মালয়েশিয়ায় খাবারের ক্রমবর্ধমান দাম: প্রজন্মান্তরের পরিবর্তন
২০২৪ সালে মালয়েশিয়ার পরিবারগুলো এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি: ১৯৮০ সালে যে পরিমাণ খাবার কিনতে ৩০.৯০ রিঙ্গিত (RM) লাগত, এখন তার জন্য খরচ করতে হচ্ছে ১০০ রিঙ্গিত। মালয়েশিয়ার পরিসংখ্যান বিভাগের (DOSM) তথ্য অনুযায়ী, এই তিন গুণ মূল্যবৃদ্ধিতে গত পাঁচ দশকে পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি শুধু দাম বাড়ার বিষয় নয়—এটি মালয়েশিয়ার মানুষের জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে মৌলিকভাবে বদলে দিচ্ছে।
সূচিপত্র
- মালয়েশিয়ায় খাবারের ক্রমবর্ধমান দাম: প্রজন্মান্তরের পরিবর্তন
- কারা বেশি চাপে? খাদ্য মূল্যস্ফীতির অসম বোঝা
- খাবারের দাম কেন বাড়ছে? স্থানীয় ও বৈশ্বিক কারণ
- বদলে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস: ঘরে রান্না থেকে বাইরে খাওয়া
- স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: অপুষ্টি, স্থূলতা ও দ্বৈত বোঝা
- মজুরি, ভর্তুকি ও সরকারি সহায়তার সীমাবদ্ধতা
- খাদ্যনিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ: নীতিগত পদক্ষেপ ও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা
- সংক্ষেপে
আঞ্চলিক কয়েকটি প্রতিবেশী দেশের তুলনায় মালয়েশিয়ার সরকারি মূল্যস্ফীতির হার মাঝারি মনে হতে পারে, তবে খাদ্যের দাম বাড়ার প্রভাব গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের মধ্যে। ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে খাদ্য ও পানীয়ের ভোক্তা মূল্যসূচক (CPI) ৩.২ শতাংশ বেড়েছে। তবে প্রকৃত চিত্রটি বোঝা যায়, এই মূল্যবৃদ্ধি কীভাবে পরিবারের বাজেট, পুষ্টি ও সুস্থতার ধরন বদলে দিচ্ছে তা দেখলে।
কারা বেশি চাপে? খাদ্য মূল্যস্ফীতির অসম বোঝা
খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রভাব সব মালয়েশীয়ের ওপর সমানভাবে পড়ে না। DOSM-এর খাদ্যনিরাপত্তা প্রতিবেদন অনুযায়ী, আয়ের দিক থেকে নিচের ৪০ শতাংশের (B40) পরিবার—যাদের মাসিক আয় ৫,২৫০ রিঙ্গিতের (RM) নিচে—এখন ব্যয়ের ৭১ শতাংশেরও বেশি দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে খরচ করে; এর মধ্যে খাবারই সবচেয়ে বড় অংশ। মধ্যম আয়ের (M40) এবং সর্বোচ্চ আয়ের ২০ শতাংশের (T20) পরিবার যথাক্রমে ৬৭ ও ৬৪ শতাংশ ব্যয় করে। তবে আর্থিক নমনীয়তা যাদের সবচেয়ে কম, তাদের ওপরই চাপ সবচেয়ে বেশি।
২০২২ সালে মালয়েশিয়ার পরিবারগুলো গড়ে প্রতি মাসে ৮৪১ রিঙ্গিত (RM), অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ১৬.৩ শতাংশ, খাবার ও পানীয়ের পেছনে খরচ করেছে—সব ব্যয়খাতের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। অনেকের জন্য এর অর্থ হলো, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার জোগাড় করতে পোশাক, বিনোদন ও ভ্রমণের মতো অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমানো। শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন, কারণ পরিবারগুলো বাড়িতে উৎপাদিত ফসল দিয়ে খাদ্যতালিকা সমৃদ্ধ করতে পারে না; খাওয়ার সবকিছুই কিনতে হয়।
সিঙ্গাপুর ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ ফেলো ড. ওহ ই সান ব্যাখ্যা করেন:
শুধু খাবারের ব্যয়ই পরিবারের আয়ের ২০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে এই খাতে দাম বাড়লে তা বিশেষভাবে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। মালয়েশিয়ায় মূল্যস্ফীতি সাধারণত ধীরগতির হলেও তা অব্যাহত থাকে; প্রায়ই মজুরি বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায় এবং বহু পরিবারের জন্য ব্যয় বহন করা কঠিন করে তোলে।
B40 গোষ্ঠীর জন্য চ্যালেঞ্জটি শুধু বেশি দামের নয়, টিকে থাকারও। অনেকে খাবার খাওয়ার সংখ্যা কমানো, পুষ্টিকর খাবারের বদলে সস্তা ও কম স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নেওয়া, এমনকি খাবার বাদ দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
খাবারের দাম কেন বাড়ছে? স্থানীয় ও বৈশ্বিক কারণ
স্থানীয় ও বৈশ্বিক নানা কারণের জটিল সমন্বয়ে খাবারের দাম বাড়ছে। মালয়েশিয়া খাদ্যের নিট আমদানিকারক দেশ, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দামের আকস্মিক ধাক্কার ঝুঁকিতে রয়েছে। শস্য ও সারের বড় রপ্তানিকারক ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে চলমান সংঘাত বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটিয়েছে; এতে চাল, গম ও মুরগির খাদ্যের মতো নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। মুদ্রার ওঠানামা, বিশেষ করে রিঙ্গিতের দরপতন, আমদানি করা খাবারের খরচ আরও বাড়িয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আবহাওয়ার অনিশ্চিত ধরন, ভয়াবহ বন্যা ও খরা ফসলের ক্ষতি করেছে এবং উৎপাদন কমিয়েছে। শুধু ২০২২ সালের ডিসেম্বরেই মৌসুমি আবহাওয়ার কারণে মালয়েশিয়ার কৃষি ও কৃষিখাদ্য খাতে প্রায় ১১ কোটি ২০ লাখ রিঙ্গিত (RM112 million) ক্ষতি হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি প্রধান চাল উৎপাদনকারী রাজ্যগুলোর ধানখেতকে হুমকির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে, তাপমাত্রার পরিবর্তনে ২০৩০ সালের মধ্যে ধানের উৎপাদন ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুত্রা বিজনেস স্কুলের অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ড. আহমেদ রাজমান আবদুল লতিফ বলেন:
জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বাহ্যিক কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, ফলে খাদ্যের দাম বেড়েছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও সরবরাহব্যবস্থায় ব্যাঘাত ঘটিয়ে খরচ আরও বাড়িয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে রিঙ্গিতের দরপতনে আমদানি ব্যয়বহুল হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবার দামে।
মালয়েশিয়ার ভেতরেও অঞ্চলভেদে দামের পার্থক্য রয়েছে। কুয়ালালামপুর, জোহর বাহরু ও পেনাংয়ের মতো শহরাঞ্চলে খাবারের দাম গ্রামীণ এলাকার তুলনায় বেশি। এতে শহরের বাসিন্দাদের সমস্যা আরও বাড়ে, কারণ তারা আগে থেকেই আয়ের বড় অংশ খাবারের পেছনে ব্যয় করেন।
বদলে যাচ্ছে খাদ্যাভ্যাস: ঘরে রান্না থেকে বাইরে খাওয়া
খাদ্য মূল্যস্ফীতি মালয়েশিয়ার মানুষের খাবারের ধরনই শুধু নয়, খাওয়ার অভ্যাসও বদলে দিচ্ছে। খাজানাহ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, বাড়িতে রান্না করা খাবারের বদলে রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও রাস্তার খাবারের দোকানে খাওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাইরে খাওয়া সুবিধাজনক হলেও তা বেশি ব্যয়বহুল এবং প্রায়ই কম পুষ্টিকর।
বাড়ির বাইরের খাবারের দাম ঘরে তৈরি খাবারের তুলনায় দ্রুত বাড়ছে। এ প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ রেস্তোরাঁ বা রাস্তার খাবার ঘন ঘন খাওয়ার সঙ্গে বেশি ক্যালরি গ্রহণ এবং নিম্নমানের খাদ্যাভ্যাসের সম্পর্ক রয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাইরে খাওয়ার খরচ দ্রুত অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু নগরজীবনের চাপ ও দীর্ঘ কর্মঘণ্টার কারণে অনেক সময় তাদের হাতে বিকল্প থাকে না।
এ ছাড়া, খাবারের দাম বাড়লে অনেক পরিবার তাজা শাকসবজি, দুগ্ধজাত পণ্য ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের বদলে ইনস্ট্যান্ট নুডলস, ভাজাপোড়া ও চিনিযুক্ত পানীয়ের মতো সস্তা, বেশি ক্যালরিসমৃদ্ধ বিকল্প বেছে নিতে বাধ্য হয়। খাদ্যাভ্যাসের এই "পুষ্টিগত পরিবর্তন" অপুষ্টি ও স্থূলতার দ্বৈত বোঝা বাড়াচ্ছে, বিশেষ করে স্বল্পমূল্যের আবাসন এলাকায় বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে।
স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: অপুষ্টি, স্থূলতা ও দ্বৈত বোঝা
খাদ্য মূল্যস্ফীতির পরিণতি মানিব্যাগের ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি। ইউনিভার্সিটি অব মালায়ার সোশ্যাল ওয়েলবিয়িং রিসার্চ সেন্টার এবং ইউনিসেফের গবেষণায় মালয়েশীয় শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ও স্থূলতা—দুটিই উদ্বেগজনকভাবে বাড়তে দেখা গেছে। নিম্ন আয়ের শহুরে জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক পরিবার জানিয়েছে, ২০২৩ সালে তাদের ইনস্ট্যান্ট নুডলস খাওয়ার পরিমাণ বেড়েছে; মহামারির সময় এই হার ছিল ৪০ শতাংশ। ফলে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ১৫ শতাংশের ওজন কম, ২২ শতাংশের বৃদ্ধি ব্যাহত এবং ২৩ শতাংশের ওজন অতিরিক্ত বা তারা স্থূলতায় ভুগছে।
একই সঙ্গে অপুষ্টি ও স্থূলতার এই বৈপরীত্যকে অপুষ্টির "দ্বৈত বোঝা" বলা হয়। সুষম খাদ্য কেনার সামর্থ্য না থাকায় পরিবারগুলো যখন চর্বি, চিনি ও লবণসমৃদ্ধ কিন্তু জরুরি পুষ্টি উপাদান কম এমন সস্তা, উচ্চ-শক্তিসমৃদ্ধ খাবারের ওপর নির্ভর করে, তখন এই পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি গুরুতর; এর মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের হার বৃদ্ধি।
খাদ্যের ব্যয়সাধ্যতা নিয়ে এক গবেষণার সহ-লেখক ড. আমজাদ রাবি সামর্থ্যের ব্যবধান তুলে ধরেন:
নেদারল্যান্ডসে ন্যূনতম মজুরির একজন শ্রমিকের এক লিটার দুধ কিনতে মাত্র চার মিনিট কাজ করতে হয়। একই পরিমাণ দুধ কেনার সামর্থ্য অর্জনে একজন মালয়েশীয় শ্রমিককে ৫৮ মিনিট কাজ করতে হয়। সামর্থ্যের এই ব্যবধান বহু পরিবারকে ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও ভাজাপোড়ার মতো অস্বাস্থ্যকর, বেশি ক্যালরিসমৃদ্ধ বিকল্পের দিকে ঠেলে দেয়। এসব খাবার সস্তা হলেও পুষ্টির চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
অনেক পরিবারের, বিশেষ করে শহরাঞ্চলের পরিবারগুলোর, দিনে তিনবেলা খাবার জোগাড় করাও বাস্তব সংগ্রাম। ইউনিসেফের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কুয়ালালামপুরের নিম্ন আয়ের পরিবারের ৫২ শতাংশ শিশু দিনে তিনবারের কম খেয়েছে, যা মহামারির আগের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
মজুরি, ভর্তুকি ও সরকারি সহায়তার সীমাবদ্ধতা
দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো, খাদ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে পরিবারের আয় তাল মেলাতে পারেনি। চাল, রান্নার তেল ও বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে সরকার ভর্তুকি ও মূল্যনিয়ন্ত্রণ চালু করলেও বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যাগুলো মোকাবিলায় এসব পদক্ষেপ প্রায়ই যথেষ্ট হয় না।
মালয়েশিয়ায় মাসে ১,৫০০ রিঙ্গিত (RM) নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি ২০১৮ সালে ব্যাংক নেগারা প্রস্তাবিত ২,৬০০ রিঙ্গিতের (RM) "জীবনধারণ উপযোগী মজুরি" মানদণ্ডের নিচে রয়ে গেছে। মজুরি ধীরে বাড়ছে, আর অনেক শ্রমিকের ভালো বেতন নিয়ে দর-কষাকষির ক্ষমতা নেই। ফলে খাবারের দামে সামান্য বৃদ্ধি হলেও পরিবারের বাজেটে তার প্রভাব বড় হয়ে ওঠে, বিশেষ করে B40 ও M40 গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে।
স্বল্পমেয়াদে ভর্তুকি সহায়ক হলেও এটি টেকসই সমাধান নয়। ২০২২ সালে মালয়েশিয়া ভর্তুকিতে ৭৭৭০ কোটি রিঙ্গিত (RM77.7 billion) ব্যয় করেছে, যা ফেডারেল সরকারের আয়ের প্রায় ২৭ শতাংশ। রাজস্বের ওপর চাপ বাড়ায় সরকার এখন ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর জন্য নগদ সহায়তার মতো আরও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপের দিকে যাচ্ছে। তবে ঘাটতি রয়ে গেছে; প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও বহু পরিবার পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছে না।
অলিভ ট্রি প্রপার্টি কনসালট্যান্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যামুয়েল ট্যান বলেন:
নিম্ন আয়ের পরিবার, বিশেষ করে B40 আয়গোষ্ঠীর পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। এই গোষ্ঠী সরকারি বিভিন্ন ভর্তুকি ও সহায়তা কর্মসূচির সুবিধা পায়। তবে মাসে ৫,২৫০ থেকে ১১,৮১৯ রিঙ্গিত আয় করা M40 গোষ্ঠী বিশেষ চ্যালেঞ্জের মুখে, কারণ তারা কম ভর্তুকি পায় এবং তাদের আয় প্রায়ই বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। এই গোষ্ঠীর জন্য আরও সহায়তা প্রয়োজন।
খাদ্যনিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ: নীতিগত পদক্ষেপ ও ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা
মালয়েশিয়ায় খাদ্যনিরাপত্তা এখন আর শুধু চাল বা অন্যান্য নিত্যপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকার বিষয় নয়। আয় বা বসবাসের স্থান যা-ই হোক, সব মালয়েশীয়ের সাশ্রয়ী ও পুষ্টিকর খাবার পাওয়া নিশ্চিত করাই এর মূল কথা। খাদ্যের উৎস বহুমুখী করা, টেকসই কৃষিতে বিনিয়োগ এবং সরবরাহব্যবস্থার অবকাঠামো জোরদারে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি বৃহত্তর অর্থনৈতিক সংস্কারও জরুরি।
নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তা যুক্ত করা, যাতে আয়ও বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে।
- স্কুলে খাবার কর্মসূচি ও সবার জন্য শিশু পরিচর্যা ভাতাসহ সামাজিক সহায়তার পরিধি বাড়ানো এবং তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা উন্নত করা।
- আবহাওয়া-সহনশীল ফসলের জাত ও দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির মতো জলবায়ু-সহনশীল কৃষিতে বিনিয়োগ করা।
- পরিবারগুলোকে আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে এবং স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে সহায়তার জন্য আর্থিক জ্ঞান ও শিক্ষা প্রসার করা।
- আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবং বৈশ্বিক বাজারে দামের আকস্মিক ধাক্কা সামলাতে স্থানীয় খাদ্য উৎপাদনে উৎসাহ দেওয়া।
টেকসই পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে IIUM-এর ড. নাজরুল হাযিজি নূরদিন বলেন:
খাদ্যনিরাপত্তায় মালয়েশিয়ার টেকসই পদ্ধতি নেওয়া দরকার, যেখানে কৃষি খাতকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব থাকবে। ব্যাপক সংস্কার ছাড়া মধ্যম ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো অর্থনৈতিক চাপের সবচেয়ে বড় বোঝা বইতে থাকবে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর গবেষণায় দেখা গেছে, ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর খাদ্য অনিরাপত্তা কমাতে সরকারি সহায়তাই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। তবে মালয়েশিয়ার জনসংখ্যা যখন বয়স্ক হচ্ছে এবং নগরায়ণ বাড়ছে, তখন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী মানুষ এবং উচ্চ ব্যয়ের শহরাঞ্চলে বসবাসকারীদেরসহ যাদের সহায়তা দরকার, তাদের সবার কাছে তা পৌঁছানোই হবে চ্যালেঞ্জ।
সংক্ষেপে
- মালয়েশিয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে ১৯৮০ সালের পর থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের দাম তিন গুণ হয়েছে, আর পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে প্রায় ৭০ শতাংশ।
- নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে; তারা এখন আয়ের অধিকাংশ খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় করে।
- ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাত ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক কারণ এবং মজুরি স্থবিরতা ও রিঙ্গিতের দরপতনের মতো স্থানীয় সমস্যা খাবারের দাম বাড়াচ্ছে।
- দাম বাড়ায় পরিবারগুলো পুষ্টিকর খাবার কমাতে বাধ্য হচ্ছে, ফলে বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ও স্থূলতার দ্বৈত বোঝা বাড়ছে।
- সরকারি ভর্তুকি ও মূল্যনিয়ন্ত্রণ কিছুটা স্বস্তি দিলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়; মজুরি বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা ও খাদ্যব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে ব্যাপক সংস্কার দরকার।
- সব মালয়েশীয়ের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নীতিগত পদক্ষেপে আয় বৃদ্ধি, সামাজিক সহায়তার সম্প্রসারণ, টেকসই কৃষিতে বিনিয়োগ ও আর্থিক জ্ঞান প্রসারে গুরুত্ব দিতে হবে।






