মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় ভারতের জন্য বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করেছে, তবে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা ট্রাম্পের হাতে রয়েছে

পড়তে 11 মিনিট
Democratic Midterm Win Gives India Trade Openings, but Trump Retains Tariff Weapons

ওয়াশিংটনে বিভক্ত সরকার গঠনের প্রস্তুতির মধ্যে আলোচনায় ভারতের সুযোগ বাড়ছে

২০২৬ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার প্রস্তাবিত বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে ভারত নতুন করে সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর কর্মসূচির পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন হারিয়েছেন, তবে শুল্ক বাড়ানো এবং নয়াদিল্লির কাছ থেকে ছাড় আদায়ের জন্য তাঁর হাতে এখনো বেশ কয়েকটি আইনি পথ রয়েছে।

সূচিপত্র
  1. ওয়াশিংটনে বিভক্ত সরকার গঠনের প্রস্তুতির মধ্যে আলোচনায় ভারতের সুযোগ বাড়ছে
  2. কেন গৃহস্থালির ব্যয় নির্বাচনী প্রতিক্রিয়ায় রূপ নিল
  3. কংগ্রেস কী বদলাতে পারে, আর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে কী আছে
  4. ফেব্রুয়ারির কাঠামো প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত চুক্তির অপেক্ষায়
  5. শুল্কের পরিসংখ্যান সতর্কভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি কেন
  6. দুটি তদন্তে দর-কষাকষির শর্ত বদলে যেতে পারে
  7. দ্রুত চুক্তিতে অসম ছাড়ের ঝুঁকি
  8. ইরান ও রুশ তেল বাণিজ্যকে জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে
  9. ভিসা ও প্রতিরক্ষা আলাদা পথে চলছে
  10. আলোচনার গতিপথ নির্ধারণ করেছে যেসব তারিখ
  11. মূল বিষয়গুলো

৪ নভেম্বর প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে পাঁচটি আসন এবং প্রতিনিধি পরিষদের অর্ধডজনের বেশি আসন পেয়েছেন। ভোট গণনা চলছিল এবং ফলের প্রত্যয়ন সম্পন্ন হতে কয়েক দিন লাগবে বলে আশা করা হয়েছিল। জীবনযাত্রার ব্যয়, আমদানি শুল্ক এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ রিপাবলিকানদের এ বিপর্যয়ের কারণ হয়েছে।

ভারতের জন্য তাৎক্ষণিক সুযোগ হলো কৃষি, শিল্পপণ্য ও ডিজিটাল বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে এমন দাবি মেনে নিতে তাড়াহুড়ো না করে মার্কিন বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনার বেশি সুযোগ পাওয়া। প্রকাশ্যে মন্তব্যের অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, কংগ্রেসের জোরালো তদারকি নয়াদিল্লির ওপর চাপ কমাতে পারে।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞরা বিপরীত দিকের ঝুঁকিও দেখছেন: বিদেশে ফল দেখাতে ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে দ্রুত চুক্তি করতে চাইতে পারেন। তাই মূল প্রশ্ন হলো, নিজেদের বাজার খোলার বিনিময়ে ভারত কতটা দীর্ঘস্থায়ী শুল্কছাড় আদায় করতে পারবে।

কেন গৃহস্থালির ব্যয় নির্বাচনী প্রতিক্রিয়ায় রূপ নিল

এসএসআরএস পরিচালিত এপি ভোটার জরিপে দেখা গেছে, ৩৯ শতাংশ ভোটার অর্থনীতিকে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলেছেন। গণতন্ত্রকে গুরুত্বপূর্ণ বলেছেন ৩২ শতাংশ এবং অভিবাসনকে ১৪ শতাংশ। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে খারাপ বলেছেন, আর ৬৫ শতাংশের মতে ট্রাম্পের নীতি পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে।

মূল্যস্ফীতি ছিল ৩.৭ শতাংশ; ট্রাম্প আবার দায়িত্ব নেওয়ার সময় তা ছিল ২.৪ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১.৩ শতাংশ-পয়েন্ট এবং ফেডারেল রিজার্ভের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১.৭ শতাংশ-পয়েন্ট বেশি হয়েছে। পরিবারের ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো, আগের দফার তীব্র মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় গতি কম হলেও দাম বাড়তে থাকছে।

শুল্কের কারণে চাপ আরও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে কোনো পণ্য আমদানিকারী ব্যবসার কাছ থেকে আমদানি শুল্ক আদায় করা হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা গবেষণায় দেখা গেছে, শেষ পর্যন্ত বাড়তি দামের মাধ্যমে এই ব্যয়ের বড় অংশ মার্কিন ভোক্তাদের ওপর পড়েছে। এবিসি নিউজের এক জরিপে ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, শুল্ক মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।

ইরানের যুদ্ধ চাপের আরেকটি উৎস তৈরি করেছে। সংঘাত শুরুর পর খুচরা জ্বালানির দাম প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানানো হয়। এপি ভোটার জরিপে ৬২ শতাংশ সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্তকে ভুল বলেছেন। আর ৭৪ শতাংশের মতে, কংগ্রেস নির্বাচনে তাঁদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংঘাতটি বড় বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।

বিজ্ঞাপন

কংগ্রেস কী বদলাতে পারে, আর ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে কী আছে

কংগ্রেসের কমিটিগুলোর মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং ব্যবসা ও ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব খতিয়ে দেখার বেশি ক্ষমতা পাবেন। আইন প্রণয়ন ও ফেডারেল ব্যয়ের ওপরও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ আছে, যা আইনপ্রণেতাদের হোয়াইট হাউসের সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ দেয়।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ ধর বলেন, কমিটিগুলো আমদানি বিধিনিষেধ খতিয়ে দেখতে পারে এবং ছাড় আদায়ে বাজেটসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কাজে লাগাতে পারে। সিনেটের অর্থ কমিটির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান হিসেবে চিহ্নিত সিনেটর রন ওয়াইডেন এবং সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা চার্লস শুমারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবগুলো বাণিজ্য নীতিতে প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করবে। শুমারের প্রস্তাবে ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা-সহ ট্রাম্পের ব্যবহৃত কয়েকটি ক্ষমতা বাতিল করার কথা রয়েছে।

এ ধরনের পরিবর্তন পাস করতে কমিটিতে জয়ই যথেষ্ট হবে না। ট্রাম্প কোনো আইনে ভেটো দিতে পারেন, আর প্রেসিডেন্টের ভেটো অগ্রাহ্য করতে কংগ্রেসের প্রতিটি কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দরকার। সিনেটের কার্যপ্রণালিগত নিয়মও আইন এগিয়ে নেওয়া কঠিন করে তুলতে পারে। নবনির্বাচিত কংগ্রেস ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেবে; তাই নির্বাচনের রাতের পরপরই কমিটি ও আইন প্রণয়নের পূর্ণ ক্ষমতা কার্যকর হবে না।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে "VETO" শব্দ লেখা লাল টুপির একটি ছবি পোস্ট করে বিরোধিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অভিবাসনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সহযোগিতায়ও তিনি প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।

সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত মোহন কুমারের যুক্তি, অভ্যন্তরীণভাবে সীমাবদ্ধ একজন প্রেসিডেন্ট পররাষ্ট্রনীতিতে আরও মনোযোগ দিতে পারেন। তাঁর মূল্যায়নে, ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্প বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে যেতে পারেন।

ফেব্রুয়ারির কাঠামো প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত চুক্তির অপেক্ষায়

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তির কাঠামো ঘোষণা করেছিল। চূড়ান্ত চুক্তিতে এখনো স্বাক্ষর হয়নি, এটি কার্যকরও হয়নি। প্রস্তাবিত বিনিময়ে রয়েছে ভারতীয় শুল্ক হ্রাস এবং বিপুল পরিমাণ মার্কিন পণ্য কেনা, আর এর বিনিময়ে বহু ভারতীয় রপ্তানি পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কম শুল্ক আরোপ।

যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পপণ্য এবং পশুখাদ্য, বাদাম, ফল, সয়াবিন তেল, ওয়াইন ও স্পিরিটসহ বিভিন্ন কৃষি ও খাদ্যপণ্যের ওপর শুল্ক কমানো বা তুলে দেওয়ার কথা ভারতের। কাঠামো প্রস্তাবে জ্বালানি, উড়োজাহাজ, মূল্যবান ধাতু, প্রযুক্তিপণ্য ও কোকিং কয়লাসহ পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন পণ্য কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এই ক্রয়-প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পাঁচ বছরে বছরে গড়ে ১০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কিনতে হবে। এর পরিমাণের কারণে বাস্তবায়নের শর্ত গুরুত্বপূর্ণ: কেনাকাটার সময় ভারতীয় ব্যবসা ও সরকারি ক্রেতাদের দাম, চাহিদা এবং বিকল্প সরবরাহকারীদের বিবেচনা করতে হবে।

বস্ত্র, পোশাক, চামড়া, জুতা, প্লাস্টিক, রাসায়নিক এবং কিছু যন্ত্রপাতিসহ ভারতের অনেক পণ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত পাল্টা শুল্কের হার ছিল ১৮ শতাংশ। কাঠামো প্রস্তাবে নির্দিষ্ট কিছু উড়োজাহাজ পণ্য, জেনেরিক ওষুধ, রত্ন ও হীরার শুল্ক তুলে দেওয়ার পাশাপাশি পারস্পরিক স্বার্থের খাতে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকারের কথাও ছিল।

বিজ্ঞাপন

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, দেশ দুটি চুক্তি সই করার "খুব কাছাকাছি" এবং "কাজের ৯৯ শতাংশ" সম্পন্ন হয়েছে। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়াল বলেন, চুক্তিটি ভারতকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেবে। চুক্তিতে স্বাক্ষরের কোনো চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।

শুল্কের পরিসংখ্যান সতর্কভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি কেন

ভারতের শুল্কের আওতা বারবার বদলেছে, আর বিভিন্ন হার বাণিজ্যের আলাদা পর্যায় বা শ্রেণিকে বোঝায়। ভারতীয় পণ্যে শুল্কের হার সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশে পৌঁছেছিল বলে জানানো হয়। অন্যদিকে ফেব্রুয়ারির কাঠামো প্রস্তাবে অনেক পণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ পাল্টা শুল্কের কথা ছিল।

২০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের Learning Resources, Inc. v. Trump মামলার রায়ে আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের আওতায় আরোপিত পাল্টা শুল্ক বাতিল করা হয়। ওই রায়ের পর সাধারণ ভিত্তিমূলক শুল্কের হার ১০ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়। চীন ছাড়া অধিকাংশ দেশের ওপর বর্তমান শুল্কও ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশের মধ্যে বলে জানানো হয়।

খাতভিত্তিক শুল্কের আইনি ভিত্তি আলাদা। ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইনের ২৩২ ধারার আওতায় ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানিতে, ভারত থেকেও আমদানি করা পণ্যসহ, ৫০ শতাংশ শুল্ক বহাল রয়েছে বলে জানানো হয়। জরুরি ক্ষমতার আওতায় আরোপিত শুল্ক নিয়ে আদালতের রায়ের পরও এসব শুল্ক বহাল ছিল।

গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব সতর্ক করে বলেন, ভবিষ্যতের কোনো চুক্তিতে ভারতীয় পণ্যের ওপর সাধারণ মার্কিন শুল্কের অতিরিক্ত ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ-পয়েন্ট শুল্ক আরোপ হতে পারে। তাঁর সতর্কতা সম্ভাব্য আলোচনাভিত্তিক চুক্তির কাঠামো নিয়ে; অন্যদিকে কাঠামো প্রস্তাবের ১৮ শতাংশ হার এবং পরবর্তী ভিত্তিমূলক হার শুল্কনীতির ভিন্ন পর্যায়কে বোঝায়।

রপ্তানিকারকের ক্ষেত্রে বাস্তব হিসাব নির্ভর করে পণ্যের ধরন, শুল্কের আইনি ভিত্তি এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো শুল্ক যোগ হচ্ছে কি না তার ওপর। একটি মাত্র শিরোনামি হার দিয়ে সব চালানের চিত্র বোঝানো যায় না।

দুটি তদন্তে দর-কষাকষির শর্ত বদলে যেতে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারার আওতায় উৎপাদন সক্ষমতার অতিরিক্ততা নিয়ে তদন্তের ফল প্রকাশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রশাসন ওই ফলের ভিত্তিতে নতুন শুল্ক আরোপ এবং ভারতসহ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে শুল্ক-সংক্রান্ত সমঝোতা নতুন করে আলোচনায় তুলতে পারে।

উৎপাদন সক্ষমতার অতিরিক্ততা বলতে এমন উৎপাদনক্ষমতা বোঝায়, যা চাহিদার চেয়ে বেশি। ওয়াশিংটনের উদ্বেগ হলো, বিদেশের সরকারি সহায়তা বা অন্য নীতি অতিরিক্ত উৎপাদনে উৎসাহ দিতে পারে, যা পরে এমন দামে মার্কিন বাজারে আসে যে দেশটির উৎপাদকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

৩০১ ধারার আরেকটি তদন্তে দেখা হয়েছে, জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি ঠেকাতে বাণিজ্য অংশীদাররা যথেষ্ট ব্যবস্থা নিচ্ছে কি না। ওই প্রক্রিয়ার আওতায় ভারতের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা জানানো হয়। উৎপাদনসংক্রান্ত তদন্ত শুল্কের আরেকটি সম্ভাব্য উৎস তৈরি করছে।

৩০১ ধারা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর বা অন্যায্য বলে বিবেচিত বিদেশি নীতির জবাব দিতে পারে দেশটি। ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইনের ২৩২ ধারা অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বিবেচিত আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা যায়। দুটি ধারাই কংগ্রেসের আগে পাস করা আইনের আওতায় কার্যকর; ফলে প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য প্রশাসনকে নতুন করে ভোট চাইতে হয় না।

বিজ্ঞাপন

দ্রুত চুক্তিতে অসম ছাড়ের ঝুঁকি

শ্রীবাস্তবের ধারণা, নির্বাচনে পরাজয় ভারতকে নিয়ে দৃশ্যমান চুক্তি করার জন্য ট্রাম্পের আগ্রহ বাড়াবে। তাঁর মতে, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা জোরদার এবং সুরক্ষামূলক শুল্কের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই দলই এখন অবস্থান নিয়েছে। এর মধ্যে ইউনিয়নের চাকরি নিয়ে উদ্বিগ্ন ডেমোক্র্যাটরাও রয়েছেন।

গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীবাস্তব ভারতের ওপর সম্ভাব্য চাপের কথা এভাবে তুলে ধরেন:

রাশিয়া, চীন ও ইরানের বিরুদ্ধে পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব খাটাতে ব্যর্থ হয়ে ট্রাম্পের এখন দ্রুত জয় দরকার। মার্কিন প্রভাব দেখাতে বাণিজ্যচুক্তির জন্য ভারতের ওপর বাড়তি চাপ আসবে বলে মনে করা যায়।

সাধারণ আমদানি শুল্ক, যেগুলোকে মোস্ট ফেভারড নেশন বা এমএফএন শুল্ক বলা হয়, সেগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাঁর প্রধান উদ্বেগ। নামটি থাকলেও এমএফএন বলতে সাধারণত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কোনো সদস্য অন্য সদস্যদের ওপর যে নিয়মিত শুল্ক আরোপ করে, সেটিই বোঝায়। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নিজের সাধারণ শুল্ক বহাল রেখে অতিরিক্ত শুল্ক থেকে ছাড় দেবে, আর ভারত মার্কিন পণ্যের ওপর এ ধরনের অনেক শুল্ক কমাবে।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাবিষয়ক বিশেষজ্ঞ অভিজিৎ দাস সতর্ক করেছেন, আমেরিকান পণ্যের জন্য অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার ভারতের এমএফএন প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করতে পারে, যদি না এই ব্যবস্থা বৈধ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মতো কোনো ব্যতিক্রমের আওতায় পড়ে। আমেরিকাও সাধারণ শুল্ক না কমালে এমন চুক্তি ওই শর্ত পূরণ করবে কি না, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।

কোয়ান অ্যাডভাইজরি গ্রুপের ভূরাজনীতি ও নীতিবিষয়ক পরিচালক দীপ পাল ভারতের দিক থেকে একটি সুযোগ দেখছেন। তাঁর মতে, ট্রাম্পের দুর্বল রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আরও ভালো চুক্তি সম্ভব বলে আলোচকেরা মনে করতে পারেন, ফলে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। দুই পক্ষের স্বার্থ স্পষ্ট: ওয়াশিংটন এমন চুক্তি চায়, যেটিকে তারা বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারবে; আর নয়াদিল্লি চায় প্রতিদ্বন্দ্বী রপ্তানিকারকদের তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী সুবিধা।

ইরান ও রুশ তেল বাণিজ্যকে জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে

জ্বালানির দাম, নৌপরিবহন এবং কূটনীতি, সব দিক থেকেই ইরানের যুদ্ধ ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ ব্যাহত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বড় ক্রেতা ভারত; তাই এই বিঘ্ন চলতে থাকলে পরিবহন, শিল্প ও গৃহস্থালির ব্যয় বাড়বে।

নির্বাচনের পর ইরানে ফেব্রুয়ারির হামলার পক্ষে অবস্থান বজায় রাখেন ট্রাম্প। তবে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণের "একটি অংশ" ইরান ছিল বলে তিনি স্বীকার করেন। সংঘাতের অবসানে ফলাফলটি আরও গুরুতর আলোচনার পথ খুলে দেয় কি না, তা নয়াদিল্লি নজরে রাখবে।

রুশ জ্বালানি আরেকটি চাপের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ২০২৬ সালের লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট, যা সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত হয়, রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতাদের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্কের বিধান করেছে। জাতীয় স্বার্থসংক্রান্ত ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্প ওই বিধান আপাতত স্থগিত রেখেছেন।

আগস্টে ভারতের তেল আমদানির প্রায় ৪৪ শতাংশ ছিল রুশ অপরিশোধিত তেল। এই অংশই দেখায়, নতুন করে শুল্কের হুমকি এলে তা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনার বাইরেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। নিষেধাজ্ঞা আইনটি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের সমর্থন পেয়েছে, ফলে দলীয় বিভাজন পেরিয়ে ভারতের ওপর চাপ আসতে পারে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুণায়েত আশা প্রকাশ করেন, নির্বাচনে ধাক্কা পাওয়ায় ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে এমন সিদ্ধান্তে লাগাম টানা হবে। শ্রীবাস্তবের পরামর্শ ছিল, ভারতের নিজস্ব জ্বালানি ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে কার্যকর ছাড় আদায় করা।

বিজ্ঞাপন

ভিসা ও প্রতিরক্ষা আলাদা পথে চলছে

ভারতীয় পেশাজীবী ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এইচ-১বি ভিসায় বিধিনিষেধ নিয়ে কংগ্রেসের তদারকির দিকেও নজর রাখবে। এই ভিসায় মার্কিন নিয়োগকর্তারা বিশেষায়িত কাজে কর্মী নিয়োগ করতে পারেন। মাইক্রোসফট, টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস এবং ইনফোসিস এই কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রশাসন নির্দিষ্ট কিছু নতুন এইচ-১বি আবেদনের জন্য ১ লাখ ডলারের ফি ঘোষণা করে। পরে দুটি ফেডারেল আদালত এর প্রয়োগে বাধা দেয় এবং ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস অর্থ প্রদান ছাড়াই আবেদন অনুমোদন করতে শুরু করে। শুনানি ও আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এ বিধিনিষেধের অর্থনৈতিক প্রভাব খতিয়ে দেখতে পারেন।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভিত্তি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ১০ বছর মেয়াদি একটি কাঠামোতে সই করে, যার আওতায় রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, তথ্য বিনিময় এবং সামরিক সরঞ্জামের যৌথ উৎপাদন। চীন নিয়ে অভিন্ন উদ্বেগ দুই মার্কিন দলেই এই সম্পর্কের সমর্থন জোগায়।

ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে কংগ্রেসের তদন্তে প্রাসঙ্গিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকা প্রতিষ্ঠান, ভারতীয় ব্যবসাসহ, বাড়তি নজরদারির মুখে পড়তে পারে। এ ধরনের তদন্ত শুল্ক, ভিসা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সিদ্ধান্ত থেকে আলাদা পথে চলবে।

আলোচনার গতিপথ নির্ধারণ করেছে যেসব তারিখ

আদালতের রায়, জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি বাণিজ্য আলোচনা এগিয়েছে। কয়েকটি ঘটনা ব্যাখ্যা করে, ফেব্রুয়ারির কাঠামো প্রস্তাবটি এখন কেন ভিন্ন রাজনৈতিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে রয়েছে।

  • অক্টোবর ২০২৫: ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র ১০ বছর মেয়াদি প্রতিরক্ষা কাঠামোতে সই করে।
  • ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: দুই দেশ অন্তর্বর্তী বাণিজ্য কাঠামো ও ৫০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করে।
  • ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ইরানে হামলার পর সংঘাত শুরু হয়; পরে তা জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করে এবং জ্বালানির দাম বাড়ায়।
  • ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতার আওতায় আরোপিত পাল্টা শুল্ক সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করে।
  • সেপ্টেম্বর ২০২৬: রুশ জ্বালানির বড় ক্রেতাদের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দিয়ে ট্রাম্প আইনে স্বাক্ষর করেন।
  • ৪ নভেম্বর ২০২৬: প্রকাশিত মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
  • জানুয়ারি ২০২৭: নবনির্বাচিত কংগ্রেসের দায়িত্ব নেওয়ার কথা রয়েছে।

বাণিজ্যে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে উৎপাদন সক্ষমতার অতিরিক্ততা নিয়ে প্রত্যাশিত ৩০১ ধারার তদন্তের ফল। আলোচনা আবার শুরু হলে ভারত কী ধরনের শুল্কচাপের মুখে পড়বে, তা এই ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।

মূল বিষয়গুলো

  • কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ভারতের আলোচনার সুযোগ বাড়বে এবং ট্রাম্পের বাণিজ্য সিদ্ধান্ত আরও কঠোর তদারকির মুখে পড়বে।
  • ২৩২ ও ৩০১ ধারার আওতায় শুল্ক আরোপের ক্ষমতা, নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষমতা এবং প্রেসিডেন্টের ভেটো দেওয়ার অধিকার ট্রাম্পের হাতে রয়েছে।
  • ফেব্রুয়ারির বাণিজ্য কাঠামো প্রস্তাবে ভারতের অনেক পণ্যে ১৮ শতাংশ পাল্টা শুল্ক এবং পাঁচ বছরে ৫০০ বিলিয়ন ডলারের ভারতীয় ক্রয়ের কথা ছিল।
  • চূড়ান্ত চুক্তিতে এখনো স্বাক্ষর হয়নি; এরই মধ্যে আদালতের পরবর্তী রায় ও নতুন শুল্ক তদন্ত দর-কষাকষির শর্ত বদলে দিয়েছে।
  • রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের যুদ্ধ ভারতের বাণিজ্য আলোচনাকে জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
  • ভিসা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আদালত ও কংগ্রেসের তদারকির মুখে, আর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রের দুই দলেরই সমর্থন পাচ্ছে।
এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন

আপনার পছন্দ হতে পারে