মাইলফলক অর্জন, সামনে আরও বড় সম্প্রসারণ
ভারত ২০২৫ সালে তার স্থাপিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার অর্ধেক অজীবাশ্ম উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য অতিক্রম করেছে, ২০৩০ সালের নির্ধারিত সময়সীমার পাঁচ বছর আগেই। নয়াদিল্লিতে ইন্ডিয়া রিনিউয়েবল এনার্জি সামিট অ্যান্ড এক্সপো ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রাজস্থান এই সম্মেলনকে কাজে লাগিয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা প্রায় ১২৫ গিগাওয়াটে উন্নীত করার পরিকল্পনার জন্য বিনিয়োগকারী খুঁজেছে।
সূচিপত্র
- মাইলফলক অর্জন, সামনে আরও বড় সম্প্রসারণ
- ৫০ শতাংশের সীমার অর্থ কী
- ভিন্ন সময়সীমায় ভারতের দুটি জাতীয় লক্ষ্য
- বর্তমান সক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি করার পরিকল্পনা রাজস্থানের
- বাড়ছে বিনিয়োগ, বাড়ছে চাহিদাও
- সম্প্রসারণে যুক্ত হচ্ছে পরিবার, খামার ও সরকারি ভবন
- সংরক্ষণ ও সঞ্চালন একসঙ্গে বাড়াতে হবে
- কারখানা ও সবুজ হাইড্রোজেনে বিস্তৃত হচ্ছে কর্মপরিকল্পনা
- আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বে যুক্ত হচ্ছে রাজ্যের অগ্রাধিকার
- মূল বিষয়গুলো
জাতীয় এই মাইলফলকের অর্থ, ভারতের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর আরও বড় অংশ এখন সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎ, পারমাণবিক শক্তি এবং জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ায় না—এমন অন্যান্য উৎসের ওপর নির্ভরশীল। নতুন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর স্থাপিত অজীবাশ্ম বিদ্যুৎ সক্ষমতা ছিল ৩০৮.০৩ গিগাওয়াট। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ২৯৯.২৫ গিগাওয়াট এবং পারমাণবিক শক্তি ৮.৭৮ গিগাওয়াট।
২ থেকে ৫ নভেম্বর ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের উদ্বোধন করে মোদি আরও একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য তুলে ধরেন: আগামী ১০ থেকে ১১ বছরে নতুন করে ৫০০ গিগাওয়াট অজীবাশ্ম বিদ্যুৎ সক্ষমতা যোগ করা। ২০৩০ সালের মধ্যে মোট অজীবাশ্ম সক্ষমতা ৫০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার ভারতের বিদ্যমান লক্ষ্যের পাশাপাশি এই সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এদিকে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী ভজনলাল শর্মা কেন্দ্রীয় নতুন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিমন্ত্রী প্রহ্লাদ যোশিকে সঙ্গে নিয়ে ৫০ জনের বেশি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনায় ব্রুকফিল্ড, রিনিউ, আদিত্য বিড়লা রিনিউয়েবলস, জিন্দাল গ্রুপ এবং আবাদার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
দুটি ঘোষণাই জাতীয় অর্জনের সঙ্গে রাজ্যভিত্তিক বাকি কাজের যোগসূত্র তৈরি করেছে। উৎপাদন সরঞ্জামের সঙ্গে জমি, অর্থায়ন, সঞ্চালন লাইন ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে মানুষের প্রয়োজনের সময় বাড়ি, খামার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ পৌঁছায়।
৫০ শতাংশের সীমার অর্থ কী
স্থাপিত সক্ষমতা বলতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সরঞ্জাম সর্বোচ্চ কতটা বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নকশা করা হয়েছে, তা বোঝায়। বাস্তবে কত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, তা নির্ভর করে সরঞ্জাম কত ঘন ঘন ও কতটা সক্ষমতায় কাজ করছে তার ওপর। সৌর প্যানেল দিনের আলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, আর বায়ু টারবাইনের উৎপাদন নির্ভর করে বাতাসের পরিস্থিতির ওপর।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় ভারতের অঙ্গীকার হলো স্থাপিত সক্ষমতার কত অংশ অজীবাশ্ম উৎস থেকে আসবে। বছরজুড়ে এসব উৎস থেকে কত বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়, সেটি আলাদা হিসাব; আবহাওয়া, বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা এবং চাহিদা এর ওপর প্রভাব ফেলে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বর স্থাপিত সক্ষমতার মধ্যে সৌরবিদ্যুতের পরিমাণ ছিল ১৭১.০৫ গিগাওয়াট এবং বায়ুবিদ্যুতের ৫৯.২০ গিগাওয়াট। এ দুই উৎস মিলিয়ে মোট ২৩০.২৫ গিগাওয়াট, যা দেশের ৩০৮.০৩ গিগাওয়াট অজীবাশ্ম সক্ষমতার প্রায় ৭৫ শতাংশ। শুধু সৌরবিদ্যুতের অংশ ছিল প্রায় ৫৬ শতাংশ।
যোশি সম্মেলনে বলেন, এরপর অজীবাশ্ম সক্ষমতা ৩১০ গিগাওয়াট ছাড়িয়েছে; ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যা ছিল ২০০ গিগাওয়াট। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আগের ওই সময়ের তুলনায় সক্ষমতা ১১০ গিগাওয়াটের বেশি, অর্থাৎ ৫৫ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
ভারতের অঙ্গীকার ও মাইলফলকের ধারাবাহিকতা দেখায়, এখন লক্ষ্য কেবল একটি নির্দিষ্ট শতাংশ অর্জন নয়, বরং আরও অনেক বেশি সক্ষমতা গড়ে তোলা:
- ২০২১: কপ২৬-এ ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট অজীবাশ্ম বিদ্যুৎ সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য ঘোষণা করে।
- ফেব্রুয়ারি ২০২৪: ১ কোটি পরিবারের বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য নিয়ে পিএম সূর্য ঘর কর্মসূচি শুরু হয়।
- ২০২৫: মোদির ভাষ্য অনুযায়ী, স্থাপিত বিদ্যুৎ সক্ষমতায় অজীবাশ্ম উৎসের অংশ ৫০ শতাংশে পৌঁছায়।
- ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬: মন্ত্রণালয়ের হিসাবে অজীবাশ্ম সক্ষমতা ছিল ৩০৮.০৩ গিগাওয়াট।
- ২–৫ নভেম্বর ২০২৬: পরবর্তী সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনার জন্য নয়াদিল্লির সম্মেলনে সরকার, বিনিয়োগকারী ও উৎপাদনকারীরা একত্র হন।
ভিন্ন সময়সীমায় ভারতের দুটি জাতীয় লক্ষ্য
২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট সক্ষমতা অর্জনের ভারতের লক্ষ্য বলতে ওই সময়ের মধ্যে মোট কত অজীবাশ্ম সক্ষমতা স্থাপন করা হবে, তা বোঝায়। সেপ্টেম্বরে সক্ষমতা ছিল ৩০৮.০৩ গিগাওয়াট; সেই হিসাবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে বাকি ছিল ১৯১.৯৭ গিগাওয়াট।
মোদির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো পরবর্তী ১০ থেকে ১১ বছরে নতুন করে আরও ৫০০ গিগাওয়াট সক্ষমতা যোগ করা। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নথিভুক্ত ভারতের পুরো অজীবাশ্ম বিদ্যুৎ সক্ষমতার চেয়েও এই সম্প্রসারণের পরিমাণ বেশি।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চ্যালেঞ্জটির কথা তুলে ধরে তা অর্জনের সক্ষমতার ওপর আস্থা প্রকাশ করেন:
আগামী ১০–১১ বছরে আমাদের লক্ষ্য থাকবে নতুন করে ৫০০ গিগাওয়াট অজীবাশ্ম সক্ষমতা যোগ করা। লক্ষ্যটি কিছুটা কঠিন, তবে আমার দেশের সক্ষমতার ওপর আস্থা আছে। এ কারণেই আমি বলছি, আমরা তা করব,
কোভিড-১৯ মহামারি ও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বিঘ্নের কথা উল্লেখ করে মোদি এই সম্প্রসারণকে জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর যুক্তি হলো, দেশে উৎপাদিত পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার ঝুঁকিতে ভারতের নির্ভরতা কমতে পারে।
বর্তমান সক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি করার পরিকল্পনা রাজস্থানের
রাজস্থানে সৌরবিদ্যুতের ৪৫ গিগাওয়াটের বেশি সহ মোট ৫১ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি, অর্থাৎ ৫১ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা স্থাপন করা হয়েছে। শর্মা বলেন, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতার দিক থেকে রাজস্থান ভারতে প্রথম।
২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১২৫ গিগাওয়াটে পৌঁছানোর লক্ষ্য রাজস্থানের বর্তমান সক্ষমতার প্রায় ২.৫ গুণ। বর্তমান সক্ষমতা ৫১ গিগাওয়াট ধরে হিসাব করলে, এর জন্য নতুন করে প্রায় ৭৪ গিগাওয়াট সক্ষমতা যোগ করতে হবে। রাজ্যের উল্লেখ করা নবায়নযোগ্য সক্ষমতার প্রায় ১০ ভাগের ৯ ভাগই ইতিমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ।
সৌর, বায়ু, হাইব্রিড প্রকল্প ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানান শর্মা। হাইব্রিড প্রকল্পে সৌর ও বায়ুর মতো একাধিক উৎস একত্রে ব্যবহার করা হয়। এসব উৎস বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে এবং গ্রিডের সংযোগব্যবস্থা যৌথভাবে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে।
বড় প্রকল্পের জন্য জমি পাওয়া সহজ করতে রাজস্থানের সমন্বিত পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নীতি এবং জমি ব্যবহারের অধিকারবিষয়ক নীতি নেওয়া হয়েছে। রাজস্থান বিনিয়োগ প্রসার প্রকল্প ২০২৪-এর আওতায় বিনিয়োগকারীরা প্রণোদনাও চাইতে পারেন। রাজ্যটি সৌর পার্ক, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন, বায়ু ও বায়োমাস প্রকল্প সম্প্রসারণের পাশাপাশি উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণের পরিকল্পনা তৈরি করছে।
বিনিয়োগকারীদের বৈঠকে বড় প্রকল্প উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক গোষ্ঠীগুলো অংশ নিলেও, ঘোষণাগুলোতে নতুন স্বাক্ষরিত প্রকল্পের মোট আর্থিক মূল্য উল্লেখ না করে বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা হয়েছে। রাজস্থানের বাস্তব কাজ হলো ২০৩০ সালের আগে আগ্রহকে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সংরক্ষণব্যবস্থা ও গ্রিড সংযোগে রূপ দেওয়া।
বাড়ছে বিনিয়োগ, বাড়ছে চাহিদাও
যোশি বলেন, আগের দুই বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৬ লাখ কোটি রুপির বেশি, অর্থাৎ ৬ ট্রিলিয়ন রুপিরও বেশি বিনিয়োগ এসেছে। একই সময়ে ৬৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং ৬.২ বিলিয়ন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
মোদির হিসাবে, গত এক দশকে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ কোটি রুপি, অর্থাৎ ১৫ ট্রিলিয়ন রুপির বেশি। দশকের শেষ নাগাদ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ ২০ লাখ কোটি রুপি, অর্থাৎ ২০ ট্রিলিয়ন রুপি ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে তিনি ধারণা দেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন, উৎপাদনশিল্প, সংরক্ষণ এবং বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক—এসব ক্ষেত্রেই বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
আরও বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রয়োজন কেন, তা তুলে ধরেন রাজ্য প্রতিনিধিরা। উত্তরপ্রদেশের বিদ্যুৎমন্ত্রী অরবিন্দ কুমার শর্মা বলেন, গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা মেটাতে রাজ্যটি ৩২ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে এবং ছয় থেকে সাত বছরে বিদ্যুৎ গ্রাহকের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। পরিবার, দোকান, কারখানা, স্কুল ও হাসপাতালে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে তিনি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানান।
দিল্লির মন্ত্রিসভার সদস্য আশিস সুদ বলেন, রাজধানীতে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ৮ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। পরের বছর তা ৯ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০৩৪–৩৫ সালে ১১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি এই পূর্বাভাস বর্তমান চাহিদার চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি।
সুদ বলেন, দিল্লিতে বিনা মূল্যে ২ লাখ ২০ হাজার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ৭৫০ মেগাওয়াট। রাজস্থানের বড় উৎপাদন প্রকল্প এবং দিল্লির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা একই সমস্যার ভিন্ন দিক মোকাবিলা করছে: নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে ক্রমবর্ধমান গ্রাহকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।
সম্প্রসারণে যুক্ত হচ্ছে পরিবার, খামার ও সরকারি ভবন
মোদি বলেন, পিএম সূর্য ঘর কর্মসূচিতে ৬৫ লাখের বেশি পরিবার যুক্ত হয়েছে। ২০২৭ সালে শেষ হওয়া অর্থবছরের মধ্যে ১ কোটি বাড়িতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্য রয়েছে এই কর্মসূচির। ওই হিসাব অনুযায়ী, লক্ষ্যের ৬৫ শতাংশের বেশি অর্জিত হয়েছে।
মোদি বলেন, এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৭৬ শতাংশ কমেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু পরিবারের বিল শূন্যে নেমে এসেছে, আর অন্যরা উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে বিক্রি করে আয় করছে। তবে তাঁর বক্তব্যে সমীক্ষাটির পরিধি ও পদ্ধতির বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি।
মোদি বলেন, ৪৪ হাজারের বেশি সরকারি ভবনেও সৌরবিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে বছরে আনুমানিক ৭০০ কোটি রুপি, অর্থাৎ ৭ বিলিয়ন রুপি সাশ্রয় হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল ও সড়কবাতিতে আরও ব্যাপকভাবে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।
কৃষি খাতের জন্য মোদি বলেন, পিএম-কুসুম কর্মসূচির মাধ্যমে ৩০ লাখের বেশি কৃষকের সেচে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে। সৌরচালিত পাম্প ব্যবহারকারী একজন কৃষকের বছরে প্রায় ১ লাখ রুপি সাশ্রয় হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। অব্যবহৃত কৃষিজমি ও মাঠের সীমানায় প্যানেল স্থাপনে কৃষকদের উৎসাহিত করেন, যাতে ফসলের পাশাপাশি বিদ্যুৎও উৎপাদন করা যায়।
দুগ্ধ খাতের কাজ, পশুখাদ্য তৈরি, ফসল কাটা এবং ফসল কাটার পর প্রক্রিয়াজাতকরণের উপযোগী সৌর সরঞ্জাম তৈরির আহ্বান জানান মোদি। তিনি ছাদে উৎপাদিত বিদ্যুৎকে বাড়িতে রান্না এবং বৈদ্যুতিক যানবাহন চার্জ দেওয়ার সম্ভাব্য উৎস হিসেবেও তুলে ধরেন। এসব কাজে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার আলো ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বাইরে দৈনন্দিন পরিবহন ও জ্বালানি ব্যয়েও বিস্তৃত হবে।
সংরক্ষণ ও সঞ্চালন একসঙ্গে বাড়াতে হবে
উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণের রাজস্থানের পরিকল্পনা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার সময়ের মধ্যে মৌলিক ব্যবধানটি মোকাবিলা করে। দিনের আলোতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ে, অথচ সূর্যাস্তের পর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি হতে পারে। সংরক্ষণব্যবস্থা পরে ব্যবহারের জন্য বিদ্যুৎ ধরে রাখতে পারে, আর সঞ্চালন লাইন তা বেশি চাহিদার এলাকায় পৌঁছে দিতে পারে।
মোদি বলেন, গ্রিন এনার্জি করিডরের পরবর্তী পর্যায়ে প্রায় ২ লাখ কোটি রুপি, অর্থাৎ ২ ট্রিলিয়ন রুপির বিনিয়োগের লক্ষ্য থাকবে। এসব করিডরে সঞ্চালন লাইন ও উপকেন্দ্রের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভালো সম্ভাবনাময় এলাকা থেকে বেশি বিদ্যুতের প্রয়োজন রয়েছে—এমন এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছানো হয়।
মোদি বলেন, ভারতের পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রিডকে একই কম্পাঙ্কে পরিচালিত একটি জাতীয় নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হয়েছে। কম্পাঙ্ক হলো পরিবর্তী তড়িৎ প্রবাহের ছন্দ; এটি স্থিতিশীল থাকলে সরঞ্জাম ও সামগ্রিক বিদ্যুৎব্যবস্থা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে।
গবেষক, স্টার্টআপ এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউটস অব টেকনোলজির প্রতি আহ্বানে মোদি ব্যাটারি সংরক্ষণ, দেশীয় সরঞ্জাম এবং নতুন প্রযুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। আবহাওয়ার বিভিন্ন পরিস্থিতি ও সারা দিনজুড়ে পরিবারের জ্বালানির চাহিদা মেটাতে সক্ষম ব্যবস্থা তৈরির আহ্বান জানান তিনি।
সৌর, বায়ু, হাইব্রিড প্রকল্প ও সংরক্ষণ নিয়ে রাজস্থানের প্রস্তাবিত সমন্বিত পরিকল্পনায় এসব প্রয়োজন একত্র হয়েছে। আরও বিদ্যুৎ উৎপাদন করা একটি কাজ। সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় তা পৌঁছে দিতে বৃহত্তর নেটওয়ার্কেও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
কারখানা ও সবুজ হাইড্রোজেনে বিস্তৃত হচ্ছে কর্মপরিকল্পনা
মোদি বলেন, ভারতে সৌর মডিউল উৎপাদন সক্ষমতা ২০০ গিগাওয়াট ছাড়িয়েছে, আর সৌর সেল উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৪০ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে। সেল হলো সূর্যের আলোকে বিদ্যুতে রূপান্তরকারী একক যন্ত্রাংশ; এসব সেল একত্র করে মডিউল বা প্যানেল তৈরি করা হয়।
তথ্য অনুযায়ী, মডিউল উৎপাদন সক্ষমতা সেল উৎপাদন সক্ষমতার পাঁচ গুণেরও বেশি। এই পরিসংখ্যান কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা নির্দেশ করে; অন্যদিকে দেশের স্থাপিত সৌর সক্ষমতা হলো ইতিমধ্যে স্থাপন করা বিদ্যুৎ উৎপাদন সরঞ্জামের পরিমাণ। সরবরাহব্যবস্থার আরও অংশ দেশে গড়ে তোলা সরকারের দেশীয় উৎপাদন প্রসারের উদ্যোগের অংশ।
মোদি জাতীয় সবুজ হাইড্রোজেন মিশনের কথাও তুলে ধরেন। দশকের শেষ নাগাদ ৫০ লাখ টন সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে এই মিশনের। নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পানিকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে বিভক্ত করে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন করা হয়।
সরাসরি বিদ্যুৎ সরবরাহের বাইরেও পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে হাইড্রোজেন; শিল্প ও পরিবহন খাতে এর সম্ভাব্য ব্যবহার রয়েছে। মোদি বলেন, কয়েক মাস আগে ভারত তাদের প্রথম সবুজ হাইড্রোজেনচালিত ট্রেন চালু করেছে। পরিবহনের সঙ্গে এই জ্বালানির সংযোগ বাড়াতে আরও কাজের আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে উৎপাদনশিল্প ও হাইড্রোজেন নিয়ে আলোচনা নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরেও বিনিয়োগের ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছে। সরঞ্জাম উৎপাদন, স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবহনে কর্মসংস্থানের কথা বলেন মোদি, তবে নতুন কর্মসংস্থানের কোনো সংখ্যাগত পূর্বাভাস দেননি।
আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বে যুক্ত হচ্ছে রাজ্যের অগ্রাধিকার
‘বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, অনুপ্রেরণা’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের পাশাপাশি ছিল আন্তর্জাতিক সৌর জোটের নবম অধিবেশন এবং সবুজ হাইড্রোজেনবিষয়ক চতুর্থ আন্তর্জাতিক সম্মেলন। ৪০০টির বেশি প্রদর্শক সৌর, বায়ু, হাইড্রোজেন, সংরক্ষণ ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের প্রযুক্তি প্রদর্শন করেন।
সম্মেলনের কর্মসূচিতে ১৩০টির বেশি দেশ এবং ৪০ জনের বেশি মন্ত্রীর অংশগ্রহণের কথা বলা হয়; তবে সম্মেলনের ফাঁকে যোশি ৩০টির বেশি দেশের প্রতিনিধিদের কথা উল্লেখ করেন। রাজস্থানসহ আরও ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বিনিয়োগের সুযোগ ও উৎপাদন সক্ষমতা তুলে ধরে।
অংশীদারদের মধ্যে ছিল অস্ট্রেলিয়া, ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্য। ভারতের বাইরেও সৌরবিদ্যুৎ উন্নয়নে অর্থায়নের প্রসঙ্গ তুলে মোদি ২০০ মিলিয়ন ডলারের আফ্রিকা সোলার ফ্যাসিলিটির প্রস্তাব দেন।
ভারতের পরবর্তী পর্যায়ে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অগ্রাধিকারগুলো একত্র হচ্ছে। বৈশ্বিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারে, আর রাজ্যগুলোকে জমি ও সংযোগের ব্যবস্থা করে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সক্ষমতার ৫০ শতাংশের মাইলফলক একটি জাতীয় অঙ্গীকার পূরণের অগ্রগতি নির্দেশ করে; পরবর্তী লক্ষ্যগুলোর জন্য আরও অনেক বেশি সরঞ্জাম ও অবকাঠামো প্রয়োজন।
মূল বিষয়গুলো
- মোদির ভাষ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়সীমার পাঁচ বছর আগে ২০২৫ সালে ভারতের স্থাপিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার ৫০ শতাংশ অজীবাশ্ম উৎসে পৌঁছায়।
- মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর অজীবাশ্ম সক্ষমতা ছিল ৩০৮.০৩ গিগাওয়াট, যার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ১৭১.০৫ গিগাওয়াট।
- ২০৩০ সালের মধ্যে মোট সক্ষমতা ৫০০ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য বহাল রেখেছে ভারত; আগামী ১০ থেকে ১১ বছরে নতুন করে আরও ৫০০ গিগাওয়াট যোগ করার লক্ষ্যও রয়েছে।
- নবায়নযোগ্য সক্ষমতা ৫১ গিগাওয়াটের বেশি থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ১২৫ গিগাওয়াটে উন্নীত করতে বিনিয়োগ চাইছে রাজস্থান।
- যোশি বলেন, আগের দুই বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে ৬ ট্রিলিয়ন রুপির বেশি বিনিয়োগ এসেছে।
- পরবর্তী সম্প্রসারণে সংরক্ষণ, সঞ্চালন, দেশীয় উৎপাদন এবং ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন গুরুত্বপূর্ণ।






