দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ঐতিহাসিক অগ্রগতি
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলে দুই দিনের এক যুগান্তকারী সফর শেষ করেন। এ সফরে দুই দেশের সম্পর্ককে "বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে" উন্নীত করা এবং প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১৬ থেকে ১৭টি বিস্তৃত চুক্তি সইয়ের মধ্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এক রূপান্তরমূলক অধ্যায়ের সূচনা হয়। ২০১৭ সালের পর ইহুদি রাষ্ট্রটিতে মোদির এটি দ্বিতীয় সফর। সফরে সম্ভাব্য ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার পথ তৈরি হয়েছে, পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সহযোগিতার এমন কাঠামো গড়ে উঠেছে, যা মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।
সূচিপত্র
ইসরায়েল গাজায় চলমান সংঘাতের মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলনামূলক বিচ্ছিন্নতা কাটানোর চেষ্টা করছে, আর ভারত নিজের কৌশলগত স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি জটিল আঞ্চলিক সম্পর্ক সামলাচ্ছে। এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এ কূটনৈতিক মাইলফলক এল। সফরে মোদি ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে ভাষণ দেন, ইয়াদ ভাশেম হলোকাস্ট স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেন। স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলোতে কৃষি ও মহাকাশ অনুসন্ধান থেকে শুরু করে শ্রমিকদের চলাচল এবং আর্থিক প্রযুক্তি—বিভিন্ন খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে বোঝা যায়, প্রচলিত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির বাইরেও সহযোগিতাকে বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় নতুন উচ্চতা
সাম্প্রতিক ইতিহাসে দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণগুলোর একটি এই সফরের প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত উদ্যোগ। ভারতীয় ও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, আলোচনাধীন সম্ভাব্য চুক্তির মূল্য ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এতে বহুস্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, চালকবিহীন আকাশযান, নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানার অস্ত্র এবং সামরিক কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নত প্রয়োগ অন্তর্ভুক্ত। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বেড়েছে। ওই সংঘাতে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও সাইবার যুদ্ধে নয়াদিল্লির দুর্বলতা স্পষ্ট হয়েছিল। অন্যদিকে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আঞ্চলিক সংঘাতে ইসরায়েলের অভিজ্ঞতা তার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা দেখিয়েছে।
আলোচনায় থাকা নির্দিষ্ট ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে রাফায়েলের SPICE 1000 গাইডেন্স কিট, এলবিট সিস্টেমসের Rampage আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের সুপারসনিক Air LORA ক্ষেপণাস্ত্র এবং Ice Breaker নৌ-ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এলবিটের Hermes 900 ড্রোন কেনার একটি বড় চুক্তিও হতে পারে, যা ভারতের নজরদারি ও আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়াবে। ইসরায়েলের বহুস্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কাঠামো নিয়েও সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে Iron Dome ও Iron Beam ব্যবস্থার দিকে বিশেষ নজর থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের বড় অঙ্কের অর্থায়ন ও যৌথ উৎপাদন অংশীদারত্বের কারণে এগুলো রপ্তানিতে বিধিনিষেধ রয়েছে। তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে হস্তান্তরের জন্য আনুষ্ঠানিক মার্কিন সম্মতি দরকার।
শুধু সরঞ্জাম কেনার চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, প্রতিরক্ষা উৎপাদনে যৌথ উন্নয়ন, যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়ে দুই দেশের সম্মতি। মোদির "মেক ইন ইন্ডিয়া" উদ্যোগের সঙ্গে এই পদ্ধতি সামঞ্জস্যপূর্ণ; এর ফলে সম্পর্কটি নিছক ক্রেতা-বিক্রেতার গণ্ডি ছেড়ে কৌশলগত শিল্প অংশীদারত্বে রূপ নিচ্ছে। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (SIPRI) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের মোট অস্ত্র রপ্তানির প্রায় ৩৪ শতাংশ কিনেছে ভারত, যার মূল্য আনুমানিক ২০.৫ বিলিয়ন ডলার। এতে নয়াদিল্লি জেরুজালেমের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ক্রেতায় পরিণত হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো ভারতে সহযোগী প্রতিষ্ঠান গড়বে এবং স্থানীয়ভাবে যৌথ উৎপাদন করবে। এর আওতায় গোপনীয়তা-সংক্রান্ত কাঠামোর কারণে আগে সীমাবদ্ধ থাকা কিছু অস্ত্রব্যবস্থার লাইসেন্সের অধীনে উৎপাদনও হতে পারে।
প্রযুক্তি, এআই ও সাইবার নিরাপত্তার সমন্বয়
প্রচলিত সামরিক সরঞ্জামের বাইরেও চুক্তিগুলো উদীয়মান ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে ভারত ও ইসরায়েলকে অংশীদার করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দুই দেশ একটি পৃথক সমঝোতা স্মারক সই করেছে। এতে যৌথ উন্নয়ন, নৈতিক এআই কাঠামো, বেসামরিক ক্ষেত্রে প্রয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব অন্তর্ভুক্ত। এ উদ্যোগের পাশাপাশি "হরাইজন স্ক্যানিং" নিয়ে একটি "উদ্দেশ্য ঘোষণাপত্র" সই হয়েছে। তথ্য বিশ্লেষণ ও এআই-চালিত সরঞ্জামের মাধ্যমে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সমাজে বৈশ্বিক পর্যায়ে উদীয়মান প্রবণতা শনাক্ত করার জন্য এটি একটি কৌশলগত দূরদর্শিতা-ব্যবস্থা। যৌথ গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই উদ্যোগ ভারতের কৌশলগত পরিকল্পনাকে শক্তিশালী করবে।
ভারতে ভারত-ইসরায়েল সাইবার নিরাপত্তা উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ার লক্ষ্যে একটি ইচ্ছাপত্রের মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এই কেন্দ্রের লক্ষ্য হলো সর্বোত্তম চর্চা তুলে ধরা, ডিজিটাল স্থিতিস্থাপকতা জোরদার করা এবং সরকারি সংস্থা, শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো। যৌথ মহড়া ও সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বহু বছরের একটি কৌশলগত কর্মসূচি তৈরিতেও দুই দেশ সম্মত হয়েছে। ভারত-ইসরায়েল যৌথ গবেষণা আহ্বান কাঠামোর আওতায় যৌথ গবেষণার তহবিল ১ মিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ১.৫ মিলিয়ন ডলার করা হবে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, সেমিকন্ডাক্টর ও মহাকাশ অনুসন্ধানেও সহযোগিতা বিস্তৃত হচ্ছে। দুই পক্ষ বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানি প্রকল্পে সহযোগিতা এবং মহাকাশ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। আর্থিক প্রযুক্তি খাতে ভারত ঘোষণা করেছে, দেশটির যুগান্তকারী ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI) ইসরায়েলেও চালু হবে। NPCI International ও ইসরায়েলের MASAV ব্যবস্থার অংশীদারত্বে এর মাধ্যমে সীমান্তপারের অর্থ পাঠানো যাবে। এ ডিজিটাল আর্থিক সমন্বয়ে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, পর্যটক ও স্টার্টআপের লেনদেন সহজ হতে পারে। এ ছাড়া ভারতের ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস সেন্টারস অথরিটি এবং ইসরায়েল সিকিউরিটিজ অথরিটির মধ্যে আরেকটি চুক্তির মাধ্যমে ফিনটেক উদ্ভাবন ও নিয়ন্ত্রক প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানো হবে।
অর্থনৈতিক সংহতি ও শ্রমিকদের চলাচল
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) নিয়ে নতুন গতি এনেছে সফরটি। মোদির সফরের কয়েক দিন আগে, ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা আবার শুরু হয়। ২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আট দফা আলোচনার পর আলোচনা থমকে গিয়েছিল। তবে এখন দুই পক্ষই হীরা, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও রাসায়নিকের আধিপত্য থাকা বর্তমান বাণিজ্য কাঠামোর বাইরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে নতুন করে অঙ্গীকারবদ্ধ। ২০২৫ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩.৬২ বিলিয়ন ডলার। এতে এশিয়ায় ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হয়েছে ইসরায়েল। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে আগের বছরের তুলনায় বাণিজ্য কমেছে: ভারতের রপ্তানি ৫২ শতাংশ কমে ২.১৪ বিলিয়ন ডলারে এবং আমদানি ২৬.২ শতাংশ কমে ১.৪৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক প্যাকেজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে ইসরায়েলের তীব্র শ্রমিক-সংকট মোকাবিলার কথা রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ফিলিস্তিনি শ্রমিকদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধে এ সংকট আরও বেড়েছে। আগামী পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার অতিরিক্ত ভারতীয় শ্রমিককে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে ইসরায়েল। নির্মাণ ও পরিচর্যা খাতে বিদ্যমান চুক্তির বাইরে বাণিজ্য, উৎপাদন, রেস্তোরাঁ, খুচরা বিক্রি, সরবরাহব্যবস্থা, গুদামজাতকরণ, আতিথেয়তা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বস্ত্র, ইলেকট্রনিকস ও রাসায়নিক খাতেও শ্রমিক নেওয়া হবে। এসব খাতে নিয়ন্ত্রিতভাবে কর্মী নিয়োগের জন্য বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত তিনটি প্রটোকল সই হয়েছে। এর মাধ্যমে দক্ষ ও আধা-দক্ষ ভারতীয় পেশাজীবীদের জন্য কাঠামোবদ্ধ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয় গভীর করতে দেশ দুটি একটি পৃথক আর্থিক সংলাপও চালু করেছে। পাশাপাশি, চতুর্থ ভারত-ইসরায়েল সিইও ফোরামের প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়েছে, যেখানে শিল্পখাতের প্রবণতার সঙ্গে সরকারি নীতির সমন্বয়ের জন্য নীতিগত সুপারিশ রয়েছে। বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি নিয়ে জ্ঞান বিনিময় ও যৌথ প্রশিক্ষণ এগিয়ে নিতে ইসরায়েল ইনস্টিটিউট অব কমার্শিয়াল আরবিট্রেশন এবং ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব আরবিট্রেশনের মধ্যে একটি চুক্তি হয়েছে। এতে দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও মসৃণ হতে পারে।
কূটনৈতিক তাৎপর্য ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
গাজায় ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান এবং বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নিয়ে আন্তর্জাতিক নজরদারির প্রেক্ষাপটে মোদির সফরের যথেষ্ট প্রতীকী গুরুত্ব ছিল। নেতানিয়াহু ব্যক্তিগতভাবে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানান এবং নেসেটের বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিতে তাঁর সঙ্গে যান। সেখানে আইনপ্রণেতারা মোদিকে "নেসেট পদক" দেন, যা কোনো সফররত বিদেশি নেতাকে প্রথমবার দেওয়া হলো। পার্লামেন্টে ভাষণের শুরুতে মোদি হিব্রু ও হিন্দিতে শুভেচ্ছা জানান। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলাকে তিনি "বর্বর সন্ত্রাসবাদ" বলে নিন্দা করেন এবং ঘোষণা দেন, "এ মুহূর্তে এবং এর পরও ভারত দৃঢ়ভাবে, পূর্ণ প্রত্যয়ের সঙ্গে, ইসরায়েলের পাশে রয়েছে।"
তবে কূটনৈতিক অবস্থানে মোদি সতর্ক ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। ইসরায়েলি নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানানো এবং সন্ত্রাসবাদের দ্ব্যর্থহীন নিন্দার পাশাপাশি তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত গাজা শান্তি পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, "মানবতা কখনো সংঘাতের শিকার হওয়া উচিত নয়।" ভারত দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি তার ঐতিহ্যগত সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং গাজায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরব অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করেছে দেশটি।
ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর (IMEC) এবং I2U2 জোটের (ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্র) আওতায় সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা এগিয়েছে। এ দুটিকে পুরো অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সংযোগের উদীয়মান ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়। প্রেসিডেন্ট হারজগ বলেন, "মধ্যপ্রাচ্যের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।" আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠারও বহু শতাব্দী আগে থেকে থাকা ইহুদি-ভারতীয় সম্পর্কের কথা তুলে ধরে মোদি হারজগকে সরকারি সফরে ভারতে আমন্ত্রণ জানান। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালে।
দেশের ভেতরে সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্ক
সম্প্রসারিত সহযোগিতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যাপন করা হলেও মোদির সফর ভারতে উল্লেখযোগ্য সমালোচনার মুখে পড়ে। বিশেষ করে কংগ্রেস দলের বিরোধী নেতারা সফরটিকে ভারতের ঐতিহাসিক পররাষ্ট্রনীতির নীতিমালার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা এবং গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র বৈশ্বিক নজরদারির সময়ে "নৈতিক কাপুরুষতার" প্রদর্শন বলে নিন্দা করেন। কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়রাম রমেশ মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম পরিত্যাগের অভিযোগ আনেন। আর প্রিয়াঙ্কা গান্ধী প্রধানমন্ত্রীকে নেসেটে ভাষণের সময় গাজায় বেসামরিক মানুষের হত্যার কথা উল্লেখ করার আহ্বান জানান, যদিও তাঁর ভাষণে এ প্রসঙ্গটি উল্লেখযোগ্যভাবে অনুপস্থিত ছিল।
২০১৪ সাল থেকে মোদির নেতৃত্বে ভারত ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের বিষয়ে ধীরে ধীরে অবস্থান বদলেছে। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি ঐতিহ্যগত সংহতির জায়গায় বাস্তববাদী "পৃথকীকরণ" কৌশল নিয়েছে, যাতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের সঙ্গে সম্পর্ককে আলাদা পথে এগিয়ে নেওয়া হয়। গাজা সংঘাতের সময় ইসরায়েলের সমালোচনামূলক জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি প্রস্তাবে ভারতের ভোটদানে বিরত থাকা এ পরিবর্তনের প্রতিফলন; এর মধ্যে ২০২৪ সালে সাধারণ পরিষদে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো প্রস্তাবও ছিল। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ভারত ইসরায়েলকে গোলাবারুদ ও ড্রোন সরবরাহ করেছে বলেও খবর রয়েছে। গাজায় ব্যবহৃত এআই-চালিত অস্ত্রব্যবস্থার সঙ্গে ভারতীয় কোম্পানির যোগসূত্রও পাওয়া গেছে; এসব ব্যবস্থা ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি।
পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘনিষ্ঠতা শুধু কৌশলগত স্বার্থের প্রতিফলন নয়, বর্তমান দুই সরকারের আদর্শগত সাদৃশ্যেরও প্রকাশ। মোদি ও নেতানিয়াহু—দুজনই এমন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন, যা জিহাদি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর জোর দেয় এবং নিজ নিজ রাষ্ট্রকাঠামোতে জাতিগত-জাতীয় পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেয়। কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের ভাষায়, এই "জাতীয়তাবাদী আন্তর্জাতিক" সমীকরণে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রতি ঐতিহ্যগত সংহতির চেয়ে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
চুক্তিতে যা অন্তর্ভুক্ত হয়নি
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক জল্পনা থাকলেও ঐতিহাসিক চুক্তিগুলোতে ইসরায়েলের Iron Dome বা Iron Beam ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হস্তান্তরের বিষয়টি ছিল না। বৃহত্তর আকাশ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তা ও যৌথ উৎপাদন অংশীদারত্বের কারণে Iron Dome এবং এর লেজারভিত্তিক উত্তরসূরি Iron Beam অবাধে রপ্তানি করা যায় না। ভারতের মতো তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে হস্তান্তরের আগে মার্কিন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন।
এর বদলে, বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কে শনাক্তকরণ ব্যবস্থা ও সমন্বয় প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে ইসরায়েল ভারতকে সহায়তা করতে পারে। এতে রুশ S-400, Akash, Barak ও QRSAM-সহ ভারতের বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলোকে একীভূত করতে সহায়তা মিলবে। এ পরামর্শভিত্তিক পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট মার্কিন-সংশ্লিষ্ট ইসরায়েলি ব্যবস্থা সরাসরি হস্তান্তরের প্রয়োজন ছাড়াই দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, মাঝারি পাল্লার রকেট ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং স্বল্পপাল্লার হুমকি মোকাবিলায় ভারতের সক্ষমতা বাড়তে পারে। বিদ্যমান সীমাবদ্ধ প্রযুক্তি সরাসরি হস্তান্তরের বদলে নতুন ব্যবস্থা যৌথভাবে উন্নয়নের ওপরই জোর দেওয়া হচ্ছে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মোদির সফরে ভারত ও ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে "বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে" উন্নীত করে; ২০১৭ সালের পর এটি ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় সফর
- প্রতিরক্ষা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি, ফিনটেক, শ্রমিকদের চলাচল ও শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশ ১৬ থেকে ১৭টি চুক্তি সই করে
- ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও এআই ব্যবস্থাসহ সম্ভাব্য ৮ থেকে ১০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে; যৌথ উৎপাদন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে জোর দেওয়া হয়েছে
- আগামী পাঁচ বছরে নির্মাণ, উৎপাদন, পরিচর্যা ও পরিষেবা খাতে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার ভারতীয় শ্রমিককে ইসরায়েলে প্রবেশের অনুমতি দেবে দেশটি
- ভারতের ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI) ইসরায়েলেও চালু হবে, যা সীমান্তপারের ডিজিটাল লেনদেন সহজ করবে
- ২০২১ সাল থেকে থমকে থাকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা আবার শুরু হয়েছে; বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৩.৬২ বিলিয়ন ডলার
- মার্কিন রপ্তানি বিধিনিষেধ ও যৌথ উৎপাদন চুক্তির কারণে Iron Dome ও Iron Beam ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে
- মোদি নেসেটে ভাষণ দেন, ৭ অক্টোবরের হামলার নিন্দা জানান এবং ট্রাম্পের গাজা শান্তি পরিকল্পনায় সমর্থন দেন; পাশাপাশি দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি ভারতের সমর্থন বজায় রাখেন
- গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি পরিত্যাগের ধারণা নিয়ে ভারতের বিরোধী দলগুলো সফরের সমালোচনা করেছে
- যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর এবং চতুর্দেশীয় I2U2 জোটের জন্য সহযোগিতার কাঠামো গড়া হয়েছে






