জাতীয় রেকর্ডে ক্যানসারের প্রবণতা স্থিতিশীল থাকার তথ্য
৩৬,০২৪,৩৯৪ জনকে নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় করা এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোভিড-১৯ টিকাদান ব্যাপক হওয়ার পরের ৫০ মাসে ১৩ ধরনের ক্যানসারের প্রকোপের প্রবণতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। এক বছর পর টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ক্যানসার শনাক্তের হার বেড়েছে বলে আগের একটি ছোট গবেষণায় দাবি ওঠার পর যে উদ্বেগ ছড়িয়েছিল, নতুন এই ফলাফল তার জবাব দেয়।
সূচিপত্র
- জাতীয় রেকর্ডে ক্যানসারের প্রবণতা স্থিতিশীল থাকার তথ্য
- বৃহত্তর বিশ্লেষণে কী পরিমাপ করা হয়েছে
- ২০২৫ সালের গবেষণায় বিতর্কের সূত্রপাত
- শুরুর তারিখ কেন গুরুত্বপূর্ণ
- স্ক্রিনিং বাড়লে রোগনির্ণয়ও বাড়তে পারে
- টিকার তুলনায় কী পাওয়া গেছে
- দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ কেন জরুরি
- ক্যানসারের ভয় নিয়ে চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা
- প্রমাণ যেভাবে গড়ে উঠেছে
- মূল বিষয়গুলো
গবেষণায় ১৯৫৫ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা পরিষেবার রেকর্ডের সঙ্গে কোভিড-১৯ টিকাদানের রেকর্ড মিলিয়ে দেখা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রথম ডোজ নেওয়ার হার ৫০ শতাংশ ছাড়ানোর সময়, অর্থাৎ ২০২১ সালের আগস্টকে, বিভাজনবিন্দু ধরে পরের ৫০ মাসের তথ্যের সঙ্গে আগের এক দশকের বেশি সময়ের ক্যানসারের প্রবণতা তুলনা করেন গবেষকেরা।
কোরিয়া ইউনিভার্সিটি কলেজ অব মেডিসিনের প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাবিদ্যার অধ্যাপক জং জে-হুন ২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর কোরিয়া সায়েন্স মিডিয়া সেন্টারের এক ব্রিফিংয়ে ফলাফল উপস্থাপন করেন। ১৩টি বিভাগেই ক্যানসারের প্রকোপের মাত্রায় উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন কিংবা বৃদ্ধির হারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন—কোনোটিই পাননি গবেষকেরা।
গণটিকাদানের আগেও ক্যানসার শনাক্তের হার ধীরে ধীরে বাড়ছিল; জং এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার সঙ্গে জনসংখ্যার বার্ধক্যের সম্পর্ক দেখেছেন। মেসেঞ্জার আরএনএ প্রযুক্তির টিকা ও ভাইরাল ভেক্টর টিকার তুলনা করে করা দ্বিতীয় বিশ্লেষণেও ১২ ধরনের ক্যানসারে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
উদ্বেগটি যাচাইয়ের দুটি কার্যকর উপায় একত্র করেছে নতুন ফলাফল: বৃহৎ জনগোষ্ঠীতে ক্যানসারের ধরন ও প্রবণতা বদলেছে কি না দেখা এবং টিকার প্রযুক্তিভেদে ফলাফলে পার্থক্য ছিল কি না পরীক্ষা করা। জং বলেন, অনেক ক্যানসার বিকশিত হতে কয়েক বছর লাগে বলে পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া জরুরি।
বৃহত্তর বিশ্লেষণে কী পরিমাপ করা হয়েছে
জাতীয় প্রবণতা বিশ্লেষণে ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রেকর্ড ব্যবহার করে মাসভিত্তিক ক্যানসারের প্রকোপ পরীক্ষা করা হয়। মানুষ টিকা নেওয়ার পর ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে কি না, শুধু সেটি দেখার বদলে টিকাদান সাধারণ হওয়ার পর ক্যানসারের প্রবণতার গতিপথ বদলেছিল কি না, সেটিই ছিল মূল প্রশ্ন।
জনসংখ্যার গড় বয়স বাড়তে থাকা দেশে এ পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ। টিকাদানের আগেই যদি ক্যানসার শনাক্তের হার বাড়তে থাকে, তাহলে পরের সময়ের তথ্যকে সেই চলমান প্রবণতার সঙ্গে তুলনা করা দরকার। বিভিন্ন বছরের মোট সংখ্যা সরাসরি তুলনা করলে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব ধরা পড়বে না; সাধারণত বয়স্কদের ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি।
কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রে শনাক্তের হার অল্প সময়ের জন্য বেড়েছিল, পরে আগের প্রবণতার কাছাকাছি ফিরে আসে। সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে যাওয়া ও স্ক্রিনিং আবার বাড়ায় এই সাময়িক উল্লম্ফন ঘটেছে বলে গবেষক দল মনে করেছে। যাঁদের পরীক্ষা পিছিয়ে গিয়েছিল, তাঁদের ক্যানসার শনাক্তের সময়ও কাছাকাছি চলে আসতে পারে।
প্রবণতা বিশ্লেষণটি প্রকাশিত হয় Biomarker Research-এ। টিকার প্রযুক্তির তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয় Journal of Korean Medical Science-এ। দুটি গবেষণাই পর্যবেক্ষণমূলক; অর্থাৎ, গবেষকেরা মানুষকে দৈবভাবে বিভিন্ন টিকা নিতে বা টিকা না নিতে নির্ধারণ না করে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত রেকর্ড পরীক্ষা করেছেন।
২০২৫ সালের গবেষণায় বিতর্কের সূত্রপাত
আগের গবেষণাপত্রটি ২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর Biomarker Research-এ প্রকাশিত হয়। এতে ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার স্বাস্থ্যবিমার রেকর্ড পরীক্ষা করা হয়। প্রাথমিক তথ্যভান্ডারে প্রায় ৮৪ লাখ মানুষ ছিলেন; বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মিলিয়ে তুলনার পর টিকা নেওয়া প্রায় ২৩ লাখ ৮০ হাজার এবং টিকা না নেওয়া ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষের তথ্য অন্তর্ভুক্ত হয়।
লেখকেরা জানান, টিকা নেওয়ার পর এক বছরে পাকস্থলী, কোলোরেক্টাল, ফুসফুস ও স্তন ক্যানসারসহ কয়েক ধরনের ক্যানসার শনাক্তের হার বেশি ছিল। তাঁদের হিসাবে, প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্তের হার ৬৯ শতাংশ এবং ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্তের হার ৫৩ শতাংশ বেশি ছিল।
এই শতাংশগুলো দুই দলের তুলনা বোঝায়। আপেক্ষিক হার ৬৯ শতাংশ বেশি হওয়ার অর্থ তুলনামূলক হারের ১.৬৯ গুণ; প্রতি ১০০ জন টিকা নেওয়া মানুষের মধ্যে ৬৯টি অতিরিক্ত ঘটনা নয়। অতিরিক্ত কতজনের ক্যানসার শনাক্ত হয়েছে তা বুঝতে হলে মূল ক্যানসার শনাক্তের হারও জানতে হয়।
বয়স, লিঙ্গ ও কিছু স্বাস্থ্যগত অবস্থা সহ পরিমাপ করা বৈশিষ্ট্যগুলোতে দল দুটিকে আরও কাছাকাছি আনতে গবেষণায় মিলিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তবে কারা কোন দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, পর্যবেক্ষণ কখন শুরু হয়েছে এবং অংশগ্রহণকারীরা কত ঘন ঘন চিকিৎসা নিতে পারেন—এসব ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়ে গেছে বলে সমালোচকেরা উল্লেখ করেন।
২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর সাময়িকীটি সম্পাদকীয় উদ্বেগের নোট যোগ করে। লেখকেরাও সম্পূরক তথ্যে স্বীকার করেন, বেশির ভাগ কঠিন টিউমার মূল্যায়নের জন্য এক বছর তুলনামূলকভাবে কম সময় এবং নজরদারিজনিত পক্ষপাত বা বিপরীত কার্যকারণ তাঁদের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। বিপরীত কার্যকারণ বলতে বোঝায়, আগে থেকেই বিকশিত হতে থাকা অসুস্থতা এমন কোনো ঘটনাকে প্রভাবিত করতে পারে, যেটিকে গবেষকেরা পরে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে পরীক্ষা করছেন।
শুরুর তারিখ কেন গুরুত্বপূর্ণ
মেদেয়া লোক্যে ও তাঁর সহকর্মীরা ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ প্রকাশিত Frontiers in Public Health-এ প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় আগের গবেষণার পদ্ধতি বিশ্লেষণ করেন। টিকা নেওয়া ও না নেওয়া অংশগ্রহণকারীদের পর্যবেক্ষণ শুরুর তারিখ আলাদা হওয়াকে তাঁরা বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
টিকা নেওয়া অংশগ্রহণকারীদের ক্ষেত্রে টিকা নেওয়ার তারিখ থেকে পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছিল, কিন্তু টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের জন্য শুরুর তারিখ ধরা হয়েছিল ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি। এই পার্থক্যে কোন রোগনির্ণয় গণনায় আসবে, তা বদলে যেতে পারে। ২০২১ সালে টিকা নেওয়ার পর শনাক্ত হওয়া ক্যানসার টিকা নেওয়া দলের ফলাফলে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে; অন্যদিকে, ২০২২ সালের জানুয়ারির আগে টিকা না নেওয়া কোনো ব্যক্তির ক্যানসার শনাক্ত হলে তাঁকে গবেষণা থেকে বাদ দেওয়া হতে পারে।
গুস্তাভ রুসি ইনস্টিটিউট এবং সেন্টার ফর রিসার্চ ইন এপিডেমিওলজি অ্যান্ড পপুলেশন হেলথের মহামারিবিদ ও জৈবপরিসংখ্যানবিদ ড্যান শালতিয়েল একে ‘ইমমর্টাল টাইম বায়াস’ বা ‘অমর সময়জনিত পক্ষপাত’ বলে বর্ণনা করেন। সহজভাবে বললে, গবেষণার নিয়মের কারণে এমন একটি সময় তৈরি হতে পারে, যখন কোন দলে আছেন তার ওপর নির্ভর করে রোগনির্ণয় আলাদাভাবে গণনা হয়।
লোক্যে ও তাঁর সহকর্মীরা ক্যালেন্ডারের সময়গত পার্থক্যের কথাও তুলে ধরেন। মহামারির সময় স্ক্রিনিংয়ের সুযোগ, সংক্রমণের ঢেউ এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার ধরন বদলেছে। টিকাদানের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার আগেই, ভিন্ন সময়ে পর্যবেক্ষণ শুরু হলে দল দুটি ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে।
পর্যালোচনায় সময়ের সঙ্গে টিকা নেওয়ার অবস্থার পরিবর্তন বিবেচনায় রাখে এবং যোগ্যতা ও পর্যবেক্ষণের সময় আরও ভালোভাবে সমন্বয় করে—এমন পদ্ধতির সুপারিশ করা হয়। ন্যায্যতর তুলনায় একই ধরনের মানুষকে তুলনীয় শুরুর সময় থেকে একই নিয়মে অনুসরণ করা হবে।
স্ক্রিনিং বাড়লে রোগনির্ণয়ও বাড়তে পারে
লোক্যে ও তাঁর সহকর্মীদের পর্যালোচনায় দক্ষিণ কোরিয়ার থাইরয়েড, স্তন, পাকস্থলী ও কোলোরেক্টাল ক্যানসার স্ক্রিনিং কর্মসূচির কথাও উঠে আসে। যাঁরা বেশি ঘন ঘন চিকিৎসাসেবা নেন, তাঁদের শরীরে উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই বিদ্যমান ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার সুযোগও বেশি থাকে।
টিকা নেওয়া ও না নেওয়া ব্যক্তিদের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগ্রহ বা সুযোগে পার্থক্য থাকতে পারে। শনাক্তকরণের এই পার্থক্যকে গবেষকেরা নজরদারিজনিত পক্ষপাত বলেন। উদাহরণস্বরূপ, দুই দলে টিউমার বিকশিত হওয়ার সংখ্যা কাছাকাছি হলেও, যে দলের বেশি পরীক্ষা হয়, স্বল্পমেয়াদি গবেষণায় তাদের ক্ষেত্রে বেশি রোগনির্ণয় নথিভুক্ত হতে পারে।
আগের গবেষণাটিতে দল দুটির মধ্যে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা একই ছিল, এমন কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। লোক্যে ও তাঁর সহকর্মীরা ধূমপান, মদ্যপান, পারিবারিক ইতিহাস, জিনগত প্রবণতা এবং স্ক্রিনিংয়ের হারসহ এমন কিছু বিষয়ও চিহ্নিত করেন, যেগুলো পরিমাপ করা হয়নি বা যথেষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি।
পর্যালোচনায় বলা হয়, আয়ের পার্থক্যও রয়ে গিয়েছিল; মানসম্মত গড় পার্থক্য ছিল ০.০৯। আয় স্ক্রিনিংয়ের সুযোগ এবং স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়, দুই দলের ৭৭.২২ শতাংশের আগের SARS-CoV-2 সংক্রমণের রেকর্ড ছিল এবং আগে সংক্রমিত ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে সংবেদনশীলতা বিশ্লেষণের সুপারিশ করা হয়।
নতুন জাতীয় বিশ্লেষণ থেকে এ-সংশ্লিষ্ট আরেকটি পর্যবেক্ষণ পাওয়া গেছে: বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার পর চিকিৎসকের কাছে যাওয়া ও স্ক্রিনিং ফিরলে কিছু ক্যানসার শনাক্তের হার সাময়িকভাবে বেড়েছিল। লেখকেরা এই প্রবণতাকে বিলম্বিত রোগনির্ণয় পরে ধরা পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করেছেন।
টিকার তুলনায় কী পাওয়া গেছে
জংয়ের দ্বিতীয় বিশ্লেষণে ১২ ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে এমআরএনএ টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে ভাইরাল ভেক্টর টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের তুলনা করা হয়। হিসাব করা ঝুঁকি অনুপাত ছিল ০.৮৭ থেকে ১.০৮-এর মধ্যে; কোনো পার্থক্যই পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না।
ঝুঁকি অনুপাত দিয়ে সময়ের সঙ্গে দুই দলে কোনো ফলাফল কত ঘন ঘন ঘটেছে, তা তুলনা করা হয়। মান ১ হলে দুই দলের আনুমানিক হার একই। তাই ক্যানসারের ধরনভেদে এই পরিসর ১৩ শতাংশ কম থেকে ৮ শতাংশ বেশি পর্যন্ত আনুমানিক হার বোঝায়, তবে টিকার দুই প্রযুক্তির মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল না।
মেসেঞ্জার আরএনএ টিকা কোষে সাময়িক নির্দেশনা দেয়, যার সাহায্যে কোষ এমন একটি প্রোটিন তৈরি করে যা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রস্তুত করে। ভাইরাল ভেক্টর টিকা নির্দেশনা পৌঁছে দিতে পরিবর্তিত ভাইরাস ব্যবহার করে। দুটি প্রযুক্তির টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের তুলনা করে টিকা গ্রহণকারীদের মধ্যে ক্যানসারের প্রবণতা যাচাইয়ের আরেকটি উপায় পান গবেষকেরা।
নতুন দুটি বিশ্লেষণ ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়। একটিতে ব্যাপক টিকাদানের আগে ও পরের সময়ে পুরো জনগোষ্ঠীর প্রবণতা অনুসরণ করা হয়েছে; অন্যটিতে ভিন্ন প্রযুক্তির টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ফলাফল তুলনা করা হয়েছে। তাদের সামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফল থেকে গবেষণার সময়কালে ক্যানসারের প্রবণতা স্থিতিশীল ছিল—এমন মূল্যায়ন আরও জোরালো হয়।
দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ কেন জরুরি
গবেষণার ফলাফলের ওপর আস্থা কতটা রাখা যায় তা মূল্যায়নে ব্যবহৃত GRADE কাঠামো অনুসারে, লোক্যে ও তাঁর সহকর্মীরা ২০২৫ সালের গবেষণাটিকে নিম্নমানের প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেন। পর্যবেক্ষণমূলক নকশা, পক্ষপাতের ঝুঁকি এবং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অবশিষ্ট পার্থক্য ছিল তাঁদের উল্লেখ করা কারণগুলোর মধ্যে।
একাধিক তুলনার জন্য সংশোধন না করেই ক্যানসারের বিভিন্ন ধরন ও উপদলের ওপর ৩০টি বিশ্লেষণ করা হয়েছিল বলেও পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়। অনেকগুলো পরিসংখ্যানগত পরীক্ষা করলে কাকতালীয়ভাবে আপাতদৃষ্টিতে তাৎপর্যপূর্ণ ফল পাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এই ঝুঁকি হিসাব করতে পরিসংখ্যানগত সংশোধন সাহায্য করে।
শালতিয়েল পর্যবেক্ষণ করেন, আগের গবেষণায় ক্যানসারের প্রকোপের রেখাগুলো প্রথম প্রায় ছয় মাসে আলাদা হয়ে যায়, এরপর সমান্তরাল থাকে। তাঁর প্রশ্ন ছিল পরিসংখ্যান মডেলের কিছু অনুমান নিয়েও; মডেলটিতে ধরে নেওয়া হয়েছিল, দুই দলের রোগনির্ণয়ের হারের সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে ধারাবাহিক থাকবে।
অনেক কঠিন টিউমার রোগনির্ণয়ের আগে দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে বিকশিত হয়। লোক্যে ও তাঁর সহকর্মীরা আরও বিশ্লেষণে অন্তত প্রথম ৬ থেকে ১২ মাসের রোগনির্ণয় বাদ দেওয়া এবং অংশগ্রহণকারীদের অন্তত ১০ বছর অনুসরণ করার সুপারিশ করেন।
স্বাস্থ্য রেকর্ড যতটা সম্ভব ব্যবহার করে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের অনুকরণে একটি বিশ্লেষণের প্রস্তাবও দেন একই লেখকেরা। এতে তুলনামূলক দলগুলোর শুরুর অবস্থা সমন্বয় করা হবে, টিকা নেওয়ার অবস্থার পরিবর্তন বিবেচনায় রাখা হবে, স্বাস্থ্যসেবার ব্যবহার মিলিয়ে দেখা হবে এবং যুক্তিসংগত ভিন্ন অনুমানেও ফল একই থাকে কি না পরীক্ষা করা হবে।
জংও দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতীয় প্রবণতার ফলাফলে ২০২১ সালের আগস্টের বিভাজনবিন্দুর পরের ৫০ মাস অন্তর্ভুক্ত, আর পর্যালোচনায় প্রস্তাবিত পর্যবেক্ষণকাল অন্তত এক দশক। এমন অনুসরণের কাজ কবে শেষ হবে, তা জানানো হয়নি।
ক্যানসারের ভয় নিয়ে চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা
গাছন ইউনিভার্সিটি গিল মেডিকেল সেন্টারের সংক্রামক রোগবিষয়ক অধ্যাপক ওম জুং-সিক বলেন, ক্যানসার নিয়ে দাবিগুলো বয়স্ক রোগী এবং যাঁদের অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্যসমস্যায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের সঙ্গে টিকাদান নিয়ে আলোচনা কঠিন করে তুলেছিল। কেউ কেউ টিকা নিতে অস্বীকার করেন, আবার কেউ এ নিয়ে গভীর উদ্বেগে ভোগেন।
ওম বলেন, গত দুই থেকে তিন বছরে তাঁর দেখা বেশির ভাগ রোগী, যাঁদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করতে হয়েছিল বা যাঁরা কোভিড-১৯-এ গুরুতর অসুস্থ হয়েছিলেন, তাঁরা সাম্প্রতিক সময়ে টিকা নেননি। তাঁর বক্তব্য চিকিৎসক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার বিবরণ; আর জাতীয় গবেষণাগুলো অনেক বড় জনগোষ্ঠীতে ক্যানসারের প্রবণতা পরীক্ষা করেছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে আগের গবেষণাপত্রটি নিয়ে অবস্থান জানিয়েছিল কোরিয়া ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এজেন্সি। টিকাদান নীতির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা লি হিয়ে-রিম ক্যানসার বিকশিত হতে যে সময় লাগে এবং গবেষণার স্বল্প পর্যবেক্ষণকালের কথা উল্লেখ করেন। গুরুতর কোভিড-১৯-এর ঝুঁকি বেশি এমন বয়স্ক ব্যক্তি ও অন্যদের টিকা নেওয়ার ওপর জোর দেয় সংস্থাটি।
সংস্থাটি আরও জানায়, ২০২৪–২০২৫ সালের টিকাদান মৌসুমে প্রতি এক লাখ ডোজে প্রায় পাঁচটি বিরূপ ঘটনার প্রতিবেদন পাওয়া গেছে; টানা তিন বছর ধরে এ সংখ্যা কমেছে। এসব হিসাবে টিকা নেওয়ার পর জানানো স্বাস্থ্যগত ঘটনা গণনা করা হয়; সেগুলোর কারণ নির্ধারণে আরও তদন্ত প্রয়োজন।
ওম ব্যাখ্যা করেন, টিকার এমআরএনএ কোষের নিউক্লিয়াসের বাইরের অংশ, সাইটোপ্লাজমে কাজ করে এবং কয়েক দিনের মধ্যে এনজাইমের মাধ্যমে ভেঙে যায়। নিউক্লিয়াসে কোষের ডিএনএ থাকে। তাঁর ব্যাখ্যায় এমআরএনএ টিকার দেওয়া সাময়িক নির্দেশনার পাশাপাশি এখন পাওয়া জনসংখ্যাভিত্তিক ফলাফলের ওপর জোর দেওয়া হয়।
প্রমাণ যেভাবে গড়ে উঠেছে
বিতর্কটি এক বছরের বেশি সময় ধরে চলেছে। প্রথমে এক বছরের মধ্যে রোগনির্ণয় নিয়ে গবেষণা, এরপর পদ্ধতিগত সমালোচনা এবং পরে অনেক বড় জনগোষ্ঠী ও দীর্ঘ সময়কালের তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে।
- ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫: Biomarker Research দক্ষিণ কোরিয়ার সেই গবেষণাটি প্রকাশ করে, যেখানে এক বছরের পর্যবেক্ষণে টিকা নেওয়ার সঙ্গে কয়েক ধরনের ক্যানসার শনাক্তের হার বেশি পাওয়ার সম্পর্ক দেখানো হয়।
- অক্টোবর ২০২৫: কোরিয়া ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এজেন্সি গবেষণার ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে এবং গুরুতর কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষার ওপর জোর দেয়।
- ২২ অক্টোবর ২০২৫: সাময়িকীটি সম্পাদকীয় উদ্বেগের নোট যোগ করে।
- ৩১ মার্চ ২০২৬: লোক্যে ও তাঁর সহকর্মীরা সময় নির্ধারণের সমস্যা, নজরদারিজনিত পক্ষপাত, অবশিষ্ট বিভ্রান্তিকারী বিষয় এবং একাধিক পরিসংখ্যানগত পরীক্ষা চিহ্নিত করে পর্যালোচনা প্রকাশ করেন।
- ২৯ অক্টোবর ২০২৬: জং কোরিয়া সায়েন্স মিডিয়া সেন্টারের ব্রিফিংয়ে জাতীয় ক্যানসার প্রবণতা এবং টিকার প্রযুক্তিভেদে পার্থক্য নিয়ে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন।
এখন ক্যানসার নিয়ে উদ্বিগ্ন রোগীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য চিকিৎসকদের হাতে ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষের ওপর করা জনসংখ্যাভিত্তিক তথ্য রয়েছে। ১৩ ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে ব্যাপক টিকাদানের পরের প্রবণতা আগের ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। আরও বহু বছরের স্বাস্থ্য রেকর্ড জমলে তা বিশ্লেষণে যুক্ত হবে এবং পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে।
মূল বিষয়গুলো
- দক্ষিণ কোরিয়ার ৩৬,০২৪,৩৯৪ জনের তথ্য বিশ্লেষণে টিকাদান ব্যাপক হওয়ার পর ১৩ ধরনের ক্যানসারের প্রকোপের মাত্রা বা প্রবণতায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন পাওয়া যায়নি।
- জাতীয় বিশ্লেষণে ২০২১ সালের আগস্টের পরের ৫০ মাসের সঙ্গে আগের এক দশকের বেশি সময়ের প্রবণতা তুলনা করা হয়েছে।
- দ্বিতীয় বিশ্লেষণে ১২ ধরনের ক্যানসারের ক্ষেত্রে এমআরএনএ ও ভাইরাল ভেক্টর টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
- ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের গবেষণার সমালোচনায় পর্যবেক্ষণ শুরুর ভিন্ন তারিখ, স্ক্রিনিংয়ের পার্থক্য, দলগুলোর মধ্যে অবশিষ্ট পার্থক্য এবং একাধিক পরিসংখ্যানগত পরীক্ষার বিষয়গুলো উঠে আসে।
- অনেক ক্যানসার বিকশিত হতে কয়েক বছর লাগে বলে গবেষকেরা পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করছেন।
- চিকিৎসকেরা বলেছেন, ক্যানসারের ভয়ে কিছু বয়স্ক ব্যক্তি ও অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্যসমস্যা থাকা রোগী টিকা নিতে নিরুৎসাহিত হয়েছেন।






