২৬ লাখ মেয়ে শিক্ষার বাইরে, এর ক্ষতি শ্রেণিকক্ষ ছাড়িয়ে
২০২১ সাল থেকে আফগানিস্তানে ২৬ লাখের বেশি মেয়েকে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট ইউনিসেফ এ কথা জানিয়ে সতর্ক করেছে, বিধিনিষেধ অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে ২০ হাজার পর্যন্ত নারী শিক্ষক এবং ৫ হাজার ৪০০ নারী স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি হতে পারে। তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পরও আফগানিস্তানই একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের ও নারীদের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা কার্যত বন্ধ, বলছে সংস্থাটি।
সূচিপত্র
- ২৬ লাখ মেয়ে শিক্ষার বাইরে, এর ক্ষতি শ্রেণিকক্ষ ছাড়িয়ে
- যেভাবে বিধিনিষেধ দীর্ঘস্থায়ী বাধায় পরিণত হলো
- দুই সংস্থার হিসাবে সংখ্যার পার্থক্য কেন
- আজ শিক্ষক কম, আগামীকাল বিকল্প শিক্ষকও কম
- মেয়েরা স্কুলে ফিরলে স্বাস্থ্যসেবা কেন উপকৃত হবে
- অর্থনৈতিক ক্ষতির শুরু বছরে ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে
- দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল সংকট আরও বাড়াচ্ছে
- শিক্ষায় সহায়তা চলছে, তবে সুযোগ এখনো অনিশ্চিত
- অবিলম্বে স্কুল খোলার আহ্বান ইউনিসেফের
- মূল বিষয়গুলো
স্কুল ও জনসেবায় এর ক্ষতি ইতিমধ্যে দৃশ্যমান। প্রাথমিক স্তরে নারী শিক্ষকের সংখ্যা ২০২২ সালে প্রায় ৭৩ হাজার থেকে ২০২৪ সালে কমে প্রায় ৬৬ হাজারে নেমেছে। ইউনিসেফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বিধিনিষেধের কারণে অর্থনীতির বছরে অন্তত ৮ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতি হচ্ছে।
২০২১ সালে ষষ্ঠ শ্রেণি শেষ করা কোনো মেয়ের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া পাঁচ বছর কাটানো মানে বিশ্ববিদ্যালয়, পেশাগত প্রশিক্ষণ বা কাজের জন্য সাধারণত যে সময়ে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, তার বড় অংশ হারানো। আফগানিস্তানজুড়ে এই একই বিঘ্নের কারণে নতুন প্রজন্মের শিক্ষক, নার্স, চিকিৎসক ও ধাত্রী হওয়ার পথ বন্ধ হচ্ছে।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল সংস্থাটির ১৪ আগস্টের বিবৃতিতে ব্যক্তিগত পর্যায়ের এই ক্ষতির কথা তুলে ধরেছেন:
একটি দেশের ইতিহাসে পাঁচ বছর হয়তো অল্প সময়, কিন্তু একটি মেয়ের জীবনে এটি নির্ধারক সময়কাল।
স্কুল থেকে বাদ পড়ার সঙ্গে শিশুশ্রম, বাল্যবিবাহ, নির্যাতন ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ার যোগসূত্র দেখিয়েছে ইউনিসেফ। দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুতি এসব ঝুঁকি আরও বাড়ায়। এর প্রভাব পড়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শিশু, চিকিৎসা নিতে চাওয়া নারী এবং যেসব পরিবারের ভবিষ্যৎ আয় শিক্ষার সুযোগের ওপর নির্ভরশীল, তাদের ওপরও।
যেভাবে বিধিনিষেধ দীর্ঘস্থায়ী বাধায় পরিণত হলো
যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের সময় ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট তালেবান ক্ষমতা দখল করে। কর্তৃপক্ষ শুরুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বাস দিয়েছিল, নারীরা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবেন। ইউনিসেফের হিসাবে, ষষ্ঠ শ্রেণির পর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে মেয়েদের বাদ দেওয়া শুরু হয় ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে।
২০২২ সালের মার্চে মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধই রাখা হয়, যা বিধিনিষেধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ওই বছরের ডিসেম্বরে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিষিদ্ধ করা হয়। কর্তৃপক্ষ এসব পদক্ষেপকে সাময়িক বলে বর্ণনা করেছিল। কিন্তু সেগুলো অব্যাহত থাকায় মেয়েদের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন পর্যন্ত যাওয়ার আনুষ্ঠানিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
- ১৫ আগস্ট, ২০২১: তালেবান ক্ষমতায় ফেরে।
- সেপ্টেম্বর ২০২১: এই মাস থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের শিক্ষা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে ইউনিসেফের হিসাব।
- মার্চ ২০২২: মেয়েদের জন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধই রাখা হয়।
- ডিসেম্বর ২০২২: নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিষিদ্ধ করা হয়।
- এপ্রিল ২০২৬: শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জরুরি সেবায় ক্ষতি নিয়ে ইউনিসেফের বিশ্লেষণ প্রকাশ।
- আগস্ট ২০২৬: বিধিনিষেধের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইউনিসেফ ও ইউনেস্কোর সতর্কবার্তা।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ইসলামী আইন ও আফগান সংস্কৃতির নিজস্ব ব্যাখ্যা অনুযায়ী তারা নারীর অধিকারকে সম্মান করে এবং শিক্ষানীতি অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাদের বিধিনিষেধ নারীদের কাজ, চলাচল ও জনপরিসরে প্রবেশাধিকারেও প্রভাব ফেলেছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অবিলম্বে প্রবেশাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ ও ইউনেস্কো; পুনরায় খোলার কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
দুই সংস্থার হিসাবে সংখ্যার পার্থক্য কেন
ইউনিসেফের আগস্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২১ সাল থেকে ২৬ লাখের বেশি মেয়েকে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ইউনেস্কোর আগস্টের হিসাবে এই সংখ্যা ২৪ লাখ, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ২ লাখ বেশি। দুই সংস্থাই বলছে, দেশজুড়ে মেয়েরা শিক্ষা থেকে বাদ পড়েছে, তবে তাদের হিসাবের মোট সংখ্যা আলাদা।
ইউনিসেফের এপ্রিলের নীতিসংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন ‘নিষ্ক্রিয়তার মূল্য’-তে আরও কিছু পরিসংখ্যান দেওয়া হয়েছে: ২০২৪ সালে ৭ থেকে ১৮ বছর বয়সী আনুমানিক ৩৮ লাখ মেয়ে স্কুলের বাইরে ছিল, যাদের মধ্যে কিশোরী মেয়ের সংখ্যা ২৬ লাখের বেশি। পাঁচ বছরে মাধ্যমিক শিক্ষায় বিধিনিষেধের সরাসরি শিকার হয়েছে—এমন অন্তত ১০ লাখ মেয়ের হিসাব আলাদাভাবে দেওয়া হয়েছে।
তাই এপ্রিলের প্রতিবেদনে একদিকে স্কুলের বাইরে থাকা বৃহত্তর জনগোষ্ঠী, অন্যদিকে ডিক্রির সরাসরি শিকার হওয়া মেয়ে—দুই ধরনের হিসাবই রয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিতীয় গোষ্ঠীর সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইউনেস্কোর পূর্বাভাস, ওই বছরের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ মেয়েকে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হতে পারে। দুই সংস্থার পূর্বাভাসে হিসাবের কাঠামো আলাদা; তাদের বিবৃতিতে এই পার্থক্য ব্যাখ্যা করে এমন কোনো অভিন্ন হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
শিক্ষা জরুরি পরিস্থিতি কর্মসূচির ইউনেস্কো সমন্বয়ক হোদা জাবেরিয়ান এই বিঘ্নের ব্যাপ্তি তুলে ধরেছেন:
পাঁচ বছর কোনো শিশুর শিক্ষাজীবনে সাময়িক বিরতি নয়। এটি যে প্রায় পুরো একটি মাধ্যমিক শিক্ষাচক্র, তা স্পষ্ট।
আজ শিক্ষক কম, আগামীকাল বিকল্প শিক্ষকও কম
২০২২ সালে আফগানিস্তানে প্রাথমিক স্তরে নারী শিক্ষকের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৩ হাজার। ২০২৪ সালের মধ্যে তা কমে প্রায় ৬৬ হাজারে দাঁড়ায়: প্রায় ৭ হাজার শিক্ষক, অর্থাৎ ৯ শতাংশেরও বেশি কমেছে। নারী শিক্ষক থাকলে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই এখনো যারা পড়ার অনুমতি পাচ্ছে, তাদের জন্যও এই হ্রাস সমস্যা তৈরি করছে।
ইউনিসেফের সতর্কতা, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিতে ২০ হাজার পর্যন্ত নারী শিক্ষক হারিয়ে যেতে পারেন। ইউনেস্কোর পূর্বাভাস, একই বছরের মধ্যে যোগ্য নারী শিক্ষকের ঘাটতি ১১ হাজার ছাড়াবে। প্রথম সংখ্যাটি সম্ভাব্য ক্ষতি, দ্বিতীয়টি যোগ্য কর্মীর সম্ভাব্য ঘাটতি বোঝায়; দুটিই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক নিয়োগের ক্রমবর্ধমান অসুবিধার ইঙ্গিত দেয়।
জাবেরিয়ান বলেন, শিক্ষকেরা আফগানিস্তান ছেড়েছেন এবং যারা রয়ে গেছেন, তাদের কেউ কেউ কাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের মুখে পড়েছেন। ছেলেদের পড়ানোর ক্ষেত্রে নারী শিক্ষকদের ওপর বিধিনিষেধের কারণে কিছু শিক্ষার্থী অযোগ্য পুরুষ শিক্ষক বা কোনো শিক্ষকই পাচ্ছে না।
দুই দিক থেকেই স্কুলের ওপর চাপ বাড়ছে: অভিজ্ঞ নারী শিক্ষক কর্মক্ষেত্র ছাড়ছেন, আর মেয়েদের তাদের জায়গা নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা সম্পন্ন করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষ খুললে পড়াশোনার সুযোগ ফিরবে, কিন্তু যোগ্য শিক্ষক সরবরাহ পুনর্গড়তে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ শেষ করতে হবে।
মেয়েরা স্কুলে ফিরলে স্বাস্থ্যসেবা কেন উপকৃত হবে
ইউনিসেফের পূর্বাভাস, ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ হাজার ৪০০ নারী স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি হতে পারে। নারী শিক্ষক নিয়ে সংস্থাটির হিসাবের সঙ্গে যোগ করলে, পরিবার সারা জীবন যে দুটি সেবা নেয়, সেই দুই খাতে মোট ২৫ হাজার ৪০০ কর্মীর ঘাটতির আশঙ্কা দাঁড়ায়।
আফগানিস্তানে সামাজিক বাধার কারণে নারীদের পক্ষে পুরুষ চিকিৎসকের কাছ থেকে চিকিৎসা নেওয়া প্রায়ই কঠিন হয়। নারী চিকিৎসক, নার্স ও ধাত্রীর ঘাটতি তাই গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মদান এবং শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক সপ্তাহে সেবা পাওয়ার সুযোগ কমাতে পারে। মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ কমে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছে ইউনিসেফ।
এপ্রিলের বিশ্লেষণ নিয়ে কথা বলার সময় ঝুঁকিতে থাকা পেশাগুলোর কথা বলেছেন রাসেল:
ভবিষ্যতের শিক্ষক, নার্স, চিকিৎসক, ধাত্রী ও সমাজকর্মীদের হারানোর সামর্থ্য আফগানিস্তানের নেই; তারাই জরুরি সেবা সচল রাখেন। মেয়েদের শিক্ষা থেকে বাদ দেওয়া অব্যাহত থাকলে এটাই বাস্তবতা হবে।
শিশুদের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও মায়েদের শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ইউনিসেফের ভাষ্য, মায়েদের শিক্ষার অভাবের সঙ্গে কম ওজন নিয়ে জন্ম, টিকা বাদ পড়া এবং শিশুর খর্বাকৃতির ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার যোগসূত্র রয়েছে। দীর্ঘদিনের অপুষ্টি বা বারবার অসুস্থতার কারণে কোনো শিশু বয়স অনুযায়ী যতটা লম্বা হওয়ার কথা, তার চেয়ে খাটো থাকাকে খর্বাকৃতি বলা হয়। এসব স্বাস্থ্যসমস্যা এমন সেবাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ায়, যা ইতিমধ্যে পরিবারের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতির শুরু বছরে ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার থেকে
ইউনিসেফের হিসাবে, মেয়েদের শিক্ষা ও নারীদের বেতনভিত্তিক কাজে অংশগ্রহণে বিধিনিষেধের কারণে আফগানিস্তানের বছরে অন্তত ৫৩০ কোটি আফগানি (এএফএন), অর্থাৎ ৮ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতি হচ্ছে। দেশটির ২০২৩ সালের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৫ শতাংশের সমান এই ক্ষতি। কোনো অর্থনীতিতে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মূল্যকে জিডিপি বলে।
মেয়েদের যোগ্যতা অর্জনের পথ বন্ধ এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের দক্ষতার ব্যবহার সীমিত হওয়ায় এই ক্ষতি হচ্ছে। পরিবার সম্ভাব্য আয় হারাচ্ছে, আর স্কুল, ক্লিনিকসহ অন্যান্য সেবায় প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব হচ্ছে। ইউনিসেফ বলছে, তাদের এই হিসাব রক্ষণশীল; বিধিনিষেধ যত বছর চলবে, ক্ষতি তত বাড়বে।
সরকারি চাকরিতে নারীদের অংশ ২০২৩ সালের ২১ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ১৭.৭ শতাংশে নেমেছে। দুই বছরে ৩.৩ শতাংশ-পয়েন্টের এই পতন সরকারি চাকরিতে নারীদের ক্রমহ্রাসমান উপস্থিতি দেখায়; নারী শিক্ষকের সংখ্যাও একই সময়ে কমেছে।
ইউনেস্কো আরও দীর্ঘ সময়ের হিসাব দিয়েছে। তাদের অনুমান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা থেকে বাদ পড়ার কারণে ২০৬৬ সালের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ নারী কর্মক্ষেত্রের বাইরে চলে যেতে পারেন এবং মোট আয়ক্ষতি হতে পারে ৯৬০ কোটি মার্কিন ডলার। ইউনেস্কোর পূর্বাভাসে দীর্ঘ সময়ে জমা হওয়া আয়ের ক্ষতি হিসাব করা হয়েছে, আর ইউনিসেফের ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারের অঙ্কটি তাদের নিজস্ব বিশ্লেষণ অনুযায়ী এক বছরের ক্ষতি।
দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি ও ক্ষতিগ্রস্ত স্কুল সংকট আরও বাড়াচ্ছে
আফগানিস্তানের স্কুলগুলো আগে থেকেই কম সাক্ষরতার হার, অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত শিশুদের নিয়ে সমস্যায় ছিল। ইউনেস্কোর ভাষ্য, মেয়েদের ওপর বিধিনিষেধের বাইরেও ২০ লাখের বেশি প্রাথমিক স্কুলবয়সী শিশু স্কুলের বাইরে। ১০ বছর বয়সী ৯০ শতাংশের বেশি শিশু সহজ একটি লেখা পড়তে পারে না, আর জাতীয় সাক্ষরতার হার ৩৭ শতাংশ।
ইউনেস্কোর হিসাবে, প্রায় অর্ধেক স্কুলে পানি, পয়োনিষ্কাশন বা গরম রাখার ব্যবস্থা নেই। ২০২১ সাল থেকে ভূমিকম্প, বন্যা ও অন্যান্য দুর্যোগের কারণে প্রায় ১ হাজার স্কুল বন্ধ হয়েছে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ও ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর কারণে যারা এখনো স্কুলে যেতে পারে, তাদের পড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিপুলসংখ্যক প্রত্যাবর্তনকারী মানুষের আগমন এই চাপ আরও বাড়াচ্ছে। ইউনিসেফের আগস্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে ইরান ও পাকিস্তান থেকে ২৭ লাখের বেশি মানুষ ফিরে এসেছেন; তাদের ৬০ শতাংশ শিশু ও তরুণ। ইউনেস্কোর হিসাবে, ২০২৩ সাল থেকে স্বেচ্ছায় ফেরা বা জোর করে ফেরত পাঠানো মানুষের সংখ্যা ৭০ লাখের বেশি; এর মধ্যে ২০২৫ সালেই ৩০ লাখ। এই দুই হিসাবের সমন্বয় করতে পারে—এমন অভিন্ন সংজ্ঞা বা গণনার পদ্ধতি সংস্থাগুলো দেয়নি।
ইউনিসেফ সতর্ক করেছে, দারিদ্র্য ও বাস্তুচ্যুতি স্কুলের বাইরে থাকা মেয়েদের বিপদ বাড়ায়। খাবার, আশ্রয় ও আয়ের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাওয়া পরিবারের ওপর শিশুদের কাজে পাঠানো বা বাল্যবিবাহ দেওয়ার চাপ বাড়তে পারে। শিক্ষকদের সঙ্গে প্রতিদিনের যোগাযোগ হারানোও সহায়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস থেকে তাদের বঞ্চিত করে।
শিক্ষায় সহায়তা চলছে, তবে সুযোগ এখনো অনিশ্চিত
২০২৫ সালে সরকারি স্কুলে পড়া ৩৭ লাখের বেশি শিশুকে জরুরি শিক্ষা সহায়তা দিয়েছে ইউনিসেফ। আরও ৪ লাখ ৪২ হাজার শিশু কমিউনিটিভিত্তিক শিক্ষাক্রমে অংশ নিয়েছে, যাদের ৬৬ শতাংশ মেয়ে। সংস্থাটির দেওয়া হিসাব থেকে গণনা করলে মেয়ের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৯২ হাজার।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে ২৩২টি স্কুল নির্মাণ বা সংস্কার করেছে সংস্থাটি। ইউনেস্কো কমিউনিটি সেন্টার ও স্থানীয় শিক্ষকদের বাড়িতে পড়াশোনার পাশাপাশি সাক্ষরতা ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে সহায়তা দেয়। আনুষ্ঠানিক বিধিনিষেধ বহাল থাকলেও এসব উদ্যোগ কিছু শিশুর কাছে শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিচ্ছে।
প্রচলিত শ্রেণিকক্ষের বাইরে পড়াশোনা করতে চাওয়া মেয়েরাও নানা বাধার মুখে পড়ে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার সময় নির্দিষ্ট ব্রডব্যান্ড সংযোগে বিধিনিষেধ বালখ প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়ে, ফলে অনলাইন ক্লাস ব্যাহত হয়। অনেক এলাকায় মোবাইল ডেটা চালু থাকলেও খরচ ও অনির্ভরযোগ্য সংযোগের কারণে পরিবারগুলোর পক্ষে তা কাজে লাগানো কঠিন ছিল।
আফগানিস্তানজুড়ে বিবিসির সেবা ২০২৬ সালের অক্টোবরে এফএম সম্প্রচার বন্ধের কারণেও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান শোনার সুযোগে প্রভাব পড়ে। বিবিসির আফগান অনুষ্ঠানমালায় মাধ্যমিক স্কুলে পড়তে না পারা মেয়েদের জন্যও অনুষ্ঠান রয়েছে। অন্য রেডিও ব্যান্ড, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও স্যাটেলাইটে সম্প্রচার চলেছে, ফলে শ্রোতাদের ওই বিকল্পগুলোর ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
কমিউনিটি ক্লাস, অনলাইন পাঠ ও রেডিও অনুষ্ঠান কিছু মেয়ের পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করে। কিন্তু শিক্ষকতা ও চিকিৎসাবিদ্যার মতো পেশায় যেতে প্রয়োজনীয় ধারাবাহিক শিক্ষা ও যোগ্যতা দেয় আনুষ্ঠানিক মাধ্যমিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়। সে কারণেই এগুলো আবার চালু করাকে ইউনিসেফের আহ্বানের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
অবিলম্বে স্কুল খোলার আহ্বান ইউনিসেফের
রাসেল কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে শিক্ষার সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং মেয়েদের শিক্ষার অধিকার সমুন্নত রাখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সমর্থন চালিয়ে যেতে বলেছেন। ইউনিসেফ জানিয়েছে, নিরাপদে স্কুল খোলায় সহায়তা করতে তারা ও তাদের অংশীদারেরা প্রস্তুত।
আগস্টের বিবৃতিতে রাসেল সংস্থাটির দাবি তুলে ধরেছেন:
কার্যত কর্তৃপক্ষের প্রতি ইউনিসেফের আহ্বান, শিক্ষার ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিয়ে সব মেয়ে ও নারীকে অবিলম্বে স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরতে দিন।
এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায়, কোনো মেয়ের স্কুলে হারানো বছরগুলোর সঙ্গে তার সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ প্রয়োজনীয় সেবার যোগ রয়েছে। আফগানিস্তানে নারী শিক্ষক ইতিমধ্যে কমে যাচ্ছে। ২০৩০ সালের পূর্বাভাসে শ্রেণিকক্ষ ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আরও বড় ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে; স্কুলের বাইরে অতিরিক্ত প্রতিটি বছর তাদের বিকল্প কর্মী তৈরির প্রস্তুতি পিছিয়ে দিচ্ছে।
মূল বিষয়গুলো
- ইউনিসেফের হিসাবে, ২০২১ সাল থেকে ২৬ লাখের বেশি মেয়েকে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে; ইউনেস্কোর হিসাবে ২৪ লাখ।
- ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েরা আনুষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বাদ রয়েছে এবং ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া নিষিদ্ধ।
- প্রাথমিক স্তরে নারী শিক্ষকের সংখ্যা ২০২২ সালের প্রায় ৭৩ হাজার থেকে ২০২৪ সালে কমে প্রায় ৬৬ হাজার হয়েছে।
- ইউনিসেফের সতর্কতা, ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ হাজার পর্যন্ত নারী শিক্ষক ও ৫ হাজার ৪০০ নারী স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি হতে পারে।
- ইউনিসেফের হিসাবে, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে বিধিনিষেধের কারণে বছরে অন্তত ৮ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতি হচ্ছে।
- ২০২৫ সালে ৪ লাখ ৪২ হাজার শিশুকে কমিউনিটিভিত্তিক শিক্ষায় সহায়তা দিয়েছে ইউনিসেফ; তাদের ৬৬ শতাংশ মেয়ে।
- মেয়েদের ও নারীদের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় অবিলম্বে প্রবেশাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউনিসেফ ও ইউনেস্কো।






