কূটনীতির কেন্দ্রে ব্যবসাকে রাখছে সমরকন্দ সফর
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ২০২৬ সালের ১৭–২২ অক্টোবর উজবেকিস্তান ও ভারত সফরে ২০০ জনের বেশি মার্কিন ব্যবসায়ী নেতার নেতৃত্ব দেবেন। সফরে তিনি সমরকন্দে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের সঙ্গে আলোচনায় বড় একটি বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদল নিয়ে যাবেন। ১৩ অক্টোবর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সফরসূচি ঘোষণা করে; এতে উজবেকিস্তানের পর তাঁর পরবর্তী গন্তব্য হিসেবে মুম্বাই ও জামনগরের নাম উল্লেখ করা হয়।
সূচিপত্র
- কূটনীতির কেন্দ্রে ব্যবসাকে রাখছে সমরকন্দ সফর
- C5+1 বৈঠকে যেসব বিষয় থাকবে
- কয়েক মাসের প্রস্তুতির পর বড় প্রতিনিধিদল
- খনিজ ও ব্যবসায়িক পরিষদ উজবেকিস্তানকে এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি দিচ্ছে
- প্রযুক্তি সহযোগিতাও এগোচ্ছে
- কূটনৈতিক সূচিতে সফরের স্থান
- মুম্বাই ও জামনগরের গুরুত্ব
- বাণিজ্যবিরোধ ভারতের আলোচ্যসূচিকে জটিল করছে
- জ্বালানির বাইরেও সহযোগিতা চলছে
- মূল বিষয়গুলো
১৩ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের পররাষ্ট্র দপ্তরের ঘোষণায় বলা হয়েছে:
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ১৭–২২ অক্টোবর উজবেকিস্তানের সমরকন্দ এবং ভারতের মুম্বাই ও জামনগর সফর করবেন।
সমরকন্দ সফরে থাকবে C5+1 পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক এবং উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক আলোচনা। গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্য এশিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করার বিষয়গুলো এমন এক সফরের পটভূমি তৈরি করছে, যার লক্ষ্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো।
পররাষ্ট্র দপ্তর প্রতিনিধিদলটিকে ২০০ জনের বেশি ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে বর্ণনা করেছে। সফর সম্পর্কে কিছু বিবরণে ২০০টির বেশি কোম্পানির কথা বলা হলেও, ঘোষণায় দেওয়া সংখ্যা মানুষের; আলাদা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নির্দিষ্ট করা হয়নি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে রুবিওর এটিই হবে উজবেকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ায় প্রথম সফর। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ২০২৬ সালে এ অঞ্চলের পাঁচটি দেশই সফর করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। ঘোষিত সফরসূচিতে কেবল উজবেকিস্তান রয়েছে, যেখানে বাকি চার দেশের কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
এ বছর দ্বিতীয় সরকারি সফরে ভারতে যাবেন রুবিও। সেখানে বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির পাশাপাশি জ্বালানি সহযোগিতা থাকবে আলোচনার কেন্দ্রে। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বিশাল তেল শোধনাগার কমপ্লেক্সের আবাসস্থল জামনগরকে সফরের গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ায় ভারত সফরে একটি বাস্তব শিল্পভিত্তিক মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
C5+1 বৈঠকে যেসব বিষয় থাকবে
C5+1-এ মধ্য এশিয়ার পাঁচটি রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেয়। ২০১৫ সালে চালু হওয়া এ কাঠামোর প্রথম বৈঠক ছিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের; তাতে অংশ নিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। অভিন্ন আঞ্চলিক উদ্বেগ নিয়ে আলোচনার জন্য ছয়টি সরকারকে নিয়মিত একটি মঞ্চ দেয় এই কাঠামো।
সমরকন্দে হবে যৌথ আলোচনা এবং দ্বিপক্ষীয় বৈঠক; অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার প্রতিটি সরকারের আলাদা আলোচনা। গোষ্ঠীর বৈঠকে অভিন্ন অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হতে পারে, আর পৃথক বৈঠকে কর্মকর্তারা নিজ নিজ দেশের নির্দিষ্ট বিষয়গুলো তুলতে পারবেন।
রুবিওর অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে পররাষ্ট্র দপ্তরের ঘোষণায় বলা হয়েছে:
উজবেকিস্তানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও C5+1 মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন। এই কূটনৈতিক মঞ্চের মাধ্যমে কৌশলগত সহযোগিতা কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য আরও শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে, তা তুলে ধরবেন তিনি।
সফরের প্রস্তুতিকালে অর্থনৈতিক যোগাযোগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অভিন্ন আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জকে অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। অর্থনৈতিক যোগাযোগ বলতে দেশগুলোর মধ্যে পণ্য, বিনিয়োগ ও সেবার আদান-প্রদান সহজ করাকে বোঝায়। জ্বালানি নিরাপত্তা হলো সাশ্রয়ী দামে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতা।
২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের নেতাদের আতিথ্য দেন। রুবিওর আসন্ন মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক সেই সম্মেলনের পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে আলোচনা আবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে ফিরছে, পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছে বড় আকারের ব্যবসায়ী উপস্থিতি।
কয়েক মাসের প্রস্তুতির পর বড় প্রতিনিধিদল
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত সার্জিও গোর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে উজবেকিস্তান সফরের পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। সে সময় তিনি ১০০টির বেশি কোম্পানির প্রতিনিধিত্বকারী একটি প্রতিনিধিদলের কথা জানান। অক্টোবরে ঘোষণায় অবশ্য ২০০ জনের বেশি ব্যবসায়ী নেতার কথা বলা হয়েছে।
দুটি সংখ্যা থেকে সফরের প্রকাশ্য বিবরণের পরিবর্তন বোঝা যায়, যদিও সেগুলো ভিন্ন বিষয় গণনা করছে: সেপ্টেম্বরে কোম্পানি, অক্টোবরে ব্যক্তি। অংশগ্রহণের ব্যাপ্তি এবং এক জায়গায় মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মার্কিন নির্বাহীদের সাক্ষাতের সুযোগই এর বাস্তব গুরুত্ব।
বাণিজ্যিক লক্ষ্য সম্পর্কে পররাষ্ট্র দপ্তর সরাসরি বলেছে:
এই ঐতিহাসিক সফরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ২০০ জনের বেশি ব্যবসায়ী নেতার সমন্বয়ে গঠিত মার্কিন বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্য এশিয়ার মধ্যে আরও জোরালো বাণিজ্যিক সহযোগিতার নতুন যুগের সূচনা হবে।
বাণিজ্যিক সহযোগিতা জোরদার করাই ওয়াশিংটনের ঘোষিত লক্ষ্য। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল সরকারগুলোর আলোচনার পাশাপাশি কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য নিয়ে কথা বলার সুযোগ দেবে। ঘোষণায় অংশগ্রহণকারী কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়নি, সফরের সঙ্গে কোনো মোট বিনিয়োগমূল্যও যুক্ত করা হয়নি।
উজবেকিস্তান সফরের আয়োজক হলেও বাণিজ্যিক বার্তাটি পুরো অঞ্চলের জন্য। পাঁচটি দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রুবিওর বৈঠক তাশখন্দের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বাইরেও আলোচনার সুযোগ তৈরি করছে।
খনিজ ও ব্যবসায়িক পরিষদ উজবেকিস্তানকে এগিয়ে যাওয়ার ভিত্তি দিচ্ছে
উজবেকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাখতিয়োর সাইদভ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়াশিংটনে রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই পক্ষ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা মৌল আহরণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে সহযোগিতা নিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই করে। এর ফলে এসব সম্পদ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে স্থান পায়।
গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বলতে শিল্প ও সরবরাহ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে সরকারগুলো যে উপাদানগুলো বিবেচনা করে, সেগুলো বোঝায়। বিরল মৃত্তিকা মৌল হলো এক ধরনের ধাতু, যা শক্তিশালী চুম্বক ও ইলেকট্রনিকসের মতো পণ্যে ব্যবহৃত হয়। আহরণে মাটির নিচ থেকে সম্পদ তুলে আনা হয়; প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সেগুলোকে উৎপাদকের ব্যবহারের উপযোগী উপাদানে রূপ দেওয়া হয়।
ফেব্রুয়ারির সমঝোতা স্মারকে দুই ধাপই অন্তর্ভুক্ত। ফলে এর আওতা খনির বাইরেও বিস্তৃত হয়ে খনিজকে ব্যবহারের উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় শিল্পকার্য পর্যন্ত পৌঁছেছে। উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ সরঞ্জাম ও বিনিয়োগে দক্ষ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য তাই এটি প্রাসঙ্গিক।
আমেরিকান উজবেক বিজনেস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কাউন্সিল এপ্রিলে ওয়াশিংটনে কার্যক্রম শুরু করে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে C5+1 শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট শাভকাত মির্জিয়োয়েভ ও ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিষদটি প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়েছিলেন।
সমরকন্দে প্রতিনিধিদল পৌঁছানোর আগেই পরিষদটি ব্যবসায়িক সহযোগিতার আরেকটি পথ তৈরি করেছে। পরিষদ ও খনিজবিষয়ক সমঝোতা স্মারক মিলিয়ে সফরটির ভিত্তি আগের কয়েক মাসে তৈরি হয়েছে; ফলে বাণিজ্যিক আলোচনা শুধু আগ্রহের একটি সাধারণ ঘোষণা দিয়ে শুরু করতে হবে না।
প্রযুক্তি সহযোগিতাও এগোচ্ছে
২৯ সেপ্টেম্বর আস্তানায় C5+1 SI সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে মধ্য এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিনিধি, প্রযুক্তি কোম্পানি এবং বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। আলোচ্যসূচিতে ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো, সাইবার নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ।
এসব বিষয় প্রাকৃতিক সম্পদের বাইরেও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিসর বাড়ায়। ডিজিটাল অবকাঠামোর মধ্যে অনলাইন সেবা পরিচালনায় ব্যবহৃত নেটওয়ার্ক ও কম্পিউটিং ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত। সাইবার নিরাপত্তা বলতে এসব ব্যবস্থা ও তাতে থাকা তথ্য সুরক্ষিত রাখাকে বোঝায়।
আস্তানার সম্মেলন ও খনিজ চুক্তি সহযোগিতার দুটি আলাদা ক্ষেত্রের দিকে ইঙ্গিত করে: শিল্পের প্রয়োজনীয় ভৌত উপকরণ এবং আধুনিক ব্যবসা ও সরকারি সেবা পরিচালনায় ব্যবহৃত প্রযুক্তি। অঞ্চলজুড়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর বৃহত্তর উদ্যোগে দুটিই প্রাসঙ্গিক।
সমরকন্দের ঘোষিত আলোচ্যসূচির কেন্দ্রে রয়েছে কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা। সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনটি দেখায়, মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের আগে সরকার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো নির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত অগ্রাধিকার নিয়েও আলোচনা করেছে।
কূটনৈতিক সূচিতে সফরের স্থান
রুবিওর সফরসূচি রাজনৈতিক বৈঠক, অর্থনৈতিক চুক্তি ও ব্যবসায়িক আয়োজনের ধারাবাহিকতার পর আসছে। প্রস্তুতি কীভাবে এগিয়েছে, তা মূল তারিখগুলোতে দেখা যায়:
- ২০১৫: জন কেরির অংশগ্রহণে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে C5+1-এর যাত্রা শুরু।
- নভেম্বর ২০২৫: ট্রাম্প ওয়াশিংটনে মধ্য এশিয়ার নেতাদের আতিথ্য দেন; যুক্তরাষ্ট্র ও উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিষদ প্রতিষ্ঠায় সম্মত হন।
- ফেব্রুয়ারি ২০২৬: সাইদভ ও রুবিও ওয়াশিংটনে বৈঠক করেন এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকা মৌল নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই করেন।
- এপ্রিল ২০২৬: আমেরিকান উজবেক বিজনেস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট কাউন্সিল ওয়াশিংটনে কার্যক্রম শুরু করে।
- ২৩–২৬ মে ২০২৬: ভারতে আগের সরকারি সফর করেন রুবিও।
- ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬: প্রযুক্তি সহযোগিতা নিয়ে C5+1 SI সম্মেলনের আয়োজক আস্তানা।
- ১৩ অক্টোবর ২০২৬: রুবিওর আসন্ন সফরসূচি ঘোষণা করে পররাষ্ট্র দপ্তর।
- ১৭–২২ অক্টোবর ২০২৬: সমরকন্দ সফরের পর মুম্বাই ও জামনগর যাওয়ার কথা রয়েছে রুবিওর।
১৭–২২ অক্টোবরের সময়সীমায় দুই দেশের সফরই রয়েছে। প্রথমে সমরকন্দ, এরপর ভারতের দুই শহর। প্রতিটি গন্তব্যে পৌঁছানোর আলাদা তারিখ জানানো হয়নি।
রুবিওর আগের ভারত সফরে নয়াদিল্লিতে কোয়াড পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক ছিল। এর আয়োজক ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর। কোয়াডে রয়েছে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। এবারের সফরে মনোযোগ সরে আসবে দ্বিপক্ষীয় সরকারি আলোচনা ও ব্যবসায়িক বৈঠকে।
মুম্বাই ও জামনগরের গুরুত্ব
কৌশলগত অংশীদারত্ব, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঘটনাবলি এবং জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ নিয়ে জ্যেষ্ঠ ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন রুবিও। বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতেও ব্যবসায়িক বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি আলোচনা সম্পর্কে পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে:
কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদার করা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়ে মত বিনিময় এবং জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে তিনি জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে:
বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ এগিয়ে নিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
গুজরাটের জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের শোধনাগার কমপ্লেক্স রয়েছে; একক স্থানে অবস্থিত বিশ্বের বৃহত্তম শোধনাগার হিসেবে এটিকে বর্ণনা করা হয়েছে। এর দৈনিক অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা ১৪ লাখ ব্যারেল। শোধনাগারে অপরিশোধিত তেল থেকে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য তৈরি করা হয়।
এই সক্ষমতার কারণেই জ্বালানি আলোচনার জন্য জামনগর প্রাসঙ্গিক। রুবিওর সফরসূচিতে তাঁকে এমন একটি শহরে নেওয়া হচ্ছে, যেখানে তেলকে ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় শিল্পভিত্তিক ভূমিকা রয়েছে; পাশাপাশি থাকছে মুম্বাইয়ে ব্যবসায়িক বৈঠক।
মার্চে ট্রাম্প টেক্সাসের ব্রাউনসভিলে প্রস্তাবিত একটি শোধনাগারের ঘোষণা দেন, যাতে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বিনিয়োগের কথা রয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটির ব্যয় তিনি ৩০০ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করেন এবং একে ৫০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নতুন শোধনাগার বলে বর্ণনা করেন। তাঁর ঘোষণার বিবরণ অনুযায়ী প্রকল্পটি এখনো প্রস্তাব পর্যায়ে রয়েছে; নির্মাণের কোনো সময়সূচি দেওয়া হয়নি।
জামনগর কমপ্লেক্স ও ব্রাউনসভিলের প্রস্তাব দুই দেশের জ্বালানি শিল্পের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট যোগসূত্র তৈরি করেছে। সহযোগিতা বাড়ানোর উপায় নিয়ে কর্মকর্তারা আলোচনার সময় এই বাণিজ্যিক পটভূমিতেই রুবিওর বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হবে।
বাণিজ্যবিরোধ ভারতের আলোচ্যসূচিকে জটিল করছে
অক্টোবরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কর্মকর্তারা জানান, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা আবারও থমকে গেছে। দুই দেশের মধ্যে পণ্য ও সেবা বিনিময়ের শর্ত নিয়ে ওই আলোচনা হচ্ছে; তাই এর অগ্রগতি রুবিওর সফরে পরিকল্পিত ব্যবসায়িক বৈঠকগুলোর জন্য প্রাসঙ্গিক।
রুশ জ্বালানি কেনা দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সুযোগ রাখা মার্কিন আইনি ব্যবস্থার বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ট্রাম্প ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬-এ সই করে একে আইনে পরিণত করেন। আইনটিতে রুশ তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচ বৃহত্তম আমদানিকারকের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্দেশনা রয়েছে। তবে যেসব দেশ রাশিয়ার প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির ১৫ শতাংশের কম আমদানি করে এবং সেই আমদানি কমাতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
CSIS-এর একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ১১৩ নম্বর ধারা রুশ তেল ও গ্যাসের বড় ক্রেতা এবং নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তাকারী দেশগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের অনুমোদন দেয়। ১১৫ নম্বর ধারা আবার জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় শুল্ক মওকুফের ব্যাপক ক্ষমতা প্রেসিডেন্টকে দেয়। ফলে আইনটি কার্যকর হওয়া মানেই ভারতের ওপর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, এমন নয়।
আমদানি পণ্যের ওপর আরোপিত করকে শুল্ক বলা হয়। শুল্কের হার ১০০ শতাংশ হলে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ঘোষিত মূল্যের সমপরিমাণ কর দিতে হবে, ফলে সেগুলো দেশে আনা অনেক ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিয়ে মস্কোর ওপর চাপ সৃষ্টি করাই ওয়াশিংটনের ঘোষিত উদ্দেশ্য।
২০২৬ সালের শুরুর দিকে ভারত সাময়িকভাবে রুশ জ্বালানি কেনা কমিয়েছিল, পরে আবার তা বাড়ায়; বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরবরাহ বিঘ্নের পর। ফলে ভারত কোথা থেকে তেল কিনছে, তা নিয়ে মতবিরোধের পাশাপাশি জ্বালানি আলোচনা হবে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি মধ্যস্থতা করেছেন বলে ট্রাম্পের বারবার দাবি এবং ওমানের কাছে একটি জাহাজে মার্কিন সামরিক হামলায় তিন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু—দুই ঘটনাতেও সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় মনোযোগী এই সফরে এসব বিরোধ রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে।
ভারতের ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদও রুবিওর সফরকে ঘিরে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির অংশ। সফর ঘোষণার সময় ওই বিক্ষোভ নিয়ে ওয়াশিংটন কোনো মন্তব্য করেনি।
জ্বালানির বাইরেও সহযোগিতা চলছে
ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর প্রতিরক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবায় সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলেছেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক এক সামরিক মহড়ায় ৫০০ জনের বেশি সেনা অংশ নিয়েছেন এবং রাজস্থানে প্রথমবারের মতো মার্কিন F-35 যুদ্ধবিমান অংশ নিয়েছে।
ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জেনেরিক ওষুধ আমদানি এবং দুই দেশের কোম্পানিগুলোর পরস্পরের বাজারে বিনিয়োগের কথাও উল্লেখ করেন গোর। জেনেরিক ওষুধে মূল ব্র্যান্ডের ওষুধের মতো একই সক্রিয় উপাদান থাকে এবং সংশ্লিষ্ট পেটেন্ট সুরক্ষার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সাধারণত এগুলো বিক্রি করা হয়।
ঘোষণার আগের সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ট্রাম্পের মধ্যে কথোপকথন সহযোগিতার আরও সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রদূত। তাঁর মন্তব্যে দেখা যায়, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি বাস্তব সহযোগিতার সম্পর্ক বাড়াতে সরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
রুবিওর দুই গন্তব্যেই বাণিজ্যিক যোগসূত্র রয়েছে, তবে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার আলাদা। উজবেকিস্তানে বড় মার্কিন প্রতিনিধিদল, খনিজবিষয়ক সমঝোতা স্মারক এবং নতুন ব্যবসায়িক পরিষদের সমর্থনে আঞ্চলিক কূটনৈতিক বৈঠক হবে। ভারতে জ্বালানি ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক আলোচনা হবে প্রতিষ্ঠিত এক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে, যে সম্পর্কে একাধিক মতবিরোধ এখনো সক্রিয়।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৬ সালের ১৭ থেকে ২২ অক্টোবর সমরকন্দ, মুম্বাই ও জামনগর সফরের কথা রয়েছে রুবিওর।
- উজবেকিস্তান সফরে তাঁর সঙ্গে থাকবেন ২০০ জনের বেশি মার্কিন ব্যবসায়ী নেতা।
- সমরকন্দে C5+1 মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক এবং মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হবে।
- যুক্তরাষ্ট্র ও উজবেকিস্তানের সহযোগিতায় রয়েছে ফেব্রুয়ারির খনিজবিষয়ক সমঝোতা স্মারক এবং এপ্রিলে কার্যক্রম শুরু করা ব্যবসায়িক পরিষদ।
- ভারতের আলোচনায় থাকবে জ্বালানি, বিনিয়োগ, কৌশলগত সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ঘটনাবলি।
- জামনগরে রিলায়েন্সের শোধনাগার কমপ্লেক্স রয়েছে, যেখানে দৈনিক ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করা যায়।
- থেমে থাকা বাণিজ্য আলোচনা, রুশ জ্বালানি কেনা এবং রাজনৈতিক বিরোধ ভারত সফরকে জটিল করছে।
- রুশ জ্বালানির ওপর শুল্ক আরোপের ব্যবস্থায় ট্রাম্প ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সই করেন; শুল্ক সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ হতে পারে, তবে শর্ত পূরণকারী প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিকারকদের জন্য ব্যতিক্রম এবং জাতীয় স্বার্থে প্রেসিডেন্টের শুল্ক মওকুফের সুযোগ রয়েছে।






