মাসের পর মাস নির্যাতন ও সতর্কবার্তা উপেক্ষার পর দোষ স্বীকার
সতর্কতা: এই প্রতিবেদনে শিশু নির্যাতনের বিবরণ রয়েছে।
সূচিপত্র
- মাসের পর মাস নির্যাতন ও সতর্কবার্তা উপেক্ষার পর দোষ স্বীকার
- ট্রেভরের জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নির্যাতন শুরু
- আঘাত চোখে পড়লেও সহিংসতা চলতে থাকে
- কান্না থামাতে মুখ চেপে ধরা শুরু
- ১ সেপ্টেম্বর রাতে কী ঘটেছিল
- ময়নাতদন্তের ফল ও স্বীকার করা অপরাধ
- মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন ও গানের ওপর সহিংসতা
- সাজার বিষয়ে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের মতভেদ
- আত্মীয়রা প্রথম জন্মদিনের পরিকল্পনা করছিলেন
- মূল বিষয়গুলো
২৩ বছর বয়সী ক্লোয়ে গান সি শুয়ান এবং ২৭ বছর বয়সী নিয়ো জিয়া মিং ২০২৬ সালের ১২ অক্টোবর সিঙ্গাপুরের হাইকোর্টে তাঁদের ছেলে ট্রেভর নিয়ো ইউ হিনের মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধে দোষ স্বীকার করেন। আট মাস বয়সী শিশুটি ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর মারা যায়। কয়েক সপ্তাহ বয়স থেকেই তার ওপর বারবার নির্যাতন চলছিল।
বিচারপতি হু শিউ পেংয়ের আদালতে শুনানিতে উঠে আসে, ট্রেভরকে ঝাঁকিয়ে অচেতন করার পর তাকে আগে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল, এক আয়া তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখেছিলেন, তার নানি সতর্ক করেছিলেন এবং শিশুটির মা-বাবা কালশিটে দাগ লুকানোর চেষ্টা করেছিলেন। কেউই অন্যজনের সহিংসতা থামাননি।
মৃত্যুর আগের রাতে গান বারবার ট্রেভরের মুখ ঢেকে দেন এবং পরে তাকে খাটে উপুড় করে শুইয়ে দেন। নিয়ো ঘরেই ছিলেন, কিন্তু ছেলেকে রক্ষা করেননি। ট্রেভর শ্বাস নিচ্ছে না বুঝতে পেরে দম্পতি তাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন এবং ট্যাক্সিতে করে কেকে উইমেনস অ্যান্ড চিলড্রেনস হাসপাতালে (কেকে হাসপাতাল) নিয়ে যান। নিয়ো অ্যাম্বুলেন্সের খরচ দিতে চাননি।
অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল শিশুর মৃত্যু ঘটানো বা তা ঘটতে দেওয়া, শিশুর প্রতি দুর্ব্যবহার এবং দুর্ব্যবহার করতে দেওয়া। নিয়ো গানের ওপর হামলা-সংক্রান্ত অপরাধও স্বীকার করেন। কৌঁসুলি গানের কর্মকাণ্ডের বিবরণ দেওয়ার সময় তিনি কাঁদছিলেন, আর নিয়ো ছিলেন নির্বিকার।
চূড়ান্ত ময়নাতদন্তে মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায়নি। তবে পরবর্তী চিকিৎসা মূল্যায়নে বলা হয়, ট্রেভরের নাক-মুখ ঢেকে দেওয়া বা তাকে উপুড় করে শুইয়ে রাখলে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি হতে পারত। সাজা নিয়ে যুক্তিতর্কে প্রত্যেক মা-বাবার দায়িত্ব, বিপদের বিষয়ে তাঁদের জ্ঞান এবং গানের মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। শুনানি ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।
ট্রেভরের জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নির্যাতন শুরু
ট্রেভরের জন্ম ২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর, তার মা-বাবার বিয়ের চার মাস পর। ২০২৩ সালের এপ্রিলে গর্ভবতী হওয়ার কথা জানার পর গান নিয়োর সঙ্গে থাকতে মা-বাবার বাড়ি ছেড়ে যান। সন্তান জন্মের পর তিনি মা-বাবার বাড়িতে ফিরে আসেন। প্রসব-পরবর্তী সময়ে তাঁকে সহায়তা করেন একজন প্রসূতি-পরিচর্যাকারী আয়া।
আদালতের বিবরণ অনুযায়ী, গান ও ট্রেভর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নিয়োর বাড়িতে ফিরে যান। তাঁরা হাউগাংয়ে হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের একটি ফ্ল্যাটে নিয়োর আত্মীয়দের সঙ্গে থাকতেন। ফেব্রুয়ারি থেকে সপ্তাহের কর্মদিবসগুলোতে একজন আয়া ট্রেভরের দেখাশোনা করতেন, আর সন্ধ্যায় ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আত্মীয়রা সাহায্য করতেন।
গান নিয়োকে ট্রেভরকে ঝাঁকাতে দেখেন। এতে শিশুটির কান্না থামত বা সে অচেতন হয়ে পড়ত বুঝতে পেরে গানও একই কাজ শুরু করেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে গান ট্রেভরকে ঝাঁকিয়ে অচেতন করে ফেললে প্রায় এক সপ্তাহ তাকে হাসপাতালে থাকতে হয়।
আদালতে বর্ণিত খুদে বার্তাগুলোতে ট্রেভরের বয়স প্রায় ৪১ দিন থাকাকালে তাকে ঝাঁকানোর কথা ছিল। নিয়ো মস্তিষ্কের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেন, আর গান কত জোরে তাকে ঝাঁকিয়েছিলেন তা জানান। পরে গান নিয়োকে বলেন, ঝাঁকানোর পর ট্রেভর এতটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল যে দুধ পান করেনি। বার্তাগুলোতে দেখা যায়, মা-বাবা নির্যাতন চালিয়ে যাওয়ার সময়ও এর বিপজ্জনক পরিণতি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
আঘাত চোখে পড়লেও সহিংসতা চলতে থাকে
২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে আগস্টের মধ্যে গান ট্রেভরের হাত, বুক, উরু ও নিতম্বে আঘাত করেন, যার ফলে কালশিটে দাগ পড়ে। নিয়ো এসব হামলার অনেকগুলো দেখেও বাধা দেননি। মে মাসে গানের মা কালশিটে দাগ দেখে মেয়েকে শিশুটিকে মারধর বন্ধ করতে সতর্ক করেন।
নিয়োও ট্রেভরের আঙুল বারবার চিমটি কাটতেন। শিশুটির প্রতিক্রিয়া তাঁর কাছে মজার লাগায় মাসে দুই-তিনবার এমন করতেন, কখনো কখনো একবারে ২০ থেকে ৩০ বার চিমটি কাটতেন। গান সেখানে উপস্থিত থাকলেও তাঁকে থামাননি। অন্য নির্যাতনের মধ্যে ছিল জোরে চড় মারা এবং এমনভাবে চেপে ধরা, যাতে ট্রেভরের ত্বক বেগুনি হয়ে যেত বা কালশিটে পড়ত।
২০২৪ সালের ২ এপ্রিল ট্রেভরের আয়া জিহ্বার নিচে রক্তপাত দেখতে পেয়ে তাকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার জন্য জোর করলে তাকে কেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। নিয়ো শিশুটিকে আয়ার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় তার মুখের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে খোঁচাখুঁচি করেছিলেন। চিকিৎসক জিহ্বার নিচে স্থানীয় আঘাত ও লালচে ভাব নথিভুক্ত করেন।
মা-বাবা আঘাত লুকানোর বিষয়েও আলোচনা করেছিলেন। নিয়ো গানকে বলেন, মুখের কালশিটে দাগ চড়ের কারণে হয়েছে না বলে ফোন দুর্ঘটনাক্রমে ট্রেভরের ওপর পড়েছিল, এমনটা বলতে। আগস্টের শুরুতে তিনি গানের উদ্দেশে বলেন, চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে শিশুটিকে যেন না মারা হয়, যাতে চিকিৎসক কালশিটে দাগ দেখে নির্যাতনের সন্দেহ না করেন।
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, হাসপাতালে ভর্তি, আরেকটি চিকিৎসা পরীক্ষা এবং পরিবারের সরাসরি সতর্কবার্তার পরও সহিংসতা চলেছিল। তবে সে সময় প্রত্যেক পরিচর্যাকারী বা চিকিৎসাকর্মী নির্যাতনের পুরো চিত্র সম্পর্কে কী জানতেন, তা এগুলো থেকে নিশ্চিত হয় না।
কান্না থামাতে মুখ চেপে ধরা শুরু
আদালতে বলা হয়, কান্না থামাতে দুজনই ট্রেভরের নাক-মুখ ঢেকে দিতেন। প্রথমে গান কম্বল ব্যবহার করতেন। ট্রেভর সেটি সরিয়ে ফেলার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠলে তিনি হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরতেন, অচেতন না হওয়া পর্যন্ত চাপ দিতেন।
নিয়ো কখন থেকে এ কাজ শুরু করেন, সে বিষয়ে বিবরণে পার্থক্য রয়েছে। একটি বিবরণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলের দিকে এটি নিয়মিত আচরণে পরিণত হয়। অন্য বিবরণে ১৮ ফেব্রুয়ারির আগের একটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে, যখন তিনি প্রায় এক মিনিট ট্রেভরের নাক-মুখ চেপে ধরেছিলেন; এতে শিশুটি দুধ বমি করে এবং তার শরীর বেগুনি হয়ে যায়। আগের এই ঘটনাটি দেখায়, নিয়মিতভাবে করা শুরু হওয়ার আগেই এপ্রিলের আগে এমন আচরণ ঘটেছিল।
ওই ঘটনার পর নিয়ো গানকে বলেন, ট্রেভরকে মেরে ফেলতে পারেন বলে তাঁর ভয় হচ্ছে এবং তিনি আর শিশুটির দেখাশোনা করতে চান না। তা সত্ত্বেও তিনি শিশুটির ওপর নির্যাতন চালিয়ে যান। তিনি জানতেন যে ট্রেভরের শ্বাসরোধ করছেন, তবে দাবি করেন, তাকে ঘুম পাড়ানোর একমাত্র উপায় এটাই।
কান্না থামানোর উপায় হিসেবে বারবার অচেতন হয়ে পড়াকে বিবেচনা করা হয়েছে। মৃত্যু ও মস্তিষ্কে আঘাতের ঝুঁকি নিয়ে মা-বাবার নিজেদের আলোচনা থেকেই বিপদ সম্পর্কে তাঁদের সচেতনতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
১ সেপ্টেম্বর রাতে কী ঘটেছিল
২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাত ৮টার দিকে দম্পতি রাতের খাবার খেয়ে ফেরেন। নিয়োর চাচারা তখন ট্রেভরের দেখাশোনা করছিলেন। পরে মা-বাবা শোবার ঘরে ফোন ব্যবহার করার সময় শিশুটি তার খাটে ছিল।
ট্রেভর কাঁদতে শুরু করলে গান প্রায় এক মিনিট তার মুখের ওপর কম্বল চেপে ধরেন। সে ছটফট করে, তারপর তার নড়াচড়া ধীর হয়ে আসে। গান হাত সরিয়ে নিলে সে আবার কাঁদে, আর তিনি কাজটি কয়েকবার পুনরাবৃত্তি করেন।
ছেলেকে শ্বাসরোধ করার সময় ট্রেভরের বাবা নিয়ো গানকে বলেন। তাঁর কথায় মৃত্যুর ঝুঁকি ও শাস্তির আশঙ্কা উঠে আসে:
কী করছ? তুমি কি শিশুটিকে মেরে ফেলতে চাও? কিছু হলে আমাদের জেলে যেতে হবে।
ট্রেভরের মা গান জবাবে বলেন, সে আবার কাঁদলে একই কাজ করা যেতে পারে:
আগে শিশুটি শব্দ করুক, তারপর আবার চেষ্টা করো।
এরপর গানের হাতের নড়াচড়ার বিবরণে পার্থক্য রয়েছে। একটি বিবরণে বলা হয়েছে, গান দুই হাত দিয়ে ট্রেভরের মুখ ঢেকে এক হাতের ওপর আরেক হাত দিয়ে আঘাত করেন। অন্য বিবরণে বলা হয়েছে, তিনি কম্বলের ওপর জোরে চাপ দেন এবং শিশুটির মুখে আঘাত করেন। তবে সব বিবরণেই একমত যে তিনি হামলা চালিয়ে যান, ট্রেভরকে গদির ওপর উপুড় করে শুইয়ে দেন এবং তার কান্না থেমে যাওয়ার পর ঘুমাতে যান।
রাত প্রায় ১১টা ৩০ মিনিটে ফোনে গেম খেলা শেষ করে নিয়ো ট্রেভরের খোঁজ নেন। শিশুটি শ্বাস নিচ্ছিল না, তার হাত ঠান্ডা ছিল। গান তাকে সাড়া-প্রতিক্রিয়াহীন অবস্থায়, বেগুনি ঠোঁট ও এক চোখ খোলা দেখতে পান। তাঁরা হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন, যাকে সিপিআর বলা হয়, কিন্তু সফল হননি।
নিয়ো গানকে অ্যাম্বুলেন্সের বদলে ট্যাক্সি ডাকতে বলেন। পথে তিনি তাঁকে চুপ থাকতে বলেন এবং ইঙ্গিত দেন, পুলিশ জড়িত না হলে তাঁরা অর্থ নিয়ে দুশ্চিন্তা ছাড়াই জীবন চালিয়ে যেতে পারবেন। ২ সেপ্টেম্বর রাত প্রায় ১২টা ২০ মিনিটে ট্রেভরকে মৃত ঘোষণা করা হয়। সন্দেহজনক পরিস্থিতির কথা হাসপাতালের কর্মীরা পুলিশকে জানান, আর সেদিন সকালে মা-বাবাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ময়নাতদন্তের ফল ও স্বীকার করা অপরাধ
কৌঁসুলিরা বলেন, প্রাথমিক ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে আরও তদন্ত সাপেক্ষে হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাসের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। এই পরিভাষাটি হৃদ্যন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাসের কার্যক্রম বন্ধ হওয়াকে বোঝায়; তবে এতে অন্তর্নিহিত কারণটি নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত নাও হতে পারে।
মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায়নি বলে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে মৃত্যুর কারণ ‘অনির্ণীত’ লেখা হয়। শারীরিক গঠনগত কোনো প্রমাণ বা আঘাত থেকে নিশ্চিত কারণ পাওয়া যায়নি। পরবর্তী চিকিৎসা প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রেভরকে শ্বাসরোধ করা বা উপুড় করে শুইয়ে রাখলে শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি হয়ে প্রাণঘাতী শ্বাসরোধ হতে পারত।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ: চিকিৎসা পরীক্ষায় মৃত্যুর কোনো একটি কারণ চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করা যায়নি, অন্যদিকে মা-বাবা ট্রেভরের মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধ স্বীকার করেছেন। আদালতে শেষবারের হামলা ও তার আগের বারবার নির্যাতনের বিস্তারিত বিবরণও দেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্তে কারণ অনির্ণীত থাকাকে শ্বাসরোধে মৃত্যুর নিশ্চিত চিকিৎসাগত সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করা উচিত নয়।
মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়ন ও গানের ওপর সহিংসতা
ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের (আইএমএইচ) মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০২৪ সালের মার্চ বা এপ্রিলে গান প্রসব-পরবর্তী কোনো মানসিক রোগে ভুগছিলেন না। আংশিকভাবে তাঁর মায়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মূল্যায়নে অপরাধ সংঘটনের সময় তাঁর মানিয়ে নেওয়ার সমস্যাজনিত মানসিক ব্যাধি ছিল বলে চিহ্নিত করা হয়, যা অপরাধে সামান্য ভূমিকা রাখতে পারে।
মানিয়ে নেওয়ার সমস্যাজনিত মানসিক ব্যাধিতে মানসিক চাপের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। গান কর্মক্ষেত্র, আর্থিক অবস্থা ও শিশুর পরিচর্যা নিয়ে চাপে ছিলেন। তবে আইএমএইচের মূল্যায়নে বলা হয়, এই ব্যাধি তাঁর কাজের ঝুঁকি বোঝার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি। নিয়োর ক্ষেত্রে কোনো মানসিক অসুস্থতা বা মানসিক ভারসাম্যহীনতা পাওয়া যায়নি।
নিয়ো ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে গানকে আক্রমণ করার কথাও স্বীকার করেন। একটি আর্কেডে বিবাদের পর তিনি গানের ওপর হামলা চালান, সিরিয়ালে কুসুম গরম পানি দেওয়া নিয়ে তর্কের পর তাঁর মাথায় ১০ বারের বেশি ঘুষি মারেন এবং এক পুরুষ বন্ধুকে তালাক দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়ে পাঠানো বার্তা দেখে তাঁকে আঘাত করেন। বিদেশ সফর শেষে একটি বাসস্টপেও আরেকটি হামলার ঘটনা ঘটে।
গানের পক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেন, এই সহিংসতার কারণে তাঁদের সম্পর্কে নির্যাতন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে উঠেছিল। তিনি আরও গানের অল্প বয়স, মানিয়ে নেওয়ার সমস্যাজনিত মানসিক ব্যাধি, অনুশোচনা ও শেষ রাতের অবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, তিনি ভেঙে পড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন। সাজা কমানোর যুক্তি হিসেবে এসব কথা বলা হয়েছিল; ট্রেভরের বিপদ বোঝার ক্ষমতা তাঁর ছিল না, এমন সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।
সাজার বিষয়ে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের মতভেদ
প্রসিকিউশন নিয়োর ১৫ থেকে ১৬ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছে। তাঁর পক্ষের আইনজীবীরা সাত বছর ও সাত সপ্তাহের সাজা চেয়েছেন। তাঁদের যুক্তি, শেষ হামলাটি গান চালিয়েছিলেন বলে তাঁর তুলনায় নিয়োর দায় কম।
প্রসিকিউশনের যুক্তি, ক্ষতিটা একই ছিল। নিয়ো গানকে ট্রেভরকে ঝাঁকানো শিখিয়েছিলেন, নির্যাতনে অংশ নিয়েছিলেন এবং প্রাণঘাতী ঘটনাগুলোর সময় উপস্থিত থেকেও ছেলেকে রক্ষা করেননি। গানের ওপর হামলার কথা স্বীকার করাও তাঁর সাজা নির্ধারণের বিবরণের অংশ ছিল।
২০ বছর বয়সে বৈদ্যুতিক স্কুটার চালানোর সময় একটি শিশুকে আহত করার অপরাধে নিয়োকে আগে পরীক্ষাকালীন নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। গানের পক্ষের আইনজীবীরা সাড়ে ১২ থেকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড চেয়েছেন।
একই পরিবারের ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যু ঘটানো বা তা ঘটতে দেওয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে; জরিমানা বা বেত্রাঘাতের সাজাও দেওয়া যেতে পারে। গান নারী হওয়ায় তাঁকে বেত্রাঘাত করা যাবে না। শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত পৃথক ধারায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ৪০ হাজার সিঙ্গাপুর ডলার জরিমানার বিধান রয়েছে বলে জানানো হয়। এগুলো আইনে নির্ধারিত সর্বোচ্চ সাজা, এ মামলায় ইতিমধ্যে দেওয়া সাজা নয়।
আত্মীয়রা প্রথম জন্মদিনের পরিকল্পনা করছিলেন
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আত্মীয়দের দেওয়া বিবরণে দেখা যায়, ট্রেভরকে ঘিরে পরিবারের অনেকেই তার যত্ন নিতেন। শুধু ‘নিয়ো’ পদবি দিয়ে পরিচিত তার এক জ্যাঠামহা বলেন, আত্মীয়রা সন্ধ্যায় ট্রেভরের দেখাশোনা করতেন, সাধারণত রাত ৯টার দিকে তার ঘুমানোর সময় পর্যন্ত। মাতৃকুলের দাদা-দাদি ও নিয়োর পরিবারের সদস্যরা সাপ্তাহিক ছুটিতে পালা করে সাহায্য করতেন।
জ্যাঠামহা স্মরণ করেন, ১ সেপ্টেম্বর রাত প্রায় ১১টা ৩০ মিনিটে মা-বাবাকে বেরিয়ে এসে ট্রেভরকে হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলতে দেখেছিলেন। তিনি বলেন, রাত প্রায় ১টার দিকে মৃত্যুর খবর পান। পরিবারের আরেকজনের বিবরণ অনুযায়ী, খবরটি পাওয়া যায় রাত প্রায় ২টায়। এই স্মৃতিচারণাগুলো আদালতের সময়রেখার সঙ্গে মেলে না; আদালতের বিবরণ অনুযায়ী, রাত প্রায় ১১টা ৩০ মিনিটে নিয়ো বুঝতে পারেন ট্রেভর শ্বাস নিচ্ছে না।
ট্রেভরের এক জ্যাঠাইমা তার মৃত্যুর পর পরিবারের শোকের কথা বলেন:
ট্রেভরকে চিরতরে হারিয়েছি, এটা মেনে নেওয়া আমাদের জন্য খুব কঠিন ছিল। সে ছিল খুবই ছোট।
৯ ডিসেম্বর তার প্রথম জন্মদিনে কেক ও চীনা ঐতিহ্যবাহী উদ্যাপনের পরিকল্পনা করেছিলেন আত্মীয়রা। এর বদলে ৪ সেপ্টেম্বর পরিবারের সদস্যরা সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতাল থেকে তার মরদেহ নিয়ে আসেন। সঙ্গে ছিল পোশাক, খেলনা ও গুঁড়ো দুধ।
ট্রেভরের জন্ম থেকে দোষ স্বীকার পর্যন্ত মামলার গুরুত্বপূর্ণ তারিখগুলো হলো:
- ৯ ডিসেম্বর, ২০২৩: ট্রেভরের জন্ম।
- জানুয়ারি ২০২৪: গান তাকে ঝাঁকিয়ে অচেতন করার পর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
- ২ এপ্রিল, ২০২৪: হাসপাতালের একজন চিকিৎসক তার জিহ্বার নিচের আঘাত পরীক্ষা করেন।
- ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৪: ট্রেভরকে মৃত ঘোষণা করা হয় এবং তার মা-বাবাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
- ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪: তখন ২১ ও ২৫ বছর বয়সী গান ও নিয়োর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
- ১২ অক্টোবর, ২০২৬: দুজনই তার মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধে দোষ স্বীকার করেন।
- ২১ অক্টোবর, ২০২৬: পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়।
মূল বিষয়গুলো
- জন্মের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হওয়া নির্যাতনের পর আট মাস বয়সে ট্রেভর নিয়ো ইউ হিনের মৃত্যু হয়।
- নির্যাতন ও তার মৃত্যুর দায়-সংশ্লিষ্ট অপরাধে মা-বাবা দুজনই দোষ স্বীকার করেন।
- আরও সহিংসতার আগে হাসপাতালে ভর্তি, দৃশ্যমান আঘাত এবং পরিবারের সতর্কবার্তা ছিল।
- চূড়ান্ত ময়নাতদন্তে মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি; পরবর্তী চিকিৎসা প্রতিবেদনে শ্বাসপ্রশ্বাসে প্রাণঘাতী বাধার ঝুঁকির কথা বলা হয়।
- গানের মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নে বলা হয়, ঝুঁকি বোঝার ক্ষমতা তাঁর ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
- নিয়ো গানের ওপর হামলার কথাও স্বীকার করেন। শুনানি ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।






