ব্যয়বহুল আমদানি বাংলাদেশের জ্বালানি বাজেটে চাপ বাড়াচ্ছে
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) ৫ নভেম্বর ২০২৬-এ প্রকাশিত এক মূল্যায়ন অনুযায়ী, আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটে (এমএমবিটিইউ) ২০ মার্কিন ডলার হলে বাংলাদেশের প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। সরবরাহে বিঘ্নের কারণে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে আরও বেশি দামে এলএনজি কিনতে বাধ্য হয় দেশটি। এতে সরকারি অর্থায়নে চাপ বাড়ে, অথচ গ্যাসের ঘাটতি চলতেই থাকে।
সূচিপত্র
- ব্যয়বহুল আমদানি বাংলাদেশের জ্বালানি বাজেটে চাপ বাড়াচ্ছে
- ৬০ টাকার ভর্তুকির অঙ্কটি কী বোঝায়
- বিনিয়োগের কতটা পরিকল্পনা স্থবির হয়ে পড়েছে?
- পাঁচ বছরের অগ্রগতি, চালু হতে আরও দীর্ঘ অপেক্ষা
- এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুতের খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বাড়তে পারে কেন
- ঋণদাতাদের নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ক্রেতা কেন প্রয়োজন
- ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের ভিন্ন বাধা
- বাংলাদেশের বিকল্প শুধু আরও গ্যাস আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়
- মূল বিষয়গুলো
এই মূল্যায়নে বাংলাদেশের ভর্তুকি সমস্যাকে বৃহত্তর বিনিয়োগ মন্দার প্রেক্ষাপটে দেখা হয়েছে। বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রস্তাবিত ৪৯টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং এলএনজি আমদানির ২২টি টার্মিনাল প্রকল্প বাতিল, প্রত্যাহার বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এসব প্রকল্পের আনুমানিক মোট বিনিয়োগমূল্য ছিল ৬৭.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
স্যাম রেনল্ডস ও ক্রিস্টোফার ডোলম্যানের লেখা আইইইএফএর পাঁচ বছরের প্রকল্প পর্যালোচনায় ১০৯.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ৯২টি প্রস্তাবিত বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ২১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের ৪৪টি আমদানি টার্মিনাল পরীক্ষা করা হয়েছে। পর্যালোচনার সময় প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ১১ শতাংশ এবং টার্মিনাল সক্ষমতার ১৫ শতাংশ চালু হয়।
বাংলাদেশ ২০২১ সালের পর তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করেছে। তবে মূল্যায়ন অনুযায়ী, জ্বালানি ও বিদ্যুতের উচ্চ ব্যয় ভর্তুকির চাহিদা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষায় বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়েছে। এত ব্যয় সত্ত্বেও অনির্ভরযোগ্য এলএনজি সরবরাহের কারণে দেশটি গ্যাসের ঘাটতির মুখে রয়েছে।
বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক সমস্যা হলো, বাজেটে আরও চাপ না দিয়ে কীভাবে আমদানি করা জ্বালানির খরচ মেটানো যায়। চার দেশের প্রকল্প উন্নয়নকারীদের সমস্যা শুরু আরও আগে: এমন সরঞ্জাম, অর্থায়ন ও বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তি নিশ্চিত করা, যা নির্মাণে বছরের পর বছর সময় লাগলেও এবং জ্বালানির দাম বদলালেও প্রকল্পকে টিকিয়ে রাখতে পারে।
৬০ টাকার ভর্তুকির অঙ্কটি কী বোঝায়
আইইইএফএর ভর্তুকির হিসাব আন্তর্জাতিক ক্রয়মূল্যের সঙ্গে বাংলাদেশে সরবরাহ করা গ্যাসের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার সম্পর্ক দেখায়। জ্বালানি সরবরাহের খরচ এবং বিক্রি থেকে আদায় হওয়া অর্থের মধ্যকার ব্যবধানের একাংশ ভর্তুকি দিয়ে পূরণ করা হয়। পুরো খরচ সরাসরি গ্রাহকের ওপর না চাপিয়ে সরকার এই ঘাটতি বহন করে।
এলএনজি হলো তরল করা প্রাকৃতিক গ্যাস, যা জাহাজে পরিবহনের সুবিধার জন্য ঠান্ডা করা হয়। আমদানি টার্মিনালে এটি আবার গ্যাসে পরিণত করে বিদ্যুৎকেন্দ্র, কারখানা ও অন্যান্য স্থাপনায় ব্যবহারের উপযোগী করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম সাধারণত প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট বা এমএমবিটিইউ হিসেবে উল্লেখ করা হয়; এটি শক্তির পরিমাপ। অন্যদিকে, স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা গ্যাসের পরিমাণ ঘনমিটারে মাপা হতে পারে।
এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২০ মার্কিন ডলার হলে ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকির হিসাবটি প্রযোজ্য। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়ার স্পট এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৭.৫০ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, যা ওই ভিত্তিমূল্যের চেয়ে ৩৭.৫ শতাংশ বেশি। স্পট ক্রয় বলতে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির পরিবর্তে তুলনামূলক দ্রুত সরবরাহের জন্য কেনা কার্গো বোঝায়। সেপ্টেম্বরে ওই দামে ভর্তুকির পরিমাণ কত হতে পারে বা বার্ষিক মোট ভর্তুকির পূর্বাভাস কী, তা আইইইএফএ জানায়নি।
বাংলাদেশে আইইইএফএর প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম সরকারি অর্থায়নে চাপের কথা তুলে ধরেন:
আন্তর্জাতিক বাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম বাড়তে থাকায় জ্বালানি খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে,
আলম বলেন, গত চার থেকে পাঁচ বছরে দামের ওঠানামার কারণে বাংলাদেশের মতো দাম-সংবেদনশীল আমদানিকারক দেশের জন্য সাশ্রয়ী মূল্য ও নির্ভরযোগ্য সরবরাহ—দুটিই নিশ্চিত করা কঠিন হয়েছে। আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও বাড়ে, ফলে জ্বালানি কেনার সিদ্ধান্ত দেশের রিজার্ভ ধরে রাখার প্রচেষ্টার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
বিনিয়োগের কতটা পরিকল্পনা স্থবির হয়ে পড়েছে?
আইইইএফএ বাতিল, প্রত্যাহার বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া প্রস্তাবিত গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিনিয়োগমূল্য ৫৬.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে শনাক্ত করেছে। ৬৬.২ গিগাওয়াট সক্ষমতার ৪৯টি প্রকল্প এর অন্তর্ভুক্ত। এক গিগাওয়াট ১,০০০ মেগাওয়াটের সমান; মেগাওয়াট দিয়ে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্দিষ্ট সময়ে কত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, তা বোঝানো হয়।
একইভাবে, ১১.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের আরও ২২টি পুনর্গ্যাসীকরণ প্রকল্প বাতিল, প্রত্যাহার বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে এসব প্রকল্পে বছরে ৮২ মিলিয়ন টন এলএনজি প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা ছিল। পুনর্গ্যাসীকরণ হলো সরবরাহের পর এলএনজিকে গরম করে আবার গ্যাসে পরিণত করার প্রক্রিয়া।
প্রভাবিত ৭১টি প্রকল্প পর্যালোচনা করা বিদ্যুৎকেন্দ্র ও টার্মিনালের ১৩৬টি প্রস্তাবের প্রায় ৫২ শতাংশ। এগুলোর মোট ৬৭.৮ বিলিয়ন ডলারের মূল্য ছিল ১৩০.২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনারও প্রায় ৫২ শতাংশ। আইইইএফএর হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ে সম্পন্ন হওয়া প্রকল্পগুলোর মোট মূল্যের প্রায় সাড়ে চার গুণ ছিল এসব প্রকল্পের মূল্য।
সরবরাহ ব্যবস্থার দুই দিকেই প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার হার ছিল সীমিত: প্রস্তাবিত টার্মিনাল সক্ষমতার মাত্র ১৫ শতাংশ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ১১ শতাংশ চালু হয়। এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরঞ্জামও প্রয়োজন। যেকোনো একটির কাজ দেরি হলে অন্যটিও প্রয়োজনীয় সরবরাহ বা গ্রাহকের অপেক্ষায় পড়ে থাকতে পারে।
পাঁচ বছরের অগ্রগতি, চালু হতে আরও দীর্ঘ অপেক্ষা
আইইইএফএর এই পর্যালোচনা ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি মূল্যায়নের হালনাগাদ সংস্করণ। ওই মূল্যায়নে এশিয়ার সাতটি বাজার পরীক্ষা করে অর্থনৈতিক, আর্থিক, অবকাঠামোগত ও নীতিগত সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা হয়েছিল। নতুন গবেষণায় এলএনজির চাহিদা বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে বলে প্রত্যাশিত চারটি দেশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগ পরিকল্পনার পাশাপাশি ব্যয় বৃদ্ধির চিত্রও প্রধান কয়েকটি তারিখে স্পষ্ট হয়:
- ২০২১: নতুন পর্যালোচনার ভিত্তি হিসেবে আইইইএফএ আগের আঞ্চলিক মূল্যায়ন প্রকাশ করে।
- ২০২১ থেকে ২০২৬: বাংলাদেশ তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করে; ভিয়েতনামে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে যায় মাত্র একটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প।
- ২০২২ সালের পর থেকে: যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক গ্যাস প্রকল্পের মূলধনি ব্যয় প্রায় চার গুণ বেড়েছে, যা বৃহত্তর সরঞ্জাম ও নির্মাণবাজারের চাপের ইঙ্গিত দেয়।
- সেপ্টেম্বর ২০২৬: এশিয়ার স্পট এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৭.৫০ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, যা মূল্যায়নে উল্লেখিত সংঘাত-পূর্ব দামের প্রায় তিন গুণ।
- ৫ নভেম্বর ২০২৬: চার দেশের প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা প্রকাশ করে আইইইএফএ।
সম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উন্নয়নের বিষয়ে প্রথম প্রকাশ্য ঘোষণার পর চালু হতে গড়ে সাত বছরের বেশি সময় নিয়েছে। উন্নয়নকারীরা সাধারণত তিন থেকে চার বছর সময় লাগবে বলে ধারণা করেছিলেন। ফলে বাস্তবে গড় সময় লেগেছে ওই সাধারণ অনুমানের সর্বোচ্চ সময়সীমার চেয়েও তিন বছরের বেশি।
বিদ্যুৎ পরিকল্পনার জন্য এই অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। চার বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে বলে প্রত্যাশিত কোনো কেন্দ্র বাস্তবে অনেক পরে চালু হতে পারে, আর এর মধ্যে সরঞ্জাম, আমদানি করা জ্বালানি ও অর্থায়নের ব্যয় বদলে যায়। প্রকল্পের সময়সূচিই নির্ধারণ করে কখন ব্যয় থেকে বিদ্যুৎ ও রাজস্ব আসতে শুরু করবে।
এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুতের খরচ দ্বিগুণেরও বেশি বাড়তে পারে কেন
আইইইএফএর হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানি ও সরঞ্জামের উচ্চ ব্যয় এবং স্থানীয় মুদ্রার দুর্বলতা মিলিয়ে এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুতের জীবনকালীন সমতুল্য ব্যয় ২০২১ সালের ভিত্তিমূল্যের ২.৩ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ, ব্যয় সর্বোচ্চ ১৩০ শতাংশ বাড়তে পারে।
সমতুল্য ব্যয় হলো একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনাকাল জুড়ে প্রতি একক বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচের হিসাব। এতে নির্মাণ, অর্থায়ন, জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয় একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। প্রাথমিক ব্যয়কে ১০০ ধরা হলে ১৩০ শতাংশ বৃদ্ধির পর তা দাঁড়াবে ২৩০।
পর্যালোচনার সহলেখক ও আইইইএফএর এশিয়া এলএনজি ও গ্যাস বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার ডোলম্যান বলেন, এই অঞ্চলের অনেক জ্বালানি পরিকল্পনায় তুলনামূলক কম জ্বালানির দাম ও সাশ্রয়ী মূলধনের ধারণা করা হয়েছিল। এখন ব্যয় বৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাব ওই প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনার আর্থিক ভিত্তিকে হুমকির মুখে ফেলছে।
মুদ্রার অবমূল্যায়নও চাপ বাড়ায়। স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলারের দাম বাড়লে একই ডলারের এলএনজি বা আমদানি করা সরঞ্জামের বিল মেটাতে ক্রেতাদের আরও বেশি স্থানীয় মুদ্রা খরচ করতে হয়। ফলে ডলারে দাম অপরিবর্তিত থাকলেও স্থানীয় মুদ্রায় প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে পারে।
গ্যাস টারবাইনের ঘাটতির কারণে ভারী সরঞ্জাম সরবরাহে ছয় বছর বা তারও বেশি সময় লাগছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক গ্যাস প্রকল্পগুলোর মূলধনি ব্যয় ২০২২ সালের তুলনায় প্রায় চার গুণ হয়েছে। একই সরঞ্জামবাজারে প্রতিযোগিতায় থাকা এশীয় উন্নয়নকারীদের জন্য এই ঘাটতি নির্মাণ বাজেট ও প্রকল্প চালুর তারিখ—দুটিই অনিশ্চিত করে তুলছে।
ঋণদাতাদের নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ক্রেতা কেন প্রয়োজন
প্রতিবেদনের সহলেখক ও আইইইএফএর এশিয়া এলএনজি ও গ্যাসবিষয়ক গবেষণাপ্রধান স্যাম রেনল্ডস বলেন, জ্বালানি, সরঞ্জাম ও মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। রাজস্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা অর্থায়ন নিশ্চিত করাও কঠিন করে তুলেছে।
বড় জ্বালানি প্রকল্পের অনেকগুলোই সীমিত দায়ের প্রকল্প অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। সহজভাবে বললে, ঋণদাতারা আশা করেন প্রকল্পের নিজস্ব আয় ও সম্পদ থেকেই মূলত ঋণ পরিশোধ হবে; উন্নয়নকারীর অন্যান্য ব্যবসাকে জড়িয়ে কোনো ব্যাপক নিশ্চয়তার ওপর তাঁরা নির্ভর করেন না। ঋণদাতাদের নিশ্চিত হতে হয়, বিদ্যুৎ বিক্রির আয় দিয়ে পরিচালন ব্যয় ও ঋণের কিস্তি মেটানো যাবে।
বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে নির্ধারিত হয়, কোনো ক্রেতা কী শর্তে বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেবে। ঋণদাতারা যে চুক্তিকে ঋণ দেওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য মনে করেন, সেটিই ব্যাংকযোগ্য চুক্তি। জ্বালানির খরচ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে বলে উন্নয়নকারী, ক্রেতা ও নিয়ন্ত্রকদের ঠিক করতে হয়, এই বাড়তি ব্যয় কে বহন করবে।
বাংলাদেশের ভর্তুকির বোঝা এই সমস্যার সরকারি অর্থায়ন-সংক্রান্ত দিকটি তুলে ধরে। ব্যবহারকারীদের জন্য জ্বালানির দাম সাশ্রয়ী রাখতে সরকারকে আরও বেশি ব্যয় বহন করতে হয়। প্রকল্প পর্যায়ে কে এই ব্যয় দেবে তা অনিশ্চিত থাকলে ঋণদাতা আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় চুক্তি চূড়ান্ত হতে দেরি হতে পারে।
ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের ভিন্ন বাধা
২০২১ সালের পর ফিলিপাইনে একাধিক প্রকল্প বাতিল হয়েছে। বিতরণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে ব্যাংকযোগ্য বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিশ্চিত করতে উন্নয়নকারীরা হিমশিম খেয়েছেন। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাইরে এলএনজির সীমিত চাহিদাও নতুন আমদানি টার্মিনালের ব্যবসায়িক সম্ভাবনা দুর্বল করেছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারের ফলে ফিলিপাইনের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কত ঘন ঘন উৎপাদনে ডাকা হবে, তা অনিশ্চিত হয়েছে। কোনো কেন্দ্র কম সময় চালালে তার বিক্রি করা বিদ্যুতের পরিমাণ কমে, ফলে নির্মাণ ব্যয় তুলে আনা ও ঋণ পরিশোধের জন্য উপলভ্য আয়ও কমে যায়।
ভিয়েতনামের এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য থাকলেও পর্যালোচনার পাঁচ বছরে মাত্র একটি প্রকল্প বাণিজ্যিক কার্যক্রমে গেছে। বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, এলএনজির বাড়তি দাম এবং বিদ্যুতের শুল্কের মাধ্যমে ব্যয় তুলে আনার অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করেছে। রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থার আর্থিক অবস্থা নিয়েও উদ্বেগের কথা মূল্যায়নে বলা হয়েছে।
গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প উন্নয়নে তুলনামূলকভাবে বেশি অগ্রগতি হয়েছে থাইল্যান্ডে। তবু দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও এলএনজি টার্মিনালের বিদ্যমান সক্ষমতার বড় অংশ অব্যবহৃত রয়েছে। অন্য দেশগুলোর বিলম্বের সঙ্গে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা আরও একটি উদ্বেগ যোগ করে: অবকাঠামো তৈরি হলেও সেটি চালানোর মতো পর্যাপ্ত চাহিদা থাকতে হয়।
বাংলাদেশের বিকল্প শুধু আরও গ্যাস আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়
বাংলাদেশের অব্যবহৃত দেশীয় গ্যাসসম্পদের বেশি ব্যবহার, জ্বালানি দক্ষতা উন্নত করা এবং বড় পরিসরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণের সুপারিশ করেছেন আলম। তাঁর প্রস্তাবে জ্বালানির উৎস এবং ভোক্তাদের কতটা জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়—দুই বিষয়ই বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
দেশীয় গ্যাস আমদানি করা কার্গোর ওপর নির্ভরতা কমাবে। অন্যদিকে, দক্ষতা বাড়লে একই শিল্প উৎপাদন বা জ্বালানিসেবা দিতে কম জ্বালানি লাগবে। চাহিদার দিক থেকে বিদ্যুতায়নের ওপর আরও গুরুত্ব দেওয়ারও সুপারিশ রয়েছে। এর অর্থ, সরাসরি জ্বালানি পুড়িয়ে চলে এমন কিছু সরঞ্জামের পরিবর্তে বিদ্যুৎচালিত সরঞ্জাম ব্যবহার করা।
উদাহরণ হিসেবে, শিল্পকারখানায় গ্যাসচালিত বয়লারের বদলে দক্ষ হিট পাম্প ব্যবহার করা যেতে পারে। হিট পাম্প জ্বালানি পুড়িয়ে তাপ তৈরির পরিবর্তে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তাপ স্থানান্তর করে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার কমানো ও দক্ষতা বাড়ানোর উপায় হিসেবে এই পরিবর্তনের কথা বলেছেন আলম।
সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যয় কমে আসা, সরবরাহের সময় কম হওয়া এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়াও এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্পগুলোকে বদলে দিচ্ছে। মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এসব পরিবর্তন নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সর্বোচ্চ চাহিদার সময় তা মেটাতে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজন কমাতে পারে।
বাংলাদেশের নতুন তিনটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেখায়, প্রকল্প চালু করা সম্ভব। কিন্তু চলমান ঘাটতি ও বাড়তে থাকা ভর্তুকি দেখায়, পরবর্তী সিদ্ধান্তে নির্মাণের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ, পরিচালন ব্যয় ও চাহিদাও বিবেচনা করতে হবে। চার দেশের ক্ষেত্রেই আইইইএফএর মূল বক্তব্য হলো, এলএনজির দ্রুত প্রসারের প্রত্যাশার তুলনায় বাস্তবে প্রকল্প বাস্তবায়ন অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
মূল বিষয়গুলো
- আইইইএফএর হিসাব অনুযায়ী, আমদানি করা এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২০ মার্কিন ডলার হলে বাংলাদেশের প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে ৬০ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়।
- ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এশিয়ার স্পট এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ২৭.৫০ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, যা ওই ভর্তুকির হিসাবের ভিত্তিমূল্যের চেয়ে বেশি।
- চার দেশে ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ৬৭.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের ৪৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ২২টি এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প বাতিল, প্রত্যাহার বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
- প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ১১ শতাংশ এবং টার্মিনাল সক্ষমতার ১৫ শতাংশ চালু হয়।
- চালু হওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো নির্মাণের সিদ্ধান্তের প্রথম প্রকাশ্য ঘোষণার পর খুলতে গড়ে সাত বছরের বেশি সময় নিয়েছে; সাধারণত তিন থেকে চার বছর লাগবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
- আইইইএফএর হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের ভিত্তিমূল্যের তুলনায় এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যয় সর্বোচ্চ ১৩০ শতাংশ বাড়তে পারে। বাংলাদেশে দেশীয় গ্যাস, দক্ষতা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুতায়ন বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।






