নতুন দিগন্তের সূচনা
২০২৬ সালের ১ জুলাই বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক ৫০ শতাংশ বায়োডিজেল মিশ্রণ কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইন্দোনেশিয়া। এ পদক্ষেপে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উদ্ভাবনে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটি অগ্রভাগে চলে আসবে। B50 বাধ্যতামূলক নীতি অনুযায়ী, ডিজেল জ্বালানিতে ৫০ শতাংশ পাম অয়েলভিত্তিক বায়োডিজেল এবং ৫০ শতাংশ প্রচলিত পেট্রোলিয়াম ডিজেল মেশাতে হবে। এটি এক নজিরবিহীন প্রযুক্তিগত অর্জন। বাণিজ্যিক বিতরণে এত উচ্চ অনুপাতে জ্বালানি মেশানোর চেষ্টা আর কোনো দেশ করেনি। ফলে আন্তর্জাতিক কোনো মানদণ্ড ছাড়াই সমাধান উদ্ভাবনের পথিকৃৎ হতে হচ্ছে ইন্দোনেশিয়াকে।
সূচিপত্র
এই কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আগের পরিকল্পনা থেকে নাটকীয়ভাবে সরে আসার ইঙ্গিত দেয়। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে কর্তৃপক্ষ প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও অর্থায়নের সংকট দেখিয়ে বছরের জন্য B50 উদ্যোগ স্থগিত করেছিল। পরিবর্তে বর্তমান B40 মান বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটায় দ্রুত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হয়। ৩০ মার্চ টোকিওতে এক ব্যবসায়িক ফোরামে প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো ১ জুলাই থেকে কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "আমরা বড় পরিসরে জৈব জ্বালানির দিকে এগোচ্ছি। এ বছর পাম অয়েল থেকে ডিজেল তেল উৎপাদন করব এবং এখন মিশ্রণের হার ৪০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করছি।"
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায় এ নীতিগত পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিতে চাপ বেড়েছে এবং জাতীয় জ্বালানি ভর্তুকির ব্যয়ও ফুলে উঠেছে। অর্থমন্ত্রী পুরবায়া ইউধি সাদেওয়া এপ্রিলের শুরুতে ধারণা দেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে এ বছর অতিরিক্ত ১০০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (৫.৯ বিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত জ্বালানি ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে। B50-এ রূপান্তরের মাধ্যমে সরকার বছরে প্রায় ৪ মিলিয়ন কিলোলিটার জীবাশ্ম ডিজেলের ব্যবহার কমাতে চায়। পাশাপাশি, কর্মসূচি চালুর প্রথম ছয় মাসে ৪৮ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (২.৮ বিলিয়ন ডলার) সাশ্রয়ের পূর্বাভাস রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিষয়ক সমন্বয়মন্ত্রী এয়ারলাঙ্গা হারতার্তো জানান, রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পের্তামিনা মিশ্রণের শর্ত বাস্তবায়নে প্রস্তুত। প্রেসিডেন্ট প্রবোওর জ্বালানি স্বনির্ভরতার বৃহত্তর পরিকল্পনার সঙ্গে এ নীতি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশ্বের বৃহত্তম পাম অয়েল উৎপাদক হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে দেশীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি কৌশল গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতার ঝুঁকি কমানো যায়।
পরিবহন খাতে বাস্তব পরীক্ষা
সারা দেশে কর্মসূচি চালুর আগে ইঞ্জিনের সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং নির্ভরযোগ্য কর্মদক্ষতা নিশ্চিত করতে ব্যাপক পরীক্ষা চলছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের মহাপরিচালক এনিয়া লিস্তিয়ানি দেউই জানান, প্রায় ১৫ বছর আগে দেশটি বায়োডিজেল মিশ্রণ কর্মসূচি উন্নয়ন শুরু করে এবং বড় ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা ছাড়াই সফলভাবে B40 মিশ্রণ ব্যবহার করে আসছে। বহু বছরের নিবেদিত গবেষণা ও উন্নয়নের ফলেই B50-এ উত্তরণ সম্ভব হচ্ছে।
এনিয়া বলেন, "আমাদের ব্যবহারের জন্য কোনো প্রযুক্তিগত নির্দেশিকা নেই। অনুসরণ করার মতো কোনো উদাহরণ ছাড়াই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, আর এ নিয়ে আমরা গর্বিত।" তিনি জানান, ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে জানতে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ যোগাযোগ করেছে, তবে কোন কোন দেশ তা তিনি জানাননি।
পরীক্ষার আওতায় পরিবহন ও শিল্প খাতের বিভিন্ন ধরনের ব্যবহার রয়েছে। রেলপথে পরীক্ষা সর্বশেষ পর্যায়, যা যোগিয়াকার্তা-জাকার্তা রুটে চলা ডিজেল জেনারেটর দিয়ে শুরু হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ লোকোমোটিভে পরীক্ষা শুরুর আগে এসব জেনারেটর ২,৪০০ ঘণ্টা চালিয়ে পরীক্ষা করবে। সুরাবায়া-জাকার্তা করিডরে লোকোমোটিভের পরীক্ষা ছয় মাস ধরে চলার কথা। রেলপথে পরীক্ষার শেষ ধাপ ২০২৬ সালের অক্টোবরে শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত রেল অপারেটর পিটি কেরেতা আপি ইন্দোনেশিয়া (KAI)-এর অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেরু কুসওয়ান্তো পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ সমর্থনের কথা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, নির্ভরযোগ্য কর্মদক্ষতার প্রকৃত তথ্য পেতে বাস্তব পরিচালন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।
নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং রেলসম্পদের নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে ধারাবাহিক প্রযুক্তিগত মূল্যায়নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। আমরা আশা করি, কর্মসূচিটি নির্বিঘ্নে চলবে এবং জাতীয় জ্বালানি রূপান্তর ও টেকসই, পরিবেশবান্ধব পরিবহনে সহায়তার পাশাপাশি রেলশিল্পের জন্য সর্বোচ্চ সুফল বয়ে আনবে।
রেল পরিবহনের বাইরে, ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর শুরু হওয়া সমন্বিত পরীক্ষায় রয়েছে মোটরযান, খনিশিল্পের সরঞ্জাম, কৃষিযন্ত্র, নৌপরিবহন এবং স্থির জেনারেটর। ঈদুল ফিতরে যাত্রী পরিবহনের বার্ষিক চাপ এড়াতে রেলপথে পরীক্ষা বিশেষভাবে মার্চের শেষভাগ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এ সময় লাখ লাখ ইন্দোনেশীয় নিজ নিজ অঞ্চলে বাড়ি ফেরেন।
ডিজেল আমদানি বন্ধ ও জ্বালানি স্বনির্ভরতা
কৃষিমন্ত্রী আন্ধি আমরান সুলেইমান ঘোষণা করেছেন, ১ জুলাই থেকে ইন্দোনেশিয়া স্থানীয়ভাবে ‘সোলার’ নামে পরিচিত ভর্তুকিপ্রাপ্ত নিম্নমানের ডিজেল জ্বালানি আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করবে। এ সিদ্ধান্ত B50 বাস্তবায়নের তারিখের সঙ্গে মিল রেখে নেওয়া হয়েছে এবং জ্বালানি স্বনির্ভরতার দিকে কৌশলগত পদক্ষেপের প্রতিনিধিত্ব করে। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি এবং তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস আমদানিতে বছরে মোট ব্যয় প্রায় ৫০০ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার)।
২০২৫ সালে ডিজেল আমদানি ৪.৯ মিলিয়ন কিলোলিটারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা জাতীয় চাহিদার প্রায় ১০.৬ শতাংশ। এসব আমদানির বদলে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত পাম অয়েল বায়োডিজেল ব্যবহার করে জাকার্তা বৈশ্বিক তেলের দামের অস্থিরতা থেকে অর্থনীতিকে সুরক্ষিত রাখতে এবং দেশীয় কৃষি খাতকে সহায়তা করতে চায়। চাষ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পাম অয়েল ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হয়ে রয়েছে।
B50 বাধ্যতামূলক নীতির ফলে বার্ষিক বায়োডিজেলের চাহিদা বেড়ে প্রায় ১৯ মিলিয়ন কিলোলিটারে পৌঁছাবে। এর জন্য ১৭ থেকে ১৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন অপরিশোধিত পাম অয়েল কাঁচামাল লাগবে। ইন্দোনেশিয়ার পাম অয়েল অ্যাসোসিয়েশন গাপকির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগের B40 নীতির অধীনে এ বছর বায়োডিজেল তৈরির কাঁচামাল হিসেবে পাম অয়েলের চাহিদা প্রায় ১৫ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছাবে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ মিলিয়ন টন বেশি। B50-এ উত্তরণের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত কাঁচামাল বরাদ্দ করতে হবে, যার ফলে রপ্তানির জন্য সরবরাহ কমে যেতে পারে।
রূপান্তরকে সহায়তা করতে সরকার জ্বালানি সংরক্ষণে কিছু ব্যবস্থাও নিয়েছে। ১ এপ্রিল থেকে গণপরিবহন পরিচালকদের জন্য ছাড় রেখে, প্রতিটি গাড়িতে প্রতিদিন ভর্তুকিপ্রাপ্ত জ্বালানি কেনার পরিমাণ ৫০ লিটারে সীমিত করা হয়েছে। মজুতদারি ঠেকানো এবং মিশ্রণের হার পরিবর্তনের সময় পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করাই এ ব্যবস্থার লক্ষ্য।
উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত অভিযোজন
উচ্চাভিলাষী সময়সূচি থাকা সত্ত্বেও দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ায় স্থাপিত বায়োডিজেল উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ১৯.৬ মিলিয়ন কিলোলিটার। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিরতির কারণে কারখানাগুলো সাধারণত সক্ষমতার মাত্র ৮৫ শতাংশ ব্যবহার করে। ন্যাশনাল এনার্জি কাউন্সিলের প্রযুক্তি অংশীজন কমিটির সদস্য উঙ্গুল প্রিয়ান্তো বলেন, রক্ষণাবেক্ষণের সময় সামাল দিতে এবং B50-এর চাহিদা পূরণ করতে উৎপাদন সক্ষমতা ২৪ মিলিয়ন কিলোলিটারে উন্নীত করতে হবে।
শিল্প খাতের কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, ২০২৬ সালে সরাসরি B50-এ যাওয়ার বদলে ইন্দোনেশিয়াকে মধ্যবর্তী ধাপ হিসেবে B45 মিশ্রণ চালু করতে হতে পারে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক এক ব্যবসায়ী জানান, বর্তমান উৎপাদন সক্ষমতা দিয়ে পুরো B50 চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। তাঁর মতে, ৪৫ শতাংশ মিশ্রণ প্রয়োজনীয় অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ হতে পারে। ২০২৬ সালের বায়োডিজেল বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫.৬৪৬ মিলিয়ন কিলোলিটার, যা ২০২৫ সালের ১৫.৬২ মিলিয়ন কিলোলিটারের চেয়ে সামান্য বেশি। ফলে উচ্চতর মিশ্রণের চাহিদা মেটানোর মতো সরবরাহ থাকবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রযুক্তিগত অভিযোজন শুধু উৎপাদনকেন্দ্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, জ্বালানি ব্যবহারকারী সরঞ্জামেও তা প্রযোজ্য। B50-এ চলা যানবাহন ও যন্ত্রপাতিতে কম অনুপাতের মিশ্রণের তুলনায় অতিরিক্ত ফিল্টার এবং সামান্য বেশি জ্বালানির প্রয়োজন হতে পারে। আগেরবার মিশ্রণের হার বাড়ানোর পর ফিল্টার আটকে যাওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছিল, বিশেষ করে খনিশিল্পে। জ্বালানিনির্ভর খনন কার্যক্রমে ব্যয়ের চাপের কথা উল্লেখ করে ইন্দোনেশিয়ান মাইনিং অ্যাসোসিয়েশন মিশ্রণের হার আরও বাড়ানোর আগে B40 বাস্তবায়ন ভালোভাবে মূল্যায়ন করতে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে।
কাঁচামালের ব্যয়ও আরেকটি চ্যালেঞ্জ। ট্রান্সএস্টারিফিকেশন প্রক্রিয়ায় বায়োডিজেল তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মিথানলের দাম মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বেড়েছে। RHB ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের বিশ্লেষক হো লি লেং বলেন, কাঁচামালের ব্যয় বাড়ার প্রেক্ষাপটে উৎপাদকদের উৎসাহ দিতে সরকারের বায়োডিজেলের মূল্য নির্ধারণের সূত্র সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। দাম সমন্বয় না করলে চাহিদা বৃদ্ধির মধ্যেও উৎপাদকদের মুনাফার হার ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
বৈশ্বিক আগ্রহ ও বাণিজ্যিক প্রভাব
ইন্দোনেশিয়ার B50 কর্মসূচি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বাস্তবায়ন মডেলটি পর্যালোচনা করতে বেশ কয়েকটি দেশ জাকার্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। এ আগ্রহ জৈব জ্বালানি ব্যবহারে বৈশ্বিক গতি বৃদ্ধির প্রতিফলন। বিভিন্ন দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে চাইছে। থাইল্যান্ড সম্প্রতি জৈব জ্বালানি মিশ্রণের হার বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র প্রচলিত ডিজেল ও পেট্রোলে রেকর্ড পরিমাণ জৈব জ্বালানি মেশানোর শর্তসহ মিশ্রণসংক্রান্ত বিধি সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে।
নীতিগত এ পরিবর্তনের বৈশ্বিক ভোজ্যতেলের বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব রয়েছে। B50 ঘোষণার পর কুয়ালালামপুরে পাম অয়েলের বেঞ্চমার্ক ফিউচারসের দাম সর্বোচ্চ ১.৯ শতাংশ বেড়ে ২০২৪ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। CIMB সিকিউরিটিজ চাহিদার কাঠামোগত বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে ২০২৬ সালে গড় দাম প্রতি টনে ৪,০০০ রিঙ্গিত থেকে বাড়িয়ে ৪,৪০০ রিঙ্গিত (১,০৯১ ডলার) নির্ধারণ করেছে। CIMB সিকিউরিটিজের মালয়েশিয়া গবেষণা ও কৃষিব্যবসা বিভাগের প্রধান আইভি এনজি এ উদ্যোগের পুনরুজ্জীবনের কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কা, অপরিশোধিত তেলের উচ্চ দাম এবং পাম অয়েলের তুলনায় গ্যাসঅয়েলের বেশি দামে লেনদেন হওয়া, পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ইন্দোনেশিয়ার প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছেন।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। বিশ্বের বৃহত্তম পাম অয়েল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে, দেশীয় বায়োডিজেল উৎপাদনে আরও অপরিশোধিত পাম অয়েল সরিয়ে নিলে বৈশ্বিক সরবরাহ কমে যাবে। ভারত ও চীনের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলো দামের চাপে পড়তে পারে, যা মালয়েশিয়ার মতো বিকল্প সরবরাহকারীদের জন্য সুবিধা তৈরি করতে পারে। ইউরোপ সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া থেকে শুল্কমুক্ত সর্বোচ্চ এক মিলিয়ন টন অপরিশোধিত পাম অয়েল আমদানির কোটা দিয়েছে। সরবরাহে সংকটের লক্ষণ আছে কি না, তা তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
জৈব জ্বালানির কাঁচামাল নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার প্রেক্ষাপটেও এ পরিবর্তন ঘটছে। পাম অয়েলের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে ক্যানোলা ও এ ধরনের ফসলের চাষ সম্প্রসারণে অস্ট্রেলিয়া সম্প্রতি প্রায় ১২ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (৭২৫ মিলিয়ন ডলার) বিনিয়োগ করেছে। এ বিনিয়োগের ইঙ্গিত, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যবহারের জন্য উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো বিকল্প ভোজ্যতেল উৎপাদনে এগোলে পাম অয়েলে ইন্দোনেশিয়ার নেতৃত্বের মুখে ক্রমেই বাড়তি প্রতিযোগিতা আসবে।
বায়োডিজেলের বাইরেও সমন্বিত জৈব জ্বালানি কৌশল
B50 বাধ্যতামূলক নীতি সড়ক ও রেল পরিবহনের বাইরেও বিস্তৃত একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অংশ। ২০২৮ সালের মধ্যে সব ডিজেল ব্যবহারকারীকে B50 মিশ্রণ গ্রহণ করতে হবে। উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে ভর্তুকিপ্রাপ্ত ডিজেল ২০২৭ সালের মধ্যে এবং ভর্তুকিবিহীন ডিজেল পরের বছর এ মিশ্রণে রূপান্তরিত হবে। উচ্চাভিলাষ ও অবকাঠামোর প্রস্তুতি এবং সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রাখাই এ পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতির লক্ষ্য।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভার বহুমুখী করতে ইন্দোনেশিয়া অন্যান্য জৈব জ্বালানিও সম্প্রসারণ করছে। সরকার পেট্রোলে ইথানল মেশানো চালুর পরিকল্পনা করেছে। ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে জাভায় পেট্রোলে অন্তত ৫ শতাংশ ইথানল মেশানো হবে, যা ২০২৮ সালের মধ্যে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হবে। দেশটির সবচেয়ে বড় জ্বালানি ভোগের বাজারকে লক্ষ্য করে নেওয়া এ উদ্যোগে কাসাভা, আখ ও ভুট্টা থেকে উৎপাদিত দেশীয় ইথানল ব্যবহার করা হবে।
এ ছাড়া ২০২৭ সালে টেকসই বিমান জ্বালানির বাধ্যতামূলক ব্যবহার শুরু হবে। এর আওতায় জাকার্তার সোয়েকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং বালির ই গুস্তি ঙ্গুরাহ রাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া ফ্লাইটে অন্তত ১ শতাংশ টেকসই বিমান জ্বালানিযুক্ত জ্বালানি ব্যবহার করতে হবে। বাণিজ্যিক পর্যায়ে বিভিন্ন খাতে জৈব জ্বালানি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা চালু করা উদীয়মান অর্থনীতির অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে ইন্দোনেশিয়াকে স্থান দিয়েছে।
আগামী তিন বছরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছেন প্রেসিডেন্ট প্রবোও। এ বহুমুখী উদ্যোগে সব জ্বালানি খাতে দেশীয় নবায়নযোগ্য সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা প্রতিফলিত হয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিকে সহায়তার পাশাপাশি আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো হবে।
একনজরে
- ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে বিশ্বের প্রথম B50 (৫০ শতাংশ বায়োডিজেল মিশ্রণ) বাধ্যতামূলক নীতি বাস্তবায়ন করবে ইন্দোনেশিয়া
- এ নীতির লক্ষ্য ডিজেল আমদানি বন্ধ করা এবং বছরে ৪ মিলিয়ন কিলোলিটার জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো
- যানবাহন, রেলপথ, খনিশিল্পের সরঞ্জাম এবং নৌপরিবহনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক পরীক্ষা চলছে
- কর্মসূচি বাস্তবায়নের প্রথম ছয় মাসে ৪৮ ট্রিলিয়ন রুপিয়াহ (২.৮ বিলিয়ন ডলার) সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে
- উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় পূর্ণমাত্রায় B50 চালুর আগে অন্তর্বর্তী B45 মিশ্রণ চালু হতে পারে
- দেশীয় চাহিদা বাড়ার প্রত্যাশায় বৈশ্বিক পাম অয়েলের দাম দ্রুত বেড়েছে
- B50 বাস্তবায়নের মডেল পর্যালোচনা করতে একাধিক দেশ ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে
- ২০২৮ সালের মধ্যে সব ডিজেল ব্যবহারকারীকে B50-এ রূপান্তরিত হতে হবে; পাশাপাশি ইথানল মিশ্রণ ও টেকসই বিমান জ্বালানির বাধ্যবাধকতাও চালু হবে






