মন্থর প্রবৃদ্ধি ও বাড়তি দাম পুনরুদ্ধারের পথে চাপ সৃষ্টি করছে
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০২৬/২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.২% করেছে এবং মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ১০.৯% করেছে। এতে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের চেয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর ব্যাংককে সংস্থাগুলোর বার্ষিক সভা চলাকালে আইএমএফের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকে এসব পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়।
সূচিপত্র
- মন্থর প্রবৃদ্ধি ও বাড়তি দাম পুনরুদ্ধারের পথে চাপ সৃষ্টি করছে
- তিন ঋণদাতা সংস্থা পূর্বাভাস কমিয়েছে
- ২০২৬ সালে কীভাবে বদলেছে সম্ভাবনার চিত্র
- তারিখ ও প্রবৃদ্ধির হিসাব সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন
- মূল্যস্ফীতিতে গত বছরের স্বস্তি উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা
- শিল্প, ঋণ ও সরকারি বিনিয়োগ এখনো দুর্বল
- জ্বালানির বাড়তি ব্যয় বাহ্যিক চাপ বাড়াচ্ছে
- আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে পিছিয়ে বাংলাদেশ
- অর্থায়ন নিয়ে আলোচনায় এখনো নিশ্চিত কোনো প্যাকেজ নেই
- মূল বিষয়গুলো
এই সংশোধনের ফলে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রত্যাশিত পুনরুদ্ধারের বড় অংশই উল্টে গেছে। এপ্রিলে আইএমএফের প্রত্যাশা ছিল, বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি হবে ৪.৩% এবং গড় মূল্যস্ফীতি হবে ৬%। সংস্থাটির সর্বশেষ মূল্যায়নে প্রবৃদ্ধি ১.১ শতাংশ পয়েন্ট কমানো হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৪.৯ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানো হয়েছে। শুধু জুলাই থেকে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.৫% থেকে কমে ৩.২% হয়েছে।
পূর্বাভাস সত্যি হলে প্রবৃদ্ধির হার ২০১৯/২০ অর্থবছরে মহামারির মধ্যে রেকর্ড করা ৩.৪৫% প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম হবে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮৮/৮৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.১১%। প্রায় চার দশকের মধ্যে পূর্বাভাসটিকে সবচেয়ে দুর্বল বলার পেছনে এই ঐতিহাসিক তুলনাটিই রয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যাংককে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা চেয়েছেন এবং ১৩ অক্টোবর আইএমএফের নির্বাহী পরিচালক উর্জিত প্যাটেল ও বিশ্বব্যাংকের অপারেশনস ব্যবস্থাপনা পরিচালক আন্না বিজার্ডের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, জ্বালানিসংকট মোকাবিলা এবং অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি থেকে পরিবারগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা চলার মধ্যে বাংলাদেশ অর্থায়নের সন্ধান করছে।
মূল উদ্বেগের জায়গা হলো, দুটি পূর্বাভাস একসঙ্গে কী ইঙ্গিত দিচ্ছে। দাম আয় বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত বাড়লে অর্থনীতি সম্প্রসারিত হলেও পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হতে পারে। প্রবৃদ্ধি মন্থর হলে ব্যবসার জন্য কর্মী নিয়োগ বাড়ানো এবং সহায়তা তহবিলের জন্য সরকারের প্রয়োজনীয় রাজস্ব আদায়ও কঠিন হয়।
তিন ঋণদাতা সংস্থা পূর্বাভাস কমিয়েছে
তিনটি প্রধান উন্নয়ন ঋণদাতা সংস্থার মধ্যে আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এখন সবচেয়ে কম। বিশ্বব্যাংক ২০২৬/২৭ অর্থবছরে ৩.৪% প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, আর এডিবির প্রত্যাশা ৪%। আইএমএফের পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের চেয়ে ০.২ শতাংশ পয়েন্ট এবং এডিবির চেয়ে ০.৮ শতাংশ পয়েন্ট কম।
তিন সংস্থাই পূর্বাভাস কমিয়েছে, যদিও তাদের পূর্বাভাসের গতিপথ এক নয়। বিশ্বব্যাংক ৬ অক্টোবর তার পূর্বাভাস এপ্রিলে করা ৪.৬% থেকে কমিয়ে ৩.৪% করেছে, অর্থাৎ ১.২ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়েছে। এডিবির সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৫% থেকে কমিয়ে ৪% করা হয়; একটি প্রতিবেদনে আগের পূর্বাভাসটি জুলাইয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক দুর্বল সম্ভাবনার কারণ হিসেবে জ্বালানিসংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগে ভাটা, ঋণপ্রবাহে স্থবিরতা এবং রাজস্বসংক্রান্ত কঠোর সীমাবদ্ধতার কথা বলেছে। এডিবিও কাঠামোগত জ্বালানিঘাটতি, ব্যাংক খাতের চাপ ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতিকে প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রত্যাশিত পুনরুদ্ধার কেন হয়নি, তা ব্যাখ্যা করেছে বিশ্বব্যাংক:
"আগের ধারণার চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানিসংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণপ্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা এবং রাজস্বসংক্রান্ত কঠোর সীমাবদ্ধতার প্রভাব অব্যাহত থাকায় এই অবনতি হয়েছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দুর্বলই থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে," বলেছে বিশ্বব্যাংক।
ভবিষ্যতে মূল্যচাপ কতটা বাড়বে, সে বিষয়েও সংস্থাগুলোর পূর্বাভাসে পার্থক্য রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ৮.৬% মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দিয়েছে, আর এডিবির পূর্বাভাস ৯%। আইএমএফের ১০.৯% পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের চেয়ে ২.৩ শতাংশ পয়েন্ট এবং এডিবির চেয়ে ১.৯ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। এগুলো আলাদা পূর্বাভাস, কোনো একক সম্মত মূল্যায়ন নয়।
২০২৬ সালে কীভাবে বদলেছে সম্ভাবনার চিত্র
ধারাবাহিক সংশোধনগুলো দেখায়, অবনতি শুধু অক্টোবরে একবারের ঘোষণায় সীমাবদ্ধ ছিল না। কয়েক মাস ধরে প্রত্যাশা দুর্বল হয়েছে, আর ঋণ ও শিল্প খাতের সূচকগুলো পুনরুদ্ধারের পথে বাধার ইঙ্গিত দিয়েছে।
- এপ্রিল: ২০২৬/২৭ অর্থবছরে আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৪.৩% এবং মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ৬%। বিশ্বব্যাংকের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৪.৬%।
- জুন: বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি কমে ৪.৫% হয়, যা ৩৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
- জুলাই: আইএমএফের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৩.৫%।
- সেপ্টেম্বর: এডিবি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪.৫% থেকে কমিয়ে ৪% করে।
- ৬ অক্টোবর: বিশ্বব্যাংক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয় ৩.৪% এবং মূল্যস্ফীতির ৮.৬%।
- ১২ অক্টোবর: বাংলাদেশ ব্যাংককে অর্থায়নের প্রয়োজন ও সংস্কারের অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরে।
- ১৩ অক্টোবর: আইএমএফ ৩.২% প্রবৃদ্ধি ও ১০.৯% মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস প্রকাশ করে, আর চৌধুরী ঋণদাতা সংস্থাগুলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
২০২৫/২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৬% হবে বলে আইএমএফের পূর্বাভাস, আগের বছরের ৩.৫% থেকে যা বেশি। এই ধারাবাহিক হিসাব অনুযায়ী, সামান্য উন্নতির পর সর্বশেষ পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি ০.৪ শতাংশ পয়েন্ট কমার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
তারিখ ও প্রবৃদ্ধির হিসাব সতর্কতার সঙ্গে দেখা প্রয়োজন
আইএমএফের পরিসংখ্যান কোন সময়কালকে নির্দেশ করছে, তা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে পার্থক্য রয়েছে। বেশির ভাগ প্রতিবেদনে ৩.২% প্রবৃদ্ধি ও ১০.৯% মূল্যস্ফীতিকে ২০২৬/২৭ অর্থবছরের পূর্বাভাস বলা হয়েছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে একই পরিসংখ্যানকে ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষের পূর্বাভাস হিসেবে তুলে ধরে, পাশাপাশি ২০২৫ সালে ৩.৫% এবং ২০২৬ সালে ৩.৬% প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অর্থবছর ও পঞ্জিকাবর্ষের সময়কাল এক নয়। বাংলাদেশের ২০২৬/২৭ অর্থবছর জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত। ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষের পূর্বাভাস জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কে বোঝায়। আইএমএফের উপাত্তের সঙ্গে দেওয়া দেশের তথ্য যাচাই না করে এই পরিসংখ্যানগুলোকে একই হিসেবে ধরা উচিত নয়।
অতীতের প্রবৃদ্ধির হিসাব নিয়েও সংস্থাগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আইএমএফের সর্বশেষ হিসাবে ২০২৫/২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৩.৬%, আর দারিদ্র্য ও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় বিশ্বব্যাংকের হিসাব ছিল ৩.৪%। ২০২৪/২৫ অর্থবছরের জন্য আইএমএফের সর্বশেষ ৩.৫% হিসাবও জানুয়ারিতে সংস্থাটির আগের মূল্যায়নে উল্লেখ করা ৩.৭% থেকে আলাদা।
বিশ্বব্যাংকের আশঙ্কা, টানা চতুর্থ বছরের মতো প্রবৃদ্ধি মন্থর হবে। অন্যদিকে, আইএমএফের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে ২০২৪/২৫ থেকে ২০২৫/২৬ অর্থবছরে সামান্য প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। উভয় সংস্থার হিসাবেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল, তবে এগুলোকে একটি নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক ধারায় মিলিয়ে দেখা উচিত নয়। একইভাবে, ৩.২% এখনো একটি পূর্বাভাস; কয়েক দশকের মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধি হয়েছে, এমন নিশ্চিত তথ্য নয়।
মূল্যস্ফীতিতে গত বছরের স্বস্তি উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা
আইএমএফের মূল্যসংক্রান্ত পূর্বাভাস ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগের বছর যে স্বস্তি মিলেছিল তা স্থায়ী নাও হতে পারে। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪/২৫ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০% থেকে কমে ২০২৫/২৬ অর্থবছরে ৮.৭% হয়। তা বেড়ে ১০.৯% হলে এই পতন উল্টে যাবে এবং আগের ১০% হারের চেয়ে ০.৯ শতাংশ পয়েন্ট বেশি হবে।
২০২৬/২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল যথাক্রমে ৮.৩২%, ৮.২৬% এবং ৮.৩৪%। এই হারগুলোর সরল গাণিতিক গড় প্রায় ৮.৩১%, যা পুরো বছরের জন্য তিন ঋণদাতা সংস্থার পূর্বাভাসের চেয়ে কম। এই তুলনা দিয়ে শেষ পর্যন্ত বার্ষিক হার কত হবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না; তবে আইএমএফ গড় মূল্যচাপ কতটা বাড়বে বলে আশা করছে, তা বোঝা যায়।
মূল্যস্ফীতি বলতে দাম বাড়ার হার বোঝায়; দাম বেশি না কম, তা নয়। মূল্যস্ফীতি ১০% থেকে ৮.৭%-এ নামার অর্থ দাম ধীরে বাড়ছে, আগের স্তরে ফিরে যাচ্ছে না। ফলে পূর্বাভাসে মূল্যস্ফীতির নতুন করে বাড়ার আগে থেকেই পরিবারগুলোকে উল্লেখযোগ্য দামবৃদ্ধির চাপ সামলাতে হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্যসংক্রান্ত পূর্বাভাসে পরিবারগুলোর ঝুঁকি স্পষ্ট: জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮.৭% থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে আনুমানিক ২২.৫% হয়েছে এবং ২০২৭ অর্থবছরে ২২.৮%-এ পৌঁছাতে পারে। এগুলো মডেলভিত্তিক হিসাব, তবে আয়বৃদ্ধি দুর্বল থাকা ও মূল্যস্ফীতি আবার বাড়লে আর্থিক সঞ্চয় কম এমন পরিবারগুলোর জন্য তা কতটা কঠিন হবে, এই হিসাবগুলো সেটিই তুলে ধরে।
শিল্প, ঋণ ও সরকারি বিনিয়োগ এখনো দুর্বল
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৫/২৬ অর্থবছরে শিল্প উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ২%। মহামারির পর প্রথমবারের মতো তৃতীয় প্রান্তিকে শিল্প খাত সংকুচিত হয়েছে, যা দেখায় উৎপাদনের সমস্যাগুলো শুধু প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তা ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বেসরকারি বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। প্রতিবেদনে উল্লেখিত ২০২৬ সালের জুন মাসে ঋণপ্রবৃদ্ধি ৪.৫% হওয়া মানে বেসরকারি ব্যবসায় ঋণপ্রবাহ খুব ধীরে বাড়ছিল; ৩৩ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন হার। এই পরিসংখ্যান একা বিনিয়োগ ব্যয়ের পরিমাপ নয়, তবে আর্থিক গতি সীমিত থাকার চিত্রকে সমর্থন করে।
রাজস্বসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবায়ন সমস্যার মধ্যে সরকারি বিনিয়োগও ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারি বিনিয়োগ কমে গেলে নির্মাণ, সরঞ্জাম ও সেবার তাৎক্ষণিক চাহিদা দুর্বল হয়। প্রকল্পে বিলম্বের ফলে পণ্য উৎপাদন ও পরিবহনে ব্যবসার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নও পিছিয়ে যেতে পারে।
২০২৭/২৮ অর্থবছর পর্যন্ত অর্থনৈতিক দুর্বলতা অব্যাহত থাকবে বলে বিশ্বব্যাংকের প্রত্যাশা। ওই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩.৯%, যা ২০২৬/২৭ অর্থবছরের ৩.৪% পূর্বাভাসের তুলনায় সামান্য পুনরুদ্ধার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে এলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে বলে ব্যাংকটি আগে আশা করেছিল, কিন্তু জ্বালানি, ঋণ ও বাজেটের সীমাবদ্ধতা পুনরুদ্ধারের পথে বাধা হয়ে রয়েছে।
জ্বালানির বাড়তি ব্যয় বাহ্যিক চাপ বাড়াচ্ছে
অক্টোবরের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুকের শিরোনাম ‘চাপে স্থিতিস্থাপকতা, জরুরি সিদ্ধান্ত’। এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ব্যয়বহুল জ্বালানি ও বাণিজ্য উত্তেজনার চাপে থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতার কারণে এসব ব্যয়ের চাপ পড়ে, আর দেশের ভেতরের জ্বালানিসংকটও উৎপাদন সীমিত করছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ২০২৫ সালের তুলনায় ৪১% বেশি হবে এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়বে ৪৮%। সংস্থাটির বিশ্লেষণের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চের শেষে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলার, আর জুনের শুরুতে প্রায় ১০০ ডলার। সেপ্টেম্বর নাগাদ উপসাগরীয় অঞ্চলের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধের আগের মাত্রার ৮৮%-এ ফিরে এসেছিল, অর্থাৎ ওই মাত্রার তুলনায় এখনো ১২% কম।
আমদানি মূল্য বাড়লে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা লাগে। এতে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও কারখানা পরিচালনার খরচও বাড়তে পারে। ঋণদাতা সংস্থাগুলোর চিহ্নিত জ্বালানিসংকটের সঙ্গে উৎপাদন দুর্বল থাকা ও মূল্যস্ফীতি বেশি হওয়ার সতর্কতার যোগসূত্র তৈরি করছে এসব চাপ।
পঞ্জিকাবর্ষভিত্তিক আইএমএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জিডিপির ০.৩% থাকা বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি ২০২৭ সালে বেড়ে ২.১% হবে; ২০২৫ সালে হিসাবটি প্রায় ভারসাম্যে ছিল। অর্থাৎ ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে ঘাটতি ১.৮ শতাংশ পয়েন্ট বাড়বে।
চলতি হিসাবের মধ্যে পণ্য ও সেবার বাণিজ্যের পাশাপাশি আয় ও রেমিট্যান্সসহ বিভিন্ন স্থানান্তরের হিসাব থাকে। ঘাটতি বাড়ার অর্থ বাহ্যিক অর্থায়নের প্রয়োজন বাড়ছে, তবে এর মাধ্যমে রিজার্ভ বা বিনিময় হার কতটা বদলাবে, তা একা নির্ধারণ করা যায় না। মূলধন প্রবাহ, ঋণ নেওয়া এবং অন্যান্য আর্থিক লেনদেনও গুরুত্বপূর্ণ।
আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে পিছিয়ে বাংলাদেশ
প্রতিবেদনে দেওয়া আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভারতের প্রবৃদ্ধি হবে ৭% এবং ভুটানের ৬.৯%, যেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৩.২%। ব্যবধান যথাক্রমে ৩.৮ ও ৩.৭ শতাংশ পয়েন্ট। মালদ্বীপে প্রবৃদ্ধি হবে ৩.৮% এবং নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় ৩.৭% করে।
এই অর্থনীতিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসও সবচেয়ে বেশি। আইএমএফের হিসাবে, ভারতে মূল্যস্ফীতি হবে ৪.৪%, ভুটানে ৬.৫%, মালদ্বীপে ২.৫%, নেপালে ৫.৮% এবং শ্রীলঙ্কায় ৫.৪%। বাংলাদেশের ১০.৯% পূর্বাভাস ভারতের দ্বিগুণেরও বেশি; অর্থাৎ প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি দুর্বল, আবার দাম বাড়ার গতিও দ্রুত।
অন্য একটি প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ভিয়েতনামের জন্য ৮.৪%, ইন্দোনেশিয়ার জন্য ৫.১% এবং চীনের জন্য ৪.৫%; বাংলাদেশের জন্য তা ৩.৬%। এই তুলনা বাংলাদেশের দুর্বল সম্ভাবনার মাত্রা তুলে ধরে, যদিও দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির অবস্থান নির্ধারণে জাতীয় হিসাবের সময়কাল ভিন্ন হওয়ায় সতর্কতা প্রয়োজন।
অর্থায়ন নিয়ে আলোচনায় এখনো নিশ্চিত কোনো প্যাকেজ নেই
ব্যাংককে বাংলাদেশের সহায়তার আবেদন এসেছে ২০২৬/২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা চাওয়ার পর। ব্যাংক খাত পুনর্গঠন, কর রাজস্ব বাড়ানো, দরিদ্র পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়া এবং বন্ধ কারখানা চালুর ওপর ভিত্তি করে পাঁচ বছরের পুনরুদ্ধার কৌশলের কথা সরকার জানিয়েছে। ঋণদাতাদের সঙ্গে মূল লক্ষ্য নিয়ে ঐকমত্য হওয়া মানেই অর্থায়ন অনুমোদন পাওয়া নয়।
চৌধুরীর কর্মসূচি বাতিলের বক্তব্যের পর আগের আইএমএফ ব্যবস্থার অবস্থাও বিতর্কিত রয়ে গেছে। ৪ অক্টোবর তিনি বলেন, কর্মসূচিটি বাতিল করেছেন। তবে কর্মকর্তারা বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানান এবং বিদ্যমান ব্যবস্থাটি এখনো কার্যকর আছে কি না, সে বিষয়ে তাঁদের বক্তব্যে পার্থক্য ছিল।
আইএমএফের বৃহত্তর নীতিগত পরামর্শে বাজারদর দমিয়ে রাখার ব্যাপক পদক্ষেপের বদলে দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে সাময়িক সহায়তা দেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্যাপকভাবে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার তুলনায় সরকারি অর্থের প্রয়োজন তিন থেকে ২২ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। এটি একটি সাধারণ তুলনা, বাংলাদেশের কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচির ব্যয় নিরূপণ নয়।
বাংলাদেশের জন্য বাস্তব চ্যালেঞ্জ হলো, জ্বালানি ও ব্যাংক খাতের সংস্কার চলার সময় সীমিত সরকারি অর্থ সংরক্ষণ করে কীভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা করা যায়। নতুন পূর্বাভাস এসব সিদ্ধান্তের জরুরিতা বাড়িয়েছে, তবে অতিরিক্ত অর্থায়নের শর্ত, পরিমাণ বা অনুমোদনের তারিখ নির্ধারণ করেনি।
বার্ষিক সভা ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। নতুন ঋণ অনুমোদনের কোনো নিশ্চিত সময়সীমা বা প্রস্তাবিত সংস্কারের বিস্তারিত সময়সূচি এসব প্রতিবেদনে ঘোষণা করা হয়নি। পরবর্তী বাস্তব অগ্রগতি হবে কোনো অর্থায়ন চুক্তি এবং এর সঙ্গে যুক্ত শর্তাবলি; আলোচনা চলছে, সেটি নয়।
মূল বিষয়গুলো
- আইএমএফের পূর্বাভাসে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.২% এবং মূল্যস্ফীতি ১০.৯%; এপ্রিলে পূর্বাভাস ছিল যথাক্রমে ৪.৩% ও ৬%।
- বিশ্বব্যাংক ৩.৪% প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, আর এডিবির প্রত্যাশা ৪%। দুই সংস্থাই পূর্বাভাস কমিয়েছে।
- জ্বালানিসংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, ঋণপ্রবাহে স্থবিরতা ও সরকারি বিনিয়োগ সীমিত থাকা পুনরুদ্ধারে চাপ সৃষ্টি করছে।
- আইএমএফের পরিসংখ্যান ২০২৬/২৭ অর্থবছর, নাকি ২০২৭ পঞ্জিকাবর্ষের পূর্বাভাস, তা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে পার্থক্য রয়েছে।
- আইএমএফ চলতি হিসাবের ঘাটতি বাড়া এবং বৈশ্বিক জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধিরও পূর্বাভাস দিয়েছে।
- বাংলাদেশ আরও সহায়তা চাইছে, তবে নতুন অর্থায়ন প্যাকেজ ও এর শর্তাবলি নিশ্চিত হয়নি।






