গোলের পর জাপানের সামনে চ্যালেঞ্জ বদলে যায়: সন্ধ্যার বেশির ভাগ সময় লিড রক্ষায় কাটানোর পর এবার তাদের ম্যাচে ফিরতে গোলের জন্য ছুটতে হয়।
৫২তম মিনিটে ব্যবধান বাড়ান জুগরাজ। অভিষেকের নেওয়া পেনাল্টি কর্নার থেকে শক্তিশালী ড্র্যাগ ফ্লিকে গোল করেন তিনি। পেনাল্টি কর্নারে আক্রমণকারী দল কাঠামোবদ্ধভাবে গোলের সুযোগ পায়; বলটি ব্যাক লাইন থেকে সার্কেলের বাইরে অপেক্ষমাণ সতীর্থদের কাছে পাঠানো হয়।
এর এক মিনিট পর ব্যবধান ৪-১ করেন বিবেক সাগর প্রসাদ। সার্কেলের কিনারায় ফিরতি বল পেয়ে জাপানের গোলরক্ষকের পায়ের ফাঁক দিয়ে শট নেন তিনি। এভাবেই ১২ মিনিটে চার গোলের ঝড় সম্পূর্ণ করে ভারত।
চতুর্থ কোয়ার্টারের ছয় মিনিটের ব্যবধানে আসে তিনটি গোল। জাপানের বিপক্ষে লিগ ম্যাচের মতোই একই ব্যবধানে জয় পায় ভারত, তবে এবার শুরুতে পিছিয়ে পড়ার ধাক্কা সামলে ফিরতে হয়েছিল তাদের।
সাত জয়, টানা তৃতীয় শিরোপা
সেমিফাইনালে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৮-১ গোলে হারানোর আগে লিগ পর্বের পাঁচটি ম্যাচই জেতে ভারত। ফাইনালে ৪-১ গোলের জয় টুর্নামেন্টের দুই পর্ব মিলিয়ে তাদের নিখুঁত রেকর্ড সম্পূর্ণ করে।
লিগের ম্যাচগুলো হয় জালন্ধরের অলিম্পিয়ান সুরজিৎ হকি স্টেডিয়ামে, আর নকআউট পর্বের আয়োজন করে মোহালি। ফলে পাঞ্জাবেই পুরো অভিযান সম্পন্ন করে ভারত; এক শহরের লিগ প্রতিযোগিতা থেকে অন্য শহরের নির্ধারণী ম্যাচে যায় দলটি।
২০১৮ সালে যৌথভাবে জেতা ট্রফিসহ ভারতের শিরোপা জয়ের সংখ্যা এখন ছয়। সর্বশেষ সাফল্যে মোট শিরোপার সংখ্যা এবং বর্তমান জয়ের ধারা, দুটিই আরও এগিয়েছে:
- ২০১১: প্রথম এশিয়ান চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জেতে ভারত।
- ২০১৬: দ্বিতীয় শিরোপা নিশ্চিত করে ভারত।
- ২০১৮: যৌথভাবে ট্রফি জেতে ভারত।
- ২০২৩: চতুর্থ শিরোপা জেতে ভারত।
- ২০২৪: পঞ্চম শিরোপা জিতে চ্যাম্পিয়নশিপ ধরে রাখে ভারত।
- নভেম্বর ৫, ২০২৬: মোহালিতে জাপানকে হারিয়ে ষষ্ঠ শিরোপা ও টানা তৃতীয় জয় পায় ভারত।
দুই নকআউট জয়ে মোট ১২-২ গোলে এগিয়ে ছিল ভারত: দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে আট গোল এবং জাপানের বিপক্ষে চার গোল, প্রতিটি ম্যাচে একটি করে গোল হজম করে। টুর্নামেন্টের গোলদাতার তালিকায় শীর্ষে থাকলেও ফাইনালে হারমানপ্রীতের বাইরে ভারতের আরও তিনজন খেলোয়াড় গোল করে দায়িত্ব ভাগ করে নেন।
টানটান সেমিফাইনালের পর দ্বিতীয় জাপান
গোলশূন্য সেমিফাইনালের পর শুটআউটে মালয়েশিয়াকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে জাপান। নিয়মিত খেলার মধ্যে কোনো দল গোল করতে না পারলে শুটআউটে নির্ধারিত হয় কোন দল পরের পর্বে যাবে।
এরপর ফাইনালেও দীর্ঘ সময় ধরে শক্ত রক্ষণাত্মক খেলা চালিয়ে যাওয়ার কাছাকাছি পৌঁছেছিল জাপান। মাতসুমোতোর শুরুর গোল তাদের এগিয়ে দেয়, আর তৃতীয় কোয়ার্টারের শেষ দিকে লাকরার সমতাসূচক গোলের আগপর্যন্ত তাদের প্রতিরোধ টিকে ছিল।
এই হারে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে জাপানের প্রথম শিরোপার অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হলো। ২০১৩, ২০২১ ও ২০২৬ সালে ফাইনালে হেরেছে তারা।
মালয়েশিয়াকে বিদায় করে ফাইনালে ওঠার পর জাপান তৃতীয়বারের মতো রানার্সআপ হলো। তৃতীয় মিনিট থেকে ৪২তম মিনিট পর্যন্ত ভারতের বিপক্ষে তাদের লিড ছিল। এরপর স্বাগতিকরা দ্রুত ধারাবাহিক কয়েকটি গোলে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
পাঞ্জাবে ব্যক্তিগত পুরস্কার ও সম্মাননা
১০ গোল করে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার সম্মাননার পাশাপাশি হিরো অব দ্য টুর্নামেন্ট পুরস্কারও পান হারমানপ্রীত। ফাইনালে ভারতের সমতাসূচক গোলের পথে পেনাল্টি কর্নারের আক্রমণে পাসের ভিন্ন কৌশল বেছে নেওয়াও ছিল তাঁর অবদান।
ভারত অধিনায়ক বলেন, তাঁর দল শেষ পর্যন্ত লড়াই করেছে। পাঞ্জাবে ট্রফি জেতাকে তিনি আজীবন মনে রাখার মতো স্মৃতি হিসেবে বর্ণনা করেন। মোহালিতে দর্শকে পরিপূর্ণ স্টেডিয়ামে ফাইনালটি উপভোগ করেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মানও।
হার্দিকের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে ভারতের আক্রমণেও সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাঁর। দিলপ্রীত ভারতকে এগিয়ে দেওয়া গোলটি করার আগে সার্কেলের ভেতরে জাপানের রক্ষণভাগকে চাপে ফেলেন তিনি।
উদীয়মান গোলরক্ষকের পুরস্কার পেয়ে ভারতের দলীয় সাফল্যে আরও একটি ব্যক্তিগত সম্মান যোগ করেন পাঠক। হকি ইন্ডিয়ার ঘোষিত পুরস্কার অনুযায়ী, সহায়তাকারী দলের প্রত্যেক সদস্যের তুলনায় প্রত্যেক বিজয়ী খেলোয়াড় দ্বিগুণ অর্থ পাবেন: যথাক্রমে ৩০০,০০০ ও ১৫০,০০০ রুপি। অর্থ প্রদানের কোনো তারিখ জানানো হয়নি।
ব্রোঞ্জ জিততে ঘুরে দাঁড়াল মালয়েশিয়া
ফাইনালের দিন এর আগে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৫-২ গোলে হারিয়ে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করে মালয়েশিয়া। ভারতের মতো তারাও পিছিয়ে পড়ার পর ঘুরে দাঁড়ায়; ২-১ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় টানা চারটি গোল করে তারা।
দ্বিতীয় মিনিটে গোল করে স্কোরিং শুরু করেন ফিতরি সারি। পঞ্চম মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে পার্ক গেউন উর গোলে সমতা ফেরায় দক্ষিণ কোরিয়া। এরপর ১৩তম মিনিটে চুন সেমিনের গোলে এগিয়ে যায় তারা।
৩৪তম মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল করে মালয়েশিয়াকে সমতায় ফেরান ফয়জল সারি। এরপর ৪৫তম ও ৫০তম মিনিটে গোল করেন আবু কামাল আজরাই। তাতে হাড্ডাহাড্ডি ম্যাচে ৪-২ ব্যবধানে এগিয়ে যায় মালয়েশিয়া।
৫৮তম মিনিটে আরেকটি পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল করে স্কোরলাইন সম্পূর্ণ করেন অধিনায়ক মারহান জলিল। দুই গোল করে ম্যাচসেরার পুরস্কার পান আজরাই। জাপানের কাছে সেমিফাইনালে শুটআউটে হারের পর তাঁর গোলগুলো মালয়েশিয়াকে পদক জিততে সাহায্য করে।
মূল তথ্য
- নভেম্বর ৫, ২০২৬-এ মোহালিতে জাপানকে ৪-১ গোলে হারিয়ে রেকর্ড ষষ্ঠ পুরুষদের এশিয়ান চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জেতে ভারত।
- কাজুমাসা মাতসুমোতোর গোলে এগিয়ে ছিল জাপান। এরপর ৪২তম থেকে ৫৩তম মিনিটের মধ্যে চারটি গোল করে ভারত।
- সাত ম্যাচে সাত জয় নিয়ে টানা তৃতীয় শিরোপা জেতে ভারত।
- হারমানপ্রীত সিং টুর্নামেন্টে ১০ গোল করে হিরো অব দ্য টুর্নামেন্ট নির্বাচিত হন।
- হার্দিক সিং তাঁর ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন এবং কৃষাণ বাহাদুর পাঠক উদীয়মান গোলরক্ষকের পুরস্কার পান।
- বিজয়ী দলের প্রত্যেক খেলোয়াড়কে ৩০০,০০০ রুপি এবং সহায়তাকারী দলের প্রত্যেক সদস্যকে ১৫০,০০০ রুপি দেওয়ার ঘোষণা দেয় হকি ইন্ডিয়া।
- আবু কামাল আজরাইয়ের দুই গোলে দক্ষিণ কোরিয়াকে ৫-২ ব্যবধানে হারিয়ে ব্রোঞ্জ জেতে মালয়েশিয়া।






