বিপর্যয়কর অভিষেক
টিকটক নিজেকে স্বতন্ত্রভাবে মার্কিন কোম্পানিতে রূপান্তরের ঘোষণা দেওয়ার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই ভিডিও-শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মটিতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ কোটি ব্যবহারকারীর ধৈর্যের পরীক্ষা হয় এবং রাজনৈতিক বিতর্কের ঝড় ওঠে। জনপ্রিয় অ্যাপটির জন্য যা হওয়ার কথা ছিল এক গৌরবোজ্জ্বল নতুন অধ্যায়ের সূচনা, ফেডারেল নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা থেকে শেষ পর্যন্ত মুক্তি—তা-ই কয়েক দিনব্যাপী প্রযুক্তিগত সংকটে পর্যবসিত হয়। নির্মাতারা কনটেন্ট পোস্ট করতে পারেননি, দর্শকেরা স্থির হয়ে থাকা ভিউ সংখ্যা দেখেছেন, আর রাজনীতিকেরা প্ল্যাটফর্মটির বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত সেন্সরশিপের অভিযোগ তুলেছেন।
সূচিপত্র
২২ জানুয়ারি বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত হয়। সেদিন বাইটড্যান্স, টিকটকের চীনা মূল প্রতিষ্ঠান, অ্যাপটির যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ মার্কিন বিনিয়োগকারীদের একটি কনসোর্টিয়ামের কাছে হস্তান্তরের চুক্তি চূড়ান্ত করে। এর নেতৃত্বে ছিল ক্লাউড কম্পিউটিং জায়ান্ট ওরাকল, যার চেয়ারম্যান ধনকুবের ল্যারি এলিসন। এই লেনদেনের ফলে টিকটক ইউএসডিএস জয়েন্ট ভেঞ্চার নামে একটি করপোরেট সত্তা গঠিত হয়। বিদেশি প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, নইলে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ স্টোর থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে—এমন ফেডারেল আইন মেনে চলার লক্ষ্যেই এটি তৈরি করা হয়।
কিন্তু উদ্যাপনের রেশ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ২৫ জানুয়ারি, রোববার ভোরের দিকে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যবহারকারীরা ব্যাপক ত্রুটির কথা জানাতে শুরু করেন। ভিডিও আপলোড হচ্ছিল না। ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত, অ্যালগরিদমের মাধ্যমে সাজানো টিকটকের ‘ফর ইউ’ পেজ হঠাৎই গতানুগতিক ও ব্যক্তিগত পছন্দের সঙ্গে অসংগত মনে হতে থাকে। মন্তব্য লোড হচ্ছিল না। কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় ছিল, ভিউয়ের সংখ্যা শূন্যে আটকে থাকছিল—যদিও সম্পৃক্ততার পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছিল, মানুষ ভিডিও দেখছেন।
বিপর্যয়ের আদর্শ সমাপতন
এর চেয়ে খারাপ সময়ে এই ঘটনা ঘটতে পারত না। টিকটকের নতুন মালিকেরা বিভ্রাটের কারণ খুঁজতে ব্যস্ত থাকাকালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে প্রধান হয়ে ওঠে দুটি বড় ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডজুড়ে বয়ে যাওয়া শক্তিশালী শীতকালীন ঝড় ফার্নে প্রায় ২৩ কোটি মানুষ বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও পাইপ ফেটে যাওয়ার সতর্কতার আওতায় ছিলেন। একই সময়ে মিনিয়াপোলিসে বিক্ষোভ চলাকালে ফেডারেল অভিবাসন কর্মকর্তাদের গুলিতে ৩৭ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক অ্যালেক্স প্রেটি নিহত হন। এ ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা পরে হোয়াইট হাউসের ভাষায়, মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে করা মিথ্যা বক্তব্যের কারণে আরও বেড়ে যায়।
টিকটকের প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণ শেষ পর্যন্ত শনাক্ত করে ওরাকল। কোম্পানির মুখপাত্র মাইকেল এগবার্ট এক বিবৃতিতে বলেন, “সপ্তাহান্তে ওরাকলের একটি ডেটা সেন্টারে আবহাওয়াজনিত কারণে সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে, যা টিকটককে প্রভাবিত করে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পর দেখা দেওয়া প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের টিকটক ব্যবহারকারীরা অসুবিধায় পড়তে পারেন।”
অস্টিনভিত্তিক প্রযুক্তি কোম্পানিটি নতুন টিকটক যৌথ উদ্যোগের ১৫ শতাংশের মালিক এবং প্ল্যাটফর্মটির যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র ডেটা সেন্টার অংশীদার। তারা স্বীকার করে, ঝড়ের কারণে ধারাবাহিক ব্যবস্থাগত বিপর্যয় ঘটে, যার প্রভাব পড়ে হাজার হাজার সার্ভারে। টিকটকের ভাষায়, এই বিভ্রাটের ফলে “একাধিক ত্রুটি, লোড হতে বেশি সময় লাগা বা অনুরোধের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়া” সমস্যা দেখা দেয়, যা কয়েক দিন ধরে চলে।
নিরবচ্ছিন্নভাবে আসক্তিকর কনটেন্ট সরবরাহের জন্য পরিচিত একটি প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে শিল্পখাতের বিশ্লেষকদের কাছে এই প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল। টিকটকের মতো বড় প্ল্যাটফর্মে ক্লাউড অবকাঠামোর বড় ধরনের বিপর্যয় বিরল হলেও তা ঘটে। কিন্তু বিভ্রাটের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ঘটনাগুলোর সমাপতন বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি করে, যা শুধু প্রযুক্তিগত বিবৃতি দিয়ে সহজে মেটানো সম্ভব ছিল না।
কণ্ঠরোধ, নাকি ব্যবস্থাগত ত্রুটি
প্রেটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই) এবং ফেডারেল আইন প্রয়োগের কৌশলের সমালোচনা করে টিকটকে কনটেন্ট পোস্ট করতে গিয়ে ব্যবহারকারীরা ভিডিও আপলোড করতে পারছিলেন না। অন্যরা জানান, মিনিয়াপোলিসের ঘটনা নিয়ে করা পোস্টে তাদের অনুসারীর সংখ্যা অনেক থাকা সত্ত্বেও ভিউ হচ্ছিল শূন্য। ‘হ্যাকস’ সিরিজে অভিনয়ের জন্য পরিচিত কৌতুকাভিনেত্রী ও অভিনেত্রী মেগ স্টাল্টার ইনস্টাগ্রামে ঘোষণা দেন, তিনি তার প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার অনুসারী থাকা টিকটক অ্যাকাউন্ট মুছে ফেলবেন। তার দাবি, অ্যাপটি “নতুন মালিকানায় গেছে এবং আমাদের পুরোপুরি সেন্সর ও নজরদারি করা হচ্ছে।”
সংগীতশিল্পী বিলি আইলিশ ও তার ভাই ফিনিয়াসও আইসিইর গুলিতে নিহতের ঘটনা নিয়ে ভিডিও পোস্ট করতে সমস্যার কথা জানান। আইলিশ ইনস্টাগ্রামে বলেন, “টিকটক মানুষকে চুপ করিয়ে দিচ্ছে।” ক্যালিফোর্নিয়ার অঙ্গরাজ্য সিনেটর স্কট উইনারও দমন-পীড়নের অভিযোগ তোলা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগ দেন। অভিযোগগুলো দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ছাড়িয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমে পৌঁছে যায়। নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন ও ওয়াশিংটন পোস্টসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দাবির খবর প্রকাশ করে।
এরপর আসে “এপস্টিন” প্রসঙ্গ। ব্যবহারকারীরা জানান, জেফরি এপস্টিনের পদবি থাকা সরাসরি বার্তা আটকে দেওয়া হচ্ছে। মৃত এই দণ্ডিত যৌন অপরাধী ও অর্থলগ্নিকারীর ঘটনা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এবং ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া স্ক্রিনশটে ত্রুটির বার্তায় লেখা ছিল: “এই বার্তাটি আমাদের কমিউনিটি নীতিমালা লঙ্ঘন করতে পারে। কমিউনিটিকে সুরক্ষিত রাখতে এটি পাঠানো হয়নি।”
টিকটক ইউএসডিএস জয়েন্ট ভেঞ্চার দাবি অস্বীকার করে যে বার্তায় “এপস্টিন” নামটি শেয়ার করার বিরুদ্ধে তারা কোনো নিয়ম চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, “test”-এর মতো নিরীহ শব্দসহ কিছু একক-শব্দের বার্তায় স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে বার্তা আটকে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। কোম্পানির দাবি, বাক্যের মধ্যে নামটি ব্যবহার করলে কোনো বাধা ছাড়াই বার্তা পাঠানো যায়। তবু ঘটনাটির দৃশ্যমান প্রভাব ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়।
কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির দাবি
সেন্সরশিপের অভিযোগ রাজ্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজমের দপ্তর স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করে যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনামূলক কিছু কনটেন্ট দমন করা হয়েছে। এরপর ২৭ জানুয়ারি নিউজম ঘোষণা দেন, টিকটক ক্যালিফোর্নিয়ার আইন লঙ্ঘন করছে কি না, তা নিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিক পর্যালোচনা শুরু করছেন।
ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ একটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে টিকটক বিক্রির পর আমাদের দপ্তর বিভিন্ন অভিযোগ পেয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সমালোচনামূলক কনটেন্ট দমনের ঘটনা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করেছে। ট্রাম্পের সমালোচনামূলক কনটেন্ট সেন্সর করে টিকটক রাজ্য আইন লঙ্ঘন করছে কি না, তা পর্যালোচনা শুরু করছি।
কানেকটিকাটের সিনেটর ক্রিস মারফি অভিযোগের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে বলেন, কথিত সেন্সরশিপ গণতান্ত্রিক আলোচনার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে মারফি লেখেন, “এই মুহূর্তে গণতন্ত্রের জন্য থাকা সব হুমকির হিসাব রাখা কঠিন জানি, তবে এটি তালিকার একেবারে শীর্ষে।” ডেমোক্র্যাট এই আইনপ্রণেতার ইঙ্গিত, টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পপন্থী প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে যাওয়ার কারণে ব্যাপকভাবে কনটেন্ট দমনকে কাকতালীয় ঘটনা বলে ধরে নেওয়া যায় না।
সংকটের রাজনৈতিক দিকগুলো উপেক্ষা করা অসম্ভব ছিল। ওরাকলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ল্যারি এলিসন রিপাবলিকান দলের বড় অনুদানদাতা এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের মিত্র। যৌথ উদ্যোগের অন্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছেন ডেল কম্পিউটার করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ডেল, যিনিও ট্রাম্পের অনুদানদাতা, পাশাপাশি সিলভার লেক এবং এমজিএক্স। এমজিএক্স হলো আমিরাতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান, যার আগে ট্রাম্প-সমর্থিত ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্যোগের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল।
যৌথ উদ্যোগের শর্ত অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায় বাইটড্যান্সের প্রায় ২০ শতাংশ মালিকানা থাকবে, আর মার্কিন বিনিয়োগকারীদের হাতে থাকবে ৮০.১ শতাংশ। নতুন প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারকারীদের তথ্য ব্যবহার করে কনটেন্ট সুপারিশের অ্যালগরিদমকে নতুন করে প্রশিক্ষণ ও হালনাগাদ করার অঙ্গীকার করেছে। ব্যবহারকারীদের ফিডে তারা শেষ পর্যন্ত কী দেখবেন, তা কে নিয়ন্ত্রণ করে—এই প্রক্রিয়ায় সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
ব্যবহারকারীদের ব্যাপক প্রস্থান
প্রকৃত সেন্সরশিপের আশঙ্কা, গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ, নাকি প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে বিরক্তি—যে কারণেই হোক, সংকটের জবাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় মার্কিন ব্যবহারকারী প্ল্যাটফর্মটি ছেড়ে যান। বাজার-বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান সেন্সর টাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, আগের ৩০ দিনের তুলনায় ২২ থেকে ২৬ জানুয়ারি দৈনিক গড়ে অ্যাপ মুছে ফেলার হার ১৩০ শতাংশ বেড়েছে। অন্য তথ্য অনুযায়ী পতন আরও বেশি ছিল। কিছু বিশ্লেষক জানান, মালিকানা হস্তান্তরের পরের সপ্তাহে অ্যাপ মুছে ফেলার হার ১৯৫ শতাংশ বেড়েছে।
ব্যবহারকারীদের এই প্রস্থান প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য সুযোগ তৈরি করে। টিকটকের চেয়ে কম সেন্সরশিপের প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী প্ল্যাটফর্ম আপস্ক্রোল্ড যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে শীর্ষস্থান এবং গুগল প্লে স্টোরে তৃতীয় স্থানে উঠে আসে। অ্যাপটির দাবি, এখন তাদের ব্যবহারকারী ১০ লাখের বেশি। আরেক প্রতিদ্বন্দ্বী স্কাইলাইটের ডাউনলোডও বেড়ে যায়, কারণ ব্যবহারকারীরা বিকল্প খুঁজছিলেন। এদিকে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া ১০টি অ্যাপের মধ্যে তিনটি আলাদা ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) অ্যাপ জায়গা করে নেয়। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ধারণা করা সরকারি নজরদারি থেকে অনলাইন কার্যকলাপ আড়াল করতে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন সরঞ্জাম খুঁজছিলেন।
অ্যাপ মুছে ফেলার হার বাড়লেও একই সময়ে টিকটকের দৈনিক সক্রিয় ব্যবহারকারী আসলে ২ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে সেন্সর টাওয়ার। তথ্য বলছে, প্রতিবাদ জানিয়ে কিছু সোচ্চার ব্যবহারকারী অ্যাপটি মুছে ফেললেও আরও অনেকে প্ল্যাটফর্মে থেকে গেছেন বা নতুন করে যোগ দিয়েছেন। তবে বিভ্রাট চলাকালে তারা কনটেন্ট তৈরির বদলে তা দেখেই সময় কাটিয়েছেন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমার্কেটারের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষক মিন্দা স্মাইলি বলেন, প্ল্যাটফর্মের ওপর আস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যার চেয়ে দৃশ্যমান ধারণা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “বাস্তবে যা-ই ঘটুক, মানুষ যদি মনে করেন কনটেন্ট দমন করা হচ্ছে, আপলোড করা কঠিন হচ্ছে, বা কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে—যাই হোক না কেন—অনেক ব্যবহারকারীর টিকটক ছেড়ে যাওয়া বা ব্যবহার বন্ধ করার জন্য সেটাই যথেষ্ট।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্ল্যাটফর্ম ছাড়ার হুমকি প্রায়ই বাস্তব আচরণের চেয়ে বেশি হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি আগের বছর টিকটক নিষিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কার সময় চীনা অ্যাপ রেডনোটে ব্যবহারকারীদের স্বল্পস্থায়ী অভিবাসনের কথা উল্লেখ করেন, যা দ্রুতই থেমে যায়।
নতুন শর্ত, নতুন আশঙ্কা
প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে যোগ হয় মালিকানা হস্তান্তরের ঠিক পরেই টিকটকের নতুন মার্কিন প্রতিষ্ঠানের গোপনীয়তা নীতিমালা হালনাগাদ। সংশোধিত শর্তে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ডিভাইসের সেটিংসের ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন ব্যবহারকারীদের সুনির্দিষ্ট জিপিএস অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। এর ফলে আগে সংগ্রহ করা আনুমানিক অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের চেয়ে তথ্য সংগ্রহের পরিধি বাড়ে। নীতিমালায় টিকটকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জামের সঙ্গে ব্যবহারকারীদের মিথস্ক্রিয়া-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের পরিধিও বাড়ানো হয়; এর মধ্যে প্রম্পট ও ব্যবহারের ধরন অন্তর্ভুক্ত।
অবস্থানের সেবা বন্ধ করে ব্যবহারকারীরা তথ্য সংগ্রহ থেকে বিরত থাকতে পারেন। তবে পরিবর্তনের সময়টি আগে থেকেই থাকা সন্দেহ-সংশয় আরও বাড়িয়ে দেয়। সমালোচকেরা বলেন, হালনাগাদ নীতিমালায় “জাতিগত ও নৃগোষ্ঠীগত উৎস”, “যৌন জীবন বা যৌন অভিমুখিতা”, “ট্রান্সজেন্ডার বা নন-বাইনারি পরিচয়” এবং “নাগরিকত্ব বা অভিবাসন-অবস্থা”-সহ সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের কথাও রয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেন, এই ভাষা শর্তাবলির আগের সংস্করণগুলোতেও ছিল। রাজ্যগুলোর ভোক্তা-গোপনীয়তা আইন মেনে চলতে সর্বশেষ ২০২৪ সালে তা হালনাগাদ করা হয়েছিল।
তা সত্ত্বেও, অভিবাসন আইন প্রয়োগ ক্রমেই কঠোর হয়ে ওঠা রাজনৈতিক পরিবেশে নাগরিকত্ব ও অভিবাসন-অবস্থার তথ্য সংগ্রহের স্পষ্ট উল্লেখ অনেক ব্যবহারকারীকে বিচলিত করে। কর্মীরা সতর্ক করেন, বিক্ষোভকারীদের চলাচল অনুসরণে তাত্ত্বিকভাবে অ্যাপটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে টিকটক ব্যাপক নজরদারির জন্য জিপিএস সুবিধা চালু করেনি; এটি কেবল ব্যবহারকারীর সম্মতিতে চালু হয়।
সেবা ফিরেছে, আস্থা ভেঙেছে
২৭ জানুয়ারি টিকটক জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে তারা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে, যদিও ব্যবহারকারীরা আরও কিছু সময় প্রযুক্তিগত সমস্যায় পড়তে পারেন বলে সতর্ক করে। ওরাকল নিশ্চিত করে, ধারাবাহিক ব্যবস্থাগত বিপর্যয়টির সমাধান হয়েছে। ভিডিও আপলোড এবং সম্পৃক্ততার সঠিক পরিসংখ্যান দেখার সুবিধা ফিরেছে। প্ল্যাটফর্মটি জোর দিয়ে জানায়, বিভ্রাটের পুরো সময় ব্যবহারকারীদের তথ্য ও কনটেন্টে সম্পৃক্ততার তথ্য সুরক্ষিত ছিল।
তবে নতুন মার্কিন মালিকানায় টিকটকের সুনামের যে ক্ষতি হয়েছে, তা প্রযুক্তিগত বিভ্রাটের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আগে নিষেধাজ্ঞার হুমকি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার যাচাই-বাছাই মোকাবিলা করেও কেলেঙ্কারির প্রভাবমুক্ত বলে মনে হওয়া প্ল্যাটফর্মটি এখন বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে পড়েছে। চীনা মালিকানাকে অনিচ্ছুক সংশয় নিয়ে মেনে নেওয়া ব্যবহারকারীরা এখন আরও জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি: অ্যাপটির নিয়ন্ত্রণে আছেন হোয়াইট হাউসের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে এমন মার্কিন ধনকুবেরেরা; আগের চেয়ে আরও বিস্তারিত ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে; আর সরকারি কর্মকাণ্ড নথিবদ্ধ করতে ব্যবহারকারীদের যখন প্ল্যাটফর্মটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই এতে ভয়াবহ ত্রুটি দেখা দিয়েছে।
অর্ধলক্ষের বেশি অনুসারী থাকা ২৬ বছর বয়সী কৌতুকাভিনেত্রী কিয়ারা সুলিভানের মতো নির্মাতাদের জন্য পরিস্থিতিটি পেশাগত জীবনে বেদনাদায়ক সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছে। সুলিভান দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “আমি সেই নির্মাতাদের একজন নই যারা টিকটককে ঘৃণা করেন। আমার ক্যারিয়ারের বর্তমান অবস্থানের পেছনে যে টিকটকের বড় ভূমিকা রয়েছে, সে বিষয়ে আমি খুবই খোলামেলা।” তিনি বলেন, “এ কারণেই অন্তত আপাতত প্ল্যাটফর্মটি ছেড়ে যাওয়া আমার জন্য খুবই দুঃখের।”
টিকটক কার্যক্রম স্থিতিশীল করা এবং ব্যবহারকারীদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করছে। তবে ভবিষ্যতের প্রতিটি ত্রুটিই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের দৃষ্টিতে খতিয়ে দেখা হবে। বিক্রি না হলে নিষেধাজ্ঞা—এমন আইনের বিধান এখনো কার্যকর রয়েছে। বর্তমান কাঠামো জাতীয় নিরাপত্তার শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে নিয়ন্ত্রকদের আরও পরিবর্তন দাবি করা বা প্ল্যাটফর্মটি পুরোপুরি সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। আপাতত টিকটক অনলাইনে রয়েছে, তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে; এর অ্যালগরিদম এখন দলীয় সন্দেহের বিষয়, আর অবকাঠামো শীতের ঝড় ও গ্রীষ্মের তাপ—দুটির কাছেই ঝুঁকিপূর্ণ।
মূল বিষয়গুলো
- ২২ জানুয়ারি টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রম ওরাকলের নেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্যোগের কাছে হস্তান্তর করা হয়; বাইটড্যান্সের হাতে ১৯.৯ শতাংশ মালিকানা থাকে
- ২৫ জানুয়ারি শীতকালীন ঝড় ফার্নের কারণে ওরাকলের ডেটা সেন্টারে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটে, যা কয়েক দিন ধরে চলা ধারাবাহিক ব্যবস্থাগত বিপর্যয়ের সূত্রপাত করে
- ব্যবহারকারীরা ভিডিও আপলোড করতে না পারা, ভিউয়ের সংখ্যা শূন্য থাকা এবং “এপস্টিন” শব্দ থাকা সরাসরি বার্তা আটকে যাওয়ার কথা জানান
- ট্রাম্পবিরোধী ও আইসিইবিরোধী কনটেন্ট সেন্সর করার অভিযোগ তদন্তে ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম রাজ্য পর্যায়ে তদন্ত শুরু করেন
- সিনেটর ক্রিস মারফি কথিত সেন্সরশিপকে গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি বলে বর্ণনা করেন
- সেন্সর টাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, মালিকানা পরিবর্তনের পরের সপ্তাহে অ্যাপ মুছে ফেলার হার ১৩০ থেকে ১৯৫ শতাংশ বেড়ে যায়
- বিকল্প খুঁজতে থাকা ব্যবহারকারীদের কারণে প্রতিদ্বন্দ্বী আপস্ক্রোল্ড যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপ স্টোরে ১ নম্বরে উঠে আসে
- টিকটক গোপনীয়তা নীতিমালা হালনাগাদ করে সুনির্দিষ্ট জিপিএস অবস্থান ও অভিবাসন-অবস্থাসহ সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের অনুমতি দেয়
- নতুন মালিকদের মধ্যে ট্রাম্পের মিত্র ল্যারি এলিসন ও মাইকেল ডেল রয়েছেন; কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে এতে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে
- রাজনৈতিক কনটেন্ট ইচ্ছাকৃতভাবে সেন্সর করার অভিযোগ অস্বীকার করে টিকটক সব সমস্যার জন্য প্রযুক্তিগত ত্রুটিকে দায়ী করেছে






