চাহিদা বাড়লেও লাখো শিশু স্কুলের বাইরে
আফগানিস্তানের প্রাথমিক বিদ্যালয়-বয়সী অর্ধেকের বেশি শিশু আনুষ্ঠানিক সাধারণ শিক্ষার বাইরে রয়েছে। ২০২১ সাল থেকে ২৬ লাখের বেশি মেয়েকে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের আফগানিস্তান শিক্ষা পরিস্থিতি প্রতিবেদন এ তথ্য জানিয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) এবং জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) যৌথভাবে ২০২৬ সালের ৪ নভেম্বর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।
সূচিপত্র
- চাহিদা বাড়লেও লাখো শিশু স্কুলের বাইরে
- শিশু বাড়ছে, চাপে স্কুল
- মেয়েদের জীবনে ছেদ পড়ার বর্ণনা
- কমিউনিটি ক্লাসে সীমিত সুযোগ
- শ্রেণিকক্ষে থাকা শিশুরাও শিখতে হিমশিম খাচ্ছে
- ফিরতি মানুষ ও বন্যায় বাড়তি চাপ
- বিশ্ববিদ্যালয় সংকুচিত, ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুযোগ কমছে
- জাতীয় সংকট, বৈশ্বিক প্রভাব
- সংকটের বিকাশ ও সংস্থাগুলোর উদ্যোগ
- মূল তথ্য
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়-বয়সী শিশুদের ৫৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে। শ্রেণিকক্ষে পৌঁছানো শিশুদের মধ্যেও শেখার গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির ৫৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর ওপর জাতীয় মূল্যায়নে দেখা গেছে, মাত্র চারজনের একজন তৃতীয় শ্রেণির জন্য নির্ধারিত গণিতের ন্যূনতম মান পূরণ করেছে।
আফগানিস্তান একই সঙ্গে নানা চাপের মুখে রয়েছে। স্কুল-বয়সী শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, বিপুলসংখ্যক পরিবার বিদেশ থেকে ফিরছে, জরুরি পরিস্থিতিতে স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বিনিয়োগও অপর্যাপ্ত। তালেবান কর্তৃপক্ষের আরোপিত বিধিনিষেধে মেয়েদের ও নারীদের জন্য মাধ্যমিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে, ফলে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতেও পরিবারগুলো সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৬৬ লাখ শিশু ভর্তি হয়, যা ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় ৫ লাখ ৬০ হাজার বেশি। কমিউনিটিভিত্তিক ক্লাসেও শেখার সুযোগ রয়েছে, বিশেষ করে মেয়েদের জন্য। তবে ইউনেস্কো ও ইউনিসেফ বলছে, শিক্ষার সুযোগের বিস্তার চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। মেয়েদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাদান, শ্রেণিকক্ষ ও শেখার উপকরণের মানও উন্নত করতে হবে।
শিশু বাড়ছে, চাপে স্কুল
আফগানিস্তানে স্কুল-বয়সী শিশু ও কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা ২০১৯ সালের প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১ কোটি ১৫ লাখ হয়েছে। পাঁচ বছরে এ সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ, অর্থাৎ প্রায় ১১ শতাংশ বেড়েছে।
বর্ধিত এই জনসংখ্যাকে শিক্ষার আওতায় আনতেই স্কুলের আরও শিক্ষক, জায়গা ও শিক্ষা উপকরণ দরকার। যারা আগে থেকেই শিক্ষার বাইরে, তাদের জন্যও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, স্কুল ও শিক্ষা পরিষেবাগুলো অতিরিক্ত চাপে রয়েছে; শিক্ষার্থী ভর্তির বৃদ্ধি আর জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
২০২২ সালের পর সরকারি প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থী ৫ লাখ ৬০ হাজার বেড়েছে, যা শিক্ষার চাহিদা এখনো জোরালো থাকার প্রমাণ। অভিভাবকেরা সন্তানদের জন্য স্কুলে জায়গা খুঁজছেন, এমন এলাকাতেও যেখানে স্কুলে পৌঁছানো কঠিন। তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো, এই চাহিদাকে শিক্ষক ও উপযুক্ত উপকরণসহ নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে যাওয়ার সুযোগে রূপ দেওয়া।
প্রতিবেদনটিতে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি পাঠদানের মান উন্নত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। শিশুর জন্য এ দুটি লক্ষ্য একে অপরের সঙ্গে যুক্ত: স্কুলে জায়গা পাওয়া হলো শুরু, আর কার্যকর পাঠ শিশুকে পড়া ও গণিতের সেই দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে, যা দিয়ে সে এগিয়ে যেতে পারে।
মেয়েদের জীবনে ছেদ পড়ার বর্ণনা
ইউনিসেফের শিক্ষার বাইরে থাকা মেয়েদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, বিধিনিষেধ তাদের দৈনন্দিন জীবন কীভাবে বদলে দিয়েছে। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার সময় শাফিকা ষষ্ঠ শ্রেণি শেষ করেছিল। শ্রেণিকক্ষে থাকতে পরের বছর সে একই শ্রেণিতে আবার পড়ে। পরে সে ছবি আঁকার ক্লাস ও কম্পিউটার কোর্সে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু আরও বিধিনিষেধে সেসব সুযোগও বন্ধ হয়ে যায়।
চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখা শাফিকা শেখার গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছে:
শিক্ষা মানুষকে আরও ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ দেয়।
১৪ বছর বয়সী রাবিয়া ২০২৪ সালে ষষ্ঠ শ্রেণি শেষ করে ধাত্রী হতে চেয়েছিল। ঘরে আটকে থাকার পর সে হতাশা ও কষ্টের কথা জানায়। নিজের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ সম্পর্কে রাবিয়া বলেছে:
আমি সত্যিই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। আমি নারীদের সহায়তা করতে ও জীবন বাঁচাতে চাই।
মাহিরার বয়স এখন ১৮। মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক স্কুল বন্ধ হওয়ার সময় সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। সে তার স্কুলের খাতাগুলো রেখে দিয়েছে এবং ঘরের কাজ শেষ করে সেগুলো পড়ে। তার মা হালিমা তাদের দুজনের ভাগ করে নেওয়া দুঃখের কথা এবং মেয়েকে আশাবাদী রাখার চেষ্টার কথা জানিয়েছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে ইউনিসেফ চারজনের নামই পরিবর্তন করেছে।
মেয়েদের অভিজ্ঞতা দেখায়, শিক্ষার বাইরে রাখার প্রভাব শুধু পাঠে সীমাবদ্ধ নয়। স্কুলে বন্ধু ও শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ, দৈনন্দিন রুটিন এবং কাজের পথে এগোনোর সুযোগও থাকে। শিক্ষা বন্ধ হয়ে যাওয়া মেয়েদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক কষ্ট দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ।
কমিউনিটি ক্লাসে সীমিত সুযোগ
যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর নাগাদ প্রায় ৫,৩০০টি কমিউনিটি ক্লাস চালু ছিল, যেখানে প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার শিক্ষার্থী পড়ত। অংশগ্রহণকারীদের ৬৪ শতাংশ ছিল মেয়ে, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার শিক্ষার্থী।
প্রতিষ্ঠিত স্কুলে যেতে অসুবিধা হয় এমন শিশুদের কাছাকাছি নিয়ে আসে কমিউনিটি শিক্ষার ক্লাস। কিশোরী মেয়েদের জন্য অবশিষ্ট কয়েকটি বিকল্পের মধ্যে রয়েছে সাক্ষরতা ও দক্ষতা কর্মসূচি, দূরশিক্ষণ, ডিজিটাল পাঠ এবং ব্যক্তিগত শিক্ষকতার ব্যবস্থা।
ইউনেস্কো ও ইউনিসেফ বলছে, এসব পথ মোটেও যথেষ্ট নয়। মেয়েরা যাতে মাধ্যমিক স্কুল পেরিয়ে উচ্চশিক্ষায় যেতে পারে, সে জন্য সংস্থাগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে সরাসরি উপস্থিত থেকে পড়াশোনার সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
শাফিকার অভিজ্ঞতা দেখায়, বিধিনিষেধ এক কাজ থেকে আরেক কাজে ছড়ালে বিকল্প সুযোগগুলো কতটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। স্কুল ছেড়ে ছবি আঁকা এবং পরে কম্পিউটার শেখার সুযোগও বন্ধ হওয়ায় সে বেশির ভাগ সময় ঘরে কাটাতে শুরু করে, সেলাই করে এবং মাকে সাহায্য করে। কিছু শেখার সুযোগ বজায় রাখা জরুরি, তবে মেয়েদের একের পর এক শ্রেণিতে এগিয়ে যাওয়ার নির্ভরযোগ্য পথও দরকার।
শ্রেণিকক্ষে থাকা শিশুরাও শিখতে হিমশিম খাচ্ছে
জাতীয় মূল্যায়নে ৩৪টি প্রদেশের ৫৫ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়। চতুর্থ শ্রেণির অর্ধেকের কম শিক্ষার্থী তৃতীয় শ্রেণির জন্য নির্ধারিত ভাষার দক্ষতার ন্যূনতম মান অর্জন করেছে। গণিতে সেই মানে পৌঁছেছে মাত্র এক-চতুর্থাংশ।
ন্যূনতম দক্ষতা বলতে শিক্ষার নির্দিষ্ট পর্যায়ের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতার প্রাথমিক স্তর অর্জন বোঝায়। এখানে শিক্ষার্থীদের তাদের নিজেদের শ্রেণির আগের শ্রেণির মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলাফল বলছে, অনেক শিশুর বর্তমান পাঠের পাশাপাশি আগের শ্রেণির শেখা বিষয়েও সহায়তা দরকার।
ইউনেস্কো ও ইউনিসেফ বলছে, শিক্ষক খাতে ধারাবাহিক বিনিয়োগ, কার্যকর শ্রেণিকক্ষের পাঠদান এবং পর্যাপ্ত পাঠদান ও শেখার উপকরণ এখন জরুরি। শিক্ষার্থীদের জন্য এর অর্থ হলো, এমন পাঠ যা তারা বুঝতে পারে, অনুশীলনের সুযোগ এবং পিছিয়ে পড়ার জায়গা শনাক্ত করতে সক্ষম শিক্ষক।
শৈশবের প্রারম্ভিক শিক্ষার সুযোগও অত্যন্ত সীমিত। তিন থেকে চার বছর বয়সী ১০০ শিশুর মধ্যে একজনেরও কম প্রারম্ভিক শিক্ষা কর্মসূচিতে অংশ নেয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে এ ধরনের কর্মসূচি শিশুদের ভাষা, সামাজিক ও প্রাথমিক সংখ্যাগত দক্ষতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। অংশগ্রহণ ১ শতাংশেরও কম হওয়ায় এ বয়সী প্রায় সব শিশুই এই পরিকল্পিত প্রস্তুতি থেকে বঞ্চিত।
ফিরতি মানুষ ও বন্যায় বাড়তি চাপ
যৌথ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ ওই বছর প্রায় ১২ লাখ ৩০ হাজার আফগান দেশে ফিরেছিলেন। দেশে ফেরা ২ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি শিশুর শিক্ষা সহায়তা দরকার ছিল, ফলে এমন সব কমিউনিটিতে চাহিদা বেড়েছে যেগুলোর স্কুল আগে থেকেই ঘাটতির মুখে ছিল।
বিপুলসংখ্যক পরিবার ফিরছে এমন এলাকাগুলোকে সেখানকার আগে থেকেই বসবাসকারী শিশুদের পাশাপাশি আরও শিক্ষার্থীর ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। শিক্ষার চাহিদা ও তা মেটানোর ব্যবস্থার সক্ষমতার মধ্যকার ব্যবধান বাড়িয়ে দেওয়া কারণগুলোর একটি হিসেবে প্রতিবেদনে এই প্রত্যাবর্তনের কথা বলা হয়েছে।
বন্যায় শিশুদের শেখার জায়গাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইউনিসেফের আগস্টের মানবিক পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যায় বাড়িঘর, অবকাঠামো, কৃষিজমি, পানিব্যবস্থা ও স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলের মোট সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি।
তাই ক্ষতিগ্রস্ত কমিউনিটিগুলোতে স্কুল মেরামতের সঙ্গে অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনেরও প্রতিযোগিতা চলে। বাড়িঘর, পানির সরবরাহ বা কৃষিজমির ক্ষতির মুখে পড়া পরিবারগুলোর একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দরকার হতে পারে; অন্যদিকে শিক্ষা পরিষেবাগুলো শিশুদের শেখা চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে কাজ করছে।
আফগানিস্তানের শিক্ষা-সংক্রান্ত বাধার ইতিহাস আরও পুরোনো। আফগানিস্তানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফের প্রণীত ২০১৮ সালের দেশভিত্তিক সমীক্ষায় যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, অভিবাসন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দারিদ্র্য এবং শিক্ষার সুযোগের অভাবকে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ইউনিসেফ ও ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকসের চালু করা একটি উদ্যোগের অংশ হিসেবে সমীক্ষাটির লক্ষ্য ছিল প্রতিক্রিয়ার ঘাটতি শনাক্ত করা ও নীতিগত সুপারিশ করা। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনেও এসব চাপ অব্যাহত থাকার পাশাপাশি মেয়ে ও নারীদের ওপর বিধিনিষেধের কথা উঠে এসেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংকুচিত, ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যকর্মীদের সুযোগ কমছে
২০২৬ সালে আফগানিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল, ২০২৪ সালে যা ছিল ১ লাখ ৮৯ হাজার। প্রায় ১৯ হাজারের এই বৃদ্ধি দুই বছরে আনুমানিক ১০ শতাংশ পুনরুদ্ধার নির্দেশ করে। তবে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া এখনো নিষিদ্ধ।
তবু শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা ২০২০ সালের প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজারের তুলনায় অনেক কম। ২০২৬ সালের মোট সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার কম, অর্থাৎ প্রায় ৫২ শতাংশ পতন। ফলে ২০২১ সালের আগের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন অর্ধেকেরও কম শিক্ষার্থী পড়ে।
শিক্ষার সুযোগ হারানোর প্রভাব আফগান কমিউনিটিগুলোর প্রয়োজনীয় পরিষেবার ওপরও পড়ে। রাবিয়া ধাত্রী হতে চেয়েছিল; শাফিকা ও মাহিরা চেয়েছিল চিকিৎসক হতে। তাদের আকাঙ্ক্ষা শ্রেণিকক্ষের ওপর বিধিনিষেধকে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর ভবিষ্যৎ জোগানের সঙ্গে যুক্ত করে।
ইউনিসেফ বলছে, নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের চিকিৎসাসেবা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর তরুণীদের এই পেশায় প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। সংস্থাটি জানায়, পুরুষ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না এমন কিছু গর্ভবতী নারী ও মাকে গর্ভকালীন বা মাতৃস্বাস্থ্যসেবা ছাড়াই থাকতে হয়। গর্ভকালীন সেবার মধ্যে রয়েছে গর্ভাবস্থায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সহায়তা, যার মাধ্যমে জটিলতা শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে শিশুমৃত্যুর হার আগে থেকেই বেশি এবং প্রতিবছর হাজারো মায়ের মৃত্যু হয়। ভবিষ্যৎ নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের শিক্ষার পথ বন্ধ করা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করে, যেখানে নারীদের সেবা পেতেই ইতিমধ্যে নানা অসুবিধার মুখোমুখি হতে হয়।
জাতীয় সংকট, বৈশ্বিক প্রভাব
ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের শিক্ষা উপাত্তবিষয়ক পর্যালোচনায় বিশ্বজুড়ে স্কুলের বাইরে থাকা মানুষের সংখ্যা ২৫ কোটি বলা হয়েছিল, যা ২০২১ সালের পর ৬০ লাখ বেড়েছে। অন্যত্র শিক্ষার অগ্রগতি থমকে যাওয়ার পাশাপাশি আফগানিস্তানে মেয়ে ও তরুণীদের বঞ্চিত হওয়াকে এই বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
পর্যালোচনাটিতে ইউনিসেফের ২০২৩ সালের এপ্রিলের এক সমীক্ষার কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে অনুমান করা হয়েছিল যে আফগানিস্তানে ৭৮ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে। সে সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়-বয়সী শিশুদের প্রায় অর্ধেক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়-বয়সীদের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ ভর্তি ছিল।
আগের এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায়, ২০২৬ সালের ফলাফল ব্যাপক বঞ্চনার দীর্ঘ সময়েরই অংশ। ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের পরিসংখ্যানে স্কুলের বাইরে থাকা বৈশ্বিক জনসংখ্যার ১২ কোটি ২০ লাখ, অর্থাৎ ৪৮ শতাংশ ছিল মেয়ে ও তরুণী। আফগানিস্তানের বিধিনিষেধ নারীদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছে, শুধু নারী হওয়ার কারণে।
ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের বৈশ্বিক শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনেও ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে স্কুল শেষ করার হারে উন্নতির কথা বলা হয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার হার ৮৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৮৭ শতাংশ হয়, আর উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার হার ৫৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৯ শতাংশে দাঁড়ায়। মেয়েদের শিক্ষার বাইরে রাখা আফগানিস্তানের এই পরিস্থিতি স্কুলশিক্ষার যে ধারাবাহিকতা বাড়ানোর লক্ষ্য বৈশ্বিক উদ্যোগগুলোর রয়েছে, তাতে ছেদ ঘটায়।
সংকটের বিকাশ ও সংস্থাগুলোর উদ্যোগ
জনসংখ্যা বৃদ্ধি থেকে সাম্প্রতিক প্রত্যাবর্তন এবং কমিউনিটি ক্লাসের বিস্তার পর্যন্ত কয়েক বছরের পরিবর্তন একত্র করেছে প্রতিবেদনটি। গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো হলো:
- ২০১৯: আফগানিস্তানে স্কুল-বয়সী শিশু ও কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ।
- ২০২০: বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার।
- ২০২১: তালেবান ক্ষমতায় ফেরে এবং মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
- ২০২৪: স্কুল-বয়সী শিশুর সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ হয়; বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার।
- ২০২৫: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৬৬ লাখ শিশু ভর্তি হয়।
- সেপ্টেম্বর ২০২৬: ওই বছর দেশে ফেরা মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১২ লাখ ৩০ হাজার।
- অক্টোবর ২০২৬: প্রায় ৫,৩০০টি কমিউনিটি ক্লাসে প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার শিক্ষার্থী পড়ত।
- ৪ নভেম্বর ২০২৬: ইউনেস্কো ও ইউনিসেফ যৌথ শিক্ষা পরিস্থিতি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
মেয়েদের ও নারীদের শিক্ষার অধিকার পুরোপুরি ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার সুযোগের বাধা দূর করা এবং শেখার মান উন্নত করার আহ্বান জানিয়েছে ইউনেস্কো ও ইউনিসেফ। তাদের অগ্রাধিকারগুলোর লক্ষ্য শ্রেণিকক্ষে যেতে না-পারা শিশু এবং আরও সহায়তা প্রয়োজন এমন স্কুলে পড়া শিশু, উভয়ই।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, তারা প্রাথমিক ও কমিউনিটি শিক্ষা, স্কুল নির্মাণ ও সংস্কার, নারী শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং শেখার উপকরণে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। মেয়েরা যাতে আবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় যেতে পারে, সে জন্য সংস্থাগুলো চাপ দেওয়ার পাশাপাশি এসব কার্যক্রম ব্যবহারিক প্রয়োজন মেটায়।
মূল কাজটি স্পষ্ট: আরও বেশি শিশুকে শেখার জায়গা দিতে হবে, শিক্ষকরা যাতে তাদের মৌলিক দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে এবং মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে দিতে হবে। এ পরিবর্তন না হলে আফগানিস্তান একটি প্রজন্মকে পিছিয়ে ফেলার এবং পুনরুদ্ধারের ভিত্তি দুর্বল করার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাগুলো।
মূল তথ্য
- ইউনেস্কো ও ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়-বয়সী ৫৩ শতাংশ শিশু আনুষ্ঠানিক সাধারণ শিক্ষার বাইরে।
- ২০২১ সাল থেকে ২৬ লাখের বেশি মেয়েকে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
- মূল্যায়নে অংশ নেওয়া চতুর্থ শ্রেণির মাত্র চারজনের একজন শিক্ষার্থী তৃতীয় শ্রেণির গণিতের ন্যূনতম মান পূরণ করেছে।
- ২০২৬ সালের অক্টোবর নাগাদ কমিউনিটি ক্লাসে প্রায় ১ লাখ ৬২ হাজার শিক্ষার্থী পড়ত; তাদের ৬৪ শতাংশ ছিল মেয়ে।
- ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ দেশে ফেরা ২ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি শিশুর শিক্ষা সহায়তা দরকার ছিল।
- বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় ৫২ শতাংশ কম ছিল; নারীরা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারেন না।
- জাতিসংঘের সংস্থাগুলো শিক্ষার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া, সুযোগ বাড়ানো এবং পাঠদান ও শেখায় ধারাবাহিক বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে।






