জালিয়াতির পর্দাফাঁস
পাম তেল জালিয়াতির ব্যাপক তদন্তে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ সরকারি শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তাসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক জৈব জ্বালানির সরবরাহব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতা সামনে এসেছে। ইন্দোনেশিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের পরিচালিত তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে, স্থানীয় কোম্পানিগুলো কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পাম তেলকে পাম তেলকলের বর্জ্য তরল—পাম অয়েল মিল এফ্লুয়েন্ট বা POME—হিসেবে চালিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা বেশি কর এড়িয়ে রাষ্ট্রের কোটি কোটি ডলার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে।
সূচিপত্র
তদন্তে ইউরোপের বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোর নামও এসেছে। নথিতে দেখা গেছে, ইতালির তেল জায়ান্ট Eni এবং ফিনল্যান্ডের টেকসই বিমান জ্বালানি উৎপাদক Neste ইন্দোনেশিয়ার যেসব প্রতিষ্ঠান এখন এই চক্রে অভিযুক্ত, সেগুলোর কাছ থেকে একাধিক চালান পেয়েছে। Eni, Neste বা ইউরোপের অন্য কোনো ক্রেতা কথিত জালিয়াতির বিষয়ে জানত বা এতে জড়িত ছিল, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। পরিবেশগত উদ্বেগের কারণে বহু বছর আগেই সরবরাহব্যবস্থা থেকে পাম তেল সরিয়ে নেওয়ার কথা দুই কোম্পানিই জানিয়েছে। তারপরও ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পাওয়া চালানগুলো এমন প্রতারণা ঠেকানোর জন্য তৈরি যাচাইব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
যেভাবে প্রতারণা করা হয়েছে
কথিত জালিয়াতিটি বুঝতে পণ্য দুটির পার্থক্য জানা দরকার। পাম তেল হলো তেলপাম গাছের ফল থেকে নিষ্কাশিত প্রধান উদ্ভিজ্জ তেল, যা খাদ্য, প্রসাধনী এবং ক্রমবর্ধমান হারে জৈব জ্বালানির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। POME বা পাম তেলকলের বর্জ্য তরল হলো তেল নিষ্কাশন ও পরিশোধনের সময় তৈরি তরল বর্জ্য, যা ঐতিহ্যগতভাবে প্রক্রিয়াজাত ও অপসারণযোগ্য উপজাত হিসেবে বিবেচিত। ইন্দোনেশিয়ার করবিধি অনুযায়ী, পাম তেল রপ্তানিতে POME-এর তুলনায় অনেক বেশি শুল্ক দিতে হয়। POME-কে কম মূল্যের বর্জ্য হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পাম তেলকে POME বলে ভুল লেবেল দিয়ে রপ্তানিকারকেরা মূল্যবান পণ্যটি আন্তর্জাতিক জৈব জ্বালানি উৎপাদকদের কাছে বিক্রি করেও উল্লেখযোগ্যভাবে কম কর দিতে পারত।
ইন্দোনেশিয়ার তদন্তে বলা হয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই ভুল লেবেল লাগানোর কাজে সহায়তা করতে কোম্পানিগুলো শুল্ক কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে আয় সর্বোচ্চ করার চেষ্টার সময় এই চক্রে ইন্দোনেশিয়া সরকারের কোটি কোটি ডলার রাজস্ব হারানোর কথা। ইউরোপীয় ক্রেতাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকির বিষয় হলো জটিল টেকসই উন্নয়ন অঙ্গীকার। বন উজাড় ও আবাসস্থল ধ্বংসের সঙ্গে পাম তেলের নথিভুক্ত সম্পর্কের কারণে ২০৩০ সাল থেকে জৈব জ্বালানিতে পাম তেল নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। প্রত্যয়িত বর্জ্য পণ্য হিসেবে POME-এর ক্ষেত্রে ইইউর নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিধিতে বিধিনিষেধ কম। ফলে নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা বিতর্কিত কাঁচামাল ব্যবহার না করে উচ্চাভিলাষী কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আগ্রহী কোম্পানিগুলোর কাছে এটি আকর্ষণীয় বিকল্প।
অভিযুক্ত কোম্পানি ও ব্যক্তিরা
গত মাসে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানির পরিচালক এবং কয়েকজন শুল্ক কর্মকর্তাসহ ১১ জনকে আটক করে। বাণিজ্যতথ্য, শেয়ারহোল্ডার চুক্তি এবং তথ্য অধিকার আইনে পাওয়া শুল্ক নথি ব্যবহার করে AFP ও SourceMaterial-এর তদন্তকারীরা গ্রেপ্তার হওয়া তিন নির্বাহীর পরিচয় শনাক্ত করেছেন।
তাঁদের একজন টনি। অনেক ইন্দোনেশীয়ের মতো তাঁরও একটিই নাম। তিনি Tanimas Edible Oil-এর পরিচালক এবং Green Product International-এর শেয়ারহোল্ডার। সরকারি নথিতে কর্তৃপক্ষ তাঁকে শুধু TNY আদ্যক্ষরে শনাক্ত করেছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে Eni-কে পাম তেলজাত পণ্য সরবরাহকারী প্রধান ইন্দোনেশীয় প্রতিষ্ঠান ছিল Green Product International। তারা ২১টি চালান পাঠায়, যার সর্বশেষটি পৌঁছায় অক্টোবরে। একই সময়ে কোম্পানিটি Neste-কে অন্তত ২৭টি চালান পাঠায়।
গ্রেপ্তার হওয়া অন্য দুই পরিচালক হলেন Surya Inti Primakarya-র ভ্যান রিকার্ডো এবং Bumi Mulia Makmur-এর এরউইন। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে Eni-কে পাঠানো চালানের অনুমোদন দেন তাঁরা দুজনই। অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় জানিয়েছে, তিন নির্বাহীই এখনো আটক রয়েছেন। Green Product International মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। Surya Inti Primakarya ও Bumi Mulia Makmur-এ ফোন করেও কাউকে পাওয়া যায়নি।
ইউরোপীয় ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া
অভিযুক্ত সরবরাহকারীদের থেকে নিজেদের দ্রুত দূরে সরিয়ে নিয়েছে Eni ও Neste। Eni জানিয়েছে, নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাদের কোনো ছাড় নেই এবং অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তাদের সরাসরি কোনো চুক্তি ছিল না। বরং স্বীকৃত সরবরাহকারী Enviq-এর মাধ্যমে তারা চালান পেয়েছে। তদন্ত প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সব কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত করে Enviq। মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি।
টেকসই বিমান জ্বালানিতে নেতৃত্ব দেওয়ার অবস্থান তৈরি করা Neste বলেছে, ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেওয়ার পরদিনই তারা সরবরাহকারীকে অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোকে সরবরাহব্যবস্থা থেকে বাদ দিতে নির্দেশ দেয়। ফিনিশ কোম্পানিটি জোর দিয়ে বলেছে, তারা জালিয়াতির ঝুঁকিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখে এবং নির্ভরযোগ্য পরীক্ষাপদ্ধতি তৈরি করেছে। Neste-এর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে Green Product International-এর চালান থেকে পর্যায়ক্রমে নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফল পাম থেকে তৈরি বর্জ্য ও অবশিষ্টাংশের সঙ্গে মেলে, অপরিশোধিত পাম তেলের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে নয়।
বাণিজ্যিক নথি অনুযায়ী, Eni ও Neste ছাড়াও Green Product International সুইস ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান Kolmar, স্পেনের তেল জায়ান্ট Repsol এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য জায়ান্ট Cargill-কে সরবরাহ করেছে। অভিযোগ নিয়ে প্রকাশের উপযোগী কোনো বক্তব্য দেয়নি এসব কোম্পানি।
সনদব্যবস্থার দুর্বলতা
জালিয়াতি ঠেকাতে ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক ও কোম্পানিগুলো যে তৃতীয় পক্ষের সনদব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে, ইন্দোনেশিয়ার এই ঘটনায় তাতে বড় ধরনের ফাঁক দেখা গেছে। Eni জানিয়েছে, তাদের চালানগুলো International Sustainability and Carbon Certification বা ISCC-স্বীকৃত একটি কোম্পানি সামলেছে। জৈব জ্বালানির জন্য পাম তেল আমদানি যাচাইয়ে ইইউ স্বীকৃত সংস্থা এটি। ISCC ব্যবস্থা পণ্যের উৎস থেকে গন্তব্য পর্যন্ত গতিপথ অনুসরণ করার জন্য তৈরি, যাতে ইউরোপীয় বন্দরে পৌঁছানো পণ্য নথিপত্র ও প্রতিশ্রুত টেকসই মানদণ্ডের সঙ্গে মেলে।
তবে ISCC-এর মুখপাত্র স্বীকার করেছেন, তদন্তে লক্ষ্যবস্তু হওয়া সরবরাহকারী Surya Inti Primakarya-কে বর্তমানে পুনরায় সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাদ রাখা হয়েছে। আরেক সরবরাহকারী Bumi Mulia Makmur-কে আগে নির্দিষ্ট না করা কিছু লঙ্ঘনের কারণে বাদ দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, Eni ও Neste-সহ ইউরোপের বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে কয়েক ডজন চালান পাঠানো Green Product International-এর সনদ এখনো বৈধ বলে সংস্থাটির অনলাইন তালিকায় দেখা যাচ্ছে। ফৌজদারি তদন্ত ও কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডারকে আটক রাখার প্রেক্ষাপটে এই স্বীকৃতি পুনর্বিবেচনা করা হবে কি না, জানতে চাওয়া হলে ISCC কোনো জবাব দেয়নি।
স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতে, যাচাইয়ের এই ঘাটতি মৌলিক ত্রুটির ইঙ্গিত দেয়। এ ধরনের ঝুঁকি এড়াতে শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতর থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে এমন আইরিশ জৈব জ্বালানি উৎপাদক ClonBio-র জননীতি বিভাগের প্রধান জেমস কোগান চরম স্বচ্ছতার আহ্বান জানিয়েছেন।
POME বা POME-ভিত্তিক জৈব জ্বালানি প্রক্রিয়াজাতকারী যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে তাদের উৎপাদনের পরিমাণ, উৎস ও কাগজপত্র প্রকাশ করার চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছি, যাতে জনসাধারণ ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়।
কোগানের বক্তব্যে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে বাড়তে থাকা উদ্বেগ প্রতিফলিত হয়েছে: যাচাইব্যবস্থা এতটাই সমস্যাজনক হয়ে উঠেছে যে ক্রেতা ও নিয়ন্ত্রকদের যেকোনো POME চালান সন্দেহের চোখে দেখা উচিত। কিছু স্বাধীন বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইইউ ও ব্রিটেনে ব্যবহৃত POME-এর মোট পরিমাণ বিশ্বে পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা সরবরাহের চেয়ে বেশি। এতে পুরো খাতজুড়ে ব্যাপকভাবে ভুল লেবেল লাগানোর ইঙ্গিত মেলে। তবে শিল্পের বাণিজ্য সংগঠনগুলো এই হিসাবকে ভুল বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সুমাত্রায় পরিবেশবিধ্বংসী ক্ষতি
কথিত জালিয়াতির পরিবেশগত পরিণতি কর রাজস্ব হারানোর বাইরেও বিস্তৃত। Green Product International সুমাত্রার উত্তর প্রান্তে কাজ করে। দ্বীপটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন বনাঞ্চলের কয়েকটি রয়েছে এবং বন্য পরিবেশে সুমাত্রার ওরাংওটাং, গণ্ডার, এশীয় হাতি ও বাঘের একসঙ্গে বসবাসের শেষ আবাসস্থলও এটি। একসময় বিশ্বের ওরাংওটাংয়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত ত্রিপা পিটল্যান্ডের বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংস হয়েছে। কৃষি ব্যবসার স্বার্থে পাম বাগান গড়তে বন কেটে ফেলায় সহস্রাব্দের শুরু থেকে এলাকাটি ৮৬ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে।
বন্যপ্রাণীর ওপর ক্ষতির মাত্রা ভয়াবহ। উত্তর সুমাত্রার Orangutan Haven-এর সংরক্ষণ ব্যবস্থাপক ইয়ান সিঙ্গলটন এ অঞ্চলে ওরাংওটাংয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার নথি রেখেছেন।
এটা ধ্বংসাত্মক। বন কেটে ফেললে ওরাংওটাংদের আর থাকার জায়গা থাকে না।
সিঙ্গলটনের ভাষ্য অনুযায়ী, পাম তেলের বিস্তারের কারণে আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে স্থানীয় ওরাংওটাংয়ের সংখ্যা ১৯৮০-এর দশকে প্রায় ৬০ হাজার থেকে কমে আজ আনুমানিক ৩০টিতে দাঁড়িয়েছে। তারা স্থানীয়ভাবে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
তদন্তের নথিতে গ্রেপ্তার হওয়া নির্বাহীদের সঙ্গে পরিবেশ ধ্বংসের উদ্বেগজনক যোগসূত্র দেখা গেছে। টনি এবং Green Product International-এর আরেক পরিচালক আঞ্চলিক কোম্পানি Inno-Wangsa Oils & Fats-এরও পরিচালক। প্রতিষ্ঠানটি ত্রিপা পিটল্যান্ডে বন পোড়ানোর জন্য আগে জরিমানা হওয়া সরবরাহকারীদের কাছ থেকে পাম তেল কিনেছে। সরকারি নথিতে দেখা যায়, অবৈধভাবে বন পোড়ানোর জন্য ওই সরবরাহকারীদের ২০১৪ ও ২০১৮ সালে জরিমানা করা হয়েছিল, তারপরও তারা কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। SourceMaterial-এর পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, গত এক বছরে ইন্দোনেশিয়ার যেকোনো স্থানে নথিভুক্ত সর্বোচ্চ বন উজাড়ের হারের মধ্যে এই সরবরাহকারীদের একটি স্থানের হারও ছিল। এতে ইঙ্গিত মেলে, পরিবেশগত অপরাধ ঠেকাতে জরিমানা খুব একটা কাজে আসেনি।
দোষী সাব্যস্ত করাতে পেরে আমরা সত্যিই গর্বিত ছিলাম। কিন্তু মাঠপর্যায়ে তাতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।
সিঙ্গলটনের মূল্যায়নে এ অঞ্চলে আইন প্রয়োগ ও বাস্তব সংরক্ষণ ফলাফলের মধ্যকার ব্যবধান স্পষ্ট হয়েছে।
ইউরোপজুড়ে নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ
ইন্দোনেশিয়ার তদন্তে প্রকাশ পাওয়া যাচাইব্যবস্থার ব্যর্থতার পর পূর্ণাঙ্গ ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিষেধাজ্ঞার আগেই কয়েকটি ইউরোপীয় সরকার এককভাবে পদক্ষেপ নিয়েছে। জৈব জ্বালানিতে POME ব্যবহারের সব আর্থিক প্রণোদনা বন্ধ করেছে আয়ারল্যান্ড। তাদের সিদ্ধান্ত, যাচাইয়ের সমস্যা থাকায় সরকারি অর্থায়নের জন্য এই কাঁচামাল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আগামী বছর একই ধরনের স্থগিতাদেশ কার্যকর করবে জার্মানি। এতে সনদের অবস্থা যা-ই হোক, POME আমদানির জন্য ইউরোপের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে।
পরিবেশবাদীদের দাবি, বর্তমান সনদব্যবস্থা বৈধ বর্জ্য পণ্য ও ভুল লেবেলযুক্ত পাম তেলের মধ্যে নির্ভরযোগ্যভাবে পার্থক্য করতে পারে না। ফলে ইউরোপের জলবায়ু লক্ষ্য জালিয়াতির ঝুঁকিতে রয়েছে। ব্রাসেলসভিত্তিক পরিবেশবাদী বেসরকারি সংস্থা Transport and Environment-এর জৈব জ্বালানি প্রচারক সিয়ান ডেলানি বলেন, বন উজাড়ের নথিভুক্ত যোগসূত্রের কারণে ২০১৯ সালে পাম তেলের জৈব জ্বালানি পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার যে সিদ্ধান্ত ইইউ নিয়েছিল, তা সঠিক ছিল। তবে নিয়ন্ত্রক কাঠামোর ফাঁক এখনো অসাধু পক্ষগুলোকে ব্যবস্থা কাজে লাগানোর সুযোগ দিচ্ছে বলে তিনি সতর্ক করেন।
এই আমদানি পণ্যের যাচাই ও সনদ দেওয়ার ব্যবস্থা স্পষ্টতই ব্যর্থ হচ্ছে। সবুজ জ্বালানি প্রসারের কথা বলে যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ুনীতি, তার সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে।
নিঃসরণ কমাতে নিয়ন্ত্রক ও ভোক্তাদের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে থাকা বিমান সংস্থাগুলোর জন্য এ অভিযোগ টেকসই বিমান জ্বালানির বাজারে আস্থা ক্ষুণ্ন করার হুমকি তৈরি করেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপীয় বিমানবন্দরগুলোতে অন্তত ৭০ শতাংশ বিমান জ্বালানি টেকসই হওয়া বাধ্যতামূলক করেছে ব্রাসেলস। এতে জৈব জ্বালানির বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে, যা Eni ও Neste-এর মতো কোম্পানি সরবরাহ করতে চায়। সম্প্রতি Ryanair-কে সর্বোচ্চ ১ লাখ টন টেকসই বিমান জ্বালানি সরবরাহে পাঁচ বছরের চুক্তি করেছে Eni। অন্যদিকে অক্টোবরে United Airlines-এর সঙ্গে বহু বছরের চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়েছে Neste। আমস্টারডামের Schiphol ও লস অ্যাঞ্জেলেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতেও জ্বালানি সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি। বন উজাড়ের সঙ্গে যুক্ত পাম তেল বর্জ্য হিসেবে পরিচয় গোপন করে এসব সরবরাহব্যবস্থায় ঢুকে পড়লে জৈব জ্বালানির যে জলবায়ু-সুবিধার দাবি করা হয়, তা পুরোপুরি ভেস্তে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ডেলানি।
মূল কথা
- ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কর ফাঁকি দিতে পাম তেলকে POME বলে ভুল লেবেল লাগানোর অভিযোগে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ শুল্ক কর্মকর্তা ও তিন কোম্পানি পরিচালকেরসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।
- ইউরোপের জ্বালানি জায়ান্ট Eni ও Neste ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে POME-লেবেলযুক্ত একাধিক চালান পেয়েছে। তবে দুই কোম্পানিই জালিয়াতি সম্পর্কে জানার কথা অস্বীকার করেছে এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে।
- International Sustainability and Carbon Certification ব্যবস্থাটি যাচাইয়ের মুখে পড়েছে। ফৌজদারি তদন্ত চললেও অভিযুক্ত একটি কোম্পানির সনদ এখনো বৈধ রয়েছে।
- পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সতর্কতা, এই জালিয়াতি ইইউর জলবায়ু লক্ষ্যকে ক্ষুণ্ন করছে। পাম তেল উৎপাদনের কারণে সুমাত্রায় বন উজাড় হচ্ছে, যা বিপন্ন ওরাংওটাংসহ বিভিন্ন প্রজাতির গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থলকে হুমকিতে ফেলছে।
- আয়ারল্যান্ড ও জার্মানি ইতিমধ্যে POME ব্যবহারে প্রণোদনা সীমিত করেছে। জৈব জ্বালানিতে পাম তেলের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ২০৩০ সালে কার্যকর হবে।






