দুঃসাহসী এক উদ্যোগের অবসান
২০২২ সালে গাঁজাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ইতিহাস গড়ে থাইল্যান্ড: এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে এমন পদক্ষেপ নেয় তারা। ব্যাপকভাবে প্রশংসিত এই উদ্যোগকে দেশের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে রূপান্তর আনার প্রগতিশীল পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে এরপর ঘটেছে অপ্রত্যাশিত নানা ঘটনা, যা এখন রাজ্যে গাঁজানীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বৈধ করার তিন বছর পর থাইল্যান্ড এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তরুণদের মধ্যে বিনোদনমূলক গাঁজা সেবন নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে, আর একসময় অর্থনৈতিক মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া নীতি উল্টে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
সূচিপত্র
শুরুর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট ও আকর্ষণীয়। চিকিৎসায় ব্যবহারের গাঁজার আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরিণত হবে থাইল্যান্ড, কৃষকেরা পাবেন নতুন অর্থকরী ফসল, আর কোভিড-১৯ মহামারির ভয়াবহ অর্থনৈতিক প্রভাব কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় থাকা দেশটিতে স্বাস্থ্য পর্যটনের প্রসার ঘটবে। কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে, তা নীতিনির্ধারকদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও বিতর্কিত।
সারা দেশে দ্রুত গাঁজার দোকান ছড়িয়ে পড়ায় এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে প্রতিশ্রুত নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা বাজারের বদলে বিনোদনমূলক ব্যবহারই বিস্তার লাভ করে। এর ফলে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা এখন এই ঐতিহাসিক সংস্কার পুরোপুরি উল্টে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
থাইল্যান্ডের গাঁজা-পরীক্ষার কাহিনি অর্থনৈতিক উদ্ভাবন ও সামাজিক সুরক্ষা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সমাজের কল্যাণ, এবং প্রগতিশীল নীতি ও রক্ষণশীল মূল্যবোধের বৃহত্তর টানাপোড়েন তুলে ধরে। দেশটি মাদক নিয়ন্ত্রণে ঐতিহ্যগত কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত।
চিকিৎসার বিস্ময় থেকে বিনোদনমূলক ব্যবহারের বিস্তার
২০২২ সালের জুনে থাইল্যান্ড গাঁজাকে মাদকের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সময় নীতিটি স্পষ্টভাবে চিকিৎসায় ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। তৎকালীন জনস্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং বর্তমানে উপপ্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের নেতৃত্বে আইনটি এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যাতে রোগীরা বিকল্প চিকিৎসা নিতে পারেন এবং কৃষকেরা আয়ের নতুন উৎস পান।
শুরু থেকেই সুস্পষ্ট বিধিবিধান না থাকায় একটি ধূসর ক্ষেত্র তৈরি হয়, যার সুযোগ দ্রুত কাজে লাগান উদ্যোক্তারা। কয়েক মাসের মধ্যেই সারা দেশে, বিশেষ করে শহরাঞ্চল ও পর্যটনকেন্দ্রে, ঝলমলে নিয়ন সাইনবোর্ডসহ হাজার হাজার গাঁজার দোকান গড়ে ওঠে। এসব দোকানে কেবল চিকিৎসায় ব্যবহারের পণ্য নয়, তার বাইরেও নানা পণ্য বিক্রি হতো; যেমন আগে থেকে গোটানো গাঁজার সিগারেট, ফলের স্বাদযুক্ত গামি ক্যান্ডি এবং নেশা সৃষ্টিকারী প্রভাবের কথা বলে বাজারজাত করা উচ্চ-টিএইচসি জাতের গাঁজা।
অনেক এলাকার পাড়ায় পাড়ায় গাঁজার গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ একে রাস্তার খাবারের দোকানে গ্রিল করা শূকরের মাংসের পরিচিত গন্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দৈনন্দিন জীবনে গাঁজার এই দৃশ্যমান উপস্থিতি ও গন্ধ মাদকটি সম্পর্কে জনধারণা বদলে দেয় এবং থাই সমাজে এর স্বাভাবিকীকরণ ত্বরান্বিত করে।
এই পরিবর্তনের গতি অনেক পর্যবেক্ষককেই বিস্মিত করে। শিশু মনোরোগ ও আসক্তির চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ ডা. পাত্রাপর্ন কিনোর্ন সম্প্রতি গাঁজাজনিত অসুস্থতা নিয়ে এক সেমিনারে বলেন, যথাযথ বিধিবিধানের অভাবে গুরুতর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি তৈরি হয়েছে।
আইনে বলা হতে পারে যে শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো: সেটাই কি যথেষ্ট?
নীতির উদ্দেশ্য আর বাস্তবে তার প্রয়োগের মধ্যকার ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন চিকিৎসার প্রয়োগের তুলনায় বিনোদনমূলক ব্যবহার অনেক বেশি বেড়ে যায়। থাইল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিনোদনমূলক গাঁজা সেবন প্রায় ১০ গুণ বেড়ে ১২ লাখ থেকে ১ কোটি ১১ লাখে পৌঁছায়। একই সময়ে চিকিৎসার প্রয়োজনে গাঁজা ব্যবহারকারীর সংখ্যা সামান্য বেড়ে ৪ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৫ লাখ ৪০ হাজার হয়।
তরুণদের সংকট: ঝুঁকিতে একটি প্রজন্ম
থাইল্যান্ডের গাঁজা-পরীক্ষার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো তরুণদের ওপর এর প্রভাব। নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসাব্যবস্থা হওয়ার কথা থাকলেও এর বদলে শিশু-কিশোরদের জন্য গাঁজাজাত পণ্য সহজলভ্য হয়ে ওঠে, যা অভিভাবক, শিক্ষক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ায়।
গবেষণায় স্কুলশিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনোদনমূলক ব্যবহার বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়া গেছে। ১৮-১৯ বছর বয়সী থাই শিশু-কিশোরদের মধ্যে ব্যবহারের হার ২০২০ সালের ১-২ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে বেড়ে ৯.৭ শতাংশে দাঁড়ায়। এই নাটকীয় বৃদ্ধি বহু থাই নাগরিকের কাছে বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। তাঁরা গাঁজাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পক্ষে ছিলেন, কিন্তু সন্তানদের মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে এমন পদার্থের সংস্পর্শে আনার উদ্দেশ্য তাঁদের ছিল না।
ইয়ুথ নেটওয়ার্ক এগেইনস্ট ক্যানাবিসের সমন্বয়ক ইয়োদসাকর্ন খুনফাকদি অপরাধমুক্ত করার প্রভাব নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সংক্ষেপে এই ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের কথা বলেন।
এটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে এবং ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে, বিশেষ করে ২৫ বছরের কম বয়সী শিশু ও তরুণদের ওপর, যাদের মস্তিষ্কের বিকাশ এখনো চলছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইয়ুথ নেটওয়ার্ক এগেইনস্ট ক্যানাবিস জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ২ লাখ স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদন জমা দিয়ে গাঁজাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের আহ্বান জানায়। এই তৃণমূল আন্দোলন অভিভাবকদের সেই উদ্বেগের প্রতিফলন, যা আবাসিক এলাকা ও স্কুলের কাছাকাছি গাঁজার দোকান ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠায় আরও বেড়েছে।
থাইল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি ছোট শহরের ৩৮ বছর বয়সী ব্যবসায়ী ও দুই সন্তানের বাবা থাপানাওং লাদকেও অভিভাবকদের এই সাধারণ দোটানার কথা তুলে ধরেন। তিনি তাঁর এলাকায় এমন মাছি বাজারের কথা বলেন, যেখানে প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রি হয়, আর কফিশপে সাজিয়ে রাখা থাকে বং।
কৌতূহল থেকে আমার সন্তানরা এ বিষয়ে জানতে চাইছিল। আমি অবশ্যই চাই না, আমার সন্তানেরা গাঁজা চেষ্টা করুক।
অনেক অভিভাবকের মতো লদকেও মনে করেন, বিনোদনমূলক ব্যবহার পাট্টায়ার মতো নির্দিষ্ট পর্যটন এলাকায় সীমিত রাখা উচিত; শিশুদের সংস্পর্শে আসে এমন দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে এর বিস্তার হওয়া উচিত নয়।
গাঁজামেশানো গামি খাওয়ার পর দুই বছর বয়সী এক মেয়েশিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে পরিস্থিতি চরমে পৌঁছায়। এ ঘটনার পর জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গাঁজামেশানো খাবার, পানীয় ও নাশতার বিরুদ্ধে জরুরি দেশব্যাপী অভিযান শুরু করে। জনস্বাস্থ্যমন্ত্রী সোমসাক থেপসুতিন এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, গাঁজা সম্পর্কে অবগত নয় এমন তরুণদের এর নাগাল পাওয়ার বিষয়টি কর্তৃপক্ষের জন্য স্থায়ী উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
বাড়ছে স্বাস্থ্যগত পরিণতি
বিনোদনমূলক ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থাইল্যান্ডের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো গাঁজাসংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যসমস্যার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধির তথ্য নথিবদ্ধ করতে শুরু করে। চিকিৎসক মহল সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছিল, তবে প্রভাবের ব্যাপকতা অপরাধমুক্ত করার অনেক সমালোচককেও বিস্মিত করে।
কানাডার ইনস্টিটিউট ফর মেন্টাল হেলথ পলিসি রিসার্চের স্টাফ বিজ্ঞানী ডা. বুন্দিত সর্নফাইসার্ন জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাসপাতালে ভর্তির তথ্য বিশ্লেষণ করে উদ্বেগজনক প্রবণতা তুলে ধরেন। গাঁজাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আগের বছরে গাঁজায় নির্ভরশীলতার মাসিক গড় ঘটনা ছিল ১৬২টি; পরের বছরে তা বেড়ে ৪৪৭টি এবং তার পরের বছরে ৮৩৭টি হয়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একই সময়ে গাঁজাজনিত সাইকোসিসের ঘটনা পাঁচ গুণ বেড়েছে।
অন্য গবেষণাতেও এই পরিসংখ্যানের সমর্থন পাওয়া গেছে। মাহিদল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজিস্ট এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের উপদেষ্টা অনুনচাই আসাওয়ামাকিন জানান, গাঁজাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার পরের ১২ মাসে গাঁজাসংশ্লিষ্ট সাইকোসিসের ঘটনা ছিল ২০ হাজার ৮০৪টি। এর আগের ১২ মাসে এ সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ৬১৯টি।
শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. পাত্রাপর্ন কিনোর্ন জানান, গাঁজায় আসক্ত তরুণ রোগীর সংখ্যা তাঁর কাছে বাড়ছে। তাঁদের কেউ কেউ বিষণ্নতার চিকিৎসা করতে নিজেরাই গাঁজা ব্যবহার করছেন, কিন্তু তাতে তাঁদের অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ এতে বোঝা যায়, যথাযথ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই তরুণেরা স্ব-চিকিৎসার জন্য গাঁজা ব্যবহার করছেন, যা তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যগত অন্তর্নিহিত সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
থাইল্যান্ডের রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস জুনে এক বিবৃতিতে জানায়, গাঁজা মানসিক ও শারীরিক উভয় দিক থেকেই স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, বিশেষ করে তরুণ ও গর্ভবতী নারীদের জন্য। এতে উদ্বেগ প্রকাশকারী ক্রমবর্ধমান কণ্ঠের সঙ্গে তারাও যোগ দেয়।
গাঁজা বৈধ করার প্রভাব পুরোপুরি বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে কিছু গবেষক সতর্ক করলেও, হাসপাতালে ভর্তির তথ্য ও চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ জনস্বাস্থ্যগত পরিণতি মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করেছে।
অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি
থাইল্যান্ডের গাঁজা-পরীক্ষার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিকগুলোর একটি হলো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম সাফল্য। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করবে এবং হাজারো কর্মসংস্থান তৈরি করবে—এমন এক বিলিয়ন ডলারের শিল্পে পরিণত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল শুরুতে। কিন্তু গাঁজা খাত মূলত সেই অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
থাইল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং রিসার্চ উপদেষ্টা নুট্টানান উইচিতাকসর্ন ২০২৪ সালে গাঁজা শিল্পের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে একটি বিস্তৃত গবেষণা করেন। তাঁর ফলাফল আর্থিক ব্যর্থতার এক করুণ চিত্র তুলে ধরে।
২০২৫ সালের মধ্যে এই শিল্পের মূল্য ১ বিলিয়ন ডলার হবে বলে ধারণা করা হলেও, নীতিটি 'একেবারেই কোনো ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলেনি'।
উইচিতাকসর্নের গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া ১৭৭টি গাঁজা কোম্পানির মাত্র ২৫ শতাংশ লাভজনক ছিল; ছোট ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছিল। কার্যকর ব্যবসায়িক মডেলের অভাবে ভোটারদের মন জেতার মতো নীতি খুঁজছেন এমন রাজনীতিকদের কাছে গাঁজা শিল্পের আকর্ষণ কমে গেছে।
এটা আর আলোচিত বিষয় নয়। এখন তারা আরও আকর্ষণীয়, বেশি ভোট এনে দেবে এমন অন্য বিষয় দেখছে,
রাজনৈতিক দলগুলো কেন মূলত এই শিল্পের প্রতি সমর্থন ছেড়ে দিয়েছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন উইচিতাকসর্ন।
যেসব ক্ষুদ্র কৃষক ও উদ্যোক্তা লাভজনক নতুন বাজারের সরকারি প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে গাঁজা চাষ বা দোকানে নিজেদের সঞ্চয় বিনিয়োগ করেছিলেন, তাঁদের জন্য অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিশেষভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। উন্নত মানের গাঁজার কুঁড়ি নিজে চাষ করেন পর্নারং পানোর। বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর হতাশার প্রতিচ্ছবি তিনি।
নিজের হার্লে ডেভিডসন বিক্রি করে সঞ্চয়ের টাকা গ্রো-লাইট ও গাঁজার দোকানে ঢালার পর এখন নতুন বিধিবিধানের কারণে ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আছেন পানোর। তাঁর মনে হয়, বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়া সরকার তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
যারা গাঁজার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল, তারা শুরু থেকেই বিষয়টা ভেবেচিন্তে করেনি। এখন তারাই সরকারে, কিন্তু এখনো তাদের কোনো পরোয়া নেই,
আনুতিন চার্নভিরাকুলের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন।
নতুন নিয়মে গাঁজার দোকানগুলোকে লাইসেন্সধারী চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তরিত হতে হবে এবং সেখানে চিকিৎসক রাখতে হবে। পানোরের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে এই ব্যয় বহন করা কঠিন।
তারা বলেছিল, সবাই চাষ করে বিক্রি করতে পারবে। এখন আর তা সবার জন্য নয়। শুধু বড় পুঁজি আর প্রত্যয়নপ্রাপ্ত খামার আছে, এমন ব্যবসায়ীরাই টিকতে পারবে,
আক্ষেপ করেন তিনি।
গাঁজাবিরোধী হচ্ছে রাজনৈতিক হাওয়া
গাঁজা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক অবস্থানেও নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। একসময় প্রগতিশীল সংস্কার হিসেবে প্রশংসিত এই পদক্ষেপ এখন রাজনৈতিক দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা দেখাতে বিভিন্ন মতাদর্শের দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি থাই নাগরিক গাঁজাকে আবার মাদকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে। জনমতের এই নাটকীয় পরিবর্তনে নির্বাচনী সুবিধা চাইছেন এমন রাজনীতিকদের কাছে গাঁজানীতি নির্ধারক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রচারে এ বিষয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে নীরব থেকেছেন আনুতিন চার্নভিরাকুল, যিনি একসময় অপরাধমুক্ত করার পক্ষে ভূমিকার জন্য "গাঁজার রাজা" নামে পরিচিত ছিলেন। উপপ্রধানমন্ত্রী ও ভূমজাইথাই পার্টির নেতা হিসেবে আনুতিন তাঁর আগের রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ করে দেওয়া এই নীতি নিয়ে আলোচনা বেশির ভাগ সময় এড়িয়ে গেছেন।
ভূমজাইথাই পার্টির এক উপনেতা সম্প্রতি ব্লুমবার্গ নিউজকে বলেন, দলটির গাঁজানীতিকে "গুরুতরভাবে বিকৃত করা হয়েছে" এবং এটি কখনোই বিনোদনমূলক ব্যবহারের জন্য ছিল না। নির্বাচনের পর দলটি আবার ক্ষমতায় এলে গাঁজার ব্যবহার শুধু চিকিৎসার মধ্যে সীমিত রাখার আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেবে, তবে একে আবার অপরাধের আওতায় আনবে না।
অন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান আরও কঠোর। জরিপে এগিয়ে থাকা সংস্কারপন্থী পিপলস পার্টি ও ফেউ থাই পার্টি জানিয়েছে, তারা গাঁজাকে আবার মাদকের তালিকায় রাখবে এবং শুধু অনুমোদিত চিকিৎসায় ব্যবহারের সুযোগ দেবে। নির্বাচনী অঙ্গীকারে বিষয়টি বড় করে না এলেও তাদের অবস্থান বর্তমান অপরাধমুক্ত অবস্থার স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান।
গাঁজা অধিকারকর্মী প্রসিতচাই নুনুয়াল রাজনৈতিক এই পরিবর্তনে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন।
আমরা গভীরভাবে হতাশ, কারণ যে দল গাঁজার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছিল এবং আমাদের একমাত্র রাজনৈতিক মিত্র ছিল, তারা এখন আমাদের পথ থেকে সরে গেছে। ন্যায্য গাঁজানীতির কোনো ভবিষ্যৎ আছে বলে মনে হয় না।
প্রসিতচাই এখন সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন। তাঁর আশা, কঠোর নিয়ন্ত্রণের অধীনে বিনোদনমূলক ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে সমর্থন পাবেন। এমন পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা ক্ষীণ মনে হলেও, তাঁর প্রার্থিতা গাঁজা অধিকারকর্মী ও উদ্যোক্তা মহলে ছড়িয়ে পড়া হতাশার প্রতিফলন।
রাজনৈতিক পরিবেশ গাঁজার প্রতি এতটাই বৈরী হয়ে উঠেছে যে অপরাধমুক্ত করার উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়া সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীও অনিচ্ছাসত্ত্বেও সেই সিদ্ধান্ত উল্টে দেওয়ার পক্ষে সমর্থনের অঙ্গীকার করেছেন। আনুতিন সম্প্রতি স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, "এ বিষয়ে আমরা ব্যক্তিগত মনোভাব নিতে পারি না"—এ কথা বলে ব্যক্তিগত আদর্শের চেয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে স্বীকার করেন তিনি।
নিয়ন্ত্রণ অভিযান ও শিল্পে এর প্রভাব
রাজনৈতিক ও জনচাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থাই কর্তৃপক্ষ গাঁজা শিল্পের ওপর ক্রমেই কঠোর বিধিবিধান আরোপ করতে শুরু করে। বাজারের প্রসারে উৎসাহ দিতে শুরুতে যে হস্তক্ষেপহীন নীতি নেওয়া হয়েছিল, তা এখন বিনোদনমূলক বিক্রি ও লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ অভিযানে রূপ নিয়েছে।
২০২৫ সালে নতুন নিয়ম করা হয়, যাতে গাঁজা কিনতে হলে প্রত্যয়নপ্রাপ্ত চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র বাধ্যতামূলক হয়। এর ফলে অবাধ বিনোদনমূলক বাজার কার্যত কঠোর চিকিৎসাব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়। বিনোদনমূলক ব্যবসার মডেলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো এর ফলে বড় চ্যালেঞ্জে পড়ে।
সরকার জানায়, কঠোর নিয়মের কারণে ২০২৫ সালের শেষ দিকে ১৮ হাজার গাঁজার দোকানের মধ্যে ৭ হাজারটি তাদের লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করেনি। বৈধ বাজার থেকে এই বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের সরে যাওয়া শিল্পটির ভবিষ্যৎ এবং বৈধ চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা রোগীদের সেবা দেওয়ার সক্ষমতা—দুটিই অনিশ্চিত করেছে।
নতুন নিয়ম মেনে চলার চেষ্টা করা ব্যবসার জন্য খরচ প্রায়ই অসাধ্য হয়ে ওঠে। এখন গাঁজার দোকানগুলোকে চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে নিবন্ধন করতে হবে এবং লাইসেন্সধারী চিকিৎসক নিয়োগ করতে হবে। এই ব্যয়বহুল ও আমলাতান্ত্রিক পরিবর্তন বহন করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে ছোট ব্যবসাগুলো। নতুন মানদণ্ড পূরণে প্রয়োজনীয় রূপান্তরের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
ব্যাংককভিত্তিক উদ্যোক্তা নাত্তাকান পুন্যথানাওরাকিতের গাঁজার তিনটি দোকান রয়েছে। বাড়তে থাকা চাপ ও নিয়ম মেনে চলার খরচের কারণে তিনি এরই মধ্যে একটি দোকান বন্ধ করে দিয়েছেন। তাঁর ধারণা, নিবন্ধিত অধিকাংশ দোকানই শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যাবে এবং অনেক ব্যবসা মাটির নিচে চলে যাবে।
ছোট ব্যবসায়ীরাই—মা-বাবার চালানো দোকান, সেই পারিবারিক ব্যবসা যেখানে স্বামী গাঁজা চাষ করার সময় স্ত্রী গাছ ছাঁটতে সাহায্য করেন—তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন,
দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন গাঁজা উদ্যোক্তা চকওয়ান চোপাকা।
সব ব্যবসা নতুন নিয়ন্ত্রক পরিবেশকে পুরোপুরি নেতিবাচকভাবে দেখছে না। ব্যাংককের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর একটিতে থাকা শ্যাগি বাডস দোকানের মালিকেরা নিয়ম মেনে চলার উপযোগী করে নতুন একটি দোকান তৈরির পরিকল্পনা করছেন।
আমার মনে হয় না ২০২৬ সাল শিল্পটির শেষের শুরু। বরং এটি একটি সুযোগ। সব শর্ত পূরণ করতে পারলে ভবিষ্যতের জন্য শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলতে পারবেন,
বলেন সহ-মালিক নিতিক্রিস্ট আত্তাক্রিস্ট।
এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে রয়েছে বিশ্বাস যে কঠোর বিধিবিধান নিম্নমানের ব্যবসায়ীদের সরিয়ে দিয়ে এবং আরও পেশাদার ও টেকসই বাজার গড়ে তুলে শেষ পর্যন্ত শিল্পটিকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে মানিয়ে নেওয়ার সামর্থ্য আছে এমন প্রতিটি ব্যবসার বিপরীতে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক ধ্বংসের মুখে।
বিশ্ব প্রেক্ষাপট ও তুলনা
থাইল্যান্ডের গাঁজা-পরীক্ষাকে বিচ্ছিন্নভাবে বোঝা যাবে না। মাদকনীতি সংস্কারের বৈশ্বিক আন্দোলনে অর্থনৈতিক সুযোগ ও সামাজিক দায়িত্বের ভারসাম্য আনার অন্যতম উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রচেষ্টা এটি। অন্য দেশ ও অঞ্চলের অভিজ্ঞতার সঙ্গে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতার তুলনা করলে কী ভুল হয়েছিল এবং আর কী করা যেত, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা সম্ভবত সবচেয়ে শিক্ষণীয় তুলনা। ১৯৯৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় চিকিৎসার জন্য গাঁজা বৈধ হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গাঁজা শিল্প ৪০ বিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হয়েছে। এখন ২৪টি অঙ্গরাজ্যে বিনোদনমূলক ব্যবহারের জন্য এবং ৪০টি অঙ্গরাজ্যে চিকিৎসার জন্য গাঁজা বৈধ। তবে অবৈধ বাজার থেকে বৈধ বাজারে উত্তরণের চ্যালেঞ্জও যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট হয়েছে; এর মধ্যে রয়েছে কালোবাজারের স্থায়ী উপস্থিতি, জটিল বিধিবিধান এবং সামাজিক ন্যায্যতার উদ্বেগ।
থাইল্যান্ডের সঙ্গে পার্থক্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ অঙ্গরাজ্য বৈধকরণের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রক কাঠামো চালু করেছিল। লাইসেন্স দেওয়ার প্রক্রিয়া, পণ্যের মান পরীক্ষা থেকে শুরু করে করব্যবস্থা—সবকিছুই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। এ পদ্ধতিরও সমস্যা আছে, তবে থাইল্যান্ডে দেখা বিনোদনমূলক ব্যবহারের অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ হয়তো তা ঠেকাতে পারত।
২০১৮ সালে দেশজুড়ে গাঁজা বৈধ করা কানাডা সরকার কঠোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলে। খুচরা বিক্রির কেন্দ্র সীমিত করা হয়, পণ্যের মানদণ্ড আরোপ করা হয় এবং বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সব সমস্যা ঠেকাতে না পারলেও এই পদ্ধতিতে থাইল্যান্ডের তুলনায় বৈধ গাঁজায় উত্তরণ ছিল আরও সুশৃঙ্খল।
আগে অপরাধমুক্ত করে পরে নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় থাইল্যান্ডে যে শূন্যতা তৈরি হয়, তা দ্রুতই সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা পূরণ করেন। অনুনচাই আসাওয়ামাকিনের ভাষায়, নীতিটি কাঠামোবদ্ধ বৈধ বাজার তৈরির বদলে "দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এক শূন্যতা" তৈরি করেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, পশ্চিমা দেশগুলোতে সাধারণত জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো বেশি প্রতিষ্ঠিত এবং মাদক ব্যবহারের ক্ষতি কমানোর পদ্ধতি নিয়ে অভিজ্ঞতাও বেশি। কঠোর মাদকবিরোধী নীতির ইতিহাস এবং নিয়ন্ত্রিত মনঃপ্রভাবী পদার্থ ব্যবহারের সীমিত অভিজ্ঞতা নিয়ে থাইল্যান্ডকে গাঁজার ব্যাপক প্রাপ্যতার সামাজিক প্রভাব মোকাবিলায় ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে।
থাইল্যান্ডের গাঁজানীতির আন্তর্জাতিক দিকটিও উত্তেজনা তৈরি করেছে। বিদেশি সরকার, বিশেষ করে এশিয়ার যেসব দেশে গাঁজা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, তারা থাইল্যান্ড থেকে মাদক পাচার বাড়ার বিষয়ে অভিযোগ করেছে। থাই গাঁজা নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে পর্যটকদের গ্রেপ্তারের একাধিক আলোচিত ঘটনা ঘটেছে, যা কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও নেতিবাচক প্রচারের জন্ম দিয়েছে।
সামনের পথ
গাঁজা-পরীক্ষার পরিণতি সামাল দিতে গিয়ে থাইল্যান্ডের নীতিনির্ধারক, অধিকারকর্মী ও উদ্বিগ্ন নাগরিকেরা সামনে এগোনোর সবচেয়ে ভালো পথ নিয়ে বিতর্ক করছেন। বিকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে গাঁজাকে পুরোপুরি আবার অপরাধের আওতায় আনা থেকে শুরু করে কঠোর নিয়ন্ত্রণে সীমিত বিনোদনমূলক ব্যবহার অনুমোদন করে এমন পূর্ণাঙ্গ বিধিব্যবস্থা।
এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, গাঁজার ব্যবহার শুধু চিকিৎসায় সীমিত রাখার জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশ রয়্যাল গেজেটে প্রকাশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক করা হবে কি না। তা হলে আদেশটি আইনত কার্যকর হবে। তরুণদের জন্য তৈরি হওয়া গুরুতর সামাজিক সমস্যার কথা উল্লেখ করে সরকারের মুখপাত্র জিরায়ু হুংসুব বলেছেন, "নীতিকে তার মূল লক্ষ্যে ফিরতে হবে: গাঁজাকে শুধু চিকিৎসার প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য নিয়ন্ত্রণ করা।"
অনেক গাঁজা অধিকারকর্মীর যুক্তি, দেখা দেওয়া সমস্যার সমাধান অপরাধের আওতায় আনা নয়, বরং যথাযথ বিধিবিধান। অ্যাডভোকেসি গ্রুপ রাইটিং থাইল্যান্ড'স ক্যানাবিস ফিউচারের প্রধান প্রসিতচাই নুনুয়াল বলেন, আটকে থাকা ক্যানাবিস অ্যান্ড হেম্প অ্যাক্ট জনউদ্বেগ মোকাবিলার পাশাপাশি বৈধকরণের সুফল বজায় রাখার সম্ভাব্য কাঠামো হতে পারে।
সবাই একমত যে এটি নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। কিন্তু গাঁজা নিয়ন্ত্রণে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো উপাত্ত সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে নেই,
তিনি বলেন।
একটি যথাযথ নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় শিশুদের কাছ থেকে গাঁজার দোকান দূরে রাখতে কঠোর এলাকা-নির্ধারণ, পণ্যের পূর্ণাঙ্গ মান পরীক্ষা, লাইসেন্সের শর্ত, বয়স যাচাইব্যবস্থা এবং জনসচেতনতামূলক প্রচার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এ ধরনের পদ্ধতির জন্য প্রয়োগ ও তদারকিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। তবে বর্তমান বিশৃঙ্খলা ও সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার মাঝামাঝি একটি টেকসই পথ তৈরি করতে পারে এটি।
অর্থনৈতিক দিকটিও সতর্কভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গাঁজা শিল্প প্রতিশ্রুত ব্যাপক সমৃদ্ধি না আনলেও, এটি কয়েক হাজার কর্মসংস্থান তৈরি করেছে এবং কিছু খাতে করের রাজস্ব এনেছে। গাঁজা অধিকারকর্মী ও থাইল্যান্ডের প্রথম বৈধ গাঁজার দোকানের প্রতিষ্ঠাতা রাত্তাফন সানরাকের ধারণা, শিল্পটি কঠোরভাবে সীমিত করা হলে অন্তত ৬০ হাজার কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ঐতিহ্যবাহী ফসলের বিকল্প হিসেবে গাঁজা চাষে বিনিয়োগ করা ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য নীতির এই পরিবর্তন ধ্বংসাত্মক হতে পারে। অন্য কৃষিকাজে যেতে না পারলে বা পণ্যের বৈধ রপ্তানি বাজার খুঁজে না পেলে তাঁদের অনেকেই দেউলিয়া হওয়ার মুখে পড়বেন।
গাঁজাকে আবার অপরাধের আওতায় আনার মানবিক মূল্যও বিবেচনায় নিতে হবে। চাষের কার্যক্রম নিবন্ধন করা ১০ লাখের বেশি মানুষ রাতারাতি আবার অপরাধী হয়ে যেতে পারেন। গাঁজাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সময় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া প্রায় ৩ হাজার গাঁজা-সংক্রান্ত অপরাধীও আবার আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
চাষি ও গাঁজার দোকানের মালিকেরা জানিয়েছেন, গাঁজাকে আবার অপরাধের আওতায় আনার ফলে তাঁদের বিনিয়োগ হারালে ক্ষতিপূরণ চেয়ে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করবেন। ব্যক্তিগতভাবে কত বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা তুলে ধরেছেন রাত্তাফন সানরাক।
কেউ কেউ ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে তাঁদের সমস্ত সঞ্চয় ব্যবহার করেছেন,
তিনি বলেন।
শেষ পর্যন্ত থাইল্যান্ড যে পথ বেছে নেবে, তা সমাজ হিসেবে দেশটির বৃহত্তর মূল্যবোধ ও অগ্রাধিকারকে প্রতিফলিত করবে। অর্থনৈতিক উদ্ভাবন ও সামাজিক সুরক্ষা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও সমাজের কল্যাণ, ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ ও প্রগতিশীল সংস্কারের মধ্যকার টানাপোড়েন আগামী মাসগুলোতে প্রকাশ পাবে; নীতিনির্ধারকেরা তখন রাজ্যে গাঁজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন।
মূল কথা
উচ্চাশা নিয়ে শুরু হওয়া থাইল্যান্ডের গাঁজা-পরীক্ষা এখন এমন এক জটিল দোটানায় রূপ নিয়েছে, যার সহজ কোনো সমাধান নেই। অপরাধমুক্ত করার অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য সুফল বজায় রাখার কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে দেশটি।
- চিকিৎসায় ব্যবহারের গাঁজার কেন্দ্র এবং কৃষকদের নতুন অর্থকরী ফসল গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ২০২২ সালে এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে গাঁজাকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেয় থাইল্যান্ড।
- বিনোদনমূলক ব্যবহার দ্রুত বাড়ে; ২০২০ সালের ১২ লাখ ব্যবহারকারী থেকে ২০২২ সালে তা প্রায় ১০ গুণ বেড়ে ১ কোটি ১১ লাখে পৌঁছায়।
- ১৮-১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে গাঁজার ব্যবহার ২০২০ সালের ১-২ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে বেড়ে ৯.৭ শতাংশে দাঁড়ায়, যা জনস্বাস্থ্য নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করে।
- গাঁজায় নির্ভরশীলতার কারণে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়, আর গাঁজাজনিত সাইকোসিসের ঘটনা পাঁচ গুণ বাড়ে।
- অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অতিরিক্ত আশাবাদী প্রমাণিত হয়; জরিপে অংশ নেওয়া গাঁজা কোম্পানির মাত্র ২৫ শতাংশ লাভের কথা জানায়।
- ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, এখন দুই-তৃতীয়াংশের বেশি থাই নাগরিক গাঁজাকে আবার মাদকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে।
- ২০২৫ সালের কঠোর নিয়মের জবাবে ১৮ হাজার গাঁজার দোকানের মধ্যে ৭ হাজারটি লাইসেন্স নবায়নের আবেদন করেনি।
- প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এখন গাঁজার ব্যবহার শুধু চিকিৎসায় সীমিত রাখার পক্ষে; কয়েকটি দল পুরোপুরি আবার অপরাধের আওতায় আনার পক্ষেও।
- নতুন বিধিবিধানে গাঁজা কেনার জন্য ব্যবস্থাপত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং দোকানগুলোকে লাইসেন্সধারী চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচালনার শর্ত দেওয়া হয়েছে।
- জনস্বাস্থ্যগত উদ্বেগের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ভারসাম্য কীভাবে করা হবে, তা বিবেচনা করছেন নীতিনির্ধারকেরা। এর মধ্যেই থাইল্যান্ডের গাঁজা শিল্পের ভবিষ্যৎ ঝুলে আছে।






