রেকর্ড সর্বনিম্ন জন্মহার ও অস্তিত্বের হুঁশিয়ারি
সিঙ্গাপুরে মোট প্রজনন হার ২০২৫ সালে নেমে এসেছে ০.৮৭-এ, যা দেশটির নথিভুক্ত ইতিহাসে সর্বনিম্ন এবং স্থিতিশীল জনসংখ্যা ধরে রাখতে নারীপ্রতি ২.১ সন্তানের প্রতিস্থাপন-স্তরের চেয়ে অনেক কম। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে উপপ্রধানমন্ত্রী গ্যান কিম ইয়ং পার্লামেন্টে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে এই প্রবণতাকে “অস্তিত্বের সংকট” হিসেবে বর্ণনা করেন, যা নগর-রাষ্ট্রটির সমাজ ও অর্থনীতির মূল কাঠামোর জন্য হুমকি। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির বাসিন্দাদের মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার ৫০০ শিশুর জন্ম হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ কম এবং নথি সংরক্ষণ শুরুর পর নবজাতকের সর্বনিম্ন সংখ্যা।
সূচিপত্র
- রেকর্ড সর্বনিম্ন জন্মহার ও অস্তিত্বের হুঁশিয়ারি
- পরিসংখ্যানের পেছনের ব্যক্তিগত হিসাব
- ‘দুটি হলেই যথেষ্ট’ থেকে ‘সামর্থ্য থাকলে তিন বা তার বেশি’
- বিশ্বজনীন প্রবণতা, স্থানীয় বাস্তবতা
- কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি ও লিঙ্গবৈষম্য
- প্রবণতার বিপরীতে যাওয়া দেশগুলোর শিক্ষা
- অভিবাসন ও নাগরিকদের মূল ভিত্তি
- আমূল পুনর্বিন্যাস ও অনুত্তরিত প্রশ্ন
- মূল বিষয়গুলো
এই পতনের গাণিতিক হিসাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে, আজকের প্রতি ১০০ জন বাসিন্দার সন্তান হবে মাত্র ৪৪ জন, আর নাতি-নাতনি হবে মাত্র ১৯ জন। ব্যবস্থা না নিলে ২০৪০-এর দশকের শুরুতেই সিঙ্গাপুরের নাগরিক জনসংখ্যা কমতে শুরু করতে পারে। দ্রুত বার্ধক্যের কারণে পরিস্থিতি আরও জরুরি হয়ে উঠছে: এখন প্রতি পাঁচজন নাগরিকের একজনের বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি, যা মাত্র এক দশক আগে ছিল প্রতি আটজনে একজন। জনসংখ্যার এই পরিবর্তনে নির্ভরশীলতার অনুপাত এমন পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে, যেখানে কর্মক্ষম প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ককে ২.৪ জন প্রবীণের ভরণপোষণ করতে হবে; এতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ও পেনশন কাঠামোর ওপর চাপ বাড়বে।
পরিসংখ্যানের পেছনের ব্যক্তিগত হিসাব
এই পরিসংখ্যানের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক চাপ ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রভাবে নেওয়া ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। ৩১ বছর বয়সী ব্যবসা পরামর্শক মি. চেন ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম সন্তানের বাবা হন। অনেক তরুণ সিঙ্গাপুরীয় দম্পতির দ্বিধা তাঁর ক্ষেত্রেও স্পষ্ট। বাবা হওয়াকে “গভীরভাবে আনন্দদায়ক” মনে করলেও তিনি ও তাঁর স্ত্রী, যিনি একজন নার্স, ঠিক করেছেন যে একটি সন্তানই যথেষ্ট। বন্ধুদের সঙ্গে তাঁদের সাপ্তাহিক নৈশভোজের আয়োজন বন্ধ হয়ে গেছে; তার জায়গা নিয়েছে শিশুর যত্নের নিরলস ব্যস্ততা।
তাঁর যুক্তিতে সিঙ্গাপুরের কর্মসংস্কৃতি নিয়ে আরও বিস্তৃত উদ্বেগের প্রতিফলন রয়েছে। তিনি বলেন, “কর্মীদের পরিবারের সঙ্গে বেশি সময় কাটানোর সুযোগ দিলে নিয়োগকর্তাদের লাভ হয় না। যে কর্মী কাজে বেশি সময় দিতে পারে, সন্তানকে স্কুল থেকে আনতে যে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যায় তার চেয়ে সে-ই নিয়োগকর্তার বেশি কাজে আসে।” সন্তান নেওয়া ও পেশাগত উন্নতি পরস্পরের সঙ্গে অসংগত—এমন ধারণার কারণে অনেকে পরিবার ছোট রাখেন, অথবা সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
৩৭ বছর বয়সী অবিবাহিত নার্স মিস হাসলিন্দা হাসান এই প্রবণতার আরেকটি দিক তুলে ধরেন। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি সন্তানহীন থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেন, “হয়তো আমি একটু স্বার্থপর; শুধু নিজের জন্য কিছু সময় চাই। পূর্ণতা অনুভব করতে আমার সন্তানের প্রয়োজন নেই।” একসময় সমাজে এমন মনোভাবের কারণে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মুখে পড়তে হতো, কিন্তু এখন মিলেনিয়াল ও জেন জেড প্রজন্মের মধ্যে তা বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। তাঁরা প্রচলিত পারিবারিক কাঠামোর বদলে পেশাগত উন্নয়ন, ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত পরিপূর্ণতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
‘দুটি হলেই যথেষ্ট’ থেকে ‘সামর্থ্য থাকলে তিন বা তার বেশি’
বর্তমান সংকটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বিশেষ ঐতিহাসিক পরিহাস। ১৯৭০-এর দশকে সিঙ্গাপুর সরকার ‘দুটি হলেই যথেষ্ট’ প্রচারাভিযান জোরেশোরে চালায়। এর ফলে মোট প্রজনন হার ১৯৬৫ সালের ৪.৬৬ থেকে কমে ১৯৭৫ সালের মধ্যে প্রতিস্থাপন-স্তরের নিচে নেমে আসে। জনসচেতনতামূলক প্রচার, আবাসন বরাদ্দে বড় পরিবারের জন্য নিরুৎসাহমূলক ব্যবস্থা এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্বের দ্রুততম জনমিতিক পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটানো হয়।
১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে পারেন, তাঁদের সাফল্যই দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্লোগান বদলে হয় ‘সামর্থ্য থাকলে তিন বা তার বেশি সন্তান নিন’। এরপর চার দশক ধরে সন্তান জন্মদানে উৎসাহমূলক নীতি নেওয়া হয়; এর মধ্যে ছিল সন্তান জন্মের জন্য বোনাস, কর ছাড়, শিশুযত্নে ভর্তুকি এবং পরিবারকে আবাসনে অগ্রাধিকার। এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও প্রজনন হার ক্রমাগত কমেছে: ২০০১ সালের ১.৪১ থেকে নেমে এখন ০.৮৭। এই ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দেয়, গভীরতর কাঠামোগত শক্তির বিরুদ্ধে নীতিগত পদক্ষেপ হয়তো কার্যকর হতে হিমশিম খাবে।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সিঙ্গাপুরের নীতি নিয়ে গবেষণারত পিএইচডি প্রার্থী জুলিয়াস মোক পরিস্থিতি নিয়ে অকপটে মূল্যায়ন করেছেন।
সরকার বুঝতে পেরেছে এবং এখন যথার্থ কারণেই আতঙ্কিত যে এসব [নীতি] কাজ করছে না।
পরপর বিভিন্ন প্রণোদনার প্যাকেজ নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বদলাতে না পারা নীতিনির্ধারকদের হতাশার প্রতিফলন এই বক্তব্যে রয়েছে। প্রজনন হারের ধারাবাহিক পতন থেকে বোঝা যায়, শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে সন্তান জন্মদানে নিরুৎসাহমূলক মনোভাবের উত্তরাধিকার কাটিয়ে ওঠা বা শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জীবনযাপনের অগ্রাধিকারে মৌলিক পরিবর্তন সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
বিশ্বজনীন প্রবণতা, স্থানীয় বাস্তবতা
সিঙ্গাপুরের এই সংকট প্রায় সব উন্নত অর্থনীতিতেই দেখা যাওয়া বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) তথ্য অনুযায়ী, তাদের সদস্য দেশগুলোতে নারীপ্রতি গড় প্রজনন হার ১৯৬০ সালের ৩.৩ সন্তান থেকে ২০২২ সালে অর্ধেকেরও বেশি কমে মাত্র ১.৫-এ দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২৩ সালে বিশ্বরেকর্ড সর্বনিম্ন ০.৭২ প্রজনন হার দেখা যায়। জাপান, তাইওয়ান, হংকং ও চীনের বড় শহরগুলোতেও একই রকম উদ্বেগজনক চিত্র।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আশার আলো দেখায়। টানা আট বছর পতনের পর দেশটির প্রজনন হার ২০২৫ সালে সামান্য বেড়ে ০.৮ হয়েছে। ২০০৬ সাল থেকে দেশটির সরকার ৩৬০ ট্রিলিয়ন ওনের (প্রায় ২৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বেশি বিনিয়োগ করেছে। সিউলের ‘জন্ম সহায়তা প্রকল্পে’ নবদম্পতিদের জন্য কল্যাণমূলক আবাসন, ডে-কেয়ারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিটি জন্মের জন্য ২০ লাখ ওনের নগদ অনুদান দেওয়া হয়। দম্পতিদের জন্য অভিভাবকীয় ছুটির মেয়াদ এখন সর্বোচ্চ তিন বছর। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জিন ইয়ংয়ের ভাষায়, এতে “লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক রীতিনীতি বদলাতে তারা যে আন্তরিক, সে বিষয়ে স্পষ্ট ও জোরালো বার্তা” দেওয়া হয়েছে।
কোরিয়ার এই পুনরুদ্ধার দেখায়, বিভিন্ন খাতে ধারাবাহিক ও সমন্বিত উদ্যোগ পতনের গতি কমাতে পারে, যদিও তা পুরোপুরি উল্টে দেওয়া এখনো কঠিন। সিঙ্গাপুর ইতিমধ্যে এ ধরনের অনেক ব্যবস্থা নিয়েছে। তাই স্থানীয় মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনতে কোন নীতি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সমন্বয় কার্যকর হতে পারে, সেটি চিহ্নিত করাই এখন চ্যালেঞ্জ।
কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি ও লিঙ্গবৈষম্য
সন্তান নেওয়ার পথে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ যে বড় বাধা, তা ক্রমেই বেশি করে তুলে ধরছে একাডেমিক গবেষণা। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সেনহু ওয়াংয়ের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, নমনীয় কর্মব্যবস্থা ২৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী অবিবাহিত সিঙ্গাপুরীয়দের সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, বিশেষ করে কর্মঘণ্টা কমলে পুরুষদের সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার সম্ভাবনা বাড়ে; আর সব ধরনের নমনীয়তাই নারীদের এমন ইচ্ছা বাড়ায়।
গবেষণার ফলাফলে ঘরের কাজের বণ্টনে স্থায়ী লিঙ্গবৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। শিশুর যত্নের অসামঞ্জস্যপূর্ণ দায়িত্ব ও পেশাগত সুযোগ হারানোর মাশুল এখনো নারীদেরই বেশি বহন করতে হয়; অন্যদিকে কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি পুরুষদের অভিভাবকীয় ছুটি নিতে নিরুৎসাহিত করে। দক্ষিণ কোরিয়ায় মা-বাবা উভয়ের জন্য এক বছরের অভিভাবকীয় ছুটির ব্যবস্থা থাকলেও ২০২০ সালে যোগ্য বাবাদের মাত্র ৩.৪ শতাংশ এ সুবিধা নিয়েছিলেন; জাপানে এ হার ছিল ১২.৭ শতাংশ। কোরীয় পুরুষেরা দৈনিক মাত্র ৪৯ মিনিট অবৈতনিক কাজ করেন, যা ওইসিডির গড় সময়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ; নারীরা এ কাজে ব্যয় করেন সাড়ে তিন ঘণ্টা।
সিঙ্গাপুরে সম্প্রতি কার্যকর হওয়া নমনীয় কর্মব্যবস্থার অনুরোধসংক্রান্ত নতুন ত্রিপক্ষীয় নির্দেশিকা এসব বাধা মোকাবিলার লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে। তবে নীতিকাঠামোর চেয়ে সাংস্কৃতিক রীতিনীতি বদলানো কঠিন হতে পারে। গবেষণায় দেখা যায়, পেশাগত ক্ষেত্রগুলোতে নিবিড়ভাবে সন্তান লালন-পালনের প্রত্যাশা ও অতিরিক্ত কাজের সংস্কৃতির কারণে সন্তান নেওয়ার ব্যয় বিশেষভাবে বেশি। এসব কাঠামোগত সমস্যা সমাধানে শুধু আইন পরিবর্তন করলেই হবে না; উৎপাদনশীলতার প্রত্যাশা ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের মানদণ্ডও মৌলিকভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
প্রবণতার বিপরীতে যাওয়া দেশগুলোর শিক্ষা
অধিকাংশ উন্নত দেশ জন্মহার কমে যাওয়ার সমস্যায় পড়লেও, সমন্বিত সামাজিক নীতির মাধ্যমে কয়েকটি দেশ জন্মহার স্থিতিশীল রাখতে বা বাড়াতে পেরেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ফ্রান্সে প্রজনন হার ১.৮-এর কাছাকাছি, যা সর্বোচ্চগুলোর একটি। সর্বজনীন শিশুযত্ন সহায়তা, উদার অভিভাবকীয় ছুটি এবং দ্বিতীয় সন্তান থেকে শুরু করে পরিবারগুলোকে মাসিক ভাতা দেওয়ার মাধ্যমে দেশটি এ হার ধরে রেখেছে। এসব সুবিধার উদ্দেশ্য দারিদ্র্য দূর করা নয়; বরং সব আয়স্তরের মানুষের মধ্যে সন্তান নেওয়াকে স্বাভাবিক করে তোলার নাগরিক অবকাঠামো গড়ে তোলা।
হাঙ্গেরি আরও জোরালো আর্থিক উদ্যোগ নিয়েছে। চার বা তার বেশি সন্তান আছে এমন নারীদের জন্য বন্ধকী ঋণ মওকুফ ও আজীবন আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হয়। ২০১০-এর দশকে এসব নীতি চালুর পর হাঙ্গেরির প্রজনন হার ১.২৫ থেকে বেড়ে ২০২১ সালে ১.৬-এ পৌঁছায়; এক দশকে চার বা তার বেশি সন্তান আছে এমন নারীর সংখ্যাও দ্বিগুণ হয়। ইসরায়েল আরেকটি ব্যতিক্রম: রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইভিএফ চিকিৎসা এবং ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ—উভয় সম্প্রদায়েই পরিবার গঠনে সহায়ক সাংস্কৃতিক পরিবেশের কারণে দেশটিতে প্রজনন হার প্রায় ৩.০।
এই উদাহরণগুলো ইঙ্গিত দেয়, আর্থিক, ব্যবহারিক ও সাংস্কৃতিক—সব ধরনের বাধা মোকাবিলা করলে নীতি প্রজনন হারকে প্রভাবিত করতে পারে। সিঙ্গাপুরের বর্তমান নীতিতেও এসব সফল উদ্যোগের কিছু উপাদান রয়েছে, যেমন ভর্তুকিযুক্ত শিশুযত্ন ও সহায়ক প্রজনন চিকিৎসায় সহায়তা। তবে চরম জনঘনত্ব, শিক্ষাক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং কর্মক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক সংস্কৃতিসহ নগর-রাষ্ট্রটির নিজস্ব সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে আরও পদক্ষেপ কার্যকর হবে কি না, তা এখনো প্রশ্ন।
অভিবাসন ও নাগরিকদের মূল ভিত্তি
শুধু দেশের ভেতরের প্রজনন হার দিয়ে জনসংখ্যা ধরে রাখা সম্ভব নয়—এটি স্বীকার করে সিঙ্গাপুর আগামী পাঁচ বছরে প্রতিবছর ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার নতুন নাগরিককে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নেওয়া হবে ৪০ হাজার মানুষকে। উপপ্রধানমন্ত্রী গ্যান জোর দিয়ে বলেছেন, এই অভিবাসন সত্ত্বেও নাগরিক জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বছরে প্রায় ০.৫ শতাংশে নেমে আসবে। সরকার জাতিগত ভারসাম্য বজায় রাখা এবং জনসংখ্যার পরিবর্তনের সঙ্গে অবকাঠামোর তাল মেলানোর অঙ্গীকার করেছে।
জনমিতিক প্রয়োজন ও জাতীয় পরিচয়ের মধ্যে অভিবাসননির্ভরতা এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি করছে। লি কুয়ান ইউ স্কুল অব পাবলিক পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো তান পো লিন সতর্ক করে বলেছেন, নাগরিকদের শক্তিশালী ভিত্তি না থাকলে সিঙ্গাপুর শিকড়-গাড়া জাতি না হয়ে “আন্তর্জাতিক অভিবাসনের আরেকটি আকর্ষণীয় গন্তব্যমাত্র” হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। নতুনদের সমাজে একীভূত করার পাশাপাশি সিঙ্গাপুরের অগ্রগতির বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠা স্বতন্ত্র সামাজিক সংহতি ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ।
অভিবাসন কেবল অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার উপায় নয়, কম প্রজনন হারের ফাঁদ থেকে জনসংখ্যাকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থাও। তবে কৌশল হিসেবে এটি স্থানীয় জন্মহার কমে যাওয়ার মূল সমস্যার পুরোপুরি সমাধান করতে পারে না। সরকারের দ্বিমুখী উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, প্রজনন সহায়তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার পাশাপাশি অভিবাসনের ফলে জনসংখ্যার গঠনে যে পরিবর্তন অনিবার্য, তা সামাল দেওয়া।
আমূল পুনর্বিন্যাস ও অনুত্তরিত প্রশ্ন
সংকট মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মন্ত্রী ইন্দ্রাণী রাজাহকে বিয়ে ও অভিভাবকত্বে সহায়তার বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে পর্যালোচনার জন্য গঠিত নতুন কর্মগোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগে “সমাজব্যাপী পুনর্বিন্যাসের” প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এতে তিনটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে: পরিবার গঠনের বিষয়ে সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন, পরিবারের প্রয়োজনের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতির সামঞ্জস্য এবং মা-বাবাকে সহায়তায় পুরো সমাজকে যুক্ত করা। আগের খণ্ডিত আর্থিক প্রণোদনা যে যথেষ্ট হয়নি, এটি তারই স্বীকৃতি।
পরিবার গঠনে অনিচ্ছাকৃতভাবে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে—এমন কয়েকটি “পবিত্র গরু” নিয়ে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা। পরিবেশের জন্য উপকারী হলেও সিঙ্গাপুরের গাড়িনির্ভরতা কমানোর নীতি একই সময়ে ছোট শিশু ও প্রবীণ মা-বাবার যত্ন নেওয়া পরিবারের জন্য যাতায়াতের জটিলতা তৈরি করে। বিবাহিত দম্পতিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও আবাসননীতি বড় পরিবারের জায়গার চাহিদা যথেষ্ট মেটাতে পারছে না। সহকর্মীদের মধ্যে বিরূপ মনোভাব তৈরি না করে অভিভাবকীয় ছুটির সময়ে বিকল্প কর্মী রাখার খরচ যৌথভাবে বহন করা এবং অফিস সময়ের পর কাজের চাপ কমাতে কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার অধিকার আইনে সুরক্ষিত করার বিষয়ও কর্মগোষ্ঠী বিবেচনা করতে পারে।
এসব সুপারিশ তৈরিতে পরিবর্তিত মনোভাবের ওপর নজর রাখতে ২০২৬ সালে বিস্তৃত বিবাহ ও অভিভাবকত্ব জরিপ করা হবে। কয়েক দশক ধরে কমতে থাকা প্রজনন হার এসব পদক্ষেপে উল্টে দেওয়া যাবে কি না, তা অনিশ্চিত। ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক তান এর্ন সের বলেন, “আরও সময়, আরও অর্থ”—এমন নীতি জরুরি হলেও যথেষ্ট নয়। তিনি অভিভাবকত্বের অন্তর্নিহিত আনন্দের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন: “নিজের রক্ত-মাংসের সন্তানকে ভালোবাসা দেওয়া ও তার কাছ থেকে ভালোবাসা পাওয়ার আনন্দ।”
মূল বিষয়গুলো
- সিঙ্গাপুরে মোট প্রজনন হার ২০২৫ সালে রেকর্ড সর্বনিম্ন ০.৮৭-এ নেমেছে; দেশটিতে মাত্র ২৭ হাজার ৫০০ শিশুর জন্ম নথিভুক্ত হয়েছে
- ব্যবস্থা না নিলে ২০৪০-এর দশকের শুরুতে নাগরিক জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে; কর্মক্ষম প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ককে সম্ভাব্যভাবে ২.৪ জন প্রবীণের ভরণপোষণ করতে হবে
- বিপুল বিনিয়োগের পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রজনন হার ০.৭২ থেকে সামান্য বেড়ে ০.৮ হয়েছে; সিঙ্গাপুর এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে
- কর্মক্ষেত্রের সংস্কৃতি, সামাজিক মনোভাব ও সমাজের সহায়তা নিয়ে কাজ করতে সরকারের নতুন কর্মগোষ্ঠী “সমাজব্যাপী পুনর্বিন্যাস” উদ্যোগ নেবে
- গবেষণায় দেখা গেছে, নমনীয় কর্মব্যবস্থা সন্তান নেওয়ার ইচ্ছা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে, বিশেষ করে পেশাজীবীদের মধ্যে
- কম জন্মহারের প্রভাব সামাল দেওয়া ও জাতিগত ভারসাম্য বজায় রাখতে সিঙ্গাপুর প্রতিবছর ২৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার নতুন নাগরিককে স্বাগত জানানোর পরিকল্পনা করেছে
- ফ্রান্স, হাঙ্গেরি ও ইসরায়েলের অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দেয়, সমন্বিত নীতির মাধ্যমে প্রজনন হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব






