তাইপেইয়ে নির্বাচনী প্রচারে উপস্থিতির পর চীনের সামরিক গণমাধ্যমের হুঁশিয়ারি
টেলিভিশন উপস্থাপক কেভিন সাইকে হুমকি দেওয়ার ঘটনা ২০২৬ সালের ২৮ নভেম্বরের স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে চীনের হস্তক্ষেপ নিয়ে তাইওয়ানের সর্বশেষ সতর্কতার কেন্দ্রে এসেছে। ২৭ অক্টোবর তাইওয়ানের এক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, সামরিক প্রচারযন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে বেইজিংয়ের চাপ মনস্তাত্ত্বিক ভীতি প্রদর্শনের পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সূচিপত্র
- তাইপেইয়ে নির্বাচনী প্রচারে উপস্থিতির পর চীনের সামরিক গণমাধ্যমের হুঁশিয়ারি
- কেভিন সাইয়ের সঙ্গে কী ঘটেছিল?
- অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার স্বাধীনতার পক্ষে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী
- নভেম্বরের ভোটের আগে গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো
- প্রকাশ্য হুমকির বাইরেও ছয়টি সন্দেহভাজন কৌশল
- বাজির অভিযোগ ঘিরে আরেক রাজনৈতিক বিতর্ক
- অনলাইন প্রভাব কীভাবে ভোটারদের কাছে পৌঁছায়
- সাইবার তৎপরতায় গোয়েন্দা হুমকি
- চাপের লক্ষ্য স্বজন ও সমালোচকেরাও
- হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান তাইওয়ানের চীননীতি-প্রধানের
- মূল বিষয়গুলো
তাইপেইয়ের মেয়র পদে ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির প্রার্থী পুমা শেনের নির্বাচনী কার্যালয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৪ অক্টোবর সাইয়ের উপস্থিতির পর এই সতর্কতা আসে। পিপলস লিবারেশন আর্মির সংবাদ ও যোগাযোগ কেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট জুন ঝেংপিং স্টুডিও পরে ওই উপস্থিতির সমালোচনা করে এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জনপরিচিত ব্যক্তিদের পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেয়।
জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, স্থানীয় নির্বাচন ও একজন বিনোদনজগতের ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে সামরিক প্রচারের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপ অস্বাভাবিক। তাইওয়ানের রাজনৈতিক জীবনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ওপর জনসমক্ষে চাপ প্রয়োগে সামরিক বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা নিয়েই উদ্বেগ।
এই ঘটনা বৃহত্তর এক গোয়েন্দা মূল্যায়নের পাশাপাশি ঘটেছে। তাইওয়ানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি ব্যুরো (এনএসবি) বলেছে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে চীন থেকে আসা ২৫ লাখের বেশি বিতর্কিত বা মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করেছে তারা। আগের বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি ছিল ১৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি; অর্থাৎ বেড়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ।
বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে; অন্যদিকে তাইওয়ান নিজেই শাসনকার্য পরিচালনা করে এবং এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে। তাইওয়ানের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ বা অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ চীনা কর্তৃপক্ষ আগেও অস্বীকার করেছে। তাইওয়ানের কর্মকর্তারা এখন এমন এক প্রচারাভিযানের কথা বলছেন, যাতে প্রকাশ্য হুমকি, আর্থিক প্রণোদনা, অনলাইনে কারসাজি এবং নির্বাচনী তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা একসঙ্গে রয়েছে।
কেভিন সাইয়ের সঙ্গে কী ঘটেছিল?
৬৪ বছর বয়সী সাই ২০০৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তাইওয়ানের টক শো ক্যাংসি কামিংয়ের সহ-উপস্থাপক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পান। তাঁর কাজের সুবাদে চীনে দর্শক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। ফলে সেখানে রাজনৈতিক বিতর্ক তাঁর পেশাজীবনের জন্য বাস্তব উদ্বেগের কারণ।
পিএলএর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওই অ্যাকাউন্ট বলেছে, তাইওয়ানের স্বাধীনতার প্রশ্নে “কোনো অস্পষ্টতার জায়গা নেই”। চীনে অর্থ উপার্জন করে এমন কোনো অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের “অসহনীয় মূল্য দিতে হবে” বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। শেনের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য চীনের তাইওয়ান অ্যাফেয়ার্স অফিসও তাঁর সমালোচনা করে।
২৫ অক্টোবর রাতে সাই ওয়েইবো ও শিয়াওহংশুতে বিতর্কটি নিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি জানান, সাক্ষাৎকার নেওয়া ও উপকরণ সংগ্রহের জন্য তিনি অনুষ্ঠানগুলোতে গিয়েছিলেন; কারও সাক্ষাৎকার নেওয়ার অর্থ তাঁর মতের সঙ্গে একমত হওয়া নয়।
টেলিভিশন উপস্থাপক ও লেখক সাই নিজের অবস্থান সরাসরি জানান:
তাইওয়ান প্রণালির দুই পাড়ের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ বিনিময় সব সময়ই কামনা করেছি। আমি কখনো তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করিনি।
ভুল-বোঝাবুঝির কারণে সহযোগী ও সমর্থকেরা সমস্যায় পড়ায় তিনি ক্ষমাও চান। তাঁর এই বক্তব্যের আগে ৪ অক্টোবরের নির্বাচনী প্রচারে উপস্থিতির পর বাণিজ্যিক পরিণতির কথা প্রকাশ্যে আসে। এর মধ্যে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা লিপমোটরের সঙ্গে তাঁর সহযোগিতা-সংশ্লিষ্ট উপকরণ সরিয়ে ফেলার বিষয়টিও ছিল।
২৬ অক্টোবর ক্ষমতাসীন তাইপেই মেয়র চিয়াং ওয়ান-আনের নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনেও উপস্থিত ছিলেন সাই। দুই প্রার্থীর অনুষ্ঠানেই তাঁর উপস্থিতি, উপকরণ সংগ্রহের ব্যাখ্যার পাশাপাশি, তাঁর নির্বাচনী প্রচারে সরাসরি অংশ নেওয়ার বিষয়টিও সামনে আনে।
অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার স্বাধীনতার পক্ষে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী
আরেক মেয়র নির্বাচনে দাঁড়ানো কুওমিনতাংয়ের মেয়র চিয়াং তাঁর কার্যালয় উদ্বোধনে সাইয়ের যোগ দেওয়ার পরিকল্পনাকে স্বাগত জানান। ২৬ অক্টোবর তিনি বলেন, কেউ তাঁকে সমর্থন করুক বা না করুক, নাগরিকদের মতামতকে তিনি সম্মান করেন। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে আক্রমণ, বর্জন বা কাউকে বাদ দেওয়ার বিরোধিতাও করেন তিনি।
মতামতের জন্য মানুষের ওপর চাপ প্রয়োগের বিষয়ে চিয়াং বলেন:
এ ধরনের গণতন্ত্রবিরোধী ভীতি প্রদর্শন আমি কোনোভাবেই মেনে নেব না বা হতে দেব না।
শেন বলেন, চীনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তাইওয়ানের মানুষের নিজেদের পছন্দের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার স্বাধীনতা থাকা উচিত। তাঁর ভাষ্য, রাজনীতিকদের সাক্ষাৎকার নেওয়া ও তাঁদের নীতি বোঝার উদ্দেশ্যে নিজের সফর ছিল বলে সাই আগেই ব্যাখ্যা করেছেন।
ডিপিপির মেয়র প্রার্থী শেন ওই সফরগুলোকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হিসেবে বর্ণনা করেন:
তাইওয়ানের মানুষের কাছে এ ধরনের কর্মকাণ্ড একেবারেই স্বাভাবিক। চীন এভাবে হস্তক্ষেপ করবে, বিষয়টি গভীরভাবে উদ্বেগজনক।
একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে গেলেও ভীতি প্রদর্শনের বিরোধিতায় দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর অবস্থান এক। বিনোদনজগতের মানুষ, নির্বাচনী প্রচারকর্মী ও ভোটারদের জন্য তাৎক্ষণিক প্রশ্ন হলো, কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দিলে তাইওয়ান প্রণালির দুই পাড় থেকে হুমকি বা বাণিজ্যিক চাপের মুখে পড়তে হবে কি না।
নভেম্বরের ভোটের আগে গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো
কয়েক সপ্তাহ ধরে বিরোধটি গড়ে উঠেছে। এ সময় সন্দেহভাজন হস্তক্ষেপ নিয়ে তাইওয়ানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আইনপ্রণেতাদেরও অবহিত করছিল। প্রধান তারিখগুলো দেখায়, কীভাবে একজনের নির্বাচনী প্রচারে উপস্থিতির ঘটনা বৃহত্তর নিরাপত্তা সতর্কতার অংশ হয়ে ওঠে:
- ৪ অক্টোবর: তাইপেইয়ে পুমা শেনের নির্বাচনী কার্যালয়ের উদ্বোধনে যোগ দেন কেভিন সাই।
- ২২ অক্টোবর: আইনসভার এক ব্রিফিংয়ে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের সন্দেহভাজন কৌশল তুলে ধরেন এনএসবির মহাপরিচালক সাই মিং-ইয়েন।
- ২৫ অক্টোবর: তাইওয়ানের স্বাধীনতার সমর্থক নন বলে বিবৃতি দেন কেভিন সাই।
- ২৬ অক্টোবর: চিয়াং ও শেন প্রকাশ্যে ভীতি প্রদর্শনের বিরোধিতা করেন, আর চিয়াংয়ের নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনে যোগ দেন সাই।
- ২৭ অক্টোবর: সামরিক প্রচারযন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে মনস্তাত্ত্বিক ভীতি প্রদর্শনের বিষয়ে সতর্ক করেন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা। হস্তক্ষেপের নিন্দা জানান মেইনল্যান্ড অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের মন্ত্রী চিউ চুই-চেং।
- ২৮ নভেম্বর: তাইওয়ানে স্থানীয় নির্বাচন হওয়ার কথা।
ভোটের আগে সন্দেহভাজন হস্তক্ষেপের প্রমাণ বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানোর আশা করছে এনএসবি। সাই মিং-ইয়েন আরও বলেন, চীনে বসবাসরত বাছাই করা তাইওয়ানি বাসিন্দাদের ভোট দিতে দেশে ফেরাতে ছাড়ে বিমান টিকিট দেওয়ার উদ্যোগ নির্বাচনের দিন থেকে প্রায় তিন সপ্তাহ আগে শুরু হওয়ার কথা।
প্রকাশ্য হুমকির বাইরেও ছয়টি সন্দেহভাজন কৌশল
এনএসবির প্রধান সাই মিং-ইয়েন আইনপ্রণেতাদের বলেন, বেইজিংয়ের নির্বাচনী তৎপরতা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ও শ্রোতাদের লক্ষ্য করে আরও কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। তিনি বিনোদনজগতের ব্যক্তি কেভিন সাই নন, অন্য একজন।
ব্যুরো ছয়টি প্রধান সন্দেহভাজন পদ্ধতি চিহ্নিত করেছে: প্রার্থী বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে অবৈধ অর্থায়ন, চীনে সস্তায় ভ্রমণের সুযোগ, তাইওয়ানে ফেরার ছাড়ের টিকিট, অপতথ্য, অবৈধ বাজির বাজার এবং নির্বাচনী তথ্য পেতে হ্যাকিং।
মহাপরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, বেইজিং তাদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার জন্য চীনে বসবাসরত নির্বাচিত তাইওয়ানি নাগরিকদের সস্তায় ফেরার টিকিট দিতে বিমান সংস্থাগুলোকে কাজে লাগাচ্ছে। কম খরচে চীন ভ্রমণের সুযোগও ভোটারদের ঘুষ দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সন্দেহ ব্যুরোর।
নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করলে এমন তৎপরতা আরও নিখুঁত হতে পারে। ভ্রমণ প্রণোদনা বিদেশে বসবাসরত ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারে, আর্থিক সহায়তা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠনের কাজে লাগতে পারে, আর চুরি করা তথ্য কোনো ব্যক্তি বা নির্বাচনী কর্মকাণ্ডকে লক্ষ্যবস্তু করতে সহায়তা করতে পারে।
তদন্তের জন্য প্রসিকিউটরদের কাছে প্রমাণ সংগ্রহ করছে তাইওয়ানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সন্দেহভাজন রাজনৈতিক অর্থায়নে জড়িত বিমান সংস্থা বা প্রার্থীদের নাম, কিংবা অর্থের পরিমাণ প্রকাশ্য ব্রিফিংয়ে জানানো হয়নি।
বাজির অভিযোগ ঘিরে আরেক রাজনৈতিক বিতর্ক
২৭ অক্টোবরের জাতীয় নিরাপত্তা সতর্কতায় চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের একটি অভিযোগ নিয়েও কথা বলা হয়। ওই অভিযোগে বলা হয়েছিল, ডিপিপি সরকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে গোপন বাজির বাজার ব্যবহার করছে। কর্মকর্তা অভিযোগটিকে অবৈধ জুয়া দমনে তাইওয়ানের প্রচেষ্টার বিকৃত উপস্থাপন বলে প্রত্যাখ্যান করেন।
তাইওয়ানের বিচারিক কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে গোপন নির্বাচনী বাজি ও অবৈধ জুয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচনের ওপর আস্থা দুর্বল করতে এবং তাইওয়ানের ভেতরের বিভেদ বাড়াতে বেইজিং এই বিষয়টি কাজে লাগাচ্ছে।
এনএসবির সন্দেহভাজন চীনা হস্তক্ষেপের তালিকাতেও অবৈধ বাজির উল্লেখ রয়েছে। ব্যুরোর মূল্যায়নে, এমন বাজার কারসাজির একটি সম্ভাব্য মাধ্যম। অন্যদিকে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের অভিযোগে এগুলোকে ক্ষমতাসীন দলের হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভাষ্য, ভোটারদের বিভ্রান্তিকর দাবিতে আচ্ছন্ন করা, প্রার্থীদের মূল্যায়নের সক্ষমতা দুর্বল করা এবং চীনের অনুকূল সিদ্ধান্তে উৎসাহিত করাই বেইজিংয়ের বৃহত্তর লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, অনলাইন কারসাজি, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রচার এবং প্রকাশ্য সংঘাতের নিচে থাকা চাপের সমন্বয় অন্য গণতন্ত্রগুলোর জন্যও উদ্বেগের বিষয়।
অনলাইন প্রভাব কীভাবে ভোটারদের কাছে পৌঁছায়
এনএসবির মূল্যায়নে ফেসবুক, থ্রেডস, ইউটিউব ও অনলাইন ফোরামজুড়ে বিস্তৃত একটি প্রচারব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। ব্যুরোর ভাষ্য, চীনের সরকারি গণমাধ্যম বিভিন্ন বয়ান সামনে আনে, এরপর জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান, ভুয়া অ্যাকাউন্ট, কনটেন্ট ফার্ম এবং সমন্বিত গোষ্ঠী বিপুলসংখ্যক মন্তব্য প্রকাশ করে সেগুলো ছড়িয়ে দেয়।
ব্যুরোর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এ ধরনের তৎপরতায় তৈরি করা উপকরণের পরিধি বাড়িয়েছে। এআই-তৈরি ভিডিওতে বাস্তব মানুষ বা ঘটনার অনুকরণ করা যায়; স্বয়ংক্রিয় সরঞ্জামের সাহায্যে প্রার্থী, নীতিগত বিতর্ক ও জনমত জরিপের তথ্যও সংগ্রহ করা সম্ভব।
ব্যুরো বলেছে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শনাক্ত করা ২৫ লাখের বেশি বিতর্কিত বা মিথ্যা তথ্যের বিষয় ছিল জ্বালানি, খাদ্যনিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা নীতি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী। আগের বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি ১৬ লাখ ৯০ হাজারের বেশি ছিল। দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বেড়েছে প্রায় ৮ লাখ ১০ হাজার।
ডিপিপির চায়না অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট আলাদাভাবে ভুয়া জনমত জরিপ, প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করা ভিডিও, বানোয়াট কেলেঙ্কারি, প্রেমের গুজব এবং প্রার্থীরা সরে দাঁড়াচ্ছেন—এমন জাল ঘোষণার বিষয়ে সতর্ক করেছে। তাদের বক্তব্য, ভোটের ঠিক আগে চাঞ্চল্যকর উপকরণ ছড়ানো হতে পারে, তখন তা যাচাইয়ের সময় থাকবে খুব কম।
হস্তক্ষেপের পেছনে থাকা আয়োজক ও অর্থের উৎস খুঁজে বের করতে তদন্তকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দলটি। তাদের সতর্কতায় যাচাইহীন অভিযোগ ছড়িয়ে পাল্টা প্রতিক্রিয়া উসকে দেওয়ার চেষ্টার কথাও ছিল; এতে উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে তারা জানায়। এনএসবি বলেছে, বিভ্রান্তিকর উপকরণের উৎস শনাক্ত করতে তারা নিজেরাও এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করছে।
সাইবার তৎপরতায় গোয়েন্দা হুমকি
এনএসবির আইনসভায় দেওয়া ব্রিফিং অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর নাগাদ তাইওয়ানের গভর্নমেন্ট সার্ভিস নেটওয়ার্কে প্রতিদিন প্রায় ২৫ লাখ ৮০ হাজার সাইবার অনুপ্রবেশের চেষ্টা হচ্ছিল। জুনের পর থেকে তৎপরতা তীব্রভাবে বেড়েছে বলে ব্যুরো জানায়; এর মধ্যে নির্বাচনে হস্তক্ষেপের প্রস্তুতিও থাকতে পারে।
ব্যুরোর হিসাবে, জুলাইয়ে শনাক্ত হুমকির সংখ্যা ছিল ১৮ কোটি ৫৬ লাখ, আর আগস্টে ১০ কোটি ৬৪ লাখ। জুলাইয়ের সংখ্যা আগস্টের তুলনায় প্রায় ৭৪ শতাংশ বেশি। ব্রিফিংয়ের আরেক বিবরণে জুলাইয়ের মোট সংখ্যাকে আরও সাধারণভাবে ১০ কোটির বেশি বলা হয়েছে।
সন্দেহভাজন নির্বাচনী কৌশলটি হলো, পরে হস্তক্ষেপের কাজে লাগতে পারে এমন তথ্য চুরি করতে বাছাই করা লক্ষ্যবস্তু হ্যাক করা। নির্বাচনী প্রচারের পরিকল্পনা, যোগাযোগের তথ্য বা অন্য সংবেদনশীল উপকরণ কোনো পক্ষকে কাকে কাছে টানতে বা চাপে ফেলতে হবে, তা নির্ধারণে সাহায্য করতে পারে। এনএসবি বলেছে, এই তৎপরতা বৃদ্ধির সম্ভাব্য উদ্দেশ্যের মধ্যে তথ্য সংগ্রহ ও হয়রানির প্রস্তুতি রয়েছে।
সাইবার সতর্কতার পাশাপাশি সমুদ্রে চাপের বিষয়টিও রয়েছে। সাই মিং-ইয়েন বলেন, তাইওয়ানের পূর্বদিকে চায়না কোস্ট গার্ডের তৎপরতা আরও নিয়মিত হয়ে উঠছে; কখনো তাতে গবেষণা জাহাজও থাকে। দ্বীপের পূর্ব ও দক্ষিণ-পশ্চিমে চীনা মিলিশিয়া নৌকার উপস্থিতি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাইওয়ানের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বৃহত্তর এই ধরনটি প্রকাশ্য যুদ্ধের পর্যায়ে না গিয়েও চাপ সৃষ্টি করে এবং মনোযোগ ও সম্পদ ব্যয় করায়।
চাপের লক্ষ্য স্বজন ও সমালোচকেরাও
চীনা প্রভাব বিস্তারের কর্মকাণ্ড নিয়ে কাজের কারণে শেনের ওপর চীনের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং তাঁকে ওয়ান্টেড তালিকায় রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে বেইজিং তাঁকে ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তাইওয়ান বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যা দিয়ে তালিকাভুক্ত করে।
চীনের তাইওয়ান অ্যাফেয়ার্স অফিস শেনের বাবা শেন তু-চেংয়ের মালিকানাধীন ভিওয়ে কোম্পানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। এসব বিধিনিষেধে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের কোনো সংস্থা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সঙ্গে কোম্পানিটির বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
স্বজনদের লক্ষ্যবস্তু করা হলে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিধি রাজনীতিকের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ইউনাইটেড মাইক্রোইলেকট্রনিকস করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট সাওয়ের ভাইকে চীনে প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিউ শি-ফাংয়ের ভাতিজার চীনে চাকরি হারানোর খবরও এমন ঘটনার মধ্যে রয়েছে।
শারীরিক ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও তদন্তাধীন। নিউ তাইপেইয়ের প্রসিকিউটরদের অভিযোগ, চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা কৌতুকাভিনেতা হুয়াং ই-হাওয়ের অনুষ্ঠান বন্ধ করতে কে নামে পরিচিত এক চীনা নাগরিক পরিকল্পিত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
হুয়াংয়ের ওপর হামলা নিয়ে অভিযোগ গঠনের পর সাই মিং-ইয়েন বলেন, অপরাধী চক্র ও বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কাছ থেকে নির্দেশনা ও অর্থ পেয়েছিল কি না, তা তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। কথিত ওই তৎপরতায় জড়িত থাকার অভিযোগে তাইওয়ানের পাঁচ ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে; সন্দেহভাজন সংগঠক হিসেবে কে-কে শনাক্ত করা হয়েছে। মামলার কিছু বিবরণে অভিযোগ গঠিত ব্যক্তিদের তালিকায় কে-র নামও ছিল।
এনএসবির প্রধান বলেন, ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং কথিত হামলার পেছনের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা অগ্রাধিকার। তিনি ঘটনাটিকে ক্রমবর্ধমান আন্তসীমান্ত দমন-পীড়নের অংশ বলে বর্ণনা করেন। এর অর্থ, কোনো সরকার তার নিয়ন্ত্রণাধীন ভূখণ্ডের বাইরের মানুষের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে।
হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান তাইওয়ানের চীননীতি-প্রধানের
তাইওয়ানের মেইনল্যান্ড অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের মন্ত্রী চিউ চুই-চেং ২৭ অক্টোবর বলেন, তাইওয়ানের মানুষের স্বাধীন পছন্দকে হুমকি দেওয়া বেইজিংয়ের বন্ধ করা উচিত। আইনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি নির্বাচনে হস্তক্ষেপ ও আন্তসীমান্ত দমন-পীড়ন বন্ধের আহ্বান জানান।
সাইয়ের বক্তব্য ঘিরে চাপের বিষয়ে চিউ বলেন:
এতে সফল হওয়া যাবে না। বরং এর উল্টো ফল হবে।
মন্ত্রী মেইনল্যান্ড অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের সাম্প্রতিক এক জরিপের কথাও উল্লেখ করেন। এতে ৮৮ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির শাসন প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, তাইওয়ান ও গণপ্রজাতন্ত্রী চীন—কেউ কারও অধীন নয়।
সাংস্কৃতিক বিনিময়ও একই বিরোধের অংশ হয়ে উঠছে। চিউ বলেন, পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে চীনা বিনোদনশিল্পীদের সঙ্গে বিনিময়কে তাইওয়ান স্বাগত জানিয়ে যাচ্ছে। তবে চীনা অভিনেতা ঝাং লিংহের সম্ভাব্য সফর রাজনৈতিক ঝুঁকি ও যুক্তফ্রন্টের উদ্দেশ্য থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত স্থগিত রাখা উচিত বলেও তিনি যুক্তি দেন। যুক্তফ্রন্ট হলো দলের বাইরের গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের ব্যবহৃত পরিভাষা।
চিউ ঝাংয়ের স্ট্রেইটস ফোরামে অংশ নেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। ওই আয়োজন চীনের তাইওয়ান অ্যাফেয়ার্স অফিসের সংশ্লিষ্টতায় হয়েছিল। তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বকে খাটো করে দেখা হয়েছে—এমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের কথাও তিনি বলেন। নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক সমর্থন সংগঠিত করার উদ্বেগের সঙ্গে নির্দিষ্ট একটি সফরের অনুমতিকে যুক্ত করেছে মন্ত্রীর অবস্থান।
তাইওয়ান কর্তৃপক্ষের সামনে পরবর্তী বাস্তব পদক্ষেপ হলো ২৮ নভেম্বরের আগে প্রমাণ বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এবং অর্থ, স্থানীয় নেটওয়ার্ক ও অনলাইন তৎপরতা নিয়ে তদন্ত। ভোটার ও জনপরিচিত ব্যক্তিদের জন্য তাৎক্ষণিক বিষয় হলো, হুমকি ছাড়াই কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়া, প্রার্থী নিয়ে আলোচনা এবং নির্বাচনী সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা।
মূল বিষয়গুলো
- তাইওয়ানের এক জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তার ভাষ্য, কেভিন সাইকে পিএলএ-সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের হুমকি স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে মনস্তাত্ত্বিক চাপ বাড়ার ইঙ্গিত।
- পুমা শেনের নির্বাচনী প্রচারের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর তাইওয়ানের স্বাধীনতার সমর্থক নন বলে জানান সাই। পরে প্রতিদ্বন্দ্বী চিয়াং ওয়ান-আনের নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনেও তিনি যোগ দেন।
- রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে ভীতি প্রদর্শনের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছেন তাইপেইয়ের মেয়র পদে দুই প্রার্থীই।
- অবৈধ অর্থায়ন, ভ্রমণ প্রণোদনা, অপতথ্য, বাজির বাজার ও হ্যাকিংসহ হস্তক্ষেপের ছয়টি সন্দেহভাজন পদ্ধতি শনাক্ত করেছে এনএসবি।
- ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ২৫ লাখের বেশি বিতর্কিত বা মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করেছে ব্যুরো; সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৪৮ শতাংশ।
- ২৮ নভেম্বরের স্থানীয় নির্বাচনের আগে বিচারিক কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণ পাঠানোর লক্ষ্য নিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।






