মহানগরীর সন্ধিক্ষণ
জাকার্তা বিশ্বে নতুন এক মাইলফলকে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী ও এর আশপাশের মহানগর এলাকায় এখন প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের বসবাস, যা জনসংখ্যার বিচারে জাকার্তাকে বিশ্বের শহরগুলোর শীর্ষে তুলে এনেছে। এই সংখ্যা টোকিও ও ঢাকাকেও ছাড়িয়ে গেছে; এশিয়ায় নগরজীবনের ব্যাপকতার মাপকাঠি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত ছিল এই দুই মহানগরী। শিরোনামের এই সংখ্যা পরিবর্তনের গতি ও ব্যাপকতা তুলে ধরে। তবে দৈনন্দিন বাস্তবতার চিত্র ধরা পড়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ যাতায়াতে, মৌসুমি বৃষ্টিতে প্লাবিত পাড়ায় এবং ঝকঝকে উঁচু ভবনের পাশে ছড়িয়ে থাকা দীর্ঘদিনের কামপুং জনপদে।
সূচিপত্র
- মহানগরীর সন্ধিক্ষণ
- যেভাবে দ্রুত বেড়ে উঠল জাকার্তা
- চাপের মুখে আবাসন, পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবন
- বন্যা, ভূমি দেবে যাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি
- কেন দেবে যাচ্ছে ভূমি
- তাপ, বায়ু ও সবুজ স্থানের ঘাটতি
- রাজধানী স্থানান্তরের প্রকৃত তাৎপর্য
- জাকার্তার অভিযোজনের চেষ্টা
- এখনই কীভাবে চাপ কমানো যায়
- পরিসংখ্যানের আড়ালে মানুষ
- মূল কথা
জাকার্তার জীবনের বড় একটি অংশই ঘনবসতিকে ঘিরে। স্থানীয় হিসাব অনুযায়ী, শহরের কেন্দ্রস্থল পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি; প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করেন প্রায় ২২ হাজার মানুষ। চাহিদার তুলনায় সাশ্রয়ী আবাসনের ঘাটতি রয়েছে। সবুজের পরিমাণও সীমিত: শহরের প্রায় ১৮ শতাংশ এলাকায় গাছপালা রয়েছে এবং আনুমানিক ১৪ শতাংশ এলাকায় আছে গাছ। যানবাহনের ধোঁয়া, কয়লা ও ডিজেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং মহানগরীর প্রান্তে খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বাতাসে প্রায়ই সূক্ষ্ম কণা ছড়ায়। দীর্ঘদিনের ভোগান্তির কারণ যানজটও জাকার্তার নগরজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে আছে।
এখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি অভিবাসন। কাজ, শিক্ষা ও উন্নত সেবার খোঁজে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে অনেকে আসেন। শহরের কেন্দ্রস্থলে জন্মহার তুলনামূলক কম এবং মৃত্যুহার অস্বাভাবিকভাবে বেশি নয়। একই সময়ে, লাখ লাখ মানুষ রাজধানীকে ঘিরে থাকা বিস্তৃত উপশহর বলয়ে চলে গেছেন। দ্রুত বেড়ে ওঠা এই অঞ্চলে রয়েছে আবাসন এলাকা, কারখানা ও পণ্য সরবরাহকেন্দ্র। দৈনন্দিন জীবনে কেন্দ্রস্থল ও আশপাশের পৌর এলাকাগুলো মিলে একটিই মহানগরী হিসেবে কাজ করে; কর্মসংস্থান, বাণিজ্য ও অবকাঠামো এখানে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
ভৌগোলিক অবস্থানও চ্যালেঞ্জ বাড়িয়েছে। জাভার উত্তর-পশ্চিম উপকূলে নিচু ও সমতল ভূমিতে অবস্থিত জাকার্তা। জাভা সাগরে যাওয়ার পথে শহরটির মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে ১৩টি নদী। বর্ষা মৌসুমে ভারী বৃষ্টি, বিশেষ করে জোয়ারের সঙ্গে মিলে গেলে, রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে। ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে শহরের নিচের ভূমি দেবে যাচ্ছে, আর উপকূলীয় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বাড়ছে। এসব কারণে বাসিন্দা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান—দুয়ের জন্যই বন্যার ঝুঁকি স্থায়ী হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
যেভাবে দ্রুত বেড়ে উঠল জাকার্তা
রাজধানীর জনসংখ্যা বৃদ্ধির বড় একটি কারণ অভিবাসনের ধরন। প্রতিবছর ঈদের ছুটির পর, যা স্থানীয়ভাবে লেবারান নামে পরিচিত, নতুন আগতরা স্বজনদের সঙ্গে শহরে ফেরেন এবং ভাগ্য গড়ার চেষ্টা করেন। ছুটির পর শহরে আসা মানুষের সংখ্যা সম্প্রতি কমেছে বলে কর্তৃপক্ষের হিসাব। ২০২২ সালে ২৭ হাজারের বেশি মানুষ আসার পর ২০২৪ সালে সংখ্যাটি ১৬ হাজারের কিছু বেশি ছিল। উন্নততর স্ব-নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং কম ভাড়ার কাছের শহরগুলোতে বসতি গড়ার প্রবণতাকে এই পরিবর্তনের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অনেক নতুন বাসিন্দা প্রথমে বোগর, দেপক, তাঙ্গেরাং, দক্ষিণ তাঙ্গেরাং বা বেকাসিতে ওঠেন, তারপর কাজের জন্য রাজধানীতে যাতায়াত করেন।
এই উপগ্রহ শহরগুলো কেন্দ্রস্থলের সঙ্গে মিলে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করেছে, যা প্রায়ই জাবোদেতাবেক নামে পরিচিত। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, এই মহানগর অঞ্চলের জনসংখ্যা ৪ কোটির কিছু বেশি, যা পৃথিবীর বৃহত্তম নগর সমষ্টিগুলোর একটি। প্রশাসনিক সীমানার চেয়ে কর্মীদের কাছে কর্মস্থল, স্কুল, বাজার এবং বাস বা ট্রেনের লাইনের অবস্থান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে জাকার্তার ভূমিকা—যেখানে প্রধান কার্যালয়, বন্দর ও বিভিন্ন সেবা খাতের ঘনত্ব বেশি—দ্বীপপুঞ্জের নানা প্রান্তের কর্মপ্রত্যাশীদের কাছে শহরটিকে আকর্ষণীয় করে রেখেছে।
মানুষকে টানার কারণগুলো স্পষ্ট। জাকার্তায় মজুরি সাধারণত গ্রামীণ এলাকার আয়ের চেয়ে বেশি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগও বিস্তৃত। বন্ধু ও স্বজনদের যোগাযোগ নতুনদের আবাসন ও স্বল্পমেয়াদি কাজ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। অনেক অভিবাসী প্রথমে আত্মীয়দের সঙ্গে থাকেন, পরে কামপুং এলাকার ভাড়া ঘর বা কারখানা ও গুদামের কাছাকাছি শ্রমিকদের আবাসনে চলে যান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম এমন মানুষের জন্য দোকান, পণ্য সরবরাহ ও গৃহকর্মের মতো সেবামূলক কাজ কর্মজীবন শুরুর সুযোগ দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের জন্য জাকার্তায় অর্থায়ন, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি ও সরকারি খাতে নানা পেশার সুযোগ রয়েছে।
চাপের মুখে আবাসন, পরিবহন ও দৈনন্দিন জীবন
আবাসনের জোগান চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। প্রতিবছর কয়েক হাজার সাশ্রয়ী আনুষ্ঠানিক আবাসন তৈরি হলেও নতুন পরিবার, দীর্ঘদিনের বাসিন্দা এবং অনানুষ্ঠানিক বসতি থেকে আসা কর্মীদের চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। কয়েকটির বয়স প্রজন্মেরও বেশি—এমন কামপুং এলাকাগুলোই প্রায়ই নতুন আগতদের প্রথম আশ্রয়স্থল। কেন্দ্রীয় জেলাগুলোতে জমির দাম দ্রুত বেড়েছে। তাই অনেক নিম্ন আয়ের বাসিন্দা কম খরচের প্রান্তিক এলাকায় চলে গেছেন, যদিও সেখানে যাতায়াতে বেশি সময় লাগে।
জাতীয় পরিসংখ্যান আবাসন ঘাটতির ব্যাপকতা তুলে ধরে। ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার আবাসন ও বসতি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ১ কোটি ২৫ লাখ ৭০ হাজার পরিবারের নিজস্ব বাড়ি নেই এবং ১ কোটি ৬৫ লাখ ৯০ হাজার পরিবার বসবাসের অনুপযোগী বলে বিবেচিত বাড়িতে থাকে। মোট ৭ কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের মধ্যে প্রায় প্রতি ১০টির চারটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে অনিশ্চিত আবাসনের ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারের আবাসন অর্থায়ন তারল্য তহবিল ছয় বছরে ১০ লাখ ৫০ হাজারের বেশি পরিবারকে উপযুক্ত বাড়ি পেতে সহায়তা করেছে, কিন্তু ঘাটতি এখনো বড়। জাকার্তায় আবাসনের টানাটানি চোখে পড়ে ভিড়ভাট্টার ভাড়া বাসা, বিদ্যমান বাড়িতে অনানুষ্ঠানিক সম্প্রসারণ এবং রেললাইনের কাছে নতুন অ্যাপার্টমেন্ট তৈরির ক্রমাগত চাপে।
পরিবহনব্যবস্থার ওপর চাপ দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলে। শহরটি আধুনিক মেট্রো, লাইট রেল ও নতুন বাস করিডরে বিনিয়োগ করেছে, ফলে গণপরিবহনের আওতা বাড়ছে। তা সত্ত্বেও গাড়ি ও মোটরসাইকেলের মালিকানা উচ্চ ধারণক্ষমতার পরিবহনের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে বলে যানজট তীব্র রয়ে গেছে। যাত্রীদের নিয়মিতই দুই ঘণ্টা বা তার বেশি সময় যাতায়াত করতে হয়। যানবাহনের ধোঁয়া ও নির্মাণকাজের ধুলা বায়ুদূষণে ভূমিকা রাখে। দূষণের মাত্রা প্রতিদিন বদলালেও তা প্রায়ই স্বাস্থ্য নির্দেশিকা ছাড়িয়ে যায়। গরম, যানজট ও দূষণের সম্মিলিত প্রভাবে উৎপাদনশীলতা কমে এবং জনস্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ বাড়ে।
বন্যা, ভূমি দেবে যাওয়া ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি
জাকার্তার ঝুঁকির ধরন অনেকটাই নির্ধারণ করে পানি। ১৯৯০ সালের পর থেকে এলাকাটিতে বারবার বড় বন্যা হয়েছে। ২০০৭ সালের বর্ষা মৌসুমে বন্যার পানি শহরের বড় একটি অংশ ডুবিয়ে দেয়, যার ফলে বাসিন্দারা বাস্তুচ্যুত হন এবং বাণিজ্য ব্যাহত হয়। উষ্ণ বায়ুমণ্ডলে ভারী বৃষ্টির ঝড় আরও তীব্র হচ্ছে, আর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রতিবছর কয়েক মিলিমিটার করে বাড়ছে। এসব প্রবণতায় জলোচ্ছ্বাস ও নদীর বন্যা আরও ক্ষতিকর হয়ে উঠছে।
কেন দেবে যাচ্ছে ভূমি
জাকার্তার কিছু অংশ দেবে যাচ্ছে, কারণ বহু পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে পানি তোলে। পানি তুলে ফেললে পলির স্তর চেপে বসে। শহরের উত্তরে স্যাটেলাইট ও ভূমিতে বসানো সেন্সরে বছরে কয়েক দশ মিলিমিটার ভূমি দেবে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, জাকার্তার প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা এখন সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে। ভূমি দেবে গেলে পানি নিষ্কাশন কঠিন হয়, নদীর পাড় দুর্বল হয়ে পড়ে এবং জোয়ারের পানি আরও ভেতরে প্রবেশ করে।
উপকূলীয় উন্নয়ন ঝুঁকির মাত্রা আরও বাড়িয়েছে। ১৯৯০ সালের পর থেকে জাকার্তা উপসাগরের অগভীর পানিতে এক হাজার হেক্টরের বেশি নতুন জমি ও কৃত্রিম দ্বীপ গড়ে তোলা হয়েছে। এসব এলাকার কয়েকটিতে অভিজাত আবাসন ও বিনোদনকেন্দ্র রয়েছে। প্রাকৃতিক মাটির তুলনায় কৃত্রিম দ্বীপ দ্রুত দেবে যায়, কারণ সময়ের সঙ্গে ভরাট করা মাটি চেপে বসে। নতুন দ্বীপগুলোতে বছরে ৮০ মিলিমিটার পর্যন্ত ভূমি দেবে যাওয়ার হার রেকর্ড করা হয়েছে। এতে এলাকাগুলো জলোচ্ছ্বাসের আরও কাছে চলে যাচ্ছে এবং সমুদ্রপ্রাচীর ও পানি নিষ্কাশন পাম্পের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন হচ্ছে।
উপকূলীয় বন্যা মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ জাতীয় রাজধানী সমন্বিত উপকূল উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রস্তাব দেয়। এতে ছিল একটি বিশাল সমুদ্রপ্রাচীর এবং উপসাগরকে রক্ষা ও উন্নয়নে সহায়তার জন্য ১৭টি কৃত্রিম দ্বীপের শৃঙ্খল। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি কাজ শুরু হলেও পরিবেশগত, কারিগরি ও আর্থিক উদ্বেগের কারণে গতি কমে যায়। শক্তিশালী উপকূলীয় প্রতিরক্ষা গড়ার মূল ধারণাটি এখনো বিবেচনায় রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, শুধু উঁচু প্রাচীর দিয়ে অভ্যন্তরীণ বন্যা ঠেকানো যাবে না; এর পেছনে রয়েছে তীব্র বৃষ্টি, আবর্জনায় বন্ধ নদী এবং দেবে যাওয়া ভূমি। দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি কমাতে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন হ্রাস এবং পুরো অববাহিকাজুড়ে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নত করা জরুরি।
তাপ, বায়ু ও সবুজ স্থানের ঘাটতি
জাকার্তার নির্মিত পরিবেশ দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০০০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নির্মিত এলাকা প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে, আর ভবনগুলোর মোট আয়তন বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ। শহরটি ওপরের দিকে বাড়ার চেয়ে বাইরের দিকে দ্রুত ছড়িয়েছে। এই ধরনটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাইরের দিকে বিস্তারের ফলে বৃষ্টির পানি শুষে নেওয়া মাঠ ও জলাভূমি প্রায়ই পাকা হয়ে যায়। দিনের বেলা পাকা রাস্তা ও ছাদ তাপ ধরে রাখে এবং রাতে ধীরে ধীরে তা ছাড়ে। এর ফলে তৈরি হয় নগর তাপদ্বীপ, যা আশপাশের গ্রামীণ এলাকার তুলনায় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
সবুজ স্থান পাড়া ঠান্ডা রাখতে, বাতাস পরিশোধন করতে এবং বৃষ্টির পানি শুষে নিতে সাহায্য করে। শহরের সামান্য অংশই গাছ বা পার্কের ছায়ায় থাকায় অনেক এলাকায় মধ্যাহ্নের রোদে দ্রুত গরম বেড়ে যায়। জাকার্তায় করা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নগরের ভবনের আয়তন বৃদ্ধির সঙ্গে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং নগর তাপদ্বীপের প্রভাব জোরালো হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এর স্বাস্থ্যগত পরিণতির মধ্যে রয়েছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ বৃদ্ধি এবং তাপপ্রবাহের সময় ঝুঁকি বেড়ে যাওয়া; বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, শিশু ও খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিকদের ক্ষেত্রে। কমিউনিটি বাগান ও সবুজায়নের উদ্যোগ জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে গাছের ছায়া ও পার্কের সুযোগ বাড়াতে রাস্তার নকশা, স্কুলের আঙিনা ও নদীপাড়ে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগ দরকার।
রাজধানী স্থানান্তরের প্রকৃত তাৎপর্য
ইন্দোনেশিয়া সরকারকে বোর্নিও দ্বীপের পূর্ব কালিমান্তানের নুসান্তারায় সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি। ২০২২ সালের ৩ নম্বর আইন অনুযায়ী প্রকল্পটি পরিচালিত হচ্ছে; আনুমানিক বাজেট ৩০ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। পরিকল্পনাটি ধাপে ধাপে এগোবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। কর্মকর্তারা নুসান্তারাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দক্ষ পানি ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক গণপরিবহনসমৃদ্ধ সবুজ ও স্মার্ট শহর হিসেবে তুলে ধরছেন। প্রাথমিকভাবে সেখানে প্রায় ১৯ লাখ মানুষের বসবাসের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৪৫ সালের মধ্যে লাখ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির পূর্বাভাস দিয়েছে সরকার। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি প্রাথমিক কাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়েছিল, যদিও অর্থায়ন ও নির্মাণকাজের অগ্রগতির সঙ্গে সময়সূচি ও পরিধিতে পরিবর্তন আসতে পারে।
এই স্থানান্তরের লক্ষ্য জাকার্তার ওপর চাপ কমানো, জাভার বাইরে উন্নয়ন ছড়িয়ে দেওয়া এবং জাতীয় পণ্য পরিবহনব্যবস্থা উন্নত করা। পরিকল্পনাকারীরা আশা করছেন, প্রথম দফায় জাকার্তা থেকে প্রায় ১৬ হাজার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সেখানে যাবেন। সমালোচকেরা অর্থায়নের ঝুঁকি, জনসাধারণের সীমিত পরামর্শ গ্রহণ এবং একেবারে নতুন করে প্রাণবন্ত শহর গড়ার কঠিনতার কথা বলছেন। স্থানান্তরের পরও ইন্দোনেশিয়ার বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে জাকার্তার ভূমিকা থাকবে। শহরের বন্দর, বিমানবন্দর ও আর্থিক খাতের সঙ্গে জাতীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের নিবিড় যোগ রয়েছে। নতুন রাজধানী গড়ে তোলা দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, মূল মহানগরীটির বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে এবং সেখানে ধারাবাহিক মনোযোগের প্রয়োজন হয়।
জাকার্তার জন্য নতুন রাজধানী সরকার-সংশ্লিষ্ট কাজে ব্যবহৃত জমি ও ভবনগুলোর ব্যবহার নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। পাশাপাশি সমন্বয়েরও পরীক্ষা হবে, কারণ দুই শহরে অবস্থিত সংস্থাগুলোকে একযোগে কাজ করতে হবে। জাকার্তার আবাসন, পানি, পরিবহন ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত এখনো কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করবে। রাজধানী স্থানান্তরে প্রশাসনিক চাপ কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু রাজধানী অঞ্চলের নগরজীবনের মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধানের প্রয়োজন তাতে শেষ হবে না।
জাকার্তার অভিযোজনের চেষ্টা
নগর নেতারা সরকার ও জনগণের সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে একটি সহনশীলতা কৌশল তুলে ধরেছেন, যা প্রায়ই ‘সিটি ৪.০’ নামে পরিচিত। এ পদ্ধতির তিনটি স্তম্ভ: ধাক্কা সামলাতে সক্ষম প্রস্তুত শহর, উন্নত মৌলিক সেবাসম্পন্ন স্বাস্থ্যকর শহর এবং উন্নত যাতায়াত ও সুযোগে প্রবেশাধিকারসহ সংযুক্ত শহর। এসব লক্ষ্যের সঙ্গে মানানসই উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে বন্যার আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, নালা ও পাম্প স্টেশন উন্নত করা, বন্যাপ্রবণ করিডরে নদীর পাড় পুনরুদ্ধার এবং বিশুদ্ধ পানিতে প্রবেশাধিকার বাড়ানোর কর্মসূচি। ভূমি দেবে যাওয়া ঠেকাতে পাইপলাইনের পানির সরবরাহ বাড়িয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন আরেকটি স্তম্ভ। জাকার্তা প্রথম মেট্রো লাইন চালু করেছে এবং নতুন লাইট রেলপথ নির্মাণ করেছে, পাশাপাশি রয়েছে ট্রান্সজাকার্তা বাস নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন পরিবহনে ভাড়া ও সময়সূচি সমন্বয় করলে গাড়ি বা মোটরসাইকেল ছাড়াই পুরো যাত্রা সম্পন্ন করা সহজ হয়। কিছু এলাকায় স্বল্প দূরত্বের যাত্রা নিরাপদ ও আকর্ষণীয় করতে শহরটি ফুটপাত ও পথচারী সেতুতেও বিনিয়োগ করেছে। এসব অগ্রগতি সত্ত্বেও, আরও বেশি মানুষের ব্যক্তিগত যানবাহন ছেড়ে নির্ভরযোগ্য ও বেশি যাত্রী বহনে সক্ষম পরিবহন ব্যবহার শুরু হলেই বড় সুফল মিলবে। সে জন্য স্টেশনের আশপাশে ঘনবসতিপূর্ণ আবাসন ও কর্মস্থল, নিয়মিত সেবা এবং যাত্রার শুরু ও শেষ অংশে ভালো সংযোগ দরকার।
রাস্তার পর্যায়ে পরিবর্তন দৃশ্যমান করতে কমিউনিটি গোষ্ঠীগুলো কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। শহরের নানা কামপুং এলাকায় বাসিন্দারা বর্জ্য ব্যাংক পরিচালনা করেন, গাছ লাগান এবং ছোট পার্কের দেখভাল করেন। ঝড়ের সময় পানি বাড়ার খবর পৌঁছে দিতে পাড়া-মহল্লার নেটওয়ার্কগুলো সাহায্য করে। সরকারি সংস্থা ও স্থানীয় এসব উদ্যোগের সহযোগিতায় পরিকল্পনা এমন প্রকল্পে রূপ নেয়, যা নির্দিষ্ট চাহিদা মেটায়—পরিষ্কার গলি থেকে শুরু করে স্কুলের কাছে নিরাপদ পারাপার পর্যন্ত। সহনশীলতা কৌশলে যৌথভাবে পরিকল্পনা তৈরির এই মডেলের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কারণ কোথায় পানি জমে, কোথায় যান চলাচল সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং কোন সেবায় পৌঁছানো সবচেয়ে কঠিন—এসব বিষয়ে বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতাকে এটি কাজে লাগায়।
এখনই কীভাবে চাপ কমানো যায়
কয়েকটি পদক্ষেপ নিলে নিকট ভবিষ্যতেই সুফল মিলবে। বন্যাপ্রবণ এলাকা ও নদীর পাড়ের সুরক্ষিত সীমানা রক্ষায় ভূমি ব্যবহারের পরিকল্পনা কার্যকর করতে হবে। নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের বাজেট নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ভরাট করা জমিতে নির্মাণ সীমিত রাখতে হবে। রেল ও বাস করিডরের কাছে সাশ্রয়ী অ্যাপার্টমেন্টের জন্য আরও জমি নির্ধারণ এবং নিরাপত্তা ও পয়োনিষ্কাশনের মৌলিক মান বজায় রেখে মানসম্মত ভাড়াবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। আনুষ্ঠানিক আবাসন নির্মাণ দ্রুত করতে হবে, যাতে কম পরিবারকে অনিরাপদ স্থাপনা বা ঝুঁকিপূর্ণ জমিতে থাকতে হয়।
পাইপলাইনের পানির আওতা বাড়াতে হবে এবং পানির অপচয় বন্ধে ফুটো মেরামত করতে হবে, যাতে পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভূগর্ভস্থ পানির বদলে নির্ভরযোগ্য বিকল্প পায়। পানি ধরে রাখার পুকুর, রাস্তার পাশের বৃষ্টির বাগান ও ছোট পার্কসহ পুরো অববাহিকায় সবুজ অবকাঠামো বাড়াতে হবে। রাস্তা, স্কুল ও বাজারে ছায়াদানকারী গাছ লাগাতে হবে এবং সবচেয়ে কম গাছপালা থাকা এলাকাগুলোতে গাছের ছাউনির আওতা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিতে হবে। এসব পদক্ষেপ তাপ কমায়, বৃষ্টির পানি শুষে নেয় এবং স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।
মহানগর অঞ্চলজুড়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমন্বয় করতে হবে। জাবোদেতাবেক একক শ্রম ও আবাসনবাজার হিসেবে কাজ করে। এ বাস্তবতা পরিবহন, ভূমি ব্যবহার ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে শহরগুলোর মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনার দাবি জানায়। বিনিয়োগ কোথায় দরকার তা নির্ধারণে যৌথ তথ্য ব্যবহার করতে হবে এবং বাসিন্দাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য সংস্থাগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে; যেমন যাতায়াতে সময়, বন্যার পানির উচ্চতা, নিরাপদ পানির সংযোগ এবং বায়ুর মানের পরিমাপ। দীর্ঘ মেয়াদে এসব মৌলিক বিষয়ে ধারাবাহিক মনোযোগ উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং শহরকে আরও নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর করে তুলবে।
পরিসংখ্যানের আড়ালে মানুষ
সংখ্যা গল্পের কেবল একাংশ বলে। অভিবাসনের প্রতিটি মৌসুমে মধ্য জাভা, সুমাত্রা, সুলাওয়েসি ও আরও দূরদূরান্ত থেকে হাজারো মানুষ আসেন। তাঁদের অনেকে দোকান, গুদাম ও সেবামূলক খাতে প্রাথমিক পর্যায়ের কাজে যোগ দেন; পরে পরিবারকে নিয়ে আসার বা ছোট ব্যবসা শুরু করার জন্য সঞ্চয় করেন। কিছু নিয়োগকর্তা শ্রমিকদের আবাসন দেন, যা শহরে প্রথম কয়েক মাসের চাপ কমায়। নিজ নিজ এলাকার পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা কমিউনিটি সমিতিগুলো নতুনদের কাজ, বাসস্থান ও আপনজনের অনুভূতি খুঁজে পেতে সাহায্য করে। সিটি হল স্ব-নিবন্ধনে উৎসাহ দেয় এবং অর্থনৈতিক অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণ করার বদলে স্বাগত জানানোর দিকে নীতি বদলেছে। প্রবৃদ্ধিশীল খাতের কাজের সঙ্গে দক্ষতার মিল ঘটাতে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কোর্স চালানো হচ্ছে।
জাকার্তায় বেকার মানুষের সংখ্যা এখনো নিরঙ্কুশ হিসাবে বেশি হলেও তা কমার প্রবণতায় রয়েছে। তবু প্রান্তিক মানুষের জীবন কঠিন। পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিস সংগ্রহ করে বিক্রি করা অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকেরা—যাঁদের কেউ কেউ ঠেলাগাড়িতে বসবাসকারী হিসেবেও পরিচিত—মহামারির সময় দুর্ভোগে পড়েছিলেন; তাঁদের অনেকে এখনো স্থায়ী আশ্রয় পাননি। বন্যাপ্রবণ এলাকায় বসবাসকারীদের জন্য প্রতিটি ভারী বৃষ্টিতে নিরাপত্তা ও জীবিকার মধ্যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তা সত্ত্বেও রাজধানীর প্রাণচাঞ্চল্য বাস্তব। আয়তন, বৈচিত্র্য ও সম্ভাবনার টানে ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম শহরে মানুষের আসা অব্যাহত। আবাসন বাড়ানো, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বায়ু পরিষ্কার এবং যাতায়াতের ভোগান্তি কমানোর নীতিই নির্ধারণ করবে আগামী দশকে এই বিশাল শহর কতটা বাসযোগ্য হবে।
মূল কথা
- জাকার্তার মহানগর এলাকায় এখন প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষের বসবাস, যা পৃথিবীর বৃহত্তম নগর জনসংখ্যা
- জন্মের চেয়ে অভিবাসন জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে বেশি ভূমিকা রাখে; অনেক নতুন বাসিন্দা উপগ্রহ শহরে বসতি গড়ে যাতায়াত করেন
- আবাসনের সংকট ও ব্যয় বেশি, আর দেশজুড়ে লাখ লাখ ইন্দোনেশীয় পরিবার অনিশ্চিত আবাসনের ঝুঁকিতে রয়েছে
- নতুন মেট্রো, লাইট রেল ও বাস লাইন চালু হলেও যানজট ও বায়ুদূষণ তীব্র রয়ে গেছে
- ভূমি দেবে যাওয়া, তীব্র বৃষ্টির ঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে
- ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানো ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নত করা ছাড়া শুধু উপকূলীয় প্রতিরক্ষা দিয়ে বন্যা সমস্যার সমাধান হবে না
- নতুন রাজধানী নুসান্তারার লক্ষ্য জাকার্তার ওপর চাপ কমানো, তবে বর্তমান মহানগরীর সমস্যা সমাধানের প্রয়োজন তাতে শেষ হবে না
- পাইপলাইনের পানি, সবুজ অবকাঠামো এবং গণপরিবহনের কাছে সাশ্রয়ী আবাসন বাড়ালে নিকট ভবিষ্যতেই সুফল মিলবে






