যে জন্মসূত্রে যুক্ত হলো তিন প্রজন্ম
ভিয়েতনামে ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের (আইভিএফ) মাধ্যমে জন্ম নেওয়া প্রথম তিন শিশুর একজন লু তুয়েত ট্রান ২০২৬ সালের ৪ নভেম্বর তাঁর প্রথম সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। ২৮ বছরেরও বেশি আগে যিনি তাঁকে পৃথিবীতে এনেছিলেন, সেই একই চিকিৎসক এবার তাঁর সন্তান প্রসব করান। হো চি মিন সিটির মি ডাক হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন অধ্যাপক নগুয়েন থি নগক ফুওং। জন্ম নেওয়া ছেলেশিশুটির ওজন ছিল ৩ হাজার ১৫০ গ্রাম।
সূচিপত্র
- যে জন্মসূত্রে যুক্ত হলো তিন প্রজন্ম
- প্রথম ভ্রূণ প্রতিস্থাপন থেকে একটি পরিবার
- ভিয়েতনামে প্রথম আইভিএফ শিশুর জন্ম যেভাবে
- চিকিৎসার এই মাইলফলকের পেছনের বাধা
- নিজের জন্মের গল্প নিয়ে ট্রানের কথা
- তিন শিশু থেকে ১৬ হাজার ৩০০-এর বেশি
- আরও চিকিৎসার সুযোগ ও মান যাচাই
- ১৬ বছরের অপেক্ষা শেষে আরেক পরিবারের সন্তান
- প্রথম প্রজন্মের নতুন অধ্যায়
- মূল তথ্য
সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে অস্ত্রোপচার শুরু হয় এবং প্রায় তিন মিনিট পর শিশুটির জন্ম হয়। সে জোরে কেঁদেছিল এবং তাকে সুস্থ বলে জানানো হয়। নবজাতকের পরীক্ষা শেষে তাকে মায়ের খালি বুকের ওপর রাখা হয়। অস্ত্রোপচারের পর ট্রানের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল।
২৮ বছর বয়সী ট্রান বিয়ের পর স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করেন। প্রথম গর্ভাবস্থায় তাঁর দেখভাল করেন ফুওং ও চিকিৎসক ত্রিয়ু থি থান তুয়েন। আলট্রাসাউন্ডে শিশুটির বেড়ে ওঠা দেখে ফুওংয়ের মনে পড়ে যায়, ভিয়েতনামে আইভিএফের মাধ্যমে প্রথম দিকের সফল গর্ভধারণগুলোর একটির সময় তিনি কীভাবে ট্রানের মায়ের সেবা করেছিলেন।
ট্রানের মা, ত্রান থি বাক তুয়েতও হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৯৮ সালের ৩০ এপ্রিল, নতুন এক প্রজনন চিকিৎসার কল্যাণে জন্ম নেওয়া কন্যাসন্তানকে দেখার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। এবার তিনি নাতিকে স্বাগত জানাতে এসেছিলেন, পাশে ছিলেন সেই চিকিৎসক, যিনি তাঁকে মা হতে সহায়তা করেছিলেন।
প্রথম ভ্রূণ প্রতিস্থাপন থেকে একটি পরিবার
তুয়েত তিয়েন জিয়াং প্রদেশের মি থো শহরে দর্জির কাজ করতেন। বহু বছর সন্তান না হওয়ার পর তাঁকে ও তাঁর স্বামীকে বলা হয়, সন্তান পাওয়ার একমাত্র সুযোগ আইভিএফ। ভিয়েতনামে এই চিকিৎসা নেওয়া প্রথম দিকের রোগীদের মধ্যে ছিলেন তাঁরা।
আইভিএফে পরীক্ষাগারে ডিম্বাণুর সঙ্গে শুক্রাণুর নিষেক ঘটিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়, এরপর সেই ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপন করা হয়, যেখানে গর্ভধারণের প্রক্রিয়া এগোতে পারে। প্রচলিত “টেস্ট-টিউব বেবি” কথাটি পরীক্ষাগারের ওই পর্যায়কে বোঝায়। শিশুটি মায়ের শরীরের ভেতরেই বেড়ে ওঠে।
ওষুধ ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে ফুওং সহায়তার ব্যবস্থা করেন, ফলে তুয়েত বিনা খরচে চিকিৎসা পান। প্রথম ভ্রূণ প্রতিস্থাপনেই তিনি গর্ভবতী হন। মেয়ের জন্মের পর তিনি তার নাম রাখেন তুয়েত ট্রান; ট্রান শব্দটি মূল্যবান রত্নের ধারণা প্রকাশ করে।
প্রায় দুই বছর পর গুরুতর অসুস্থতায় মারা যান তুয়েতের স্বামী। তিনি দর্জির কাজ চালিয়ে যান এবং একাই ট্রানকে বড় করেন। ওই বছরগুলোতে ফুওং যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন এবং ট্রানকে নাতনির মতো ভাবতে শুরু করেছিলেন।
ট্রানের প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া ও গর্ভাবস্থাতেও এই সম্পর্ক অটুট ছিল। হাসপাতালে তাঁর প্রতিটি সাক্ষাৎ ছিল চিকিৎসা-পরীক্ষার পাশাপাশি এমন একজনের সঙ্গে পুনর্মিলন, যিনি তাঁর জন্মেরও আগে থেকে পরিবারের পাশে ছিলেন।
ভিয়েতনামে প্রথম আইভিএফ শিশুর জন্ম যেভাবে
ভিয়েতনামে আইভিএফ চালুর উদ্যোগ ফুওং নেন ১৯৮৪ সালে ব্যাংককে এক কর্মসূত্রে সফরের সময়। এই চিকিৎসার মাধ্যমে বন্ধ্যত্বের সমস্যায় থাকা নারীদের মা হতে দেখে তিনি নিজ দেশে এটি চালুর উদ্যোগ নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হন।
পরে এ কাজে যুক্ত হন ভিয়েতনামের চিকিৎসক ও ফরাসি বিশেষজ্ঞরা। ভিয়েতনামে প্রথম আইভিএফ ও ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় ১৯৯৭ সালের আগস্টে। তখন ফুওং ছিলেন তু জু হাসপাতালের পরিচালক। হো চি মিন সিটির এই প্রতিষ্ঠানেই প্রথম তিন শিশুর জন্ম হয়।
১৯৯৮ সালের ৩০ এপ্রিল জন্ম নেয় মাই কুয়ক বাও, ফাম তুয়ং লান থি ও লু তুয়েত ট্রান। তিনজনের মধ্যে ট্রান ছিল সবার শেষে; তার জন্ম হয় সকাল ৯টায়। ফুওং পরে স্মরণ করেন, সেদিন সকালে আবেগে তাঁর চোখে জল এসেছিল।
প্রথমবার এই পদ্ধতি চালু করা থেকে পরবর্তী প্রজন্মের জন্ম দেখা পর্যন্ত যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো হলো:
- ১৯৮৪: ব্যাংকক সফরের সময় বন্ধ্যত্বের সমস্যায় থাকা নারীদের আইভিএফের মাধ্যমে মা হতে দেখে ফুওং ভিয়েতনামে এই চিকিৎসা চালুর সিদ্ধান্ত নেন।
- ১৯৯৭ সালের আগস্ট: ফরাসি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় ভিয়েতনামে প্রথম আইভিএফ ও ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
- ১৯৯৮ সালের ৩০ এপ্রিল: তু জু হাসপাতালে দেশটির প্রথম তিন আইভিএফ শিশুর জন্ম হয়।
- ২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল: ওই জন্মগুলোর ২৫ বছর পূর্তি এবং আইভিএফ ইউনিটের সম্প্রসারণ উপলক্ষে তু জু হাসপাতাল একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
- ২০২৬ সালের ৪ নভেম্বর: মি ডাক হাসপাতালে ট্রান তাঁর প্রথম সন্তানের জন্ম দেন।
চিকিৎসার এই মাইলফলকের পেছনের বাধা
১৯৯৭ সালে ভিয়েতনামের প্রথম আইভিএফ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা দলের সদস্য চিকিৎসক হো মান তুয়ং ২০২৩ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বলেন, সে সময় এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য বিরোধিতা ছিল। তত দিনে তিনি হো চি মিন সিটি রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন সোসাইটির মহাসচিব হয়েছিলেন।
তুয়ং বলেন, সমাজে, চিকিৎসা পেশায়, এমনকি হাসপাতালের ভেতরেও আপত্তি ছিল। ভিয়েতনাম তখন জন্মহার কমানোর নীতি অনুসরণ করছিল, অর্থের সংকট ছিল, আর বন্ধ্যত্বের চিকিৎসাকে কখনো কখনো জীবনহানিকর রোগের চিকিৎসার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় থাকা ব্যয়বহুল সেবা হিসেবে দেখা হতো।
কিছু চিকিৎসকও সন্দেহ করতেন, ভিয়েতনামের আইভিএফ করার মতো কারিগরি সক্ষমতা আছে কি না। তুয়ং স্মরণ করেন, গুরুতর শারীরিক ত্রুটিযুক্ত শিশু জন্মানোর আশঙ্কায় কেউ কেউ এ কাজ নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন। চিকিৎসাটি সফল করার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি দলটিকে পেশাগত ও রাজনৈতিক চাপও মোকাবিলা করতে হয়েছিল।
২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিলের অনুষ্ঠানে হো চি মিন সিটি স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক তাং চি থুয়ং তিন সুস্থ শিশুর জন্মকে ভিয়েতনামের প্রজনন চিকিৎসার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বলে উল্লেখ করেন। বন্ধ্যত্বে ভোগা পরিবারগুলোর জন্য মা-বাবা হওয়ার নতুন পথ খুলে দেওয়ার কৃতিত্ব তিনি ফুওংসহ হাসপাতালের চিকিৎসাকর্মীদের দেন।
নিজের জন্মের গল্প নিয়ে ট্রানের কথা
নিজে মা হওয়ার আগে, ২০২৩ সালে তু জু হাসপাতালে ২৫ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন ট্রান। যাঁদের সিদ্ধান্ত ও কাজের কারণে তাঁর জীবন সম্ভব হয়েছে, তাঁদের কথা তিনি তুলে ধরেন।
ভিয়েতনামের প্রথম আইভিএফ শিশুদের একজন হিসেবে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে পরিবার ও চিকিৎসক দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান ট্রান:
এত বিশেষভাবে এই পৃথিবীতে আসতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত। আমার মা-বাবা ও চিকিৎসকদের অনেক ধন্যবাদ। আমি সব সময় নিজেকে বলি, ভালোভাবে বাঁচতে হবে, যাতে মা-বাবার স্নেহ ও এই পৃথিবীতে আমার উপস্থিতির মর্যাদা রাখতে পারি।
ট্রানের মায়ের অভিজ্ঞতাই এই কথাগুলোর ব্যক্তিগত ভিত্তি। আর্থিক সহায়তায় চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয়েছিল, প্রথম ভ্রূণ প্রতিস্থাপন সফল হয়েছিল, আর স্বামীর মৃত্যুর পর বহু বছর দর্জির কাজ করে তিনি ট্রানকে বড় করেছেন।
ফুওংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় থাকার ফলে চিকিৎসার এই মাইলফলক জীবনের সাধারণ ঘটনাগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল: বড় হওয়া, বিয়ে ও গর্ভধারণ। ২০২৬ সালের নভেম্বরে ট্রানকে প্রসব করানো চিকিৎসকই তাঁর ছেলেকে পৃথিবীতে আনেন।
তিন শিশু থেকে ১৬ হাজার ৩০০-এর বেশি
২০২৩ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে তু জু হাসপাতালের প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বন্ধ্যত্ব চিকিৎসা বিভাগ কতটা বড় হয়েছে। হাসপাতালের নির্বাহী উপপরিচালক চিকিৎসক ত্রান নগক হাই বলেন, ১৯৯৮ সালে প্রথম শিশুদের জন্মের পর থেকে সেখানে আইভিএফের মাধ্যমে ১৬ হাজার ৩০০-এর বেশি শিশুর জন্ম হয়েছে।
হাসপাতাল জানায়, প্রতি বছর বন্ধ্যত্বের চিকিৎসা নিতে ৫৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার রোগী আসেন। আগের এক দশকে তারা ২২ হাজারের বেশি জরায়ুতে শুক্রাণু প্রবেশ করানোর প্রক্রিয়া এবং ২৩ হাজারের বেশি আইভিএফ চক্র সম্পন্ন করেছে।
জরায়ুতে শুক্রাণু প্রবেশ করানোর পদ্ধতিকে সাধারণত আইইউআই বলা হয়। এতে প্রক্রিয়াজাত শুক্রাণু সরাসরি জরায়ুতে প্রবেশ করানো হয়। এরপর নিষেক ঘটে শরীরের ভেতরেই। আইভিএফে নিষেক হয় পরীক্ষাগারে, তারপর ভ্রূণ প্রতিস্থাপন করা হয়। আইভিএফ চক্র বলতে চিকিৎসার একটি কোর্স বোঝায়; কোনো কোনো রোগীকে একাধিক চক্রের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
এই পরিসংখ্যান চিকিৎসার দুই ভিন্ন পদ্ধতির ব্যাপ্তি তুলে ধরে। ১০ বছরে ২৩ হাজারের বেশি আইভিএফ চক্র মানে বছরে গড়ে ২ হাজার ৩০০-এর বেশি চক্র; আর ২২ হাজারের বেশি আইইউআই প্রক্রিয়া মানে বছরে গড়ে ২ হাজার ২০০-এর বেশি। বার্ষিক রোগী-সাক্ষাতের মধ্যে পরামর্শ, পরীক্ষা ও পরবর্তী পরিচর্যাও রয়েছে।
তু জু হাসপাতাল জানায়, আইভিএফের ক্ষেত্রে তাদের ক্লিনিক্যাল গর্ভধারণের হার ৪৫ শতাংশের বেশি। সাধারণত চিকিৎসা পরীক্ষা বা আলট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল গর্ভধারণ নিশ্চিত করা হয়। জীবিত শিশুর জন্ম গর্ভাবস্থার পরবর্তী পর্যায়ের ফল, যখন গর্ভধারণ প্রসব পর্যন্ত স্থায়ী হয়। চিকিৎসা থেকে শিশুকে নিয়ে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত ধাপগুলো বুঝতে পরিবারের তাই দুই ধরনের পরিমাপকই জানা প্রয়োজন।
আরও চিকিৎসার সুযোগ ও মান যাচাই
তু জু হাসপাতালের কাজ প্রথম আইভিএফ কর্মসূচিতে ব্যবহৃত পদ্ধতির বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৩ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সময় হাসপাতাল জানায়, তাদের সেবার মধ্যে রয়েছে ডিম্বাণুর ভেতর সরাসরি শুক্রাণু প্রবেশ করানো, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শুক্রাণু সংগ্রহ, ভ্রূণ হিমায়িত করা, জিনগত রোগ শনাক্তে ভ্রূণ পরীক্ষা এবং ডিম্বাণু বা ডিম্বাশয়ের টিস্যু সংরক্ষণ।
প্রতিটি পদ্ধতি আলাদা প্রয়োজন মেটায়। ডিম্বাণুর ভেতর সরাসরি শুক্রাণু প্রবেশ করানোকে আইসিএসআই বলা হয়; এটি নিষেকে সহায়তা করতে পারে। ভ্রূণ হিমায়িত করে রাখলে পরবর্তী সময়ে প্রতিস্থাপনের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। প্রজনন কোষ বা ডিম্বাশয়ের টিস্যু সংরক্ষণের মাধ্যমে কিছু রোগী ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
হাসপাতালটি আরও জানায়, ২০১৭ সালে তাদের বন্ধ্যত্ব বিভাগ আইভিএফের মান ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক আরটিএসি সনদ পায়। ভিয়েতনামের সরকারি হাসপাতাল ব্যবস্থায় এই সনদ পাওয়া প্রথম বিভাগ ছিল তারা। সনদটি বজায় রাখতে বিভাগটিকে বারবার মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে হাসপাতাল জানায়।
রোগীদের জন্য পরীক্ষাগারভিত্তিক প্রক্রিয়া ও মান যাচাইয়ের পাশাপাশি চিকিৎসার দৃশ্যমান ধাপগুলোও রয়েছে, যেমন পরামর্শ, আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা ও ভ্রূণ প্রতিস্থাপন। হাসপাতালের অগ্রগতির বিবরণে চিকিৎসার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি সেবাদানের পদ্ধতি মানসম্মত করার প্রচেষ্টার কথাও ছিল।
১৬ বছরের অপেক্ষা শেষে আরেক পরিবারের সন্তান
তু জু হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিবরণে এমন এক দম্পতির কথাও ছিল, যাঁরা ১৬ বছর ধরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা শেষে ২০২১ সালের জুনে সুস্থ শিশুকে স্বাগত জানান। তাঁদের অভিজ্ঞতা আইভিএফের আরেকটি ব্যবহার দেখায়: ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের আগে পরিচিত বংশগত রোগের জন্য তা পরীক্ষা করা।
স্বামীর নামের আদ্যক্ষর টি.টি.কিউ. দিয়ে পরিচিত এই দম্পতি দুজনই ফ্যাক্টর সেভেনের ঘাটতির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জিনগত পরিবর্তনের বাহক ছিলেন। ফ্যাক্টর সেভেন রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্যকারী একটি প্রোটিন। এর গুরুতর ঘাটতিতে বিপজ্জনক রক্তক্ষরণ হতে পারে।
২০১১ সালে তাঁদের প্রথম সন্তান মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর ১৪ দিন বয়সে মারা যায়। ফরাসি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় করা জিনগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, মা-বাবা দুজনই একটি প্রচ্ছন্ন জিনগত পরিবর্তনের বাহক। এ ধরনের বংশগতিতে প্রতিটি গর্ভধারণে উভয় মা-বাবার কাছ থেকে আক্রান্ত জিন পাওয়া শিশুর জন্মের সম্ভাবনা ২৫ শতাংশ।
২০১৩ সালের একটি গর্ভধারণেও একই সমস্যা ধরা পড়ে এবং পরিবারকে গর্ভাবস্থা শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের গর্ভধারণের পর জন্ম নেওয়া আরেক শিশুকে নিবিড় চিকিৎসা দেওয়া হলেও চার বছর বয়সে সে মারা যায়।
পরে দম্পতি প্রি-ইমপ্লান্টেশন জেনেটিক ডায়াগনসিস বা পিজিডিসহ আইভিএফ করান। এ পদ্ধতিতে প্রতিস্থাপনের জন্য কোন ভ্রূণ বেছে নেওয়া হবে, তা ঠিক করার আগে নির্দিষ্ট জিনগত রোগের উপস্থিতি জানতে ভ্রূণের কোষ পরীক্ষা করা হয়। ২০১৯ সালের শেষ দিকে প্রথম আইভিএফ প্রচেষ্টায় তাঁদের কাঙ্ক্ষিত সন্তান হয়নি। ২০২০ সালের জুনে তাঁরা আবার চেষ্টা করেন এবং ২০২১ সালের জুনে একটি সুস্থ শিশুর জন্ম হয়।
গর্ভধারণের জন্য ট্রানের পরিবারের আইভিএফ প্রয়োজন হয়েছিল। বংশগত রোগের কারণে উপযুক্ত ভ্রূণ শনাক্ত করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই দম্পতির আইভিএফ দরকার হয়েছিল। তাঁদের অভিজ্ঞতা দেখায়, তিন শিশুর জন্ম দিয়ে যে সেবা শুরু হয়েছিল, তা কীভাবে বিভিন্ন চিকিৎসাগত প্রয়োজন মেটাতে এগিয়েছে।
প্রথম প্রজন্মের নতুন অধ্যায়
ট্রান আইভিএফের মাধ্যমে গর্ভে এসেছিলেন, আর তাঁর ছেলে গর্ভে আসে স্বাভাবিকভাবে। তাঁর গর্ভাবস্থায় প্রায় তিন দশক পর আবার সেই পরিবারটির সেবায় ফিরে আসেন ফুওং, যিনি একসময় তাঁর মাকে সহায়তা করেছিলেন।
সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের কারণ জানানো হয়নি। জন্মসংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সুস্থ ছেলেশিশু, তার ওজন, অস্ত্রোপচারের পর মায়ের স্থিতিশীল অবস্থা এবং পরীক্ষা শেষে মা-ছেলের সংস্পর্শের ওপর।
ভিয়েতনামে চিকিৎসাটি চালু করতে বহু বছর কাটানোর পর প্রথম আইভিএফ শিশুদের বড় হতে, বিয়ে করতে ও সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে দেখা ফুওংয়ের জন্য আনন্দের ছিল। তুয়েতের কাছে এই মুহূর্তের অর্থ ছিল নাতিকে স্বাগত জানানো; একসময় যে কন্যাকে তিনি ভেবেছিলেন হয়তো কখনো পাবেন না, তাকেই তিনি বড় করে তুলেছিলেন।
মূল তথ্য
- ভিয়েতনামের প্রথম তিন আইভিএফ শিশুর একজন লু তুয়েত ট্রান ২০২৬ সালের ৪ নভেম্বর হো চি মিন সিটির মি ডাক হাসপাতালে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন।
- শিশুটির ওজন ছিল ৩ হাজার ১৫০ গ্রাম। সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর ট্রানের অবস্থা স্থিতিশীল ছিল।
- অধ্যাপক নগুয়েন থি নগক ফুওং ১৯৯৮ সালে ট্রান এবং ২০২৬ সালে তাঁর ছেলেকে প্রসব করান।
- বিয়ের পর ট্রান স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করেন। তাঁর মা ফুওংয়ের উদ্যোগে পাওয়া আর্থিক সহায়তায় আইভিএফ চিকিৎসা নিয়েছিলেন।
- ১৯৯৮ সালের ৩০ এপ্রিল তু জু হাসপাতালে ভিয়েতনামের প্রথম তিন আইভিএফ শিশুর জন্ম হয়।
- ২০২৩ সালের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তু জু জানায়, তাদের হাসপাতালে আইভিএফের মাধ্যমে ১৬ হাজার ৩০০-এর বেশি শিশুর জন্ম হয়েছে এবং ক্লিনিক্যাল গর্ভধারণের হার ৪৫ শতাংশের বেশি।






