বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার পেছনে থাকা ইউনিট শনাক্ত তদন্তকারীদের
জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বিমান হামলার পেছনে থাকা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর কয়েকটি ইউনিট ও তাদের কমান্ড কাঠামো শনাক্ত করেছেন। এতে তাদের তদন্ত ধ্বংসযজ্ঞের তথ্য নথিবদ্ধ করার গণ্ডি ছাড়িয়ে কারা ফৌজদারি দায় বহন করতে পারে, তা নির্ধারণের দিকে এগিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় নিয়ে ১১ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত তাদের অষ্টম বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সামরিক বাহিনীর আয়োজন করা নির্বাচনের আগে হামলা বেড়েছিল এবং ভোট শেষ হওয়ার পরও সহিংসতা অব্যাহত ছিল।
সূচিপত্র
- বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার পেছনে থাকা ইউনিট শনাক্ত তদন্তকারীদের
- আকাশপথের কৌশলে সতর্ক হওয়ার সময় কমে যায়
- নির্বাচনের সমালোচনা ফৌজদারি অপরাধে পরিণত
- নির্যাতনের তদন্তে সামরিক বাহিনীর বাইরের পক্ষও
- রাখাইনে হামলায় আগে থেকেই বাস্তুচ্যুত মানুষ ঝুঁকিতে
- সাগাইং ও কারেনের প্রতিবেদনে আরও বোমা হামলার বর্ণনা
- নতুন করে পালানোয় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন আরও কঠিন
- ভিন্ন হতাহতের পরিসংখ্যান ভিন্ন ধরনের ক্ষতির হিসাব
- প্রমাণ আদালতে পৌঁছালেও রায় আলাদা বিষয়
- মূল বিষয়গুলো
মিয়ানমারবিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা (আইআইএমএম) বলেছে, তারা বাড়িঘর, স্কুল, চিকিৎসাকেন্দ্র, ধর্মীয় স্থাপনা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরে ইচ্ছাকৃত হামলার তথ্য নথিবদ্ধ করেছে। সামরিক বাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনীর নির্বিচার আটক, নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কথিত গুরুতর অপরাধও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক ২০২৬ সালের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতাংশে নিশ্চিত করা হয়েছে, তদন্তকারীরা আকাশপথে হামলার জন্য দায়ী কয়েকটি ইউনিট শনাক্ত করেছেন এবং তাদের কমান্ড কাঠামো খতিয়ে দেখেছেন। ২০২৫ সালের একটি আইনের সঙ্গে যুক্ত আটক-সংক্রান্ত অপরাধের তদন্তেও অগ্রগতির কথা জানিয়েছে সংস্থাটি। ওই আইনে নির্বাচনের সমালোচনা করাকে অপরাধ করা হয়েছে। আটক নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে প্রজনন-সংক্রান্ত সহিংসতার অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে।
১,৬০০টিরও বেশি সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসব অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ৭৫০টিরও বেশি প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনার পাশাপাশি ছবি, ভিডিও, ফরেনসিক প্রমাণ ও স্যাটেলাইট চিত্র রয়েছে। এগুলো তদন্তের ফল, ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় নয়। আসামিদের বিরুদ্ধে নিজেরা মামলা পরিচালনার বদলে আদালতের জন্য প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে সংস্থাটি।
আইআইএমএমের প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান এই কাজের পেছনের মানবিক দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেছেন:
আমরা যেসব প্রমাণ সংগ্রহ করি, তার প্রতিটির পেছনে এমন মানুষ আছেন, যাদের জীবন এসব অপরাধে বিপর্যস্ত হয়েছে।
প্রমাণ সংরক্ষণ আর আদালতের রায় পাওয়ার মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ: কোনো ইউনিট শনাক্ত করা বা নির্দেশের সূত্র অনুসরণ করে মামলার ভিত্তি গড়া যেতে পারে, তবে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী দায় নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতেরই।
আকাশপথের কৌশলে সতর্ক হওয়ার সময় কমে যায়
তদন্তে বলা হয়েছে, কম উচ্চতা থেকে অনির্দেশিত বিস্ফোরক ফেলতে সামরিক বাহিনীর প্যারামোটর, জাইরোকপ্টার ও ড্রোনের ব্যবহার বাড়ছে। প্যারামোটর হলো মোটরচালিত প্যারাগ্লাইডার; জাইরোকপ্টার হলো ছোট আকারের উড়োজাহাজ, যার রোটর বায়ুপ্রবাহে ঘোরে। প্রচলিত যুদ্ধবিমানের তুলনায় সস্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করে এসব উড়োজাহাজ থেকে হামলা চালানো যায়।
সাগাইং অঞ্চলের উত্তরাংশে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগে প্যারামোটরের চালকেরা ইঞ্জিন বন্ধ করে দিতেন বলে যে অভিযোগ উঠেছে, তা তদন্ত করছেন কর্মকর্তারা। নীরবে গ্লাইড করে কোনো জনপদের দিকে এগিয়ে গেলে বাসিন্দাদের পালানো বা আশ্রয় নেওয়ার জন্য খুব কম সময় থাকে। অভিযোগগুলো তদন্তাধীন নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার, সব হামলাতেই এ কৌশল ব্যবহৃত হয় এমন সিদ্ধান্ত নয়।
আইআইএমএম একের পর এক হামলার কথাও জানিয়েছে, যেখানে প্রথম হামলার পর আরেকটি হামলা চালানো হয়। এতে প্রথম হামলার পর ঘটনাস্থলে ছুটে যাওয়া উদ্ধারকর্মী, আহতদের সাহায্যকারী কিংবা পালানোর চেষ্টা করা বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকতে পারে। এ ধরনের হামলায় প্রথম বিস্ফোরণের পরও বিপদ দীর্ঘায়িত হতে পারে এবং সহায়তাকারীরা নতুন করে হামলার শিকার হতে পারেন।
তদন্তকারীরা হামলায় ব্যবহৃত গোলাবারুদ এবং বিমান হামলার নির্দেশ কীভাবে দেওয়া হয়েছিল, দুটিই খতিয়ে দেখেছেন। এ কাজের মধ্য দিয়ে হামলাস্থলের বস্তুগত প্রমাণের সঙ্গে দায়ী সামরিক সংগঠনগুলোর যোগসূত্র স্থাপন করা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিক উদ্ধৃতাংশে শনাক্ত ইউনিট বা কমান্ডারদের নাম প্রকাশ করা হয়নি, আর প্রতিবেদনকালের বিমান হামলার পূর্ণাঙ্গ সংখ্যাও দেওয়া হয়নি।
নির্বাচনের সমালোচনা ফৌজদারি অপরাধে পরিণত
২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারির নির্বাচন ঘিরে দমন-পীড়নের পাশাপাশি আকাশপথে হামলাও বেড়েছিল। সামরিক বাহিনী-সমর্থিত একটি দল ভোটে জয়ী হয়। পশ্চিমা সরকার ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো নির্বাচনকে অবাধ বা সুষ্ঠু নয় বলে প্রত্যাখ্যান করে। পরে মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট হন।
২০২৫ সালে প্রণীত একটি আইনের সঙ্গে যুক্ত আটক-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো তদন্ত করছে আইআইএমএম। ওই আইনে নির্বাচনের সমালোচনা করাকে অপরাধ করা হয়েছে। শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রতিবেদনে বর্ণিত ঘটনাগুলোর মধ্যে ভোটের সমালোচনা করে অনলাইনে মন্তব্য করা বা ভোটের বিরোধিতায় লিফলেট বিতরণ করায় শাস্তি পাওয়ার ঘটনা রয়েছে।
তাই তদন্তে নির্বাচন দুটি ভিন্নভাবে এসেছে: একদিকে, যে সময়ের আগে বিমান হামলা বেড়েছিল; অন্যদিকে, সমালোচকদের গ্রেপ্তারে ব্যবহৃত আইনের বিষয় হিসেবে। তবে শুধু সময়ের মিল থেকে প্রতিটি হামলা বা আটকের পেছনের উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয় না।
তদন্তকারীরা বলছেন, জানুয়ারিতে ভোট শেষ হওয়ার পরও হামলা চলেছে। সাগাইং, রাখাইন ও কারেন রাজ্যে হামলার অক্টোবরের বিবরণগুলো বার্ষিক প্রতিবেদনের ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়সীমার বাইরে। এগুলোকে পরবর্তী সময়ে জানানো ঘটনা হিসেবে দেখতে হবে, ওই প্রতিবেদনে ইতিমধ্যে মূল্যায়ন করা ঘটনা হিসেবে নয়।
নির্যাতনের তদন্তে সামরিক বাহিনীর বাইরের পক্ষও
সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন স্থানে নির্বিচার আটক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন এবং মৃত্যুর বিষয়ে ব্যাপক প্রমাণ সংগ্রহ করেছে সংস্থাটি। তাদের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতাংশে আটক নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে প্রজনন-সংক্রান্ত সহিংসতার অভিযোগও রয়েছে। এ কথায় প্রজননস্বাস্থ্য বা এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন সহিংসতা বোঝানো হয়েছে; ব্যক্তিগত ঘটনাগুলোতে ঠিক কী করা হয়েছিল, উদ্ধৃতাংশে তা উল্লেখ নেই।
বেশির ভাগ প্রমাণ সামরিক বাহিনী ও মিত্র মিলিশিয়াদের বিষয়ে হলেও, বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সংঘটিত বলে অভিযোগ ওঠা অপরাধও তদন্ত করছেন কর্মকর্তারা। সংঘাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার অভিযোগও এর মধ্যে রয়েছে।
রাখাইন রাজ্যে তদন্তের আওতায় এসেছে আরাকান আর্মির সদস্যরাও। রাজ্যের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই বাহিনী সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছে। রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন সহিংসতা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, শিশুদের নিয়োগ এবং মসজিদ ধ্বংসের অভিযোগ রয়েছে।
আনুষ্ঠানিক উদ্ধৃতাংশে রোহিঙ্গা, রাখাইন ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নির্বিচার আটক, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সহায়তায় বাধা দেওয়ার ঘটনা নিয়ে তদন্ত সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে। এতে আরাকান আর্মির সদস্যদের কথিত অপরাধী হিসেবে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একাধিক পক্ষের বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে বলে তাদের আচরণ, নির্যাতনের মাত্রা বা দায় একই, এমনটা বোঝায় না। প্রতিটি অভিযোগের জন্য আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন।
বার্ষিক তদন্ত বা আগস্টে রাখাইনে হামলার পৃথক অভিযোগ নিয়ে সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এর আগে তারা বলে এসেছে, বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় এবং প্রতিরোধ বাহিনীকে সন্ত্রাসী বলে অভিযুক্ত করেছে। তবে এসব বক্তব্য বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু নিয়ে তদন্তকারীদের অনুসন্ধানের মীমাংসা করে না।
রাখাইনে হামলায় আগে থেকেই বাস্তুচ্যুত মানুষ ঝুঁকিতে
আরাকান আর্মি বলেছে, ১ থেকে ১১ আগস্ট রাখাইনের তিনটি টাউনশিপে সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় প্রায় ২০ বেসামরিক মানুষ নিহত এবং ২২ জন আহত হয়েছেন। একটি হামলায় আটটি পর্যন্ত উড়োজাহাজ অংশ নেয় এবং তা প্রায় এক ঘণ্টা স্থায়ী হয় বলে খবর পাওয়া গেছে। এসব সংখ্যা সংঘাতের একটি পক্ষের দেওয়া; স্বাধীনভাবে যাচাই করা মোট সংখ্যা হিসেবে এগুলো উপস্থাপন করা হয়নি।
পরবর্তী প্রতিবেদনগুলোতে অক্টোবরে পন্নাগিউন টাউনশিপের বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবিরে হামলার কথা বলা হয়েছে। একটি বিবরণে দুটি হামলায় আটজন নিহত ও ১৩ জন আহত হওয়ার কথা রয়েছে: রোববার ছয়জন নিহত ও ১১ জন আহত হন, এরপর সোমবার সকালে দুজন নিহত ও দুজন আহত হন। আরেকটি বিবরণেও অন্তত আটজনের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে, তবে তাতে রোববারের হামলায় ছয়জন এবং পৃথক একটি ওয়াই-১২ উড়োজাহাজের হামলায় একজন নিহত হওয়ার কথা রয়েছে। এই হিসাব শিরোনামে উল্লেখ করা মোট মৃত্যুর পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয় না।
পন্নাগিউন ইয়ুথ অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র কিয়াও উইন তুন শিবির দুটির বাসিন্দাদের বিষয়ে বলেছেন:
ওখানে সবাই বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষ।
রাখাইনের লেখক ও ত্রাণকর্মী ওয়াই হুন অং বলেছেন, শিবিরগুলো সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে। হামলার বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি এবং সরকারের একজন মুখপাত্র তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।
২৮ সেপ্টেম্বর প্রতিবেশী কিয়াউকতাও টাউনশিপের একটি বাজারের কাছে হামলায় ৫০ জন নিহত এবং অন্তত ৫৮ জন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। আরেকটি বিবরণে রাখাইনের একটি বাজারে হামলায় একই সংখ্যক হতাহতের কথা বলা হলেও সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ নেই। তাই এগুলোকে দুটি পৃথক ঘটনার প্রমাণ ধরে সংখ্যা যোগ করা উচিত নয়। ম্রাউক উ-এর একটি হাসপাতালে ডিসেম্বরে হামলায় অন্তত ৩০ জন নিহত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে রয়েছে।
সাগাইং ও কারেনের প্রতিবেদনে আরও বোমা হামলার বর্ণনা
সাগাইংয়ে ১১ ও ১২ অক্টোবরের হামলা নিয়ে প্রতিবেদনে শোয়েবো টাউনশিপের সেইখুন গ্রামের একটি মঠ প্রাঙ্গণে তিন দফা বোমা হামলার কথা বলা হয়েছে। এর পর ওয়েতলেত টাউনশিপের চারটি গ্রামে ৩০টি হামলা হয়। দুই দিনে অন্তত পাঁচজন বেসামরিক মানুষ নিহত ও ২৩ জন আহত হওয়ার কথা একটি বিবরণে রয়েছে।
অক্টোবরের মঠে হামলার আরেক বিবরণে ছয়জন নিহত এবং প্রায় ২১ জন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। দুই বিবরণেই মঠে দুজন নিহত ও আটজন আহত হওয়ার বিষয়ে একমত। ওয়েতলেতের হতাহতের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ওয়েতলেতের হামলার সময় কোনো লড়াই চলছিল না।
মঠটিতে বাস্তুচ্যুত বেসামরিক মানুষ ও বয়স্ক ব্যক্তিরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। বৌদ্ধ শিক্ষক মহাসি সায়াদাওকে স্মরণে নির্মিত ভবনগুলো ধ্বংস হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে, যদিও পুরো প্রাঙ্গণের ক্ষয়ক্ষতি কতটা, সে বিষয়ে বিবরণে পার্থক্য রয়েছে। মিয়াউং টাউনশিপের একটি মঠে ২১ আগস্ট পৃথক হামলায় ১৫ জন নিহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
কারেন রাজ্যের উত্তর কাওকারেইক টাউনশিপে স্থানীয় সূত্র ও প্রতিরোধ যোদ্ধারা ৬ থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের হামলার কথা জানিয়েছেন। এতে যুদ্ধবিমান, ওয়াই-১২ উড়োজাহাজ ও সশস্ত্র ড্রোন ব্যবহার করা হয়। ৮ অক্টোবর সকালে অন্তত ৫০টি বোমা ফেলা হয়েছিল বলে খবর পাওয়া গেছে। ৭ অক্টোবর কুইমাউংতাইং গ্রামে ৫০০ পাউন্ডের একটি বোমা আঘাত হানে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২,০০০-এর বেশি বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানা গেছে। বোমা হামলা তীব্র হওয়ার আগেই অনেক গ্রামবাসী পালিয়ে যাওয়ায় হতাহতের সংখ্যা ও ভবনের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তী এসব বিবরণে আইআইএমএমের তদন্তাধীন ঘটনাগুলোর মতো উড়োজাহাজ ও বেসামরিক স্থাপনার কথা রয়েছে, তবে সেগুলোর তথ্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বার্ষিক তদন্তের যাচাইকৃত অনুসন্ধান হিসেবে ধরা যাবে না।
নতুন করে পালানোয় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন আরও কঠিন
রাখাইনের সহিংসতায় নতুন করে মানুষ বাংলাদেশে আসছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১ লাখ ৫৪ হাজার ছাড়িয়েছে। ধারাবাহিক নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির পর কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।
২০১৭ সালের আগস্টে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের সময় ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি মানুষ পালিয়ে যায়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সীমা ধরে হিসাব করলে সাম্প্রতিক সময়ে আসা মানুষের সংখ্যা আগের ওই দেশত্যাগের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। পরিসংখ্যান দুটি ভিন্ন সময়ের, তাই কত মানুষ বাস্তুচ্যুত রয়ে গেছে তার সুনির্দিষ্ট পরিমাপ হিসেবে এগুলো বিবেচনা করা উচিত নয়।
বাংলাদেশে ছয় দিনের সফরে কুমজিয়ান রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং রাখাইনে চলমান অপরাধের তদন্ত নিয়ে আলোচনা করেন। আইআইএমএমের প্রধান তদন্তের পরিধি সম্পর্কে বলেন:
বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অপরাধীদের দ্বারা রাখাইন রাজ্যে বর্তমানে সংঘটিত অত্যন্ত গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের অভিযোগ তদন্ত করছে সংস্থাটি।
তিনি আরও বলেন, শরণার্থীদের সাম্প্রতিক সাক্ষ্য তদন্ত এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ। চলমান হামলা, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি ও সহায়তায় বিধিনিষেধ নিরাপদে ফিরে যাওয়ার পথে বাধা সৃষ্টি করছে, প্রত্যাবাসন নিয়ে আলোচনা যা-ই হোক না কেন।
অক্টোবরে মালয়েশিয়ার প্রত্যাবাসন আলোচনা চলাকালে এ সমস্যা স্পষ্ট হয়। মালয়েশিয়া জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তারা ১০,৪৯৩ জন মিয়ানমারের নাগরিককে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। অন্যদিকে মিন অং হ্লাইং বলেছেন, তার প্রশাসন শুধু মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে নিশ্চিত হওয়া ব্যক্তিদের গ্রহণ করবে। ধারাবাহিক সরকারগুলোর কাছ থেকে নাগরিকত্ব না পাওয়া অনেক রোহিঙ্গাকে এ শর্তে বাদ দেওয়া হতে পারে।
ভিন্ন হতাহতের পরিসংখ্যান ভিন্ন ধরনের ক্ষতির হিসাব
একটি মাত্র পরিসংখ্যান দিয়ে মিয়ানমারের যুদ্ধের ব্যাপ্তি বোঝানো যায় না। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির অভ্যুত্থানের পর থেকে মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় এক লাখ বলে সামগ্রিক হিসাবে ধারণা করা হয়। আর রাজনৈতিক বন্দিদের সহায়তা সংস্থা জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ৮,০০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত এবং ৩১,০০০-এর বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছেন।
এগুলো ভিন্ন ধরনের হিসাব, পরস্পরবিরোধী সংখ্যা নয়। সামগ্রিক যুদ্ধের মৃত্যুর অনুমান এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত বেসামরিক মানুষের ওই সংস্থার নথিতে আলাদা শ্রেণি অন্তর্ভুক্ত। এ সংখ্যা দুটি যোগ করা উচিত নয়।
২০২১ সালের ১৪ মার্চ থেকে সামরিক বাহিনীর নামে নথিবদ্ধ ৫১০টি ঘটনায় অন্তত ৫,৩৫৮ জন নিহত হওয়ার কথা পৃথক একটি গণহত্যা-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডারে রয়েছে। এতে গণহত্যা বলতে এমন ঘটনা বোঝানো হয়েছে, যেখানে অন্তত পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ সীমার কারণে পাঁচজনের কম নিহত হওয়ার হামলাগুলো বাদ পড়ে, আর এই সংখ্যা বেসামরিক হতাহতের অন্য হিসাবের সঙ্গে মিলে যেতে পারে।
বাস্তুচ্যুতির হিসাবও প্রতিবেদনে ভিন্ন: একটিতে ৩৫ লাখের বেশি, আর জাতিসংঘের উদ্ধৃতি দেওয়া অন্যটিতে প্রায় ৩৮ লাখ। এসব হিসাবের সময়কাল ও আওতা এক নয়, তাই পার্থক্য দেখে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৩ লাখ বেড়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
বার্ষিক তদন্তকে আগের অপরাধ ও পরবর্তী হামলা থেকে আলাদা করে দেখার জন্য সংক্ষিপ্ত কালপঞ্জি:
- আগস্ট ২০১৭: সামরিক অভিযানে ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যায়।
- ফেব্রুয়ারি ২০২১: সামরিক বাহিনী নির্বাচিত বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে, যার জেরে বিক্ষোভ ও সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়।
- জুলাই ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬: আইআইএমএমের অষ্টম বার্ষিক প্রতিবেদনের আওতাধীন সময়কাল।
- ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬: সামরিক বাহিনীর আয়োজন করা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়; এ সময় তদন্তকারীরা হামলা বাড়তে দেখেন।
- জানুয়ারি ২০২৬: মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার মামলায় দ্য হেগে প্রকাশ্য শুনানিতে আইআইএমএমের দেওয়া প্রমাণের উল্লেখ করা হয়।
- ১১ আগস্ট ২০২৬: বার্ষিক তদন্তের ফল প্রকাশিত হয়।
- অক্টোবর ২০২৬: রাখাইন, কারেন রাজ্য ও সাগাইংয়ে আরও হামলার খবর আসে।
প্রমাণ আদালতে পৌঁছালেও রায় আলাদা বিষয়
২০১৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ আইআইএমএম প্রতিষ্ঠা করে। ২০১১ সাল থেকে মিয়ানমারে সংঘটিত সবচেয়ে গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করে সংস্থাটি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি), আর্জেন্টিনার কর্তৃপক্ষ এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) কার্যক্রমে এ কাজ সহায়তা করে।
এই সংস্থাগুলোর কাজ আলাদা। আইসিসি ও জাতীয় ফৌজদারি আদালত ব্যক্তির ফৌজদারি দায় নির্ধারণ করে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ মীমাংসা করে আইসিজে। এর মধ্যে ২০১৬ ও ২০১৭ সালের অভিযানে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে মিয়ানমার গণহত্যা সনদ লঙ্ঘন করেছে বলে গাম্বিয়ার অভিযোগও রয়েছে।
আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনের উদ্ধৃতাংশে বলা হয়েছে, আইআইএমএম দুই রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রমাণ ও বিশ্লেষণ ভাগ করে নিয়েছে। জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রকাশ্য শুনানিতে এসব উপাদানের ব্যাপক উল্লেখ করা হয়। এতে প্রমাণ আইনি কার্যক্রমে পৌঁছানোর বিষয়টি বোঝা যায়, অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়।
সার্বজনীন এখতিয়ারের নীতিতে ২০২৪ সালে আর্জেন্টিনা কার্যক্রম শুরু করে। এ নীতিতে কোনো দেশের আদালত নির্দিষ্ট কিছু গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ বিবেচনা করতে পারে, যদিও সেগুলো অন্য কোথাও সংঘটিত হয়। আলাদাভাবে, মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে ইন্দোনেশিয়ায় করা গণহত্যার অভিযোগ ৬ এপ্রিল ২০২৬ প্রসিকিউটররা গ্রহণ করেন। অভিযোগ গ্রহণ করা আর মামলা পরিচালনা বা দোষী সাব্যস্ত করা এক বিষয় নয়।
প্রতিবেদনের উদ্ধৃতাংশে বিমান হামলার তদন্তে শনাক্ত সামরিক ইউনিটগুলোর নাম নেই, ওই অনুসন্ধানের ভিত্তিতে কোনো অভিযোগ আনার কথাও বলা হয়নি; পরবর্তী শুনানির তারিখও উল্লেখ নেই। প্রমাণ সংরক্ষণ এবং কথিত অপরাধের সঙ্গে দায়ী ব্যক্তিদের যোগসূত্র স্থাপনের মধ্যেই এ কাজের আইনি গুরুত্ব। মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আদালতের।
মূল বিষয়গুলো
- আইআইএমএমের আগস্ট ২০২৬-এর প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় অন্তর্ভুক্ত। এতে বিমান হামলার জন্য দায়ী সামরিক বাহিনীর কয়েকটি ইউনিট ও কমান্ড কাঠামো শনাক্ত করা হয়েছে।
- তদন্তকারীরা বলছেন, ডিসেম্বর ও জানুয়ারির নির্বাচনের আগে হামলা বেড়েছিল এবং পরে তা অব্যাহত ছিল।
- তদন্তে নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, নির্বাচন-সংক্রান্ত আটক এবং বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর কথিত অপরাধ রয়েছে।
- পরবর্তী প্রতিবেদনে বাস্তুচ্যুত মানুষের শিবির, গ্রাম ও মঠে আরও হামলার কথা রয়েছে; হতাহতের কিছু হিসাবে পার্থক্যও রয়েছে।
- ২০২৪ সালের শুরু থেকে ১ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে বলে খবর। সহিংসতা নিরাপদে ফিরে যাওয়ার পথে বাধা দিচ্ছে।
- আইনি কার্যক্রমের জন্য প্রমাণ সংরক্ষণ ও ভাগ করে নেয় সংস্থাটি; তাদের অনুসন্ধান ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় নয়।






