পাহাড়ি বন্যায় সীমান্তজুড়ে সতর্কবার্তা
২০২৬ সালের ২৯ অক্টোবর ভুটানের উত্তরাঞ্চলীয় গাসা জেলার সিনতাফু হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যায় গাসা ছাচু উষ্ণ প্রস্রবণ কমপ্লেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়, লায়ার দিকে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং প্রতিবেশী ভারতের ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। ভুটানে কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি; পানি পৌঁছানোর আগেই উষ্ণ প্রস্রবণ এলাকা খালি করা হয়েছিল।
সূচিপত্র
রাত প্রায় ৮টার দিকে বন্যার পানি তাক্তসেমাখাংয়ে পৌঁছায়। এরপর তা ভুটানের উঁচু পাহাড়কে ভারতের সংকোশ নদীর সঙ্গে যুক্ত করা নদীব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। পশ্চিমবঙ্গ সর্বোচ্চ সতর্কতা—রেড অ্যালার্ট—জারি করে, আর আসাম নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রস্তুতি নেয়।
৩০ অক্টোবরের মধ্যে ঢল পশ্চিমবঙ্গের সংকোশ নদী দিয়ে বড় ধরনের প্লাবন ছাড়াই বয়ে যায়। ত্রাণশিবিরে রাত কাটানো বাসিন্দারা গ্রামে ফিরতে শুরু করেন। তবে ভুটান উজানে দুটি স্রোতধারার মিলনস্থলের কাছে তৈরি হওয়া নতুন একটি হ্রদ পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখে।
ঘটনাটি দুটি তাৎক্ষণিক উদ্বেগ সামনে আনে: ভুটানে সড়ক ও জনসেবামূলক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি এবং আসন্ন বন্যার মাত্রা স্পষ্ট হওয়ার আগেই অনেক দূরের ভাটির নদী এলাকা থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন।
লায়া ও গাসা ছাচুর কাছে কী ঘটেছিল?
সিনতাফু হ্রদ, যা শিনতাফু নামেও লেখা হয়, গাসা জেলার প্রশাসনিক এলাকা লায়া গেওগের লুঙ্গোতে ওয়াকিলা পর্বতের নিচে অবস্থিত। হ্রদ থেকে বেরিয়ে আসা পানি মো ছু নদীব্যবস্থায় প্রবল বেগে নেমে আসে এবং ভুটানের দুর্গম পার্বত্য জনপদগুলোর একটি লায়ার সঙ্গে সংযোগকারী সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত করে।
গাসা ছাচু উষ্ণ প্রস্রবণ কমপ্লেক্স ভেসে যায় এবং পুনাখা-গাসা মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লায়ার দিকে সড়কের অংশবিশেষও ভেসে যায়। ফলে পথটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করা হয়। মেরামতের ব্যবস্থা চলার সময়ে এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় যাতায়াত ও সরবরাহ পরিবহন কঠিন হয়ে পড়েছে।
দুটি বেইলি সেতুও ভেসে গিয়ে থাকতে পারে। বহনযোগ্য ইস্পাতের অংশ জুড়ে এসব সেতু তৈরি করা হয়, ফলে প্রকৌশলীরা স্থানে প্রতিটি উপকরণ তৈরি না করেই পারাপারের ব্যবস্থা করতে পারেন। অন্ধকার ও প্রবল স্রোতের কারণে পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন সম্ভব না হওয়ায় শুরুতে সেতুগুলোর অবস্থা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগেও গাসা ছাচু বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ২০২১ সালে মো ছু গতিপথ বদলে উষ্ণ প্রস্রবণ এলাকা প্লাবিত করে। নদীর পরিবর্তনশীল আচরণে আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত এই পর্যটনকেন্দ্রের মেরামতের চাপ সর্বশেষ ধ্বংসযজ্ঞে আরও বেড়েছে।
পানির পরিমাণ কত ছিল?
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান সেচ প্রকৌশলী বলেন, ভুটানের জাতীয় জলবিদ্যা ও আবহাওয়া কেন্দ্র (এনসিএইচএম) থেকে পাওয়া তথ্য ভারতের কেন্দ্রীয় পানি কমিশনের মাধ্যমে আসার পর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৭৪ লাখ ঘনমিটার পানির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক সমন্বিত পার্বত্য উন্নয়ন কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি) ধারণা করেছে, পানি উপচে পড়ার আগে সিনতাফু হ্রদে ৬০ লাখ থেকে ৭০ লাখ ঘনমিটার পানি ছিল।
প্রাথমিক এক হিসাবেও বেরিয়ে আসা পানির পরিমাণ ৭৪ লাখ ঘনমিটারের বেশি বলা হয়েছিল। আইসিআইএমওডি জানায়, প্রকৃতপক্ষে কত পানি বেরিয়েছে, তা তখনও যাচাই করা হচ্ছিল। ভাটিতে প্রত্যাশিত পানির পরিমাণ, হ্রদে থাকা পানির আনুমানিক পরিমাণ এবং পরিমাপ করা পানিনিষ্কাশন—এগুলো আলাদা হিসাব। তাই প্রতিটি সংখ্যা কী বোঝাচ্ছে, তা শনাক্ত করা জরুরি।
আইসিআইএমওডির হিসাব অনুযায়ী, হ্রদের পানির পরিমাণ অলিম্পিকের প্রায় ২,৪০০ থেকে ২,৮০০টি সুইমিং পুলের সমান। এক ঘনমিটার সমান ১,০০০ লিটার। অর্থাৎ, কম হিসাব ধরলেও জনবসতিপূর্ণ উপত্যকার অনেক উঁচুতে প্রায় ৬০০ কোটি লিটার পানি জমা ছিল।
তাৎক্ষণিক বিপদ নির্ভর করে পানি কত দ্রুত বেরিয়ে আসে, উপত্যকার গঠন কেমন এবং নেমে আসার পথে পানি কতটা শিলা ও পলি টেনে আনে—তার ওপর। এক জায়গায় ঘনীভূত ঢল আরও দূরে ভাটিতে ছড়িয়ে পড়ার আগেই কোনো সেতু বা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ভারতের নদীব্যবস্থায় বন্যা যেভাবে পৌঁছায়
সিনতাফু থেকে আসা পানি মো ছুতে প্রবেশ করে। পুনাখায় এই নদী ফো ছুর সঙ্গে মিশে পুনাতসাংছু গঠন করে, যা ভারতের দিকে বয়ে গিয়ে সংকোশে পরিণত হয়। সংযুক্ত নদীগুলোর এই প্রবাহপথ ব্যাখ্যা করে, কেন পাহাড়ি হ্রদে শুরু হওয়া জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সীমান্তজুড়ে প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল।
ভুটানের এনসিএইচএম তাশিথাংয়ে মো ছু পর্যবেক্ষণ করে ভারতকে তথ্য জানায়। ভুটানে ভারতের দূতাবাসও ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে। এরপর ২৯ অক্টোবর কেন্দ্রীয় পানি কমিশন পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ জারি করে।
ভারতের জলশক্তি মন্ত্রণালয় পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার জেলা এবং আসামের ধুবরি জেলায় সংকোশ নদীর পানি আকস্মিক বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানায়। আসামের কোকরাঝাড় জেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
দুই দিনে প্রধান ঘটনাগুলো ঘটে এভাবে:
- ২৯ অক্টোবর, সন্ধ্যা: সিনতাফু হ্রদের পানি উপচে তাক্তসেমাখাংয়ের দিকে বন্যার পানি নেমে আসে। রাত প্রায় ৮টায় পানি সেখানে পৌঁছে যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
- ২৯ অক্টোবর, রাত: ভুটান ভারতকে সতর্কবার্তা জানায়, কেন্দ্রীয় পানি কমিশন পরামর্শ জারি করে এবং কর্তৃপক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর থেকে বাসিন্দাদের সরাতে শুরু করে।
- ৩০ অক্টোবর: ভুটানে কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। পশ্চিমবঙ্গের সংকোশ নদী দিয়ে বড় ধরনের প্লাবন ছাড়াই বন্যার পানি বয়ে যায় এবং কিছু বাসিন্দা আশ্রয়কেন্দ্র থেকে ফিরতে শুরু করেন।
- পানি উপচে পড়ার পর: তাক্তসেমাখাংয়ে নতুন হ্রদ তৈরি হওয়ায় ভুটানের এনসিএইচএম বাসিন্দাদের সতর্ক করে এবং নদী উপত্যকাগুলো পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখে।
১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরানো হয়
পশ্চিমবঙ্গ কর্তৃপক্ষ আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলার ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ এবং উপনদীর পাশের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। শুধু আলিপুরদুয়ারেই ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও জানানো হয়; জেলার চূড়ান্ত সংখ্যাভিত্তিক বিভাজন দেওয়া হয়নি।
কুমারগ্রাম চা-বাগান, কুমারগ্রাম বনগ্রাম, পাকড়িগুড়ি ও ভোলকাসহ কুমারগ্রামের সংকোশ তীরবর্তী জনপদগুলোতে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। নদীতীরের কিছু গ্রামের বাসিন্দারা গবাদিপশু সঙ্গে নিয়ে চলে যান। এতে স্পষ্ট হয়, সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগে জীবিকা রক্ষার বিষয়টিও জীবনের সুরক্ষার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
পশ্চিমবঙ্গের পানিসম্পদ অনুসন্ধান ও উন্নয়নমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত নিশীথ প্রামাণিক সংকোশ ও এর উপনদীর পাশে বসবাসকারীদের পানি থেকে দূরে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান:
সংকোশ নদী ও এর সঙ্গে যুক্ত সব উপনদীর অববাহিকায় বসবাসকারী সবাইকে জীবন রক্ষার জন্য অবিলম্বে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে বলা হয়েছে।
ভারতের জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) সহায়তা ও দিনরাত উদ্ধারকাজের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সদস্য মোতায়েন করে। আসাম ধুবরি জেলার কর্মকর্তাদের নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলে। মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
নতুন তৈরি হ্রদের দিকে ভুটানের নজর কেন ছিল
পরবর্তীতে ভুটানের এনসিএইচএম সিনতাফু ছু ও লুঙ্গু ছুর, যেটি গাংছেন তাগ ছু নামেও পরিচিত, মিলনস্থলের কাছে তাক্তসেমাখাংয়ে নতুন একটি হ্রদ শনাক্ত করে। সংস্থাটির পরামর্শে জলাশয়টিকে কৃত্রিম হ্রদ বলা হয়।
মো ছু ও পুনাতসাংছু উপত্যকার মানুষকে সতর্ক থাকতে এবং নদীতীর ও বন্যাপ্রবণ এলাকা এড়িয়ে চলতে পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। প্রথম ঢল ভাটিতে চলে যাওয়ার পরও এই সতর্কতা জারি ছিল, কারণ নতুন হ্রদের আশপাশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন ছিল।
হ্রদটির আয়তন, স্থিতিশীলতা বা পানি বেরিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য ধরন কর্তৃপক্ষ জানায়নি। তাই কাছাকাছি জনপদের জন্য বাস্তবসম্মত নির্দেশনা ছিল সহজ: পর্যবেক্ষণ চলাকালে ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর থেকে দূরে থাকা।
পশ্চিমবঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি এবং ভুটানে সতর্কতা অব্যাহত থাকা—একই নদীব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন অংশের পরিস্থিতিই তুলে ধরে। ভারতের আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাসিন্দারা ফিরছিলেন ঢল চলে যাওয়ায়; অন্যদিকে ভুটানের কর্তৃপক্ষ উজানে নতুন করে জমা হওয়া পানির দিকেও নজর রাখছিল।
হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে বন্যা হয় কীভাবে?
হিমবাহ-সম্পর্কিত হ্রদের পানি আকস্মিকভাবে বেরিয়ে এসে যে বন্যা সৃষ্টি করে, তাকে সাধারণত গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা সংক্ষেপে জিএলওএফ বলা হয়। ভূপ্রকৃতি ও বরফের চলাচলের ওপর নির্ভর করে গলিত পানি হিমবাহের সামনে, পৃষ্ঠে বা নিচে জমতে পারে।
কিছু হ্রদের পানি আটকে রাখে বরফ। অন্যগুলো থাকে কঠিন শিলা বা মোরেইনের পেছনে; মোরেইন হলো হিমবাহের ফেলে যাওয়া প্রাকৃতিক পাথর-মাটির স্তূপ। এতে বালি, পলি, নুড়ি, ছোট পাথর ও বড় বোল্ডার থাকতে পারে। এগুলোর শক্তি ও আকৃতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখে, কতটা নিরাপদে পানি আটকে থাকবে।
ভারী বৃষ্টিতে হ্রদে প্রবেশ করা পানির পরিমাণ বাড়তে পারে। ভূমিধস, শিলাধস বা তুষারধস হ্রদে আছড়ে পড়ে বাধার ওপর দিয়ে ঢেউ ঠেলে দিতে পারে। বাধার ভেতরে ক্ষয় বা পরিবর্তন হলেও পানি বেরিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।
নেমে আসার সময় বেরিয়ে আসা পানি কাদা, পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সঙ্গে নিতে পারে। নদীর পানি ধীরে বাড়ার তুলনায় এই মিশ্রণ অনেক বেশি শক্তিতে সড়ক, সেতু, ভবন ও জলবিদ্যুৎ স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে। সিনতাফু হ্রদের পানি উপচে পড়ার নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা যায়নি।
আঞ্চলিক মূল্যায়নে যা উঠে এসেছে
আইসিআইএমওডির ২০২৬ সালের মূল্যায়নে দেখা গেছে, হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলো ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ এবং আনুমানিক বরফের মজুতের ৯ শতাংশ হারিয়েছে। হিমবাহ পিছু হটলে উন্মুক্ত হয়ে পড়া ভূমির নিচু জায়গায় গলিত পানি জমতে পারে বা বিদ্যমান হ্রদের আয়তন বাড়তে পারে।
‘ন্যাচারাল হ্যাজার্ডস অ্যান্ড আর্থ সিস্টেম সায়েন্সেস’ সাময়িকীতে ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ২০২০ সালের উপাত্তের ভিত্তিতে ভুটানের ২,৫৭৪টি হিমবাহ-হ্রদের তালিকা ব্যবহার করা হয়। ভাটিতে ভবন, সড়ক ও কৃষিজমির সম্ভাব্য ঝুঁকি যাচাই করতে গবেষকেরা বিস্তারিত বন্যা মডেলিংয়ের জন্য ২৭৮টি হ্রদ বেছে নেন। এটি তালিকাভুক্ত হ্রদের প্রায় ১১ শতাংশ; অর্থাৎ তুলনামূলকভাবে ছোট একটি দলের ওপর মডেলিং কেন্দ্রীভূত করা হয়েছিল।
ভুটানের সম্ভাব্য বিপজ্জনক ১৭টি হিমবাহ-হ্রদের একটি হিসেবে সিনতাফুকে শনাক্ত করা হয়েছিল। আন্তঃসীমান্ত কোশি, গণ্ডকী ও কর্ণালী অববাহিকা জুড়ে আইসিআইএমওডি ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির আগের মূল্যায়নে সম্ভাব্য বিপজ্জনক ৪৭টি বড় হ্রদ শনাক্ত করা হয়েছিল। এই সংখ্যাগুলো ভিন্ন ভৌগোলিক এলাকা ও মূল্যায়নভুক্ত গোষ্ঠীর হিসাব।
আইসিআইএমওডি হিন্দুকুশ হিমালয়জুড়ে, কারাকোরাম এবং মধ্য ও পূর্ব হিমালয়সহ, নথিভুক্ত ৩৮৮টি হিমবাহ-হ্রদ ভেঙে বন্যার ঘটনাও উল্লেখ করেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে তিস্তা নদীতে ঢলের প্রধান কারণ হিসেবে সাউথ লোনাক হ্রদের পানি উপচে পড়াকে চিহ্নিত করে। এতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং জনবসতি, সেতু ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিপদ কমানোর উপায় কী?
ভারতের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য বিপজ্জনক হ্রদের আয়তন, প্রাকৃতিক বাধা, আশপাশের হিমবাহ ও ভূপ্রকৃতি যাচাই করে ঝুঁকি মূল্যায়নের সুপারিশ করে। স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জলাশয়ের পরিবর্তন অনুসরণ এবং নতুন হ্রদ শনাক্ত করা যায়। সিনথেটিক অ্যাপারচার রাডার—ভূমি পর্যবেক্ষণে রাডার সংকেত ব্যবহারকারী প্রযুক্তি—মেঘলা বর্ষা মৌসুমেও নজরদারিতে সহায়তা করতে পারে।
বিশেষভাবে বিপজ্জনক বলে মূল্যায়িত হ্রদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি নিষ্কাশন, পানির নির্গমনপথ নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামো নির্মাণ, পাম্পিং, সাইফনিং এবং প্রাকৃতিক বাধার ভেতর দিয়ে নিষ্কাশন সুড়ঙ্গ তৈরির মতো প্রকৌশল ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। হ্রদের ভৌত অবস্থা এবং দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডে কাজ করার বাস্তব সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করে ব্যবস্থা বেছে নিতে হয়।
নদীর পানি মাপার গেজ ও সতর্কবার্তা ভাটির এলাকার ঝুঁকি মোকাবিলা করে। এগুলো কর্তৃপক্ষকে সড়ক বন্ধ করা, উদ্ধারকারী দল প্রস্তুত রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি থেকে মানুষ সরানোর সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। ২৯ অক্টোবরের উদ্যোগে ভুটানের পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে এবং সেখান থেকে স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আইসিআইএমওডির মহাপরিচালক পেমা গিয়ামতশো চলমান পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর সতর্কবার্তার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে এই সাড়ার যোগসূত্র তুলে ধরেন:
ভুটানের কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী সতর্কবার্তা দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে,
উষ্ণ প্রস্রবণ এলাকা খালি করার পর ভুটানে কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি, আর ঢল বয়ে যাওয়ার সময় পশ্চিমবঙ্গ বড় ধরনের প্লাবন এড়াতে পেরেছে। বাকি কাজের মধ্যে ছিল ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর অবস্থা যাচাই, লায়ার সড়কপথ পুনরুদ্ধার এবং উজানে তৈরি হওয়া নতুন হ্রদ পর্যবেক্ষণ।
মূল বিষয়গুলো
- ২৯ অক্টোবর সিনতাফু হ্রদের পানি উপচে পড়ে উত্তর ভুটানে গাসা ছাচু ও সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- ভুটানে কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি; উষ্ণ প্রস্রবণ এলাকা আগেই খালি করা হয়েছিল।
- পশ্চিমবঙ্গে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়; আসাম নদীর পানি বাড়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়।
- ৩০ অক্টোবরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সংকোশ নদী দিয়ে বড় ধরনের প্লাবন ছাড়াই ঢল বয়ে যায়।
- লায়ার সড়ক অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকে এবং দুটি বেইলি সেতু ভেসে গেছে বলে আশঙ্কা করা হয়।
- ভুটান তাক্তসেমাখাংয়ে তৈরি হওয়া নতুন হ্রদ পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখে এবং ঝুঁকিপূর্ণ নদীতীর এড়িয়ে চলতে বাসিন্দাদের পরামর্শ দেয়।






