বড় অর্থপাচার মামলা নিয়ে ব্যক্তিগত আলাপ
সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি সঞ্জয় কিষাণ কৌল বলেছেন, প্রিভেনশন অব মানি লন্ডারিং অ্যাক্টের (পিএমএলএ) অধীনে বিস্তৃত ক্ষমতা বহাল রাখা রায়ের পুনর্বিবেচনা চেয়ে করা আবেদনের শুনানির সময় তৎকালীন ভারতের প্রধান বিচারপতি ডি.ওয়াই. চন্দ্রচূড় তাঁকে ‘মধ্যপন্থা’ নিতে বলেছিলেন। কৌল আরও বলেন, বিচারক নিয়োগে বিলম্ব-সংক্রান্ত একটি মামলা তাঁর বেঞ্চ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, যখন তিনি বকেয়া সুপারিশগুলোর বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে কেন্দ্রীয় সরকারকে চাপ দিচ্ছিলেন।
সূচিপত্র
- বড় অর্থপাচার মামলা নিয়ে ব্যক্তিগত আলাপ
- প্রধান বিচারপতির চেম্বারে কী ঘটেছিল বলে কৌল জানিয়েছেন
- ২০২২ সালের রায় কেন গুরুত্বপূর্ণ
- রায় পুনর্বিবেচনার দুটি পথ
- বেঞ্চ বদলের মধ্য দিয়ে যেভাবে এগিয়েছে কার্যক্রম
- কৌলের বেঞ্চ থেকে সরানো নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলা
- সম্মত পাঁচটি নাম, বিতর্কিত ষষ্ঠটি
- এক প্রার্থীর জাত এবং দৃঢ়তা নিয়ে মতবিরোধ
- নিয়োগব্যবস্থা নিয়েও কৌলের সমালোচনা
- মূল বিষয়
সাংবাদিক করণ থাপারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের স্মৃতিকথা, ‘উইদাউট ফিয়ার অর ফেভার’ নিয়ে আলোচনার সময় এসব ঘটনার বর্ণনা দেন কৌল। তাঁর বিবরণে সুপ্রিম কোর্টের কাজের দুটি স্পর্শকাতর দিক উঠে এসেছে: সরকারি তদন্তকারী সংস্থার ক্ষমতা নিয়ে চ্যালেঞ্জের নিষ্পত্তি এবং বিচারক নিয়োগের ব্যবস্থাপনা।
পিএমএলএ-বিষয়ক বিরোধটি ২০২২ সালের ২৭ জুলাই বিজয় মাদনলাল চৌধুরী বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলায় দেওয়া আদালতের রায়কে ঘিরে। ওই রায়ে গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, সম্পত্তি ক্রোক, প্রমাণের দায় এবং জামিনের কঠোর শর্ত-সংক্রান্ত বিধান বহাল রাখা হয়। এসব বিধানের পুনর্বিবেচনা হলে অর্থপাচার তদন্তের মুখে থাকা ব্যক্তিরা তাঁদের মামলা সম্পর্কে তথ্য কীভাবে পাবেন এবং হেফাজত থেকে মুক্তি চাইবেন, তা প্রভাবিত হতে পারে।
বিচারক নিয়োগ নিয়ে স্মৃতিকথার সমালোচনার বিষয়ে চন্দ্রচূড় বলেছেন, তিনি বইটি পড়েননি এবং বিস্তারিত জবাব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট অংশগুলোর প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। কৌলের সঙ্গে কলেজিয়ামে তাঁর সম্পর্ককে তিনি শ্রদ্ধাপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন এবং বলেন, কোনো বৈঠক থেকে কৌলের বেরিয়ে যাওয়ার কথা তাঁর মনে পড়ে না।
নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলা নিয়ে চাপের বিষয়ে কৌলের বক্তব্যে একটি স্পষ্ট সীমা আছে: সরকার তাঁর বেঞ্চ থেকে মামলাটি সরানোর পেছনে ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা তিনি বলতে পারেননি।
প্রধান বিচারপতির চেম্বারে কী ঘটেছিল বলে কৌল জানিয়েছেন
কৌল বলেন, পিএমএলএ পুনর্বিবেচনার আবেদনগুলোর শুনানির কথা থাকাকালে চন্দ্রচূড় তাঁকে নিজের চেম্বারে ডেকেছিলেন। কৌলের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চে বিচারপতি সঞ্জীব খান্নাও ছিলেন। কৌলের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনিও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
কৌল বলেন, চন্দ্রচূড় তাঁকে শুনানি না করতে রাজি করানোর চেষ্টা করেন এবং তিনি এগোলে সতর্কতা অবলম্বন করে মধ্যপন্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন। কৌলের মনে পড়ে, তিনি জবাবে বলেছিলেন, বিচারিক জীবনে তিনি কখনো এ ধরনের পন্থা নেননি এবং কোনো বিষয়ে শুনানি করা ঠিক মনে হলে তা করেছেন।
কৌল বলেন, ওই পর্যায়ে সরে দাঁড়ালে তাঁর সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠত। এরপর তিনি ও খান্না এজলাসে গিয়ে মামলাটির শুনানি করেন। তাঁর অভিযোগ, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তাঁর অবসর নেওয়ার পর পর্যন্ত কার্যক্রম বিলম্বিত করতে কেন্দ্রীয় সরকার বারবার মুলতবি চেয়েছিল।
ওই কথোপকথনের আগেই মতবিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল। কৌল বলেন, এক সহকর্মী তাঁকে জানান যে আবেদনগুলো অন্য একটি বেঞ্চে উঠেছিল। তিনি বিষয়টি চন্দ্রচূড়কে জানালে প্রধান বিচারপতি ব্যাখ্যা করেন, একজন বিচারপতি সংশ্লিষ্ট মামলাগুলো তাঁর বেঞ্চে একত্র করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কৌল আপত্তি জানিয়ে বলেন, প্রধান বিচারপতির সম্মতি ছাড়া এমন বদলি সম্ভব নয়। তিনি বলেন, মামলাগুলোর শুনানি তিনি করবেন না—এমন ইচ্ছা থাকলে তাঁকে সরাসরি জানাতে বলেছিলেন। পরে চন্দ্রচূড় কৌল, খান্না ও বিচারপতি বেলা এম. ত্রিবেদীকে নিয়ে একটি বেঞ্চ গঠন করেন। কৌলের অবসরের আগে শুনানি শেষ হয়নি।
২০২২ সালের রায় কেন গুরুত্বপূর্ণ
পিএমএলএ অর্থপাচারের তদন্তের ক্ষমতা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটকে (ইডি) দেয়। অর্থপাচার বলতে সাধারণভাবে অপরাধলব্ধ অর্থ এমনভাবে ব্যবহার করাকে বোঝায়, যাতে তা বৈধ বলে মনে হয়। তদন্তের সময় এই ক্ষমতা কোনো ব্যক্তির স্বাধীনতা ও সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ—দুটিই প্রভাবিত করতে পারে।
২০২২ সালের রায় দেন বিচারপতি এ.এম. খানউইলকর, দীনেশ মহেশ্বরী ও সি.টি. রবিকুমার। তাঁরা চ্যালেঞ্জ করা ৫, ৮(৪), ১৫, ১৭ ও ১৯ নম্বর ধারাসহ সম্পত্তি ক্রোক, দখল, সমন, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা-সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো বহাল রাখেন।
২৪ নম্বর ধারা প্রমাণের দায় নিয়ে। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, অপরাধলব্ধ অর্থ-সংক্রান্ত অনুমান খণ্ডনের দায় আইনটি কার্যক্রমের মুখে থাকা ব্যক্তির ওপর দেয়। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাধারণত ফৌজদারি মামলায় শুরুতে অভিযোগ প্রমাণের দায় থাকে রাষ্ট্রপক্ষের ওপর।
৪৫ নম্বর ধারায় জামিনের জন্য দুটি কঠোর শর্ত রয়েছে। মোটামুটিভাবে, সরকারি কৌঁসুলি মুক্তির বিরোধিতা করলে আদালতকে যুক্তিসংগতভাবে বিশ্বাস করতে হবে যে অভিযুক্ত দোষী নন এবং জামিনে থাকাকালে কোনো অপরাধ করবেন না। সাধারণ জামিনের নিয়মের তুলনায় এসব শর্তে মুক্তি পাওয়া কঠিন হয়।
নিকেশ তারাচাঁদ শাহ মামলায় আদালত এর আগের দ্বৈত শর্তের একটি সংস্করণ বাতিল করেছিলেন। ২০১৮ সালে সংসদ বিধানটি সংশোধন করে এবং ২০২২ সালের রায়ে সংশোধিত কাঠামোটি বহাল রাখা হয়। ফলে পুনর্বিবেচনা-সংক্রান্ত মামলাটি এমন নিয়ম নিয়ে, যার তাৎক্ষণিক প্রভাব রয়েছে গ্রেপ্তার, আটক ও সম্পত্তির ওপর বিধিনিষেধের মুখে থাকা ব্যক্তিদের জন্য।
রায় পুনর্বিবেচনার দুটি পথ
২০২২ সালের রায়ের বিরুদ্ধে আটটি রিভিউ পিটিশন দাখিল করা হয়েছিল। কার্যক্রমটি কার্তি পি. চিদাম্বরম বনাম এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট, RP(Crl) 219/2022 এবং সংশ্লিষ্ট আবেদন হিসেবে চিহ্নিত।
রিভিউয়ের মাধ্যমে সীমিত আইনি কাঠামোর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টকে নিজের রায় পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করা হয়। আরও বিস্তৃত আবেদনগুলোতে বিজয় মাদনলাল চৌধুরী মামলার রায় পুনর্বিবেচনা এবং বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর আবেদনও ছিল। কৌলের বক্তব্য বিস্তৃত পুনর্বিবেচনা-সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ে, আর আটটি রিভিউ পিটিশন আলাদা পথে এগিয়েছে।
২০২২ সালের ২৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এন.ভি. রমণার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ রিভিউ কার্যক্রমে নোটিশ জারি করে। ওই শুনানিতে বেঞ্চ আরও বিবেচনার জন্য দুটি বিষয় চিহ্নিত করে: এনফোর্সমেন্ট কেস ইনফরমেশন রিপোর্ট (ইসিআইআর)-এ প্রবেশাধিকার এবং নির্দোষতার অনুমানের উল্টো দায় আরোপ।
ইসিআইআর হলো অর্থপাচার মামলার তথ্য নথিবদ্ধ করার জন্য ইডির অভ্যন্তরীণ নথি। এতে প্রবেশাধিকার গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি অভিযুক্তকে তদন্তের ভিত্তি বুঝতে সাহায্য করতে পারে। নির্দোষতার অনুমানের অর্থ, ফৌজদারি কার্যক্রমে একজন ব্যক্তি শুরুতে এমন ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হন, যার অপরাধ প্রমাণ করতে হবে; শুরু থেকেই তাঁকে নির্দোষতা প্রমাণ করতে হয় না।
আদালত রিভিউ পিটিশনগুলোর উন্মুক্ত আদালতে শুনানির অনুমতি দেয়। পরের এক শুনানিতে বিচারপতি রবিকুমার প্রশ্ন তোলেন, এই প্রক্রিয়া ‘আড়ালের আপিল’ হয়ে দাঁড়াবে কি না। রিভিউ আবেদনকারীদের পক্ষে থাকা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কপিল সিব্বল যুক্তি দেন, রায়ে যে ভুলগুলো হয়েছে বলে তাঁরা অভিযোগ করেছেন, তা ব্যাখ্যা করার সুযোগ তাঁদের দেওয়া উচিত। বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, রিভিউয়ের আওতাধীন আইনি বিষয়গুলোর মধ্যে দুই পক্ষই যুক্তি উপস্থাপনের সময় পাবে।
বেঞ্চ বদলের মধ্য দিয়ে যেভাবে এগিয়েছে কার্যক্রম
মুলতবি ও বেঞ্চের সদস্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মামলাটির কার্যক্রম চলেছে। ২০২৪ সালের এক শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বলেন, আগের রাতে রাত ৯টার পর রিভিউ মামলাটি তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল এবং প্রস্তুতির জন্য ইডির সময় প্রয়োজন। বেঞ্চ ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করতে সম্মত হয়।
বিশেষ ওই বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি সূর্য কান্ত, রবিকুমার ও উজ্জ্বল ভুঁইয়া। পরে রবিকুমারের অবসরের কারণে বেঞ্চ পুনর্গঠিত হলে রিভিউ পিটিশনগুলো বিচারপতি সূর্য কান্ত, এন. কোটিশ্বর সিং ও ভুঁইয়ার বেঞ্চে ওঠে। শুনানির তারিখ ছিল ৭ মে, দুপুর ২টা; ওই তালিকাভুক্তির পর কী ফল হয়েছিল, তা এখানে নিশ্চিত করা হয়নি।
মূল রায়, রিভিউ পিটিশন এবং বিস্তৃত চ্যালেঞ্জগুলো যেসব ধাপ পেরিয়েছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো:
- ২৭ জুলাই, ২০২২: বিজয় মাদনলাল চৌধুরী মামলায় সুপ্রিম কোর্ট পিএমএলএর গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো বহাল রাখেন।
- ২৫ আগস্ট, ২০২২: প্রধান বিচারপতি এন.ভি. রমণার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ রিভিউ পিটিশনে নোটিশ জারি করে এবং ইসিআইআরে প্রবেশাধিকার ও নির্দোষতার অনুমান নিয়ে আলোচনা করে।
- ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের আগে: কৌলের নেতৃত্বে বিস্তৃত পুনর্বিবেচনা-সংক্রান্ত কার্যক্রম চলছিল, যা তাঁর অবসরের আগে শেষ হয়নি।
- আগস্ট ২০২৪: ইডি প্রস্তুতির জন্য সময় চাওয়ায় রিভিউ পিটিশনগুলোর শুনানি ২৮ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
- পরবর্তী ৭ মে তারিখে তালিকাভুক্তি: বিচারপতি রবিকুমারের অবসরের পর পুনর্গঠিত বেঞ্চে বিচারপতি এন. কোটিশ্বর সিং ছিলেন।
বিচারপতি খান্না, এম.এম. সুন্দরেশ ও ত্রিবেদীকে নিয়ে গঠিত আরেকটি বেঞ্চে বৃহত্তর পুনর্বিবেচনা ও বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর আবেদনগুলোর শুনানিও চলছিল। দুটি কার্যক্রম আলাদা করে দেখলে মামলার ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন বিচারপতির নাম আসার কারণ বোঝা যায়।
কৌলের বেঞ্চ থেকে সরানো নিয়োগ-সংক্রান্ত মামলা
কৌলের দ্বিতীয় বড় অভিযোগটি বিচারক নিয়োগে বিলম্ব নিয়ে করা আদালত অবমাননার আবেদনের বিষয়ে। তিনি ও বিচারপতি সুধাংশু ধুলিয়া কলেজিয়ামের সুপারিশে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে চাপ দিচ্ছিলেন এবং তাঁরা যেটিকে ‘বেছে বেছে গ্রহণ’ করার পদ্ধতি বলে বর্ণনা করেছেন, তার সমালোচনা করেছিলেন।
কলেজিয়াম হলো উচ্চতর বিচার বিভাগে নিয়োগের সুপারিশকারী জ্যেষ্ঠ বিচারপতিদের একটি দল। সরকার সুপারিশগুলো প্রক্রিয়াকরণ করে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে; রাষ্ট্রপতির নিয়োগ পরোয়ানা জারির মধ্য দিয়ে প্রক্রিয়াটি শেষ হয়। বিলম্ব হলে সুপারিশকৃত নিয়োগ অনিষ্পন্ন থেকে যেতে পারে এবং বিচারকের পদ খালি পড়ে থাকতে পারে।
কৌল বলেন, বিচারকদের কোন কোন মামলার শুনানি হবে, তা চিহ্নিত করা কার্যতালিকা থেকে মামলাটি হঠাৎ তাঁর বেঞ্চের নামের পাশে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে সুপ্রিম কোর্টের এক রেজিস্ট্রার তাঁকে জানান, একটি ফাইল নোটে বলা হয়েছে, দুই বছর আগে মামলাটি তাঁর কাছে বরাদ্দ করার সময় প্রধান বিচারপতির আনুষ্ঠানিক অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। মামলাটি সরানোর কারণ হিসেবে এই ব্যাখ্যাই তাঁকে জানানো হয়।
কৌল বলেন, তিনি চন্দ্রচূড়ের কাছে নিজের অভিযোগ তুলেছিলেন। প্রধান বিচারপতি চাপের মুখে ছিলেন বলে স্মৃতিকথায় ইঙ্গিত করা হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চন্দ্রচূড় নিশ্চয়ই মনে করেছিলেন যে মামলাটি তাঁর হাতে থাকা উচিত নয়। মামলাটি সরাতে সরকার প্রধান বিচারপতিকে ইঙ্গিত দিয়েছিল কি না, জানতে চাইলে কৌল বলেন, এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে বলা তাঁর জন্য কঠিন।
সম্মত পাঁচটি নাম, বিতর্কিত ষষ্ঠটি
প্রস্তাবিত নিয়োগ তালিকা নিয়ে কলেজিয়ামের ভেতরের টানাপোড়েনের কথাও বলেছেন কৌল। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের ছয়টি শূন্য পদ পূরণের জন্য সদস্যরা পাঁচটি নাম নিয়ে একমত হয়েছিলেন। তখন শেষ মুহূর্তে চন্দ্রচূড় ষষ্ঠ একজন প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করেন। কৌল ও অন্য সদস্যরা সংযোজনটি মেনে নেননি।
কৌল বলেন, বৈঠক চলাকালে চন্দ্রচূড় তাঁকে পাশে ডেকে সরকারকে ফোন করে তাদের মতামত জেনে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কলেজিয়ামের আলোচনা চলার মধ্যে এমনটি করার বিরোধিতা করেন কৌল। তাঁর স্মৃতিকথা অনুযায়ী, সম্মত হওয়া পাঁচটি নামই প্রক্রিয়ায় এগিয়েছিল; ষষ্ঠটি নয়।
কৌলের ধারণা, নামগুলো নিয়ে চন্দ্রচূড় হয়তো আগেই সরকারের কোনো ধরনের অনুমোদন নিয়েছিলেন। তিনি এটিকে নিজের সন্দেহ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বৃহত্তর আপত্তি ছিল, বিচারকেরা কাকে সুপারিশ করবেন তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্থির করার আগে পুরো তালিকা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা।
সাক্ষাৎকারে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কৌল বলেন, পরামর্শের সময় ও ধরনই ছিল মূল বিষয়:
“আলোচনার ধারণাটি খারাপ বলে আমি মনে করি না; সমস্যা হলো, কোন পর্যায়ে এবং কীভাবে তা করা হচ্ছে,” তিনি বলেন।
কৌল সতর্ক করে বলেন, তুলনামূলক দীর্ঘ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা কোনো প্রধান বিচারপতি এমন রীতি চালু করতে পারেন, যা স্বল্প মেয়াদের উত্তরসূরিদের পক্ষে প্রতিরোধ করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, চন্দ্রচূড়ের মেয়াদের আগে ও পরেও আগাম আলোচনা হয়েছে; তাই তাঁর সমালোচনা তাঁদের ব্যক্তিগত মতবিরোধের চেয়ে বিস্তৃত।
এক প্রার্থীর জাত এবং দৃঢ়তা নিয়ে মতবিরোধ
সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী একজন প্রার্থীকে ঘিরে আরেকটি মতবিরোধের কথা স্মৃতিকথায় লিখেছেন কৌল। তিনি বলেন, ওই প্রার্থীকে আরও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এবং তাঁর পরিবারের জাত কী, তা নিয়ে সরকারের প্রশ্ন চন্দ্রচূড় তাঁকে জানিয়েছিলেন—যদিও ওই পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেই ধর্ম পালন করে আসছিল।
কৌল বলেন, জাত নিয়ে প্রশ্নটি তাঁর কাছে অদ্ভুত ও অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছিল। স্মৃতিকথায় প্রকাশ না করা সরকারের একটি মত নিয়ে আরও কথা কাটাকাটির পর তিনি ফাইল বন্ধ করে ঘর থেকে বেরিয়ে যান বলে জানান। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, বৈঠক মুলতবি করা হয় এবং সরকার পিছু হটলে শেষ পর্যন্ত প্রার্থীর নিয়োগ প্রক্রিয়া এগোয়।
চন্দ্রচূড় বলেন, কলেজিয়ামের কোনো বৈঠক থেকে কৌল বেরিয়ে গিয়েছিলেন বলে তাঁর মনে পড়ে না। সাবেক প্রধান বিচারপতি তাঁদের কথোপকথন এভাবে বর্ণনা করেন:
আমাদের মধ্যে ভালো কথাবার্তা হয়েছে, যুক্তিনির্ভর আলোচনা হয়েছে এবং কলেজিয়ামে একসঙ্গে আমাদের বৈঠকগুলো ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ।
চন্দ্রচূড় আরও বলেন, কলেজিয়ামের প্রতিটি বৈঠকের পর তিনি সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে নথিবদ্ধ করার রীতি চালু করেছিলেন এবং সেসব নথিতে কারও ভিন্নমত থাকার কথা তাঁর মনে পড়ে না। বিচারকদের আনুষ্ঠানিক নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি প্রক্রিয়ায় সরকারের অংশগ্রহণের পক্ষে যুক্তি দেন।
কৌলের সমালোচনায় চন্দ্রচূড়ের বিচারিক দক্ষতা ও প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আলাদা করে দেখা হয়েছে। বিচারিক দায়িত্ব পালনে চন্দ্রচূড়ের মেধা, সামর্থ্য ও কঠোর পরিশ্রমের প্রশংসা করলেও নিয়োগের বিষয়ে তিনি সরকারের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয় ছিলেন বলে যুক্তি দেন কৌল।
নিয়োগব্যবস্থা নিয়েও কৌলের সমালোচনা
কৌল বলেন, ২০২২ সালের জুনে চন্দ্রচূড় কলেজিয়ামে যোগ দেওয়ার পর সরকারের সঙ্গে লেনদেনে তিনি যৌথভাবে আরও দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, চন্দ্রচূড় সাধারণত ওই সম্পর্ক নিজে সামলাতে চাইতেন।
স্মৃতিকথায় এমন কিছু ঘটনার কথা বলা হয়েছে, যেখানে সরাসরি যোগাযোগের ফলে সরকারের পদক্ষেপ পাওয়া গিয়েছিল; এর মধ্যে দিল্লি হাইকোর্টের দুই বিচারপতির নিয়োগে ছাড়পত্রও ছিল। কৌলের যুক্তি, আদালতকে সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ না করেও দৃঢ় অবস্থান ফল বয়ে আনতে পারে।
জাতীয় বিচারক নিয়োগ কমিশনকে (এনজেএসি) কাজ করার সুযোগ দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন কৌল। ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট ওই বিকল্প নিয়োগব্যবস্থা বাতিল করে। তাঁর অবস্থানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সরকারের অংশগ্রহণের জায়গা স্বীকার করা হয়েছে, তবে বর্তমান ব্যবস্থায় কীভাবে প্রভাব খাটানো হয় তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর মর্যাদা প্রদান নিয়েও আরেকটি ঘটনা রয়েছে। আদালত পেশাগত এই মর্যাদা দেয়। কৌল বলেন, পরে তিনি শুনেছিলেন, অবসরের পর পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত করার পরামর্শ কেউ কেউ দিয়েছিলেন, কারণ তিনি কঠোর অবস্থান নিতেন। এই ব্যাখ্যা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা তিনি স্বীকার করেন; তাঁর অবসরের পর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মর্যাদা প্রদান করা হয়।
সুতরাং মূল বিরোধটি বাস্তব প্রভাব ফেলে এমন প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়ে: গ্রেপ্তার ও জামিনের ক্ষমতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ কোন বেঞ্চে শুনবে, নিয়োগের সুপারিশ কত দিন অনিষ্পন্ন থাকবে এবং প্রস্তাবিত বিচারকদের বিষয়ে কখন সরকারের সঙ্গে আলোচনা হবে। এসব সিদ্ধান্ত নিয়ে কৌল বিস্তারিত ব্যক্তিগত বিবরণ দিয়েছেন। চন্দ্রচূড় তাঁদের কলেজিয়াম-সম্পর্কের বিষয়ে ভিন্ন স্মৃতিচারণ করেছেন এবং বইটি পড়ার পর বিস্তারিত জবাব দেওয়ার কথা বলেছেন।
মূল বিষয়
- বিচারপতি সঞ্জয় কিষাণ কৌল বলেন, ২০২২ সালের পিএমএলএ রায়ের পুনর্বিবেচনা চেয়ে করা কার্যক্রমে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ডি.ওয়াই. চন্দ্রচূড় তাঁকে মধ্যপন্থা নিতে বলেছিলেন।
- কৌল বলেন, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তাঁর অবসরের আগে পিএমএলএ নিয়ে বিস্তৃত শুনানি শেষ হয়নি।
- আলাদা আটটি রিভিউ পিটিশনে ইসিআইআরে প্রবেশাধিকার ও নির্দোষতার অনুমান নিয়ে আলোচনা হয়।
- কৌল বলেন, বিচারক নিয়োগে বিলম্ব নিয়ে সরকারকে চাপ দেওয়ার সময় একটি মামলা তাঁর বেঞ্চ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
- আনুষ্ঠানিক কলেজিয়াম সিদ্ধান্তের আগে সরকারের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে তিনি সমালোচনা করেছেন, তবে পরামর্শের ভূমিকা মেনে নিয়েছেন।
- চন্দ্রচূড় তাঁদের কলেজিয়াম-সম্পর্ককে শ্রদ্ধাপূর্ণ বলে বর্ণনা করেন এবং কোনো বৈঠক থেকে কৌলের বেরিয়ে যাওয়ার কথা তাঁর মনে নেই বলে জানান।






