২০ লাখ ওনের দোটানা
দক্ষিণ কোরিয়ার ৪৬ বছর বয়সী শিক্ষাবিষয়ক কর্মী বে হিউন-জিন প্রকাশ্যে দেশের বেসরকারি শিক্ষার সংস্কৃতিকে সামাজিক ব্যাধি বলে নিন্দা করেন। অথচ ব্যক্তিগতভাবে তিনি তাঁর উচ্চমাধ্যমিকপড়ুয়া ছেলের প্রাইভেট টিউশনে প্রতি মাসে প্রায় ২০ লাখ ওন (১,৩৮০ ডলার) খরচ করেন। এই অঙ্ক দক্ষিণ কোরিয়ার গড় মাসিক বেতন ৩৭ লাখ ৩০ হাজার ওনের অর্ধেকেরও বেশি। তাঁর এই বৈপরীত্য জাতীয় উদ্বেগেরই প্রতিফলন: অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন যে শিক্ষার প্রতিযোগিতার এই উন্মত্ত দৌড় ক্ষতিকর, তবু তা থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষমতা তাঁদের নেই বলেই মনে হয়।
সূচিপত্র
সম্প্রতি নতুন এক আশঙ্কা তাঁর মানসিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। প্রচলিত শিক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ করেও বে উপেক্ষা করতে পারছেন না সেই শিরোনামগুলো, যেখানে বলা হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিগগিরই শ্বেতপোশাক পেশার কর্মীদের প্রতিস্থাপন করবে। উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে, কিন্তু সমাধান অধরাই রয়ে গেছে। টিউশনের খরচ কমানোকে তিনি বাস্তবসম্মত বিকল্প মনে করেন না।
শুনছি, এআই নিয়োগের ধরন বদলে দিচ্ছে, কিন্তু সত্যি বলতে এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। ভবিষ্যতে এআই চাকরি কেড়ে নিলেও, আমি আমার সন্তানকে বলতে পারি না যে এটা ছেড়ে অন্য কিছুর প্রস্তুতি নিতে শুরু করো।
তাঁর এই বিভ্রান্তি আরও ব্যাপক জাতীয় অচলাবস্থার প্রতিফলন। দক্ষিণ কোরিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে সাফল্যের একটি স্পষ্ট সূত্র চালু ছিল: বহু নির্বাচনী প্রশ্নের কলেজ স্কলাস্টিক অ্যাবিলিটি টেস্টের জন্য কঠোর পড়াশোনা, মর্যাদাপূর্ণ SKY বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর (সিউল ন্যাশনাল, কোরিয়া বা ইয়নসে) একটিতে ভর্তি, তারপর বড় কোনো শিল্পগোষ্ঠীতে চাকরি কিংবা চিকিৎসা, আইন বা হিসাবরক্ষণের মতো উচ্চ বেতনের পেশায় প্রবেশ। অভিভাবকেরা জানতেন, এই পথ ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য, কিন্তু এতে একটি নির্ভরযোগ্য লক্ষ্য ছিল।
এখন এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই নিশ্চয়তা বিলীন হয়েছে। অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা দিশাহারা হয়ে পড়েছেন; ঐতিহ্যগত পদ্ধতিটি আঁকড়ে আছেন, যদিও জানেন, এই পথে এগিয়ে হয়তো কোথাও পৌঁছানো যাবে না।
নিশ্চিত ভবিষ্যতের পথ যখন ভেঙে পড়ে
ব্যাংক অব কোরিয়া ২০২৩ সালে কড়া সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিল, চিকিৎসা, আইন ও হিসাবরক্ষণসহ উচ্চ আয়ের পেশাগুলো এআইয়ের প্রভাবে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রযুক্তি খাতের অগ্রদূত বিল গেটস ও ইলন মাস্কও একইভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, এআই শিগগিরই এমন কাজ করতে পারে, যা এখন কেবল চিকিৎসক ও আইনজীবীদের জন্য সংরক্ষিত। বিশ্বের বৃহত্তম নিয়োগসেবা প্রতিষ্ঠান র্যান্ডস্ট্যাডের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, এআইয়ের সক্ষমতার কারণে এ বছর গত বছরের তুলনায় কম কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ নিয়োগকর্তার।
এই পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের পেছনে বছরের পর বছর ও বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করা কোরীয় পরিবারগুলোর জন্য এমন পূর্বাভাস বিকল্পের দিশা না দিয়েই আতঙ্ক তৈরি করছে। ৪৭ বছর বয়সী মা রিউ ইউন-হ্যে মেয়ের বেসরকারি শিক্ষায় প্রতি মাসে ১৫ লাখ ওন খরচ করেন। তিনি এই যৌথ উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন।
আমি উদ্বিগ্ন। আমার মেয়েও উদ্বিগ্ন। আমরা দুজনেই উদ্বিগ্ন। যারা ভালো পড়াশোনা করে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য আছে, তাদের ঠিকই মনে হয়। কিন্তু আমার মেয়ের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের কী বলব, তা জানি না।
এই বিদ্রূপ গভীরভাবে আঘাত করে। কয়েক বছর আগে অভিভাবকদের বলা হয়েছিল, ভবিষ্যতের জন্য কোডিং শেখা অপরিহার্য। এখন এআই আগে থেকেই প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক প্রোগ্রামিংয়ের কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে করছে। এরপর কী, সেই প্রশ্নের উত্তর নেই।
চুং-আং বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের ইমেরিটাস অধ্যাপক ই বাইং-হুন ব্যাখ্যা করেন, এআইয়ের হুমকি আগের অর্থনৈতিক বিপর্যয়গুলোর চেয়ে মৌলিকভাবেই আলাদা।
আগের বিপর্যয়গুলোর তুলনায় এআইয়ের চাকরির হুমকি মৌলিকভাবেই আলাদা। পরিবর্তনের গতি ভীতিকর। কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা এলে মানুষের শ্রম আদৌ টিকিয়ে রাখা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন উঠবে।
তিনি ধারণা করেন, ডিগ্রি যদি আর চাকরির নিশ্চয়তা না দেয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে এই আসক্তি ধীরে ধীরে বদলাতে পারে। কেউ কেউ শেষ পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন যে এআইয়ের প্রতিস্থাপন থেকে সুরক্ষিত দক্ষ কারিগরি পেশা বা সেবাখাত পেশাগত চাকরির চেয়ে ভালো সম্ভাবনা দিচ্ছে।
শিক্ষার সংজ্ঞা নতুন করে নির্ধারণের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা
কোরীয় অভিভাবকেরা দ্বিধায় থাকলেও অন্য দেশগুলো খুব ছোটবেলা থেকেই শিক্ষায় এআই-সাক্ষরতা যুক্ত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশব্যাপী একটি উদ্যোগ শুরু করেছে, যার আওতায় ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য এআই বাধ্যতামূলক বিষয় হবে। পাঠ্যক্রমে সাতটি ক্ষেত্র রয়েছে, যার মধ্যে আছে মৌলিক ধারণা, তথ্য ও অ্যালগরিদম, নৈতিক সচেতনতা এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগ। বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা বিষয়বস্তু পড়াবেন।
চীন ঘোষণা করেছে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশজুড়ে সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এআই শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। প্রথম শ্রেণি থেকেই এই শিক্ষা শুরু হতে পারে এবং বিষয়টির জন্য বছরে অন্তত আট ঘণ্টা ক্লাস বরাদ্দ থাকবে। চীন সরকার এআই-সাক্ষরতাকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি পরাশক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য অপরিহার্য বলে মনে করে।
এর বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্রে কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত এআই শিক্ষার কোনো জাতীয় বাধ্যতামূলক পাঠ্যক্রম নেই; অঙ্গরাজ্যভেদে মানদণ্ডও আলাদা। ২০২৫ সালের এপ্রিলে হোয়াইট হাউসের এক নির্বাহী আদেশে ছোটবেলা থেকেই এআইয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার গুরুত্ব স্বীকার করা হলেও বাস্তবায়ন এখনো খণ্ডিত। ইউরোপেও আগ্রহ বাড়ছে, কিন্তু পুরো অঞ্চলজুড়ে কোনো বাধ্যতামূলক নির্দেশনা নেই। ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এআইয়ের বিষয়বস্তু চালু করতে অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে, অন্যরা এগোচ্ছে সতর্কভাবে।
দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থান মাঝামাঝি। সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি স্কুলে এআই ডিজিটাল পাঠ্যবই (AIDT) চালুর পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করেছে। গণিত, ইংরেজি ও কোডিংসহ বিভিন্ন বিষয়ের জন্য তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি, মাধ্যমিকের প্রথম শ্রেণি এবং উচ্চমাধ্যমিকের প্রথম শ্রেণিতে ব্যবহারের জন্য ৭৬টি পাঠ্যবই অনুমোদন করা হয়েছে। এ উদ্যোগের নেতৃত্ব দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১০ হাজার অগ্রণী শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।
ডিজিটাল পাঠ্যবই ও সমতার সম্ভাবনা
দেগু মহানগর শিক্ষা দপ্তরের সুপারিনটেনডেন্ট কাং ইউন-হি জোর দিয়ে বলেন, এআই প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের নিজস্ব শেখার গতির সঙ্গে মানানসই প্রকৃত ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। দেগুতে AIDT চালুর হার ৯৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে জাতীয় গড় ৩২ শতাংশ।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার বাইরেও সম্ভাব্য সুফল রয়েছে। ম্যাককিনজির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই শিক্ষকদের সময়ের ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হয় এমন কাজ স্বয়ংক্রিয় করতে পারে। এর মধ্যে আছে খাতা দেখা, পাঠ পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক কাজ। এতে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়া, সৃজনশীলতা বাড়ানো এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা করার দিকে মনোযোগ দিতে পারবেন।
কোরীয় উদ্যোগটির বিশেষ লক্ষ্য হলো শিক্ষায় বৈষম্য দূর করা এবং ব্যয়বহুল প্রাইভেট টিউশনের ওপর নির্ভরতা কমানো। এআইচালিত প্রতিবেদনব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির সারাংশ তৈরি করে। এতে হাতে তথ্য নথিভুক্ত করার কাজ বাদ পড়ে, পাশাপাশি অভিযোজনমূলক শিক্ষণ কৌশল তৈরির জন্য তাৎক্ষণিক বিশ্লেষণও পাওয়া যায়।
তবে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। ভাষা শেখানোর ক্ষেত্রে এআই খুব সক্ষম হলেও, গণিত বা বিজ্ঞানের যুক্তি শিক্ষাদানের উপযোগী উপায়ে ব্যাখ্যা করতে কখনো কখনো সমস্যায় পড়ে। শিক্ষার্থীরা নিজেরা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলার বদলে এআইয়ের ধাপে ধাপে দেওয়া সমাধানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে। এতে বোঝা যায়, কারিগরি বিষয়ে এআই টিউশন মানবশিক্ষার বিকল্প নয়, বরং সহায়ক হিসেবে কাজ করলেই সবচেয়ে কার্যকর।
স্নাতকদের ওপর বেকারত্বের সংকটের আঘাত
শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে বিতর্কের আড়ালে রয়েছে কঠোর অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দক্ষিণ কোরিয়ার বেকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের অনুপাত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ৪৯.৬ শতাংশে পৌঁছেছে; ২০২৪ সালে তা ছিল ৪৭.৮ শতাংশ এবং ২০১০ সালে ৩৭.৭ শতাংশ। তরুণ জনগোষ্ঠী কমে গেলেও ডিগ্রিধারীদের বেকারত্বের হার বাড়ছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে চাকরিপ্রার্থীদের বিপরীতে চাকরির শূন্যপদের সংখ্যা ছিল মাত্র ০.৪২, যা ১৯৯৮ সালের এশীয় আর্থিক সংকটের পর থেকে ওই মাসের সর্বনিম্ন। এখন একজন তরুণ কোরীয়ের প্রথম চাকরি পেতে গড়ে ১১.৫ মাস লাগে, যা এ পর্যন্ত দীর্ঘতম অপেক্ষা। ব্যাংক অব কোরিয়ার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত তিন বছরে তরুণদের যে ২ লাখ ১১ হাজার চাকরি হারিয়েছে, তার প্রায় সবই ঘটেছে এআইয়ের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিল্পখাতে।
ইউসি বার্কলির নোবেলজয়ী ডেভিড কার্ড কোরিয়ার তরুণদের কর্মসংস্থান দুর্বল করে দিচ্ছে এমন চারটি বৈশ্বিক শক্তির কথা উল্লেখ করেছেন: যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা, প্রাথমিক পর্যায়ের সফটওয়্যার উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব ফেলা এআই অটোমেশন, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা স্নাতকের সংখ্যা শ্রমের চাহিদাকে ছাড়িয়ে যাওয়ায় সরবরাহের ভারসাম্যহীনতা।
ইনহা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউন হং-শিকের মতে, কোরিয়ার কল্যাণ ও শিল্প মডেলে মৌলিক পুনর্গঠন প্রয়োজন।
একসময় আমরা ভাবতাম, এআই শুধু কম বা মাঝারি দক্ষতার কাজই প্রতিস্থাপন করবে, কিন্তু এখন উচ্চ দক্ষতার কাজও ভেতর থেকে ফাঁপা করে দিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে ব্যবহারিক দক্ষতা শেখানো থেকে সরে সৃজনশীলতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি গড়ে তোলার দিকে যেতে হবে, কারণ যন্ত্র এসব দক্ষতার অনুকরণ করতে পারে না।
পিছু না হটে বদলে যাচ্ছে বেসরকারি শিক্ষা
এআইয়ের কারণে কাজের ধরন বদলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও বেসরকারি শিক্ষায় ব্যয় কমার কোনো লক্ষণ নেই। সঙগ্যুনগোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক ইয়াং জং-হো ধারণা করেন, কোরিয়ার ভর্তি পদ্ধতি অপরিবর্তিত থাকলে এই ব্যয় চলতেই থাকবে।
পরিহাসের বিষয়, এআইয়ের বিরোধিতা না করে বেসরকারি শিক্ষা খাত দ্রুত এই প্রযুক্তি গ্রহণ করছে। কোরীয় এডটেক স্টার্টআপ RiiiD ইংরেজি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখার পথ দেখানো এআইচালিত প্ল্যাটফর্ম SANTA TOEIC তৈরি করেছে। ডিপ লার্নিং অ্যালগরিদম দিয়ে সেবাটি তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহারকারীর দক্ষতা বিশ্লেষণ করে এবং উপযোগী পাঠ্যক্রম দেয়। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, মাত্র ২০ ঘণ্টা পড়াশোনার পর এতে নম্বরে প্রায় ১৩০ পয়েন্ট উন্নতি হতে পারে।
RiiiD কয়েক মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। এআইচালিত টিউশন সেবা দিতে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শিক্ষা সরবরাহকারী Kaplan-এর সঙ্গে অংশীদারত্ব করেছে। প্ল্যাটফর্মটি দেখায়, কোরিয়ার বেসরকারি শিক্ষা খাতের মূল ভিত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিও সেই প্রযুক্তির কারণে বদলে যাচ্ছে, যে প্রযুক্তি শিক্ষার্থীরা যে চাকরির জন্য পড়াশোনা করছে, সেগুলোই বিলুপ্ত করার হুমকি দিচ্ছে।
এতে জটিল এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অভিভাবকেরা প্রচলিত যোগ্যতা অর্জনে বিনিয়োগ চালিয়ে যাচ্ছেন, অথচ সেই যোগ্যতা অর্জনের উপায়গুলো ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠছে। একজন সিপিএ পরীক্ষার্থী এই বৈপরীত্যের কথা জানিয়ে বলেন, এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও বিশেষজ্ঞদের পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা অসম্ভব, কারণ এআই ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য এখনো মানুষের তদারকি দরকার।
খেলা ও দর্শনে বিকল্পের সন্ধান
এই চাপের মধ্যে কিছু পরিবার বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বাবা কিম জুং-গু সপ্তাহে এক দিন ৩০ মিনিটের খেলায় জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে তাঁর পাঁচ বছর বয়সী ছেলের আঁকা ছবি থেকে ভিডিও ক্লিপ ও গল্প তৈরি করেন। কোডিং শেখানো বা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে জোর না দিয়ে তিনি মহাকাশ অভিযান ও গল্প বলার মাধ্যমে সৃজনশীলতা বাড়াতে মনোযোগ দেন।
সিউল ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব এডুকেশনের এআই শিক্ষাবিষয়ক অধ্যাপক কওন জং-মিন বলেন, মাধ্যমের চেয়ে সম্পর্ক ও সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিশুটি ChatGPT-কে কীভাবে দেখে, সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রযুক্তিগুলো কীভাবে দেখতে হয়, সে বিষয়ে শিশুর কোনো শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা না থাকলে সে একে বেশি ক্ষমতা ও জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে দেখবে। শেষ পর্যন্ত এর ফলে সে প্রযুক্তির কথা মেনে চলবে।
কওনের মতে, এআই যুগের শিক্ষা শুধু কারিগরি দক্ষতায় মনোযোগ না দিয়ে মানবিক বিদ্যা, সাহিত্য ও দর্শনের মাধ্যমে সমালোচনামূলক চিন্তা গড়ে তুলবে। তিনি বলেন, এআইয়ের নৈতিকতা নিয়ে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে জোর দেওয়া ইউরোপীয় মডেলগুলো থেকে মূল্যবান শিক্ষা নেওয়ার আছে, যদিও তারা প্রযুক্তি গ্রহণে তুলনামূলক ধীরগতিতে এগোয়।
শৈশবের অতিরিক্ত বেসরকারি শিক্ষা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। দ্বিদলীয় সমর্থন পাওয়া একটি বিলে ৩৬ মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য ইংরেজি কোচিং স্কুলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার এবং তার চেয়ে বেশি বয়সী প্রাক্-প্রাথমিক শিশুদের পাঠদান দিনে ৪০ মিনিটে সীমিত করার প্রস্তাব রয়েছে। শিশুদের ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে চাপ তৈরি করা ইংরেজি কিন্ডারগার্টেনগুলোকে লক্ষ্য করে বিলটি আনা হয়েছে।
প্রজন্মগত বিভাজন
বর্তমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি স্পষ্ট। কলেজ ভর্তি পরীক্ষা আবার দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া ২১ বছর বয়সী এক পরীক্ষার্থী বলেন, এআই চাকরি প্রতিস্থাপন করবে বলে সতর্কতা সত্ত্বেও মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখনো চিকিৎসা ও আইন অনুষদে ভর্তির লক্ষ্য রাখে, কারণ কোরিয়ায় শিক্ষাগত পরিচিতির মর্যাদা এখনো অনেক বেশি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিশেষায়িত আরেক পরীক্ষার্থীও অস্বস্তিকর অনিশ্চয়তার কথা জানান। তিনি যে ক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, স্নাতক হওয়ার সময় সেটি বর্তমান রূপে আদৌ থাকবে কি না, তা নিয়ে তিনি অনিশ্চিত।
এআই পেশাগত চাকরি প্রতিস্থাপন করতে পারে, এই ধারণা উদ্বেগ তৈরি করে। প্রযুক্তি এত দ্রুত এগোচ্ছে যে চাকরির কাঠামো নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে। কিন্তু শিক্ষাগত পরিচিতি ও পেশাগত চাকরি স্থিতিশীলতা এবং সামাজিক আস্থার নিশ্চয়তা দেয়, এই বিশ্বাস এখনো প্রবল।
লন্ডন বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক মার্কাস আলেকজান্ডার এই পরিবর্তনের মধ্যে পথ খুঁজতে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য স্পষ্ট মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
তথ্য মুখস্থ করা অপ্রাসঙ্গিক; কার্যকরভাবে চিন্তা করতে শেখা এখন আগের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মূল প্রশ্নটি ডিগ্রি অর্জন নিয়ে নয়, বরং বিভিন্ন কোর্স ও প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতকেরা আসলে কী শিখছেন, তা নিয়ে।
রিউ ইউন-হ্যের মতো অভিভাবকেরা আশা করেন, পরবর্তী প্রজন্ম আরও স্পষ্ট পথ খুঁজে পাবে। হয়তো এআই যুগে বেড়ে ওঠা শিশুরা নিজেদের সন্তানদের ভিন্নভাবে শিক্ষিত করবে। আপাতত, SKY বিশ্ববিদ্যালয় ও অভিজাত পেশাকেই সাফল্যের মাপকাঠি মনে করে বেড়ে ওঠা অভিভাবকদের পক্ষে সন্তানদের সম্পূর্ণ ভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করা প্রায় অসম্ভব।
মূল কথা
- দক্ষিণ কোরিয়ার বেকার জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকের (৪৯.৬%) হাতে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি; স্নাতকদের প্রথম চাকরির জন্য গড়ে ১১.৫ মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে
- চিকিৎসা, আইন ও হিসাবরক্ষণসহ উচ্চ আয়ের পেশাগুলো এআইয়ের প্রভাবে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করেছে ব্যাংক অব কোরিয়া
- দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি স্কুলগুলোতে ২০২৫ সাল থেকে এআই ডিজিটাল পাঠ্যবই চালু হবে; ৭৬টি পাঠ্যবই অনুমোদন করা হয়েছে এবং ১০ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে
- এআই নিয়ে উদ্বেগ সত্ত্বেও বেসরকারি শিক্ষায় ব্যয় রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে; অভিভাবকেরা টিউশনে মাসে ২০ লাখ ওনেরও বেশি খরচ করছেন
- বৈশ্বিক তুলনায় দেখা যায়, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীন কিন্ডারগার্টেন থেকেই বাধ্যতামূলক এআই শিক্ষা চালু করছে, আর কোরিয়া গুরুত্ব দিচ্ছে ডিজিটাল পাঠ্যবই ও পরীক্ষামূলক কর্মসূচিতে
- এডটেক খাত দ্রুত মানিয়ে নিচ্ছে; RiiiD-এর SANTA TOEIC-এর মতো এআই টিউশন প্ল্যাটফর্ম পরীক্ষার প্রস্তুতিতে প্রচলিত কোচিং পদ্ধতির জায়গা নিচ্ছে
- বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই যুগে অপরিহার্য দক্ষতা হলো মুখস্থনির্ভর শিক্ষার বদলে সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা ও মানবিক বিদ্যার চর্চা
- শৈশবের ইংরেজি শিক্ষা সীমিত করে প্রাক্-প্রাথমিক শিশুদের ওপর চাপ কমাতে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ চলছে






