সিঙ্গাপুরের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় ক্রমবর্ধমান সংকট
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছানোর সময়ে মনোবিজ্ঞানীর তীব্র সংকট মোকাবিলা করছে সিঙ্গাপুর। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির ২৬% প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে বিষণ্নতা বা উদ্বেগের হালকা উপসর্গ রয়েছে, ১৯% জানিয়েছেন তাঁদের উপসর্গ মাঝারি পর্যায়ের এবং ৭% গুরুতর উপসর্গে ভুগছেন। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক: ১৪.৯% তরুণের বিষণ্নতার উপসর্গ গুরুতর বা অত্যন্ত গুরুতর এবং ২৭% তীব্র উদ্বেগের উপসর্গে ভুগছেন।
সূচিপত্র
চাপ শুধু রোগনির্ণয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সিঙ্গাপুরের কর্মজীবী প্রাপ্তবয়স্কদের ৬৬.৮৪% কর্মক্ষেত্রে অবসাদে ভুগছেন। কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের চাপে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফিলিপাইনের পরই দেশটির অবস্থান। স্বাস্থ্যকর্মীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে রয়েছেন; তাঁদের ৩৯% অবসাদের কথা জানিয়েছেন। এসব পরিসংখ্যান পেশাদার সহায়তার বাস্তব চাহিদার ইঙ্গিত দেয়, অথচ যোগ্য মনোবিজ্ঞানীর সংখ্যা সেই চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
বর্তমান জনবলসংক্রান্ত পরিসংখ্যান সংকটের ব্যাপকতা তুলে ধরে। ২০২৩ সালের হিসাবে, সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন ২৯৮ জন এবং নিবন্ধিত মনোবিজ্ঞানী ৬৯১ জন; প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে এই সংখ্যা যথাক্রমে ৫.১ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ১১.৯ জন লাইসেন্সধারী মনোবিজ্ঞানী। সিঙ্গাপুর সাইকোলজিক্যাল সোসাইটিতে এখন অন্তত ৮৭০ জন মনোবিজ্ঞানী নিবন্ধিত হলেও, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে তাঁদের সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০০। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের দেশে এই সংখ্যা ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে অপর্যাপ্ত।
এই সংকটের কারণে সেবায় প্রবেশাধিকারেও পরিমাপযোগ্য বাধা তৈরি হয়েছে। ভর্তুকিযুক্ত সেবার জন্য মনোবিজ্ঞানীর কাছে যেতে গড় অপেক্ষার সময় ৪২ দিন এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞের ক্ষেত্রে ৪৫ দিন। ফলে দুর্দশায় থাকা অনেক মানুষ সময়মতো পেশাদার সহায়তা পাচ্ছেন না। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় শুরুতেই হস্তক্ষেপ করা দীর্ঘমেয়াদি ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই বিলম্ব বিশেষভাবে সমস্যাজনক।
সাত বছরের পথচলা: পেশায় প্রবেশের বাধা
সিঙ্গাপুরে যোগ্য মনোবিজ্ঞানী হতে হলে বড় ধরনের অঙ্গীকার প্রয়োজন। প্রচলিত শিক্ষাপথে স্নাতক ডিগ্রির পর ক্লিনিক্যাল প্লেসমেন্ট এবং স্নাতকোত্তর পড়াশোনাসহ প্রায় সাত বছর লাগে। যোগ্যতা অর্জনের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া দ্রুত জনবল বাড়ানোর অন্যতম প্রধান বাধা।
মনোবিজ্ঞানের স্নাতক শিক্ষার্থী জেরেইন সান্দ্রাসাগেরান আগে ক্রীড়া প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। এই পথে এগিয়ে যাওয়ার কঠিন অভিজ্ঞতার কথা তিনি তুলে ধরেন। এক দশক ধরে খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসের সমস্যা ও পারফরম্যান্সের চাপের সঙ্গে লড়তে দেখে তাঁদের আরও ভালোভাবে সহায়তা করতে তিনি মনোবিজ্ঞানে ডিগ্রি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এখন তিনি নিজেকে কঠিন এক পরিস্থিতিতে দেখতে পাচ্ছেন।
যে ক্ষেত্রেই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই না কেন, বেসরকারি বা পেশাদার মনোবিজ্ঞানী হতে হলে পথটা দীর্ঘ। আমরা জানি, কাজটি সত্যিকার অর্থে করতে বা স্বীকৃতি পেতে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা দরকার, পাশাপাশি অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। ফলে আমরা মাঝামাঝি এক অবস্থায় আটকে আছি—আমাদের যথেষ্ট অভিজ্ঞতা নেই, আবার কাজটি করার জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চতর শিক্ষাও নেই।
সমস্যা শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতার মধ্যেই সীমিত নয়। তত্ত্বাবধানে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য জরুরি ক্লিনিক্যাল প্লেসমেন্টের সুযোগ কম এবং প্রতিযোগিতা তীব্র। সিঙ্গাপুর সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. পিয়ারলিন এনজি বলেন, প্লেসমেন্টের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা তৈরি করছে। তাঁর ভাষ্য, প্লেসমেন্টের সুযোগ প্রায়ই সীমিত থাকে এবং যোগ্য তত্ত্বাবধায়কেরও ঘাটতি রয়েছে। শিক্ষার্থীরা জায়গা পেলেও প্রয়োজনীয় কাজের ঘণ্টা পূরণ করতে প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ক্লায়েন্ট খুঁজতে হয়; অথচ সাধারণ মানুষ প্রশিক্ষণার্থী মনোবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিতে প্রায়ই দ্বিধা করেন।
আর্থিক বিষয়গুলো এই পথকে আরও জটিল করে তোলে। স্থানীয় স্নাতকোত্তর কর্মসূচির সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীকে বিদেশে পড়তে যেতে হয়, ফলে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ডা. এনজি জোর দিয়ে বলেন, যোগ্য মনোবিজ্ঞানী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়—শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের জন্যও।
সংস্কারের আভাস: বাধ্যতামূলক নিবন্ধন কাঠামো
এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পেশাটিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং রোগীদের সুরক্ষার লক্ষ্যে উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন আনছে সিঙ্গাপুর। সরকার পাঁচটি নির্দিষ্ট উপশাখায় কর্মরত মনোবিজ্ঞানীদের জন্য বাধ্যতামূলক নিবন্ধন চালুর পরিকল্পনা করছে: ক্লিনিক্যাল, শিক্ষামূলক, কাউন্সেলিং, ফরেনসিক মনোবিজ্ঞান এবং ক্লিনিক্যাল নিউরোসাইকোলজি। এসব ক্ষেত্রে সরাসরি সেবা দেওয়া হয় এবং ঝুঁকির মাত্রা বেশি এমন মূল্যায়ন ও হস্তক্ষেপ জড়িত থাকায় তদারকির প্রয়োজন রয়েছে বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ প্রতিমন্ত্রী কো পো কুনের ভাষ্য অনুযায়ী, নিবন্ধনের বিস্তারিত সময়সূচি, শর্ত এবং রূপরেখা ২০২৭ সালের শুরুর মধ্যে ঘোষণা করা হবে। এই কাঠামোর লক্ষ্য হলো, পেশাজীবীরা যেন নৈতিক মানদণ্ড পূরণ করেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ নেন এবং নির্ধারিত মানে সেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা বজায় রাখেন।
সিঙ্গাপুর সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি অ্যাড্রিয়ান তো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের পক্ষে কথা বলে আসছেন। তাঁর ব্যাখ্যা, নিয়ন্ত্রণ না থাকলে যোগ্যতা বা প্রশিক্ষণ যা-ই হোক, যে কেউ নিজেকে মনোবিজ্ঞানী বলে দাবি করতে পারেন; এতে রোগীর ক্ষতি হতে পারে বা তাঁদের সুস্থতা ব্যাহত হতে পারে। সিঙ্গাপুরের বর্তমান স্বেচ্ছামূলক মনোবিজ্ঞানী নিবন্ধনে শুধু তাঁদেরই রাখা হয়, যাঁদের প্রয়োগিক মনোবিজ্ঞানে স্বীকৃত বিশেষায়নসহ স্নাতকোত্তর বা ডক্টরাল ডিগ্রি এবং তত্ত্বাবধানে উল্লেখযোগ্য ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
নিবন্ধন কাঠামো রোগীদের নিরাপত্তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও, কিছু পেশাজীবীর আশঙ্কা, অতিরিক্ত কঠোর শর্তে বিদ্যমান সংকট আরও বাড়তে পারে। উচ্চ মান বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত জনবল নিশ্চিত করার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নীতি প্রণয়নের একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ব্যবস্থাগত ঘাটতি ও সেবার বিচ্ছিন্নতা
গবেষণায় দেখা গেছে, জনবলের ঘাটতি সিঙ্গাপুরের মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মাত্র একটি দিক। সরকারি ও বেসরকারি খাতের ২০টি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে করা একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে সেবা পাওয়ার পথে একাধিক ব্যবস্থাগত বাধা চিহ্নিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও খাতের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব সহায়তা খোঁজা মানুষের জন্য বড় বাধা তৈরি করে, বিশেষত যাঁদের জটিল প্রয়োজন মেটাতে সমন্বিত সহায়তা দরকার।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় যোগাযোগের আদর্শ প্রথম ধাপ হিসেবে বিবেচিত সাধারণ চিকিৎসকেরা সেবা দিতে গিয়ে উল্লেখযোগ্য বাধার মুখে পড়েন। আর্থিক টেকসইতা বড় সমস্যা: মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পরামর্শ দিতে সময় বেশি লাগে এবং পরিচালন ব্যয়ও বেশি, ফলে বাড়তি সহায়তা ছাড়া এ ধরনের সেবা চালানো কঠিন। এক চিকিৎসক অর্থনৈতিক বাস্তবতার কথা ব্যাখ্যা করে বলেন, ৪৫ মিনিটের সেশনের জন্য ৪০ থেকে ৫০ ডলার ফি নিলে কর্মীদের খরচ, ভাড়া এবং নিবিড় সেবার মানসিক চাপ বিবেচনায় তা আর্থিকভাবে টেকসই হয় না।
বিশেষ করে কর্মজীবী প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে কলঙ্কবোধ সেবার পরিসর সীমিত করে চলেছে। নিজের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা সহায়তা চাইতে দেরি করায়; আবার বিষয়টি প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কর্মীরা কর্মক্ষেত্রের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিতে দ্বিধা করেন, কারণ এতে ক্যারিয়ারের অগ্রগতি ব্যাহত হতে পারে বলে তাঁদের ভয়। ১৮ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের সম্মতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় আরেকটি বাধা তৈরি হয়: সম্ভাব্য কলঙ্ক বা চিকিৎসার নথি নিয়ে উদ্বেগের কারণে বাবা-মা সম্মতি না দিলে তারা সেবা পায় না।
তথ্যের বিচ্ছিন্নতা এই চ্যালেঞ্জ আরও বাড়ায়। সামাজিক সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর কাছে প্রায়ই ক্লায়েন্টদের চিকিৎসার হালনাগাদ তথ্য থাকে না, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবাদানকারীরা রোগীরা কমিউনিটি পর্যায়ে কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন, সে বিষয়ে অবগত নাও থাকতে পারেন। এই সমন্বয়হীনতায় মানুষ সেবার ফাঁকফোকরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষত যাঁদের চিকিৎসা ও সামাজিক—দুই ধরনের জটিল প্রয়োজন রয়েছে।
উদ্ভাবন ও বিকল্প পদ্ধতি
প্রচলিত উপায়ে জনবল বাড়িয়ে তাৎক্ষণিক সংকট মেটানো সম্ভব নয়—এটি স্বীকার করে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে একাধিক উদ্ভাবনী পদ্ধতি খতিয়ে দেখছে সিঙ্গাপুর। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর সম্প্রতি একটি দ্রুততর শিক্ষাপথ চালু করেছে, যাতে শিক্ষার্থীরা সাত বছরের বদলে পাঁচ বছরে প্রশিক্ষণ শেষ করতে পারবেন। এতে তিন বছরের স্নাতক পড়াশোনার সঙ্গে দুই বছরের স্নাতকোত্তর কর্মসূচি যুক্ত করা হয়েছে। এনইউএসের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি কর্মসূচির পরিচালক ডা. লোহসনা জীবানান্দাম বলেন, সংক্ষিপ্ত স্নাতক পর্যায়ে ঐচ্ছিক বিষয়ের সুযোগ কম থাকলেও হাতে-কলমে কঠোর প্রশিক্ষণের মান বজায় রাখা হয়েছে।
জনবলসংকট মোকাবিলায় প্রযুক্তিও আরেকটি পথ খুলে দিচ্ছে। গবেষকেরা এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যার উদ্দেশ্য মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের বদলে কাজ করা নয়, বরং তাঁদের সহায়তা করা। এই দ্বিমুখী সংলাপ ব্যবস্থা থেরাপিস্ট ও ক্লায়েন্টের কথোপকথন বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য উত্তর প্রস্তাব করে, প্রয়োজনীয় উপকরণের সুপারিশ দেয় এবং সেশনের সারসংক্ষেপ তৈরি করে। এতে সেবাদানকারীদের মানসিক চাপ ও ক্লান্তি কমতে পারে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, বৃহৎ ভাষা মডেল মানুষের থেরাপিস্টদের সঙ্গে তুলনীয় সহমর্মিতা প্রকাশ করে এমন উত্তর তৈরি করতে পারে। জনবলসংকটের সময়ে সেবা বাড়াতে এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগও সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া হিউম্যান ইমার্জেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড রেসপন্স টিমস (হার্ট) প্রফেশনালস নেটওয়ার্কে হোম টিমের মনোবিজ্ঞানী, সংশোধন ও পুনর্বাসন বিশেষজ্ঞ এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সংগঠনের পেশাজীবীরা একত্র হয়েছেন। সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে এই নেটওয়ার্ক কাজ করছে। মানসিক স্বাস্থ্য ও সংকট ব্যবস্থাপনায় জ্ঞান ভাগাভাগি, হস্তক্ষেপের পদ্ধতি এবং বিভিন্ন সংস্থার অংশীদারত্ব উন্নত করাও এর লক্ষ্য।
ধ্যান ও সহায়তাভিত্তিক সহকর্মী গোষ্ঠীর মতো পরিপূরক পদ্ধতিও কম খরচে চাপ কমানোর উপায় হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। ধ্যান মানসিক সুস্থতার জন্য বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগযোগ্য একটি উপায় হতে পারে—এটি স্বীকার করে জাতিসংঘ ২০২৪ সালে ২১ ডিসেম্বরকে বিশ্ব ধ্যান দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পেশাদার চিকিৎসার বিকল্প না হলেও, এ ধরনের অনুশীলন মানসিক চাপ সামলাতে এবং সমস্যা সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছানো ঠেকাতে সহায়তা করতে পারে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট: বিশ্বজুড়ে একই চ্যালেঞ্জ
মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি নিয়ে সিঙ্গাপুরের সংগ্রাম আন্তর্জাতিক প্রবণতারই প্রতিফলন। এতে বোঝা যায়, দ্রুত সমাধানের বদলে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যবস্থাগত উদ্যোগ প্রয়োজন। ইংল্যান্ডে রয়্যাল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্টসের সাম্প্রতিক আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, পরামর্শক মনোরোগ বিশেষজ্ঞের প্রতি সাতটি পদের একটি শূন্য রয়েছে। ২০১৫ সালে শূন্য পদের হার ৬% থাকলেও ২০২৫ সালে তা বেড়ে ১৪% হয়েছে। প্রতি বছর মানসিক অসুস্থতায় ভুগবেন বলে ধারণা করা হয়, এমন প্রতি ২,৫৪০ জন মানুষের বিপরীতে বর্তমানে ইংল্যান্ডে রয়েছেন মাত্র একজন পরামর্শক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।
রয়্যাল কলেজ অব সাইকিয়াট্রিস্টসের সভাপতি ডা. লেড স্মিথ সতর্ক করে বলেন, অসহনীয় কাজের চাপ চিকিৎসকদের ভেঙে পড়ার মুখে ঠেলে দিচ্ছে; এতে অবসাদ ও আগেভাগে অবসরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। কলেজটির তথ্য অনুযায়ী, এক-চতুর্থাংশের বেশি পদ হয় শূন্য, নয়তো অস্থায়ী কর্মী দিয়ে পূরণ করা হচ্ছে। এতে অস্থায়ী কর্মীদের ওপর নির্ভরতা বাড়ার চিত্র ফুটে উঠেছে। আন্তর্জাতিক এই মিলগুলো দেখায়, মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী গড়ে তুলতে শিক্ষা, কর্মী ধরে রাখা এবং কাজের পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
সিঙ্গাপুর সরকার ২০৩০ সাল বা তার আগেই সরকারি খাতে মনোবিজ্ঞানীর সংখ্যা প্রায় ৪০% বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে। লক্ষ্যটি উচ্চাভিলাষী হলেও পর্যাপ্ত সক্ষমতা গড়ে তুলতে বছরের পর বছর ধরে নিরলস প্রচেষ্টার প্রয়োজন—এ কথা এতে স্বীকার করা হয়েছে। বাধ্যতামূলক নিবন্ধনে রূপান্তরের প্রস্তুতি নেওয়ার পাশাপাশি সিঙ্গাপুর সাইকোলজিক্যাল সোসাইটি তার স্বেচ্ছামূলক নিবন্ধনে নতুন আবেদন প্রক্রিয়াকরণ চালিয়ে যাচ্ছে, যা মোট যোগ্য জনবলের প্রাথমিক ধারণা দেবে।
যা জানা দরকার
- সিঙ্গাপুরে মনোবিজ্ঞানীর সংকট রয়েছে। দেশটির ৮৭০ জন নিবন্ধিত পেশাজীবীকে এমন একটি জনগোষ্ঠীর সেবা দিতে হচ্ছে, যেখানে অবসাদের হার বেশি (কর্মীদের ৬৬.৮৪%) এবং তরুণদের মধ্যে বিষণ্নতার গুরুতর উপসর্গের হার ১৪.৯%।
- প্রশিক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনে প্রায় সাত বছর লাগে। স্থানীয় স্নাতকোত্তর কর্মসূচি ও প্লেসমেন্টের সুযোগ সীমিত হওয়ায় জনবল বাড়ানোর পথে বড় বাধা তৈরি হয়েছে।
- রোগীদের নিরাপত্তা ও পেশাগত মান বাড়াতে পাঁচটি উপশাখায়—ক্লিনিক্যাল, শিক্ষামূলক, কাউন্সেলিং, ফরেনসিক এবং নিউরোসাইকোলজি—২০২৭ সালের মধ্যে বাধ্যতামূলক নিবন্ধন চালু হবে।
- সেবার বিচ্ছিন্নতা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং কলঙ্কবোধসহ ব্যবস্থাগত বাধার কারণে সিঙ্গাপুরে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার চিকিৎসায় ৭৮.৬% ঘাটতি রয়েছে।
- সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারি খাতে মনোবিজ্ঞানীর সংখ্যা ৪০% বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে। জনবলসংকট মোকাবিলায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পাঁচ বছরের দ্রুততর প্রশিক্ষণপথ চালু করছে।
- ভর্তুকিযুক্ত মনস্তাত্ত্বিক সেবার জন্য বর্তমানে গড় অপেক্ষার সময় ৪২ দিন। এতে জনবল বাড়ানো এবং উদ্ভাবনী সেবা পদ্ধতি চালুর জরুরি প্রয়োজন স্পষ্ট হয়েছে।






