চিপের জোয়ারে দক্ষিণ কোরিয়া চীনের পরেই
২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুনে দক্ষিণ কোরিয়ার চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ১১৬.৬৩ বিলিয়ন ডলার। ১৯৯৬ সাল থেকে পাওয়া তুলনাযোগ্য তথ্যের মধ্যে এই প্রথম দেশটির উদ্বৃত্ত জার্মানি ও জাপানের সম্মিলিত উদ্বৃত্তকে ছাড়িয়ে যায়। সেমিকন্ডাক্টরের দাম বৃদ্ধি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যবহৃত চিপের চাহিদা দেশটিকে ওই প্রান্তিকে তথ্য পাওয়া ৩৬টি বড় অর্থনীতির মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে তুলে আনতে সহায়তা করে।
সূচিপত্র
- চিপের জোয়ারে দক্ষিণ কোরিয়া চীনের পরেই
- জার্মানি ও জাপানের সঙ্গে ঐতিহাসিক তুলনা
- জুলাই ও আগস্টে ব্যবধান আরও বাড়ে
- রপ্তানি আয়ের বেশির ভাগই এসেছে মেমোরি চিপ থেকে
- জাতীয় উৎপাদনের রেকর্ড অংশ হতে পারে উদ্বৃত্ত
- আরও বড় উদ্বৃত্তের সম্ভাবনা দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
- দাম ও এআই খাতে ব্যয় তৈরি করছে নির্দিষ্ট খাতকেন্দ্রিক ঝুঁকি
- পরবর্তী সময়ে উদ্বৃত্ত কমার পূর্বাভাস আইএমএফের
- রপ্তানির শক্তিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ
- মূল বিষয়গুলো
ব্যাংক অব কোরিয়ার অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ব্যবস্থায় পাওয়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩.৭২ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে চীন প্রথম স্থানে ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার পরে জার্মানির উদ্বৃত্ত ছিল ৫২.২৮ বিলিয়ন ডলার, আর জাপানের ৫০.৬২ বিলিয়ন ডলার। জার্মানি ও জাপানের প্রকাশিত অঙ্ক যোগ করলে দাঁড়ায় ১০২.৯০ বিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়া ১৩.৭৩ বিলিয়ন ডলারে এগিয়ে ছিল।
২৫ অক্টোবর প্রকাশিত এই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়ার বৈদেশিক আয় কত দ্রুত বেড়েছে। আগের বছরের একই প্রান্তিকে দেশটির উদ্বৃত্ত ছিল ২৮.৩৯ বিলিয়ন ডলার। সর্বশেষ অঙ্কটি তার প্রায় ৪.১ গুণ, অর্থাৎ বেড়েছে ৮৮.২৪ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে জার্মানির উদ্বৃত্ত বেড়েছে ১১.৯ শতাংশ, আর জাপানের ৫ শতাংশ।
চলতি হিসাব পণ্য, সেবা, বিনিয়োগ থেকে আয় এবং হস্তান্তরসহ বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে একটি দেশের লেনদেনের হিসাব রাখে। এসব লেনদেনের মাধ্যমে দেশে আসা অর্থ বিদেশে পরিশোধিত অর্থের চেয়ে বেশি হলে উদ্বৃত্ত তৈরি হয়। সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি দক্ষিণ কোরিয়ার আয়ের বড় উৎস, যদিও এই হিসাবে বিদেশি বিনিয়োগ থেকে আয়ের মতো অর্থপ্রদানের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত থাকে।
তথ্য ও পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮১.৬ শতাংশ বেড়ে ১১৩.৮৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। তৃতীয় প্রান্তিকে এই উল্লম্ফন আরও দ্রুত হয়, ফলে চিপের জোয়ার কত দিন টেকসই হবে, তা দেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
জার্মানি ও জাপানের সঙ্গে ঐতিহাসিক তুলনা
জার্মানির তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বৃত্ত ৬৪.৩৫ বিলিয়ন ডলার বেশি ছিল, যা ১৯৭৬ সালে তুলনাযোগ্য তথ্য শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে বড় ব্যবধান। জাপানের তুলনায় ৬৬.০১ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান ছিল ১৯৯৬ সালের পর সর্বোচ্চ, যখন তিনটি দেশেরই তথ্য পাওয়া যায়।
বছরের মধ্যে তুলনামূলক চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে। জানুয়ারি থেকে জুনে দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বৃত্ত জমা হয় ১৯১.০১ বিলিয়ন ডলার। জার্মানির ছিল ১২৬.৩৯ বিলিয়ন ডলার এবং জাপানের ১১২.১২ বিলিয়ন ডলার। ফলে পুরো প্রথমার্ধে দুই দেশের সম্মিলিত উদ্বৃত্ত দক্ষিণ কোরিয়ার চেয়ে বেশি ছিল। দ্বিতীয় প্রান্তিকেই কেবল দক্ষিণ কোরিয়া তাদের সম্মিলিত অঙ্ক ছাড়িয়ে যায়।
দুই সময়কালেই চীন এগিয়ে ছিল। প্রথমার্ধে দেশটির উদ্বৃত্ত ছিল ৩৭৮.০৩ বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় প্রান্তিকে দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বৃত্ত ছিল চীনের ৬০.২ শতাংশ, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২২.৭ শতাংশ। দুই দেশই উদ্বৃত্তে থাকা প্রান্তিকগুলোর মধ্যে ২০১৯ সালের শেষ প্রান্তিকের পর এটি ছিল সর্বোচ্চ অনুপাত।
জুলাই ও আগস্টে ব্যবধান আরও বাড়ে
জুলাই ও আগস্টেও দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বৃত্ত জার্মানি ও জাপানের সম্মিলিত অঙ্কের চেয়ে বেশি ছিল। এই দুই মাসে দেশটির মোট উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ৮৮.১৯ বিলিয়ন ডলার; জার্মানির ৩৬.৮৫ বিলিয়ন এবং জাপানের ৪৩.৯৭ বিলিয়ন ডলার। দুই দেশের সম্মিলিত ৮০.৮২ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়া ৭.৩৭ বিলিয়ন ডলারে এগিয়ে ছিল।
এই ধারাবাহিকতা দেখায়, প্রবৃদ্ধি একটি প্রান্তিকেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তবে তৃতীয় প্রান্তিকের আন্তর্জাতিক তুলনায় শুধু জুলাই ও আগস্টের তথ্য রয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির পরিসংখ্যান সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, তাই দুই ধরনের তথ্যের সময়কাল এক নয়।
- এপ্রিল থেকে জুন ২০২৬: দক্ষিণ কোরিয়ার চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ১১৬.৬৩ বিলিয়ন ডলার, যা জার্মানি ও জাপানের সম্মিলিত অঙ্কের চেয়ে বেশি।
- জুলাই ও আগস্ট: দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বৃত্ত হয় আরও ৮৮.১৯ বিলিয়ন ডলার, যা আবারও দুই দেশের সম্মিলিত অঙ্ককে ছাড়িয়ে যায়।
- জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর: সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২১৮.৭ শতাংশ বেড়ে ১৪৮.০২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
- অক্টোবর ২০২৬: আইএমএফ পুরো বছরের চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত ৪২১.৯৪৬ বিলিয়ন ডলার হবে বলে পূর্বাভাস দেয়।
জুলাই ও আগস্টের ফল মিলিয়ে প্রথম আট মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার পুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ২৭৯.২০ বিলিয়ন ডলার। প্রথমার্ধের ১৯১.০১ বিলিয়ন ডলারের সঙ্গে পরের দুই মাসের ৮৮.১৯ বিলিয়ন ডলার যোগ করে এই হিসাব করা হয়েছে।
রপ্তানি আয়ের বেশির ভাগই এসেছে মেমোরি চিপ থেকে
দ্বিতীয় প্রান্তিকে সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি ছিল ১১৩.৮৯ বিলিয়ন ডলার। তৃতীয় প্রান্তিকে তা বেড়ে হয় ১৪৮.০২ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ৩৪.১৩ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি দ্বিতীয় প্রান্তিকের ১৮১.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে তৃতীয় প্রান্তিকে ২১৮.৭ শতাংশ হয়।
আয়ের বড় অংশ এসেছে মেমোরি চিপ থেকে। তৃতীয় প্রান্তিকে মেমোরি চিপ রপ্তানি ৩১১.৬ শতাংশ বেড়ে ১৩০.৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। হিসাব অনুযায়ী, প্রান্তিকের মোট সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির প্রায় ৮৮.৩ শতাংশ ছিল এটি। কম্পিউটারকে বিভিন্ন কাজ, বিশেষত এআই ব্যবস্থার জটিল হিসাব, সম্পন্ন করতে যে তথ্যের প্রয়োজন হয়, মেমোরি চিপ তা সংরক্ষণ করে।
শুধু সেপ্টেম্বরে সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি ছিল ৬০.৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২৬২.৮ শতাংশ বেশি। তৃতীয় প্রান্তিকের মোট সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি মূল্যের প্রায় ৪০.৮ শতাংশ এসেছে এই মাসে।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে দাম বেড়ে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি চিপের দাম বাড়লে একই সংখ্যক চিপ বিক্রি করেও কোনো কোম্পানি বেশি অর্থ পেতে পারে। তাই দক্ষিণ কোরিয়ার রপ্তানি আয় নির্ভর করছে বিক্রির পরিমাণ এবং ক্রেতারা যে দাম দিতে রাজি, উভয়ের ওপর।
জাতীয় উৎপাদনের রেকর্ড অংশ হতে পারে উদ্বৃত্ত
আইএমএফের অক্টোবরের ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে’ ২০২৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত ৪২১.৯৪৬ বিলিয়ন ডলার হবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়। তথ্য পাওয়া ১৯০টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে এতে দেশটির অবস্থান দ্বিতীয়। ৮৬৩.২০৫ বিলিয়ন ডলারের প্রক্ষেপিত উদ্বৃত্ত নিয়ে চীন প্রথম স্থানে থাকবে। আগের বছর দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান ছিল পঞ্চম।
আইএমএফের প্রত্যাশা, দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বৃত্ত ২৯৮.৮৯২ বিলিয়ন ডলার বাড়বে, যা ওই অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। চীনের প্রক্ষেপিত বৃদ্ধি ১৩৮.৮০৩ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ দক্ষিণ কোরিয়ার বৃদ্ধির পরিমাণ তার প্রায় ২.১৫ গুণ।
অর্থনীতিতে উৎপাদিত পণ্য ও সেবার মোট মূল্য, অর্থাৎ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রক্ষেপিত উদ্বৃত্ত ছিল ১৮.৮ শতাংশ। ১৯৮০ সালে শুরু হওয়া আইএমএফের তথ্যের মধ্যে এটি হবে সর্বোচ্চ অনুপাত, এবং এশীয় আর্থিক সংকটের পর ১৯৯৮ সালে রেকর্ড করা ১০.১ শতাংশের প্রায় দ্বিগুণ।
জিডিপির অনুপাতে চীন, জার্মানি ও জাপানের পূর্বাভাস যথাক্রমে ৪.০, ৪.৫ ও ৪.৬ শতাংশ। এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি জিডিপি রয়েছে এমন ২২টি অর্থনীতির মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রক্ষেপিত অনুপাত তাইওয়ানের পর দ্বিতীয়। জিডিপির অংশ হিসেবে উদ্বৃত্ত প্রকাশ করলে প্রতিটি অর্থনীতির আকারের তুলনায় এর ব্যাপ্তি বোঝা সহজ হয়।
আরও বড় উদ্বৃত্তের সম্ভাবনা দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
আইএমএফের বার্ষিক পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি আশাবাদী ছিল ব্যাংক অব কোরিয়ার মূল্যায়ন। ২২ অক্টোবর প্রকাশিত ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে’ কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে:
শক্তিশালী সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির জোরে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত উচ্চ পর্যায়ে থাকবে এবং বছরের জন্য প্রাথমিক পূর্বাভাস ৪৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বাভাসে বার্ষিক মোট উদ্বৃত্ত ৫০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছানোর ইঙ্গিত দেওয়া হয়। তা আগের বছরের প্রায় ১২৩.১ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ডের প্রায় চার গুণ হবে। আইএমএফের ৪২১.৯৪৬ বিলিয়ন ডলারের প্রক্ষেপণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রাথমিক ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাস এবং প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা—সবই পূর্বাভাস, পূর্ণ বছরের চূড়ান্ত ফল নয়।
বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে। কোরিয়া সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষে আটটি বড় বিনিয়োগ ব্যাংকের গড় পূর্বাভাসে ২০২৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বৃত্ত জিডিপির ১৭.৫ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ১৭.৪ শতাংশ হবে। আগের মাসের তুলনায় এই অনুমান যথাক্রমে ১.৫ ও ২.৪ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
দাম ও এআই খাতে ব্যয় তৈরি করছে নির্দিষ্ট খাতকেন্দ্রিক ঝুঁকি
কোরিয়া ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ইয়াং জুন-সক এই প্রবৃদ্ধির পেছনে দামকে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন:
উদ্বৃত্তের মূল কারণ সেমিকন্ডাক্টর—আর পরিমাণের চেয়ে দাম।
এআই খাতে বিনিয়োগ কমে গেলে বা মেমোরি সরবরাহকারীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়লে এই আয় দ্রুত কমে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইয়াং:
এআইয়ের জোয়ার স্তিমিত হলে, অথবা এআই মেমোরি আরও বেশি কোম্পানি তৈরি করতে শুরু করলে এবং দামের প্রতিযোগিতা তীব্র হলে, চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত দ্রুত কমে যাবে।
কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি রিসার্চের অর্থনৈতিক গবেষণা দপ্তরের প্রধান কিম কোয়াং-সক যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী সরবরাহকারীদের কথা বলেছেন। তাঁর উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে মাইক্রন এবং চীনের চ্যাংশিন মেমোরি টেকনোলজিস, যা সিএক্সএমটি নামে পরিচিত। এসব কোম্পানি সক্ষমতা বাড়ালে দক্ষিণ কোরিয়ার উৎপাদকদের বাজারের অংশ হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে চাহিদা ও প্রতিযোগিতা একই আয়ের উৎসকে ভিন্ন দিক থেকে প্রভাবিত করে। এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ধীর হলে চিপের চাহিদা কমবে। প্রতিদ্বন্দ্বী উৎপাদকদের সরবরাহ বাড়লে দামের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। তৃতীয় প্রান্তিকে সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি মূল্যের প্রায় নয়-দশমাংশই মেমোরি চিপ হওয়ায় ওই বাজারের পরিবর্তনের প্রভাবও হবে উল্লেখযোগ্য।
পরবর্তী সময়ে উদ্বৃত্ত কমার পূর্বাভাস আইএমএফের
আইএমএফের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ার চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত ২০২৭ ও ২০২৮ সালেও ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি থাকবে। এরপর ২০২৯ সালে তা কমে ২৯৫.৬৫৬ বিলিয়ন ডলার এবং ২০৩১ সালে ১৭৭.৪৯১ বিলিয়ন ডলার হবে। আন্তর্জাতিক তালিকায় দেশটির অবস্থান ২০২৯ সালে তৃতীয় এবং ২০৩১ সালে পঞ্চমে নেমে আসতে পারে।
২০৩১ সালের অঙ্কটি ২০২৬ সালের জন্য আইএমএফের ৪২১.৯৪৬ বিলিয়ন ডলারের প্রক্ষেপণের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ কম। পূর্বাভাসগুলো বর্তমান সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে উল্লেখযোগ্য পতনের ইঙ্গিত দিলেও দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বৃত্ত বড় অঙ্কেরই থাকবে।
ইয়াংয়ের মতে, আয়ের এই সুসময় দুর্বল হওয়ার আগে সংকটে থাকা ব্যবসাগুলো পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করেছে। কিম আর্থিক ঝুঁকি আরও ভালোভাবে সামলানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ সুদের হার এবং বিনিময় হারে তীব্র উলটপালটের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন।
রপ্তানির শক্তিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, তবে অভ্যন্তরীণ চাহিদাও গুরুত্বপূর্ণ
সেমিকন্ডাক্টরের জোয়ার ইতিমধ্যেই সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস উন্নত করতে সহায়তা করেছে। আইএমএফের অক্টোবরের মূল্যায়নে ২০২৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি জুলাইয়ের ২.৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.৩ শতাংশ করা হয়। ২০২৭ সালের পূর্বাভাসও ২.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২.৮ শতাংশ করা হয়।
এই ঊর্ধ্বমুখী সংশোধনের পেছনে ছিল সেপ্টেম্বরের রেকর্ড ১২০.৯ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি, যার মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি ছিল ৬০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বাণিজ্য আয় বাড়িয়ে দিচ্ছে যে নির্দিষ্ট খাতনির্ভরতা, সেটিই দ্রুততর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশাকেও চালিত করছে।
রপ্তানি ধীর হলে সহায়তার উৎস হিসেবে সরকার অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর কথা বলেছে। নতুন শিল্পে বিনিয়োগ এবং সেবা খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোও তাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। চিপ শিল্পের বাইরের ব্যবসা ও কর্মীদের জন্য বাস্তব প্রশ্ন হলো, রপ্তানি আয় কতটা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং পুরো অর্থনীতিতে ব্যয়ে রূপ নেয়।
বিদেশের সঙ্গে লেনদেন থেকে দক্ষিণ কোরিয়া এখন অস্বাভাবিক রকমের বড় অঙ্কের আয় পাচ্ছে। এই শক্তি টেকসই করতে সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা, রপ্তানিকারকেরা যে দাম পাচ্ছেন এবং চিপের বাজারের চক্র শীতল হলে প্রবৃদ্ধিতে অন্য শিল্প ও অভ্যন্তরীণ ব্যয়ের অবদান—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হবে।
মূল বিষয়গুলো
- দ্বিতীয় প্রান্তিকে দক্ষিণ কোরিয়ার চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ১১৬.৬৩ বিলিয়ন ডলার; তথ্য পাওয়া ৩৬টি বড় অর্থনীতির মধ্যে দেশটি ছিল দ্বিতীয়।
- ১৯৯৬ সাল থেকে পাওয়া তুলনাযোগ্য তথ্যের মধ্যে এই প্রথম উদ্বৃত্ত জার্মানি ও জাপানের সম্মিলিত অঙ্ককে ছাড়িয়ে যায়।
- তৃতীয় প্রান্তিকে সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি ২১৮.৭ শতাংশ বেড়ে ১৪৮.০২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়; এর প্রায় ৮৮.৩ শতাংশ ছিল মেমোরি চিপ।
- আইএমএফ ২০২৬ সালে ৪২১.৯৪৬ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্তের পূর্বাভাস দেয়, যা জিডিপির ১৮.৮ শতাংশের সমান।
- ব্যাংক অব কোরিয়ার প্রত্যাশা ছিল, বার্ষিক উদ্বৃত্ত প্রাথমিক ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের পূর্বাভাস ছাড়িয়ে যাবে।
- পরবর্তী বছরগুলোতে উদ্বৃত্ত কমবে বলে আইএমএফের পূর্বাভাস। এদিকে অর্থনীতিবিদেরা এআই খাতে ব্যয় কমা এবং চিপের প্রতিযোগিতা বাড়ার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন।






