ইতিহাসের গড়া এক জীবন্ত বৈচিত্র্য
তাশখন্দে ভিক্টর পাকের জীবন দেখায়, ব্যক্তিগত গল্প কীভাবে একটি দেশের পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি হতে পারে। পাক কোরীয় বংশোদ্ভূত। শিশুকালে তিনি মা-বাবাকে হারান এবং এক উজবেক পরিবারে বড় হন। তাঁর দাদি ছিলেন সোভিয়েত আমলে নির্বাসিতদের একজন; ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে ওই নির্বাসনের মাধ্যমে হাজার হাজার কোরীয়কে মধ্য এশিয়ায় স্থানান্তর করা হয়েছিল। বর্তমানে কোরিও সারাম নামে পরিচিত এই জনগোষ্ঠী উজবেকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে শিকড় গেড়েছে। পাক উজবেকদের আন্তরিকতায় বেড়ে উঠেছেন, পাশাপাশি লালন করেছেন কোরীয় ঐতিহ্য। এখন তিনি উজবেকিস্তানের কোরীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রসমূহের সমিতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। প্রায়ই তিনি বলেন, দুটি সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হওয়া গর্ব ও সংযোগের উৎস। তাঁর অভিজ্ঞতায় নতুন উজবেকিস্তানের একটি মূল ধারণা প্রতিফলিত হয়: সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে জনসম্পদ ও সামাজিক বন্ধন হিসেবে বিবেচনা করা।
সূচিপত্র
এ ধারণা এখন রূপ নিয়েছে যৌথ আয়োজনের ব্যস্ত সূচি এবং মানুষকে একত্র করা নানা প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কে। সারা দেশে সক্রিয় রয়েছে ১৫৭টি জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে ভাষার ক্লাস, সংগীত পরিবেশনা, প্রদর্শনী ও কমিউনিটিভিত্তিক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। রাষ্ট্রীয় সেবায় কাজ করেন ৩৫টি জাতিগত পটভূমির প্রায় ৫ হাজার সরকারি কর্মচারী। জাতীয় ও স্থানীয় আইনসভাতেও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ২০২১ সাল থেকে ৩০ জুলাই নগরজুড়ে আয়োজিত উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে উজবেকিস্তানে পালিত হচ্ছে জনগণের বন্ধুত্ব দিবস। এ বছর ২২টি প্যাভিলিয়নে বেলারুশীয়, কাজাখ, কিরগিজ, কোরীয়সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ও শিল্প তুলে ধরা হয়। সহযোগিতা ও সামাজিক সংহতি জোরদারে অবদানের জন্য ৫০ জন নাগরিককে জনগণের বন্ধুত্ব পদকে ভূষিত করা হয়েছে।
জনউৎসব এই দৃষ্টিভঙ্গির দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফসল উৎসব, সাংস্কৃতিক মেলা ও যৌথ উদ্যাপনে সারা দেশ থেকে হাজারো মানুষ যোগ দেন। বার্তাটি সহজ: সবাই এই সমাজের অংশ, আর সবারই ভাগ করে দেওয়ার মতো কিছু আছে। নীতি ও সম্পদের সমর্থনে গড়ে ওঠা এই একসঙ্গে থাকার গুরুত্ব বৈচিত্র্যকে স্লোগানের বদলে দৈনন্দিন চর্চায় পরিণত করতে সাহায্য করে।
নীতি থেকে বাস্তব চর্চা: বৈচিত্র্যের সুরক্ষা
উজবেকিস্তানের নেতৃত্ব আন্তঃজাতিগত সম্প্রীতিকে অভ্যন্তরীণ নীতির মূল অংশ হিসেবে তুলে ধরে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আইনের চোখে সমতা এবং জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বাস্তব সহযোগিতা এগিয়ে নিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করা হয়েছে। দেশটি বন্ধুত্ব সমিতিগুলোকে সহায়তা করে এবং বিদেশে প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগে উৎসাহ দেয়। এর ফলে জাতীয় সীমানার বাইরেও সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধ বাড়ে এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ জোরদার হয়।
এই উদ্যোগের ভিত্তি হলো দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোর নেটওয়ার্ক। এসব কেন্দ্রে ভাষাশিক্ষার্থী, সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী এবং কমিউনিটির খোঁজে থাকা তরুণদের জন্য দ্বার খোলা থাকে। কেন্দ্রগুলো প্রায়ই স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে এমন কর্মসূচির আয়োজন করে, যাতে কেবল কোনো একটি গোষ্ঠীর সদস্য নয়, সব বাসিন্দাই অংশ নিতে পারেন। এতে এমন যৌথ পরিসর তৈরি হয়, যেখানে প্রতিবেশীরা মিলিত হন এবং একে অপরের রীতিনীতি সম্পর্কে জানেন। অনেক পরিবারের শিশুরা পাঠ্যবই থেকে নয়, এসব কেন্দ্রেই প্রথম অন্য কোনো ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়।
জনগণের বন্ধুত্ব দিবস এই উদ্যোগের শীর্ষ আয়োজন। এ বছরের ‘উজবেকিস্তান, আমাদের অভিন্ন মাতৃভূমি’ প্রতিপাদ্যের অনুষ্ঠান দর্শনার্থীদের দেশের নানা পরিচয়ের জীবন্ত প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে ঘুরে দেখার আহ্বান জানায়। একটি প্যাভিলিয়নে বেলারুশের নগর ভবনের আদলে সাজানো হয়েছিল। অন্যটিতে বোনা কাপড় ও গৃহস্থালির সামগ্রীসহ কাজাখ ও কিরগিজদের ইউর্ট তাঁবু তুলে ধরা হয়। দর্শনার্থীরা বিভিন্ন ভাষায় গান শোনেন, আঞ্চলিক খাবারের স্বাদ নেন এবং কারিগরদের কাজ দেখেন। উৎসবের পাশাপাশি ঐক্যবিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রতিবেশী দেশসহ দূরদূরান্তের অংশগ্রহণকারীরা আলোচনা করেন, সাংস্কৃতিক সহযোগিতা কীভাবে স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। এসব উদ্যোগ দেশের ভেতরে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ায় এবং পুরো অঞ্চলে সদিচ্ছা গড়ে তোলে।
প্রতিবেশীদের এক করে উৎসব ও দৈনন্দিন রীতিনীতি
উজবেকিস্তানের উৎসবগুলো যৌথ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ঐক্যের ছবি তুলে ধরে। প্রতিবছরের ফসল উৎসবে হাজারো দর্শনার্থী আসেন; এতে সহায়তা দেয় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। পরিবারগুলো এক মঞ্চ থেকে অন্য মঞ্চে ঘুরে লোকজ দলের পরিবেশনা দেখে, আর স্টলগুলোতে থাকে দেশের নানা প্রান্তের হস্তশিল্প। অনেকে খাবারের টানে আসেন, তবে আলাপচারিতা, নাচের কর্মশালা ও শিশুদের আয়োজনে যে মেলবন্ধন তৈরি হয়, তার জন্য থেকে যান। পরিবেশটি অনাড়ম্বর, কিন্তু এতে একে অপরকে স্বীকৃতি ও সম্মান জানানোর অভ্যাস গড়ে ওঠে।
বসন্তের উৎসবগুলো ঐতিহ্য ও নতুন করে শুরুর এই মেলবন্ধন তুলে ধরে। মার্চের শেষে পালিত প্রাচীন নববর্ষ নওরোজ নতুন জীবনের সূচনা ও আতিথেয়তার উদ্যাপন। মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশে ১ মে সোভিয়েত আমলের কুচকাওয়াজ থেকে বদলে ভিন্ন ধরনের আয়োজনে রূপ নিয়েছে। উজবেকিস্তানে ১ মে ঝরনা দিবস হিসেবে পালিত হয়; এটি আনুষ্ঠানিক সরকারি ছুটির দিন নয়, বরং ঋতু পরিবর্তনের স্মারক। এই পরিবর্তন দেখায়, পুরোনো ঐতিহ্য সমকালীন জীবনে নতুন অর্থ পেলেও কীভাবে মানুষকে অভিন্ন জনপরিসরে একত্র করতে পারে।
ধর্মীয় ছুটিও দেশবাসীকে একত্র করে। ২০২৫ সালে উজবেকিস্তানে ঈদুল ফিতরের প্রথম দিন পড়েছে ৩০ মার্চ, রবিবার। দেশজুড়ে পরিবারগুলো যাতে একসঙ্গে উদ্যাপন করতে পারে, সে জন্য রাষ্ট্রপতির এক ডিক্রিতে সরকারি ছুটি সোমবারে সরিয়ে নেওয়া হয়। ডিক্রিতে জনপরিসরের বক্তব্যে প্রায়ই গুরুত্ব পাওয়া মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতার মতো মূল্যবোধের ওপর জোর দেওয়া হয়। ছুটির সময় স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোকে সহায়তারও আহ্বান জানানো হয়। বহুজাতিক সমাজে সামাজিক সংহতি ও সবার অংশগ্রহণমূলক উদ্যাপনের প্রতি নাগরিক অঙ্গীকারের দৃষ্টান্ত এসব পদক্ষেপ।
ভাষাশিক্ষা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ
উজবেকিস্তান আন্তঃজাতিগত সম্প্রীতিকে অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের সঙ্গে যুক্ত করে; ইউনেস্কো এই ধারণাটি এগিয়ে নেয়। অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণবিষয়ক ২০০৩ সালের কনভেনশনের অধীনে সাম্প্রতিক এক পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদনে দেশটি ২০২০ সাল থেকে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষায় ঐতিহ্যবাহী চর্চা যুক্ত করা, কমিউনিটিনির্ভর নথিভুক্তকরণে সহায়তা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক তালিকা হালনাগাদ রাখা। এই পদ্ধতিতে ঐতিহ্য ধারণ ও প্রজন্মান্তরে সঞ্চারকারী কমিউনিটি, গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়; তাঁদের সহায়তায় রয়েছে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও গবেষণা। ইউনেস্কোর প্রতিবেদনব্যবস্থায় এসব নীতির সারসংক্ষেপ পাওয়া যাবে এই লিংকে: উজবেকিস্তান বিষয়ে ইউনেস্কো আইসিএইচের পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন।
জীবন্ত ঐতিহ্য কমিউনিটির দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। ইউনেস্কোর তালিকাভুক্ত নওরোজ, পালভ তৈরির সংস্কৃতি এবং আসকিয়ার মৌখিক শিল্পের মতো চর্চা উজবেকিস্তানে রয়েছে। ধ্রুপদি সংগীত ও নৃত্যের ধারাগুলো এখনো সক্রিয়, আর কারুশিল্পের বিদ্যালয়গুলো তরুণ প্রজন্মের কাছে দক্ষতা পৌঁছে দিতে সহায়তা করে। সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও বিদ্যালয়ে কর্মশালার আয়োজন করা হয়, যেখানে প্রবীণেরা আচার-অনুষ্ঠান, গান ও খাবারের পেছনের গল্প বলেন। এ ধরনের হাতে-কলমে অংশগ্রহণ শিশুদের নিজেদের ঐতিহ্যের কদর করতে শেখায়, পাশাপাশি প্রতিবেশীদের ঐতিহ্য বুঝতে ও সম্মান করতেও সাহায্য করে।
ভাষাশিক্ষার ব্যবহারিক গুরুত্ব রয়েছে। অনেক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে বিনা মূল্যে বা স্বল্প খরচে ক্লাস হয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা পাশাপাশি উজবেক ও অন্য কোনো কমিউনিটির ভাষা শেখে। শিক্ষকরা প্রায়ই অনানুষ্ঠানিক বিনিময় পর্বের আয়োজন করেন; সেখানে অংশগ্রহণকারীরা সাধারণ অভিবাদন, গান ও সহজ কথোপকথনের চর্চা করেন। শেখার ছোট ছোট মুহূর্ত দূরত্ব কমায় এবং ভুল করার ভয় ছাড়াই দৈনন্দিন জীবনে মেলামেশার আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। সামাজিক সংহতির নীরব চালিকাশক্তিগুলোর একটি এই আত্মবিশ্বাস।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট: সহযোগিতা ও তুলনা
মধ্য এশিয়ার ইতিহাস চলাচল ও বিনিময়ের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাণিজ্যপথ কাস্পিয়ান সাগর থেকে তিয়ান শান পর্যন্ত শহরগুলোকে যুক্ত করেছে। ১৯৯১ সালের পর স্বাধীন হওয়া আধুনিক প্রজাতন্ত্রগুলোর মধ্যে সীমান্তের দুই পাশেই ভাষা, খাবার ও পারিবারিক সম্পর্কের মিল রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অঞ্চলের নেতারা পারস্পরিক পরামর্শ বাড়িয়েছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সি৫+১ বৈঠক এবং চীনের সঙ্গে সি৫ বৈঠকের মতো বড় অংশীদারদের নিয়ে বিভিন্ন আয়োজন শুরু করেছেন। লক্ষ্য হলো ভৌগোলিক অবস্থান ও ঐতিহ্যকে বাণিজ্য এবং স্থিতিশীলতার সুবিধায় রূপ দেওয়া।
উজবেকিস্তানের ঐক্যের উদ্যোগ এই বৃহত্তর ধারারই অংশ। নিরাপত্তা ও সংস্কৃতি—উভয় ক্ষেত্রেই সহযোগিতার প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সমরকন্দে ‘ইউনিটি ২০২৫’ আঞ্চলিক সামরিক মহড়া শুরু হয়। এতে আজারবাইজান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের সেনাসদস্যরা অংশ নেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকতা ও পরিবেশনা মিলেমিশে ছিল। জাতীয় সংগীত বাজানো হয়, কমান্ডাররা যৌথ প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দেশের গান পরিবেশিত হয়। এ ধরনের আয়োজন পেশাগত পরিচিতি বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক বন্ধুত্বের অনুভূতিও জোরদার করে।
বৈচিত্র্য সামলাতে প্রতিবেশী দেশগুলোও নিজেদের পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। কাজাখস্তানে ১ মে জনগণের ঐক্য দিবস পালিত হয় এবং জাতিগত নীতি সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছে জনগণের পরিষদ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি উদ্যাপন ও প্রতিষ্ঠান সহায়ক হলেও এগুলো একা স্থানীয় উত্তেজনা ঠেকাতে পারে না। অঞ্চলের কিছু এলাকার অভিজ্ঞতা বলছে, ধারাবাহিক বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ প্রতিক্রিয়া এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সমস্যা সমাধান জাতীয় ঘোষণার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। সবার জন্য শিক্ষাটি সহজ: প্রতীক সুর বেঁধে দেয়, কিন্তু ফল নির্ধারণ করে বাস্তব চর্চা।
বৃহত্তর প্রতিবেশী অঞ্চলে নেতারা প্রায়ই জনজীবনে সংস্কৃতির ভূমিকার ওপর জোর দেন। সাম্প্রতিক এক এশীয় ফোরামে জাতীয় বৈচিত্র্য থেকে বৈশ্বিক সংহতির পথে এগোনোর বিষয়টি প্রতিপাদ্য ছিল। জলবায়ু, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলার পাশাপাশি দেশগুলো যখন অভিন্ন ভিত্তি খুঁজছে, তখন এ ধরনের বক্তব্য সময়ের চাহিদার সঙ্গে মেলে। আন্তঃজাতিগত সম্প্রীতি সমর্থনে উজবেকিস্তানের রেকর্ড এই আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে মধ্য এশিয়া আলোচনার সুবিধাভোগী নয়, বরং অবদানকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারে।
বাস্তবে যা কাজ করে, আর যেসব চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে
উজবেকিস্তানের মডেলের কয়েকটি শক্তিশালী দিক রয়েছে। এটি স্বীকার করে যে পরিচয় ব্যক্তিগত ও বহুস্তরবিশিষ্ট। একই সঙ্গে মানুষকে নিজেদের ঐতিহ্য বিসর্জন না দিয়েই জনজীবনে অংশ নেওয়ার দৃশ্যমান সুযোগ দেয়। ১৫৭টি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে শুরু করে ডজনখানেক বন্ধুত্ব সমিতি পর্যন্ত বিস্তৃত সহায়তার ফলে শহর ও ছোট শহরগুলোতেও কর্মসূচি পৌঁছানো সম্ভব হয়। উৎসব ও সম্মেলন সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার অভিন্ন বয়ান তৈরি করে। রাষ্ট্রীয় সেবা ও আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব এই বার্তা দেয় যে সরকারি প্রতিষ্ঠান সব নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত। এসব সিদ্ধান্ত মানুষের প্রত্যাশা গড়ে তোলে, আর সেই প্রত্যাশা আচরণেও প্রভাব ফেলে।
তবে কিছু চ্যালেঞ্জেও সার্বক্ষণিক নজর দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, রাজধানী ও বড় শহরের বাইরে অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা; সেখানে সাংস্কৃতিক আয়োজন বা ভাষার ক্লাসে প্রবেশের সুযোগ অসম হতে পারে। দ্বিতীয়ত, অগ্রগতি পরিমাপ। অনুষ্ঠান ও কেন্দ্রের সংখ্যা গণনা করা সহজ, কিন্তু দৈনন্দিন মেলামেশা সবার কাছে ন্যায্য মনে হয় কি না, কিংবা সেবাগুলো বাস্তবে সহজলভ্য কি না, তা পরিমাপ করা কঠিন। তৃতীয়ত, শিক্ষা। সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রতি সংবেদনশীলতা বজায় রেখে বিদ্যালয়গুলোকে অভিন্ন পাঠ্যক্রমের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এ ভারসাম্য যথাযথভাবে বজায় রাখতে প্রশাসকদের প্রায়ই প্রশিক্ষণ ও সম্পদের প্রয়োজন হয়। সবশেষে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দ্রুত ভুল বোঝাবুঝি ছড়িয়ে দিতে পারে। গুজব সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ালে দ্রুত পদক্ষেপ ও শান্তভাবে যোগাযোগ করা জরুরি।
আঞ্চলিক গবেষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মীরা প্রায়ই যেসব পদক্ষেপের কথা বলেন, তার মধ্যে রয়েছে জাতিগত নীতির নিয়মিত ও স্বাধীন পর্যালোচনা, স্থানীয় প্রয়োজন সম্পর্কে উন্নত তথ্য সংগ্রহ, পাড়াপ্রতিবেশী পর্যায়ে মধ্যস্থতার সক্ষমতা জোরদার এবং বিদ্যালয় ও যুব ক্লাবে শ্রদ্ধাশীল সংলাপের দক্ষতা শেখানো। সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও স্থানীয় নেতারা অভিভাবকদেরও সহায়তা করতে পারেন, কারণ পারিবারিক জীবনেই শিশুরা প্রথম ভিন্নতাকে বুঝতে শেখে। মাহাল্লা, ঐতিহ্যবাহী পাড়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে, ছোট সমস্যা বড় হওয়ার আগেই সমাধানের একটি মূল্যবান ক্ষেত্র। এসব বিষয়ে দৈনন্দিন দক্ষতা আনুষ্ঠানিক কোনো নীতি পরীক্ষার মুখে পড়ার অনেক আগেই সমাজের সহনশীলতা বাড়ায়।
উজবেকিস্তানের বাইরেও কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
ভিক্টর পাকের মতো গল্প বৃহত্তর আন্তর্দেশীয় বাস্তবতার অংশ। মধ্য এশিয়ার কোরীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলটিকে কোরীয় উপদ্বীপের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। এখন বাণিজ্য, শিক্ষার্থী বিনিময় ও শ্রমিকদের চলাচল দুই দিকেই হচ্ছে। মধ্য এশিয়ার ক্রমবর্ধমানসংখ্যক নাগরিক কোরিয়ায় কাজ করেন; তাতে নতুন সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, যা পরিবার ও ব্যবসাকে প্রভাবিত করছে। প্রতিটি সফল বিনিময় আস্থা গড়ে তোলে, যা শিক্ষা থেকে প্রযুক্তি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশগুলোর সহযোগিতায় সহায়তা করে।
স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উজবেকিস্তান পাশাপাশি বসবাসকারী বিভিন্ন কমিউনিটির আবাসভূমি হিসেবে মধ্য এশিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়ায়। এ সুনাম পর্যটক, শিক্ষার্থী ও বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে সেতু হিসেবে অঞ্চলের ভূমিকাকেও সমর্থন করে। মধ্য এশিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া ট্রানজিট রুটগুলো, যা প্রায়ই ‘মিডল করিডর’ নামে পরিচিত, অবকাঠামোর পাশাপাশি আস্থার ওপরও নির্ভরশীল। সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাস, ন্যায্য আচরণ এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ সেই আস্থা গড়ে তোলা সহজ করে।
মূল কথা
- অংশগ্রহণে উৎসাহ দেওয়া নীতি, প্রতিষ্ঠান ও জনউৎসবের মাধ্যমে উজবেকিস্তান বহুজাতিক সমাজকে সমর্থন করে।
- সারা দেশে ১৫৭টি জাতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে। বিদেশে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বাড়াতে আছে বন্ধুত্ব সমিতি ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ।
- রাষ্ট্রীয় সেবায় ৩৫টি জাতিগত পটভূমির প্রায় ৫ হাজার সরকারি কর্মচারী কাজ করেন এবং জাতীয় ও স্থানীয় আইনসভায় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে।
- ২০২১ সালে চালু হওয়া জনগণের বন্ধুত্ব দিবস ৩০ জুলাই পালিত হয়। এ আয়োজনে রয়েছে ২২টি প্যাভিলিয়ন এবং পাশাপাশি বিভিন্ন ঐতিহ্য ঘুরে দেখেন বিপুলসংখ্যক মানুষ।
- সহযোগিতা ও সামাজিক সংহতি গড়ে তোলার স্বীকৃতিস্বরূপ এ বছর ৫০ জন নাগরিক জনগণের বন্ধুত্ব পদক পেয়েছেন।
- ঈদুল ফিতর ও নওরোজসহ ধর্মীয় ও ঋতুভিত্তিক উদ্যাপনকে ঐক্য ও পারস্পরিক সহায়তার সুযোগ হিসেবে দেখা হয়।
- ইউনেস্কুতে উজবেকিস্তানের প্রতিবেদন অমূর্ত ঐতিহ্যকে শিক্ষায় যুক্ত করা এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করার পদক্ষেপ তুলে ধরে।
- আঞ্চলিক সহযোগিতায় সাংস্কৃতিক সংলাপের পাশাপাশি সমরকন্দে ‘ইউনিটি ২০২৫’-এর মতো নিরাপত্তা মহড়াও রয়েছে, যেখানে প্রশিক্ষণের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময় হয়।
- প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে বড় শহরের বাইরে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, দৈনন্দিন অন্তর্ভুক্তির ভালো পরিমাপ এবং ঐক্য ও বৈচিত্র্য—দুইয়ের উপযোগী শিক্ষা।
- দেশের অভ্যন্তরে অগ্রগতি মধ্য এশিয়ার স্থিতিশীল ও স্বাগতপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে ভাবমূর্তি জোরদার করে এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সহযোগিতায় সহায়তা করে।






