সৌরপ্যানেলের নিচে অপ্রত্যাশিত মরূদ্যান
চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের ৪৯ বছর বয়সী পশুপালক ইয়েহদোরের মনে আছে ১৯৯৮ সালের সেই দুর্দশার কথা। তালাতান গোবি মরুভূমিজুড়ে প্রাকৃতিক ঘাস উধাও হয়ে গিয়েছিল, ক্ষুধায় কাতরাচ্ছিল তাঁর গরু ও ভেড়া। তিনি ও তাঁর বাবা খড় কিনতে দূরের গ্রামে যেতেন, দুর্গম পথে ত্রিচাকায় করে তা ফিরিয়ে আনতেন। এমনই এক যাত্রায় অতিরিক্ত বোঝাই গাড়িটি টানতে গিয়ে ইয়েহদোরের গোড়ালিতে চোট লাগে। গত শতাব্দীর শেষ নাগাদ যে মরুভূমির ৯৮.৫ শতাংশ মরুকরণের শিকার হয়েছিল, সেখানে বালুঝড় আর সংগ্রাম ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
সূচিপত্র
আজ বদলে যাওয়া ভূদৃশ্যের মধ্য দিয়ে মোটরসাইকেল চালান ইয়েহদোর। চীনের ছিংহাই প্রদেশের গংহে কাউন্টিতে একসময়কার অনুর্বর ১৬২ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত গাঢ় নীল সৌরপ্যানেল। প্যানেলগুলোর নিচে তাঁর ভেড়ার পাল ঘন সবুজ ঘাসে চরছে, যা কখনো কখনো প্যানেলও ঢেকে ফেলে। তাঁর পালের ভেড়ার সংখ্যা ২০০ থেকে বেড়ে ৩০০ ছাড়িয়েছে, আর বার্ষিক আয় পৌঁছেছে প্রায় ১ লাখ ইউয়ানে (প্রায় ১৪ হাজার ডলার)। ত্রিশ বছর আগে যে ভূমি থেকে বালুঝড় ছড়িয়ে পড়ত, সেখান থেকে এখন রপ্তানি হয় পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ এবং ‘ফটোভোলটাইক ভেড়া’ নামে ব্র্যান্ড করা উন্নত মানের খাসির মাংস।
তিব্বতি মালভূমিতে বিশ্বের বৃহত্তম সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র গংহে ফটোভোলটাইক পার্কের এই রূপান্তর কেবল জ্বালানি প্রকল্পের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। পিয়ার-রিভিউড গবেষণা সাময়িকী সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে প্রকাশিত গবেষণায় নিশ্চিত করা হয়েছে, এই স্থাপনা মরুভূমির মাটিজুড়ে পরিমাপযোগ্য পরিবেশগত উন্নতি ঘটিয়েছে। প্যানেলগুলো এমন শীতল ও আর্দ্র ক্ষুদ্র জলবায়ু তৈরি করেছে, যেখানে এখন উদ্ভিদ ভালোভাবে বেড়ে উঠছে। প্রায় প্রাণহীন বিস্তীর্ণ ভূমি পরিণত হয়েছে এমন এক কার্যকর বাস্তুতন্ত্রে, যা একই সঙ্গে গিগাওয়াটের বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং হাজার হাজার চরানো পশুকে ধারণ করছে।
পরিবর্তনের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তুলে ধরে ইয়েহদোর এর কথা বলেন।
ভেড়া পালনে আমাদের পরিবারের বছরে প্রায় ১ লাখ ইউয়ান আয় হয়। আমার পালের ভেড়া ২০০ থেকে বেড়ে ৩০০ ছাড়িয়েছে, আর আমাদের ভেড়াগুলো সুস্থ-সবল। জীবন এখন অনেক ভালো।
বিশ্বের ছাদে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার
তালাতান সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রটি ছিংহাই-তিব্বত মালভূমিতে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। এখানকার পাতলা বায়ু ও তীব্র সৌর বিকিরণ ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে। চীনের প্রথম ১ কোটি কিলোওয়াট শ্রেণির সৌরবিদ্যুৎ ঘাঁটির অংশ হিসেবে ২০১২ সালে এর নির্মাণ শুরু হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ কেন্দ্রটি ৩০০ বর্গকিলোমিটারের (১১৬ বর্গমাইল) বেশি এলাকায় বিস্তৃত হয়। তবে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোসহ মোট আয়তন ১৬২ বর্গমাইল বলে কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো তুলনীয় স্থাপনাকে ছাড়িয়ে গেছে এর ব্যাপ্তি। পুরো কমপ্লেক্সে এখন ৯১টি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ৬৩টি সৌর ফটোভোলটাইক কোম্পানি এবং ২৮টি বায়ুবিদ্যুৎ কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। সব মিলিয়ে গ্রিডে যুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ১ কোটি ৭৭ লাখ ৩০ হাজার কিলোওয়াট। উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন দিয়ে এই বিদ্যুৎ ১ হাজার মাইলেরও বেশি দূরের শিল্পকেন্দ্রে পাঠানো হয়। এর ফলে চীনের সম্প্রসারিত বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টারগুলো বিদ্যুৎ পাচ্ছে। শুধু গত বছরই, ওই এলাকায় নতুন জ্বালানি প্রকল্পের নির্মাণকাজে স্থানীয় কৃষক ও পশুপালকদের ৩ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান হয়েছে।
স্থানটি বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল বাস্তবসম্মত। তালাতান গোবিতে রয়েছে বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি, যেখানে জমির অন্য ব্যবহার খুবই সীমিত এবং পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সৌরসম্পদ পাওয়া যায়। বায়ুমণ্ডল পাতলা হওয়ায় মালভূমিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় অনেক বেশি তীব্র সূর্যালোক পাওয়া যায়। তবে যে বিষয়গুলো জায়গাটিকে সৌরপ্যানেলের জন্য আদর্শ করে তুলেছিল, সেই তীব্র বিকিরণ ও শুষ্ক পরিবেশই দীর্ঘদিন ধরে উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করেছে এবং গুরুতর মরুকরণে ভূমিকা রেখেছে।
ছায়ায় বদলে যাচ্ছে মরুভূমির বাস্তুতন্ত্র
সৌরপ্যানেলের নিচে ঘটে চলা পরিবেশগত পরিবর্তন নাজুক পরিবেশে শিল্প উন্নয়ন নিয়ে প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। শি'আন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষকেরা গংহে এলাকায় ৫৭টি ভিন্ন পরিবেশগত সূচক পরিমাপে ডিপিএসআইআর কাঠামো (চালিকাশক্তি, চাপ, অবস্থা, প্রভাব, প্রতিক্রিয়া) প্রয়োগ করেন। এই মূল্যায়ন পদ্ধতিটি তৈরি করেছে ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থা। ২০২৪ সালে প্রকাশিত তাঁদের গবেষণায় দেখা যায়, প্যানেলের ঠিক নিচের এলাকাগুলোর সামগ্রিক পরিবেশগত স্বাস্থ্যের স্কোর ০.৪৩৯৩; যা রূপান্তর অঞ্চলের (০.২৮৫৮) বা অক্ষত মরুভূমির (০.২৮০২) তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
পরিবেশগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণকারী গবেষকেরা প্যানেলের নিচে মাটির অবস্থার পরিমাপযোগ্য উন্নতির তথ্য নথিভুক্ত করেছেন।
সৌরপ্যানেলের উপস্থিতি ভূপৃষ্ঠের শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন আনে। আশপাশের অনাবৃত মরুভূমির তুলনায় প্যানেলের নিচে আমরা বেশি জৈবিক কর্মকাণ্ড দেখতে পাচ্ছি।
এই উন্নতির পেছনের প্রক্রিয়াটি আশ্চর্যজনকভাবে সরল। সরাসরি সূর্যালোক আটকে দিয়ে প্যানেল মাটির তাপমাত্রা কমায় এবং বাষ্পীভবনের গতি ধীর করে। ফলে মাটিতে অতি প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা থেকে যায়, যা সাধারণত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উবে যেত। উপগ্রহের দূর অনুধাবন তথ্য বলছে, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে বাতাসের গতি ৫০ শতাংশ কমেছে, আর মাটির আর্দ্রতা বাষ্পীভবনের হার কমেছে ৩০ শতাংশ। ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সে ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্থির প্যানেলের নিচের মাটিতে কাছের অনাবৃত জমির তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি পানি ছিল।
রক্ষণাবেক্ষণের নিয়মিত কাজ থেকেও পানি আসে। কার্যকারিতা কমিয়ে দেয় এমন ধুলো সরাতে সৌরপ্যানেল নিয়মিত পরিষ্কার করতে হয়, আর সেই পানি চুঁইয়ে প্যানেলের নিচের মাটিতে যায়। তালাতান মরুভূমিতে এই নিয়মিত অল্প পরিমাণ পানির জোগান, বাষ্পীভবন কমে যাওয়ার সঙ্গে মিলে কিছু এলাকায় এক মিটারেরও বেশি উঁচু ঘাস জন্মাতে সাহায্য করেছে। স্টেট পাওয়ার ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন লিমিটেড এবং শি'আন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির তথ্য অনুযায়ী, পার্কের ভেতরে উদ্ভিদের আচ্ছাদন বেড়ে ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই ক্ষুদ্র জলবায়ুর সুরক্ষা উদ্ভিদ ও মাটির অণুজীবের টিকে থাকার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। ছায়া দৈনিক তাপমাত্রার ওঠানামা কমিয়ে দেয়, যা উদ্ভিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে স্থাপনাগুলো বাতাসের গতিপথ ভেঙে দেয়, ফলে মাটির উপরিভাগ ও নতুন চারা আর সহজে উড়ে যায় না। এর ফলে স্বয়ংসম্পূর্ণ এক চক্র তৈরি হয়: মাটির আর্দ্রতা বাড়লে উদ্ভিদের বৃদ্ধি হয়, আর উদ্ভিদ মাটিকে আরও স্থিতিশীল করে ও ধুলা কমায়।
কৃষি-সৌরবিদ্যুতের বিপ্লব
উদ্ভিদ ফিরে আসায় সৌরবিদ্যুৎ পরিচালনাকারীদের সামনে অপ্রত্যাশিত এক সমস্যা দেখা দেয়। প্যানেলের নিচে ঘাস ঘন হয়ে উঠলে তা সূর্যালোক আটকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কার্যকারিতা কমাতে শুরু করে। শীতকালে শুকনো গাছপালায় আগুন লাগার ঝুঁকি তৈরি হয়। শুরুতে কোম্পানিগুলো ঘাস হাতে পরিষ্কারের জন্য শ্রমিক নিয়োগ করত, যা ছিল ব্যয়বহুল ও শ্রমসাধ্য কাজ।
২০১৮ সালে পরিচালনাকারীরা সমাধানের জন্য স্থানীয় পশুপালকদের দ্বারস্থ হন। সেই সমাধান এখন বিশ্বজুড়ে কৃষি-সৌরবিদ্যুতের সমন্বয়ের মডেল হয়ে উঠেছে। ইয়েহদোরের মতো পশুপালকেরা এখন বিনা খরচে প্যানেলের নিচে ভেড়া চরান। এতে প্রাকৃতিকভাবে ঘাস নিয়ন্ত্রণ করা যায়, হার্বিসাইড বা যন্ত্রের সাহায্যে ঘাস পরিষ্কারের প্রয়োজন পড়ে না। পশুদের চলাচলের সুবিধার জন্য প্রযুক্তিবিদেরা অবকাঠামোতে পরিবর্তন আনেন: প্যানেলের সারির মধ্যকার দূরত্ব তিন মিটার থেকে বাড়িয়ে পাঁচ মিটার করা হয় এবং স্থাপনার উচ্চতা ৫০ সেন্টিমিটার থেকে বাড়িয়ে ১.৫ থেকে ১.৮ মিটার করা হয়।
এই ব্যবস্থায় উভয় পক্ষই উপকৃত হয়েছে। প্রচণ্ড গরমের দিনে ভেড়াগুলো ছায়া পায়, আর উন্নত ক্ষুদ্র জলবায়ুতে বেড়ে ওঠা উন্নত মানের ঘাস প্রচুর পরিমাণে খেতে পারে। ‘ফটোভোলটাইক ভেড়া’ তাদের মানের জন্য পরিচিতি পেয়েছে। পশুপালকেরা একটি ব্র্যান্ড তৈরি করেছেন, যার পণ্য ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সারা দেশে বিক্রি হয়। প্রতিটি পশুর কানে লাগানো কিউআর কোড ট্যাগের ডিজিটাল পরিচয়পত্রে তার বয়স, টিকা দেওয়ার ইতিহাস ও মালিকানার তথ্য থাকে।
প্রিফেকচারে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে ৩২টি ফটোভোলটাইক পরিবেশবান্ধব চারণভূমি এবং ৫৬টি কেন্দ্রীয় চারণক্ষেত্র গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলোর সুবিধা পাচ্ছে আশপাশের ১৮টি গ্রাম, যেখানে বছরে ২০ হাজারের বেশি ভেড়া পালন করা হয়। পার্কটিতে বছরে আনুমানিক ১ লাখ ১৮ হাজার টন ঘাস উৎপাদিত হয়, যা তাত্ত্বিকভাবে ২ লাখ ভেড়ার খাদ্যের জোগান দিতে পারে। শুধু ২০২৩ সালেই ফটোভোলটাইক ভেড়া বিক্রি করে পশুপালকেরা মোট ১ কোটি ১০ লাখ ইউয়ান আয় করেছেন। এদিকে, আগে দারিদ্র্যপীড়িত ছিল এমন ১৭৩টি গ্রাম সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট ব্যবসার মাধ্যমে ৬ কোটি ৭০ লাখ ইউয়ান আয় করেছে।
ছিংহাইয়ের বাইরেও প্রমাণ
বৈজ্ঞানিক দাবির সত্যতা যাচাই করতে একটি স্থানের পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট নয়; একই ফল অন্যত্রও পাওয়া দরকার বলে বিজ্ঞানীরা জোর দিয়ে বলেন। চীনের অন্যান্য মরুভূমির সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, গংহের ঘটনাটি স্থানীয় ব্যতিক্রম নয়, বরং আরও বিস্তৃত একটি প্রবণতার অংশ। কুবুচি মরুভূমিতে ত্রিশ বছরের উন্নয়ন এমন এক অঞ্চলকে বদলে দিয়েছে, যেখান থেকে একসময় বালুঝড় ছড়াত। এখন সেখানে জুনমা সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ঝোপঝাড় এবং শিয়াল ও খরগোশসহ বন্যপ্রাণীর আবাস টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করছে।
জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্টে প্রকাশিত একটি বিস্তৃত বিশ্লেষণে ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের দূর অনুধাবন তথ্য ব্যবহার করে চীনের ১২টি বড় মরুভূমি পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ সময়ে ফটোভোলটাইক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিস্তৃতি শূন্য থেকে বেড়ে ১০২.৫৬ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়ায়। এসব স্থাপনার ভেতরে সবুজ হয়ে ওঠা এলাকার আয়তন ছিল ৩০.৮০ বর্গকিলোমিটার, যা সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট আয়তনের ৩০ শতাংশ। গবেষকেরা এর পেছনে মূলত অনুকূল জলবায়ুর পাশাপাশি সরকার পরিচালিত ফটোভোলটাইক মরুভূমি নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পকে দায়ী করেছেন।
চীনের বাইরেও একই নীতি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রজেক্ট নেক্সাসে পরীক্ষা করা হচ্ছে, সান ফ্রান্সিসকোর পূর্বে হিকম্যান খালের ওপর সৌরপ্যানেল বসালে বাষ্পীভবন ঠেকিয়ে কীভাবে ৬ হাজার ৩০০ কোটি গ্যালন পানি সাশ্রয় করা যায়। মরুভূমিকে সবুজ করার সঙ্গে এর পরিসরের পার্থক্য থাকলেও এর পেছনের পদার্থবিজ্ঞান একই। ছায়া পানির ক্ষয় কমায় ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, যা শুষ্ক পরিবেশে উদ্ভিদ জন্মানো বা পানি সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি করে।
সম্ভাবনা, ব্যাপ্তি ও সতর্কতা
একেকটি স্থানে পরিবেশগত সুফলের প্রমাণ শক্তিশালী হলেও নির্বিচারে সম্প্রসারণের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন গবেষকেরা। জলবায়ু মডেল বলছে, অত্যন্ত বড় পরিসরের স্থাপনা আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহের ধরন বদলে দিতে পারে, যার প্রভাব সৌরপ্যানেল থেকে বহু দূরের বৃষ্টিপাতপ্রবণ এলাকায়ও পড়তে পারে। ভূপৃষ্ঠের প্রতিফলন ক্ষমতার (অ্যালবেডো) পরিবর্তন এবং তাপের পুনর্বণ্টনের প্রভাব পার্কের সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সুফলগুলো নকশা ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করে। প্যানেলের উচ্চতা, সারির মধ্যকার দূরত্ব এবং বিন্যাসের দিক মাটিতে আলো ও আর্দ্রতা কতটা পৌঁছাবে, তা উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে। দক্ষিণমুখী প্যানেলের তুলনায় পূর্ব-পশ্চিমমুখী বিন্যাসে আলো আরও সমানভাবে ছড়াতে পারে। যথাযথ ক্ষয়রোধ ও পানিব্যবস্থাপনা না থাকলে ইতিবাচক প্রভাব নাজুক বা সাময়িক হয়ে থাকতে পারে। স্থান নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; প্রকল্পের জন্য সংবেদনশীল আবাসস্থল ও প্রাণীর চলাচলের করিডর এড়িয়ে চলতে হবে।
দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ আরেকটি চ্যালেঞ্জ। এই মরুভূমিগুলোর অধিকাংশ সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র ১৫ বছরেরও কম সময় ধরে চলছে। উদ্ভিদের বৃদ্ধি স্থাপনাগুলোর বয়স বাড়ার সঙ্গে টিকে থাকে কি না, ধুলা জমার ধরন কীভাবে বদলাতে পারে এবং পরিবর্তিত ক্ষুদ্র জলবায়ু স্থানীয় জীববৈচিত্র্য বা মাটির রসায়নে অপ্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারে কি না, তা জানতে বিজ্ঞানীদের কয়েক দশকের তথ্য প্রয়োজন।
মূল কথা
- তিব্বতি মালভূমিতে ছিংহাই প্রদেশের ১৬২ বর্গমাইলজুড়ে বিস্তৃত গংহে ফটোভোলটাইক পার্ক উচ্চতায় বিশ্বের বৃহত্তম সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র।
- বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নিশ্চিত হওয়া গেছে, সৌরপ্যানেলগুলো শীতল ও আর্দ্র ক্ষুদ্র জলবায়ু তৈরি করেছে। ফলে পার্কের ভেতরে উদ্ভিদের আচ্ছাদন বেড়ে ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে আগে প্রায় পুরো এলাকাই মরুকরণের শিকার ছিল।
- অনাবৃত মরুভূমির তুলনায় প্যানেলের নিচে মাটির আর্দ্রতা প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছে, আর বাতাসের গতি কমেছে ৫০ শতাংশ।
- কৃষি-সৌরবিদ্যুৎ নামে পরিচিত ব্যবস্থায় স্থানীয় পশুপালকেরা এখন প্যানেলের নিচে ২০ হাজারের বেশি ভেড়া চরান। এতে তাঁদের লাখ লাখ ইউয়ান আয় হচ্ছে এবং প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভিদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে।
- চীনের ১২টি মরুভূমিতে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ৩০ শতাংশ এলাকায় উল্লেখযোগ্যভাবে সবুজায়ন হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ ও সতর্কভাবে স্থান নির্বাচন এখনও জরুরি বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন।






