ব্রাসেলসকে চীনের কঠোর হুঁশিয়ারি
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) উৎপাদনভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত আইনের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট হুমকি দিয়েছে বেইজিং। সোমবার প্রকাশিত কড়া ভাষার এক বিবৃতিতে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইইউর ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাক্সিলারেটর অ্যাক্টকে (আইএএ) পদ্ধতিগত বৈষম্যের হাতিয়ার বলে নিন্দা করেছে। পাশাপাশি, বিদেশি বিনিয়োগে প্রস্তাবিত বিধিনিষেধ নিয়ে ব্রাসেলস এগোলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে।
সূচিপত্র
চীনা সরকার শুক্রবার ইউরোপীয় কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আপত্তি জানায়। এতে আইনটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়। মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক যান, ফটোভোলটাইক এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল—এই চারটি কৌশলগত উদীয়মান শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগের ওপর আইনটি একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। প্রস্তাবে সরকারি ক্রয় ও সরকারি সহায়তা নীতিতে ইইউভিত্তিক উৎসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার শর্তও রয়েছে। বেইজিংয়ের যুক্তি, এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে।
আইনটি নিয়ে ইইউ এগোলে এবং তাতে চীনা কোম্পানিগুলোর স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হলে, নিজেদের প্রতিষ্ঠানের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ দৃঢ়ভাবে রক্ষায় পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া চীনের আর কোনো উপায় থাকবে না বলে সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়। স্থানীয় উপাদান ব্যবহারের শর্তের মাধ্যমে শিল্প খাত পুনরুজ্জীবিত করার ইইউর সর্বশেষ উদ্যোগের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে জোরালো প্রতিবাদ।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাক্সিলারেটর অ্যাক্টের কার্যপদ্ধতি
মার্চে উন্মোচিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাক্সিলারেটর অ্যাক্ট ইইউর শিল্পায়ন হ্রাস ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার উদ্বেগজনক প্রবণতা উল্টে দেওয়ার কৌশলের মূল ভিত্তি। আইনটি তিনটি কৌশলগত খাতকে লক্ষ্য করেছে: পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি, মোটরগাড়ি উৎপাদন এবং অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত ও সিমেন্টসহ জ্বালানিনির্ভর শিল্প। এর কেন্দ্রে রয়েছে স্থানীয় উপাদান ব্যবহারের কঠোর সীমা। একক বাজারে সরকারি তহবিল ও ক্রয়চুক্তি পেতে কোম্পানিগুলোকে এই সীমা পূরণ করতে হবে।
প্রস্তাবিত বিধি অনুযায়ী, সরকারি সহায়তা পেতে বৈদ্যুতিক গাড়িতে ইইউর ৭০ শতাংশ উপাদান থাকতে হবে। অ্যালুমিনিয়াম ও সিমেন্টের ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদনের শর্ত হবে ২৫ শতাংশ। ইইউতে কার্যক্রম শুরু করার সময় বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইউরোপীয় কোম্পানির সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে আইনে। এই বিধানটি বিশেষভাবে ক্ষুব্ধ করেছে বেইজিংকে।
তীব্র অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে আইনটি আনা হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল থেকে জ্বালানিনির্ভর শিল্প ও মোটরগাড়ি খাতে ২ লাখের বেশি কর্মসংস্থান হারিয়ে গেছে। পূর্বাভাস বলছে, এ দশকে শুধু গাড়ি উৎপাদন খাতেই আরও ৬ লাখ কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হতে পারে। প্রস্তাবটি উন্মোচনের সময় ইউরোপীয় শিল্পবিষয়ক কমিশনার স্তেফান সেজুরনে এর পক্ষে যুক্তি দেন।
এটি (ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাক্সিলারেটর অ্যাক্ট) করদাতাদের অর্থ ইউরোপীয় উৎপাদনে কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, আমাদের নির্ভরতা কমাবে এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বাড়াবে।
বেইজিংয়ের আইনি চ্যালেঞ্জ ও অর্থনৈতিক উদ্বেগ
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতিমালার সঙ্গে আইনের সামঞ্জস্য নিয়ে বিস্তারিত সমালোচনার ওপর ভিত্তি করে চীনের আপত্তি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুক্তি, স্থানীয় উপাদান ব্যবহারের শর্ত এবং ইইউতে উৎপাদিত পণ্যের জন্য অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা—দুটিই ডব্লিউটিওর মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করে। এর মধ্যে রয়েছে সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের মর্যাদা ও জাতীয় আচরণের নীতি। এসব নীতিতে আমদানি করা ও দেশীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে সমান আচরণ করতে হয়। বেইজিংয়ের দাবি, আইএএ এই মানদণ্ড উপেক্ষা করছে।
আইনি জটিলতার বাইরেও চীনা কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন যে আইনটি সরবরাহশৃঙ্খল ব্যাহত করবে এবং ইইউর সবুজ রূপান্তর ধীর করবে। তাদের যুক্তি, ইউরোপের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাত থেকে চীনা প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ বাদ দিলে ন্যায্য প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত দাম বাড়া ও উদ্ভাবন কমে যাওয়ার কারণে ইউরোপীয় ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। বৈষম্যমূলক বলে বিবেচিত বিধানগুলো—বিশেষ করে জোরপূর্বক প্রযুক্তি হস্তান্তর, মেধাস্বত্বে বিধিনিষেধ এবং সরকারি ক্রয়ে অংশ নেওয়ার বাধা—বাদ দিতে ব্রাসেলসকে আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
ইউরোপীয় সরবরাহশৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটানোর বেইজিংয়ের সামর্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে পাল্টা ব্যবস্থার হুমকিটি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, তবে আলোচনার পথও খোলা রাখবে। প্রস্তাবটি ইইউর প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় এগোনোর সময় তাই তৈরি হয়েছে উত্তেজনাপূর্ণ অপেক্ষার পর্ব।
বাড়তে থাকা টানাপোড়েনের ইতিহাস
বর্তমান বিরোধের পেছনে রয়েছে এক বছরের বেশি সময় ধরে অবনতিশীল বাণিজ্যিক সম্পর্ক। এর শুরু ২০২৪ সালের অক্টোবরে চীনে তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর শুল্ক আরোপের ইইউর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। ব্রাসেলসের ভাষায় অন্যায্য ভর্তুকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হিসেবে নেওয়া ওই পদক্ষেপের জবাবে বেইজিং ইউরোপীয় ব্র্যান্ডি, শূকরের মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি নিয়ে তদন্ত শুরু করে। বৈদ্যুতিক গাড়ির শুল্ক ব্রাসেলসের ভেতরেও সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়ায়। এতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে গভীর মতপার্থক্য প্রকাশ পায় এবং ইইউর প্রচলিত বাণিজ্য সুরক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে আসে।
এরপর একাধিক ক্ষেত্রে উত্তেজনা বেড়েছে। ইউরোপীয় কমিশন চীনা বায়োডিজেল, মিষ্টিকারক এবং মোবাইল অ্যাক্সেস সরঞ্জাম নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। অন্যদিকে, ইইউর বিদেশি ভর্তুকি বিধিমালা নিয়ে তদন্ত শেষ করে সেটিকে অন্যায্য বাণিজ্য বাধা বলে আখ্যা দিয়েছে বেইজিং। ডিজিটাল ক্ষেত্রে ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্টের অধীনে টেমু ও শেইনের মতো চীনা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মকে লক্ষ্য করেছে ইইউ। একই সময়ে তথ্য স্থানান্তর ও সাইবার নিরাপত্তার মানদণ্ড নিয়ে নতুন করে যাচাইয়ের মুখে পড়েছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো।
ইউরোপীয় শিল্পের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছিল ২০২৫ সালের এপ্রিল ও অক্টোবরে খনিজ রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপের মাধ্যমে চীনের জবরদস্তিমূলক ক্ষমতার প্রদর্শন। বিরল মৃত্তিকা উপাদান ও স্থায়ী চুম্বক রপ্তানিতে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করে বেইজিং ইউরোপজুড়ে মোটরগাড়ির সেমিকন্ডাক্টর, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও উন্নত যন্ত্রপাতির উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত করে। ট্রাম্প-শি সম্মেলনের পর সমঝোতা হলেও ঘটনাটি সরবরাহশৃঙ্খলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকির মুখে ইউরোপের দুর্বলতা স্পষ্ট করে দেয়। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সবুজ রূপান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে এই ঝুঁকি বেশি।
শিল্প খাতে সার্বভৌমত্বের পক্ষে ব্রাসেলস
বেইজিংয়ের হুমকির মুখে ইউরোপীয় কমিশনের কর্মকর্তারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাক্সিলারেটর অ্যাক্টকে নজিরবিহীন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে সমর্থন করে যাচ্ছেন। চীনের সমালোচনার সরাসরি জবাব দিয়েছেন মুখপাত্র ওলোফ গিল।
আমাদের প্রস্তাবগুলো নাগরিকদের জন্য বৃহত্তর কিছু অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের উপযোগী করে সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা হয়েছে। যতটা সম্ভব, আমরা আমাদের বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করি। তাদের সঙ্গে কথা বলতে এবং মতামত শুনতে আমরা আগ্রহী।
কমিশনের অবস্থান অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন নিয়ে ইউরোপের চিন্তাভাবনার বৃহত্তর পরিবর্তনের প্রতিফলন। কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সমান করা এবং চীনে বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া আগের পদ্ধতিগুলো শিল্পায়ন হ্রাস ঠেকাতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির শুল্ক নিয়ে বিরোধটি বিতর্কিত হলেও ব্রাসেলসকে শিখিয়েছে, নিয়ম এড়িয়ে চলা প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে প্রচলিত ডব্লিউটিও নিয়ম মেনে কাজ করলে সুরক্ষা সীমিত থাকে। ইইউর এক জ্যেষ্ঠ বাণিজ্য কর্মকর্তার ভাষায়, জোটটি নিয়ম মেনেই কাজ করেছে, কিন্তু তাতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আমাদের পরিমিত পদ্ধতিতে কোনো লাভ নেই।
প্রস্তাবটি এখন ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় কাউন্সিলের জটিল আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে। সেখানে সদস্যদেশগুলো শিল্প সুরক্ষার সুবিধার সঙ্গে চীনের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার বাণিজ্যযুদ্ধের ঝুঁকির তুলনা করবে। মাদ্রিদ ও বুদাপেস্টসহ কয়েকটি রাজধানী আগে ইইউজুড়ে উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। এতে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান বজায় রাখার প্রচেষ্টা জটিল হতে পারে। চীনা বাজারে প্রবেশাধিকার বনাম শিল্প সুরক্ষা নিয়ে সদস্যদেশগুলোর স্বার্থের পার্থক্যই ব্রাসেলসের চীন কৌশলে রাজনৈতিক মতবিরোধের মূল রেখা।
ট্রাম্পের প্রভাব ও বৃহৎ শক্তির হিসাব-নিকাশ
ট্রাম্প প্রশাসনের আমলে অস্থির আটলান্টিকপারের সম্পর্ক থেকে এই বাণিজ্যবিরোধকে আলাদা করে দেখা যায় না। চীনা কৌশলবিদেরা সম্ভবত ধরে নিচ্ছেন, ওয়াশিংটনের চাপ ইউরোপীয় রাজধানীগুলোকে ভারসাম্য রক্ষার জন্য বেইজিংয়ের দিকে ঠেলে দেবে। ফলে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করে এমন ঝুঁকি কমানোর পদক্ষেপের প্রতি আগ্রহ কমতে পারে। চীনা থিংক ট্যাংকের বিশ্লেষকেরা ইউরোপের পরিস্থিতিকে মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীলতার সমস্যা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, ট্রাম্পের চরম আক্রমণাত্মক অবস্থান ইউরোপীয় নেতাদের নিজেদের জোটগত অবস্থান পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করতে পারে।
ফ্রান্সে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে সংঘাতমুখী কূটনৈতিক শৈলীর জন্য পরিচিত লু শায়েকে ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কবিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বেইজিং। এই নিয়োগে আপসের ইঙ্গিত খুব একটা নেই। বরং মনে হচ্ছে, নির্বাচিত ক্ষেত্রে সম্পর্ক পুনরায় সক্রিয় করার কৌশল নিচ্ছে চীন। এতে বেইজিংয়ের খরচ সামান্য, অথচ মার্কিন অনিশ্চয়তার মধ্যে স্থিতিশীল অংশীদার খুঁজতে মরিয়া ইউরোপের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের সুযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের বিনিময় এবং মোটরগাড়ি ও আইনি পরিষেবা খাতে ৬০ কোটি পাউন্ডের চুক্তি দেখায়, অন্য ইউরোপীয় রাজধানীগুলোর ক্ষেত্রেও বেইজিং একই ছক অনুসরণ করতে পারে।
তবে মৌলিক মতপার্থক্য সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার সম্ভাবনা সীমিত করে। রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় চীনের অব্যাহত সমর্থন, অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে মতভেদ এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিষয়ে চীনের দৃষ্টিভঙ্গি—সবই ইউরোপের মৌলিক স্বার্থের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। রাশিয়ার সামরিক ব্যবস্থাকে সহায়তাকারী চীনা সংস্থাগুলোর ওপর ইইউ ইতিমধ্যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১৫তম দফার নিষেধাজ্ঞায় ছয়টি প্রতিষ্ঠান ও একজন ব্যক্তিকে লক্ষ্য করা হয়। ১৬তম দফায় আরও নাম যুক্ত হওয়ার কথা। এসব পদক্ষেপ দেখায়, সম্পর্ক নতুন করে গড়ার ব্যাপারে বেইজিংয়ের আশার পরও ইউরোপের নিরাপত্তা-উদ্বেগ তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক লাভের আকর্ষণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাজারের প্রতিক্রিয়া ও অর্থনৈতিক অভিঘাত
চীন-ইউরোপ বাণিজ্যবিরোধ আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি আর্থিক বাজারে প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে। জার্মান ভোক্তাদের আস্থা ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। মে মাসে জিএফকে সূচক কমে -৩৩.৩-এ দাঁড়িয়েছে, যা ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির পর সর্বনিম্ন। বিএনওয়াইয়ের বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপোড়েন ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এই পতনের আংশিক কারণ। তাদের পর্যবেক্ষণ, এই দুই বিষয়ের সমন্বয়ে ইউরোপীয় সম্পদ ও ইউরোর জন্য নেতিবাচক পূর্বাভাস তৈরি হয়েছে।
চীনা বাজারের ওপর আয়ের বড় অংশের জন্য নির্ভরশীল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের আধিক্যের কারণে ড্যাক্স সূচক বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে। কৃষিপণ্য নিয়ে চলমান তদন্তের বাইরে বেইজিং পাল্টা ব্যবস্থা নিলে ইউরোপের মোটরগাড়ি ও রাসায়নিক খাতের আয় তাৎক্ষণিকভাবে কমতে পারে। অর্থনৈতিক দুর্বলতার প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমাতে পারে—এমন সম্ভাবনার ভিত্তিতে মুদ্রাবাজারে ইতিমধ্যে অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। অনিশ্চয়তার মধ্যে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় খোঁজায় সুদের হারের ডেরিভেটিভে জার্মান বুন্ডের আয় কমার ইঙ্গিত মিলছে।
ইউরোপে উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে বড় বিনিয়োগ করা বিওয়াইডি ও সিএটিএলের মতো চীনা কোম্পানির কাছে বিদ্যমান বৈদ্যুতিক গাড়ির শুল্ক এড়ানোর পর আইএএ এখন অস্তিত্বের জন্য হুমকি। ইউরোপীয় অংশীদারদের কাছে একই সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর করে ৭০ শতাংশ স্থানীয় উপাদানের শর্ত পূরণে বাধ্য করা হলে, ইউরোপে সম্প্রসারণের অর্থনৈতিক যুক্তিই আর থাকবে না। এতে দুই পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো সরে গেলে স্বল্প মেয়াদে ইউরোপে কর্মসংস্থান কমবে। আর শর্ত মেনে নিলে তাদের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ক্ষয়ে যাবে, যা বেইজিংকে আরও পাল্টা ব্যবস্থা নিতে প্ররোচিত করতে পারে।
মূল বিষয়গুলো
- চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় শুক্রবার ইইউর ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাক্সিলারেটর অ্যাক্টের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানায় এবং সোমবার প্রকাশ্যে সতর্ক করে যে আইনটি এগোলে অনির্দিষ্ট পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- সরকারি ক্রয়ে অংশ নিতে আইনটি বৈদ্যুতিক গাড়িতে ৭০ শতাংশ এবং অ্যালুমিনিয়াম ও সিমেন্টে ২৫ শতাংশ ইইউ উপাদান ব্যবহারের শর্ত দেয়। এতে ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ফটোভোলটাইক ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল খাতকে লক্ষ্য করা হয়েছে।
- বেইজিংয়ের যুক্তি, ‘মেড ইন ইউরোপ’ বিধি সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের মর্যাদা ও জাতীয় আচরণসহ ডব্লিউটিওর নীতি লঙ্ঘন করে এবং জোরপূর্বক প্রযুক্তি হস্তান্তরের শামিল।
- ২০২৪ সালের বৈদ্যুতিক গাড়ির শুল্ক এবং ইউরোপীয় ব্র্যান্ডি, শূকরের মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য নিয়ে চীনের চলমান তদন্তের পর এই বিরোধ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি চীনা বায়োডিজেল ও ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম নিয়ে তদন্ত চালাচ্ছে ইইউ।
- ২০২৪ সাল থেকে ইউরোপের শিল্পভিত্তিতে ২ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে। মোটরগাড়ি খাতে আরও ৬ লাখ কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে রয়েছে, যা স্থানীয় উপাদান ব্যবহারের শর্তের পক্ষে উদ্যোগকে জোরদার করেছে।
- আইনটির জন্য ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ও কাউন্সিলের অনুমোদন প্রয়োজন। সুরক্ষা ও বাণিজ্যযুদ্ধের ঝুঁকির ভারসাম্য নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতভেদ রয়েছে।






