রাতের বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল আফগান রাজধানী
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে কাবুলের ৬ নম্বর জেলার বাসিন্দারা বিস্ফোরণের শব্দে হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে ওঠেন। বিস্ফোরণে তাঁদের ঘরবাড়ি কেঁপে ওঠে, আর আশপাশের এলাকার জানালার কাচ ভেঙে যায়। তাঁরা রাস্তায় ছুটে এসে মাথার ওপর জেটবিমানের গর্জন শোনেন এবং শহরের পশ্চিম উপকণ্ঠে একটি সামরিক অস্ত্রভান্ডারে আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখেন। এরপর কয়েক ঘণ্টা ধরে একের পর এক বিস্ফোরণে ভোর পর্যন্ত রাতের আকাশ আলোকিত হয়ে থাকে। হামলাগুলো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধকে নাটকীয়ভাবে আরও তীব্র করে তোলে। ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা সীমান্তবিরোধ রূপ নেয় এমন এক সংঘাতে, যাকে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা স্পষ্ট ভাষায় ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন।
সূচিপত্র
কাবুলে বোমাবর্ষণ ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পর প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের সবচেয়ে গুরুতর পর্যায়ের সূচনা করে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে, তারা শুধু আফগান রাজধানীতেই নয়, কান্দাহার ও পাক্তিয়া প্রদেশেও বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল তালেবানের সামরিক অবকাঠামো। জবাবে আফগান তালেবান সরকার দাবি করেছে, তারা পাকিস্তানের ভূখণ্ডের গভীরে ড্রোন হামলা চালিয়ে অ্যাবোটাবাদ ও নওশেরার কাছে সামরিক স্থাপনায় আঘাত হেনেছে। সীমান্ত থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরের এসব এলাকাকে আগে নিরাপদ বলে মনে করা হতো।
দ্রুত অবনতিশীল সংকট
কয়েক দিন আগের এক ধারাবাহিক ও ক্রমবর্ধমান ঘটনার পরই এই সহিংসতা শুরু হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি রোববার রাতে পাকিস্তান আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় নানগারহার ও পাক্তিকা প্রদেশের লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায়। ইসলামাবাদের দাবি, এসব হামলায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) অন্তত ৭০ সদস্য নিহত হয়েছেন। গোষ্ঠীটি পাকিস্তানি তালেবান বা ফিতনা আল খাওয়ারিজ নামেও পরিচিত। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ওই হামলায় নারী ও শিশুসহ ১৩ জন আফগান বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ রয়েছে।
তালেবান সরকার রোববারের হামলাকে বিনা উসকানিতে চালানো সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে আখ্যা দেয়। বৃহস্পতিবার রাতে আফগান বাহিনী পাকিস্তানি সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালায়, যেগুলোকে তারা ‘প্রতিশোধমূলক অভিযান’ বলে বর্ণনা করে। আফগান কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের বাহিনী পাকিস্তানের একাধিক সীমান্তচৌকি দখল করেছে এবং ব্যাপক হতাহত ঘটিয়েছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তান কাবুলসহ অন্যান্য শহরে বিমান হামলা চালিয়ে জবাব দেয়। একই সঙ্গে দেশটি ঘোষণা করে, তাদের ধৈর্যের বাঁধ ‘ভেঙে গেছে’।
শুক্রবার সকাল নাগাদ হতাহতের বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় ধরনের অমিল দেখা যায়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা ২৭৪ জন আফগান তালেবান যোদ্ধাকে হত্যা করেছে এবং ৮৩টি চৌকি ধ্বংস করেছে। তবে তারা ১২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে। তালেবান সরকারের দাবি, তারা ৫৫ জন পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেছে, কয়েকজনকে জীবিত আটক করেছে এবং পাকিস্তানের ১৯টি চৌকি ধ্বংস করেছে। নিজেদের বাহিনীতে মাত্র আটজন নিহত হয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা। এসব দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ দুই দেশই সংঘাতপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ সীমিত করেছে এবং তথ্যপ্রবাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে।
পরস্পরবিরোধী বয়ান ও প্রথম হামলার প্রশ্ন
সংঘাত শুরুর দায় কার, তা নির্ভর করছে কোন সরকারের বক্তব্য বিশ্বাস করা হচ্ছে তার ওপর। পাকিস্তানের বক্তব্য, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্যই তাদের পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। ইসলামাবাদের অভিযোগ, আফগান তালেবান টিটিপিকে আশ্রয় দিচ্ছে। পাকিস্তানের ভেতরে প্রাণঘাতী হামলার ঢেউয়ের জন্য এই গোষ্ঠীকে দায়ী করে দেশটি। এসব হামলার মধ্যে রয়েছে ফেব্রুয়ারিতে ইসলামাবাদের একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলা, যাতে ৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন, এবং বাজাউরে এক হামলা, যাতে ১১ জন সেনা নিহত হন। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের কাছে ‘চূড়ান্ত প্রমাণ’ আছে যে টিটিপির নেতৃত্ব তালেবান সরকারের জ্ঞাতসারে ও সমর্থনে আফগান ভূখণ্ড থেকে কার্যক্রম চালায়।
তালেবান সরকার এসব অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে বলেছে, আফগান ভূখণ্ড কোনো প্রতিবেশী দেশকে হুমকি দিতে ব্যবহৃত হয় না। তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ পাকিস্তানের বিমান হামলাকে বেসামরিক নাগরিক ও ধর্মীয় স্থাপনায় আগ্রাসন বলে আখ্যা দিয়েছেন। আফগান কর্তৃপক্ষ প্রমাণ হিসেবে জালালাবাদে এক কৃষকের বাড়িতে বোমা হামলার কথা তুলে ধরেছে। ওই হামলায় তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পাক্তিকায় একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলার কথাও উল্লেখ করেছে তারা। তালেবানের বক্তব্য, বৃহস্পতিবার রাতের অভিযান ছিল বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির কারণ হওয়া আগের পাকিস্তানি অনুপ্রবেশের বৈধ জবাব।
আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। এখন আমাদের ও আপনাদের মধ্যে প্রকাশ্য যুদ্ধ চলছে। তালেবান ভারতের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদ রপ্তানি শুরু করেছে।
সংঘাত তীব্র করার সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতে শুক্রবার এই বিবৃতি দেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ। ভারতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি ইঙ্গিত দেন, তালেবান সরকার পাকিস্তানের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তুলছে বলে ইসলামাবাদের উদ্বেগ বাড়ছে। এতে আগে থেকেই অস্থির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিরোধের কেন্দ্রে টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ
এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের অবস্থান। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপজাতীয় এলাকায় সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়ে ২০০৭ সালে একটি জোট হিসেবে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আফগান তালেবানের থেকে আলাদা হলেও দুই গোষ্ঠীর মধ্যে গভীর আদর্শিক বন্ধন, পশতুন জাতিগত পরিচয় এবং পশ্চিমা বাহিনী ও সাবেক আফগান সরকারের বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। আফগানিস্তানে দুই দশকের যুদ্ধে টিটিপি যোদ্ধারা জনবল ও কৌশলগত সহায়তা দিয়ে আফগান তালেবানের শক্তি বাড়িয়েছিল।
২০২১ সালের আগস্টে কাবুলে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানি নেতারা প্রথমে এই ঘটনাকে স্বাগত জানান। তাঁরা আশা করেছিলেন, দীর্ঘদিনের মিত্ররা পাকিস্তানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সহযোগিতা করবে। কিন্তু তালেবান কৌশলী অস্পষ্টতার পথ বেছে নেয়। ইসলামাবাদকে আশ্বস্ত করতে প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে তারা কখনো কখনো টিটিপি সদস্যদের সীমান্ত এলাকা থেকে সরিয়ে নিলেও, গোষ্ঠীটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বা এর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে আফগান সরকার। এতে পাকিস্তান নিরাপত্তা-সংকটে পড়েছে: আফগানিস্তানে তাদের সাবেক কৌশলগত মিত্র এখন দেশের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভ্যন্তরীণ হুমকিকে আশ্রয় দিচ্ছে।
জবাবে পাকিস্তান বিশ্লেষকদের ভাষায় ‘সমন্বিত চাপ প্রয়োগের’ কৌশল নিয়েছে। এতে সীমিত সামরিক হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা হচ্ছে। ইসলামাবাদ গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পারাপারের পথ বন্ধ করেছে, আফগান ট্রানজিট পণ্যে শুল্ক আরোপ করেছে এবং লাখ লাখ আফগান শরণার্থীকে বহিষ্কার করেছে। পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের ব্যয় ও ঝুঁকি এড়িয়ে টিটিপি সদস্যদের আশ্রয় দেওয়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য তালেবানের ওপর চাপ বাড়ানোই এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য। তবে এই কৌশল ধরে নেয়, টিটিপির সঙ্গে আদর্শিক সংহতির চেয়ে তালেবান অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে—যে ধারণার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অসম যুদ্ধ ও ড্রোনের ভূমিকা
দুই দেশের সামরিক শক্তির ব্যবধান স্পষ্ট। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সামরিক বাহিনী রয়েছে পাকিস্তানের। তাদের হাতে রয়েছে শত শত ট্যাংক, এফ-১৬ যুদ্ধবিমান এবং উন্নত নির্ভুল অস্ত্র। অন্যদিকে, আফগান তালেবান মূলত ২০২১ সালে পশ্চিমা বাহিনীর ফেলে যাওয়া সরঞ্জাম ও কালোবাজার থেকে কেনা অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল। চালকসহ বিমান মোতায়েন বা পাকিস্তানের ভূখণ্ডের গভীরে প্রচলিত সামরিক অভিযান চালানোর সক্ষমতা তাদের আছে বলে জানা যায় না।
তবে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত সামরিক শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে দুই দশকের গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা রয়েছে তালেবানের। বর্তমান সংঘাতে তারা নতুন ও উদ্বেগজনক এক সক্ষমতা দেখিয়েছে: ড্রোন হামলা। বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায় এমন ড্রোনে তাৎক্ষণিকভাবে তৈরি বিস্ফোরক বহন করে শুক্রবার পাকিস্তানের ভেতরে তিনটি স্থাপনায় হামলা চালায় তালেবান বাহিনী। এর মধ্যে ছিল অ্যাবোটাবাদে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি এবং নওশেরায় একটি আর্টিলারি স্কুলের কাছের এলাকা। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা ড্রোনবিধ্বংসী ব্যবস্থার সাহায্যে সেগুলো ধ্বংস করার দাবি করলেও, হামলাগুলো নজিরবিহীন দূরপাল্লার সক্ষমতা দেখিয়েছে, যা সংঘাতের ধরন বদলে দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সস্তা ও সহজলভ্য ড্রোন প্রযুক্তির কারণে অরাষ্ট্রীয় গোষ্ঠী এবং সীমিত সরঞ্জামসম্পন্ন সামরিক বাহিনী প্রচলিত সক্ষমতার চেয়ে অনেক দূরে আঘাত হানতে পারে। তালেবানের ড্রোন পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনা, এমনকি বড় শহরের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে—এই সম্ভাবনা ইসলামাবাদের জন্য ঝুঁকির বড় বৃদ্ধি। যদিও প্রচলিত যুদ্ধের সক্ষমতার বিচারে পাকিস্তান এখনও বিপুলভাবে এগিয়ে।
কূটনীতির ভাঙন
বর্তমান সহিংসতা এমন সব মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা ভেঙে পড়ারই ইঙ্গিত দেয়, যেগুলো এর আগে সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে সীমান্তপারের সংঘর্ষে ৭০ জনের বেশি নিহত হওয়ার পর কাতার ও তুরস্ক দুই পক্ষের মধ্যে ভঙ্গুর একটি যুদ্ধবিরতি করায়। আলোচকেরা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া গড়ে তোলেন এবং যাচাইয়ের নিয়মে সম্মত হন। যুদ্ধবিরতি কয়েক মাস টিকলেও টিটিপিকে আশ্রয় দেওয়া নিয়ে মূল বিরোধের সমাধান করতে পারেনি।
সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে এখন একাধিক আন্তর্জাতিক পক্ষ হস্তক্ষেপ করেছে। দুই দেশের সঙ্গেই সীমান্ত রয়েছে এমন ইরান মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি রমজান মাসে সংঘাতের সময়কাল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দুই সরকারের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং অঞ্চলটিতে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে চীনের। তারা অবিলম্বে সংযম দেখিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে এবং শক্তির বদলে কূটনীতির মাধ্যমে মতপার্থক্য মেটাতে দুই পক্ষকে আহ্বান জানিয়েছেন।
আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জালমাই খলিলজাদ পাল্টাপাল্টি হামলাকে ‘ভয়াবহ এক পরিস্থিতি, যা থামতেই হবে’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি প্রস্তাব দিয়েছেন, তুরস্কের মতো কোনো বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় পক্ষের তত্ত্বাবধানে নতুন একটি চুক্তি করা হোক, যার আওতায় কোনো দেশই নিজেদের ভূখণ্ড অন্য দেশের বিরুদ্ধে হামলায় ব্যবহৃত হতে দেবে না। তবে আগের কূটনৈতিক উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হয়েছে, কারণ তালেবান টিটিপির সঙ্গে সম্পর্ক সীমিত করতে রাজি নয় এবং পাকিস্তানের বক্তব্য, আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের অর্থ এই নয় যে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সীমান্তপারের হামলা চালানো যাবে না।
ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ ও আঞ্চলিক প্রভাব
আঞ্চলিক জোটের রদবদলের প্রেক্ষাপটে এই সংঘাত ঘটছে, যা পাকিস্তানি কৌশলবিদদের উদ্বিগ্ন করছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে তালেবানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি পাকিস্তানের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতে নজিরবিহীন সফর করেন। সফরের সময় ভারত ঘোষণা করে, কাবুলে তাদের কূটনৈতিক মিশনকে পূর্ণাঙ্গ দূতাবাসে উন্নীত করা হবে। এর মাধ্যমে ঐতিহাসিকভাবে বিরোধ থাকা সত্ত্বেও তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আগ্রহ জানায় নয়াদিল্লি। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আসিফ স্পষ্টভাবে তালেবানকে ‘ভারতের উপনিবেশ’ বলে অভিযুক্ত করেন। এতে বোঝা যায়, ইসলামাবাদ কাবুল সরকারকে শুধু ব্যর্থ প্রতিবেশী নয়, সম্ভাব্য কৌশলগত প্রতিপক্ষ হিসেবেও দেখছে।
এই নতুন মেরুকরণ আফগানিস্তানে ‘কৌশলগত গভীরতা’ তৈরির পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের নীতিকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এই ধারণার ভিত্তি ছিল কাবুলে বন্ধুত্বপূর্ণ ও অনুগত সরকার থাকা, যা ভারতের সঙ্গে সংঘাত হলে নিরাপত্তা দেবে। এর বদলে এখন পাকিস্তান এমন এক তালেবান সরকারের মুখোমুখি, যারা নিজেদের স্বাধীনতা জোর দিয়ে তুলে ধরছে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ছে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর হামলাকারী যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে। বিষয়টি বিশেষভাবে বিদ্রূপাত্মক: আফগানিস্তানে ভারতের প্রভাব ঠেকাতে ইসলামাবাদ কয়েক দশক তালেবানকে সমর্থন করেছে, অথচ তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পর সেই প্রভাবই বাড়তে দেখছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা শক্তির জন্য এই সংঘাত সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে জটিল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আফগান ভূখণ্ড থেকে টিটিপিকে বিনা বাধায় কার্যক্রম চালাতে দিলে যে ঝুঁকি, তার সঙ্গে তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ঝুঁকির ভারসাম্য ওয়াশিংটনকে বিবেচনা করতে হবে। যেকোনো হস্তক্ষেপ অনিচ্ছাকৃতভাবে রাশিয়া ও চীনের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে তালেবানের ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে পারে, অথবা মূল সশস্ত্র হুমকির সমাধান না করেই পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকট আরও গভীর করতে পারে।
মানবিক পরিণতি ও অর্থনৈতিক অবরোধ
সামরিক সংঘর্ষের বাইরে দুই দেশের বেসামরিক মানুষের ওপরও এই সংঘাত চরম দুর্ভোগ চাপিয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে দীর্ঘতম বিঘ্ন। এতে আফগানিস্তানের ছোট ব্যবসাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০২১ সালের পর আন্তর্জাতিক সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটি এমনিতেই তীব্র ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের মুখে; সীমান্ত বন্ধ থাকায় অত্যাবশ্যক ওষুধ ও পণ্যের সংকটও দেখা দিয়েছে।
পাকিস্তানে কর্তৃপক্ষ ব্যাপকভাবে আফগান শরণার্থীদের ফেরত পাঠিয়েছে। কয়েক দশক ধরে দেশটিতে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সীমান্তের দুই পাশের এলাকাগুলো থেকে বেসামরিক মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং তোরখাম সীমান্ত পারাপারের কাছে শরণার্থীশিবিরগুলো গোলার আঘাতে পড়েছে। কাবুলের বাসিন্দারা হতাশা প্রকাশ করেছেন যে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর তাঁরা যে তুলনামূলক নিরাপত্তা পেয়েছিলেন, তা হারিয়ে গেছে।
কাবুলে হামলার শিকার অস্ত্রভান্ডারের কাছে বসবাসকারী ট্যাক্সিচালক তামিম মধ্যরাতের কিছু পর বোমাবর্ষণ শুরু হলে আতঙ্কের কথা জানান। তিনি বলেন, “বাড়ির দ্বিতীয় তলা থেকে সবাই দৌড়ে নিচে নেমে এসেছিল।” তিনি আরও বলেন, “অস্ত্রভান্ডারের ভেতরের গোলাবারুদ নিজে থেকেই বিস্ফোরিত হতে থাকল।” চার দশকের যুদ্ধ পেরিয়ে আসা সাধারণ আফগানদের কাছে রাজধানীতে আবার বিমান হামলা শুরু হওয়া তাঁদের জীবনের ২০২১ সালের পর একমাত্র সামান্য উন্নতির ভয়াবহ উল্টোযাত্রা: আকাশ থেকে আর বোমা না পড়া।
যা জানা জরুরি
- তালেবানের ড্রোন হামলা ও পাকিস্তানি অবস্থানে স্থল আক্রমণের পর পাকিস্তান আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ ঘোষণা করে। জবাবে কাবুল, কান্দাহার ও পাক্তিয়ায় বিমান হামলা চালায় তারা।
- তাৎক্ষণিক সংঘাতের সূত্রপাত ২২ ফেব্রুয়ারি কথিত টিটিপি যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে পাকিস্তানি হামলা দিয়ে। এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তানের পাল্টা হামলা এবং পরে পাকিস্তানের যুদ্ধ ঘোষণার ঘটনা ঘটে।
- পাকিস্তানের অভিযোগ, আফগান তালেবান তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে (টিটিপি) আশ্রয় দিচ্ছে। ইসলামাবাদ সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলাগুলোর জন্য এই গোষ্ঠীকে দায়ী করে, যার মধ্যে ইসলামাবাদের একটি মসজিদে বোমা হামলাও রয়েছে।
- তালেবান সরকার টিটিপিকে সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির জবাবেই তারা এসব পদক্ষেপ নিয়েছে।
- তালেবান বাহিনী নতুন ড্রোন যুদ্ধ সক্ষমতা দেখিয়ে পাকিস্তানের ভেতরে অ্যাবোটাবাদ ও নওশেরার কাছের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। তবে পাকিস্তানের দাবি, তারা ড্রোনগুলো প্রতিহত করেছে।
- ২০২৫ সালের অক্টোবরে কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে। ক্রমবর্ধমান সংঘাতে এখন তুরস্ক, ইরান, চীন ও সৌদি আরব মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে।
- পাকিস্তানের অভিযোগ, তালেবান সরকার ভারতের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে। এতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে আফগানিস্তানকে পাকিস্তানের কৌশলগত পশ্চাৎভূমি হিসেবে দেখা হয়েছে।
- ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। এতে সীমান্তের দুই পাশের মানবিক সংকট আরও তীব্র হচ্ছে এবং পাকিস্তানে থাকা লাখ লাখ আফগান শরণার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।






