কাশ্মীরে বই নিষিদ্ধ: সেন্সরশিপ, স্মৃতি ও বয়ান নিয়ন্ত্রণের লড়াই

পড়তে 9 মিনিট
কাশ্মীরে বই নিষিদ্ধ: সেন্সরশিপ, স্মৃতি ও বয়ান নিয়ন্ত্রণের লড়াই

কাশ্মীরে বই নিষিদ্ধ: সেন্সরশিপ, স্মৃতি ও বয়ান নিয়ন্ত্রণের লড়াই

২০২৫ সালের আগস্টে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের কর্তৃপক্ষ খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও লেখকদের ২৫টি বই নিষিদ্ধ করে। এতে সেন্সরশিপ, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং অঞ্চলটিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। বইয়ের দোকানে পুলিশি তল্লাশি চালিয়ে এবং বই রাখা বা বিক্রির ক্ষেত্রে ফৌজদারি শাস্তির হুমকি দিয়ে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে। ভারতের ভেতরে ও আন্তর্জাতিক পরিসরে লেখক, অধিকার সংগঠন এবং রাজনৈতিক দলগুলো এর নিন্দা জানিয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে—কাশ্মীরের গল্প কে বলবে, আর কোন গল্পগুলো বলার অনুমতি থাকবে—তা নিয়ে টানাপোড়েন।

সূচিপত্র
  1. কাশ্মীরে বই নিষিদ্ধ: সেন্সরশিপ, স্মৃতি ও বয়ান নিয়ন্ত্রণের লড়াই
  2. নিষেধাজ্ঞার কারণ কী?
  3. নিষেধাজ্ঞা কার্যকর: তল্লাশি ও জব্দ
  4. এই বইগুলো কেন? রাষ্ট্রের যুক্তি
  5. আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন
  6. লেখক কারা, তাঁদের বইয়ে কী বলা হয়েছে?
  7. লেখক ও শিক্ষাবিদদের প্রতিক্রিয়া
  8. বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: সেন্সরশিপ ও কাশ্মীরের ইতিহাস
  9. ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মাত্রা
  10. প্রভাব: চিন্তার স্বাধীনতা, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও গণতন্ত্র
  11. আন্তর্জাতিক ও শিক্ষাঙ্গনে প্রতিক্রিয়া
  12. বই নিষিদ্ধ করে কি স্মৃতি মুছে ফেলা যায়?
  13. সংক্ষেপে

নিষেধাজ্ঞার কারণ কী?

জম্মু ও কাশ্মীরের স্বরাষ্ট্র দপ্তর ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট এই নিষেধাজ্ঞা জারি করে। দিনটি ছিল ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে অঞ্চলটির আধা-স্বায়ত্তশাসিত মর্যাদা বাতিলের ষষ্ঠ বার্ষিকী। ২০২৫ সালের সরকারি বিজ্ঞপ্তি এসও ২০৩-এ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা, ২০২৩ (বিএনএসএস)-এর ৯৮ ধারায় ২৫টি বইকে “বাজেয়াপ্ত” ঘোষণা করা হয়। এই নতুন ফৌজদারি বিধি কর্তৃপক্ষকে ভারতীয় ন্যায় সংহিতা, ২০২৩ (বিএনএস)-এর নির্দিষ্ট কিছু ধারায় শাস্তিযোগ্য বিষয়বস্তু রয়েছে বলে বিবেচিত প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেয়।

সরকারের দাবি, এসব বই “মিথ্যা বয়ান ও বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রচার করে”, “তরুণদের বিভ্রান্ত করে” এবং ক্ষোভ, ভুক্তভোগিতার বোধ, এমনকি “সন্ত্রাসীদের বীর হিসেবে তুলে ধরার” মাধ্যমে “সহিংসতায় উসকানি দেয়”। নিষিদ্ধ বইগুলোর মধ্যে রয়েছে অরুন্ধতী রায়, হাফসা কাঞ্জওয়াল, এ. জি. নুরানি, সুমন্ত্র বোস, অনুরাধা ভাসিন, ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ড, ক্রিস্টোফার স্নেডেনসহ অন্যদের লেখা ইতিহাসবিষয়ক বিশ্লেষণ, স্মৃতিকথা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক ভাষ্য। এসব বইয়ে কাশ্মীর বিরোধের সূত্রপাত এবং ভারত ভাগ থেকে শুরু করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ভারতীয় শাসনের অধীনে কাশ্মীরিদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা পর্যন্ত নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা কার্যকর: তল্লাশি ও জব্দ

নিষেধাজ্ঞার পর পুলিশ কাশ্মীর উপত্যকার শ্রীনগর, অনন্তনাগ, গান্দেরবল ও হান্দওয়ারাসহ বিভিন্ন এলাকার বইয়ের দোকানে তল্লাশি চালায়। নিষিদ্ধ বই খোঁজা, বই বিক্রেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং মজুত বই জব্দ করা হয়। শ্রীনগরের চিনার বই উৎসবেও অভিযান চালানো হয়; নিষিদ্ধ বই আছে কি না, তা দেখতে পুলিশ স্টলগুলো পরিদর্শন করে। আদেশে নিষিদ্ধ বই বিক্রি বা নিজের কাছে রাখার দায়ে যে কাউকে ফৌজদারি শাস্তি দেওয়ার হুমকিও রয়েছে, ফলে ব্যক্তিগতভাবে বই রাখা পর্যন্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

উল্লেখযোগ্য পরিহাস হলো, অঞ্চলটিতে একটি বই উৎসবের উদ্বোধন করতে ভারতীয় কর্মকর্তারা যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এই নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করা হয়। এতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সাহিত্য উদ্‌যাপন এবং ভিন্নমত দমনের মধ্যকার টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

এই বইগুলো কেন? রাষ্ট্রের যুক্তি

সরকারের যুক্তির কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা। সরকারি আদেশে অভিযোগ করা হয়েছে, বইগুলো “ঐতিহাসিক তথ্য বিকৃত করে”, “সন্ত্রাসীদের মহিমান্বিত করে” এবং “বিচ্ছিন্নতাবাদে উসকানি দেয়”, ফলে ভারতের সার্বভৌমত্ব ও ঐক্য বিপন্ন হয়। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, এ ধরনের সাহিত্য তরুণদের উগ্রপন্থায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা বাড়াতে পারে এবং জাতীয় সংহতি দুর্বল করতে পারে।

তবে সমালোচকেরা বলছেন, আদেশে নির্দিষ্ট কোনো অংশ বা আসন্ন সহিংসতার প্রমাণ উল্লেখ না করে কেবল ব্যাপক ও অস্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। নিষিদ্ধ বইগুলোর অনেকগুলোই স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত এবং গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা বা তথ্যনির্ভর সাংবাদিকতা হিসেবে স্বীকৃত। বিজ্ঞপ্তিতে স্বীকার করা হয়েছে, বইগুলো “ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক ভাষ্যের ছদ্মবেশে” রয়েছে; অর্থাৎ সেগুলোকে সরাসরি সহিংসতার আহ্বান নয়, বরং বিশ্লেষণ বা মতামত হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে।

আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন

বিএনএসএসের ৯৮ ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রকাশনায় বিএনএসের নির্দিষ্ট ধারায় শাস্তিযোগ্য বিষয়বস্তু রয়েছে বলে মনে হলে সেটি বাজেয়াপ্ত করা যায়। এসব ধারার মধ্যে রয়েছে সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করা, শত্রুতা উসকে দেওয়া কিংবা জাতীয় সংহতির পরিপন্থী বক্তব্য দেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত ধারা। তবে ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদে বাক্‌ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে; জনশৃঙ্খলা বা সহিংসতায় উসকানির মতো সীমিত কারণেই কেবল এ অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়।

ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (আইএফএফ)-সহ আইন বিশেষজ্ঞ ও অধিকার সংগঠনগুলোর যুক্তি, সর্বাত্মক এই নিষেধাজ্ঞা আইনগতভাবে টেকসই নয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বারবার বলেছে, কোনো মতের নিছক আলোচনা বা সমর্থন—তা যতই অজনপ্রিয় হোক—সরাসরি উসকানিতে পরিণত না হলে সুরক্ষিত মতপ্রকাশের আওতায় পড়ে। শ্রেয়া সিংহল বনাম ভারত সরকার (২০১৫) মামলার ঐতিহাসিক রায়ে আদালত মতপ্রকাশের ওপর ব্যাপক বা আগাম দমনমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিল, বিশেষ করে রাজনৈতিক বা শিক্ষাবিষয়ক আলোচনার ক্ষেত্রে।

বিজ্ঞাপন

লেখক কারা, তাঁদের বইয়ে কী বলা হয়েছে?

নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকায় কাশ্মীরবিষয়ক গবেষণা ও সমালোচনামূলক ভাষ্যের বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট লেখকের নাম রয়েছে:

  • অরুন্ধতী রায় – বুকার পুরস্কারজয়ী লেখক। তাঁর আজাদি বইয়ে কাশ্মীরে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও গুম নিয়ে প্রবন্ধ রয়েছে।
  • হাফসা কাঞ্জওয়াল – যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিক্ষাবিদ। তাঁর কাশ্মীরের উপনিবেশায়ন: ভারতীয় দখলদারির অধীনে রাষ্ট্র গঠন বইয়ে ভারত কীভাবে অঞ্চলটির ওপর নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করেছে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
  • এ. জি. নুরানি – সংবিধান বিশেষজ্ঞ। তাঁর কাশ্মীর বিরোধ ১৯৪৭–২০১২ বইটি সংঘাতটির আইনি ও রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি বিশদ বিবরণ।
  • সুমন্ত্র বোস – লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক। তাঁর বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ড এবং সন্ধিক্ষণে কাশ্মীর বইয়ে অঞ্চলটির জটিল ভূরাজনীতি তুলে ধরা হয়েছে।
  • অনুরাধা ভাসিন – সাংবাদিক। তাঁর ভেঙে ফেলা রাজ্য বইয়ে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পরিণতি নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
  • ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ড – ইতিহাসবিদ; সংঘাতের কাশ্মীর বইয়ের লেখক।
  • ক্রিস্টোফার স্নেডেন – অস্ট্রেলীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী; স্বাধীন কাশ্মীর বইয়ের লেখক।

নিষিদ্ধ অন্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে নারীবাদী সাক্ষ্য, মানবাধিকার লঙ্ঘনের নথি এবং অঞ্চলটির রাজনৈতিক বিবর্তন নিয়ে বিশ্লেষণ। ভারতীয়, কাশ্মীরি ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গির এই বৈচিত্র্য কাশ্মীর প্রশ্নের জটিলতাই তুলে ধরে।

লেখক ও শিক্ষাবিদদের প্রতিক্রিয়া

নিষেধাজ্ঞায় লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করেছেন। নিষিদ্ধ কাশ্মীর: স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তি বইয়ের সহলেখক অঙ্গনা চ্যাটার্জি বলেন:

এই আদেশের মধ্য দিয়ে গবেষণাকে অপরাধে পরিণত করা এবং তাকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করার রাষ্ট্রীয় অভিপ্রায় স্পষ্ট হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার প্রতীকী ও বাস্তব প্রভাব ব্যাপক হতে পারে। এটি কাশ্মীরিদের ভয় দেখানো, বিচ্ছিন্ন করা এবং তাঁদের যন্ত্রণা ও প্রতিরোধের কণ্ঠ স্তব্ধ করার মনস্তাত্ত্বিক তৎপরতাকে নতুন করে উসকে দেয়।

ঔপনিবেশিক আমল থেকে যার পরিবার সেন্সরশিপের মুখে পড়েছে, সেই ইতিহাসবিদ সুমন্ত্র বোস সরকারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তাঁর কাজের উদ্দেশ্য শান্তির পথ খুঁজে বের করা। অনুরাধা ভাসিন তাঁর বইকে তথ্যনির্ভর বলে সমর্থন করেন এবং বইটি সন্ত্রাসবাদকে মহিমান্বিত করেছে—এমন প্রমাণ দেখাতে কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানান।

প্রধান ধর্মীয় নেতা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুক বলেন:

শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদদের বই নিষিদ্ধ করলেও ঐতিহাসিক তথ্য বা মানুষের জীবিত অভিজ্ঞতার স্মৃতি মুছে যাবে না; বরং এমন পদক্ষেপের নেপথ্যে যাঁরা রয়েছেন, তাঁদের অনিরাপত্তাই প্রকাশ পায়।
বিজ্ঞাপন

বৃহত্তর প্রেক্ষাপট: সেন্সরশিপ ও কাশ্মীরের ইতিহাস

কাশ্মীরে সেন্সরশিপ নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলটিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, সংবাদপত্র নিষিদ্ধ করা এবং সাংবাদিকদের আটক করার ঘটনা ঘটেছে। ১৯৮৯ সালের সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পর, বিশেষত ২০১৯ সালে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর থেকে কর্তৃপক্ষ শুধু সংবাদমাধ্যম নয়, শিক্ষাঙ্গন ও নাগরিক সমাজকেও ক্রমবর্ধমানভাবে লক্ষ্যবস্তু করেছে। বর্তমান বই নিষিদ্ধের ঘটনাকে কাশ্মীর নিয়ে বয়ান নিয়ন্ত্রণ এবং ভিন্নমতের কণ্ঠ দমনের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মাত্রা

এই দমন অভিযান ধর্মীয় সাহিত্যেও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ইসলামী চিন্তাবিদ সৈয়দ আবুল আ'লা মওদুদীর লেখা জব্দ করতে শ্রীনগরের বইয়ের দোকানে তল্লাশি চালায় পুলিশ। সমালোচকদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বাছাই করে আইন প্রয়োগের বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি করে, কারণ ভারতের অন্য অঞ্চলে একই ধরনের বই পাওয়া যায়।

বই নিষিদ্ধ করে মানুষের চিন্তা নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট ঔপনিবেশিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সরকারের এই পদ্ধতির তুলনা করা হচ্ছে। নিরাপত্তা ও সমাজবিষয়ক ভাষ্যকার গাজালা ওয়াহাব বলেন, কর্তৃপক্ষ তরুণ কাশ্মীরিদের নিজেদের ইতিহাস জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু সমষ্টিগত স্মৃতি বইয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে টিকে থাকে।

বিজ্ঞাপন

প্রভাব: চিন্তার স্বাধীনতা, ঐতিহাসিক স্মৃতি ও গণতন্ত্র

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বইয়ের তাক থেকে সেগুলো সরিয়ে ফেলার তাৎক্ষণিক ঘটনার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। সমালোচকদের আশঙ্কা, এটি গোটা ভারতে ভিন্নমত ও শিক্ষাবিষয়ক স্বাধীনতা দমনের বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। বিএনএসএসের ৯৮ ধারায় বই বাজেয়াপ্ত করার যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা শুধু কাশ্মীরে নয়, সম্ভাব্যভাবে সারা দেশেই নিষিদ্ধ বই জব্দ করার সুযোগ দেয়। আইনি ঝুঁকি এড়াতে প্রকাশক, বই বিক্রেতা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো বইগুলো পুরোপুরি সরিয়ে নিতে পারে; এর ফলে কার্যত দেশজুড়ে নিষেধাজ্ঞা তৈরি হতে পারে।

আইএফএফের মতো ডিজিটাল অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, পরস্পরবিরোধী বয়ানের জবাব হলো আরও সংলাপ ও স্বচ্ছতা, সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা নয়। তাদের সতর্কবার্তা, গবেষণা ও ভাষ্যের নাগাল সীমিত করা গণতান্ত্রিক আলোচনা এবং তথ্য জানার অধিকারকে দুর্বল করে।

বিরোধী দলের নেতা ও দলগুলো এই পদক্ষেপকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের ওপর আঘাত বলে নিন্দা জানিয়েছে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি বলেন, সেন্সরশিপ কোনো ধারণাকে স্তব্ধ না করে বরং আরও ছড়িয়ে দেয় এবং কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবোধ গভীর করে। সিপিআই(এম) নেতা এম. ওয়াই. তারিগামি এই নিষেধাজ্ঞাকে নির্লজ্জ সেন্সরশিপ বলে আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাহারের দাবি জানান।

আন্তর্জাতিক ও শিক্ষাঙ্গনে প্রতিক্রিয়া

নিষেধাজ্ঞাটি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। সংবাদমাধ্যম ও অধিকার সংগঠনগুলো বহুমতের প্রতি সহনশীল গণতন্ত্র হিসেবে ভারতের সুনামের জন্য এই পদক্ষেপের হুমকির বিষয়টি তুলে ধরেছে। শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, এর ফলে প্রকাশকেরা কাশ্মীর নিয়ে সমালোচনামূলক লেখা ছাপাতে নিরুৎসাহিত হবেন, যা শিক্ষাবিষয়ক অনুসন্ধান ও বিতর্ককে শীতল করে দেবে। কাশ্মীরের শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা এই নিষেধাজ্ঞাকে সমষ্টিগত বিস্মৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে দেখছেন; এতে অঞ্চলটির ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও তা স্মরণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশিষ্ট ভারতীয় লেখক নীলাঞ্জনা রায় বলেন:

এই নিষেধাজ্ঞা কাশ্মীরবিষয়ক বাছাই করা পাঠতালিকার মতো কাজ করছে। ইতিহাস বলে, এমন নিষেধাজ্ঞা খুব কমই সফল হয়; বরং নিষিদ্ধ বিষয়বস্তুর চাহিদা প্রায়ই বাড়িয়ে দেয়।

বই নিষিদ্ধ করে কি স্মৃতি মুছে ফেলা যায়?

সরকারের চেষ্টা সত্ত্বেও অনেকের বিশ্বাস, বই নিষিদ্ধ করে সেগুলোয় বর্ণিত বাস্তবতা বা বইগুলোতে সংরক্ষিত স্মৃতি মুছে ফেলা যায় না। মিরওয়াইজ উমর ফারুকসহ অনেকে যেমন বলেছেন, লিখিত বিবরণ দমন করা হলেও মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও মৌখিক ইতিহাস টিকে থাকে। কোন ইতিহাস ও বিবরণ প্রচারিত হবে, তা নিয়ন্ত্রণের এই চেষ্টাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কাশ্মীর সম্পর্কে কী জানবে তা নির্ধারণের উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে; তবে এর ফলে অবিশ্বাস ও বিচ্ছিন্নতাবোধ আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

নিষিদ্ধ বই প্রতিরোধ ও কৌতূহলের প্রতীকে পরিণত হওয়ার দৃষ্টান্তে ইতিহাস ভরপুর। ডিজিটাল যুগে তথ্য দমন করা আরও কঠিন, আর সেন্সরশিপের চেষ্টা প্রায়ই উল্টো ফল দেয়—নিষিদ্ধ বইগুলোর প্রতি মনোযোগ আরও বাড়িয়ে তোলে।

বিজ্ঞাপন

সংক্ষেপে

  • ২০২৫ সালের আগস্টে ভারত-শাসিত কাশ্মীরের কর্তৃপক্ষ জাতীয় নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলার উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও লেখকদের ২৫টি বই নিষিদ্ধ করে।
  • পুলিশি তল্লাশি ও ফৌজদারি শাস্তির হুমকির মাধ্যমে কার্যকর করা এই নিষেধাজ্ঞায় কাশ্মীরের ইতিহাস, রাজনীতি ও মানবাধিকার নিয়ে লেখা বইগুলো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে; এর মধ্যে অরুন্ধতী রায়, হাফসা কাঞ্জওয়াল ও এ. জি. নুরানির বইও রয়েছে।
  • সমালোচকদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষাবিষয়ক অনুসন্ধান ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্নকারী ব্যাপক সেন্সরশিপ; এর প্রভাব দেশজুড়েও পড়তে পারে।
  • আইন বিশেষজ্ঞ ও অধিকার সংগঠনগুলোর যুক্তি, উসকানি বা আসন্ন সহিংসতার নির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায় নিষেধাজ্ঞাটি সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
  • এই পদক্ষেপকে ভিন্নমত দমন ও কাশ্মীর নিয়ে বয়ান নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে; এর প্রভাব পড়বে ঐতিহাসিক স্মৃতি ও তথ্য জানার অধিকারের ওপর।
  • লেখক, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক নেতাদের সতর্কবার্তা, বই নিষিদ্ধ করলেও মানুষের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা ঐতিহাসিক সত্য মুছে ফেলা যাবে না; বরং রাষ্ট্র যে ধারণাগুলো দমন করতে চায়, নিষেধাজ্ঞা সেগুলোকে আরও ছড়িয়ে দিতে পারে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে