এআই মেমোরির আধিপত্য নিয়ে অদৃশ্য লড়াই
চীন যখন মেমোরি চিপ উৎপাদনে দক্ষিণ কোরিয়ার দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, তখন বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ক্ষমতার ভারসাম্যে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কয়েক দশক ধরে কোরিয়ার দুই জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিকস ও এসকে হাইনিক্স এবং তাদের মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক্রন টেকনোলজি বৈশ্বিক ডিআরএএম বাজারের ৯০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করেছে। এতে প্রযুক্তিগত দক্ষতার এমন এক দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে উঠেছিল, যা ভেদ করা অসম্ভব বলেই মনে হয়েছিল। তবে রাষ্ট্রীয় পুঁজির বিপুল অর্থায়ন ও ভূরাজনৈতিক তাগিদে এগিয়ে চলা উচ্চাকাঙ্ক্ষী এক দেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীর কারণে এখন সেই আধিপত্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে।
সূচিপত্র
মাত্র এক দশকের কিছু বেশি আগে, ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত চ্যাংসিন মেমোরি টেকনোলজিস (সিএক্সএমটি) মেমোরি খাতে চীনের প্রধান প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে। তুচ্ছ বাজার-অংশীদারত্ব থেকে দ্রুত এগিয়ে এসে প্রতিষ্ঠানটি বৈশ্বিক ডিআরএএম বাজারের আনুমানিক ৪ থেকে ৫ শতাংশ দখল করেছে। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো মুনাফা অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জে ৪.২ বিলিয়ন ডলারের বড় প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা এর বাণিজ্যিক সক্ষমতা ও কৌশলগত জাতীয় গুরুত্ব—দুইয়েরই ইঙ্গিত দেয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরবরাহ শৃঙ্খলে মেমোরি চিপ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা জোরদার হচ্ছে, আর এর মধ্যেই এই আর্থিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
চাপ বাড়লেও শিল্পবিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিতে কোরিয়ার এগিয়ে থাকা এখনো উল্লেখযোগ্য, বিশেষ করে উচ্চ ব্যান্ডউইথ মেমোরি (এইচবিএম) খাতে। বড় ভাষা মডেল প্রশিক্ষণ এবং উন্নত এআই অ্যাপ্লিকেশন পরিচালনায় এই মেমোরি অপরিহার্য। কোরীয় চিপ নির্মাতারা ২০২০ সালে প্রথম ডিডিআর৫ মেমোরি বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আনে। বর্তমানে তারা বড় এআই গ্রাহকদের কাছে পঞ্চম প্রজন্মের এইচবিএম৩ই পণ্য সরবরাহ করছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের এইচবিএম৪ বাজারে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্লেষকদের হিসাবে, সাধারণ ডিআরএএমে তাদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান প্রায় দুই থেকে তিন বছর; আর আরও জটিল এইচবিএম স্ট্যাকিং প্রযুক্তিতে তিন থেকে চার বছর।
রাষ্ট্রীয় সহায়তায় চীনের মেমোরি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান
বিশ্বের বৃহত্তম সেমিকন্ডাক্টর ভর্তুকি কর্মসূচিগুলোর একটি—রাষ্ট্র পরিচালিত ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট ইন্ডাস্ট্রি ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড, যা ‘বিগ ফান্ড’ নামে পরিচিত—সিএক্সএমটির অগ্রযাত্রায় জ্বালানি জুগিয়েছে। এই উদ্যোগে মোট পুঁজির পরিমাণ ৬৯০ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলার) ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বেইজিংয়ের দৃঢ় সংকল্পের প্রতিফলন এই উদ্যোগ। ২০২৪ সালে চালু হওয়া তহবিলের তৃতীয় পর্যায়ে উন্নত এআই চিপ ও এইচবিএম উন্নয়নের পাশাপাশি বৃহত্তর সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিক মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তিগত অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। আইপিও প্রসপেক্টাস অনুযায়ী, কয়েক বছরের মধ্যেই সিএক্সএমটি প্রাথমিক পর্যায়ের উন্নয়ন থেকে ব্যাপক উৎপাদনে পৌঁছেছে। সম্প্রতি পিসি, সার্ভার ও মোবাইল ডিভাইসের জন্য ডিডিআর৫ এবং এলপিডিডিআর৫এক্স মেমোরির ব্যাপক উৎপাদন শুরুর ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এইচবিএম খাতে ২০২৪ সালের শেষ দিকে এইচবিএম২-এর ব্যাপক উৎপাদন শুরু করে সিএক্সএমটি। ২০২৬ সালের মধ্যে এইচবিএম৩-শ্রেণির পণ্য এবং সম্ভবত ২০২৭ সালের মধ্যে এইচবিএম৩ই উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তারা। এ সময়সূচি বাস্তবায়িত হলে বৈশ্বিক শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবধান তিন থেকে চার বছরে নেমে আসবে।
টেকইনসাইটসের স্বাধীন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সিএক্সএমটি বর্তমানে ডিআরএএমের ডি১ওয়াই ও ডি১জেড নোডে উৎপাদন করতে পারে, যা প্রায় ১৭ থেকে ১৩ ন্যানোমিটারের সমতুল্য। তাদের ডিডিআর৫-এর ঘনত্ব বৈশ্বিক শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের ২০২১ সালের পণ্যের কাছাকাছি। জানা গেছে, এইচবিএম৩ই উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় ১৫ ন্যানোমিটারের নিচের নোড—ডি১আলফা ও ডি১বিটা—উন্নয়নে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ক্ষেত্রে তারা মাইক্রনের ২০২১ সালের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারে, যখন প্রতিষ্ঠানটি এক্সট্রিম আলট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি ছাড়াই ডি১আলফা নোড তৈরি করেছিল।
সাংমিয়ং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিস্টেম সেমিকন্ডাক্টর প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক লি জং-হোয়ান বলেন, চীনের কৌশলগত লক্ষ্য তাৎক্ষণিক বাণিজ্যিক সাফল্যের বাইরেও বিস্তৃত।
চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত ব্যবধান স্পষ্ট। কিন্তু চীনের চূড়ান্ত লক্ষ্য স্বল্পমেয়াদি মুনাফা নয়। এআই ও সামরিক সক্ষমতাসহ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সঙ্গে দেশটির চিপ খাতের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সরাসরি যুক্ত।
প্রযুক্তিগত ব্যবধানের পরিমাপ
প্রযুক্তিগত ব্যবধানের সুনির্দিষ্ট মাত্রা অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতার এক জটিল চিত্র তুলে ধরে। সাধারণ ডিআরএএম উৎপাদনে কোরীয় ও বৈশ্বিক শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো ১০ ন্যানোমিটার শ্রেণির পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রজন্মের নোডে, অর্থাৎ ১বি ও ১সি-তে পৌঁছেছে। এতে অধিক ঘনত্ব ও উন্নত বিদ্যুৎ-দক্ষতা পাওয়া যায়। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো মূলত ১জেড নোডে উৎপাদন করছে, যা ২০ ন্যানোমিটারের নিচের প্রযুক্তির আগের প্রজন্ম। এতে উৎপাদনের ফলন কম এবং খরচ বেশি।
প্রক্রিয়াগত নোডের এই পার্থক্য কোরীয় নির্মাতাদের উল্লেখযোগ্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দেয়। ১বি ও ১সি নোডে তৈরি চিপ কম বিদ্যুৎ খরচে বেশি কর্মক্ষমতা দেয় এবং বড় পরিসরে আরও সাশ্রয়ীভাবে উৎপাদন করা যায়। পণ্যের পরবর্তী প্রজন্মগুলোতে এসব সুবিধা ক্রমে আরও বাড়ে। কোরিয়ার ন্যাশনাল একাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের হিসাবে, এই ব্যবধান প্রায় দুই থেকে তিন বছর। আগে যেখানে ব্যবধান ছিল প্রায় এক দশক, এখন তা কমেছে; তবে এমন এক শিল্পে এই ব্যবধান এখনো যথেষ্ট বড়, যেখানে প্রতিটি প্রজন্মে দক্ষতার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়।
ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরিতে ব্যবধান তুলনামূলক কম, যদিও তা এখনো স্পষ্ট। বাজারের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্স বর্তমানে ২৮৬ থেকে ৩২১ স্তরের চিপ ব্যাপকভাবে উৎপাদন করছে, যা শিল্পের সবচেয়ে উন্নত পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে। চীনা নির্মাতারা, বিশেষ করে ইয়াংজি মেমোরি টেকনোলজিস (ওয়াইএমটিসি), ২৩২ স্তরের ন্যান্ড চিপ উৎপাদনে এগিয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, কিছু ক্ষেত্রে কোরীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় উন্নত বলে বিবেচিত হাইব্রিড বন্ডিং প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে ওয়াইএমটিসি। এতে দেখা যায়, চীনের অগ্রগতি অসম হলেও নির্দিষ্ট কিছু প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে প্রকৃত সাফল্য এসেছে।
উচ্চ ব্যান্ডউইথ মেমোরিতে ব্যবধান অনেক বেশি; এই খাতে কোরিয়ার আধিপত্য সবচেয়ে স্পষ্ট। কর্মক্ষমতা ও বিদ্যুৎ-দক্ষতা বাড়াতে থ্রু-সিলিকন ভায়া ব্যবহার করে ডিআরএএম চিপগুলোকে উল্লম্বভাবে স্তরে স্তরে সাজানোর প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন প্রক্রিয়ায় এইচবিএম তৈরি হয়। মেমোরি উৎপাদনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত এই প্রযুক্তি। সিএক্সএমটি এই বাজারে প্রবেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা জানালেও কোরীয় চিপ নির্মাতারা ইতিমধ্যে বড় পরিসরে এইচবিএম৩ই সরবরাহ করছে এবং এইচবিএম৪ বাজারে আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই নেতৃত্ব শুধু প্রচারিত প্রক্রিয়াগত নোডের ওপর নির্ভর করে না; বরং এআই চিপ নকশাকারীদের সঙ্গে বছরের পর বছর ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে অর্জিত স্তরবিন্যাসের নিখুঁততা, তাপ নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন ফলনের স্থিতিশীলতার ওপরও নির্ভরশীল।
শিল্পগুপ্তচরবৃত্তি ও গোপন তথ্যের সুরক্ষা
বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি সুরক্ষা নিয়ে নাটকীয় আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে প্রতিযোগিতার চাপ প্রকাশ পেয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার কৌঁসুলিরা স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের সাবেক নির্বাহী ও প্রকৌশলীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে উন্নত ১০ ন্যানোমিটার ডিআরএএম উৎপাদনের গোপন তথ্য সিএক্সএমটিকে পাচারের অভিযোগে মামলা করেন। পাঁচ সন্দেহভাজন এখনো কারাগারে রয়েছেন; অন্য পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কোরিয়ার ইতিহাসে শিল্পগুপ্তচরবৃত্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর একটি এটি।
সিউল সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিক্ট প্রসিকিউটরস অফিসের তথ্য অনুযায়ী, স্যামসাং ছাড়ার পর অভিযুক্তরা সিএক্সএমটিতে গবেষণা ও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ দেন। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে যাওয়া এক গবেষক হাতে লিখে ডিআরএএম প্রক্রিয়ার গোপন তথ্যের শত শত ধাপ নকল করেন। প্রক্রিয়ার ক্রম, যন্ত্রপাতির বৈশিষ্ট্য এবং উৎপাদন ফলন বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ এসব নোটে লেখা হয়েছিল বলে অভিযোগ। স্যামসাংয়ের উৎপাদনপ্রক্রিয়া পুনর্গঠন ও সিএক্সএমটির জন্য উপযোগী করে নিতে ওই হাতে লেখা নোট ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে ২০২৩ সালে চীনের প্রথম দেশীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৮ ন্যানোমিটার ডিআরএএম চিপ উৎপাদনে সক্ষম হয় সিএক্সএমটি।
কৌঁসুলিদের হিসাবে, শুধু ২০২৪ সালেই বিক্রি হারানোর কারণে স্যামসাংয়ের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ওন (৩.৫৬ বিলিয়ন ডলার)। দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির পরিমাণ কয়েক দশ ট্রিলিয়ন ওন পর্যন্ত হতে পারে। তদন্তে আরও জানা যায়, সরবরাহকারীর মাধ্যমে এসকে হাইনিক্সের কাছ থেকেও অতিরিক্ত ডিআরএএম প্রযুক্তি পেয়েছে সিএক্সএমটি, যা তাদের উন্নয়নের সময়সীমা আরও এগিয়ে এনেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিরা স্যামসাংয়ে আগের বেতনের তুলনায় সিএক্সএমটিতে বছরে তিন থেকে পাঁচ গুণ বেশি বেতন পান বলে জানা গেছে; বছরে এই বেতনের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ওন পর্যন্ত।
এসকে হাইনিক্সে ২৬ বছর ডিআরএএম ব্যবসা তদারকির দায়িত্বে থাকা ডং-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিম দে-ইয়ং বলেন, শুধু পুঁজি দিয়ে প্রযুক্তিগত বাধা পেরোনো যায় না।
শুধু অর্থ দিয়ে সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসা আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। শিল্পের দ্রুত প্রযুক্তি-উন্নয়নের চক্রের কারণে শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছানোর পর পুরোনো প্রযুক্তির প্রাসঙ্গিকতা দ্রুত হারায়। ফলে অপেক্ষাকৃত কম উন্নত খাতে আধিপত্যের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত থাকে।
বাজার-অংশীদারত্বের লড়াই ও দামের চাপ
প্রতিযোগিতার গতিশীলতায় বাজারের কাঠামো পরিমাপযোগ্যভাবে বদলে যাচ্ছে। কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক ডিআরএএম বিক্রিতে ৩৪ শতাংশ বাজার-অংশীদারত্ব নিয়ে শীর্ষে ছিল এসকে হাইনিক্স। এর পরেই ছিল স্যামসাং, ৩৩ শতাংশ নিয়ে, এবং মাইক্রন, ২৬ শতাংশ নিয়ে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে ৩ শতাংশ থাকা সিএক্সএমটির বাজার-অংশীদারত্ব দ্রুত বেড়ে ৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা একটি পরিণত বাজারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এইচবিএম খাতে এসকে হাইনিক্সের বাজার-অংশীদারত্ব ৫৭ শতাংশ। স্যামসাংয়ের অংশ বেড়ে ২২ শতাংশ হয়েছে এবং মাইক্রনের রয়েছে ২১ শতাংশ। বছরের প্রথমার্ধে চীনে রপ্তানি সীমাবদ্ধতার কারণে সমস্যায় পড়ার পর স্যামসাংয়ের বাজার-অংশীদারত্ব বেড়েছে, যা ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের কারণে তৈরি অস্থিরতা তুলে ধরে। এআইয়ের চাহিদা বাড়তে থাকায় সরবরাহকারীরা ২০২৬ সাল পর্যন্ত এইচবিএম পণ্য বিক্রি শেষ করে ফেলেছে বলে জানা গেছে।
বাজারে জায়গা করে নিতে সিএক্সএমটি আক্রমণাত্মক মূল্যকৌশল নিয়েছে। ডিডিআর৪ ডিআরএএম চিপ প্রতিষ্ঠিত প্রতিদ্বন্দ্বীদের দামের প্রায় অর্ধেকে বিক্রি করছে তারা। এতে স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রনের মুনাফার হার চাপে পড়েছে, অন্যদিকে পরবর্তী পর্যায়ের ক্রেতারা লাভবান হয়েছেন। পণ্য খুলে পরীক্ষা করার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীনা প্রতিষ্ঠানটির ১৬ গিগাবিট ডিডিআর৫ পণ্যের বিট ঘনত্ব মাইক্রনের ২০২১ সালের পণ্যের কাছাকাছি। তবে চিপের ডাইয়ের আকার বড় এবং উৎপাদন ফলনের হার যাচাই করা হয়নি। ফলে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চাহিদার পরিস্থিতি উৎপাদন সম্প্রসারণের পক্ষে। টেনসেন্ট, বাইদু ও আলিবাবাসহ চীনা ক্লাউড সেবা প্রদানকারীরা ২০২৫ সালে সম্মিলিতভাবে ৩১.৯৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। এআইয়ের এই উত্থানের কারণে ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ২২.২ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১৭৩.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়া সত্ত্বেও।
ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও যন্ত্রপাতির সরবরাহে বাধা
রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের জাল আরও আঁটসাঁট হওয়ার মধ্যে এই প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা চলছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের প্যাকেজ ঘোষণা করে, যার লক্ষ্য ছিল এইচবিএম উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য উচ্চ ব্যান্ডউইথ মেমোরি ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনযন্ত্রে চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করা। এসব নিয়মে ১৪০টির বেশি চীনা চিপ নির্মাতা ও যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারীকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এন্টিটি লিস্টে যুক্ত করা হয়। এইচবিএম সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে চীনের এআই উন্নয়ন সীমিত করাই এর লক্ষ্য।
এই বিধিনিষেধ সিএক্সএমটির কার্যক্রমে তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত মার্কিন সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রপাতি কোম্পানিগুলোর রক্ষণাবেক্ষণকর্মীদের চলে যেতে বলা হয়েছে, যা ডিআরএএম ও এইচবিএম উন্নয়নের সময়সূচিকে প্রভাবিত করছে। ২০২৬ বা ২০২৭ সাল পর্যন্ত কার্যক্রম চালানোর মতো পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি মজুত করলেও, বিদ্যমান রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে এক্সট্রিম আলট্রাভায়োলেট লিথোগ্রাফি যন্ত্রে প্রবেশাধিকার ছাড়া বর্তমান নোডের বাইরে উন্নত উৎপাদনপ্রক্রিয়া তৈরি ও সম্প্রসারণ সীমিত।
দেশীয় ইইউভি সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে চীন। খবরে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যে কার্যকর চিপ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে একটি প্রোটোটাইপ যন্ত্র তৈরি করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হতে ২০৩০ সাল নাগাদ লাগতে পারে। ইইউভি ব্যবহারের সুযোগ না থাকলে ১৫ ন্যানোমিটারের নিচের নোডে উৎপাদন ফলন বাড়ানো ও চিপের ডাইয়ের আকার কমানোর ক্ষেত্রে চীনের অন্যান্য ফাউন্ড্রির মতোই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে সিএক্সএমটি। এতে কোরীয় ও মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের দক্ষতার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকারও বাড়তি বাধা তৈরি করছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সিএক্সএমটি এখনো এন্টিটি লিস্টে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তবে জানুয়ারি থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে তালিকায় যুক্ত করার বিষয়ে ওয়াশিংটনে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে, যা এর বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। তালিকায় না থাকলেও প্রযুক্তিগত ব্যবধান ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের এআই অ্যাক্সিলারেটরে সিএক্সএমটির এইচবিএম ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। ফলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক মূলত চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
মূল বিষয়গুলো
- স্যামসাং ও এসকে হাইনিক্সসহ দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিষ্ঠানগুলো মাইক্রনের সঙ্গে বৈশ্বিক ডিআরএএম বাজারের ৯০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, যদিও সিএক্সএমটির বাজার-অংশীদারত্ব বেড়ে ৫ শতাংশ হয়েছে
- সাধারণ ডিআরএএমে প্রযুক্তিগত ব্যবধান প্রায় দুই থেকে তিন বছর এবং উচ্চ ব্যান্ডউইথ মেমোরিতে তিন থেকে চার বছর; কোরীয় শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো ১বি/১সি নোডে উৎপাদন করছে, আর চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে ১জেড নোডে
- ২০২৫ সালে প্রথমবার মুনাফা অর্জনের পর ৪.২ বিলিয়ন ডলারের সাংহাই আইপিওর আবেদন করেছে সিএক্সএমটি; এর পেছনে রয়েছে চীনের ৯৫ বিলিয়ন ডলারের বিগ ফান্ড সেমিকন্ডাক্টর ভর্তুকি কর্মসূচির সহায়তা
- সিএক্সএমটিকে ১০ ন্যানোমিটার ডিআরএএম প্রযুক্তির গোপন তথ্য পাচারের অভিযোগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে স্যামসাংয়ের সাবেক ১০ কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার কৌঁসুলিরা; এতে আনুমানিক ৩.৫৬ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে
- ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণে এইচবিএম উৎপাদনের যন্ত্রপাতি পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়; এদিকে চীনে এআইয়ের চাহিদায় নিষেধাজ্ঞার আগে এনভিডিয়ার এইচ২০ চিপের চালান ১০ লাখ ইউনিট ছাড়িয়ে যায়
- ২০২৬ সালের মধ্যে এইচবিএম৩ এবং ২০২৭ সালের মধ্যে এইচবিএম৩ই-এর ব্যাপক উৎপাদনের পরিকল্পনা করেছে সিএক্সএমটি; এতে বর্তমানে এইচবিএম৩ই সরবরাহ ও এইচবিএম৪ উন্নয়নরত কোরীয় শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যবধান কমবে






