বড় বৈপরীত্য
২০২৫ সালে চীন এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক অর্জন করে, যা দেখে মনে হতে পারে কয়লার যুগের অবসান আসন্ন। দেশটি ৩১৫ গিগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা এবং ১১৯ গিগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ সক্ষমতা স্থাপন করেছে। এর ফলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অ-জীবাশ্ম জ্বালানির উৎসগুলো তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনকে ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমানে মোট স্থাপিত সক্ষমতার ৬০ শতাংশের বেশি আসে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি থেকে। অন্যদিকে, জুনে প্রকৃত বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার অংশ কমে ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৫১ শতাংশে নেমে আসে।
সূচিপত্র
তবু একই সময়ে চীন ৭৮ গিগাওয়াট নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চালু করেছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক পরিমাণ। ৫০টির বেশি বড় কয়লাভিত্তিক ইউনিট, যার প্রতিটির উৎপাদন সক্ষমতা ১ গিগাওয়াট বা তার বেশি, চালু হয়েছে। তুলনার জন্য বলা যায়, ব্যবহারের ধরন অনুযায়ী ১ গিগাওয়াট বিদ্যুতে কয়েক লাখ থেকে ২০ লাখেরও বেশি বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব।
নির্মাণের ব্যাপকতা বিস্ময়কর। শুধু ২০২৫ সালেই চীন গত পুরো এক দশকে ভারতের চালু করা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার চেয়েও বেশি সক্ষমতা চালু করেছে।
এ স্পষ্ট বৈপরীত্যের চিত্র উঠে এসেছে সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার এবং গ্লোবাল এনার্জি মনিটরের যৌথ প্রতিবেদনে। বিশ্লেষণে বিশ্বের বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশটির সামনে থাকা মূল টানাপোড়েন তুলে ধরা হয়েছে: পরিচ্ছন্ন জ্বালানি গ্রিড থেকে কয়লাকে সরিয়ে দিলেও জীবাশ্ম জ্বালানিটির অবকাঠামো এমন গতিতে বিস্তৃত হচ্ছে, যা কয়েক দশকের জন্য নিঃসরণ আটকে রাখার ঝুঁকি তৈরি করছে।
এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ নির্মাণ
২০২৫ সালে যুক্ত হওয়া ৭৮ গিগাওয়াট সাম্প্রতিক প্রবণতা থেকে বড় বিচ্যুতি। এর আগের দশকে চীন বছরে ২০টিরও কম বড় কয়লাভিত্তিক ইউনিট চালু করেছিল। ২০২৫ সালের পরিমাণ ২০১৬ সালের পর এমন নির্মাণমাত্রায় প্রত্যাবর্তনকে চিহ্নিত করছে। পূর্বাভাস বলছে, পুরো বছরে নতুন সক্ষমতা ৮০ গিগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে।
শুধু ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই ২১ গিগাওয়াট সক্ষমতা চালু হয়েছে, যা ২০১৬ সালের পর প্রথমার্ধের সর্বোচ্চ পরিমাণ। বছরটিতে ৮৩ গিগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতার নির্মাণ শুরু হয়েছে, আর আরও ৪৬ গিগাওয়াটের নির্মাণকাজ আবার শুরু হয়েছে। এ পরিমাণ দক্ষিণ কোরিয়ার পুরো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সমান। এতে ইঙ্গিত মিলছে, ২০২৬ ও ২০২৭ সালেও নতুন প্রকল্প চালুর আরেকটি ঢেউ আসবে।
২০২৫ সালে নতুন ও পুনরুজ্জীবিত প্রকল্পের প্রস্তাবের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬১ গিগাওয়াটে, যা রেকর্ড। সম্ভাব্য নীতিগত কঠোরতার আগে অনুমোদন নিশ্চিত করতে শিল্পখাতের তৎপরতার ইঙ্গিত দেয় এ সংখ্যা। বছরের শেষ নাগাদ উন্নয়নাধীন প্রকল্পের তালিকায় ২৯১ গিগাওয়াট সক্ষমতা ছিল, যেগুলো অনুমোদিত অথবা নির্মাণাধীন। তা চীনের বর্তমানে চালু কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতার প্রায় ২৩ শতাংশ।
এই সম্প্রসারণ মূলত কয়লা-সমৃদ্ধ পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে কেন্দ্রীভূত। প্রকল্প চালু এবং নির্মাণ শুরুর উভয় ক্ষেত্রেই শিনজিয়াং, ইনার মঙ্গোলিয়া ও শানসি এগিয়ে ছিল। নতুন অনুমোদিত প্রকল্পের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি অর্থায়ন করেছে কয়লা খনন কোম্পানি অথবা খনন কার্যক্রম রয়েছে এমন জ্বালানি গোষ্ঠী। ২০৩০ সাল এবং তার পরেও নিজেদের উৎপাদিত কয়লার স্থিতিশীল চাহিদা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।
জলবায়ু লক্ষ্যের চেয়ে জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার
চীন কেন নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে, তার উত্তর নিহিত রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, গ্রিডের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের সমন্বয়ে। ২০২১ ও ২০২২ সালে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনে তীব্র খরার কারণে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায়। এতে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয়, কারখানা বন্ধ করতে হয় এবং কয়েকটি শহরে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। এসব সংকটের স্মৃতি আজও নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলছে।
চীনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার প্রধান সংস্থা ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিফর্ম কমিশন বলেছে, আগামী বহু বছর কয়লাকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ও ভারসাম্য রক্ষাকারী ভূমিকা পালন করতে হবে। সরকারের দৃষ্টিতে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের অপরিহার্য বিকল্প উৎস হলো কয়লা, কারণ এসব নবায়নযোগ্য উৎস আবহাওয়া ও দিনের সময়ের ওপর নির্ভরশীল। পুরোনো ব্যবস্থা সরানোর আগে নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার দর্শন হিসেবে পরিচিত এ নীতিতে রূপান্তরকালে স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত উৎপাদনশিল্পে প্রভাবশালী হয়ে ওঠার চীনা প্রচেষ্টাও বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বর্তমানের সংরক্ষণ ও সঞ্চালন সীমাবদ্ধতার কারণে ডেটা সেন্টার ও কারখানার জন্য নির্ভরযোগ্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার, যা শুধু নবায়নযোগ্য জ্বালানি এখনো নিশ্চিত করতে পারে না। চীনের ১৪০ কোটি মানুষের আরও বেশি মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে প্রবেশ করায় শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও গৃহস্থালি সরঞ্জামের চাহিদা বাড়ছে। শুধু ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়েছে ৩.৭ শতাংশ।
২০২১ ও ২০২২ সালের বিদ্যুৎ সংকট জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ আরও জোরালো করে। কয়েকটি কারখানায় সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ হয় এবং একটি শহরে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। এর জবাবে সরকার আরও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ইঙ্গিত দেয়, ফলে নির্মাণের জন্য আবেদন ও অনুমোদনের সংখ্যা বেড়ে যায়।
অনুমোদন-প্রক্রিয়ার জট
২০২৫ সালে সক্ষমতা বৃদ্ধির বড় অংশের সূত্রপাত ২০২২ সালে শুরু হওয়া অনুমোদন-দৌড় থেকে। বিদ্যুৎ সংকটের পর প্রাদেশিক সরকারগুলো ২০২২ ও ২০২৩ সালে প্রতিবছর ১০০ গিগাওয়াটের বেশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অনুমোদন দেয়। সপ্তাহে গড়ে দুটি নতুন প্রকল্পের অনুমোদন হয়। এ ঢেউয়ের পেছনে ছিল জাতীয় কার্বন লক্ষ্যের পরিবর্তে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয় উদ্বেগ।
সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের চীন-বিষয়ক বিশ্লেষক চি ছিন ব্যাখ্যা করেছেন, কেন এই নির্মাণ অব্যাহত রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “একবার অনুমোদন দেওয়া হলে প্রকল্পগুলো ফিরিয়ে নেওয়া কঠিন।” বাজারের পরিস্থিতি বদলালেও আমলাতান্ত্রিক গতি অব্যাহত থাকে। ২০২৪ সালে নির্মাণের পরিমাণ ১০ বছরের সর্বোচ্চ ৯৪.৫ গিগাওয়াটে পৌঁছে, যা ২০২৫ সালের প্রকল্প চালুর জোয়ারের পটভূমি তৈরি করে।
২০২৫ সালের প্রথমার্ধে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে মাত্র ২৫ গিগাওয়াটের জন্য, যা সর্বোচ্চ পর্যায়ের বছরগুলোর তুলনায় কম। তবে ওই সময় নতুন ও পুনরুজ্জীবিত প্রকল্পের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৫ গিগাওয়াটে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ তৎপরতা ইঙ্গিত দেয়, ২০৩০ সালের কার্বন নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সময়সীমার আগে কয়লাভিত্তিক প্রকল্প সম্প্রসারণে শিল্পখাত শেষ মুহূর্তের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
রাজনৈতিক ও আর্থিক চাপের কারণে কেন্দ্রগুলো চালু রাখা হতে পারে, ফলে অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎসের জন্য জায়গা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। চীনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতার সম্প্রসারণ শেষ পর্যন্ত নিঃসরণ বাড়াবে কি না, তা নির্ভর করবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ভূমিকা সত্যিকার অর্থে শুধু বিকল্প ও সহায়ক উৎস হিসেবে সীমিত রাখা হয় কি না, মূল নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন উৎস হিসেবে নয়—বলেছেন চি।
বিশ্বে ব্যতিক্রম চীন
চীন যখন নির্মাণ করছে, তখন বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এগোচ্ছে উল্টো পথে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বজুড়ে চালু হওয়া নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৮৭ শতাংশ এসেছে চীন ও ভারত থেকে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রায় ২০২৩ সালের পুরো অবসরের পরিমাণের সমান সক্ষমতা বন্ধ করেছে; বন্ধ হওয়া কেন্দ্রের পরিমাণ ২.৫ গিগাওয়াট। ২০২৫ সালের জুনে আয়ারল্যান্ড কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ পুরোপুরি বন্ধ করা ইইউর পঞ্চম দেশ হয়।
লাতিন আমেরিকায় হন্ডুরাস ও ব্রাজিলে প্রকল্পের প্রস্তাব বাতিল হওয়ায় সাম্প্রতিক স্মৃতিতে প্রথমবারের মতো অঞ্চলটিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কোনো সক্রিয় প্রস্তাব নেই। এর আগে মে মাসে হন্ডুরাস পাওয়ারিং পাস্ট কোল অ্যালায়েন্সে যোগ দেয়। ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগত পরিবর্তন সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৫ সালে ২০২৪ সালের চেয়ে বেশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ১০০ গিগাওয়াট সক্ষমতা বন্ধের পরিকল্পনা করছে।
এই ভিন্নতা বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থায় বিভাজন তৈরি করছে। উন্নত অর্থনীতিগুলো পরিকল্পিতভাবে কয়লার অবকাঠামো ভেঙে ফেলছে, আর চীন ও ভারত উন্নয়নের চাহিদা ও গ্রিডের স্থিতিশীলতার কথা বলে তা সম্প্রসারণ করছে। বিশ্বে পোড়ানো মোট কয়লার অর্ধেকেরও বেশি ব্যবহার করে একা চীন। ফলে দেশটির সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী নিঃসরণের গতিপথের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর অংশীদারত্ব এগিয়ে চলেছে। দেশগুলো কয়লার ব্যবহার বজায় রাখার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত তা বন্ধ করার পরিকল্পনাও করছে। বিপরীতে, চীন কয়লা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করার কোনো সময়সীমা প্রকাশ্যে আলোচনা করেনি; ফলে বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় জ্বালানিটি গভীরভাবে যুক্ত রয়ে গেছে।
সক্ষমতা বাড়লেও উৎপাদন কমছে
এখানেই মূল ধাঁধা: রেকর্ড পরিমাণ সক্ষমতা যুক্ত হওয়া সত্ত্বেও চীনের বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ভূমিকা আসলে কমছে। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ২.৯ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে যথাক্রমে ২০ শতাংশ ও ১০.৬ শতাংশ। বিদ্যুতের চাহিদায় নিট যতটুকু বৃদ্ধি হয়েছে, তার সবটাই মিটিয়েছে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি। ফলে নতুন কেন্দ্র চালু হলেও মোট উৎপাদনে কয়লার অংশ কমেছে।
চীনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন গড়ে সময়ের মাত্র ৪৭ শতাংশ চালু থাকে; আগে এ হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ। ব্যবহার কমে আসার এই হার থেকে বোঝা যায়, অতিরিক্ত সক্ষমতা ইতিমধ্যেই ব্যাপক আকার নিচ্ছে। সিডনিভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট এনার্জি ফাইন্যান্সের পরিচালক টিম বাকলি জানান, ২০২৫ সালে চীনের গড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সময়ের মাত্র ৪৭ শতাংশ চালু ছিল, যা রেকর্ড সর্বনিম্ন। তিনি বলেন, “নবায়নযোগ্য জ্বালানি স্থাপনের বর্তমান গতি যদি প্রায় বজায় থাকে এবং আগামী দশকে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বছরে ১০ গিগাওয়াটে পৌঁছায়, তাহলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রথমে স্থিতিশীল হবে, এরপর ধীরে ধীরে কমবে।”
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস, ২০২৭ সালের মধ্যে চীনের কয়লার চাহিদা কমে ৪,৮৭৯ মিলিয়ন টনে দাঁড়াবে এবং ২০৩০ সাল নাগাদ আরও কমে ৪,৭৭২ মিলিয়ন টন হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের বিদ্যুতের ৪৯ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বলে আশা করা হচ্ছে, যা কয়লাকে ছাড়িয়ে যাবে। এই পতন যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমান নীতির অধীনে কয়লার ব্যবহার বাড়ার যে পূর্বাভাস রয়েছে, তার চেয়েও বেশি হবে।
এদিকে, ২০২৫ সালে চীন প্রায় ৭৪ গিগাওয়াট নতুন জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা যুক্ত করেছে, যা একই বছরে চালু হওয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতার কাছাকাছি। নমনীয়তাভিত্তিক ব্যবস্থার সম্পদের দিকে এই পরিবর্তন সর্বোচ্চ চাহিদা মেটানো ও গ্রিডের ভারসাম্য রক্ষায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ভূমিকা ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে।
অচল সম্পদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি
উন্নয়নাধীন প্রকল্পের তালিকায় ২৯১ গিগাওয়াট সক্ষমতা এবং ব্যবহার হার দ্রুত কমে যাওয়ায় অচল সম্পদের সম্ভাব্য ঢেউয়ের মুখে রয়েছে দেশটি। নির্মাণ ব্যয় উঠে আসার আগেই এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র অলাভজনক হয়ে পড়তে পারে। ২০২৫ সালে সক্ষমতা বৃদ্ধির ঢেউ কয়লা শিল্পের অংশীজনদের নীতিগত বিধিনিষেধ কঠোর হওয়ার আগে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার তাড়াহুড়োর প্রতিফলন। এতে বিনিয়োগ অপচয় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অর্থনৈতিকভাবে কয়লার অবস্থান দুর্বল হলেও কিছু কাঠামোগত বিষয় এর সুরক্ষা দিচ্ছে। প্রাদেশিক বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি এবং কয়লা সরবরাহ চুক্তির মাধ্যমে কয়লার ব্যবহার নিশ্চিত করে, যা খরচ যেমনই হোক বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই জ্বালানি ব্যবহার করতে বাধ্য করে। সক্ষমতার জন্য অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা নমনীয়তা বা প্রকৃত কার্যকারিতার বদলে স্থাপিত কয়লাভিত্তিক সক্ষমতাকে পুরস্কৃত করে। এসব ব্যবস্থা কয়লাকেন্দ্রগুলোকে বাজারের প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দেয়, অথচ বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উন্নয়নকারীদের মূল্য ওঠানামা ও অনিশ্চিত চাহিদার মুখে পড়তে হয়।
এর ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সীমিত করার ঘটনা বাড়ছে। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে এ হার সম্ভবত প্রায় ৫.৫ শতাংশ ছিল, সরকারি হিসাবে জানানো ৩.২ শতাংশ নয়। এর কারণ আবহাওয়ার বদলে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। নমনীয়তাহীন বিদ্যুৎ সঞ্চালন বিধিসহ বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বহর কয়লাকে ব্যবস্থায় আটকে রেখে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির কার্যক্রমের সুযোগ সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধের গতিও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ধীর। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে মাত্র ১ গিগাওয়াট সক্ষমতা বন্ধ হয়েছে, ফলে ২০২১ সাল থেকে মোট বন্ধ হওয়া সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ১৬ গিগাওয়াটে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ৩০ গিগাওয়াট সক্ষমতা বন্ধের ১৪তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য পূরণ করতে হলে দ্বিতীয়ার্ধে আরও ১৩ গিগাওয়াট বন্ধ করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, তা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে।
১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার সন্ধিক্ষণ
চীনের ২০৩০ সালের জলবায়ু অঙ্গীকার এখন অনিশ্চয়তার মুখে। দেশটি ২০৩০ সালের আগে কার্বন নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে তা কমানোর এবং ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের অঙ্গীকার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব লক্ষ্য পূরণে ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের নিঃসরণ বাড়তে দেওয়া যাবে না। এ জন্য নতুন কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র নির্মাণের বদলে এখনই বিদ্যমান সক্ষমতা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে হবে।
২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, যা মার্চে অনুমোদিত হওয়ার কথা, নীতিনির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। গবেষকেরা বেইজিংকে বিদ্যুৎ খাতে নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর সুস্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ, কয়লাভিত্তিক নতুন প্রকল্পের অনুমোদন বন্ধ এবং পুরোনো, অদক্ষ বা কম ব্যবহৃত ইউনিট দ্রুত বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছেন। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা নিট বাড়ানো বন্ধের স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না এলে জ্বালানি রূপান্তরের পথে কাঠামোগত বাধা স্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনের আগে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে চীনের জাতীয় অঙ্গীকার—ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনস—ঘোষণা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায়ও এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। নীতির দিকনির্দেশনা চীনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ খাতের গতিপথ এবং তার সঙ্গে দেশের নিঃসরণের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা কেবল আরেকটি পরিকল্পনা চক্র নয়; বরং চীনের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক, জলবায়ু ও জ্বালানি নিরাপত্তার লক্ষ্য অনুযায়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণের এক निर्णায়ক সুযোগ। সংস্কার না হলে কয়লায় বিনিয়োগ করা শত শত কোটি অর্থ অচল সম্পদে পরিণত হওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মূল বিষয়গুলো
- ২০২৫ সালে চীন ৭৮ গিগাওয়াট নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চালু করেছে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ বার্ষিক পরিমাণ। একই সময়ে দেশটি ৩১৫ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ও ১১৯ গিগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করেছে।
- খরা ও সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে বিদ্যুৎ সংকটের পর ২০২২-২০২৩ সালে অনুমোদনের ঢেউ থেকে এ সম্প্রসারণের সূত্রপাত। ২০২৫ সালে নতুন ও পুনরুজ্জীবিত প্রকল্পের প্রস্তাব রেকর্ড ১৬১ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে।
- বিশ্বের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ সক্ষমতা বৃদ্ধির ৮৭ শতাংশের জন্য সম্মিলিতভাবে দায়ী চীন ও ভারত। অন্যদিকে ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকা কয়লার ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধ করছে।
- নতুন নির্মাণ সত্ত্বেও ২০২৫ সালের মাঝামাঝি বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার অংশ ৯ বছরের সর্বনিম্ন ৫১ শতাংশে নেমেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রবৃদ্ধি বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধির পুরোটা মিটিয়েছে, আর কয়লাকেন্দ্রের ব্যবহার নেমে এসেছে ৪৭ শতাংশে।
- উন্নয়নাধীন প্রকল্পের তালিকায় থাকা ২৯১ গিগাওয়াট সক্ষমতার কারণে অচল সম্পদ ও অতিরিক্ত সক্ষমতার ঝুঁকিতে রয়েছে চীন। ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০২৬-২০৩০) কয়লার সম্প্রসারণ সীমিত না করা হলে এ ঝুঁকি বাড়বে।
- আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে চীনের কয়লার চাহিদা কমতে শুরু করবে। এতে অব্যাহত নির্মাণের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।






