শুরুর দিকে কম চাপ নিলে ২০৫০ সালে বড় ধাক্কা আসতে পারে
কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনে ২০৫০ সাল পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহ খাতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ৮৪০ ট্রিলিয়ন ওন বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে ব্যাংক অব কোরিয়ার এক গবেষণা। এতে ব্যয়ের সময় ও প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়টিকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। গবেষণার প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, নির্গমন ধীরে ধীরে কমানো হলে ২০৫০ সালে জিডিপি ভিত্তিমাত্রার প্রবৃদ্ধির পথের চেয়ে ১০.২% কম হবে। আর দ্রুততর হারে আগে কমানো হলে তা ভিত্তিমাত্রার চেয়ে ৮.২% কম হবে।
সূচিপত্র
- শুরুর দিকে কম চাপ নিলে ২০৫০ সালে বড় ধাক্কা আসতে পারে
- দুটি পথ, শেষ লক্ষ্য এক
- সময়ের সঙ্গে প্রবৃদ্ধির প্রভাব কীভাবে বদলায়
- চাপের বড় অংশের ব্যাখ্যা কার্বন মূল্যে
- শিল্প খাতে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা ইস্পাত ও সিমেন্টে
- প্রায় ৮৪০ ট্রিলিয়ন ওন, তবে ব্যয়ের সময়সূচি ভিন্ন
- প্রযুক্তি উন্নয়নে পাঁচ বছর দেরি হলে ব্যয় অনেক বাড়ে
- নতুন এআই ও সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্পে বাড়তি চাহিদা
- জলবায়ু ক্ষতি ও আর্থিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে
- মূল বিষয়গুলো
ব্যাংক অব কোরিয়ার ‘কার্বন নিরপেক্ষতায় উত্তরণের পথের অর্থনৈতিক প্রভাব’ শীর্ষক ইস্যু নোটটি প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর। এতে একই লক্ষ্যে পৌঁছানোর দুটি পথ পর্যালোচনা করা হয়েছে: ২০৫০ সালে নিট-শূন্য নির্গমন। ব্যাংকের টেকসই প্রবৃদ্ধি কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক কিম জে-ইয়ুন ও ইয়ন জং-ইন এ বিশ্লেষণ তৈরি করেছেন।
দুটি পথেই ইস্পাত, সিমেন্ট, রাসায়নিক ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় হবে। আগে পদক্ষেপ নিলে উত্তরণের মাঝামাঝি সময়ে চাপ বাড়বে, আর ধীরে ধীরে নির্গমন কমালে ২০৫০ সালের কাছাকাছি অর্থনীতিতে আরও তীব্র সমন্বয় দরকার হবে। শিল্পপ্রযুক্তির উন্নয়নে পাঁচ বছর দেরি হলে ধীরগতির পথের অধীনে জিডিপির প্রক্ষেপিত ঘাটতি বেড়ে ১৭.৩% হবে।
ভিত্তিমাত্রায় ২০২৫ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত গড় বার্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১%। প্রক্ষেপিত ঘাটতি দিয়ে বোঝানো হয়েছে, ওই রেফারেন্স পথের তুলনায় অর্থনীতি কতটা ছোট হবে। জ্বালানি ব্যবস্থা ও শিল্প উৎপাদন বদলানোর ব্যয় গবেষণায় হিসাব করা হয়েছে; জলবায়ু ক্ষতি কমানোর সুফল এসব হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছে।
দুটি পথ, শেষ লক্ষ্য এক
তুলনার জন্য ব্যবহৃত দুটি প্রান্তবিন্দু নির্ধারণ করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার ২০৩৫ সালের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান, বা এনডিসি: ২০১৮ সালের তুলনায় নির্গমন ৫৩% থেকে ৬১% কমানো। জলবায়ু পরিবর্তন সীমিত রাখার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় কোনো দেশের ঘোষিত অবদানকে এনডিসি বলা হয়।
ব্যাংকের সরলরৈখিক হ্রাসের পথে ধীরে ধীরে নির্গমন কমিয়ে ওই সীমার নিম্ন প্রান্ত, অর্থাৎ ৫৩%-এ পৌঁছানো হবে। দ্রুততর হ্রাসের পথে ২০৩০ সাল থেকে কমানোর গতি বাড়িয়ে ২০৩৫ সালে ৬১%-এ পৌঁছানো হবে। উভয় পথেই ২০৩০ সালে নির্গমন ৪০% কমবে এবং ২০৫০ সালে নিট-শূন্য অর্জিত হবে। নিট-শূন্য বলতে অবশিষ্ট নির্গমনের সঙ্গে অপসারণের ভারসাম্য বোঝায়।
প্রধান মাইলফলকগুলো হলো:
- ২০৩০: উভয় পথেই ২০১৮ সালের তুলনায় নির্গমন ৪০% কমবে।
- ২০৩৫: সরলরৈখিক পথে নির্গমন ৫৩% কমবে, আর আগাম পদক্ষেপের পথে কমবে ৬১%।
- ২০৪৫ থেকে ২০৫০: সরলরৈখিক পথে অর্থনৈতিক চাপ সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে।
- ২০৫০: উভয় পথেই নিট-শূন্য অর্জিত হবে, তবে জিডিপি ও দামে প্রভাব ভিন্ন হবে।
- ২০৬০: কম নির্গমনকারী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় জিডিপির ঘাটতি সংকুচিত হবে।
তাই তুলনাটি নির্ভর করছে কারখানাগুলো কখন যন্ত্রপাতি বদলাবে, পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ কখন পাওয়া যাবে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কত দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারবে তার ওপর। এসব পরিবর্তন ভিন্ন গতিতে ঘটলে একই নির্গমন লক্ষ্যে পৌঁছেও অর্থনৈতিক ফল ভিন্ন হতে পারে।
সময়ের সঙ্গে প্রবৃদ্ধির প্রভাব কীভাবে বদলায়
দুই পথেই ২০৩০ সালে জিডিপি ভিত্তিমাত্রার চেয়ে ১.৭% কম হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। এরপর আগে নির্গমন কমালে শুরুতে চাপ বেশি পড়ে: দ্রুততর পদক্ষেপের পথে ঘাটতি ২০৩৫ সালে ২.৫% এবং ২০৪০ সালে ৩.৫%-এ পৌঁছাবে। সরলরৈখিক পথে তা হবে যথাক্রমে ২.১% ও ২.৭%।
২০৪৫ সালে আগাম পদক্ষেপের পথে জিডিপি ভিত্তিমাত্রার চেয়ে ৬.১% কম থাকবে, আর ধীরে কমানোর পথে কম থাকবে ৪.৭%। পরের পাঁচ বছরে অবস্থান দ্রুত পাল্টে যায়। ২০৫০ সালে সরলরৈখিক পথের ঘাটতি বেড়ে ১০.২% হবে, আর আগাম পদক্ষেপের পথে হবে ৮.২%; পার্থক্য ২ শতাংশ পয়েন্ট।
এরপর উভয় পথেই ঘাটতি কমে। ২০৬০ সালে আগাম পদক্ষেপের পথে জিডিপি ভিত্তিমাত্রার চেয়ে ২.২% এবং সরলরৈখিক পথে ২.৫% কম হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। ২০৫০ সালের পর নির্গমন কমানোর প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
২০২৫ থেকে ২০৬০ সাল পর্যন্ত গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হ্রাসের প্রাক্কলন আগাম পদক্ষেপের পথে ০.০৬ শতাংশ পয়েন্ট এবং ধীরে কমানোর পথে ০.০৭ শতাংশ পয়েন্ট। দুটি হারের পার্থক্য বোঝাতে শতাংশ পয়েন্ট ব্যবহৃত হয়: ১% প্রবৃদ্ধি ০.০৭ শতাংশ পয়েন্ট কমলে প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ০.৯৩%।
ব্যাংক অব কোরিয়া বলেছে, এই গড় হিসাবগুলোতে ডিসকাউন্ট রেট প্রয়োগ করা হয়নি। ভিন্ন সময়ে হওয়া ব্যয়ের গুরুত্ব সমন্বয় করে এই হার। আগাম পদক্ষেপে দ্রুত বেশি ব্যয় করতে হয়, তাই মোট অর্থনৈতিক ব্যয়ের তুলনা করতেও কখন অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে, তা বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
চাপের বড় অংশের ব্যাখ্যা কার্বন মূল্যে
ফলাফলের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি কার্বন মূল্য। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে এই মূল্য আরোপ করা হয়, ফলে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উৎপাদন ব্যয়বহুল হয় এবং পরিচ্ছন্ন উৎপাদনপ্রক্রিয়া গ্রহণে কোম্পানিগুলো আর্থিক প্রণোদনা পায়।
মডেলে ২০২৫ সালে প্রতি টন কার্বনের মূল্য প্রায় ৭ ডলার এবং ২০৩০ সালে ১৬৯ ডলার ধরা হয়েছে; দুই পথেই এই হিসাব একই। সব কার্বন মূল্যের অঙ্ক ২০১০ সালের ডলারে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তি অভিন্ন থাকে।
২০৪০ সালে আগাম নির্গমন হ্রাসের পথে কার্বন মূল্য প্রতি টন ৫৪৩ ডলারে পৌঁছাবে, সরলরৈখিক পথে যা ৪৪৪ ডলার। অর্থাৎ আগাম পদক্ষেপে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্গমনের বেশি ব্যয় দ্রুত বহন করতে হবে। একই চাপ কম কার্বন নিঃসরণকারী যন্ত্রপাতি ও উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় আগেভাগে বিনিয়োগে উৎসাহ দেয়।
২০৫০ সালে চিত্র পাল্টে যায়। সরলরৈখিক পথে প্রতি টন কার্বনের মূল্য দাঁড়ায় ১,৪৮৮ ডলার, যা আগাম পদক্ষেপের পথের ১,৩৫২ ডলারের চেয়ে বেশি। ধীরগতির পদক্ষেপে শেষ বছরগুলোর জন্য বেশি সমন্বয় বাকি থাকে; তখন প্রযুক্তি ব্যবহারের গতি ধীর থাকলেও নির্গমনসীমা আরও কঠোর হয়।
উৎপাদক মূল্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। উৎপাদক মূল্যসূচক সরাসরি পরিবারগুলো যে দাম দেয় তা নয়, বরং উৎপাদকদের প্রাপ্ত দাম অনুসরণ করে। ২০৩০ সালে দুই পথেই এ সূচক ভিত্তিমাত্রার চেয়ে ১.৩% বাড়ে। ২০৫০ সালে সরলরৈখিক পথে বৃদ্ধি ৬.৫% এবং আগাম পদক্ষেপের পথে ৫.১% হবে। ২০৬০ সাল পর্যন্ত উৎপাদক মূল্যস্ফীতি গড়ে বছরে ০.০৪ শতাংশ পয়েন্ট বাড়বে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
শিল্প খাতে সবচেয়ে বেশি ধাক্কা ইস্পাত ও সিমেন্টে
সামগ্রিক অর্থনীতির তুলনায় উৎপাদনশিল্পে চাপ অনেক বেশি। ২০৫০ সালের কাছাকাছি উৎপাদনশিল্পের মূল্য সংযোজন ভিত্তিমাত্রার চেয়ে ২৬% থেকে ৩২% কম হতে পারে, আর খাতটির উৎপাদক মূল্য ১৩.৪% থেকে ১৬.৮% বেশি হতে পারে। অন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেনা পণ্য ও সেবার মূল্য বাদ দেওয়ার পর কোনো শিল্পের অবদানকে মূল্য সংযোজন বলা হয়।
মডেলের হিসাবে ইস্পাত খাতে প্রভাব সবচেয়ে তীব্র। সরলরৈখিক পথে মূল্য সংযোজনের ধাক্কা ভিত্তিমাত্রার চেয়ে ১৫১.১% কম এবং আগাম পদক্ষেপের পথে ১২৪.৫% কম হতে পারে। এগুলো ইনপুট-আউটপুট মডেলের প্রাক্কলন, যেখানে শিল্পগুলোর মধ্যে ব্যয় ও ক্রয়ের প্রবাহ অনুসরণ করা হয়। এই শতাংশগুলো মডেলে হিসাব করা মূল্য সংযোজনের ধাক্কা বোঝায়; উৎপাদিত ইস্পাতের টন বা কোম্পানির মুনাফা নয়, যা ভিন্ন পরিমাপ।
সরলরৈখিক পথে ইস্পাতের উৎপাদক মূল্য ৯০.৭% বাড়বে, আর আগাম পদক্ষেপের পথে বাড়বে ৭২.৫%। এর ফলে মৌলিক শিল্প উপকরণের ব্যয় অন্য ব্যবসায়ে উত্তরণের প্রভাব ছড়ানোর বড় একটি পথ হয়ে দাঁড়ায়।
সরলরৈখিক পথে সিমেন্টের মূল্য সংযোজন ভিত্তিমাত্রার চেয়ে ৭১.০% কমবে এবং আগাম পদক্ষেপের পথে কমবে ৫৮.৯%; অন্যদিকে সিমেন্টের উৎপাদক মূল্য যথাক্রমে ৬০.১% ও ৪৮.৭% বাড়বে। রাসায়নিক উৎপাদনে মূল্য সংযোজন সর্বোচ্চ ৪২.২% কমতে পারে এবং উৎপাদক মূল্য সর্বোচ্চ ২৪.২% বাড়তে পারে।
এরপর গাড়ি নির্মাতা ও নির্মাণ কোম্পানিগুলোকে বেশি দামে ইস্পাত, সিমেন্ট ও অন্যান্য উপকরণ কিনতে হবে। তাদের মূল্য সংযোজন যথাক্রমে সর্বোচ্চ ৩৯.৪% ও ২৫.০% কমতে পারে। নির্গমন ব্যয় বাড়ায় তেল পরিশোধন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সরাসরি চাপ পড়বে।
প্রায় ৮৪০ ট্রিলিয়ন ওন, তবে ব্যয়ের সময়সূচি ভিন্ন
২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহে মোট বিনিয়োগ আগাম নির্গমন হ্রাসের পথে ৮৩৯.৪ ট্রিলিয়ন ওন এবং সরলরৈখিক পথে ৮৪৩.৩ ট্রিলিয়ন ওন। পার্থক্য ৩.৯ ট্রিলিয়ন ওন, যা দুই মোট অঙ্কের যেকোনোটির ০.৫%-এরও কম। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, বিনিয়োগ কখন করতে হবে।
২০৩০ সালের কাছাকাছি জ্বালানি সরবরাহে গড় বার্ষিক বিনিয়োগ বেড়ে প্রায় ২৬ ট্রিলিয়ন ওনে পৌঁছাবে, যা গবেষণায় উল্লেখিত বর্তমান মাত্রার দ্বিগুণের বেশি। আগাম পদক্ষেপের পথে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে বার্ষিক বিনিয়োগ সর্বোচ্চ আনুমানিক ৪৫.৭ ট্রিলিয়ন ওনে পৌঁছাবে। সরলরৈখিক পথে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ হবে ২০৪৬ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে, ৪৩.৪ ট্রিলিয়ন ওন।
এই অঙ্কগুলো শুধু জ্বালানি সরবরাহের জন্য। শিল্প যন্ত্রপাতি বদলানো ও পরিবহন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে আরও বিনিয়োগ লাগবে। জ্বালানি উত্তরণে নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের পাশাপাশি কার্বন ধারণ ও সংরক্ষণের মতো প্রযুক্তিও অন্তর্ভুক্ত; এতে কার্বন ডাই-অক্সাইড ধরে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে তা বায়ুমণ্ডলে না যায়।
ব্যাংকের জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণ দলের ব্যবস্থাপক কিম জে-ইয়ুন বলেন, আগে নির্গমন কমালে অর্থনৈতিক ওঠানামা কম হতে পারে; তবে এই ফলের পেছনে বিনিয়োগ নিয়ে কঠিন কিছু অনুমান রয়েছে। মসৃণতর সমন্বয়ের প্রক্ষেপণ নির্ভর করছে, প্রয়োজনের সময় অর্থায়ন, নির্মাণ ও প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত হওয়ার ওপর।
তাই ব্যাংক কোনো একটি পথকে শ্রেষ্ঠ বলে চিহ্নিত করেনি। আগাম ব্যয় ২০৫০ সালের কাছাকাছি ধাক্কা কমাতে পারে, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে বিনিয়োগ সক্ষমতার ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে।
প্রযুক্তি উন্নয়নে পাঁচ বছর দেরি হলে ব্যয় অনেক বাড়ে
গবেষণায় ধরে নেওয়া হয়েছে, নির্গমন কমানোর প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি নির্ধারিত সময়ে উন্নত ও ব্যবহৃত হবে। ইস্পাত, পেট্রোরসায়ন ও সিমেন্ট খাতে এই অনুমান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এসব খাতের অনেক মৌলিক প্রযুক্তি এখনো উন্নয়নাধীন।
সরলরৈখিক পথে শিল্পপ্রযুক্তির উন্নয়নে পাঁচ বছর দেরি হলে ২০৫০ সালের জিডিপির প্রক্ষেপিত ঘাটতি ১০.২% থেকে বেড়ে ১৭.৩% হবে। অতিরিক্ত ক্ষতি ৭.১ শতাংশ পয়েন্ট। এতে বোঝা যায়, নির্গমনসীমা কঠোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর বিকল্প পাওয়া কতটা জরুরি, তার ওপর অর্থনৈতিক ফল কতখানি নির্ভরশীল।
কার্বন ব্যয় বাড়লে কোনো কারখানার পণ্য তৈরির পদ্ধতি বদলানোর বাস্তবসম্মত উপায় দরকার। উপযুক্ত যন্ত্রপাতি বা প্রক্রিয়া দেরিতে এলে কঠোর নিয়ম মেনে চলার পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘ সময় বেশি ব্যয় বহন করতে হয়।
গবেষকেরা জলবায়ু প্রতিক্রিয়া তহবিলের অর্থসহ সরকারি সহায়তা এমন খাতে দেওয়ার সুপারিশ করেছেন, যেখানে নির্গমন কমানো বিশেষভাবে কঠিন। তাদের ফলাফলে কার্বন মূল্যের পাশাপাশি শিল্পপ্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারকে উত্তরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
নতুন এআই ও সেমিকন্ডাক্টর প্রকল্পে বাড়তি চাহিদা
সেমিকন্ডাক্টর, ভৌত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং এআই ডেটা সেন্টার নিয়ে সরকারের তিনটি মেগা প্রকল্প থেকে সম্ভাব্য অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা মডেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ২০৪০ সালে এসব প্রকল্পের কারণে বিদ্যুৎ চাহিদা বিদ্যমান ৬৫৪.৪ টেরাওয়াট-ঘণ্টার পূর্বাভাসের চেয়ে ২৫৩.৪ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বাড়তে পারে।
এতে মোট চাহিদা বেড়ে ৯০৭.৮ টেরাওয়াট-ঘণ্টা হবে, অর্থাৎ বৃদ্ধি ৩৮.৭%। বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ মাপার একক হলো টেরাওয়াট-ঘণ্টা। উত্তরণের ক্ষেত্রে বাস্তব চ্যালেঞ্জ হলো, নির্গমন কমানো অব্যাহত রেখে এই বাড়তি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা।
এতে কার্বন নির্গমন করে না এমন অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো দরকার হবে। কিম বলেন, এর ফলে ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উত্তরণের ব্যয় বাড়তে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এআই উৎপাদনশীলতা ও জ্বালানি দক্ষতাও বাড়াতে পারে, যা উত্তরণের ব্যয় কমাতে পারে। গবেষণার মূল প্রাক্কলনে বাড়তি বিদ্যুৎ চাহিদা ও সম্ভাব্য দক্ষতা বৃদ্ধির হিসাব রাখা হয়নি; ফলে পরিকল্পনায় এগুলো উল্লেখযোগ্য অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
জলবায়ু ক্ষতি ও আর্থিক ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে
ব্যাংক অব কোরিয়ার ২০২৪ সালের নভেম্বরের জলবায়ু ঝুঁকি গবেষণায় অর্থনৈতিক হিসাবের আরেকটি দিক, অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি, পর্যালোচনা করা হয়। তাতে অনুমান করা হয়, কোনো পদক্ষেপ না নিলে ২০২৪ থেকে ২১০০ সাল পর্যন্ত গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ০.৩০ শতাংশ পয়েন্ট কমবে। অন্যদিকে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখতে সক্রিয় পদক্ষেপ নিলে কমবে ০.১৪ শতাংশ পয়েন্ট।
আগের ওই বিশ্লেষণে ২১০০ সালের জিডিপি কোনো পদক্ষেপ না নিলে ভিত্তিমাত্রার চেয়ে ২১.০% এবং সক্রিয় পদক্ষেপ নিলে ১০.২% কম হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছিল। ওই গবেষণার ১০.২% অঙ্কটি আলাদা বছর ও পরিস্থিতির হিসাব; নতুন গবেষণায় ২০৫০ সালের উত্তরণসংক্রান্ত প্রাক্কলনের সঙ্গে এটি এক নয়।
নতুন গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, জলবায়ু ক্ষতি কমানোর ফলে প্রবৃদ্ধির সুফল বছরে প্রায় ০.৩ শতাংশ পয়েন্ট হতে পারে বলে আগের কিছু প্রাক্কলনে দেখা গেছে। সেসব প্রাক্কলনের অনুমান ও সময়কাল ভিন্ন; তাই একত্রিত হিসাব করতে হলে মডেল ও সেগুলোর আওতা সামঞ্জস্য করতে হবে।
নীতিনির্ধারকদের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়া সামলানো। মূল্যস্থিতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে টানাপোড়েন পর্যবেক্ষণ এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে ব্যাংক। যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি বদলাতে হবে এবং কম মুনাফার মধ্যে চলতে হবে, সেগুলো থেকে ঋণদাতাদের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
তাই দক্ষিণ কোরিয়ার সিদ্ধান্ত শুধু নির্গমন কমানোর সময়সীমা নির্ধারণের বিষয় নয়। শিল্প বিনিয়োগের সময়, নতুন প্রযুক্তির প্রস্তুতি এবং পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের সরবরাহ ঠিক করবে—কারখানা, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে ব্যয়ের প্রভাব কীভাবে পৌঁছাবে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০৫০ সালে জিডিপি ধীরে নির্গমন কমানোর পথে ভিত্তিমাত্রার চেয়ে ১০.২% এবং আগাম কমানোর পথে ৮.২% কম হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
- দুই পথেই ২০৩০ সালের মধ্যে নির্গমন ৪০% কমবে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে নিট-শূন্য অর্জিত হবে।
- ২০৫০ সাল পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহে বিনিয়োগ হবে প্রায় ৮৪০ ট্রিলিয়ন ওন; দ্রুততর হ্রাসের পথে ব্যয়ের বড় অংশ আগেই করতে হবে।
- ইস্পাত, সিমেন্ট, রাসায়নিক ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত সরাসরি তীব্র চাপের মুখে পড়বে; এর ব্যয় গাড়ি নির্মাণ ও নির্মাণ খাতেও ছড়াবে।
- শিল্পপ্রযুক্তির উন্নয়নে পাঁচ বছর দেরি হলে সরলরৈখিক পথে ২০৫০ সালের জিডিপির প্রক্ষেপিত ঘাটতি বেড়ে ১৭.৩% হবে।
- বড় সেমিকন্ডাক্টর ও এআই প্রকল্প থেকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা মূল প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
- গবেষণায় উত্তরণের ব্যয় হিসাব করা হয়েছে; জলবায়ু ক্ষতি কমানোর সুফল অন্য গবেষণায় পর্যালোচনা করা হয়েছে।






