ডিজিটাল গোপনীয়তা নিয়ে লড়াই
বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একটির বিরুদ্ধে নজিরবিহীন ভর্ৎসনা জানিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট হোয়াটসঅ্যাপকে ব্যবহারকারীর তথ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে বাধ্য করেছে। মেসেজিং প্ল্যাটফর্মটিকে ১৬ মার্চের মধ্যে সম্মতিভিত্তিক কাঠামো চালুর সময়সীমা দিয়েছে আদালত। এর ফলে ভারতে হোয়াটসঅ্যাপের ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ব্যবহারকারী তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ পাবেন। এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি কনগ্লোমারেটগুলোর সঙ্গে নাগরিকদের ডিজিটাল অধিকার রক্ষায় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় তৎপর জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ক্রমবর্ধমান টানাপোড়েন তুলে ধরেছে। ভারতে পরিবার ও বন্ধুদের কথোপকথন থেকে ব্যবসায়িক লেনদেন ও সরকারি সেবা, সব ক্ষেত্রেই হোয়াটসঅ্যাপ কার্যত যোগাযোগের অবকাঠামো হয়ে ওঠায় এই মামলার ফল তাৎক্ষণিক পক্ষগুলোর বাইরেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।
সূচিপত্র
মামলাটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে প্ল্যাটফর্মটির বিতর্কিত ২০২১ সালের গোপনীয়তা নীতির হালনাগাদ, যাতে সেবা ব্যবহার চালিয়ে যেতে হলে ব্যবহারকারীদের মেটার কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগি বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। আগের শর্তগুলোতে বিদ্যমান ব্যবহারকারীরা বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে তথ্য ভাগাভাগি থেকে সরে দাঁড়াতে পারতেন। কিন্তু নতুন নীতিতে তাঁদের সামনে কঠোর এক আলটিমেটাম রাখা হয়েছিল: শর্ত মেনে নিন, নয়তো পুরোপুরি সেবা ব্যবহার বন্ধ করুন। এই পদ্ধতির তীব্র সমালোচনা করে ভারতের প্রতিযোগিতা কমিশন (সিসিআই) ২০২১ সালের মার্চে তদন্ত শুরু করে। শেষ পর্যন্ত প্রভাবশালী বাজার অবস্থানের অপব্যবহারের দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার (২১৩.১৪ কোটি রুপি) জরিমানা করে কমিশন।
চলতি মাসের শুরুর দিকে সুপ্রিম কোর্ট প্ল্যাটফর্মটির তথ্য ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে কঠোর মন্তব্য করে। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত সতর্ক করে বলেন, ভারতীয়দের গোপনীয়তার মৌলিক অধিকার নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ বা মেটাকে "ছিনিমিনি খেলতে" দেওয়া হবে না, কিংবা সংবিধানকে "প্রহসনে পরিণত" করতেও দেওয়া হবে না। বিচারপতিদের বেঞ্চ জোর করে তথ্য ভাগাভাগিকে "ব্যক্তিগত তথ্য চুরির একটি ভদ্র উপায়" বলে বর্ণনা করে। লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যক্তিগত যোগাযোগ ব্যবহার করা হলেও তা সম্পর্কে যেসব "নীরব গ্রাহক" কিছুই জানেন না, তাঁদের নিয়ে উদ্বেগও তুলে ধরে আদালত।
যে নীতিতে বিতর্কের সূত্রপাত
২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি হোয়াটসঅ্যাপের সেবার শর্ত ও গোপনীয়তা নীতি হালনাগাদের ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিতর্কের শুরু। এতে মেসেজিং সেবা ও এর মূল কোম্পানির সম্পর্ক মৌলিকভাবে বদলে যায়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ও বিপণনের উদ্দেশ্যে ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্টের তথ্য, ফোন নম্বর ও যোগাযোগের বিবরণ ফেসবুক এবং এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগিতে সম্মতি দিতে হতো। সম্মতি দেওয়ার সময়সীমা প্রথমে ২০২১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করা হয়। জনরোষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চাপে পরে তা বাড়িয়ে ১৫ মে করা হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ২০২১ সালের নীতিটি আগের হালনাগাদগুলো থেকে গুরুত্বপূর্ণভাবে আলাদা ছিল, কারণ এতে সম্মতির বিস্তারিত বিকল্প বাদ দেওয়া হয়। আগের ব্যবস্থায় ব্যবহারকারীরা সেবার উন্নতির জন্য তথ্য ভাগাভাগি এবং বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের জন্য তথ্য ভাগাভাগির মধ্যে পার্থক্য করতে পারতেন। ২০১৬ সালের কাঠামোয় বিদ্যমান ব্যবহারকারীরা তাঁদের গোপনীয়তা সেটিংস বজায় রাখতে পারতেন, আর নতুন ব্যবহারকারীরা বিস্তৃত শর্ত মেনে নিতেন। এই পার্থক্য তুলে দিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ কার্যত মেটার বিভিন্ন সেবার তথ্যব্যবস্থাকে একীভূত করে। ফলে মেসেজিংয়ের ধরন থেকে সংগৃহীত তথ্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনের কাজে লাগানো সম্ভব হয়, এমনকি ব্যবহারকারীরা কখনো সরাসরি ওই প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার না করলেও।
ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা দ্রুত দিল্লি হাইকোর্টে নীতিটির বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাঁদের যুক্তি, এই পরিবর্তন সুপ্রিম কোর্টের ২০১৭ সালের ঐতিহাসিক রায়ে স্বীকৃত গোপনীয়তার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে। মামলাকারীদের দাবি, কার্যকর নিয়ন্ত্রক তদারকি ছাড়াই মেটার সেবাগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত তথ্য ভাগাভাগি করে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের বিস্তারিত প্রোফাইল তৈরি করছে। মামলায় হস্তক্ষেপকারী পক্ষ ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশন জোর দিয়ে বলে, মেটাডেটা সংগ্রহও গুরুতর গোপনীয়তার উদ্বেগ তৈরি করে। ব্যবহারকারীরা কার সঙ্গে ও কত ঘন ঘন কথা বলেন, সেই তথ্য থেকেই তাঁদের জীবন সম্পর্কে সংবেদনশীল বিষয় জানা যেতে পারে, যদিও বার্তার বিষয়বস্তু এনক্রিপ্ট করা থাকে।
প্রতিযোগিতা আইন ও তথ্য সুরক্ষার সংযোগ
২০২১ সালের মার্চে শুরু হওয়া ভারতের প্রতিযোগিতা কমিশনের তদন্তে প্রথমবারের মতো দেশের অ্যান্টিট্রাস্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা গোপনীয়তাকে স্পষ্টভাবে মূল্যবহির্ভূত প্রতিযোগিতার একটি দিক হিসেবে বিবেচনা করে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের আদেশে সিসিআই জানায়, প্ল্যাটফর্মটির "অস্পষ্ট, ব্যাপক ও সীমাহীন" গোপনীয়তা নীতি তথ্যের অসমতা তৈরি করেছে। এতে ব্যবহারকারীরা অসুবিধায় পড়েছেন এবং বিকল্প সেবা সম্পর্কে জেনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। কমিশনের সিদ্ধান্ত, ওভার-দ্য-টপ মেসেজিং অ্যাপের বাজারে মেটার প্রভাবশালী অবস্থান রয়েছে। ভারতে আনুমানিক ৮৫ কোটি ৩০ লাখ ব্যবহারকারী নিয়ে এর নাগাল বা নেটওয়ার্ক প্রভাবের সমতুল্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।
সিসিআইয়ের সিদ্ধান্ত, প্রতিযোগিতা আইন, ২০০২-এর ৪(২)(ক)(i), ৪(২)(গ) ও ৪(২)(ঙ) ধারার অধীনে এই আচরণ প্রভাবশালী অবস্থানের শোষণমূলক ও প্রতিযোগিতাবিরোধী অপব্যবহার। ব্যবহারকারীদের ওপর জবরদস্তিমূলক ও অন্যায্য শর্ত আরোপ করে প্ল্যাটফর্মটি অনলাইন প্রদর্শন বিজ্ঞাপনের খাতে প্রতিযোগীদের বাজারে প্রবেশে বাধা দেওয়ার বিধান লঙ্ঘন করেছে এবং বিজ্ঞাপন ব্যবসার স্বার্থ রক্ষায় মেসেজিং বাজারে নিজের প্রভাবশালী অবস্থান কাজে লাগিয়েছে। এসব লঙ্ঘনের গুরুতরতা বিবেচনায় ২১৩.১৪ কোটি রুপি জরিমানা করা হয়। পাশাপাশি, পাঁচ বছরের জন্য মেটার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যবহারকারীর তথ্য ভাগাভাগি বন্ধ করতে এবং স্বচ্ছভাবে তথ্য ভাগাভাগি থেকে সরে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা চালু করতে হোয়াটসঅ্যাপকে নির্দেশ দেয় সিসিআই।
ভারতে প্রতিযোগিতা আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। এতে তথ্য সুরক্ষা ও অ্যান্টিট্রাস্ট উদ্বেগকে আলাদা রাখার "পৃথকতাবাদী" দৃষ্টিভঙ্গির বদলে এমন একটি "সমন্বিত" কাঠামো গ্রহণ করা হয়েছে, যা গোপনীয়তার অবনতিকেও ভোক্তাকল্যাণের ক্ষতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৯ সালে জার্মানির বান্ডেসকার্টেলআমটও একইভাবে ফেসবুকের বিভিন্ন সেবায় অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহকে প্রভাবশালী অবস্থানের অপব্যবহার বলে রায় দিয়েছিল। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ইউরোপীয় বিচার আদালত সেই রায় বহাল রাখে। শুধু প্রতিযোগিতা আইনের নীতির ওপর নির্ভর না করে ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন, ২০২৩-এর নির্দিষ্ট বিধান সরাসরি প্রয়োগ করলে ভারতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা ভবিষ্যতে আইন প্রয়োগ আরও জোরদার করতে পারে।
আপিল আদালত ঘুরে মামলার অগ্রগতি
সিসিআইয়ের আদেশের পর হোয়াটসঅ্যাপ ও মেটা জাতীয় কোম্পানি আইন আপিল ট্রাইব্যুনালে (এনসিএলএটি) সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ট্রাইব্যুনাল বিভক্ত রায় দেয়। এতে আর্থিক জরিমানা বহাল থাকলেও বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে তথ্য ভাগাভাগির ওপর পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়া হয়। এনসিএলএটির রায়, ব্যবহারকারীর পছন্দ ফিরিয়ে দিয়ে শোষণ বন্ধ করাই হওয়া উচিত "মূল নীতি", সার্বিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ নয়। ট্রাইব্যুনাল আরও জানায়, বিজ্ঞাপনের জন্য প্রয়োজনীয় নয় এমন তথ্য সংগ্রহ কেবল ব্যবহারকারীর স্পষ্ট ও প্রত্যাহারযোগ্য সম্মতিতেই করা যাবে।
এই আংশিক প্রতিকারে সন্তুষ্ট না হয়ে মেটা ও হোয়াটসঅ্যাপ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয় এবং অবশিষ্ট জরিমানা বাতিলের আবেদন জানায়। একই সময়ে এনসিএলএটির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাল্টা আপিল করে সিসিআই; বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে তথ্য ভাগাভাগি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্তটি চ্যালেঞ্জ করে তারা। ২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলিকে নিয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ প্ল্যাটফর্মটির বাজারক্ষমতা ও তথ্য ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
আদালত পর্যবেক্ষণ করে, প্ল্যাটফর্মটির প্রভাবশালী অবস্থান কার্যত ব্যবহারকারীদের এমন শর্ত মেনে নিতে বাধ্য করে, যেগুলো নিয়ে তাঁদের দর-কষাকষির সুযোগ নেই। এতে এমন একচেটিয়া পরিস্থিতি তৈরি হয়, যার মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার করা হয়। কোম্পানিগুলোর পক্ষে উপস্থিত জ্যেষ্ঠ আইনজীবী কপিল সিবাল বেঞ্চকে আশ্বাস দেন, ব্যবহারকারীর সম্মতির বিষয়ে এনসিএলএটির নির্দেশনা ২০২৬ সালের ১৬ মার্চের মধ্যে পুরোপুরি মেনে চলবে হোয়াটসঅ্যাপ। এই অঙ্গীকারের পর ট্রাইব্যুনালের আদেশ স্থগিত রাখার আবেদনগুলো নিষ্পত্তি করে আদালত, পাশাপাশি সিসিআইয়ের কাছে সম্মতি-সংক্রান্ত হলফনামা জমা দিতে কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দেয়। প্রতিযোগিতাসংক্রান্ত মূল সিদ্ধান্তগুলোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা আপিলটি এখনো সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।
হোয়াটসঅ্যাপের বক্তব্য ও প্রযুক্তিগত দাবি
পুরো বিচারপ্রক্রিয়ায় হোয়াটসঅ্যাপ বলে এসেছে, তাদের মেসেজিং সেবায় এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন ব্যবহৃত হয়, যা মেটার কর্মী বা তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে ব্যক্তিগত বার্তার বিষয়বস্তু সুরক্ষিত রাখে। সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হলফনামায় কোম্পানিটি দাবি করে, বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে মেটার অন্য কোম্পানিগুলোর সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগি হয় কেবল ব্যবহারকারীরা ঐচ্ছিক ফিচার ব্যবহার করতে বেছে নিলে। ব্যবহারকারীরা ওই ফিচার ব্যবহার না করলে কোনো তথ্য ভাগাভাগি হয় না বলেও দাবি করে তারা।
কোম্পানিটি জানায়, ব্যবহারকারীদের তথ্য ভাগাভাগি থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে তাঁদের জানানো হবে এবং অ্যাপের সেটিংসে থাকা স্পষ্ট একটি ট্যাবের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের পছন্দ পর্যালোচনা বা পরিবর্তন করতে পারবেন। হলফনামায় বলা হয়, হোয়াটসঅ্যাপ সেবা দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহারকারীর তথ্য মেটার অন্য কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করাকে ভারতে সেবা ব্যবহারের শর্ত করা হবে না। ভবিষ্যতের সব নীতিগত হালনাগাদেও এসব শর্ত মেনে চলা হবে বলে জানানো হয়। ডিজিটাল ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন মেনে চলার পরিকল্পনাও হোয়াটসঅ্যাপ তৈরি করতে শুরু করেছে বলে জানায়।
তবে স্বাধীন পর্যবেক্ষকেরা এসব দাবি খতিয়ে দেখছেন। তাঁদের মতে, বার্তার বিষয়বস্তু এনক্রিপ্ট করা থাকলেও মেটাডেটা সংগ্রহের মাধ্যমে ব্যাপক প্রোফাইল তৈরি করা সম্ভব। ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের যুক্তি, যোগাযোগের ধরন, গ্রুপের সদস্যপদ ও কথোপকথনের ঘনত্ব প্রকাশকারী মেটাডেটা থেকে ব্যবহারকারীর স্বাস্থ্য, সম্পর্ক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংবেদনশীল তথ্য জানা যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক মামলাগুলোতেও এনক্রিপশন-সংক্রান্ত দাবি চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মেটার কর্মীরা বার্তার বিষয়বস্তু দেখতে পারেন। এ কারণে প্ল্যাটফর্মটিতে সিগন্যাল প্রোটোকল কীভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে, তা স্বাধীনভাবে নিরীক্ষার দাবি উঠেছে।
ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ে ভিন্নমত
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই মামলা মৌলিক টানাপোড়েন সামনে এনেছে। ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের যুক্তি, ভারতে অত্যাবশ্যক অবকাঠামোর মতো কাজ করা হোয়াটসঅ্যাপের মতো প্রভাবশালী সেবাগুলো নেটওয়ার্কের প্রভাব কাজে লাগিয়ে অর্থবহ বিকল্প না রেখেই ব্যক্তিগত তথ্য আদায় করতে পারে না। তাঁদের মতে, জবরদস্তিমূলক এই মডেল বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহারকারীদের ক্ষতি করে, যাঁরা স্বাস্থ্যসেবা পরামর্শ ও আর্থিক লেনদেনসহ জরুরি সেবার জন্য প্ল্যাটফর্মটির ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে, শিল্প খাতের কিছু পর্যবেক্ষক মেটাডেটা ও লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আয় করার অধিকারকে সমর্থন করেন। ডিজিটাল অধিকারকর্মী নিখিল পাহওয়ার মতে, বিজ্ঞাপন একটি বৈধ ব্যবসায়িক মডেল, যা বিনা মূল্যের ইন্টারনেট সেবা টিকিয়ে রাখে। তাঁর বক্তব্য, তথ্য ভাগাভাগিতে অস্বস্তি হলে ব্যবহারকারীরা সিগন্যাল বা টেলিগ্রামের মতো বিকল্পে যেতে পারেন। আর হোয়াটসঅ্যাপকে মেটার সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগিতে বাধা দিলে গুগলের সমন্বিত সেবার ক্ষেত্রেও একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। অন্য বিশ্লেষকদের মতে, হোয়াটসঅ্যাপকে অনির্দিষ্টকাল বিজ্ঞাপনমুক্ত ও মুনাফাবিহীন রাখার প্রত্যাশা ব্যবসার মৌলিক যুক্তিকে উপেক্ষা করে। কারণ, প্রতিষ্ঠানটি অধিগ্রহণের উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্যিক মূল্য সৃষ্টি করা, জনহিতকর কাজ নয়।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২১ সালের নীতিগত হালনাগাদ নিয়ে গোপনীয়তা মামলায় সুপ্রিম কোর্টের চাপের পর ২০২৬ সালের ১৬ মার্চের মধ্যে ব্যবহারকারীর সম্মতিভিত্তিক কাঠামো চালু করতে অঙ্গীকার করেছে হোয়াটসঅ্যাপ।
- জবরদস্তিমূলক তথ্য ভাগাভাগির শর্তের মাধ্যমে প্রভাবশালী অবস্থানের অপব্যবহারের দায়ে ২০২৪ সালের নভেম্বরে মেটাকে ২১৩.১৪ কোটি রুপি (২ কোটি ৫০ লাখ ডলার) জরিমানা করে ভারতের প্রতিযোগিতা কমিশন।
- ২০২১ সালের নীতিতে ২০১৬ সালের সংস্করণে থাকা তথ্য ভাগাভাগি থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ তুলে নেওয়া হয়। ফলে ভারতের ৮৫ কোটি ৩০ লাখ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীকে মেটার সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগি করতে, নয়তো অ্যাকাউন্টের সুবিধা হারাতে বলা হয়।
- ব্যক্তিগত তথ্য চুরির "ভদ্র উপায়" হিসেবে নীতিটির সমালোচনা করে সুপ্রিম কোর্ট। তথ্য ভাগাভাগির প্রভাব সম্পর্কে অজ্ঞাত ব্যবহারকারীদের শোষণ না করার ব্যাপারেও সতর্ক করে আদালত।
- ভারতের প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই প্রথম গোপনীয়তাকে মূল্যবহির্ভূত প্রতিযোগিতার একটি মানদণ্ড হিসেবে স্পষ্টভাবে বিবেচনা করেছে। এতে তথ্য সুরক্ষা ও অ্যান্টিট্রাস্ট আইনকে যুক্ত করে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া হয়েছে।
- জাতীয় কোম্পানি আইন আপিল ট্রাইব্যুনাল আর্থিক জরিমানা বহাল রাখলেও বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে তথ্য ভাগাভাগির ওপর পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়। সার্বিক নিষেধাজ্ঞার বদলে ব্যবহারকারীর পছন্দকে গুরুত্ব দেয় ট্রাইব্যুনাল।






