বড় ধরনের বিক্রির চাপে তাইওয়ানের সূচক ৪৪,০০০ পয়েন্টের নিচে
তাইওয়ানের প্রধান সূচক তাইএক্স মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬-এ ১,৬১২.৬০ পয়েন্ট বা ৩.৫৯% কমে ৪৩,৩০৭.৫৪ পয়েন্টে দাঁড়ায়। এক দিনের পয়েন্ট পতনের হিসাবে এটি ছিল সূচকটির সপ্তম বৃহত্তম পতন। বিনিয়োগকারীরা প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বিক্রি করেন এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধান বাজার থেকে নিট ১০৭.৩১ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার তুলে নেয়।
সূচিপত্র
- বড় ধরনের বিক্রির চাপে তাইওয়ানের সূচক ৪৪,০০০ পয়েন্টের নিচে
- এআই খাতে ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ তাইওয়ালে পৌঁছাল কেন
- বড় কয়েকটি সরবরাহকারীর তুলনায় টিএসএমসির পতন কম
- টানা চার সেশনে বিদেশি বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে
- সক্রিয় ইটিএফ বিক্রির বড় লক্ষ্য হয়ে ওঠে
- ছোট ও উচ্চমূল্যের শেয়ারে দরপতন বেশি ছিল
- ঋণের অর্থে বিনিয়োগও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে
- অর্থ বাইরে যাওয়ার সঙ্গে তাইওয়ান ডলারের দর কমে
- বিক্রির চাপের মধ্যেও নিয়ন্ত্রকেরা আয় বৃদ্ধির কথা তুলে ধরেন
- মূল বিষয়
লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯২৮.০৬ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার (২৮.৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা সোমবারের ৭৯৯.৬৯ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলারের চেয়ে বেশি। ১২৮.৩৭ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার বা প্রায় ১৬.১% লেনদেন বৃদ্ধি চিপ নির্মাতা, ইলেকট্রনিকস সরবরাহকারী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং ছোট কোম্পানির শেয়ারে দরপতনের সঙ্গে ঘটে। সূচকটি ৪৩,১৯১.৫৮ থেকে ৪৪,৬১৪.৬৪ পয়েন্টের মধ্যে ওঠানামা করে এবং দিনের সর্বনিম্ন অবস্থানের চেয়ে মাত্র ১১৫.৯৬ পয়েন্ট ওপরে শেষ হয়।
শেয়ারের পাশাপাশি তাইওয়ান ডলারেরও দর কমে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৩২.৮৬০ তাইওয়ান ডলারে নেমে যাওয়ার পর মুদ্রাটি ৩২.৭৬০ তাইওয়ান ডলারে লেনদেন শেষ করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা টানা চতুর্থ লেনদেন সেশনে নিট বিক্রেতা ছিলেন, অন্যদিকে দেশীয় বিনিয়োগ ট্রাস্টগুলো কেনা অব্যাহত রাখে।
দরপতনের বড় অংশের চাপ ছিল প্রযুক্তি শেয়ারে। তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির শেয়ার ১.৫০%, মিডিয়াটেক ৭.৪৩% এবং এএসই টেকনোলজি হোল্ডিং ৮.৬১% কমে। ছোট কোম্পানির বাজারে পতন আরও গভীর ছিল; টিপিএক্স সূচক ৬.৪২% কমে ৩৪৫.৫২ পয়েন্টে নামে।
বিনিয়োগকারীরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সম্প্রসারণের ব্যয়, যুক্তরাষ্ট্রের সেমিকন্ডাক্টর শেয়ারের দুর্বলতা এবং মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা পর্যালোচনা করছিলেন। তাইওয়ানের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান আয়ের কথা তুলে ধরে জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে তারা দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে বলেছে।
এআই খাতে ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ তাইওয়ালে পৌঁছাল কেন
তাইওয়ানের বাজার খোলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শেয়ারের দর কমেছিল। রাতারাতি ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক ৩.৩৭% এবং নাসডাক ১.০৭% কমে। চিপ তৈরি, সার্ভার সংযোজন এবং এআই কম্পিউটিংয়ে ব্যবহৃত সরঞ্জাম সরবরাহকারী বড় কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীল বাজারে এই দরপতন চাপ সৃষ্টি করে।
কনকর্ড সিকিউরিটিজের বিশ্লেষক কেরি হুয়াং তাইওয়ানে লেনদেন বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এআই শেয়ারে আরও দরপতনের পর বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকা শেয়ার কমানোর প্রবণতাকে যুক্ত করেন।
"লেনদেনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার দিকে তাকান। আমার মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এআই-সংশ্লিষ্ট শেয়ারের আরও বড় ধরনের দরপতন দেখে অনেক বিনিয়োগকারী আতঙ্কে দ্রুত তাঁদের হাতে থাকা শেয়ার কমিয়েছেন। এআই বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ বাজারের মনোভাবে চাপ সৃষ্টি করে চলেছে," হুয়াং বলেন।
এআই অবকাঠামো গড়ে তোলা বড় ক্লাউড কম্পিউটিং কোম্পানিগুলোর ওপর ঋণের উচ্চ ব্যয়ের প্রভাবও তুলে ধরেন হুয়াং।
"ঋণের সুদ উচ্চ পর্যায়ে থাকলে বড় ক্লাউড সেবা সরবরাহকারীদের তহবিল সংগ্রহের আর্থিক বোঝা বাড়তে পারে, যা তাঁদের জন্য সন্তোষজনক মুনাফা নিশ্চিত করা কঠিন করে তুলতে পারে," হুয়াং বলেন।
বন্ড ইল্ড হলো বিনিয়োগকারীরা টাকা ধার দেওয়ার বিনিময়ে যে মুনাফা দাবি করেন। ঋণ নিতে কোম্পানিগুলোকে বেশি ইল্ড দিতে হলে ডেটা সেন্টারে অর্থায়ন ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। তখন বিনিয়োগকারীরা আরও খুঁটিয়ে দেখেন, এআই সেবা থেকে আয় চিপ, ভবন, বিদ্যুৎ ও ঋণের খরচ মেটাতে পারবে কি না।
তাইওয়ানের সরবরাহকারীরা এই ব্যয়চক্রের সরাসরি অংশ। বড় নির্মাণ বাজেট তাদের জন্য নতুন অর্ডার আনতে পারে, আবার শেষ পর্যন্ত বিনিয়োগ থেকে কতটা মুনাফা হবে তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনতে যে দাম দিতে রাজি, তা কমিয়ে দিতে পারেন।
বড় কয়েকটি সরবরাহকারীর তুলনায় টিএসএমসির পতন কম
টিএসএমসির শেয়ার ৩৫ তাইওয়ান ডলার কমে ২,২৯৫ তাইওয়ান ডলারে লেনদেন শেষ করে। কোম্পানিটির মার্কিন ডিপোজিটরি রসিদের দর কমে ১.৮৫%। এসব রসিদের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো এক্সচেঞ্জে কোম্পানিটির শেয়ারে বিনিয়োগ করতে পারেন।
প্রধান বাজারের মোট মূল্যের ৪০%-এর বেশি টিএসএমসির দখলে। ফলে কোম্পানিটির শেয়ারের দামের ওঠানামা তাইএক্স সূচকে বড় প্রভাব ফেলে। এর দরপতনে মঙ্গলবার সূচকটি প্রায় ২৮০ পয়েন্ট কমে, যা সূচকের ১,৬১২.৬০ পয়েন্ট পতনের প্রায় ১৭.৪%। বাকি পতনের বেশির ভাগই অন্য শেয়ার থেকে আসে।
চিপ নকশাকারী মিডিয়াটেকের শেয়ার ২৯৫ তাইওয়ান ডলার কমে ৩,৬৭৫ তাইওয়ান ডলারে দাঁড়ায়। সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ও পরীক্ষার কাজ করা এএসই টেকনোলজির শেয়ার ৮১৬ তাইওয়ান ডলারে লেনদেন শেষ করে। দক্ষিণ কোরিয়ার মেমোরি চিপ নির্মাতা স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্সের শেয়ার বিক্রির চাপ খাতে ছড়িয়ে পড়ায় নানইয়া টেকনোলজির শেয়ার দৈনিক সর্বোচ্চ সীমা ১০% কমে ৪১১ তাইওয়ান ডলারে নামে।
আইফোন সংযোজনকারী ও এআই সার্ভার নির্মাতা হন হাই প্রিসিশন ইন্ডাস্ট্রির শেয়ার ২.১৯% কমে ২৪৫.৫০ তাইওয়ান ডলারে দাঁড়ায়। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা পণ্যের সরবরাহকারী ডেল্টা ইলেকট্রনিকসের শেয়ার ৬.২৭% কমে ১,২৭০ তাইওয়ান ডলারে নামে। কোয়ান্টা কম্পিউটারের শেয়ার কমে ২.০৪% হয়ে ৩১১.৫০ তাইওয়ান ডলারে দাঁড়ায়।
ক্ষতিগ্রস্ত কোম্পানির বিস্তৃত পরিসর দেখায়, চিপ নকশা ও উৎপাদন থেকে শুরু করে পরীক্ষা, সার্ভার সংযোজন এবং বিদ্যুৎ সরঞ্জাম পর্যন্ত তাইওয়ানের উৎপাদন নেটওয়ার্কে এআই বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্ক কতটা ছড়িয়ে পড়েছে।
টানা চার সেশনে বিদেশি বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে
তাইওয়ান স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেনের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১০৭.৩০৭ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার, যা রেকর্ডে এক দিনের অষ্টম বৃহত্তম পরিমাণ। নিট বিক্রি বলতে বোঝায়, বিক্রি করা শেয়ারের মূল্য কেনা শেয়ারের মূল্যের চেয়ে ওই পরিমাণ বেশি।
এর আগের টানা তিন সেশনেও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ব্যাপক শেয়ার বিক্রি করেছিলেন। পরিসংখ্যানটি হলো:
- ২৯ অক্টোবর: নিট বিক্রি ৬৮.৮১৫ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার।
- ৩০ অক্টোবর: নিট বিক্রি ১১২.৪৬৭ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার।
- ২ নভেম্বর: নিট বিক্রি ৭৩.৫২০ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার।
- ৩ নভেম্বর: নিট বিক্রি ১০৭.৩০৭ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার।
চার সেশনে এই দৈনিক পরিসংখ্যানের যোগফল প্রায় ৩৫৩.০১ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার। সোমবারের তুলনায় মঙ্গলবার বিদেশিদের অর্থ তুলে নেওয়ার পরিমাণ বেশি ছিল, তবে ৩০ অক্টোবরের মোট পরিমাণের চেয়ে কম। বিদেশিদের এক দিনে নিট বিক্রির হিসাবে ৩০ অক্টোবরের পরিমাণ ছিল সপ্তম বৃহত্তম।
দেশীয় সিকিউরিটিজ ডিলাররাও মঙ্গলবার নিট ৫৯.০৫৫ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলারের শেয়ার বিক্রি করেন। এর মধ্যে নিজেদের হিসাবে প্রায় ৮.৭০৪ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলারের লেনদেন এবং আর্থিক ঝুঁকি কমাতে ব্যবহৃত হেজিং লেনদেনে ৫০.৩৫১ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার ছিল।
বিনিয়োগ ট্রাস্টগুলো উল্টো পথে গিয়ে নিট ১৯.৯০৫ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলারের শেয়ার কেনে। এটি ছিল টানা ১৬তম সেশন, যখন তারা নিট ক্রেতা ছিল। তাদের কেনাকাটা বিক্রির চাপ আংশিকভাবে সামাল দেয়। ফলে তিন প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী গোষ্ঠীর সম্মিলিত নিট বিক্রি দাঁড়ায় প্রায় ১৪৬.৪৫৭ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার।
সক্রিয় ইটিএফ বিক্রির বড় লক্ষ্য হয়ে ওঠে
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিক্রি ব্যক্তিগত কোম্পানির শেয়ার ছাড়িয়ে সক্রিয়ভাবে পরিচালিত এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডেও (ইটিএফ) ছড়িয়ে পড়ে। ইটিএফে একগুচ্ছ বিনিয়োগ থাকে এবং শেয়ারের মতোই এক্সচেঞ্জে কেনাবেচা হয়। সক্রিয় ইটিএফে ব্যবস্থাপকেরা নির্দিষ্ট কোনো সূচক অনুসরণ না করে নিজেরাই বিনিয়োগ বেছে নেন এবং সমন্বয় করেন।
সবচেয়ে বড় বিক্রির মধ্যে ছিল সিটিবিসি তাইওয়ান ইনকাম অ্যাকটিভ ইটিএফের প্রায় ১,৬৪,০০০ লট, ইউপিএএমসি তাইওয়ান গ্রোথ অ্যাকটিভ ইটিএফের ১,৩৪,০০০ লট এবং ইউপিএএমসি আপগ্রেড ৫০ অ্যাকটিভ ইটিএফের ১,০১,০০০ লট। এগুলো লেনদেন হওয়া ফান্ড ইউনিটের সংখ্যা, নগদ অর্থের পরিমাণ নয়।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি করা ছয় অবস্থানের মধ্যে পাঁচটিই ছিল সক্রিয় ইটিএফ; এসব ফান্ডে সম্মিলিত বিক্রি ৪,৬০,০০০ লট ছাড়িয়ে যায়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা নিষ্ক্রিয় ইউয়ানতা তাইওয়ান ৫০ ইটিএফ থেকেও প্রায় ৭৮,০০০ লট কমান। ফান্ডে বিক্রির এই কেন্দ্রীভবন ২ নভেম্বরের তুলনায় ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে, যেদিন বিক্রির তালিকায় ব্যক্তিগত কোম্পানিগুলো শীর্ষে ছিল।
ব্যক্তিগত শেয়ারের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উইনবন্ড ইলেকট্রনিকসের নিট ৩৬,৭৪০ লট, পাওয়ারচিপ সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের ৩৩,১৫৪ লট এবং নানইয়া টেকনোলজির ১৩,২৮৪ লট বিক্রি করেন। টিএসএমসিতে বিদেশিদের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ১১,৭০৩ লট।
বড় পরিমাণে বিক্রি হওয়া শেয়ারের মধ্যে প্লাস্টিক, আর্থিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানও ছিল। এর মধ্যে নান ইয়া প্লাস্টিকস, কেজিআই ফাইন্যানশিয়াল, ইনোলাক্স ও ফরমোসা প্লাস্টিকস রয়েছে। ফলে অর্থ তুলে নেওয়ার প্রভাব এআই খাতের বৃহত্তম কোম্পানিগুলোর বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।
ছোট ও উচ্চমূল্যের শেয়ারে দরপতন বেশি ছিল
টিপিএক্স সূচকের ৬.৪২% পতন তাইএক্স সূচকের ৩.৫৯% পতনের চেয়ে ২.৮৩ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। প্রধান বাজারের প্রযুক্তি খাতের বড় কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি ওই বাজারে তালিকাভুক্ত ছোট কোম্পানিগুলোতেও বিশেষভাবে জোরালো বিক্রির চাপ পড়ে।
দিন শেষে করা এক হিসাবে দুই বাজার মিলিয়ে ৭৬টি শেয়ার দৈনিক সর্বনিম্ন দামে পৌঁছায়। এর মধ্যে ৩৩টি প্রধান বাজারে এবং ৪৩টি টিপিএক্সে ছিল। অন্য এক হিসাবে দুই বাজারে মোট সংখ্যা ৭৪ বলে উল্লেখ করা হয়। দৈনিক মূল্যসীমা কোনো লেনদেন সেশনে একটি শেয়ারের দামের ওঠানামা কতটা হতে পারবে, তা বেঁধে দেয়।
১,০০০ তাইওয়ান ডলার বা তার বেশি দামের শেয়ারগুলোর মধ্যে কয়েকটিতে সবচেয়ে বড় আঘাত লাগে। এই শ্রেণির ১৪টি শেয়ার সর্বনিম্ন মূল্যসীমায় পৌঁছায়, যার মধ্যে লারগান প্রিসিশন, এমপিআই ও হার্মিস টেস্টিং সলিউশনস ছিল। গোল্ড সার্কিট ইলেকট্রনিকস, ম্যাটেরিয়ালস অ্যানালাইসিস টেকনোলজি ও জিনিয়াস ইলেকট্রনিক অপটিক্যালের দাম ১,০০০ তাইওয়ান ডলারের নিচে নেমে যায়। ফলে ওই সীমার ওপরে থাকা শেয়ারের সংখ্যা ৪৬ থেকে কমে ৪৩ হয়।
অ্যাসপিড টেকনোলজির শেয়ার প্রথমে বেড়ে ১৫,৮০০ তাইওয়ান ডলারে পৌঁছায়, পরে দর ঘুরে কমে ১৪,৭৩০ তাইওয়ান ডলারে লেনদেন শেষ করে। ৮৯৫ তাইওয়ান ডলার বা ৫.৭৩% কমার এই গতিপথ দেখায়, বাজারের সবচেয়ে ব্যয়বহুল কিছু শেয়ারেও দিনের শুরুতে কেনাকাটা পরে বিক্রির চাপে বদলে যায়।
গুড ফাইন্যান্সের বিশ্লেষক হুয়াং জু-তুং তাইওয়ান ডলারের দুর্বলতা এবং মার্কিন নির্বাচনের আগের অনিশ্চয়তাকে বড় ও উচ্চমূল্যের শেয়ারের ওপর চাপের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থানীয় মুদ্রার দর কমলে তাইওয়ানের শেয়ারে তাঁদের বিনিয়োগ ডলারে ফেরত রূপান্তর করার সময় তার মূল্য কমে যেতে পারে।
ঋণের অর্থে বিনিয়োগও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে
বিশ্লেষক চেন লুং এআই খাতে ব্যয় নিয়ে উদ্বেগের চেয়ে ভিন্ন বিষয়ে গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, ঋণ করা অর্থে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রি দরপতনের বড় কারণ। কোম্পানির ব্যবসায় অবনতি না হয়ে তিনি এই সেশনকে আবেগের বশে ঋণনির্ভর বিনিয়োগ কমানোর ঘটনা হিসেবে দেখেন।
মার্জিন লেনদেনে বিনিয়োগকারী শেয়ার কেনার অর্থের একটি অংশ ঋণ নেন। দাম কমলে ওই ঋণের জামানত হিসেবে থাকা শেয়ারের মূল্যও কমে যায়। তখন বিনিয়োগকারীকে নগদ অর্থ যোগ করতে বা বিনিয়োগের পরিমাণ কমাতে হতে পারে, যা দুর্বল বাজারে বিক্রির চাপ আরও বাড়ায়।
চেনের হিসাব অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত শেয়ারে বকেয়া মার্জিন অর্থায়ন ৩০ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলারের বেশি কমতে পারে। তিনি মনে করেন, বিনিয়োগের অবস্থান আরও স্থিতিশীল হওয়ার আগে আরও ২০ বিলিয়ন থেকে ৩০ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলার কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। এগুলো তাঁর অনুমান, সম্পন্ন হওয়া দৈনিক অর্থায়নের পরিসংখ্যান নয়।
সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ফিউচারস ব্যুরোর তথ্যমতে, ২ নভেম্বর মার্জিন অ্যাকাউন্টের রক্ষণাবেক্ষণ অনুপাত ছিল ১৭৩.৬২%। এই অনুপাত মার্জিন অ্যাকাউন্টের জামানতের মূল্য ও অর্থায়নের দায়ের তুলনা করে। মঙ্গলবারের দরপতনের আগের পুরো বাজারের এই পরিসংখ্যান বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর ব্যক্তিগত ঝুঁকির মাত্রা অবশ্য প্রকাশ করে না।
চেন টিএসএমসি, মিডিয়াটেক ও এএসইর অর্ডার নিয়ে আশাবাদী ছিলেন; মাইক্রোসফট, মেটা ও ওরাকল এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণ করায় এসব কোম্পানির অর্ডার বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশার বিপরীতে কেরি হুয়াং সতর্ক করেন, তাইএক্স সূচকে আরও চাপ পড়ে ৩৯,৩৮৪ পয়েন্ট পর্যন্ত নামতে পারে। ২৯ জুলাই সূচকটির দিনের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থান ছিল এটাই। পুনরুদ্ধার কখন হবে, তা অনিশ্চিত ছিল।
অর্থ বাইরে যাওয়ার সঙ্গে তাইওয়ান ডলারের দর কমে
মার্কিন ডলারের বিপরীতে তাইওয়ান ডলারের লেনদেন শুরু হয় ৩২.৬১০ দরে, পরে দুর্বল হয়ে ৩২.৮৬০-এ নামে এবং দিন শেষ করে ৩২.৭৬০-এ। সোমবারের ৩২.৫৯২ দরের তুলনায় দিনের শেষে মার্কিন ডলারের বিপরীতে তাইওয়ান ডলারের অবমূল্যায়ন হয় ০.১৬৮ তাইওয়ান ডলার। তাইপে ফরেক্স ইনকরপোরেটেডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩.৯৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের দিনের ৩.০৭৮ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে বেশি।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের তাইওয়ানের শেয়ার বিক্রি করে সেই অর্থ ডলারে রূপান্তর করার ফলে মার্কিন মুদ্রার চাহিদা বাড়ে। এই যোগসূত্রে শেয়ারবাজারের চাপ বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও ছড়িয়ে পড়ে।
রপ্তানিকারকদের মার্কিন ডলার বিক্রির দৈনিক সীমা সাময়িকভাবে শিথিল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ডলারে অর্থপ্রাপ্ত রপ্তানিকারকেরা সেই আয় তাইওয়ান ডলারে বিনিময় করতে পারেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যখন ডলার কিনতে চান, তখন এই পদক্ষেপে ডলারের সরবরাহ বাড়তে পারে।
ওসিবিসি ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা কৌশলবিদ হুয়াং চিং-লুং বলেন, এই শিথিলতা তাইওয়ান ডলারের আরও অবমূল্যায়ন ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে। তবে বিদেশিদের শেয়ার বিক্রি এবং বিদেশে অর্থ স্থানান্তর অব্যাহত থাকলে মুদ্রাটির পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হবে।
দিনের শেষভাগে তাইওয়ান ডলারের দর ৩২.৮৬০ থেকে বেড়ে ৩২.৭৬০-এ আসায় দিনের পতন কমে। তবু বিনিয়োগকারীরা দুই বাজারেই চাপে ছিলেন: শেয়ারের দাম পড়ায় তাঁদের বিনিয়োগের স্থানীয় মূল্য কমে, আর তাইওয়ান ডলারের দুর্বলতায় মার্কিন ডলারে হিসাব করা মূল্যও কমে যায়।
বিক্রির চাপের মধ্যেও নিয়ন্ত্রকেরা আয় বৃদ্ধির কথা তুলে ধরেন
ফিন্যানশিয়াল সুপারভাইজরি কমিশনের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড ফিউচারস ব্যুরোর উপমহাপরিচালক হুয়াং চুং-হাও বাজারের অস্থিরতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আর্থিক কার্যক্রম, কোম্পানির মূল্যায়ন নিয়ে মতভেদ এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার যোগসূত্র তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে কমিশন তাইওয়ান স্টক এক্সচেঞ্জ ও টিপিএক্সকে বলেছে।
ব্যুরো জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে তালিকাভুক্ত এবং টিপিএক্সের কোম্পানিগুলোর আয় ছিল ৪৯.৮৯ ট্রিলিয়ন তাইওয়ান ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৮.২১% বেশি। সেপ্টেম্বরের শেষে বাজারের মূল্য-আয় অনুপাত ছিল প্রায় ২৬.৬৮, আর নগদ লভ্যাংশের ইল্ড ছিল ১.৫৪%; শেয়ার লভ্যাংশসহ তা ১.৫৮%।
মূল্য-আয় অনুপাত শেয়ারের দামের সঙ্গে কোম্পানির মুনাফার তুলনা করে। এই পরিসংখ্যান বিনিয়োগকারীদের সামনে থাকা বিপরীতমুখী বিষয়গুলো বুঝতে সহায়তা করে: কোম্পানিগুলোর বিক্রি দ্রুত বেড়েছে, আবার ভবিষ্যৎ আয়ের জন্য কত দাম দেওয়া উচিত, তা বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিবেচনা করছেন।
ফিন্যানশিয়াল সুপারভাইজরি কমিশনের চেয়ারম্যান পেং চিন-লুংও বাজারের আগের সম্প্রসারণের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাইওয়ানের মোট শেয়ারবাজারের মূল্য ২০২৫ সালের অক্টোবরের শেষে ৯৮ ট্রিলিয়ন তাইওয়ান ডলার থেকে এক বছর পর বেড়ে ১৫৮ ট্রিলিয়ন তাইওয়ান ডলারে পৌঁছেছে, অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ৬১%-এর বেশি।
মঙ্গলবারের দরপতনের মধ্যেও কিছু শেয়ারের দাম বেড়েছে। তাইওয়ান গ্লাসের শেয়ার ৬.২৮% বেড়ে ৬৭.৭০ তাইওয়ান ডলারে দাঁড়ায় এবং ব্যক্তিগত শেয়ারের মধ্যে বিদেশিদের কেনাকাটায় ৫৪,৭৭৫ লট নিয়ে শীর্ষে ছিল। ইভিএ এয়ারওয়েজের শেয়ার ১.২৭% বেড়ে ৪৩.৭০ তাইওয়ান ডলারে, চায়না এয়ারলাইন্সের ০.২৪% বেড়ে ২০.৭০ তাইওয়ান ডলারে এবং ইউনিপ্রেসিডেন্ট এন্টারপ্রাইজেসের ০.৬২% বেড়ে ৮১.১০ তাইওয়ান ডলারে দাঁড়ায়।
দেশীয় বিনিয়োগ ট্রাস্টগুলো খাতটির বাছাই করা কিছু শেয়ার কিনলেও আর্থিক খাতের শেয়ার ২.৫৪% কমে। ফুবন ফাইন্যানশিয়ালের শেয়ার ৩.৪৫% কমে ১৫৪ তাইওয়ান ডলারে এবং ক্যাথে ফাইন্যানশিয়ালের শেয়ার ২.৫৯% কমে ১১৩ তাইওয়ান ডলারে নামে।
বিনিয়োগকারীদের সামনে পরবর্তী বিষয় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আরও আয়ের প্রতিবেদন এবং শুক্রবার, ৬ নভেম্বর প্রকাশিত হওয়ার কথা থাকা অক্টোবরের মার্কিন কর্মসংস্থান প্রতিবেদন। এসব ঘটনা নীতি, কোম্পানির মুনাফা এবং ঋণ নেওয়ার ব্যয় নির্ধারণকারী অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নতুন তথ্য দেবে।
মূল বিষয়
- ৩ নভেম্বর তাইএক্স সূচক ৪৩,৩০৭.৫৪ পয়েন্টে লেনদেন শেষ করে; ১,৬১২.৬০ পয়েন্ট বা ৩.৫৯% পতনে এক দিনের পয়েন্ট হ্রাসের হিসাবে এটি ছিল সূচকটির সপ্তম বৃহত্তম পতন।
- সোমবারের তুলনায় লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১৬.১% বেড়ে ৯২৮.০৬ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলারে দাঁড়ায়।
- বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো নিট ১০৭.৩০৭ বিলিয়ন তাইওয়ান ডলারের শেয়ার বিক্রি করে; টানা চার সেশনে তাদের বিক্রি অব্যাহত থাকে।
- টিএসএমসির তুলনায় মিডিয়াটেক, এএসই টেকনোলজি, নানইয়া টেকনোলজি ও ডেল্টা ইলেকট্রনিকসের শেয়ারের শতকরা হিসাবে দরপতন বেশি ছিল।
- টিপিএক্স সূচক ৬.৪২% কমে; আর্থিক ও শিল্প খাতের শেয়ারেও বিক্রির চাপ ছড়িয়ে পড়ে।
- সোমবারের ৩২.৫৯২ দরের তুলনায় তাইওয়ান ডলার মার্কিন ডলারের বিপরীতে ৩২.৭৬০ দরে লেনদেন শেষ করে।
- নিয়ন্ত্রকেরা জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে তালিকাভুক্ত ও টিপিএক্সের কোম্পানিগুলোর আয় ৩৮.২১% বেড়েছে।






