তাইওয়ানের চারপাশের সাগরে বাড়ছে প্রতিযোগিতা
তাইওয়ানের কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, চীনের ১২০টির বেশি গবেষণা জাহাজ রয়েছে। তাইওয়ানের পাঁচটি জাহাজ সক্রিয়ভাবে সামুদ্রিক গবেষণা চালায়। সক্ষমতা বাড়াতে আগস্টে আরও দুটি জাহাজ পানিতে নামানো হয়েছে। তাইওয়ানের দক্ষিণ ও পূর্বে চীনা জাহাজগুলো জলসীমার মানচিত্র তৈরি করায় এই ব্যবধানের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। কোনো সংঘাত হলে এসব পথ পাড়ি দিতে হতে পারে মার্কিন নৌবাহিনীকে।
সূচিপত্র
- তাইওয়ানের চারপাশের সাগরে বাড়ছে প্রতিযোগিতা
- তাইওয়ানের পূর্বের জলসীমা কেন গুরুত্বপূর্ণ
- সমুদ্রতলের জরিপ কীভাবে পানির নিচের অভিযানে কাজে লাগে
- জাহাজের গতিবিধি নিয়ে গবেষণায় কী মাপা হয়েছে
- দুটি জাহাজে ভৌগোলিক বিস্তারের চিত্র
- কেবল নিরাপত্তা কেন তাইওয়ানের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়
- জাহাজ বাড়ানোর বাইরেও তাইওয়ানের উদ্যোগ
- জরিপ ও প্রতিক্রিয়ার সময়রেখা
- মূল বিষয়গুলো
জাহাজের গতিবিধির তথ্য দেখায়, চীনা গবেষণা জাহাজগুলো বারবার এসব জলসীমায় সমান্তরাল পথে চলেছে। সমুদ্রতল জরিপে সাধারণত এ ধরনের পথ ব্যবহার করা হয়। তাইওয়ানের কোস্ট গার্ডের ভাষ্য, এ তৎপরতা সামুদ্রিক যুদ্ধক্ষেত্র প্রস্তুতের অংশ। পানির নিচের ভূপ্রকৃতি ও পানির অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সাবমেরিন ও পানির নিচের ড্রোনকে চলাচল, আড়ালে থাকা এবং প্রতিপক্ষের বাহিনী খুঁজে পেতে সহায়তা করতে পারে।
অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে তাইওয়ান ছয়টি চীনা জরিপ জাহাজ, ছয়টি চীনা কোস্ট গার্ড জাহাজ এবং চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার অংশ বলে সন্দেহ করা চারটি মাছ ধরার নৌকা শনাক্ত করে। তাইওয়ানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপমহাসচিব লি ওয়েন এসব জাহাজকে চীনা সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতার প্রমাণ হিসেবে বর্ণনা করেন।
এই তৎপরতায় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দুটি উদ্বেগ একত্র হয়েছে: তাইওয়ানের আশপাশে পানির নিচে চীনের কার্যক্রম চালানোর সক্ষমতা এবং দ্বীপটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বহনকারী কেবলগুলোর ঝুঁকি। প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে জাহাজের চলাচল নিয়ে গবেষণা—দুই উদ্বেগ সম্পর্কেই আরও তথ্য দিচ্ছে। অন্যদিকে, তাইওয়ানও নিজেদের চারপাশের সাগর সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে এবং নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের হুমকি দেয়। গবেষণা কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়নি চীনের তাইওয়ানবিষয়ক দপ্তর। সমুদ্র জরিপ বৈজ্ঞানিক গবেষণা, খনিজ অনুসন্ধান ও সামরিক অভিযান—সব ক্ষেত্রেই সহায়ক হতে পারে। তাই এসব জাহাজের সরঞ্জাম, অবস্থান ও সংগৃহীত তথ্য নিরাপত্তা বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।
তাইওয়ানের পূর্বের জলসীমা কেন গুরুত্বপূর্ণ
তাইওয়ানের পূর্বে চীনা গবেষণা জাহাজ বিশেষভাবে সক্রিয়। কোনো সংঘাতে ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপ করলে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে এগিয়ে আসা মার্কিন বাহিনী এই পথ ব্যবহার করতে পারে। হাডসন ইনস্টিটিউটের সেন্টার ফর ডিফেন্স কনসেপ্টস অ্যান্ড টেকনোলজির পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ ফেলো ব্রায়ান ক্লার্ক বলেন, অবরোধ বা মার্কিন হস্তক্ষেপ ঠেকানোর চেষ্টায় ব্যবহৃত চীনা সাবমেরিন ও পানির নিচের ড্রোনকে সমুদ্রতলের বিস্তারিত তথ্য সহায়তা করতে পারে।
সাবমেরিনের ক্রুদের শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠের মানচিত্র জানলেই চলে না। পানির নিচের শৈলশিরা, খাদ ও গভীরতার পরিবর্তন জাহাজটি কোথায় চলতে পারবে তা নির্ধারণ করে। পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোতও পানির নিচের অভিযান এবং সোনারের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলে। সোনার শব্দ ব্যবহার করে পানির নিচের বস্তু শনাক্ত করে।
মে মাসে জাপান ও ফিলিপাইন দ্বীপটির পূর্বে পরস্পরের সঙ্গে মিলে যাওয়া সামুদ্রিক সীমানা নিয়ে আলোচনার ঘোষণা দেওয়ার পর তাইওয়ানের আশপাশে চীনের জরিপ তৎপরতা বেড়ে যায়। বেইজিং ওই আলোচনা অবৈধ বলে আখ্যা দেয় এবং নিজেদের দাবি জোরালো করতে কোস্ট গার্ডের মহড়া চালায়।
চীনা গবেষণা জাহাজ নিয়ে কাজ করা হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের গবেষণা সহকারী অ্যালেন ঝ্যাং বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়াকে বৃহত্তর চাপ সৃষ্টির অভিযানের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, সীমানা নিয়ে আলোচনা ছিল এমন তৎপরতা চালানোর অজুহাত, যা চীন আগে থেকেই করতে চাইছিল।
গবেষণা জাহাজ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাষায় ‘গ্রে জোন’ কৌশলের অংশ—অর্থাৎ প্রকাশ্য যুদ্ধের পর্যায়ে না গিয়ে চাপ প্রয়োগ। তাইওয়ানের আশপাশে জরিপ জাহাজগুলো বৃহত্তর চীনা সামুদ্রিক উপস্থিতির পাশাপাশি কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে কোস্ট গার্ডের জাহাজ ও রাষ্ট্রীয় নির্দেশে কাজ করছে বলে সন্দেহ করা মাছ ধরার নৌকা।
সমুদ্রতলের জরিপ কীভাবে পানির নিচের অভিযানে কাজে লাগে
গবেষণা জাহাজ মাল্টিবিম সোনার ব্যবহার করে পাখার মতো ছড়িয়ে শত শত শব্দতরঙ্গ পাঠায়। প্রতিধ্বনি ফিরে আসার সময় মেপে যন্ত্রটি সমুদ্রের বিস্তৃত অংশের গভীরতা ও তলদেশের আকৃতির চিত্র তৈরি করে। বারবার সমান্তরাল পথে চললে জাহাজটি নিয়ম মেনে আরও বড় এলাকা জরিপ করতে পারে।
অন্য যন্ত্রপাতি স্রোত মাপে বা সমুদ্রতলের নিচের ভূতাত্ত্বিক স্তরের ছবি তোলে। দূরনিয়ন্ত্রিত যান ও স্বয়ংক্রিয় পানির নিচের যান গভীর থেকে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। জরিপের তথ্য জাহাজেই প্রক্রিয়াজাত করা যায়, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে গবেষণাগারে পাঠানো যায়, অথবা জাহাজ বন্দরে ফেরার পর পরীক্ষা করা যায়।
ক্লার্ক বলেন, স্বয়ংক্রিয় যানের জন্য সমুদ্রতলের নির্ভুল মানচিত্র বিশেষভাবে কার্যকর। পানির নিচের ড্রোন তার অনুভূত ভূপ্রকৃতির সঙ্গে সংরক্ষিত মানচিত্র মিলিয়ে নিজের অবস্থান নির্ণয়ে সহায়তা পেতে পারে। পানির নিচে স্যাটেলাইট নেভিগেশন সংকেত পাওয়া যায় না। তাই পানির ওপরে না উঠেই চলতে পারে এমন যান দীর্ঘ সময় আড়ালে থাকতে পারে।
তাইওয়ান নিজেদের প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে সামুদ্রিক ড্রোনে বিনিয়োগ করছে। তাই তাদের মানচিত্র তৈরির উদ্যোগের একাডেমিক গবেষণার পাশাপাশি ব্যবহারিক উদ্দেশ্যও রয়েছে: এসব ব্যবস্থা যে পরিবেশে কাজ করবে, তা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া।
জাহাজের গতিবিধি নিয়ে গবেষণায় কী মাপা হয়েছে
স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ সেন্টারের ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ৪৮টি দেশের ২২৩টি গবেষণা জাহাজের তুলনা করা হয়েছে। গবেষণায় জাহাজগুলোর গতিবিধি ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা হয়। উচ্চ সমুদ্রে সমুদ্রতলের অবকাঠামোর কাছাকাছি জাহাজগুলো মোট পর্যবেক্ষিত সময়ের কতটা কাটিয়েছে তা হিসাব করতে গবেষকেরা অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেমের তথ্য ব্যবহার করেন। এই ব্যবস্থায় জাহাজগুলো নিজেদের অবস্থানসংক্রান্ত বার্তা সম্প্রচার করে।
গবেষণায় মানচিত্রে চিহ্নিত সাবমেরিন টেলিযোগাযোগ কেবল বা গ্যাস পাইপলাইনের এক কিলোমিটারের মধ্যে থাকাকে নিকটবর্তী অবস্থান হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। নমুনায় অন্তর্ভুক্ত করার আগে গবেষকেরা জাহাজের ধরন ও শনাক্তকারী নম্বর যাচাই করেন। কিছু জাহাজের গতিবিধির রেকর্ডে ফাঁক ছিল।
তুলনামূলক দলের জাহাজগুলোর চেয়ে চীনা জাহাজগুলো পর্যবেক্ষিত সময়ের বেশি অংশ এই অবকাঠামোর কাছে কাটিয়েছে। ২০২৪ সালে সাতটি চীনা গবেষণা জাহাজ নমুনার ৮০তম পার্সেন্টাইলের চেয়ে ওপরে ছিল—অর্থাৎ ওই পরিমাপে তারা শীর্ষ প্রায় এক-পঞ্চমাংশের মধ্যে ছিল।
বেশির ভাগ জাহাজ বছরে তাদের পর্যবেক্ষিত সময়ের ১ শতাংশেরও কম অবকাঠামোর কাছে কাটিয়েছে। কিছু বছরে মার্কিন গবেষণা জাহাজও শীর্ষের কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। পরিসংখ্যানের মডেলটি উপাত্তের তারতম্যের প্রায় ১.৩ শতাংশ ব্যাখ্যা করতে পেরেছে। ফলে জাহাজের চলাচলের মধ্যে থাকা বেশির ভাগ পার্থক্যের ব্যাখ্যা মেলেনি।
গবেষণায় পর্যবেক্ষিত সময়ের অনুপাত মাপা হয়েছে। ফলে কোনো জাহাজের অবস্থান নির্ভর করেছে অবকাঠামোর কাছে কাটানো সময় এবং তার মোট রেকর্ড করা কার্যক্রম—দুটির ওপরই। ১,১৭৭টি পরিসংখ্যানগত পর্যবেক্ষণ বলতে ২২৩টি জাহাজের মধ্য থেকে নির্দিষ্ট বছরে নির্দিষ্ট জাহাজের রেকর্ড বোঝানো হয়েছে।
দুটি জাহাজে ভৌগোলিক বিস্তারের চিত্র
গবেষণায় শিয়াং ইয়াং হং ০৬ এবং ক্যে শ্যু জাহাজ দুটি বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। এদের চলাচলের পথ তাইওয়ান ঘিরে উদ্বেগকে প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক বিস্তৃত এলাকার সঙ্গে যুক্ত করেছে। ক্যে শ্যুর ক্ষেত্রে এর মধ্যে বেরিং সাগরও রয়েছে।
শিয়াং ইয়াং হং ০৬ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে গুয়ামের আন্তর্জাতিক জলসীমায় তিনটি অভিযান চালায়। এর বারবার সমান্তরাল পথে চলার স্থানগুলো এপ্রিকট ও এএজি টেলিযোগাযোগ কেবলের মানচিত্রভুক্ত পথের কাছাকাছি ছিল। প্রাথমিক জরিপের এলাকাগুলো নির্দিষ্ট কিছু সমুদ্রতলের খনিজের সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত অঞ্চলগুলোর বাইরে ছিল।
জুলাইয়ের মধ্যে জাহাজটির জরিপ এলাকা এসিসি-১, এএজি ও সি-ইউএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পথ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এসিসি-১ তখনো পরিকল্পনাধীন ছিল, ফলে এটি চালু সংযোগ নয়, বরং সম্ভাব্য কেবলপথ। আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে জরিপ খনিজের সম্ভাবনাময় বলে বিবেচিত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকেরা ধারণা করেন, এই তৎপরতার পেছনে খনিজ অনুসন্ধানের ভূমিকা আরও জোরালো হয়ে উঠেছিল।
ক্যে শ্যু ২০২৪ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে বারবার ওকিনোতোরিশিমার পশ্চিমে চলাচল করে। এটি টিজিএন-আইএ, এপ্রিকট ও জুপিটার কেবলের মানচিত্রভুক্ত পথের কাছাকাছি বা সেগুলোর ওপর দিয়ে গেছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে এটি জাপান সাগর ও সুকারু প্রণালি পেরিয়ে বেরিং সাগরের দিকে যায়। এ সময় রাশিয়ার পোলার এক্সপ্রেস ব্যবস্থা-সহ আন্তর্জাতিক কেবলগুলোর কাছে জরিপের চিহ্ন দেখা যায়।
চীনা তৎপরতা বাড়ার যে গ্রীষ্মের কথা বিবরণে বলা হয়েছে, সে সময় ক্যে শ্যুকে তাইওয়ানের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমে কেবলের কাছেও দেখা গেছে। এসব পৃথক অভিযানের নির্দেশ, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও সংগৃহীত তথ্য সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।
কেবল নিরাপত্তা কেন তাইওয়ানের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়
সমুদ্রতলের টেলিযোগাযোগ কেবল আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট যোগাযোগ বহন করে। কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তথ্য অন্য পথে পাঠাতে হয়, ফলে যাতায়াতের দূরত্ব ও পৌঁছাতে লাগা সময়—দুটিই বাড়ে। একাধিক সংযোগ বিঘ্নিত হলে সচল থাকা কেবলগুলোর ওপর অনেক বেশি চাপ পড়তে পারে।
চীন কৌশলগত ঝুঁকি ইনস্টিটিউট যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পর্যালোচনা কমিশনের জন্য সেপ্টেম্বরে একটি মূল্যায়ন তৈরি করে। এতে সম্ভাব্য বিঘ্নের ঝুঁকি অনুযায়ী প্রশান্ত মহাসাগরীয় কেবল ব্যবস্থাগুলোর ক্রম নির্ধারণ করা হয়। তাদের ট্রান্স-প্যাসিফিক কেবল গ্রে জোন ভলনারেবিলিটি ইনডেক্সে পানির গভীরতা, জাহাজ চলাচল, মালিকানা, চীনের সামুদ্রিক দাবির নৈকট্য এবং তাইওয়ানের সঙ্গে সংযোগ বিবেচনা করা হয়।
ট্রান্স-প্যাসিফিক এক্সপ্রেস প্রথম স্থানে ছিল। আংশিকভাবে ভেরাইজনের মালিকানাধীন ই২এ ছিল দ্বিতীয়, গুগলের টিপিইউ তৃতীয় এবং মেটার অর্কা পঞ্চম স্থানে। ই২এ, টিপিইউ ও অর্কার কাজ তখনো চলছিল। ভৌগোলিক অবস্থান, বিতর্কিত জলসীমা ও ব্যস্ত নৌপথের কারণে তাইওয়ান, জাপান ও ফিলিপাইনকে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
মূল্যায়নের মডেলে দেখা গেছে, কোনো বড় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে যুক্তরাষ্ট্র ও পূর্ব এশিয়ার মধ্যে তথ্য চলাচল দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে পারে। একসঙ্গে একাধিক সংযোগ বিকল হলে উপলভ্য সক্ষমতার সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে ক্লাউড সেবা, আর্থিক লেনদেন এবং দ্রুত যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য কাজে।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সাবেক সাবমেরিন কর্মকর্তা ক্লার্ক বলেন, জবরদস্তিমূলক অভিযানে সহায়তার জন্য চীন পানির নিচের অবকাঠামো সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে। সম্ভাব্য উদ্দেশ্যটি তিনি এভাবে ব্যাখ্যা করেন:
তারা সমুদ্রতলের অবকাঠামোটি দেখতে কেমন, তা জানার চেষ্টা করছে। কারণ, জবরদস্তির অভিযানের অংশ হিসেবে বাইরের যোগাযোগ থেকে তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন করার সক্ষমতা তারা হয়তো চায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের আশপাশে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কয়েকটি ঘটনায় চীনা জাহাজের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। বিশ্বজুড়ে মাছ ধরার সরঞ্জাম, নোঙর ও প্রাকৃতিক ঘটনায় বেশির ভাগ সাবমেরিন কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কংগ্রেসের মূল্যায়নে মিত্রদের সামুদ্রিক নজরদারি বাড়ানো, বিকল্প কেবল সংযোগ রাখা, ঘটনায় সমন্বিত সাড়া দেওয়া এবং মেরামতের সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। মেরামতের জাহাজের বহর পুরোনো ও সীমিত হওয়ায় বড় ধরনের বিঘ্নের পর সংযোগ পুনরুদ্ধারে দেরি হতে পারে।
জাহাজ বাড়ানোর বাইরেও তাইওয়ানের উদ্যোগ
তাইওয়ানের পাঁচটি সক্রিয় গবেষণা জাহাজ কয়েকটি সংস্থার অধীনে রয়েছে: তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করে, একটি সরকার-সমর্থিত তাইওয়ান ওশান রিসার্চ ইনস্টিটিউট পরিচালনা করে এবং একটি নৌবাহিনীর। আগস্টে পানিতে নামানো দুটি জাহাজ ওশান অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের অধীন আরেকটি প্রতিষ্ঠানের জন্য তৈরি করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে এই সম্প্রসারণকে সরাসরি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেন:
নিজেদের সামুদ্রিক পরিবেশ সম্পর্কে আরও পূর্ণাঙ্গ ধারণা অর্জন করলেই কেবল আমরা জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা করতে পারব।
কাওশিউংয়ে অবস্থিত ন্যাশনাল একাডেমি অব মেরিন রিসার্চ ২০২৯ সালে একটি বড় গবেষণা জাহাজ পানিতে নামানোর পরিকল্পনা করেছে। এর প্রেসিডেন্ট চেন চুং-লিং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তথ্য একত্র করে একটি সামুদ্রিক তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা বলেন:
আমরা এই বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলো একত্র করতে চাই, ধীরে ধীরে উপাত্ত সংগ্রহ করতে চাই, নিজেদের তথ্য যোগ করতে চাই এবং একটি সামুদ্রিক তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে চাই।
উপকূলের কাছাকাছি জলসীমা জরিপে তাইওয়ানের এখনো সুবিধা রয়েছে, কারণ সেখানে চীনা গবেষণা জাহাজের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তবে উপকূল থেকে দূরের জলসীমায় ১২০টির বেশি গবেষণা জাহাজের চীনা বহরকে বিস্তীর্ণ এলাকায় বারবার তথ্য সংগ্রহের অনেক বেশি সক্ষমতা দেয়।
তাইওয়ান ওশান রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক লিয়াও তে-ইউ বলেন, তাইওয়ানের গবেষণা বহর মূলত একাডেমিক স্বার্থে কাজ করে, যা সব সময় প্রতিরক্ষার প্রয়োজনের সঙ্গে মেলে না। জাহাজের সংখ্যা বাড়লে তথ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়বে। তবে কোথায় জরিপ চালানো হবে এবং ফলাফল কীভাবে একত্র করা হবে, তার ওপর নির্ভর করবে প্রতিরক্ষায় এসব তথ্যের কার্যকারিতা।
জরিপ ও প্রতিক্রিয়ার সময়রেখা
ঘটনাগুলো কয়েকটি সময়পর্বজুড়ে বিস্তৃত। জাহাজ নিয়ে বিস্তারিত ঘটনাগুলো ২০২৪ সালের। আর বৃহত্তর পরিসংখ্যানগত গবেষণায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জাহাজের চলাচল অনুসরণ করা হয়েছে।
- ফেব্রুয়ারি থেকে মে ২০২৪: শিয়াং ইয়াং হং ০৬ গুয়ামের কাছে মানচিত্রভুক্ত কেবলপথের আশপাশে তিনটি অভিযান চালায়।
- মার্চ থেকে মে ২০২৪: ক্যে শ্যু ওকিনোতোরিশিমার পশ্চিমে কয়েকটি টেলিযোগাযোগ কেবলপথের কাছে বারবার চলাচল করে।
- জুলাই ২০২৪ থেকে: ক্যে শ্যু জাপান সাগর ও সুকারু প্রণালি পেরিয়ে বেরিং সাগরের দিকে যায়।
- আগস্ট থেকে অক্টোবর ২০২৪: শিয়াং ইয়াং হং ০৬ খনিজের সম্ভাবনাময় বলে বিবেচিত এলাকায় জরিপ বাড়ায়।
- ৮ অক্টোবর ২০২৬: ২২৩টি গবেষণা জাহাজের তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়।
- ২০২৯: তাইওয়ানের ন্যাশনাল একাডেমি অব মেরিন রিসার্চ একটি বড় গবেষণা জাহাজ পানিতে নামানোর পরিকল্পনা করেছে।
চীনের তৎপরতা পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি নিজেদের সামুদ্রিক জ্ঞান বাড়ানোই তাইওয়ানের তাৎক্ষণিক কাজ। কেবলের স্থিতিস্থাপকতা আরেকটি ব্যবহারিক অগ্রাধিকার: কোনো বড় পথ বিচ্ছিন্ন হলে বিকল্প সংযোগ ও মেরামতের সংস্থান যেন পাওয়া যায়।
মূল বিষয়গুলো
- চীনা গবেষণা জাহাজ তাইওয়ানের দক্ষিণ ও পূর্বের জলসীমা জরিপ করছে, যা অবরোধ বা সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
- তাইওয়ানের কোস্ট গার্ডের হিসাবে চীনের গবেষণা বহরে ১২০টির বেশি জাহাজ রয়েছে। বিপরীতে, তাইওয়ানের সামুদ্রিক গবেষণায় সক্রিয় জাহাজের সংখ্যা পাঁচটি।
- ২২৩টি জাহাজ নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, তুলনামূলক দলের চেয়ে চীনা জাহাজগুলো পর্যবেক্ষিত সময়ের বেশি অংশ সমুদ্রতলের মানচিত্রভুক্ত অবকাঠামোর কাছে কাটিয়েছে।
- বিস্তারিত ঘটনাগুলোতে শিয়াং ইয়াং হং ০৬ ও ক্যে শ্যুকে গুয়ামের আশপাশে, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে এবং বেরিং সাগর পর্যন্ত কেবলপথের কাছে দেখা যায়।
- তাইওয়ান আগস্টে আরও দুটি গবেষণা জাহাজ পানিতে নামিয়েছে। ২০২৯ সালে আরও বড় একটি জাহাজ নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
- কেবল সুরক্ষার সুপারিশের মধ্যে রয়েছে বিকল্প সংযোগ, সামুদ্রিক নজরদারি, সমন্বিত সাড়া এবং মেরামতের সক্ষমতা বাড়ানো।






