টোকিওর আলোচনায় বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা
জাপান ও জার্মানি ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ জোরদার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ প্রতিষ্ঠা এবং সামরিক সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে শিল্পনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা আরও বিস্তৃত অংশীদারত্বের আওতায় এসেছে।
সূচিপত্র
- টোকিওর আলোচনায় বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা
- গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এখন অভিন্ন অগ্রাধিকার
- নির্দিষ্ট দেশের নাম না করেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
- এআই আলোচনা ও ৩৩টি ব্যবসায়িক চুক্তি
- সামরিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরির উদ্যোগ
- যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে আগ্রহ জানালেন মের্ৎস
- ইউক্রেন ও তাইওয়ান নিরাপত্তাবিষয়ক বার্তায় প্রভাব ফেলেছে
- শিল্পখাতে সহায়তা এখনো স্পর্শকাতর বিষয়
- মূল বিষয়গুলো
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বৈঠক করেন। দুই সরকারই চীনের ওপর নির্ভরতা এবং অবনতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের মুখে রয়েছে। চীনের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক তৎপরতা, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল আলোচনার পটভূমি।
এই সফরে বড় একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলও অংশ নেয়। মের্ৎসের সঙ্গে প্রায় ৩০ জন করপোরেট নির্বাহী ছিলেন। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এবং কোম্পানিগুলো এআই ও নিউক্লিয়ার ফিউশনসহ উন্নত প্রযুক্তির বিভিন্ন বিষয়ে ৩৩টি সমঝোতা স্মারক সই করে।
যুদ্ধবিমান উন্নয়নে সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন মের্ৎস। এর মাধ্যমে জার্মানি জাপান, ব্রিটেন ও ইতালির নেতৃত্বাধীন গ্লোবাল কমব্যাট এয়ার প্রোগ্রাম (জিক্যাপ)-এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। ২০৩৫ সালের মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরি করাই এই কর্মসূচির লক্ষ্য।
২০২৫ সালের মে মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর জাপানে এটিই ছিল মের্ৎসের প্রথম সফর। এশিয়া সফরের অংশ হিসেবে তিনি সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়াতেও যান। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের চেষ্টা করছে জার্মানি।
গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এখন অভিন্ন অগ্রাধিকার
গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও সেমিকন্ডাক্টরের ওপর চীনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে কৌশলগত পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা জোরদারে সম্মত হয়েছে জাপান ও জার্মানি। দুই দেশের উৎপাদকদের জন্য এসব উপকরণের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা কারখানা চালু রাখার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
বিরল মৃত্তিকা বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সেমিকন্ডাক্টর তৈরির যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পর্যন্ত নানা পণ্যে এসব মৌল ব্যবহৃত হয়, আর বিশ্বজুড়ে এর সরবরাহে চীনের প্রাধান্য রয়েছে। ফলে নিষেধাজ্ঞার প্রভাব একসঙ্গে একাধিক শিল্পে পড়তে পারে।
সরবরাহব্যবস্থা হলো ব্যবসা ও প্রক্রিয়ার সেই ধারাবাহিকতা, যার মাধ্যমে কোনো উপকরণ উত্তোলন থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও উৎপাদন পেরিয়ে চূড়ান্ত পণ্যে রূপ নেয়। এটি জোরদার করার অর্থ হতে পারে অতিরিক্ত সরবরাহকারী খুঁজে বের করা বা কোনো একটি দেশের সিদ্ধান্তের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমানো। নেতারা সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একমত হয়েছেন, তবে নির্দিষ্ট সরবরাহের পরিমাণ বা ক্রয়চুক্তির ঘোষণা দেননি।
বিশ্বের যথাক্রমে চতুর্থ ও তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে বর্ণিত জাপান ও জার্মানি, উভয়েরই বড় উৎপাদনশিল্পের স্বার্থ জড়িত। তাদের অভিন্ন উদ্বেগটি বাস্তব: ছোট কিন্তু অত্যাবশ্যক কোনো উপকরণের ঘাটতিতে অনেক বেশি মূল্যবান যন্ত্র, গাড়ি বা ইলেকট্রনিক পণ্যের উৎপাদন থেমে যেতে পারে।
নির্দিষ্ট দেশের নাম না করেই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা
নেতারা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং উন্নত প্রযুক্তিতে সহযোগিতা নিয়ে ঘোষণা গ্রহণ করেন। বৈঠকের পর তিনটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তাকাইচি, যেখানে সহযোগিতার আরও বিস্তৃত রূপরেখা থাকবে।
ঘোষণাগুলোতে সরাসরি চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে অর্থনৈতিক জবরদস্তির ওপর গুরুত্ব দিয়ে দুই সরকারের একটি প্রধান উদ্বেগের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে: অন্য কোনো দেশকে চাপে ফেলতে বাণিজ্য, সরবরাহে বিধিনিষেধ বা অন্যান্য অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ব্যবহার।
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমানোর জার্মানির প্রচেষ্টা নিরাপত্তার পাশাপাশি এই অংশীদারত্বকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যও দিয়েছে। জার্মান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য জাপান আরেকটি বড় শিল্পোন্নত অর্থনীতি, যার সঙ্গে তারা সম্পর্ক গভীর করতে পারে। অন্যদিকে, একই ধরনের সরবরাহসংক্রান্ত উদ্বেগ থাকা একটি ইউরোপীয় অংশীদার পাচ্ছে টোকিও।
বৈঠকের পর চুক্তির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তাকাইচি দুই দেশকে পরিপূরক সক্ষমতাসম্পন্ন অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেন:
বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের কৌশলগত সহযোগিতা আরও জোরদার করতে আমরা একমত হয়েছি।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে যে নীতিগুলোর কথা বলেন, সেগুলোও তুলে ধরেন:
আইনের শাসনের ভিত্তিতে অবাধ, উন্মুক্ত ও ন্যায্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রাখতে জাপান ও জার্মানির পরস্পরের পরিপূরক সক্ষমতা রয়েছে এবং তারা গুরুত্বপূর্ণ সমমনা অংশীদার।
দুই নেতাই অপর দেশের নাম উল্লেখ করে তাকে "বিশেষ মর্যাদার অংশীদার" বলেন। এই ভাষা একক কোনো বাণিজ্যচুক্তি বা প্রতিরক্ষা প্রকল্পের গণ্ডি ছাড়িয়ে সম্পর্কের ব্যাপ্তি তুলে ধরে।
এআই আলোচনা ও ৩৩টি ব্যবসায়িক চুক্তি
পরিকল্পিত উচ্চপর্যায়ের এআই সংলাপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনার জন্য দুই সরকারকে একটি নির্দিষ্ট মাধ্যম দেবে। এআই ব্যবস্থা বিভিন্ন ধরনের কাজ করে, যেমন ধরন শনাক্ত করা, লেখা তৈরি করা বা মানুষকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা। ফলে শিল্প ও সরকার—উভয় ক্ষেত্রেই এ প্রযুক্তি প্রাসঙ্গিক।
নেতারা সংলাপ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেও প্রথম বৈঠকের তারিখ জানাননি। এর বিস্তারিত আলোচ্যসূচি এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বও নির্ধারিত হয়নি।
বেসরকারি খাতের সহযোগিতা এআইয়ের বাইরেও হাইড্রোজেন ও নিউক্লিয়ার ফিউশন পর্যন্ত বিস্তৃত। শিল্পপ্রক্রিয়ায় ব্যবহারের জন্য হাইড্রোজেন শক্তি বহন করতে পারে। আর নিউক্লিয়ার ফিউশনে হালকা পরমাণুর নিউক্লিয়াস একত্র করে শক্তি উৎপাদনের চেষ্টা করা হয়। ফিউশন প্রযুক্তি এখনো উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে, তাই এ ক্ষেত্রে গবেষণা ও প্রকৌশলগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
৩৩টি সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে কূটনৈতিক বৈঠকের সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর যোগসূত্র তৈরি হয়েছে। সমঝোতা স্মারকে সাধারণত অভিন্ন অভিপ্রায় ও সহযোগিতার কাঠামো লিপিবদ্ধ থাকে; পরবর্তী কাজ নির্ভর করে প্রতিটি চুক্তির শর্তের ওপর।
ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের আকারও দেখায়, এই সফরে সরকারি নীতির সঙ্গে শিল্পখাতের স্বার্থ কতটা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। খনিজের সরবরাহ, উন্নত কম্পিউটিং এবং নতুন জ্বালানি প্রযুক্তি—সবই জাপানি ও জার্মান কোম্পানির ভবিষ্যৎ পণ্য এবং উৎপাদনপদ্ধতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
সামরিক সহযোগিতার কাঠামো তৈরির উদ্যোগ
তাকাইচি ও মের্ৎস দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ ও কাঠামো খতিয়ে দেখতে এবং পরস্পর-পরিপূরক প্রতিরক্ষা শিল্পগুলোর সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হন। তাই সামরিক আলোচনায় বাহিনীগুলো কীভাবে একসঙ্গে কাজ করতে পারে এবং কোম্পানিগুলো কীভাবে সরঞ্জাম তৈরি বা সরবরাহ করতে পারে—দুই বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০২৬ সালের শেষের দিকে জাপানের প্রধান তিনটি নিরাপত্তানীতিবিষয়ক নথি সংশোধনের পরিকল্পনা এই সহযোগিতার জন্য একটি অভ্যন্তরীণ নীতিগত প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। সংশোধনীগুলোতে ব্যাপক পরিসরে মনুষ্যবিহীন ব্যবস্থা মোতায়েনকে কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে রাখার কথা ছিল। এতে ড্রোনসংক্রান্ত শিল্প সহযোগিতার প্রাসঙ্গিকতাও বাড়ে।
তিনটি কৌশলগত নথি সংশোধনের কাজে সহায়তার জন্য ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট একটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন তৈরি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, সংশোধনীর মাধ্যমে জাপান তার প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় রূপান্তর ঘটাবে। ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা পদক্ষেপ হিসেবে এতে বিভিন্ন ধরনের মনুষ্যবিহীন ব্যবস্থা বিপুল সংখ্যায় মাঠপর্যায়ে মোতায়েন এবং আঘাত হানতে সক্ষম মনুষ্যবিহীন আকাশযান (ইউএভি) চালুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মনুষ্যবিহীন ব্যবস্থা পরিচালনায় ভেতরে কোনো মানুষ থাকেন না, যদিও দূর থেকে মানুষ এগুলো নিয়ন্ত্রণ বা তদারক করতে পারেন। এগুলোর উন্নয়নে উড়োজাহাজ নকশা, সেন্সর, যোগাযোগব্যবস্থা ও সফটওয়্যার একসঙ্গে কাজ করে—যেসব ক্ষেত্র টোকিওর আলোচনায় উঠে আসা বৃহত্তর প্রযুক্তি কর্মসূচির সঙ্গেও মেলে।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় রূপান্তর নিয়ে ২০২৬ সালের মার্চের নথিতে জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মনুষ্যবিহীন সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছে এবং মনুষ্যবিহীনকরণ ও স্বয়ংক্রিয়করণ নিয়ে নিবিড়ভাবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। ২০২৬ অর্থবছরের বাজেটে মনুষ্যবিহীন সম্পদ চালুর জন্য ১০০.১ বিলিয়ন ইয়েন বরাদ্দের কথা এতে রয়েছে। ২০২৭ অর্থবছরে মনুষ্যবিহীন সম্পদ ব্যবহার করে সিঙ্ক্রোনাইজড, হাইব্রিড, ইন্টিগ্রেটেড অ্যান্ড এনহ্যান্সড লিটোরাল ডিফেন্স (শিল্ড) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যও এতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগস্টের মূল্যায়নে জাপানের বিদ্যমান সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরা হয়েছে। দেশটির মনুষ্যবিহীন ব্যবস্থাগুলো প্রধানত স্বল্পপাল্লার এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি ও অনুসন্ধানের কাজে ব্যবহৃত হয়। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি কাজ করার জন্য তৈরি আঘাত হানতে সক্ষম ইউএভি সংগ্রহের কাজ এখনো শুরু হয়নি। শিল্ড সম্পন্ন হওয়ার পরও বহরে কয়েক হাজার প্ল্যাটফর্মের বেশি থাকবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্বৈত ব্যবহারের উপযোগী সম্পদসহ মনুষ্যবিহীন সম্পদের গণ-উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
তাকাইচি বলেন, ইউরো-আটলান্টিক ও ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা অবিচ্ছেদ্য। তার এ অবস্থান ইউরোপে রাশিয়ার যুদ্ধকে এশিয়ায় সামরিক চাপ নিয়ে জাপানের উদ্বেগের সঙ্গে যুক্ত করেছে: এক অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহ অন্য অঞ্চলের অংশীদারদের নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলে।
আলোচনায় জাপানের ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদারের চলমান প্রচেষ্টা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতি জার্মানির ক্রমবর্ধমান মনোযোগ প্রতিফলিত হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামোটি সামরিক সহযোগিতার জন্য আরও সুসংগঠিত মাধ্যম তৈরি করবে।
যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে আগ্রহ জানালেন মের্ৎস
জাপানের সঙ্গে যুদ্ধবিমান উন্নয়নে সহযোগিতা করতে জার্মানি আগ্রহী বলে জানান মের্ৎস। এর মাধ্যমে জিক্যাপে আগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। জাপান, ব্রিটেন ও ইতালি ইতিমধ্যেই ২০৩৫ সালের মধ্যে পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটি এগিয়ে নিচ্ছে।
টোকিওর বৈঠকে জার্মানির অংশগ্রহণে কোনো সমঝোতা হয়নি। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তাকাইচি জিক্যাপের কথা উল্লেখ করেননি। ফলে মের্ৎসের মন্তব্য অংশীদারত্ব সম্প্রসারণের ঘোষণার বদলে আগ্রহ প্রকাশ হিসেবেই রয়ে গেছে।
আলোচনার পরবর্তী ধাপে এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার আওতায় নানা ধরনের সরঞ্জাম থাকতে পারে। কিন্তু যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে যোগ দিতে হলে উন্নয়নের দায়িত্ব, প্রযুক্তি, অর্থায়ন ও উৎপাদন নিয়ে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে।
২০৩৫ সালের লক্ষ্য যুদ্ধবিমান নিয়ে আলোচনাকে এআই সংলাপ প্রতিষ্ঠা বা খনিজে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর তাৎক্ষণিক কাজের তুলনায় অনেক দীর্ঘমেয়াদি করে তুলেছে। জার্মানির যেকোনো ভূমিকার সঙ্গে তিন সরকার ইতিমধ্যে যে কর্মসূচি এগিয়ে নিচ্ছে, তার সামঞ্জস্য থাকতে হবে।
ইউক্রেন ও তাইওয়ান নিরাপত্তাবিষয়ক বার্তায় প্রভাব ফেলেছে
২০২২ সালে শুরু হওয়া ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নেতাদের আলোচনার কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল। ইন্দো-প্যাসিফিকে চীনের ক্রমবর্ধমান দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েও দুই সরকার আলোচনা করে।
তাইওয়ান প্রণালিতে বাড়তে থাকা উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মের্ৎস এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে বিচক্ষণতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ করার জাতিসংঘ সনদের বিধান এখানে প্রযোজ্য। এভাবে তিনি রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণকারী আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রসঙ্গ তোলেন।
তাইওয়ান প্রণালি তাইওয়ানকে চীনের মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা করেছে। ইউক্রেনের পাশাপাশি টোকিওতে এ বিষয়টি তুলে ধরে মের্ৎস ইউরোপের নিরাপত্তা নিয়ে জার্মানির উদ্বেগের সঙ্গে পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য সংঘাতের যোগসূত্র স্থাপন করেন।
মের্ৎস আরও বলেন, জাপান ও জার্মানির অভিন্ন স্বার্থ ও মূল্যবোধ রয়েছে এবং বড় শক্তিগুলো যাতে লাগামহীনভাবে কাজ করতে না পারে, সে জন্য তারা একসঙ্গে কাজ করতে পারে। অভিন্ন নিয়মের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা রক্ষার বৃহত্তর সমঝোতাকে এ বার্তা সমর্থন করে।
শিল্পখাতে সহায়তা এখনো স্পর্শকাতর বিষয়
তাকাইচি বলেন, শিল্পখাতে সহায়তার ব্যবস্থা চালুর সময় প্রতিটি দেশের স্বার্থ বিবেচনার গুরুত্বে নেতারা একমত হয়েছেন। তার মন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রস্তাবের দিকে ইঙ্গিত করে থাকতে পারে। জার্মানি ও ফ্রান্সের সমর্থিত ওই প্রস্তাবে ইউরোপে তৈরি গাড়িকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে প্রস্তাবিত বিশেষ সুবিধা থেকে জাপান বাদ পড়বে।
এই বিষয়টি অংশীদারত্বের একটি বাস্তব টানাপোড়েন তুলে ধরে। দুই দেশই আরও নিরাপদ শিল্প এবং নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক অংশীদার চায়। তবে অভ্যন্তরীণ বা আঞ্চলিক উৎপাদনে সহায়তার জন্য নেওয়া নীতি বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের উৎপাদকদের অসুবিধায় ফেলতে পারে।
জাপানি গাড়ি কোম্পানিগুলোর উদ্বেগ হলো, ইউরোপের শিল্পনীতির আওতায় দেওয়া সুবিধা পাওয়ার সুযোগ। দুই সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, অবাধ, উন্মুক্ত ও ন্যায্য আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি ঘোষিত সমর্থনের সঙ্গে এই উদ্বেগের সমন্বয় করা।
পরের বছর তাকাইচিকে বার্লিন সফরের আমন্ত্রণ জানান মের্ৎস। ঘোষিত পদক্ষেপের সময়সীমা তাৎক্ষণিক কূটনৈতিক চুক্তি থেকে শুরু করে আরও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্প পর্যন্ত বিস্তৃত:
- ২০২২: রাশিয়া ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করে, যা জাপান ও জার্মানির নিরাপত্তা আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
- মে ২০২৫: জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব নেন মের্ৎস।
- ২৮ অক্টোবর ২০২৬: টোকিওতে বৈঠক করেন তাকাইচি ও মের্ৎস এবং অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষায় বিস্তৃত সহযোগিতার ঘোষণা দেন।
- ২০২৬ সালের শেষের দিকে: জাপান নিরাপত্তানীতিবিষয়ক প্রধান তিনটি নথি হালনাগাদের পরিকল্পনা করে; এতে মনুষ্যবিহীন ব্যবস্থা অগ্রাধিকার পাবে।
- ২০২৭: তাকাইচিকে বার্লিন সফরের আমন্ত্রণ জানান মের্ৎস।
- ২০৩৫: জিক্যাপের লক্ষ্য পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরি করা।
টোকিওর অঙ্গীকারগুলোকে সরকারি আলোচনা, সামরিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক প্রকল্পে রূপ দেওয়াই এখন তাৎক্ষণিক কাজ। গাড়ি নীতির বিরোধ দেখায়, দুই উৎপাদনশীল অর্থনীতির স্বার্থ যেখানে ভিন্ন, সেখানে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়তে আলোচনারও প্রয়োজন হবে।
মূল বিষয়গুলো
- গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহব্যবস্থা জোরদার এবং এআই নিয়ে উচ্চপর্যায়ের সংলাপ প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়েছে জাপান ও জার্মানি।
- মের্ৎসের সঙ্গে প্রায় ৩০ জন ব্যবসায়ী নির্বাহী ছিলেন। সংস্থা ও কোম্পানিগুলো উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে ৩৩টি সমঝোতা স্মারক সই করেছে।
- সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সহযোগিতার কাঠামো এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবেন নেতারা।
- যুদ্ধবিমান সহযোগিতায় আগ্রহ প্রকাশ করেছেন মের্ৎস, তবে জিক্যাপে জার্মানির অংশগ্রহণ নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি।
- ইউক্রেন, তাইওয়ান প্রণালি এবং অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ আলোচনায় প্রভাব ফেলেছে।
- স্থানীয়ভাবে তৈরি গাড়িতে ইউরোপীয় সহায়তা জাপানের জন্য এখনো স্পর্শকাতর বিষয়।






