ভিড়ভাট্টার মন্দির, যেখানে কাউকে কথা বলতে হয় না
দক্ষিণ কোরিয়ার ২৬ বছর বয়সী এক চাকরিপ্রার্থীর তৈরি ভার্চুয়াল বৌদ্ধমন্দির সানসা চালুর তিন দিনের মধ্যে মোট ৮ লাখের বেশি ভিজিট পেয়েছে, ২০২৬ সালের ১ নভেম্বরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী। এর আকর্ষণ অস্বাভাবিক রকমের সরল: কিছু না বলেই অন্য মানুষের পাশে বসে থাকা যায়।
সূচিপত্র
- ভিড়ভাট্টার মন্দির, যেখানে কাউকে কথা বলতে হয় না
- ভেতরে দর্শনার্থীরা কী করেন
- নীরবতার আড়ালে চাকরিপ্রার্থী
- ব্যক্তিগত প্রকল্প থেকে জনাকীর্ণ প্রার্থনাকক্ষ
- শান্তির পাশাপাশি বাস্তব সমস্যার সমাধান চান দর্শনার্থীরা
- দক্ষিণ কোরিয়ার বাইরেও পৌঁছেছে দর্শক
- দক্ষিণ কোরিয়ার বৌদ্ধ জোয়ারের শান্ত এক দিক
- বেনামি পবিত্র পরিসর কেন আকর্ষণীয়
- গির্জা, ক্যাম্পিং এবং চালু রাখার খরচ
- সানসার পরবর্তী পরিকল্পনা
- মূল বিষয়গুলো
ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক পার্ক জিন-ওন ‘মেটামং’ নামে কাজ করেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তিনি ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছেন। কাজ খোঁজার সময় মন্দিরে যাওয়ার স্বস্তি পেতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেখানে যাওয়ার মতো সময় ও শক্তি ছিল না। তাঁর তৈরি ব্যবস্থায় ফোন বা কম্পিউটার থেকে কোনো অ্যাপ ইনস্টল না করেই বনের মধ্যে থাকা মন্দিরে প্রবেশ করা যায়।
শুরুতে মাত্র ২০ জনের জন্য তৈরি জায়গাটি দ্রুতই উপচে পড়ে। ৩০ অক্টোবর সকালে ১০০টি প্রার্থনাকক্ষে অনলাইনে ৪,৬৭৯ জনকে দেখা যায়। পাঁচটি কক্ষে সর্বোচ্চ ১০০ জন করে ছিলেন। বসার কুশন খুঁজতে আসা দর্শনার্থীদের কখনো কখনো হেঁটে যেতে হয়েছে, নয়তো দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়েছে।
২৯ অক্টোবর এক দিনে ১ লাখ ভিজিটের কথা জানিয়েছিলেন পার্ক। ৩১ অক্টোবরের এক সাক্ষাৎকারে তিনি মোট ভিজিটের সংখ্যা ৬ লাখ বলে উল্লেখ করেন; ১ নভেম্বরের প্রতিবেদনে তা ৮ লাখ ছাড়িয়েছে বলে জানানো হয়। সংখ্যাগুলো দ্রুত বাড়তে থাকা দর্শকসংখ্যার হিসাব দেয়, আর ৩০ অক্টোবরের কক্ষভিত্তিক সংখ্যা একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে কতজন সেখানে ছিলেন, তা তুলে ধরে।
এই বৃদ্ধির সঙ্গে এসেছে প্রযুক্তিগত বিপর্যয়, আরও জায়গার অনুরোধ এবং সার্ভারের খরচ মেটানোর বাস্তব প্রশ্ন। দর্শনার্থীরা এরই মধ্যে আর্থিক সহায়তার উপায় চেয়েছেন। অনুদানের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, তবে ট্রাফিক সক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে তা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
ছোট্ট একটি প্রকল্পে সানসা দুটি প্রবণতাকে এক করেছে: বৌদ্ধ পরিবেশে স্বস্তি খুঁজে নেওয়া তরুণেরা, আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যৌথ ডিজিটাল পরিসর তৈরি করা ব্যক্তি। এর সবচেয়ে সচেতন সিদ্ধান্ত হলো চ্যাটের কোনো ঘর না রাখা।
ভেতরে দর্শনার্থীরা কী করেন
সানসা অর্থ পাহাড়ি মন্দির। প্রবেশ করলে দর্শনার্থীরা তরুণ বৌদ্ধ ভিক্ষুর মতো দেখতে একটি ছোট অবতার এবং এলোমেলোভাবে দেওয়া একটি নাম পান, যেমন ‘অলস মেঘ’ বা ‘কোমল চাঁদের আলো’। প্রধান প্রার্থনাকক্ষে রয়েছে বড় একটি বুদ্ধমূর্তি, আর তার চারপাশে কুশন, যেখানে অবতারগুলো বসতে পারে।
বোতামে চাপ দিয়ে দর্শনার্থীরা হাত জোড় করতে, প্রণাম করতে বা জপমালা ঘোরাতে পারেন। তাঁরা বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ হৃদয় সূত্রের আবৃত্তি শুনতে পারেন, কিংবা বাতাস ও পাখির শব্দের মধ্যে স্থির থাকতে পারেন। কেউ কেউ জানান, তাঁদের অবতার দিয়ে ১০৮ বার প্রণাম করেন, যা বৌদ্ধ ভক্তির সঙ্গে যুক্ত একটি পুনরাবৃত্ত প্রণাম-অনুশীলন।
অন্য কোনো দর্শনার্থী হাত জোড় করলে বিজ্ঞপ্তি হিসেবে একটি অভিবাদন দেখা যায়। এখানে লিখিত কথোপকথন বা ব্যক্তিগত বার্তা নেই। জবাব দিতে হবে এমন কোনো আলাপ শুরু না করেই মানুষ একে অন্যকে স্বীকৃতি জানাতে পারেন।
কথাবার্তার অনুপস্থিতি কক্ষটির সামাজিক প্রত্যাশা বদলে দেয়। কোনো দর্শনার্থী এসে নীরবে বসতে পারেন, তারপর পরিচয় না দিয়ে বা আসার কারণ না বুঝিয়েই চলে যেতে পারেন। অন্য অবতারগুলো সঙ্গ দেয়, আর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা যোগাযোগকে সীমিত রাখে।
নীরবতার আড়ালে চাকরিপ্রার্থী
পার্ক এমন এক পদ্ধতিতে সানসা তৈরি করেছেন, যাকে সাধারণত ‘ভাইব কোডিং’ বলা হয়: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থাকে কাঙ্ক্ষিত কাজের বর্ণনা দিলে সেটি প্রোগ্রামিং কোড তৈরিতে সহায়তা করে। এতে সাধারণ ভাষায় নির্দেশ দিয়ে সফটওয়্যার তৈরি করা সম্ভব হয়। তবে জনসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী কোনো সেবা চালু করতে পরীক্ষা, ত্রুটি সংশোধন এবং দর্শনার্থীর চাপ সামলানোর মতো কম্পিউটিং সক্ষমতা দরকার হয়।
শুরুতে পার্ক নিজেই মন্দিরটি ব্যবহার করার কথা ভেবেছিলেন। তিনি বৌদ্ধ নন, তবে ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে মন্দিরে যাওয়া এবং মন্দিরে থেকে ধর্মীয় জীবনযাপনের অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে। তরুণ ভিক্ষুর অবতারগুলো তৈরির অনুপ্রেরণা পেয়েছেন তাঁর ছোট ভাগনের কাছ থেকে।
পার্ক, সানসার নির্মাতা, দর্শনার্থীদের সাড়া এবং তাঁর চোখে ধরা পড়া প্রয়োজনের কথা এভাবে তুলে ধরেন:
আমার মনে হয়, আমার বয়সী মানুষের কাছে মন্দির আকর্ষণীয়, কারণ সেখানে সবাইকে স্বাগত জানানো হয়—আপনি বৌদ্ধ না হলেও। এত মানুষের সাড়া দেখে বুঝতে পেরেছি, আরও অনেকে আমার মতোই ক্লান্ত। হয়তো তাদের আসলে দরকার ছিল শুধু একটু বিরতি নেওয়ার জন্য একটি নীরব জায়গা, যেখানে কাউকে কিছু বলতে হবে না।
ব্যক্তিগত প্রকল্প থেকে জনাকীর্ণ প্রার্থনাকক্ষ
থ্রেডস ও ইনস্টাগ্রামের মাধ্যমে সানসা ছড়িয়ে পড়ে এবং পার্কের প্রাথমিক প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বড় দর্শকসমাগম ঘটে। প্রথম দিনে প্রায় ১২ হাজার ভিজিটের চাপে সেবা বন্ধ হয়ে যায়। প্রকল্প পরিচালনার জরুরি অংশ হয়ে ওঠে সক্ষমতা বাড়ানো।
শুরুর দিকের প্রবৃদ্ধির ধারাটি কয়েকটি প্রকাশ্য আপডেটে দেখা যায়:
- ২৯ অক্টোবর: প্রথম দিনে প্রায় ১২ হাজার ভিজিটের পর সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা জানান পার্ক, এরপর এক দিনে ভিজিট ১ লাখে পৌঁছানোর কথা ঘোষণা করেন।
- ৩০ অক্টোবর: সকালে প্রধান মন্দিরের ১০০টি কক্ষে ৪,৬৭৯ জন ছিলেন, আর ওই বিকেলেও কিছু কক্ষ পূর্ণ ছিল।
- ৩১ অক্টোবর: সাম্প্রতিক তিন দিনে মোট ভিজিট ৬ লাখে পৌঁছেছে বলে জানান পার্ক।
- ১ নভেম্বর: পরবর্তী এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চালুর তিন দিনের মধ্যে মোট ভিজিট ৮ লাখ ছাড়িয়েছে।
পার্কের বাড়ানো সক্ষমতা প্রথমে ২০টি জায়গা থেকে ১০০, তারপর ১,২০০ এবং সবশেষে ১০ হাজারে পৌঁছায়। ১০০টি কক্ষে ১০০ জন করে থাকতে পারেন। চূড়ান্ত সক্ষমতা ছিল শুরুর ২০টি জায়গার ৫০০ গুণ। ব্যস্ত সময়ে এতটা বাড়ানোর পরও কিছু দর্শনার্থীকে অপেক্ষা করতে হয়েছে।
কক্ষের বিন্যাস ব্যাখ্যা করে, পুরো মন্দিরে জায়গা থাকলেও কোনো একটি কক্ষে কেন ভিড় হতে পারে। ৩০ অক্টোবর ১০ হাজার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থায় ৪,৬৭৯ জনের উপস্থিতির মধ্যেও পাঁচটি কক্ষ পূর্ণ ছিল। দর্শনার্থীরা আলাদা কক্ষ বেছে নেন, তাই চাহিদা সব কক্ষে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে না।
শান্তির পাশাপাশি বাস্তব সমস্যার সমাধান চান দর্শনার্থীরা
ব্যবহারকারীরা বলেছেন, কাজে যাওয়ার আগে মন শান্ত করতে তাঁরা এখানে ঢোকেন, কাজের সময় মন্দিরটি খোলা রাখেন, কিংবা দিনে কয়েকবার ফিরে আসেন। কেউ কেউ নিজেদের ধর্মহীন বলে পরিচয় দেন; আবার কেউ প্রোটেস্ট্যান্ট বা ক্যাথলিক হয়েও এখানকার শান্ত পরিবেশ উপভোগ করেন।
এক দর্শনার্থী ওয়েবসাইটটিকে তাঁর জীবনের প্রথম মন্দির-দর্শন বলে বর্ণনা করেছেন। আরেকজন, যিনি নিজেকে প্রবল অন্তর্মুখী বলে পরিচয় দিয়েছেন, সামনের সারিতে বসতে পারার সুযোগকে স্বাগত জানান। তাঁদের মন্তব্য থেকে এমন একটি পরিসরের ছবি পাওয়া যায়, যেখানে অন্যরা কাছাকাছি থাকলেও অংশগ্রহণ হতে পারে ছোট পরিসরের ও ব্যক্তিগত।
অভিযোগগুলোও ছিল সুনির্দিষ্ট: কোনো কুশন খালি নেই, কক্ষে ভিড় এবং বসার জায়গা খুঁজে পেতে অসুবিধা। সার্ভারের সমস্যার জন্য পার্ক দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, ব্যবহারকারীদের মতামতের ভিত্তিতে উন্নতি করা হবে।
শব্দ নিয়ে অভিযোগের পর সবার জন্য শোনা যেত এমন মোকতাকের শব্দ সরিয়ে নেওয়া হয়। মোকতাক হলো বৌদ্ধ প্রার্থনা বা মন্ত্রপাঠের ছন্দ ধরে রাখতে ব্যবহৃত কাঠের বাদ্যযন্ত্র। পার্ক আলাদা করে ব্যবহারের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা করেন, যাতে প্রত্যেকে অন্যদের ওপর শব্দ চাপিয়ে না দিয়ে এটি বাজাতে পারেন। একই কুশনে দুটি অবতার বসতে না দেওয়ার ব্যবস্থাও করেন তিনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার বাইরেও পৌঁছেছে দর্শক
রাতারাতি তাইওয়ান থেকে ৫০ হাজার ভিজিট এসেছে বলে জানান পার্ক। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকেও মানুষ যুক্ত হয়েছেন। ওয়েবসাইটে সহজেই ঢোকা যায় বলে বিদেশ থেকে ভিজিটের জন্য ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে হয় না, আলাদা কোনো প্রোগ্রামও ডাউনলোড করতে হয় না।
থ্রেডসে ভিয়েতনামি ভাষায় প্রকাশিত একটি পোস্টে তরুণ ভিক্ষুর অবতারে ঠাসা একটি প্রার্থনাকক্ষ দেখা যায়। সাত ঘণ্টার মধ্যে পোস্টটি ১ লাখ ৫২ হাজার ভিউ ও ৮ হাজার ৬০০ লাইক পায়। অনলাইনের মন্দিরে বসার জায়গা নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতার রসিকতাটি প্রকল্পটির কেন্দ্রীয় বৈপরীত্য তুলে ধরে: দৈনন্দিন চাপ থেকে মুক্তি খুঁজতে আসা মানুষ একটি নীরব ডিজিটাল কুশনের জন্য সারিতে দাঁড়িয়েছেন।
সানসার জনপ্রিয়তার সঙ্গে এ অঞ্চলের আরেকটি প্রবণতার মিল রয়েছে। চীনে ২০২৩ সালে মন্দির থাকা দর্শনীয় স্থানের বুকিং আগের বছরের তুলনায় ৩১০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে ট্রিপ ডটকম। অর্থাৎ বুকিং আগের মাত্রার প্রায় ৪.১ গুণে পৌঁছেছে। এসব দর্শনার্থীর প্রায় অর্ধেকের জন্ম ১৯৯০ সালের পরে।
চীনের ভ্রমণসংক্রান্ত পরিসংখ্যান আর সানসার ভিজিট ভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ডের কথা বলে, তবে দুটিতেই তরুণদের মন্দিরকেন্দ্রিক পরিবেশ বেছে নিতে দেখা যায়। সানসায় সরাসরি মন্দিরে যাওয়ার ঝামেলার অনেকটাই নেই: যাত্রার ব্যবস্থা করতে হয় না, আর বাড়িতে বসেই কয়েক মিনিট থাকা যায়।
দক্ষিণ কোরিয়ার বৌদ্ধ জোয়ারের শান্ত এক দিক
দক্ষিণ কোরিয়ায় বৌদ্ধ সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহে বাস্তব অনুষ্ঠানস্থলেও ভিড় বেড়েছে। ২০২৫ সালে সিউল আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ প্রদর্শনীতে ২ লাখের বেশি দর্শনার্থী এসেছিলেন, যাঁদের ৭০ শতাংশের বেশি ছিলেন ২০ ও ৩০ বছর বয়সী। ২০২৬ সালে দর্শনার্থীর সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছায়, যা ১৪ বছরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
২০২৬ সালের দর্শকদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের বয়স ছিল ২০ ও ৩০-এর কোঠায়। আয়োজকদের ভাষ্য, তরুণ দর্শনার্থীদের প্রায় অর্ধেকের কোনো ধর্মীয় পরিচয় ছিল না। ফলে মেলাটির দর্শকগোষ্ঠী আগে থেকেই কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত মানুষের চেয়ে অনেক বিস্তৃত ছিল।
এর আরও প্রাণবন্ত দিকের মধ্যে রয়েছে ডিজে নিউজিন্সনিম, কৌতুকাভিনেতা ইউন সঙ-হো অভিনীত একটি চরিত্র, যা ইলেকট্রনিক নাচের সংগীতের সঙ্গে বৌদ্ধ মন্ত্র মিলিয়ে পরিবেশন করে। ২০২৪ সালের মেলায় তাঁর উপস্থিতি এত আগ্রহ তৈরি করেছিল যে অনুষ্ঠানটির ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ে।
সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে বুদ্ধকে সার্ফিং বা স্কিইং করতে দেখানো টি-শার্ট, চাবির রিং এবং বৌদ্ধ বিষয়বস্তুর ফোন স্ট্যান্ড। মন্দিরে থেকে সময় কাটানোর সুযোগ দেওয়া টেম্পল স্টে কর্মসূচিতেও আরও বেশি তরুণ কোরীয় অংশ নিচ্ছেন। জনাকীর্ণ মেলা বা সংগীত পরিবেশনার তুলনায় সানসা অনেক শান্ত; তবে একই ধর্মীয় পরিবেশের পরিচিতিকে কাজে লাগায়।
বেনামি পবিত্র পরিসর কেন আকর্ষণীয়
সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ধর্মতত্ত্বের অধ্যাপক সঙ হে-ইয়ং তরুণদের বৌদ্ধধর্মে আগ্রহের সঙ্গে তাঁদের জীবনের অনিশ্চয়তার যোগসূত্র দেখেন। তাঁর মতে, বৌদ্ধধর্ম দুঃখকে স্বীকার করে এবং ব্যক্তিগত উপলব্ধির মধ্য দিয়ে সেই দুঃখের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানায়; অস্থির পরিস্থিতিতে থাকা মানুষের কাছে তা আকর্ষণীয় হতে পারে।
ধর্মীয় পরিবেশ চান, কিন্তু কোনো সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হতে চান না—এমন কারও কাছে ডিজিটাল পরিসর কেন আকর্ষণীয়, সেটিও ব্যাখ্যা করেছেন সঙ:
মানুষ উপাসনালয়ে যেমন শান্তি ও পবিত্রতার অনুভূতি পেতে চায়, তেমনই চায়; কিন্তু তারা যে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হতে বা কোনো কিছু নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করার চাপ অনুভব করতে চায়, তা নয়। বেনামি অনলাইন পরিসর ঠিক সেটিই দেয়।
পার্কের পরিস্থিতি এই ব্যাখ্যার একটি বাস্তব উদাহরণ। চাকরি খুঁজছিলেন এমন একজন মানুষ বিশ্রামের জায়গা তৈরি করেছেন, কারণ বাস্তব মন্দিরে যাওয়ার মতো সময় ও শক্তি তাঁর ছিল না। কাজে যাওয়ার আগে অল্প সময়ের জন্য ঢোকা বা কাজের মধ্যে নীরব সঙ্গ পাওয়ার কথা বলা দর্শনার্থীরা দৈনন্দিন ব্যস্ততার সঙ্গে মিলিয়ে এই পরিসর ব্যবহার করছেন।
সানসার নকশায় মানুষ আসার একাধিক কারণের জায়গা রয়েছে। কেউ প্রণাম করে ধর্মগ্রন্থ শুনতে পারেন, কেউ ধর্মীয় বিশ্বাস ছাড়াই পরিবেশ উপভোগ করতে পারেন, আবার কেউ শুধু অন্য অবতারের পাশে বসতে পারেন। একই কক্ষ এসব ভিন্ন কাজকে এক জায়গায় রাখে, সেগুলো নিয়ে কথা বলার বাধ্যবাধকতা ছাড়াই।
গির্জা, ক্যাম্পিং এবং চালু রাখার খরচ
অন্য নির্মাতারাও এ ধরনের পরিসর তৈরি করেছেন। চানমি ক্যাথলিক গির্জার পুনর্নির্মাণ করেছেন, যেখানে রয়েছে সারি সারি বসার বেঞ্চ, মানতের মোমবাতি ও জপমালা। দর্শনার্থীরা ঐতিহ্যবাহী স্তোত্র শুনতে পারেন, আর সকাল ৬টা, দুপুর ১২টা ও সন্ধ্যা ৬টায় অ্যাঞ্জেলুসের ঘণ্টা বাজে। গোয়ত্তুলে রয়েছে প্রার্থনার অনুরোধ ও ধর্মোপদেশসহ প্রোটেস্ট্যান্ট গির্জার পরিবেশ।
ভার্চুয়াল সাঁতার, ক্যাম্পিং ও সাউনার পরিসরও তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি রয়েছে পোষা প্রাণীর স্মৃতিচারণের জায়গা। এসব প্রকল্প ধর্মের বাইরেও ধারণাটিকে বিস্তৃত করে: যৌথ ডিজিটাল জায়গাকে বিশ্রাম, পরিচিত অবসরযাপন বা স্মৃতিচারণের জন্য সাজানো যায়।
দোংইয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের গেম অনুষদের অধ্যাপক কিম জং-তে মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গেম তৈরির প্রযুক্তিগত বাধা কমিয়ে দেওয়ায় আরও ব্যক্তি-উদ্যোগী নির্মাতা এই ক্ষেত্রে আসবেন। সানসায় এই প্রক্রিয়ার দুই দিকই দেখা যায়: একজন মানুষ আকর্ষণীয় পরিসর তৈরি করতে পারেন, তারপর হঠাৎই বিপুল দর্শক সামলানোর পরিচালনাগত চাহিদার মুখে পড়তে পারেন।
পার্কের সার্ভার খরচ ইতিমধ্যেই বেড়েছে। ব্যবহারকারীদের অনুরোধে তিনি গংইয়াংমি—মন্দিরে দেওয়া চাল—উৎসর্গের ভাবনায় অনুদানের ব্যবস্থা চালু করেন। ব্যাপক ট্রাফিকে সেই ব্যবস্থাও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, ফলে সেবাটিকে সহায়তা করার জন্য চালু করা ব্যবস্থাতেও চাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সানসার পরবর্তী পরিকল্পনা
পার্ক হৃদয় সূত্রের বাইরে আরও শব্দ যোগ করা, মোকতাক ও জপমালা উন্নত করা এবং মন্দিরের মানচিত্র বড় করার পরিকল্পনা করেছেন। কোনো প্রকাশের তারিখ বা বিস্তারিত আর্থিক পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়নি। আপাতত তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে জায়গা বাড়ানো এবং একই সঙ্গে বর্তমান অভিজ্ঞতাকে শান্ত রাখা।
অনুদানের ব্যবস্থা চালু হওয়ায় প্রকল্পটির শুরুতে অর্থ সংগ্রহের কোনো ঘোষিত উপায় ছিল না—এমন ধারণা বদলেছে। দর্শনার্থীরা সহায়তা করতে আগ্রহ দেখিয়েছেন, আর প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে সাময়িক বন্ধ হয়ে যাওয়া দেখিয়েছে, চাহিদা কত দ্রুত মূল ব্যক্তিগত উদ্যোগের সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
বৌদ্ধধর্মের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক প্রবণতা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে কেউ কেউ সতর্ক করেছেন, বৌদ্ধধর্মকে শুধু আকর্ষণীয় ছবি হিসেবে দেখলে আগ্রহ ক্ষণস্থায়ী ফ্যাশনে পরিণত হতে পারে। প্রাথমিক কৌতূহল কমে যাওয়ার পরও দর্শনার্থীরা এর সাধারণ কর্মকাণ্ডে মূল্য খুঁজে পান কি না, তার ওপর আংশিকভাবে নির্ভর করবে সানসার জনপ্রিয়তা টিকে থাকা।
আপাতত এর স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতাটি স্পষ্ট: একটি কক্ষে ঢোকা, কুশন খুঁজে নেওয়া, মন্ত্রপাঠ বা বাতাসের শব্দ শোনা এবং এমন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কিছুটা সময় ভাগ করে নেওয়া, যারা কোনো বার্তা পাঠাবেন না। বিরতির প্রয়োজন থেকেই পার্ক জায়গাটি তৈরি করেছিলেন। লাখ লাখ ভিজিটের ফলে সেই নীরবতা বজায় রাখার কাজ অনেক বড় হয়ে উঠেছে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৬ সালের ১ নভেম্বরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চালুর তিন দিনের মধ্যে সানসায় মোট ভিজিট ৮ লাখ ছাড়িয়েছে।
- নির্মাতা ২৬ বছর বয়সী পার্ক জিন-ওন চাকরি খোঁজার প্রস্তুতির সময় এআই-সহায়তায় প্রোগ্রামিং ব্যবহার করেন।
- ব্রাউজারভিত্তিক মন্দিরে প্রণাম, জপমালা, মন্ত্রপাঠ ও নীরব সঙ্গের সুযোগ রয়েছে; চ্যাট বা ব্যক্তিগত বার্তা নেই।
- সক্ষমতা ২০টি জায়গা থেকে বেড়ে ১০০টি কক্ষে ১০ হাজারে পৌঁছেছে।
- তাইওয়ান থেকে রাতারাতি ৫০ হাজার ভিজিটসহ তাইওয়ান, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের দর্শনার্থীদের কথা জানিয়েছেন পার্ক।
- ব্যবহারকারীদের অনুরোধে অনুদানের ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, তবে ব্যাপক ট্রাফিকে তা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
- পরিকল্পিত উন্নতির মধ্যে রয়েছে আরও অডিও, ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারের বাদ্যযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ, উন্নত জপমালা এবং বড় মন্দিরের মানচিত্র।






