কোরীয় ভাষা শিক্ষার ঐতিহাসিক স্বীকৃতি
জাতীয় শিক্ষা কাঠামোতে কোরীয় ভাষার মর্যাদা আনুষ্ঠানিক করার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে ভিয়েতনাম। দেশটির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি একটি মন্ত্রণালয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত জারি করে কোরীয় ভাষা দক্ষতা পরীক্ষা (টপিক)-কে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য বৈধ যোগ্যতা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০২৬ সালের পরীক্ষা চক্র থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই নীতির ফলে দক্ষিণ কোরিয়ার বাইরে টপিককে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ব্যবস্থায় যুক্ত করা দ্বিতীয় অঞ্চল হবে ভিয়েতনাম। এর আগে ২০২৫ সালে হংকং এই ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
সূচিপত্র
- কোরীয় ভাষা শিক্ষার ঐতিহাসিক স্বীকৃতি
- নতুন নীতি যেভাবে ভিয়েতনামের পরীক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে
- অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও কর্মসংস্থানের চাহিদায় ভাষাটির জনপ্রিয়তা
- কোরীয় ভাষা শিক্ষার বৈশ্বিক বিস্তারে ভিয়েতনামের ভূমিকা
- কঠোর মানদণ্ডে পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত
- দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কৌশলগত তাৎপর্য
- যা জানা জরুরি
এই সিদ্ধান্তের সময় ভিয়েতনামের বার্ষিক শিক্ষাপঞ্জির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশটির জাতীয় উচ্চমাধ্যমিক সমাপনী পরীক্ষা জুনের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হয়। ফলে ২০২৬ সালের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরাই প্রথম দল, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনে টপিকের নম্বর ব্যবহার করতে পারবে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে যাওয়া শিক্ষার্থীরা এমন একটি সহজতর ভর্তি প্রক্রিয়ার সুবিধা পাবে, যেখানে তাদের কোরীয় ভাষার দক্ষতাকে প্রচলিত বিদেশি ভাষার পরীক্ষার ফলের সমতুল্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
এই অগ্রগতি শুধু প্রশাসনিক সুবিধার বিষয় নয়। শিক্ষামন্ত্রী চোই কিয়ো-জিন এ সিদ্ধান্তকে কোরীয় ভাষার ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মর্যাদা এবং পরীক্ষাটির বাড়তে থাকা গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
বিদেশে কোরীয় ভাষা শিক্ষা প্রসারে এবং এর বিস্তারে পূর্ণ সহায়তা দিতে মন্ত্রণালয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যাবে।
এই স্বীকৃতির ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিয়েতনামের গ্রহণ করা অন্যান্য বড় আন্তর্জাতিক মানসম্মত পরীক্ষার পাশে স্থান পেল টপিক। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য স্যাট, পিএসএটি ও এপি পরীক্ষা আয়োজন করতে কলেজ বোর্ডের সঙ্গে অংশীদারত্বসহ বৈশ্বিক মূল্যায়ন কাঠামোতে অংশগ্রহণ ক্রমাগত বাড়িয়েছে দেশটি। এই সর্বশেষ সংযোজন বহুভাষিক শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে ভিয়েতনামের কৌশলগত অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
নতুন নীতি যেভাবে ভিয়েতনামের পরীক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনছে
ভিয়েতনামের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ব্যবস্থা মূলত উচ্চমাধ্যমিক সমাপনী পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এটি দক্ষিণ কোরিয়ার কলেজ স্কলাস্টিক অ্যাবিলিটি টেস্টের অনুরূপ দেশব্যাপী একটি মূল্যায়ন। এই কঠোর ব্যবস্থায় উচ্চশিক্ষায় ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করতে শিক্ষার্থীদের চারটি ভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা দেখাতে হয়। গণিত ও ভিয়েতনামি সাহিত্য বাধ্যতামূলক বিষয়। পাশাপাশি বিদেশি ভাষা, ইতিহাস, ভূগোল, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও প্রযুক্তিশিক্ষাসহ নয়টি ঐচ্ছিক বিষয়ের মধ্য থেকে আরও দুটি বেছে নিতে হয়।
টপিক যুক্ত হওয়ায় বিদেশি ভাষার শর্ত পূরণের পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। আগে বিদেশি ভাষার ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে কোরীয় ভাষা বেছে নেওয়া ভিয়েতনামি শিক্ষার্থীদের সমাপনী পরীক্ষার কেন্দ্রে আলাদা কোরীয় ভাষার পরীক্ষায় বসতে হতো। সংশোধিত ব্যবস্থায় টপিকে লেভেল ৩ বা তার বেশি অর্জনকারী শিক্ষার্থীরা একটি ঐচ্ছিক বিষয় থেকে পুরোপুরি অব্যাহতি পাবে। তাদের রূপান্তরিত টপিক নম্বর সরাসরি সমাপনী পরীক্ষার আনুষ্ঠানিক ফলাফলে যুক্ত হবে।
লেভেল ৩-এর দক্ষতা বলতে কোরীয় ভাষায় মধ্যম পর্যায়ের জ্ঞান বোঝায়। এ পর্যায়ে পরীক্ষার্থীরা দৈনন্দিন সামাজিক পরিস্থিতি সামলাতে এবং কর্মক্ষেত্রে মৌলিক যোগাযোগে যথেষ্ট নির্ভুলতার সঙ্গে অংশ নিতে পারে। এ মান নিশ্চিত করে যে অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের ব্যবহারিক ভাষাদক্ষতা রয়েছে, শুধু পরীক্ষায় ভালো করার একাডেমিক দক্ষতা নয়। নম্বর রূপান্তরের সূত্রে শিক্ষার্থীরা প্রচলিত পরীক্ষার অংশের বদলে মানসম্মত পরীক্ষায় নিজেদের ফল ব্যবহার করতে পারে। এতে কঠোর মূল্যায়ন মান বজায় রেখেই তাদের পরীক্ষার চাপ কার্যকরভাবে কমে।
এই অব্যাহতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুতিতে কৌশলগত সুবিধা দেয়। জুনের পরীক্ষার আগেই অর্জিত টপিকের নম্বরকে স্বীকৃতি দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা অন্য বিষয়ের প্রস্তুতিতে সময় দিতে পারে অথবা সামগ্রিক পরীক্ষার চাপ কমাতে পারে। ভিয়েতনামের সমাপনী পরীক্ষায় ইংরেজি, চীনা, জাপানি, ফরাসি, জার্মান, রুশ ও কোরীয় ভাষা ইতিমধ্যে বিদেশি ভাষার বিকল্প হিসেবে রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোরীয় ভাষাই এখন টপিকের স্বীকৃতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানে পরীক্ষিত হওয়ার অনন্য সুবিধা দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও কর্মসংস্থানের চাহিদায় ভাষাটির জনপ্রিয়তা
ভিয়েতনামে কোরীয় ভাষাকে প্রধান বিদেশি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার পেছনে শুধু সাংস্কৃতিক আগ্রহ নয়, বাস্তব অর্থনৈতিক কারণও রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার করপোরেট বিনিয়োগ ভিয়েতনামের শিল্পখাতের চিত্র বদলে দিয়েছে। হুন্দাই মোটর কোম্পানি ও পস্কোর মতো বৃহৎ প্রতিষ্ঠান দেশজুড়ে উল্লেখযোগ্য উৎপাদন ও কার্যক্রমের ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। এই অর্থনৈতিক উপস্থিতির কারণে ভিয়েতনামি কর্মী ও কোরীয় ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মধ্যে যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করতে সক্ষম দ্বিভাষিক পেশাজীবীদের চাহিদা অব্যাহত রয়েছে।
শ্রমবাজারের তথ্য ভিয়েতনামের অর্থনীতিতে কোরীয় ভাষার ব্যবহারিক মূল্য তুলে ধরে। কোরীয় ভাষায় দক্ষতা চাওয়া পদগুলোতে প্রায়ই ভাষা ভাতা হিসেবে বাড়তি বেতন দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের নিবিড় ভাষা শিক্ষা গ্রহণে সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা তৈরি হয়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোরীয় ভাষায় কথা বলতে পারেন এমন কর্মী খোঁজে প্রতিষ্ঠানগুলো; এর মধ্যে রয়েছে দোভাষী, বিক্রয়, মান নিয়ন্ত্রণ, ক্রয় ও শ্রম ব্যবস্থাপনা। কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভিয়েতনামে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো অব্যাহত রাখায় দ্বিভাষিক কর্মীর জন্য মানবসম্পদ চাহিদাও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
এই অর্থনৈতিক প্রয়োজন তাৎক্ষণিক কর্মসংস্থানের বাইরেও দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত। কোরীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয়ভাবে কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রধান কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয় এমন ব্যবস্থাপনা পদে ভিয়েতনামি কর্মীদের উন্নীত করার সঙ্গে সঙ্গে কোরীয় ভাষায় দক্ষতা শুধু প্রাথমিক পর্যায়ের বাড়তি যোগ্যতা নয়, পদোন্নতির পূর্বশর্ত হয়ে উঠছে। পেশাগত উন্নতির এই স্পষ্ট সম্ভাবনা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের টপিক লেভেল ৩ বা তার বেশি অর্জনে উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় করতে উৎসাহিত করছে। তারা জানে, ভাষা শেখায় বিনিয়োগ শ্রমবাজারে পরিমাপযোগ্য সুফল দেয়।
টপিক পরীক্ষার্থীর ধারাবাহিক উচ্চ সংখ্যা প্রমাণ করে, শিক্ষার্থীরা কোরীয় ভাষার দক্ষতাকে পেশাগত উন্নয়নে বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে। ২০২৫ সালে ভিয়েতনামে টপিক পরীক্ষার্থী ছিল ৮৫,৮৯৬ জন। বিশ্বের মোট আবেদনকারীর ১৫.২ শতাংশ নিয়ে বিদেশি পরীক্ষার্থীর বৃহত্তম উৎস ছিল দেশটি। এ সংখ্যা শুধু কোরীয় সংস্কৃতির প্রতি সাধারণ আগ্রহ নয়, বরং কর্মসংস্থানে সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে সচেতন প্রস্তুতির প্রতিফলন।
কোরীয় ভাষা শিক্ষার বৈশ্বিক বিস্তারে ভিয়েতনামের ভূমিকা
কোরীয় ভাষা শিক্ষার অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক বিস্তারের সময়েই ভিয়েতনামের এই নীতিগত সিদ্ধান্ত এসেছে। বর্তমানে ৪৭টি দেশের ২,৭৭৭টি প্রাথমিক, মধ্য ও উচ্চবিদ্যালয়ে কোরীয় ভাষার ক্লাস চালু রয়েছে। আনুষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমে এতে অংশ নিচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী। ২৪টি দেশ তাদের জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় কোরীয় ভাষাকে আনুষ্ঠানিক দ্বিতীয় বিদেশি ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। ১১টি দেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির মূল্যায়নেও কোরীয় ভাষা যুক্ত করেছে।
এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের অংশগ্রহণের পরিসর উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশটির ১৬৯টি স্কুলে কোরীয় ভাষা পড়ানো হচ্ছে এবং এতে ভর্তি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৩,২৭১। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কোরীয় ভাষা শিক্ষার সবচেয়ে উন্নত অবকাঠামোগুলোর একটি রয়েছে ভিয়েতনামে। ২০২০ সালে ঐচ্ছিক বিদেশি ভাষা হিসেবে কোরীয় ভাষা চালুর সিদ্ধান্তের পর এই শিক্ষাভিত্তি দ্রুত গড়ে ওঠে। ২০২১ সালের মধ্যে ভাষাটি প্রধান বিদেশি ভাষার মর্যাদা পায় এবং জাতীয় উচ্চমাধ্যমিক সমাপনী পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
ভিয়েতনাম ও কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা এই জাতীয় নীতির ভিত্তি তৈরি করেছে। ২০১৯ সাল থেকে হো চি মিন সিটির ইউনিভার্সিটি অব ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সের মতো প্রতিষ্ঠান ওয়ানকওয়াং হেলথ সায়েন্স ইউনিভার্সিটির মতো কোরীয় অংশীদারদের সঙ্গে মিলে নিবিড় টপিক প্রস্তুতি কোর্স চালু করেছে। শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে দেওয়া এসব কোর্সে কোরীয় শিক্ষকেরা পড়াতেন। পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত আনুষ্ঠানিক কোরীয় ভাষা ও সংস্কৃতি কেন্দ্র, কিং সেজং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার পথও তৈরি করেছে এসব উদ্যোগ।
শিক্ষার্থী চলাচলের পরিসংখ্যান ভিয়েতনাম ও কোরিয়ার শিক্ষাগত সম্পর্কের গভীরতা তুলে ধরে। ২০২৫ সালে প্রায় ৭৫,১৪৪ জন ভিয়েতনামি শিক্ষার্থী দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর উৎস হিসেবে চীনের পরেই ছিল ভিয়েতনাম। শিক্ষার্থীদের এই বড় প্রবাহ ভাষা শিক্ষার চাহিদাকে আরও বাড়ায়। বিদেশে পড়াশোনা শেষে ফিরে আসা স্নাতকেরা কোরীয় ভাষা জানার ব্যবহারিক সুফল দেখালে শিক্ষার বিকল্প বিবেচনাকারী নতুন শিক্ষার্থীরাও উৎসাহিত হয়।
বিদেশি ভাষা হিসেবে কোরীয় ভাষার বৈশ্বিক অবস্থান নাটকীয়ভাবে এগিয়েছে। ভাষা শেখার প্ল্যাটফর্ম ডুওলিঙ্গোর তথ্যমতে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি শেখা ভাষার তালিকায় এখন কোরীয় ভাষার অবস্থান ষষ্ঠ। এর আগে রয়েছে ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফরাসি, জাপানি ও জার্মান। এতে বৈশ্বিক শিক্ষার্থীদের আগ্রহের দিক থেকে কোরীয় ভাষা ঐতিহ্যগতভাবে প্রভাবশালী ইতালীয় ও পর্তুগিজ ভাষারও ওপরে স্থান পেয়েছে। মাত্র তিন দশক আগেও কোরীয় সম্প্রদায়ের বাইরে ভাষাটি খুব কমই পড়ানো হতো। সেই বিবেচনায় এই উত্থান উল্লেখযোগ্য।
কঠোর মানদণ্ডে পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত
ভিয়েতনামের নীতিগত স্বীকৃতির পেছনে টপিক পরীক্ষার কঠোর পরিচালনাবিধিও আংশিকভাবে ভূমিকা রেখেছে। কিছু আন্তর্জাতিক পরীক্ষা যেখানে পুরোপুরি স্থানীয় পরিদর্শকদের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ভিয়েতনামে টপিক পরীক্ষা সরাসরি পরিচালনা করেন হো চি মিন সিটি ও হ্যানয়ের কোরীয় শিক্ষা কেন্দ্র থেকে পাঠানো কেন্দ্রীয় কর্মকর্তারা। কোরীয় এই কর্মকর্তারা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েন করেন। এর মাধ্যমে অনিয়ম প্রতিরোধ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরীক্ষার সমতুল্য নিরাপত্তা বজায় রাখা হয়।
এই নিরাপত্তা অবকাঠামো জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় বিদেশি পরীক্ষার স্বীকৃতিকে ঐতিহাসিকভাবে জটিল করে তোলা উদ্বেগগুলো মোকাবিলা করে। আন্তর্জাতিক পরিসরে পরীক্ষার পরিচালনায় ধারাবাহিক সততা দেখানোর মাধ্যমে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন টপিককে একাডেমিক মূল্যায়নের নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ভিয়েতনামের শিক্ষা ব্যবস্থার কর্মকর্তারা বিশেষভাবে পরীক্ষার পরিচালন মানের স্বীকৃতি ও নম্বরের নির্ভরযোগ্যতাকে সমাপনী পরীক্ষার কাঠামোতে টপিককে সমমর্যাদা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
কোরীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে নম্বরের মানদণ্ড ব্যবহার করে, সেগুলোর সঙ্গেও এই মানসম্মত ব্যবস্থা সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইয়ংনাম ইউনিভার্সিটি ও কিয়ংইল ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠান সাধারণ স্নাতক পর্যায়ে ভর্তির জন্য টপিক লেভেল ৩ চায়। কিছু প্রতিষ্ঠান আবার চারুকলা ও শারীরিক শিক্ষা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য লেভেল ২ গ্রহণ করে। এসব মানদণ্ড ভিয়েতনামের বিদেশি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের শিক্ষাগত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে জাতীয় পরীক্ষায় অব্যাহতি পাওয়া শিক্ষার্থীরা এমন যোগ্যতা অর্জন করে, যা কোরিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও কাজে লাগে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কৌশলগত তাৎপর্য
তাৎক্ষণিক শিক্ষাগত সুবিধার বাইরেও টপিককে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় আরও গভীর হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে ভিয়েতনাম। এই নীতির ফলে শিক্ষাগতভাবে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার পথে বাধা কমে। ভিয়েতনামি শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কোরীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বীকৃত মানসম্মত সনদ দেখাতে পারবে; কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্দিষ্ট আলাদা ভর্তি পরীক্ষায় বসতে হবে না। আগে অনেক কোরীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব কোরীয় ভাষার পরীক্ষা নিত অথবা বিভিন্ন ভাষা ইনস্টিটিউটের সনদ গ্রহণ করত। ভিয়েতনামে আনুষ্ঠানিক টপিকের জাতীয় স্বীকৃতি সম্ভাব্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির পথ সহজ করবে।
কোরিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব আর্টসের মতো বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই এএমএ+ উদ্যোগের মতো বৃত্তি কর্মসূচিতে টপিককে প্রধান মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে। যোগ্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য এ কর্মসূচিতে পুরো টিউশন ফি, মাসিক ভাতা ও বিমানভাড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এসব বিশেষ কর্মসূচিতে কখনো কখনো টপিকের পাশাপাশি অতিরিক্ত অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন নেওয়া হলেও যোগ্যতার মূল শর্ত হিসেবে মানসম্মত পরীক্ষাটিই ব্যবহৃত হয়। মাধ্যমিক পর্যায়ের মূল্যায়নকে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করায় ভিয়েতনামের নতুন নীতি শিক্ষার্থীদের এ ধরনের সুযোগের জন্য আরও দক্ষভাবে প্রস্তুত করছে।
এই সিদ্ধান্ত ভিয়েতনামকে শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণের বৃহত্তর ধারার মধ্যেও স্থান দিয়েছে। ভিয়েতনামি শিক্ষার্থীরা ক্রমে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে—দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র (যেখানে ভিয়েতনাম ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হ্যানয় ও ফরেন ট্রেড ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্যাটের নম্বর গ্রহণ করা হয়) এবং অন্যান্য দেশে। দেশটির সমাপনী পরীক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্যায়ন যুক্ত করার মাধ্যমে বৈশ্বিক শিক্ষাগত মানের সঙ্গে কৌশলগতভাবে খাপ খাওয়ানোর প্রতিফলন ঘটেছে। এই পদ্ধতি ভিয়েতনামের স্নাতকদের কঠোর দেশীয় শিক্ষামান বজায় রেখেই আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা করতে সহায়তা করে।
যা জানা জরুরি
- ভিয়েতনামের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ মন্ত্রণালয় ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য টপিকের নম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। হংকংয়ের পর এই নীতি গ্রহণকারী দ্বিতীয় অঞ্চল ভিয়েতনাম।
- টপিকে লেভেল ৩ বা তার বেশি অর্জনকারী শিক্ষার্থীরা ভিয়েতনামের উচ্চমাধ্যমিক সমাপনী পরীক্ষায় একটি ঐচ্ছিক বিষয় থেকে অব্যাহতি পাবে। রূপান্তরিত নম্বর সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আবেদনে প্রয়োগ হবে।
- ২০২৬ সালের জুনের শেষ দিকে নির্ধারিত জাতীয় সমাপনী পরীক্ষার পর, ওই বছরের সেপ্টেম্বরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই নীতি কার্যকর হবে।
- ২০২৫ সালে ভিয়েতনামে ৮৫,৮৯৬ জন টপিক পরীক্ষার্থী ছিল। বিশ্বে বিদেশে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া জনসংখ্যার মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ; মোট আন্তর্জাতিক আবেদনকারীর ১৫.২ শতাংশ ছিল ভিয়েতনামের।
- বর্তমানে প্রায় ৭৫,১৪৪ জন ভিয়েতনামি শিক্ষার্থী দক্ষিণ কোরিয়ায় পড়াশোনা করছে। আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর উৎস হিসেবে চীনের পরেই ভিয়েতনামের অবস্থান।
- ভিয়েতনামে কোরীয় ভাষা ২০২০ সালে ঐচ্ছিক ভাষা হিসেবে চালু হয় এবং ২০২১ সালে প্রধান বিদেশি ভাষার মর্যাদা পায়। বর্তমানে ১৬৯টি স্কুলে ৩৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে ভাষাটি পড়ানো হয়।
- ভিয়েতনামে টপিক পরীক্ষা হো চি মিন সিটি ও হ্যানয়ের কোরীয় শিক্ষা কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষার নিরাপত্তায় স্থানীয় পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
- বিশ্বের ২৪টি দেশ কোরীয় ভাষাকে আনুষ্ঠানিক দ্বিতীয় বিদেশি ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছে। ১১টি দেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থায় ভাষাটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে।






