সামান্য উত্থানের পর শুরু হয় ব্যাপক বিক্রি
৫ নভেম্বর রাতের লেনদেনে তাইওয়ানের শেয়ারবাজার সূচকের ফিউচার ৪০,০০০-এর নিচে নেমে যায়। একপর্যায়ে ২,০০০ পয়েন্টেরও বেশি হারায় এটি। যুক্তরাষ্ট্রের চিপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির প্রভাব প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ায় এ পতন ঘটে। এর আগে ৪০০ পয়েন্টের বেশি বেড়ে ফিউচার সূচক ৪২,২৯৮-এ উঠেছিল।
সূচিপত্র
- সামান্য উত্থানের পর শুরু হয় ব্যাপক বিক্রি
- যেভাবে উল্টে গেল বাজারের গতিপথ
- এআই সম্প্রসারণে অঙ্গরাজ্য নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ
- চিপ নির্মাতা ও স্টোরেজ সরবরাহকারীদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি
- চাপের আরেকটি জায়গা সামনে আনল কোয়ালকম
- ঋণের খরচে ক্লাউড খাতের উদ্বেগ বাড়ছে
- এশিয়ায় ক্ষতি ছিল নির্দিষ্ট খাতে, সর্বত্র নয়
- তেল ও প্রতিরক্ষামূলক শেয়ারে ভিন্ন চিত্র
- পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ওয়াল স্ট্রিটে মতভেদ
- মূল বিষয়গুলো
২০২৬ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পর বিনিয়োগকারীদের নজর ঘুরে যায় ডেটা সেন্টার নির্মাণে সম্ভাব্য বিধিনিষেধের দিকে। এর পাশাপাশি এআই সম্প্রসারণের খরচ ও বিনিয়োগ থেকে সম্ভাব্য আয় নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল। ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পায়। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর নির্বাচনে তাদের জয় নির্মাণ অনুমতি ও বিদ্যুৎ নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ায়।
৫ নভেম্বর তাইপে সময় রাত ১১টা ৩৪ মিনিটে ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক ৭৯১ পয়েন্ট বা ৭.৭% কমে যায়। নাসডাক কম্পোজিট ৯৮২ পয়েন্ট বা ৩.৮% কমে যায়। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ হারায় ১৬৯ পয়েন্ট বা ২.২%, আর ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ কমে ৫৯৫ পয়েন্ট বা ১.১%।
তাইপে সময় ৬ নভেম্বর ভোরের দিকে বিক্রি আরও জোরালো হয়। দিনের লেনদেনে নাসডাকের পতন ৪.৯%-এ পৌঁছায়, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কমে ৩.২% এবং ডাও হারায় ১,১৩৬ পয়েন্ট বা প্রায় ২.১%। পরে সেমিকন্ডাক্টর সূচক সর্বোচ্চ ১২% পর্যন্ত পড়ে, ফলে চলতি বছরে এর মোট উত্থান নেমে আসে প্রায় ২৫%-এ।
গত মাসের রেকর্ড উচ্চতা থেকে নাসডাকও ১০%-এর বেশি নিচে নেমে যায়, যা বাজারের ভাষায় ‘কারেকশন’ বা সংশোধন। তাইওয়ানের বাজারে তাৎক্ষণিক চাপ আসে ফিউচার এবং তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির (টিএসএমসি) মার্কিন ডিপোজিটরি রসিদ—দুই দিক থেকেই। যুক্তরাষ্ট্রের লেনদেনে রসিদটির দাম প্রায় ১০% কমে যায়।
যেভাবে উল্টে গেল বাজারের গতিপথ
নির্বাচনের ফলের কিছু দিককে শুরুতে স্বাগত জানিয়েছিল বাজার। বিনিয়োগকারীরা ধারণা করেছিলেন, রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখোমুখি ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস বড় নীতিগত পরিবর্তন ঠেকাতে পারে এবং ইরান যুদ্ধের অবসানে চাপ বাড়াতে পারে। তবে এআই খাতে নির্মাণকাজ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের শেয়ারে উল্টো প্রভাব পড়ে।
- ৪ নভেম্বর, এশিয়ার লেনদেন: নির্বাচনের ফল তখনো বিশ্লেষণ করছিলেন বিনিয়োগকারীরা; কংগ্রেসের কোনো কক্ষেই আনুষ্ঠানিকভাবে জয়ী ঘোষণা করা হয়নি। এ সময় জাপানের নিক্কেই প্রায় ৩.১% কমে যায়।
- ৪ নভেম্বর, যুক্তরাষ্ট্রের লেনদেন: ডাও ৩.০৩%, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ১.৫৮% এবং নাসডাক ১.৪৪% বাড়ে। তবে ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক ৩.১% কমে যায়।
- ৫ নভেম্বর, এশিয়ার লেনদেন: তাইওয়ানের তাইএক্স ৩.২০% কমে ৪১,৫৭৪.৭২-এ দাঁড়ায়। দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি ৫.২৮% কমে ৫,৩৮৩.৮১-এ নামে।
- ৫ নভেম্বর, তাইওয়ানের রাতের লেনদেন: সূচক ফিউচার ৪২,২৯৮-এ উঠলেও পরে দিক বদলে ৪০,০০০-এর নিচে নামে; ততক্ষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শেয়ারে বড় পতন শুরু হয়েছে।
- ৬ নভেম্বরের প্রথম প্রহর, তাইপে সময়: নাসডাকের দিনের পতন বেড়ে ৪.৯%-এ পৌঁছায়। সবচেয়ে বেশি দর হারানো কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিল সেমিকন্ডাক্টর ও এআই অবকাঠামো খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো।
বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিট খোলার আগেই বাজারের গতিপথ বদলের আভাস মিলেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত ৩টা ৩ মিনিটে নাসডাক ১০০ ফিউচার ১% কমে, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ ফিউচার ০.২% নামে এবং ডাও ফিউচার ০.৩% বাড়ে। নিয়মিত লেনদেন শুরু হলে তিনটি প্রধান সূচকেই বিক্রি ছড়িয়ে পড়ে।
এআই সম্প্রসারণে অঙ্গরাজ্য নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ
টেক্সাসের গভর্নর নির্বাচিত জিনা হিনোজোসা ডেটা সেন্টার নির্মাণে কঠোর বিধিনিষেধের পক্ষে ছিলেন। নতুন প্রকল্পের বিরোধিতাকারী ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জর্জিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনেও জয়ী হন। ফলে ভবিষ্যতে এআই খাতে ব্যয়ের হিসাব-নিকাশে স্থানীয় পর্যায়ের নির্মাণ সিদ্ধান্তও যুক্ত হয়।
ডেটা সেন্টারে এআই ব্যবস্থা প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার থাকে। এগুলোর সম্প্রসারণে প্রসেসর, মেমোরি, স্টোরেজ, নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম ও বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। তাই কোনো স্থাপনা চালুর সময় পিছিয়ে গেলে কয়েকটি শিল্পের সম্ভাব্য ক্রয়াদেশও প্রভাবিত হতে পারে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান বাজার অর্থনীতিবিদ জোনাস গোল্টারমান বলেন, রাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে অঙ্গরাজ্য সরকারগুলোই তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গভর্নর ও আইনসভাগুলো তুলনামূলক দ্রুত নির্মাণে বিধিনিষেধ দিতে পারে। ম্যাকোয়ারি গ্রুপের বিশ্লেষকেরাও হিনোজোসার জয়কে টেক্সাসে কঠোর নিয়মের সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন; অঙ্গরাজ্যটিতে বড় প্রকল্পের পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজারের বিবরণে কোনো নির্দিষ্ট নতুন বিধিনিষেধ বা তা কার্যকরের তারিখ উল্লেখ করা হয়নি। জানুয়ারিতে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেবেন। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা আছে, যার মাধ্যমে তিনি কেন্দ্রীয় আইন আটকে দিতে পারেন। স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের প্রধান স্থির-আয় কৌশলবিদ মাসাহিকো লু বলেন, এ ক্ষমতা বড় ধরনের পরিবর্তন সীমিত রাখতে পারে; তবে এআই বিনিয়োগ, জ্বালানির চাহিদা ও ভোক্তা ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
চিপ নির্মাতা ও স্টোরেজ সরবরাহকারীদের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি
স্যানডিস্কের শেয়ারদর সর্বোচ্চ ২২% কমে যায়। এর আগের লেনদেনেও দর কমেছিল ৭%। এএমডি সর্বোচ্চ ১৭% এবং মাইক্রনের শেয়ার দিনের লেনদেনে প্রায় ১৬% কমে। ইন্টেল প্রায় ১০% হারায়। বিক্রির চাপে এনভিডিয়া ও ব্রডকমের দরও প্রায় ৯% করে কমে যায়।
প্রসেসর ঘিরে সরঞ্জাম সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও দুর্বলতা ছড়িয়ে পড়ে। লেনদেনের একপর্যায়ে সিগেট টেকনোলজি ও ওয়েস্টার্ন ডিজিটালের দর ১৫%-এর বেশি কমে যায়। অ্যাস্টেরা ল্যাবস প্রায় ১৭%, লুমেন্টাম প্রায় ১৪%, ম্যাকম টেকনোলজি ১৫%, সাইটাইম ১১%, উলফস্পিড ১৪% এবং ভিকো ইনস্ট্রুমেন্টস ৭% কমে। চিপ কোম্পানির শেয়ারের সমন্বয়ে গঠিত আইশেয়ার্স সেমিকন্ডাক্টর ইটিএফ প্রায় ১১% নামে।
সাম্প্রতিক ভালো ফলাফলও বড় ক্ষতি ঠেকাতে পারেনি। ডেটা সেন্টার সংযোগের চাহিদায় ত্রৈমাসিক আয় ৫০% বাড়ার কথা জানালেও অপটিক্যাল প্রযুক্তি সরবরাহকারী কোহেরেন্টের শেয়ার ১৩% কমে যায়। আর্ম হোল্ডিংসের ফলাফল ও পূর্বাভাস বাজারের গড় প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেলেও শেয়ারদর প্রায় ১৩% পড়ে। কারণ বিনিয়োগকারীরা আরও জোরালো প্রবৃদ্ধির আশা করেছিলেন।
কিছু কোম্পানির নিজস্ব সমস্যাও ছিল। শ্রমিকদের বিরোধের কারণে তাইওয়ানে একটি কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা স্থগিত করে মাইক্রন। মর্নিংস্টারের প্রধান মার্কিন কৌশলবিদ ডেভ সেকেরা বলেন, বৃহস্পতিবারের বিক্রি শুরুর আগেই প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল আয়ের পূর্বাভাস ইন্টেলকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। এতে ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের গতি কমার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
চাপের আরেকটি জায়গা সামনে আনল কোয়ালকম
স্মার্টফোন ব্যবসা থেকে আসা আয়ের কারণে সতর্ক হওয়ার আলাদা কারণ তৈরি হয় কোয়ালকমের ক্ষেত্রে। চতুর্থ প্রান্তিকে হ্যান্ডসেট চিপ বিভাগ থেকে কোম্পানিটির আয় ২৬% কমে ৫.১৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়; প্রত্যাশা ছিল ৫.২৫ বিলিয়ন ডলার। প্রত্যাশার চেয়ে ঘাটতি ১১০ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২.১%।
লেনদেন-পরবর্তী সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৮%-এর বেশি কমে এবং বৃহস্পতিবার লেনদেন শুরুর সময় প্রায় ১৩% নিচে ছিল। হতাশাজনক মুনাফার পূর্বাভাস চাপ আরও বাড়ায়, ডেটা সেন্টার ব্যবসার তুলনামূলক আশাব্যঞ্জক পূর্বাভাসও যা ঠেকাতে পারেনি।
এআই অবকাঠামোর চাহিদার কারণে মেমোরির দাম বেড়েছে। এতে ফোনের খরচ বেড়েছে এবং হ্যান্ডসেটের চাহিদা দুর্বল হয়েছে। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের তথ্যে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বিশ্বজুড়ে স্মার্টফোনের সরবরাহ এক-পঞ্চমাংশ কমেছে। কোয়ালকমের প্রধান নির্বাহী ক্রিস্তিয়ানো আমন বলেন, অ্যান্ড্রয়েড হ্যান্ডসেটের বিক্রি তলানিতে পৌঁছেছে এবং ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।
চিপ খাতের বিনিয়োগকারীদের জন্য এই সম্পর্কটি কঠিন ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এআই খাতে ব্যয় মেমোরি ও কম্পিউটিং সরঞ্জামের চাহিদা বাড়াতে পারে, একই সঙ্গে অন্য ইলেকট্রনিকস নির্মাতাদের জন্য যন্ত্রাংশের দামও বাড়াতে পারে। বাজার যখন এআই নির্মাণের গতি নতুন করে পর্যালোচনা করছে, তখন কোয়ালকমের ফলাফল এই চাপকে সামনে এনেছে।
ঋণের খরচে ক্লাউড খাতের উদ্বেগ বাড়ছে
কোরউইভের শেয়ার প্রায় ১৪%, নেবিয়াসের প্রায় ১৭% এবং আইরেনের প্রায় ১৯% কমে। এ কোম্পানিগুলোকে প্রায়ই ‘নিওক্লাউড’ সরবরাহকারী বলা হয়। এরা মূলত এআই-সংক্রান্ত কাজের জন্য কম্পিউটিং সক্ষমতা সরবরাহ করে।
কোরউইভ, নেবিয়াস ও আইরেন—প্রতিটি কোম্পানির শেয়ারই অক্টোবরে আগে অন্তত ৩০% করে কমেছিল। জেপি মরগানের জেমস সুলিভান নিওক্লাউড কোম্পানিগুলোর ঋণের সুদ-ব্যবধান বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। ঋণের সুদ-ব্যবধান হলো কোনো মানদণ্ড সুদের হারের ওপর ঋণদাতার ধার্য করা অতিরিক্ত সুদ; এই ব্যবধান বাড়লে নতুন স্থাপনায় অর্থায়ন আরও ব্যয়বহুল হয়।
বড় ক্লাউড পরিচালকদের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা রয়েছে, যা বিনিয়োগে সহায়তার জন্য নগদ আয় তৈরি করে। ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল কোম্পানিগুলোর হিসাবটা কঠিন: নির্মাণে অর্থ জোগাতে হবে, স্থাপনা চালু করতে হবে এবং অর্থায়নের খরচ মেটানোর মতো আয়ও করতে হবে। অনুমতি পেতে দেরি হলে সেই আয় আসার অপেক্ষা দীর্ঘ হতে পারে।
বৃহস্পতিবার বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারও কমে, তবে অবকাঠামো খাতের বিশেষায়িত কোম্পানির তুলনায় সাধারণত কম হারে। মেটা ৪%, অ্যামাজন ৩%, মাইক্রোসফট ২% এবং অ্যালফাবেট ১% কমে। একপর্যায়ে ওরাকলের শেয়ার প্রায় ৯% এবং টেসলার প্রায় ১০% দর হারায়।
ট্যান্ডেম ইনভেস্টমেন্ট অ্যাডভাইজরসের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপক জর্ডান ওয়াটসন আরও অস্থিরতার আশঙ্কা জানিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এআই অবকাঠামোয় প্রতিশ্রুত বিপুল অর্থ থেকে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত মুনাফা পাবেন কি না। তাঁর উদ্বেগে রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে আর্থিক সমস্যাটিও যুক্ত হয়: নির্মাণে ব্যয় করা অর্থের বিপরীতে শেষ পর্যন্ত অর্থ দিতে প্রস্তুত গ্রাহক এবং লাভজনক ব্যবহার থাকতে হবে।
এশিয়ায় ক্ষতি ছিল নির্দিষ্ট খাতে, সর্বত্র নয়
সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার বেশি নির্ভরশীলতা দেশটিকে বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলে। এসকে হাইনিক্সের শেয়ার ৮.৫% এবং স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের ৬.৫% কমে। পতনের মধ্যে কোস্পিতে সাময়িকভাবে লেনদেন বন্ধ করা হয়। প্রযুক্তিনির্ভর কোসডাক সূচক কমে ৫.১১%।
তাইওয়ানের তাইএক্স ৩.২০% কমে ৪১,৫৭৪.৭২-এ দাঁড়ায়। সপ্তাহের হিসাবে প্রায় ৮% লোকসানের পথে ছিল সূচকটি। ফক্সকনের দর ৩%-এর বেশি কমে। এশিয়ার লেনদেনে টিএসএমসির স্থানীয় শেয়ার ০.৮৮% কমে; পরে এর মার্কিন ডিপোজিটরি রসিদে আরও বড় পতন হয়।
বৃহস্পতিবার জাপানের নিক্কেই ১.৭৯% কমে ৬১,০৭৭.৯০-এ শেষ হয়। অন্যদিকে বিস্তৃত টপিক্স ১.১৬% বেড়ে ৩,৯৪০.৩৯-এ দাঁড়ায়। দুই সূচকের মধ্যে ২.৯৫ শতাংশ-পয়েন্ট ব্যবধান তাদের কোম্পানি-সমন্বয়ের ভিন্নতা তুলে ধরে। ভালো আয়ের ফল ও উন্নত পূর্বাভাসের পর টয়োটার ১৬.৭% উত্থান টপিক্সকে সহায়তা করে।
বুধবারের লেনদেনেই জাপানের এআই সরবরাহকারীদের শেয়ারে বড় বিক্রি হয়েছিল। অ্যাডভানটেস্ট ৬.৪%, টোকিও ইলেকট্রন ৫%, সফটব্যাংক গ্রুপ প্রায় ৭% এবং কিওক্সিয়া ১০% কমে। ফাইবার কেব্ল সরবরাহকারী ফুজিকুরা ও ফুরুকাওয়া ইলেকট্রিক যথাক্রমে ৮.২% ও ৯% হারায়। নিক্কেইয়ের ২২৫টি কোম্পানির মধ্যে ১৩০টির দর কমে এবং ৯৫টির বাড়ে।
বৃহস্পতিবার অন্য কয়েকটি বাজারে উত্থান হয়। হংকংয়ের হ্যাং সেং ৩.৬৭%, অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স ২০০ ২.৬১% এবং চীনের সিএসআই ৩০০ ০.২৯% বাড়ে। মুর থ্রেডস, বিরেন টেকনোলজি ও এসএমআইসিসহ চীনা চিপ কোম্পানিগুলোর শেয়ারও বাড়ে। ইউরোপে দুপুরের দিকে স্টক্স ৬০০ প্রায় ০.৪৭% বাড়ে, যদিও এএসএমএল, সোইটেক ও ইনফিনিয়নের দর কমে।
তেল ও প্রতিরক্ষামূলক শেয়ারে ভিন্ন চিত্র
বৃহস্পতিবার প্রযুক্তি শেয়ারে বিক্রির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভোগ্যপণ্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কোম্পানিগুলোর শেয়ার ১%-এর বেশি বাড়ে। জ্বালানি ও ইউটিলিটিজ খাতও এগোয়। শেভরন ও জনসন অ্যান্ড জনসনের উত্থান ডাওয়ের পতন কিছুটা ঠেকায়, যদিও সামগ্রিক বিক্রির ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট ছিল না।
তেলের দামে বড় ওঠানামা দেখা যায়। বুধবার ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮.৯৮ ডলার বা ৮.৭% কমে ৯৪.৬২ ডলারে দাঁড়ায়। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ৭.৯৭ ডলার বা ৮.৩% কমে ৮৮.১২ ডলারে নামে। এশিয়ার লেনদেনে দাম আরও কমার পর বৃহস্পতিবার পরে ঘুরে দাঁড়ায়। ডব্লিউটিআই ২%-এর বেশি বেড়ে ৯০ ডলারের ওপরে ওঠে এবং ব্রেন্ট ২%-এর বেশি বেড়ে প্রায় ৯৭ ডলারে দাঁড়ায়।
বিনিয়োগকারীরা ধারণা করেছিলেন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ইরান যুদ্ধের অবসানে আলোচনার জন্য ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়তে পারে। জ্বালানির দাম কমায় এশিয়ায় বিমান সংস্থাগুলোর শেয়ারে লাভ হয়: সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস ৩.২%, ক্যাথে প্যাসিফিক ২.২% এবং জাপান এয়ারলাইনস ৬.২% বাড়ে। তেলের আগের দরপতনের সময় জ্বালানি ও শিপিং কোম্পানিগুলোর শেয়ার দুর্বল হয়েছিল।
সরকারি বন্ডও ক্রেতাদের আকর্ষণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড কমে প্রায় ৪.৮৫%-এ দাঁড়ায়। জাপানের সমপর্যায়ের বন্ডের ইল্ড কমে ৫.৮ বেসিস পয়েন্ট, অর্থাৎ ২.৭৬%-এ নামে। এক বেসিস পয়েন্ট হলো এক শতাংশ-পয়েন্টের একশ ভাগের এক ভাগ।
সুদের হারে ভিন্ন চিত্র দেখা যায় যুক্তরাজ্যে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার এক-চতুর্থাংশ শতাংশ-পয়েন্ট বাড়িয়ে ৪% করে। আটজন নীতিনির্ধারক এ বৃদ্ধির পক্ষে ভোট দেন; ক্যাথরিন মান আরও বেশি বৃদ্ধির পক্ষে ছিলেন। জ্বালানি ব্যয়ের চাপের মধ্যে সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি ৩.৫%-এ পৌঁছায়, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ২% লক্ষ্যমাত্রার ওপরে।
পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ওয়াল স্ট্রিটে মতভেদ
অ্যান্ড্রু টাইলারের নেতৃত্বাধীন জেপি মরগানের যুক্তরাষ্ট্রের বাজার বিশ্লেষক দল নিকট ভবিষ্যতে বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান ধরে রাখে। দলটি প্রযুক্তি শেয়ারের সঙ্গে চক্রাকার কোম্পানির শেয়ার রাখার পক্ষে ছিল। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে এসব কোম্পানির আয় সাধারণত ওঠানামা করে। মিশ্রণটিতে চক্রাকার কোম্পানির অংশ বাড়ানোরও পক্ষে ছিল দলটি।
জেপি মরগানের যুক্তি, টেক্সাস নিয়ে উদ্বেগ অতিরঞ্জিত হতে পারে; কারণ নির্মাতারা অন্য অঙ্গরাজ্যে প্রকল্প করতে পারে এবং কঠোর নিয়ম হলেও নির্মাণের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হবে না। তবে বিক্রির চাপ কমা, বড় ক্লাউড পরিচালকদের ব্যয় পরিকল্পনা নিশ্চিত করা, সেমিকন্ডাক্টর ও মেমোরি কোম্পানির ভালো ফল এবং পুঁজিবাজারের কর্মকাণ্ড ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় ছিল দলটি।
বার্কলেসের বৈশ্বিক শেয়ার বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান অ্যালেক্স অল্টম্যান নির্বাচনের চেয়ে এআই খাতে অর্থায়ন ও ভবিষ্যৎ আয়ের প্রবৃদ্ধিকে বেশি গুরুত্ব দেন। সিটাডেল সিকিউরিটিজের কৌশলবিদ স্কট রুবনার বছর শেষের দিকে বাজারে উত্থানের সম্ভাবনা দেখেন। তাঁর যুক্তি, কোম্পানির আয় স্থিতিশীল এবং বিনিয়োগকারীরা আবার শেয়ারে বিনিয়োগ বাড়াতে পারেন। জেপি মরগানের ক্রেইগ কোহেনও ১৯৫০ সাল থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরের বছরে গড়ে প্রায় ১৫% বাজারবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন।
নীতি নিয়ে অনিশ্চিত সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক বাজার প্রতিক্রিয়া নিয়ে রোজেনব্লাট সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক কেভিন ক্যাসিডি বলেন:
বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তা পছন্দ করেন না।
ইয়র্কভিল আইভসের বিশ্লেষক ড্যানিয়েল আইভস বলেন, তিনি এখন বাছাই করে বিনিয়োগ করছেন এবং যেসব ব্যবসা এআইয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগ ও বিনিয়োগের সুফল দেখাতে পারে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এদিকে ওপেনএআই বৃহস্পতিবারের নীতিগত রূপরেখায় ডেটা সেন্টার নির্মাণের পক্ষে যুক্তি দেয়। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, এসব স্থাপনা বৃহত্তর শিল্পোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সুফলে সহায়তা করা উচিত।
তাইওয়ানের নির্মাতা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো হলো ক্লাউড খাতে ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি, চিপ কোম্পানির আয় এবং নির্মাণ অনুমতি-সংক্রান্ত বাস্তব সিদ্ধান্ত। বৃহস্পতিবারের লেনদেন দেখিয়েছে, এসব বিষয়ে প্রত্যাশা কত দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য নির্বাচন থেকে এশিয়ার কারখানা, শেয়ারবাজার ও ফিউচার চুক্তিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- আগে ৪২,২৯৮-এ ওঠার পর তাইওয়ানের রাতের ফিউচার ৪০,০০০-এর নিচে নেমে যায়।
- নাসডাকের দিনের পতন ৪.৯%-এ পৌঁছায়; সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে সূচকটি ১০%-এর বেশি নিচে নামে।
- ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক সর্বোচ্চ ১২% কমে; স্যানডিস্ক ও এএমডির ক্ষতি ছিল বিশেষভাবে বড়।
- ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী জয়ে ডেটা সেন্টারের অনুমতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে; অর্থায়নের খরচ ও কোম্পানির পূর্বাভাসও চাপ বাড়ায়।
- তাইওয়ানের তাইএক্স ৩.২০% এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি ৫.২৮% কমে; এশিয়ার আরও কয়েকটি বাজারে উত্থান হয়।
- পরবর্তী ইঙ্গিতের জন্য বিনিয়োগকারীরা ক্লাউড খাতের বিনিয়োগ পরিকল্পনা, সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির আয় ও নির্মাণ নীতি পর্যবেক্ষণ করছেন।






