আবিষ্কারটি পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন সমাজ সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে
চীনা গবেষকদের একটি দল পূর্ব এশিয়ায় এখন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া প্রাচীনতম সামাজিক কাঠামোর সন্ধান পেয়েছে বলে মনে করছে, যার কেন্দ্র ছিল পরিবার। ৮,৮০০ থেকে ৫,০০০ বছর আগের মানবদেহাবশেষ থেকে প্রাচীন ডিএনএ সিকোয়েন্স করে গবেষকেরা জানিয়েছেন, মঙ্গোলীয় মালভূমির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে বসবাসকারী মানুষ মা-বাবা ও সন্তানদের পরিবারকে ঘিরে জীবনযাপন করত। এই আবিষ্কার ওই অঞ্চলের প্রাচীন সমাজ কৃষির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মাতৃসূত্রভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে সরলরৈখিকভাবে পিতৃসূত্রভিত্তিক ব্যবস্থায় গিয়েছিল—এমন দীর্ঘদিনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। বরং এসব স্থানের জিনগত ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, ৮,৮০০ থেকে ৭,৫০০ বছর আগেই পরিবারকেন্দ্রিক একটি মডেল প্রতিষ্ঠিত ছিল।
সূচিপত্র
- আবিষ্কারটি পূর্ব এশিয়ার প্রাচীন সমাজ সম্পর্কে নতুন ধারণা দিচ্ছে
- জিনোম ও সমাধি থেকে কী জানা যায়
- স্থায়ী জীবনযাপন ও মিলেট চাষ
- প্রাচীন সমাজ কি মাতৃসূত্র থেকে সরলরেখায় পিতৃসূত্রে গিয়েছিল?
- বিয়ের নিয়মের সূচনা হয়েছিল প্রাচীনকালেই
- আত্মীয়তার বাইরেও উন্মুক্ততা
- আজ কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
- প্রাচীন ডিএনএ থেকে বিজ্ঞানীরা কীভাবে সামাজিক জীবন বোঝেন
- সীমাবদ্ধতা ও পরবর্তী গবেষণা
- মূল বিষয়গুলো
চাইনিজ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের (সিএএস) ইনস্টিটিউট অব ভার্টিব্রেট প্যালিওন্টোলজি অ্যান্ড প্যালিওঅ্যানথ্রোপোলজির ফু ছিয়াওমেইয়ের নেতৃত্বে গবেষণাটি পরিচালিত হয়। এতে হেবেই প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক নিদর্শন ও প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউট এবং শিয়ামেন বিশ্ববিদ্যালয়ও সহযোগিতা করে। গবেষকেরা বর্তমান হেবেই প্রদেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নব্যপ্রস্তর যুগের বসতি—শিংলং ও সিতাই—নিয়ে কাজ করেন। তাঁরা ৩৫ জনের উচ্চ-রেজল্যুশনের নিউক্লিয়ার জিনোম বিশ্লেষণের সঙ্গে ঘরবাড়ি, হাতিয়ার ও গৃহপালিত মিলেটের অবশেষের প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য মিলিয়ে দেখেন। এতে কৃষিনির্ভর প্রাথমিক স্থায়ী জনপদের একটি চিত্র উঠে আসে, যার আকার ছিল যাযাবর খাদ্যসংগ্রাহক শিবিরের তুলনায় অনেক বড়। একাধিক যৌথ সমাধিতে মূলত নিউক্লিয়ার পরিবারের সদস্যদের পাওয়া গেছে। এই ধরন থেকে বোঝা যায়, কঠোর মাতৃসূত্র বা পিতৃসূত্রভিত্তিক নিয়মের বদলে পরিবারই ছিল সামাজিক জীবনের প্রধান ভিত্তি।
আরও দুটি ধরনের প্রমাণ নমনীয় ও পরিবারকেন্দ্রিক সমাজের ধারণাকে জোরালো করে। প্রথমত, দুই স্থানেরই গণকবরে এমন মানুষ ছিলেন, যাঁরা একই সমাধিতে থাকা অন্যদের সঙ্গে জৈবিকভাবে সম্পর্কিত ছিলেন না। উদাহরণস্বরূপ, সিতাইয়ে একসঙ্গে সমাহিত ১৩ জনকে তিনটি আলাদা পরিবারে ভাগ করা যায়; তাঁদের পাশাপাশি ছিলেন এমন তিনজন, যাঁদের কারও সঙ্গেই ওই পরিবারগুলোর সম্পর্ক ছিল না। দ্বিতীয়ত, জিনগত পরীক্ষায় দেখা যায়, এসব সমাজে সাধারণত নিকটাত্মীয় ও একই গোত্রের মধ্যে বিয়ে এড়ানো হতো। এতে বোঝা যায়, অন্তঃপ্রজননের ঝুঁকি সম্পর্কে তখনই ধারণা ছিল এবং মানুষের জুটি গড়ার ক্ষেত্রে কিছু সামাজিক নিয়ম চালু ছিল। সব মিলিয়ে, এই তথ্যগুলো এমন এক সহযোগিতামূলক সমাজের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে আত্মীয় নন এমন মানুষদেরও স্থান দেওয়া হতো, আবার পরিবারকেও মূল একক হিসেবে মূল্য দেওয়া হতো।
জিনোম ও সমাধি থেকে কী জানা যায়
হাজার হাজার বছর আগে সমাহিত মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে প্রাচীন ডিএনএ বিজ্ঞানীদের সহায়তা করে। এই গবেষণায় গবেষকেরা হাড় ও দাঁত থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে প্রত্যেকের নিউক্লিয়ার জিনোম সিকোয়েন্স করেন। জিনোমের অভিন্ন অংশ থেকে মা-বাবা ও সন্তান, কিংবা ভাইবোনের সম্পর্ক শনাক্ত করা যায়; আর তুলনামূলকভাবে কম পরিমাণ অভিন্ন ডিএনএ থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের আত্মীয়তার সম্পর্ক বোঝা যায়। দলটি এই ফলাফল মাতৃসূত্র অনুসরণকারী মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ এবং পুরুষদের পিতৃসূত্র অনুসরণকারী ওয়াই ক্রোমোজোমের চিহ্নের সঙ্গে তুলনা করে। শিংলং ও সিতাইয়ে যে চিত্র উঠে আসে, তা স্পষ্ট: অনেক যৌথ সমাধিতে মা-বাবা ও সন্তানকে একসঙ্গে সমাহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে, নমুনাগুলোতে মাতৃসূত্র বা পিতৃসূত্র—কোনোটিরই প্রাধান্য দেখা যায়নি। এতে বোঝা যায়, কঠোরভাবে মাতৃসূত্র বা পিতৃসূত্রভিত্তিক গোত্রের বদলে নিউক্লিয়ার পরিবারই ছিল মূল একক।
স্থান দুটির প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনও এই জিনগত চিত্রকে সমর্থন করে। ঘরবাড়ি, শস্য সংরক্ষণের গর্ত, চাষাবাদের হাতিয়ার এবং ঝাড়ু মিলেট ও ফক্সটেইল মিলেটের অবশেষ থেকে শস্য উৎপাদননির্ভর স্থায়ী জীবনযাপনের প্রমাণ মেলে। বসতবাড়ির আশপাশে গুচ্ছাকারে থাকা যৌথ সমাধিগুলো এমন এক সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে একসঙ্গে বসবাস ও কাজ করা পরিবারগুলোই ছিল সংগঠনের ভিত্তি। গণকবরে সম্পর্কহীন মানুষের উপস্থিতি দেখায়, সমাজের সদস্যপদ রক্তের সম্পর্কের বাইরেও বিস্তৃত হতে পারত। দত্তক নেওয়া, বিয়ের সূত্রে সম্পর্ক তৈরি, কিংবা কাজ ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা সামাজিক বন্ধন—সবই গোষ্ঠীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাব্য পথ।
স্থায়ী জীবনযাপন ও মিলেট চাষ
উত্তর চীনে প্রথম গৃহপালিত শস্যগুলোর মধ্যে মিলেট অন্যতম। মানুষ যখন ফসল বুনতে, পরিচর্যা করতে ও সংরক্ষণ করতে শুরু করল, তখন স্থায়ীভাবে বসবাসের যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়। শস্য সংরক্ষণ ও ঘরভিত্তিক উৎপাদনের কারণে পরিবার সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময়ের স্বাভাবিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই পরিস্থিতিতে পরিবারকেন্দ্রিক সংগঠন দৈনন্দিন জীবনকে স্থিতিশীল করতে এবং বীজ বোনা, ফসল কাটা, রান্না ও শিশুর যত্নের কাজ সমন্বয়ে সহায়তা করতে পারত। মিলেটের প্রত্নউদ্ভিদতাত্ত্বিক চিহ্ন এবং তা প্রক্রিয়াজাত করার হাতিয়ার দেখায়, এসব স্থানের অর্থনীতি পরিকল্পিত উৎপাদনচক্রের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যা স্থায়ী পরিবারভিত্তিক জীবনের সঙ্গে মানানসই।
পারিবারিক সম্পর্কের পরিচয় দেওয়া একই জিনগত তথ্য থেকে বোঝা যায়, কারা কার সঙ্গে বিয়ের সম্পর্ক এড়িয়ে চলত। নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের অনুপস্থিতি থেকে বোঝা যায়, চাচাতো বা মামাতো ভাইবোন কিংবা অন্য ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে বিয়ে করার বিরুদ্ধে সামাজিক নিয়ম ছিল। এতে জিনগত ঝুঁকি কমে এবং বিনিময়ের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হতে পারে। জনসংখ্যা ছোট হলেও এসব স্থানের মানুষ নিকটাত্মীয়ের বাইরের সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার পথ খুঁজে পেয়েছিল। এতে গ্রাম পর্যায়ের সমন্বয় এবং বিয়ে নিয়ন্ত্রণকারী সাংস্কৃতিক নিয়মের ইঙ্গিত মেলে।
প্রাচীন সমাজ কি মাতৃসূত্র থেকে সরলরেখায় পিতৃসূত্রে গিয়েছিল?
একটি জনপ্রিয় মডেলে দীর্ঘদিন ধরে বলা হয়েছে, প্রাচীন কৃষিনির্ভর সমাজে সম্পত্তি ও বংশপরিচয়ের নিয়ন্ত্রণ প্রথমে নারীদের হাতে ছিল, পরে পশুপালন ও ধাতুশিল্প ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পুরুষদের হাতে চলে যায়। পূর্ব এশিয়ার নতুন প্রমাণ এই সরল ব্যাখ্যার সঙ্গে মেলে না। মাতৃসূত্র বা পিতৃসূত্রের স্পষ্ট প্রাধান্য দেখা যাওয়ার বদলে, গবেষকেরা মা-বাবা ও সন্তানদের নিয়ে গঠিত পরিবার পেয়েছেন, যা এমন বৃহত্তর সমাজের অংশ ছিল, যেখানে আত্মীয় নন এমন মানুষদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হতো। এ থেকে বোঝা যায়, এই অঞ্চলে কৃষির শুরুর দিকেও ক্ষমতা, সম্পত্তি ও যত্নের ব্যবস্থা গড়ে তোলার ধরন ছিল বিচিত্র।
বিশ্বের অন্যান্য স্থানের গবেষণাও দেখায়, সামাজিক সংগঠনের কোনো একটিমাত্র পথ ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, মধ্য তুরস্কের বিখ্যাত প্রোটো-শহর ছাতালহয়ুক নিয়ে গবেষণায় প্রজন্মান্তরের সম্পর্ক মাতৃসূত্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, এবং ওই বসতির প্রাথমিক পর্যায়ে নারীকেন্দ্রিক কাঠামোর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অন্যদিকে পূর্ব এশিয়ার নিদর্শনে মাতৃসূত্র বা পিতৃসূত্রের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বিভিন্ন পারিবারিক গৃহস্থালির মিশ্র চিত্র দেখা যায়। পাশাপাশি বিবেচনা করলে, এই উদাহরণগুলো দেখায় যে একই সময়ে বিভিন্ন সমাজ স্থানীয় পরিবেশ, অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই আলাদা সামাজিক মডেল গড়ে তুলেছিল।
বিয়ের নিয়মের সূচনা হয়েছিল প্রাচীনকালেই
আত্মীয়তার সম্পর্ক নিয়ে দলের বিশ্লেষণে দেখা যায়, উত্তর চীনের এই অংশে ৮,৮০০ থেকে ৭,৫০০ বছর আগে বসবাসকারী মানুষ সাধারণত নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে বা একই গোত্রের মধ্যে বিয়ে এড়িয়ে চলত। এই ধরন আকস্মিক ঘটনার বদলে সচেতন সামাজিক নিয়মের ইঙ্গিত দেয়। নিজের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর বাইরে বিয়ে করলে অন্তঃপ্রজননের ঝুঁকি কমতে পারে, পরিবারে নতুন দক্ষতা ও জ্ঞান আসতে পারে এবং বিভিন্ন পরিবার ও পাড়ার মধ্যে জোট গড়ে উঠতে পারে। এ ধরনের নিয়মের জন্য সাধারণ বোঝাপড়া এবং কখনো আনুষ্ঠানিক প্রয়োগের দরকার হয়। অর্থাৎ, প্রাচীন সমাজগুলোতে নিয়ম জানানো ও বজায় রাখার উপায় তখনই ছিল।
এই ফলাফল প্রাগৈতিহাসিক অন্য কিছু স্থানের সঙ্গে ভিন্ন, যেখানে জিনগত নিদর্শনে চাচাতো বা মামাতো ভাইবোনের মধ্যে, এমনকি আরও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ের প্রমাণ মেলে। জনসংখ্যার ওপর চাপ থাকলে বা অভিজাত গোষ্ঠী ক্ষমতা শক্তভাবে ধরে রাখলে এমনটা প্রায়ই দেখা যায়। হেবেইয়ের স্থানগুলোতে এমন কাঠামো দেখা যায়নি। বরং, এগুলো এমন গ্রামভিত্তিক সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়, যেখানে বিস্তৃত সম্পর্ককে উৎসাহিত করা হতো। গণকবরে সম্পর্কহীন মানুষের উপস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে, এখানে এমন এক সমাজের ছবি পাওয়া যায়, যেখানে সদস্যপদের বাধা কম ছিল, কিন্তু নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে এড়ানো হতো।
বিয়ের নিয়ম শুধু সঙ্গী নির্বাচন নিয়ে নয়। এগুলো বসবাস, উত্তরাধিকার ও সন্তান লালন-পালনের প্রত্যাশাও নির্ধারণ করে। বিয়ের পর কোথায় বসবাস করা হতো, সে বিষয়ে বর্তমান গবেষণায় কোনো একক নিয়মের প্রমাণ নেই। তবে এতে দেখা যায়, নিউক্লিয়ার পরিবার ছিল কেন্দ্রীয় এবং সমাজ বহিরাগতদেরও পূর্ণ সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারত। পরিবারকেন্দ্রিকতা ও উন্মুক্ততার এই মিশ্রণ বসতিগুলোকে বেড়ে উঠতে ও টিকে থাকতে সাহায্য করে থাকতে পারে।
আত্মীয়তার বাইরেও উন্মুক্ততা
কোনো সমাজ কেন সম্পর্কহীন মানুষকে যৌথ সমাধিতে স্থান দেবে, যে স্থান পরিবার ও বংশপরম্পরার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত? প্রমাণের সঙ্গে কয়েকটি ব্যাখ্যা মেলে। সম্পর্কহীন ব্যক্তিরা হতে পারেন এমন জীবনসঙ্গী, যাঁরা বিয়ে করে গোষ্ঠীতে যোগ দিয়েছিলেন; দত্তক সন্তান; দক্ষ কারিগর; অথবা আচার-অনুষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ, যাঁদের মর্যাদা পরিবারের সঙ্গে সমাহিত হওয়ার অধিকার দিয়েছিল। দুর্দিনে আশ্রয় নেওয়া মানুষ কিংবা আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে স্বাগত জানানো নবাগতরাও হতে পারেন তাঁরা। যে পথেই তাঁরা আসুন না কেন, অন্তর্ভুক্তি একটি সামাজিক সিদ্ধান্ত। শিংলং ও সিতাইয়ের সমাজগুলো শুধু রক্তের সম্পর্কের বাইরে গিয়েও মানুষকে আপন করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
ভৌত পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ। নব্যপ্রস্তর যুগের অনেক প্রেক্ষাপটে সমাধি ঘরের মেঝের নিচে বা বাড়ির কাছাকাছি থাকত, যা জীবিত মানুষকে স্থানটির সঙ্গে এবং স্মরণে থাকা মৃতদের সঙ্গে যুক্ত করত। হেবেইয়ের স্থানগুলোতেও একই ধরন দেখা যায় বলে মনে হয়; সেখানে যৌথ সমাধির সঙ্গে বসতবাড়ি ও দৈনন্দিন জীবনের যোগ ছিল। এই পরিবেশে সম্পর্কহীন মানুষকে সমাহিত করে সমাজ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল যে সদস্যপদ শুধু বংশপরিচয়ের ওপর নির্ভর করে না। এই নমনীয়তা কৃষিকাজ থেকে শিশুর যত্ন—বিভিন্ন কাজে সহযোগিতাকে সমর্থন করত এবং আকস্মিক সংকটে গ্রামকে টিকে থাকতে সাহায্য করতে পারত।
আজ কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
আধুনিক পূর্ব এশীয় সমাজে লিঙ্গ, পরিবার এবং কাজ ও যত্নের ভারসাম্য নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। জরিপে দেখা যায়, এ অঞ্চলের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রায়ই জটিল মিশ্রণ থাকে। কেউ কেউ কাজ ও পরিবার—দুই ক্ষেত্রেই ঐতিহ্যগত ভূমিকার পক্ষে। আবার কেউ কেউ পরিবার সম্পর্কে ঐতিহ্যগত ধারণা বজায় রেখেও ঘরে সমান ভূমিকা সমর্থন করেন, কিংবা এর বিপরীত অবস্থান নেন। তৃতীয় একটি গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কাজ ও পরিবার নিয়ে বিশ্বাসের মধ্যে দুর্বল সম্পর্ক দেখা যায়। এসব দৃষ্টিভঙ্গি জীবনসন্তুষ্টি ও সন্তান নেওয়ার ইচ্ছাকে প্রভাবিত করে। এ কারণে মনোভাব বদলালেও বিয়ে ও জন্মহার যে সব সময় বাড়ে না, তা বোঝা যায়।
এ অঞ্চলের নীতিনির্ধারণী বিতর্কেও এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ প্রাপ্তবয়স্কদের সামনে রয়েছে আবাসনের উচ্চ ব্যয়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং যত্নের দায়িত্ব পালনের জন্য কর্মীদের শাস্তি দেয় এমন কর্মসংস্কৃতি। নারীরা কর্মক্ষেত্রে উন্নতির চেষ্টা করার পাশাপাশি প্রায়ই বিনা পারিশ্রমিকের যত্নের কাজের বড় অংশ বহন করেন। অন্যদিকে, প্রারম্ভিক পর্যায়ের চাকরির সুযোগ কমে যাওয়া সত্ত্বেও পুরুষদের উপার্জনকারী হিসেবে ভূমিকা পালনের প্রত্যাশা করা হয়। শিশুযত্ন, পিতামাতার ছুটি ও কর্মক্ষেত্রের প্রত্যাশা নিয়ে সংস্কার এই চাপ কমাতে পারে, তবে অগ্রগতি অসম। পরিবারকেন্দ্রিক কল্যাণব্যবস্থা ও ব্যক্তির ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষার মধ্যে টানাপোড়েন এসব বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এবং নীতি ও সামাজিক রীতির পরিবর্তনের গতিকে প্রভাবিত করে।
শিংলং ও সিতাইয়ের প্রাগৈতিহাসিক নিদর্শন পরিবার-সংক্রান্ত রীতিনীতির উৎস নিয়ে অনমনীয় ধারণার বিপরীতে একটি বিকল্প চিত্র তুলে ধরে। এ অঞ্চলে খুব প্রাচীনকাল থেকেই সামাজিক জীবনের কেন্দ্রে ছিল পরিবার। একই সঙ্গে, এসব সমাজ নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে এড়িয়ে চলত এবং আত্মীয় নন এমন মানুষদেরও অন্তর্ভুক্ত করত। কোনো সমাজ পরিবার ও প্রজন্মান্তরের যত্নকে মূল্য দিয়েও একটিমাত্র বংশানুক্রমিক নিয়মে আবদ্ধ না থেকে কিংবা বহিরাগতদের বাদ না দিয়েও চলতে পারে। এই উপলব্ধি আজকের জনমিতিক চ্যালেঞ্জের সমাধান দেয় না, তবে সমাজ, যত্ন ও অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ভাবনার পরিসর প্রসারিত করে।
প্রাচীন ডিএনএ থেকে বিজ্ঞানীরা কীভাবে সামাজিক জীবন বোঝেন
প্রাচীন ডিএনএ প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এখন হাড় থেকে পারিবারিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা ঘন হাড় ও দাঁত থেকে ডিএনএর খণ্ডাংশ সংগ্রহ করেন, মৃত্যুর পর জমা হওয়া ক্ষয়ের ধরন মেপে সেগুলোর সত্যতা যাচাই করেন এবং লক্ষ লক্ষ ছোট অংশ সিকোয়েন্স করেন। এরপর তাঁরা এই সিকোয়েন্সগুলোকে মানুষের রেফারেন্স জিনোমের সঙ্গে মেলান এবং দূষণ হয়েছে কি না পরীক্ষা করেন। জিনোমজুড়ে দুজন মানুষের অভিন্ন ডিএনএর পরিমাণ তুলনা করে গবেষকেরা মা-বাবা, সন্তান, ভাইবোন এবং আরও দূরের আত্মীয় শনাক্ত করতে পারেন। ওয়াই ক্রোমোজোমের রিড আছে কি না এবং অটোসোমের তুলনায় এক্স ক্রোমোজোমের রিডের অনুপাত দেখে জৈবিক লিঙ্গ নির্ধারণ করা হয়।
জিনগত তথ্য একা যথেষ্ট নয়। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মানুষের তৈরি ও ব্যবহৃত স্থানগুলোও অধ্যয়ন করেন। ঘরের আকার ও বিন্যাস, চুলা ও সংরক্ষণের গর্ত, শস্য পেষার হাতিয়ার, এবং মিলেটের বীজ ও উদ্ভিদকোষের সিলিকা দেহের মতো উদ্ভিদাবশেষ দৈনন্দিন জীবন পুনর্গঠনে সহায়তা করে। সমাধি থেকে সাংস্কৃতিক পছন্দের পরিচয় মেলে। কাকে কার সঙ্গে, কোন ধরনের কাঠামোর নিচে এবং কী কী সামগ্রীসহ সমাহিত করা হয়েছে—এসবের মধ্যেই পরিচয় ও সদস্যপদের অর্থ নিহিত থাকে। দুই ধরনের প্রমাণ একই দিকে ইঙ্গিত করলে উঠে আসা সামাজিক চিত্রের প্রতি আস্থা বাড়ে।
প্রতিটি তথ্যভান্ডারেরই সীমাবদ্ধতা আছে। সমাধিতে জীবিত সমাজের কেবল একটি অংশের প্রতিফলন থাকতে পারে, কারণ অনেককে অন্য কোথাও বা এমনভাবে সমাহিত করা হয়ে থাকতে পারে, যা টিকে থাকেনি। ৩৫ জনের নমুনা মূল্যবান হলেও, পূর্ব এশিয়ার মতো বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সব বৈচিত্র্য তুলে ধরতে পারে না। সামাজিক নিয়মও সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। তা সত্ত্বেও, জিনগত আত্মীয়তার তথ্য, পারিবারিক বসতির প্রত্নতত্ত্ব এবং বসতি-সংক্রান্ত অভিন্ন বৈশিষ্ট্য—সব মিলিয়ে এসব স্থানে পরিবারকেন্দ্রিক সংগঠনের পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়।
সীমাবদ্ধতা ও পরবর্তী গবেষণা
যে চিত্রটি উঠে এসেছে, তা নির্দিষ্ট অঞ্চল ও সময়ের। এটি বর্তমান হেবেই প্রদেশে মঙ্গোলীয় মালভূমির দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের সমাজগুলোর প্রতিফলন। এ ধরনগুলো কতটা বিস্তৃত ছিল তা বুঝতে ভবিষ্যৎ গবেষণায় উত্তর চীনের অন্যান্য অংশ, হুয়াংহে অববাহিকা, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং এর বাইরের এলাকার জিনোম ও পূর্ণাঙ্গ প্রত্নতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে হবে। পরবর্তী সময়ের তথ্য থেকে ধাতুশিল্প, পশুপালন ও বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর আবির্ভাবের সঙ্গে কী পরিবর্তন ঘটেছিল, তা স্পষ্ট হবে।
এই পদ্ধতিকে আরও এগিয়ে নিতে কয়েকটি কৌশল কাজে লাগানো যেতে পারে। স্ট্রনশিয়াম আইসোটোপ বিশ্লেষণে একজন মানুষ শৈশব কোথায় কাটিয়েছেন তা শনাক্ত করা যায়। এতে কোনো বিবাহিত দম্পতি একই স্থানে নাকি ভিন্ন স্থানে বড় হয়েছেন, তাও বোঝা সম্ভব। আরও পূর্ণাঙ্গ জিনোম থেকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তর পর্যন্ত আত্মীয়তার সম্পর্ক নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা যাবে, যা বর্ধিত পরিবারের মানচিত্র তৈরি করতে সাহায্য করবে। প্রাচীন ডিএনএর সঙ্গে পরিবেশগত নথির তুলনা করে জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সামাজিক পরিবর্তনের যোগসূত্রও দেখা যেতে পারে। গবেষক দলটি তাদের ফলাফল ‘দ্য ইনোভেশন’ সাময়িকীতে দুটি প্রবন্ধে প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এই অঞ্চল নব্যপ্রস্তর যুগের সমাজের জন্মভূমি এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছিল, যা ঐক্যবদ্ধ বহু-জাতিগোষ্ঠীর চীনের গঠনে অবদান রাখে। এই বৃহত্তর দাবির পরীক্ষা করতে হলে অঞ্চলজুড়ে আরও বহু প্রত্নস্থান, সময়কাল ও তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ করতে হবে।
মূল বিষয়গুলো
- ৮,৮০০ থেকে ৫,০০০ বছর আগের ৩৫ জনের প্রাচীন ডিএনএ থেকে উত্তর চীনে পরিবারকেন্দ্রিক গৃহস্থালির প্রমাণ পাওয়া গেছে।
- ৮,৮০০ থেকে ৭,৫০০ বছর আগের পূর্ব এশিয়ার প্রাচীনতম শনাক্ত সামাজিক সংগঠনের কেন্দ্রে ছিল মা-বাবা ও সন্তান, কোনো কঠোর মাতৃসূত্র বা পিতৃসূত্রভিত্তিক বংশধারা নয়।
- শিংলং ও সিতাইয়ের যৌথ সমাধিতে মূলত নিউক্লিয়ার পরিবারের সদস্যদের পাওয়া গেছে; জিনগত নিদর্শনে মাতৃসূত্র বা পিতৃসূত্রের কোনোটিরই প্রাধান্য নেই।
- মানুষ নিকটাত্মীয় ও একই গোত্রের মধ্যে বিয়ে এড়িয়ে চলত, যা প্রাচীন বিয়ের নিয়ম ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয়।
- গণকবরে সম্পর্কহীন মানুষের উপস্থিতি আত্মীয় নন এমন মানুষদের গ্রহণ এবং সহযোগিতামূলক সমাজব্যবস্থার পরিচয় দেয়।
- মিলেট চাষ ও ঘরভিত্তিক সংরক্ষণ প্রাথমিক স্থায়ী জীবনের প্রমাণ, যা পরিবারকেন্দ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে মানানসই ছিল।
- এই আবিষ্কার মাতৃসূত্র থেকে পিতৃসূত্রে সরল পরিবর্তনের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সামাজিক সংগঠনের নানা ধরন থাকার ইঙ্গিত দেয়।
- গবেষণাটি ‘দ্য ইনোভেশন’ সাময়িকীতে দুটি প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়েছে। এতে নব্যপ্রস্তর যুগের বিকাশে অঞ্চলটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।
- প্রাগৈতিহাসিক যুগের এই অন্তর্দৃষ্টি আধুনিক পূর্ব এশীয় সমাজে পরিবার, লিঙ্গ ও যত্ন নিয়ে চলমান বিতর্ককে সমৃদ্ধ করে।






