কম্বোডিয়ার প্রতারণা চক্রের সঙ্গে যুক্ত নিখোঁজের ঘটনা বেড়েছে
দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন ভ্রমণ ও অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য কম্বোডিয়ায় দেশটির নাগরিকদের পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, কম্বোডিয়া যাওয়া এবং ফিরে আসা মানুষের সংখ্যার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। ২০২১ সালে এই ব্যবধান ছিল মাত্র ১১৩ জন; ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩,২০৯, ২০২৩ সালে ২,৬৬২ এবং ২০২৪ সালে ৩,২৪৮ জনে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৬৭,৬০৯ জন কম্বোডিয়ার উদ্দেশে দেশ ছেড়েছেন, আর ফিরেছেন ৬৬,৭৪৫ জন; ওই সময়ে ৮৬৪ জনের হিসাব মেলেনি। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে না যে অপরাধের অর্থে হাজারো মানুষ নিখোঁজ। তবে এগুলো ইঙ্গিত দেয়, অনেকে নথিভুক্ত পথে দেশে ফেরেননি। কম্বোডিয়ার চাকরির প্রলোভনে প্রতারণার চক্রগুলো যখন জননিরাপত্তার সংকটে পরিণত হয়েছে, তখন এটি সতর্কসংকেত।
সূচিপত্র
- কম্বোডিয়ার প্রতারণা চক্রের সঙ্গে যুক্ত নিখোঁজের ঘটনা বেড়েছে
- যাতায়াতের পরিসংখ্যান কেন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
- প্রতারণার ঘাঁটির ভেতরের চিত্র
- দক্ষিণ কোরিয়াকে নাড়া দেওয়া মৃত্যু
- সিউলের জরুরি পদক্ষেপ
- কম্বোডিয়ার অবস্থান ও আন্তর্জাতিক চাপ
- কম্বোডিয়া কেন কেন্দ্র হয়ে উঠল
- যেভাবে ভুক্তভোগীদের প্রলুব্ধ করে আটকে রাখা হয়
- পরিবার ও ভ্রমণকারীদের জন্য পরামর্শ
- মূল বিষয়গুলো
আগস্টে দক্ষিণ কোরিয়ার ২২ বছর বয়সী এক কলেজছাত্রের মৃত্যুর পর বিষয়টি জাতীয় আলোচনায় আসে। কাম্পোট প্রদেশে তার মরদেহ পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষ জানায়, ভয়াবহ নির্যাতনের পর হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। তার হত্যাকাণ্ডে দেশে ক্ষোভের ঢেউ ওঠে এবং সিউলের কর্মকর্তারা জরুরি পদক্ষেপ নেন। তারা কম্বোডিয়ার নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং প্রতারণার ঘাঁটিতে আটকে পড়া নাগরিকদের খুঁজে বের করে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন।
সীমান্তপারের তথ্যের অসংগতি উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। কম্বোডিয়ার অভিবাসন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ার ১,৯২,৩০৫ জন নাগরিক দেশটিতে প্রবেশ করেছেন; দক্ষিণ কোরিয়ার নথিতে কম্বোডিয়াগামী যাত্রীর সংখ্যা ১,০০,৮২০, যা এর প্রায় অর্ধেক। কিছু যাত্রী তৃতীয় দেশ হয়ে কম্বোডিয়ায় পৌঁছান, ফলে প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যেতে পারে। আইনপ্রণেতা ও তদন্তকারীদের আশঙ্কা, যারা ফেরেননি তাদের একটি অংশ অনলাইন প্রতারণার কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। পরিচিতজন ও সাবেক কর্মীরা জানিয়েছেন, প্রতিটি ঘাঁটিতে কয়েক ডজন কোরীয় নাগরিক থাকতে পারেন; তাদের অনুমান, মোট ২,০০০ থেকে ৩,০০০ জন জড়িত থাকতে পারেন। প্রকৃত সংখ্যা অনিশ্চিত, তবে এই প্রবণতার জেরেই সরকার জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছে।
যাতায়াতের পরিসংখ্যান কেন উদ্বেগ বাড়াচ্ছে
পর্যটন বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে কম্বোডিয়ায় যাওয়া দক্ষিণ কোরীয়দের বেশির ভাগই কোনো ঘটনা ছাড়াই দেশে ফেরেন। যাত্রা ও ফেরার সংখ্যার ব্যবধানের কারণ হতে পারে দীর্ঘ সময় অবস্থান, অন্য দেশে চলে যাওয়া বা স্থানান্তর। তবে ২০২১ সালের পর দেশে না ফেরার ঘটনা দ্রুত বেড়ে যাওয়া এবং প্রতারণার ঘাঁটির আশপাশে অপহরণ ও আটকের ঘটনা বৃদ্ধির বিষয়টি বিশেষভাবে চোখে পড়ছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের দিকে ঝোঁক এবং বিদেশি ভাষাভাষীদের লক্ষ্য করা অপরাধী চক্রের আকর্ষণ বাড়ার ইঙ্গিত মেলে।
তথ্যগুলো দক্ষিণ কোরিয়ায় নিবিড় পর্যালোচনার দাবি তুলেছে। আইনপ্রণেতারা ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে এবং একই ব্যক্তিকে একাধিকবার গণনা এড়াতে পুলিশ ও কনস্যুলার তথ্যের সঙ্গে প্রত্যেকের যাতায়াতের নথি মিলিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। কর্মকর্তারা বলেন, বছরের প্রথম আট মাসে কম্বোডিয়ায় প্রবেশের পর নিখোঁজ বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকের শিকার হয়েছেন বলে ৩৩০ জনের বিষয়ে খবর পাওয়া যায়; এর বেশির ভাগ ঘটনাই সমাধান হয়েছে। প্রায় ৮০ জনের খোঁজ এখনো মেলেনি, আর সন্দেহভাজন প্রতারণা কেন্দ্রে অভিযানের পর প্রায় ৬০ জন দক্ষিণ কোরীয় কম্বোডিয়ায় আটক রয়েছেন।
পরিসংখ্যানের এই ব্যবধানের পেছনে কাঠামোগত কারণও রয়েছে। অনেক যাত্রী থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম বা চীন হয়ে আকাশপথে যান, এরপর স্থলপথে কম্বোডিয়ায় প্রবেশ করেন। ফলে তাদের প্রাথমিক যাত্রার নথিতে গন্তব্য হিসেবে কম্বোডিয়ার নাম থাকে না। অপরাধী চক্রগুলো এই পথ কাজে লাগায়। নিয়োগকারীরা লক্ষ্যবস্তুদের তৃতীয় দেশ হয়ে যেতে বলেন এবং বাসে করে সীমান্তবর্তী শহরে নিয়ে যান। কেউ যোগাযোগ বন্ধ করে দিলে তার যাত্রাপথ অনুসরণ করা পরিবার ও কর্তৃপক্ষের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতারণার ঘাঁটির ভেতরের চিত্র
মহামারির পর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু এলাকায় অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্রের বিস্তার ঘটেছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, কম্বোডিয়ায় প্রতারণার কাজে প্রায় ২ লাখ মানুষ কাজ করছেন; তাদের মধ্যে আনুমানিক ১,০০০ জন দক্ষিণ কোরীয়। বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা বলেন, এসব ঘাঁটি পরিচালনা করে বহুজাতিক গোষ্ঠী, যাদের অনেকের সঙ্গে চীনা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের যোগ রয়েছে। উচ্চ বেতন ও বিনা মূল্যে আবাসনের প্রলোভনে লোকজনকে নিয়োগ করা হয়, এরপর তাদের নিজেদের মাতৃভাষায় মানুষকে প্রতারণা করতে বাধ্য করা হয়। এসব ঘাঁটি থেকে উদ্ধার হওয়া কোরীয়দের বর্ণনায় উঠে এসেছে মারধর, বৈদ্যুতিক শক, জোর করে মাদক সেবন, যৌন নিপীড়ন এবং অঙ্গ পাচারের হুমকির মতো নৃশংস পরিস্থিতির কথা। কয়েকজন জানান, চীনা তত্ত্বাবধায়কেরা ঘাঁটিগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে শাস্তি দিতেন।
প্রতারণার কৌশল নানা রকম হলেও সেগুলোর ধরনে মিল রয়েছে। ‘পিগ বাচারিং’ নামে পরিচিত প্রেমের সম্পর্কের প্রলোভনে প্রতারণায় কয়েক সপ্তাহ ধরে ভুক্তভোগীর বিশ্বাস অর্জন করে পরে ভুয়া বিনিয়োগে টাকা ঢালতে বলা হয়। সেক্সটর্শন চক্র ঘনিষ্ঠ ছবি প্রকাশের হুমকি দিয়ে অর্থ আদায় করে। দলগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংক্রান্ত প্রতারণা এবং ভুয়া লেনদেনের প্ল্যাটফর্মও চালায়। এর ব্যাপকতা বিশাল। কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভাষ্য, গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রতারকেরা অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলার চুরি করেছে। অনলাইন বিনিয়োগ ও প্রেমের সম্পর্কের প্রলোভনে প্রতারণায় দক্ষিণ কোরীয়দের ক্ষতি ২০২৩ সালে আনুমানিক ১৪৮ মিলিয়ন ডলার। এই মুনাফায় ঘাঁটিগুলো বিপুল অর্থ পায়, যা দিয়ে তারা রক্ষীদের ঘুষ দিতে, স্থান বদলাতে এবং নতুন ভুক্তভোগী নিয়োগ করতে পারে।
কিছু মানুষ অবৈধ কাজে যুক্ত হওয়ার কথা জেনেই দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় কম্বোডিয়ায় গেছেন। তবে আরও অনেকে নিয়োগকারীদের প্রতারণার শিকার হয়ে পরে জোরপূর্বক শ্রমে আটকে পড়েছেন। কর্মীরা জানান, বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের এক ঘাঁটি থেকে আরেক ঘাঁটিতে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে; যারা লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেননি, তাদের ওপর ক্রমে সহিংসতা বাড়ানো হয়েছে। অপরাধী চক্রের কাছে মানুষ বিক্রি, এমনকি অঙ্গ অপসারণের অভিযোগও জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে এসব দাবি যাচাই করা কঠিন, তবে বারবার পাওয়া সাক্ষ্যে স্পষ্ট হয়েছে যে ঘাঁটিগুলোর ভেতরে নিষ্ঠুরতা ও জবরদস্তি নিত্যনৈমিত্তিক কৌশল।
দক্ষিণ কোরিয়াকে নাড়া দেওয়া মৃত্যু
দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তোলা ঘটনাটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পার্ক মিনহোর মৃত্যু। কাম্পোট প্রদেশের বোকর পর্বত এলাকার কাছে তার মরদেহ পাওয়া যায়। তদন্তকারীরা জানান, ভয়াবহ নির্যাতনের ফলে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। তার পরিবার মুক্তিপণ চেয়ে ফোন পেয়েছিল। কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ কয়েকজন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে হত্যা ও অনলাইন প্রতারণার অভিযোগ এনেছে। ঘটনাটি দক্ষিণ কোরিয়ার শিরোনামে প্রাধান্য পায় এবং ভুয়া চাকরির প্রস্তাব দিয়ে শুরু হয়ে প্রাণঘাতী নির্যাতনে শেষ হওয়া ঝুঁকির দিকে নজর ফেরায়।
মরদেহ উদ্ধারের পর দক্ষিণ কোরিয়া কম্বোডিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এবং পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানায়। পার্ক মিনহোর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে কর্মকর্তারা দ্রুত সমন্বয় করেন এবং প্রতারণার ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত অভিযান চালানোর আহ্বান জানান। এ মৃত্যু বিদেশে দ্রুত আয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করে। পাশাপাশি, কঠোরতর ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশি সহযোগিতা বাড়ানোর পক্ষে জনসমর্থন জোরদার করে।
সিউলের জরুরি পদক্ষেপ
সিউল ভ্রমণ সতর্কতা বাড়িয়েছে এবং এই সংকটের মধ্যে প্রথমবারের মতো কম্বোডিয়ার নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ‘কোড ব্ল্যাক’ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে কাম্পোট প্রদেশের বোকর পর্বত এলাকা, বাভেট শহর এবং পয়পেট শহর; এসব স্থানের সঙ্গে ঘাঁটির কার্যক্রম ও বিদেশিদের আটকে রাখার যোগসূত্র রয়েছে। নাগরিকদের এসব স্থানে ভ্রমণ বাতিল করতে বলা হয়েছে। নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করলে পাসপোর্ট আইনসহ অন্যান্য আইনে শাস্তি হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, ভুয়া বিদেশি চাকরির বিজ্ঞাপন সরাতে এবং প্রতারণামূলক নিয়োগকর্তাদের পক্ষে যাতে সহজে কোরীয়দের লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব না হয়, সে জন্য নিয়োগ প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে কাজ বাড়ানো হবে এবং যাচাই প্রক্রিয়া জোরদার করা হবে।
দক্ষিণ কোরিয়া জাতীয় নিরাপত্তা দপ্তরের নেতৃত্বে একটি জরুরি টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল নমপেনে পাঠিয়েছে। সাম্প্রতিক অভিযানে কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষের হাতে আটক ব্যক্তিদের দেশে ফেরাতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে এবং একটি বিশেষ উড়োজাহাজের ব্যবস্থা করেছে। পুলিশি পাহারায় ৬৪ জন দক্ষিণ কোরীয় দেশে ফিরেছেন; এখন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রত্যেককে জোর করে যুক্ত করা হয়েছিল, নাকি তারা স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছিলেন, তা তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন। অপরাধে জড়িত প্রমাণিত হলে তাদের কোরীয় আইনে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, ভুক্তভোগী হিসেবে স্বীকৃতি আর অপরাধের দায় এক বিষয় নয়; প্রতিটি ঘটনা সতর্কতার সঙ্গে আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।
কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, এ বছর কম্বোডিয়ায় নিখোঁজ বা ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটক প্রায় ৩৩০ জনের বিষয়ে প্রাথমিক খবর পাওয়া গিয়েছিল, তবে অধিকাংশেরই সন্ধান মিলেছে। প্রায় ৮০ জনের খোঁজ এখনো মেলেনি, আর প্রতারণাবিরোধী অভিযানে আটক প্রায় ৬০ জন কম্বোডিয়ায় রয়েছেন। সিউল বলেছে, তারা প্রতিটি ঘটনার খোঁজ রাখা, নিখোঁজ নাগরিকদের সন্ধান করা এবং কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে আরও মানুষকে দেশে ফিরিয়ে আনার কাজ চালিয়ে যাবে।
কম্বোডিয়ার অবস্থান ও আন্তর্জাতিক চাপ
ঘাঁটি থেকে উদ্ধার বা অভিযানে গ্রেপ্তার দক্ষিণ কোরীয়দের বহিষ্কারে প্রস্তুত বলে জানিয়েছে নমপেন। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দক্ষিণ কোরীয় ও কম্বোডীয় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সংকট নিয়ে বৈঠক করেছেন; প্রধানমন্ত্রী হুন মানেতের সঙ্গে একটি বৈঠকও হয়েছে। কম্বোডীয় কর্মকর্তারা বলছেন, তারা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন এবং আটক ব্যক্তিদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নিচ্ছেন। আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমনে যৌথ প্রচেষ্টার বিষয়ে দুই পক্ষ বিবৃতি দিয়েছে, যদিও তদন্তের ধীর গতি এবং চক্রগুলোর অর্থের উৎস ভেঙে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উত্তেজনা রয়ে গেছে।
ঘাঁটিগুলোর সঙ্গে যুক্ত অপরাধী চক্রের ওপর কম্বোডিয়ার বাইরেও চাপ বাড়ছে। প্রতারণা চক্রকে সহায়তার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য নমপেনভিত্তিক একটি শিল্পগোষ্ঠীর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে; মার্কিন কৌঁসুলিরা গোষ্ঠীটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন। তদন্তকারীরা জানান, প্রতারণামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ করা হয়েছে। এ বছরের শুরুতে চীন দমন অভিযান চালিয়ে মিয়ানমার থেকে লোকজনকে ফিরিয়ে আনে; এর ফলে অনেক পরিচালনাকারী অন্যত্র চলে যান। এখন বিভিন্ন সীমান্ত পেরিয়ে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্র বদলাচ্ছে, যা জাতীয় পর্যায়ের পদক্ষেপকে জটিল করে তুলছে।
দক্ষিণ কোরিয়া বলেছে, গ্রেপ্তার, প্রত্যর্পণ, তথ্য বিনিময় এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তায় সহযোগিতা বাড়াতে আসিয়ান বৈঠকসহ আঞ্চলিক সম্মেলনগুলোতে তারা বিষয়টি তুলবে। প্রতারণা চক্র বিভিন্ন দেশ থেকে লোক নিয়োগ করে এবং সীমান্তবর্তী শহর দিয়ে তাদের সরিয়ে নেয়। স্থায়ী অগ্রগতির জন্য দরকার সীমান্তপারের তদন্ত ও অর্থের গতিবিধি অনুসরণ, যাতে অর্থ পাচারের পথ বন্ধ করা যায় এবং ঘাঁটিগুলোকে অর্থায়ন ও সুরক্ষা দেয় এমন ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়া যায়।
কম্বোডিয়া কেন কেন্দ্র হয়ে উঠল
অপরাধী গোষ্ঠীগুলো সুযোগের সন্ধানে স্থান বদলেছে। চীন জুয়া ও অনলাইন প্রতারণার ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করলে অনেক অপরাধী চক্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চলে যায়; সেখানে আইন প্রয়োগে সমন্বয়ের অভাব এবং সীমান্ত এলাকায় পালানোর পথ রয়েছে। কম্বোডিয়ার সীমান্তবর্তী শহর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে জমি, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধা থাকায় বড় কার্যালয়সদৃশ ঘাঁটি গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। কিছু অঞ্চলে ক্যাসিনো ও বেসরকারি নিরাপত্তাব্যবস্থা আড়াল হিসেবে কাজ করেছে। দুর্নীতির কারণে অপরাধী চক্রগুলোর কার্যক্রম চালানো এবং আসন্ন অভিযানের খবর একে অন্যকে জানানো সহজ হয়েছে। এর ফলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেক ঘাঁটি গড়ে উঠেছে, যেখানে প্রয়োজনমতো শত শত কর্মীকে রাখা, প্রশিক্ষণ দেওয়া, শাস্তি দেওয়া ও এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরানো সম্ভব।
কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ অভিযান ও আটকের ব্যবস্থা নিয়েছে; সাম্প্রতিক অভিযানে কয়েক ডজন দক্ষিণ কোরীয়ও আটক হয়েছেন। অপরাধী চক্রগুলো দ্রুত কৌশল বদলায়। পরিচালনাকারীরা ভবন বদলান, রাতে কর্মীদের সরিয়ে নেন এবং প্রতিবেশী দেশে আবার কার্যক্রম শুরু করেন। তদন্তকারীরা বলছেন, মিয়ানমারের কিছু এলাকায় এখন কল সেন্টারের কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে; মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিম আফ্রিকা ও মধ্য আমেরিকার দূরবর্তী স্থানেও এমন কার্যক্রমের খবর পাওয়া গেছে। এসব স্থানান্তর দেখায়, দুর্বল নজরদারি ও দ্রুত মুনাফার সুযোগের পেছনে ছোটে এমন একটি চলমান অপরাধব্যবস্থা এটি।
যেভাবে ভুক্তভোগীদের প্রলুব্ধ করে আটকে রাখা হয়
নিয়োগকারীরা গ্রাহকসেবা, ডিজিটাল বিপণন বা বিক্রয় সহায়তার মতো উচ্চ বেতনের চাকরির প্রস্তাব দেন; অনেক ক্ষেত্রে বিনা মূল্যে বিমানভাড়া ও আবাসনের প্রতিশ্রুতিও থাকে। বার্তা আদান-প্রদানের অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও চাকরির ওয়েবসাইটের মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন প্রতারকেরা। কেউ পাসপোর্টের অনুলিপি পাঠিয়ে ভ্রমণে সম্মতি দিলে নিয়োগকারীরা একাধিক দেশ হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেন। গন্তব্যে পৌঁছানোর পর ফোন ও পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হতে পারে। রক্ষীরা বলেন, যাতায়াত ও থাকার খরচের জন্য কর্মীদের ঋণ হয়েছে। যারা বাধা দেন, তাদের সহিংসতার হুমকি দেওয়া হয় অথবা অভিবাসন কর্তৃপক্ষের কাছে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।
প্রতারণায় ভুক্তভোগী জোগাড় করলে ঘাঁটিগুলো বোনাস দেয়, আর লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে কর্মীদের শাস্তি দেয়। তত্ত্বাবধায়কেরা কথোপকথনের চিত্রনাট্য লিখে দেন এবং ডেটিং অ্যাপ ও বিনিয়োগসংক্রান্ত গ্রুপে ভুয়া প্রোফাইল ব্যবহার করেন। দেশে থাকা পরিবার কখনো কখনো মুক্তিপণ চেয়ে ফোন বা মারধরের ভিডিও পায়। অনলাইন প্রতারণা এবং স্বজনদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি, দুই দিক থেকেই অর্থ আদায় করাই লক্ষ্য। কিছু কর্মী পালিয়ে দূতাবাস বা স্থানীয় পুলিশের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন। অভিযান বা আলোচনার মাধ্যমে হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত অনেকে আটকে থাকেন।
পরিবার ও ভ্রমণকারীদের জন্য পরামর্শ
বিদেশে চাকরির প্রস্তাব সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা উচিত চাকরিপ্রার্থীদের। কোনো প্রতিষ্ঠানের আইনি নিবন্ধন যাচাই করুন, ভিডিও কলে বর্তমান কর্মীদের সঙ্গে কথা বলুন এবং আগাম নিয়োগ ফি দিতে অস্বীকার করুন। পাসপোর্টের অনুলিপি নিজের কাছে রাখুন এবং নিয়োগকারী বা ব্যবস্থাপকের কাছে আসল পাসপোর্ট জমা দেবেন না। ভ্রমণসূচি স্বজনদের জানান, সরকারি সীমান্তপথ ব্যবহার করুন এবং ‘কোড ব্ল্যাক’ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কম্বোডিয়ার অঞ্চলগুলো এড়িয়ে চলুন। বন্ধু বা পরিবারের কেউ বিদেশে গেলে নিয়মিত যোগাযোগের সময় ঠিক করুন এবং বিমানবন্দর ও সীমান্ত থেকে ছোট ভিডিও পাঠাতে বলুন, যাতে তাৎক্ষণিকভাবে অবস্থান নিশ্চিত করা যায়।
কোনো স্বজন কম্বোডিয়ায় নিখোঁজ হলে যত দ্রুত সম্ভব কোরীয় পুলিশ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। ভ্রমণের তারিখ, নিয়োগকারীর নাম, ফোন নম্বর এবং কথোপকথনের স্ক্রিনশট দিন। যোগাযোগের নথি ও ব্যাংকের রেকর্ড সংরক্ষণ করুন। মুক্তিপণ চেয়ে ফোন এলে অজানা অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাবেন না। কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে চাঁদাবাজির চেষ্টা সম্পর্কে জানাতে এবং কম্বোডিয়ার পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে এমন সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। উদ্ধারপ্রক্রিয়া ধীর হতে পারে, তবে প্রতিটি প্রতিবেদন তদন্তকারীদের অপরাধী চক্রের মানচিত্র তৈরি ও নিরাপদে মানুষকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনায় সহায়তা করে।
মূল বিষয়গুলো
- দক্ষিণ কোরিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে কম্বোডিয়ায় যাওয়া মানুষের সংখ্যা নথিভুক্ত ফিরে আসা মানুষের চেয়ে হাজারো বেশি; এতে দেশে না ফেরা ব্যক্তিদের নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
- কর্মকর্তারা বলছেন, এ বছর কম্বোডিয়ায় প্রায় ৮০ জন দক্ষিণ কোরীয়ের খোঁজ মেলেনি; প্রতারণা কেন্দ্রে অভিযানের পর প্রায় ৬০ জন আটক রয়েছেন।
- ২২ বছর বয়সী ছাত্র পার্ক মিনহো আগস্টে বোকর পর্বতের কাছে নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান; এতে ক্ষোভ ছড়ায় এবং সরকার জরুরি পদক্ষেপ নেয়।
- সিউল বোকর, বাভেট ও পয়পেটে ‘কোড ব্ল্যাক’ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং নাগরিকদের ওই অঞ্চলগুলোতে ভ্রমণ বাতিল করতে বলেছে।
- অনুমান অনুযায়ী, কম্বোডিয়ার প্রতারণা শিল্পে কাজ করা প্রায় ২ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১,০০০ জন দক্ষিণ কোরীয়।
- বিশেষ উড়োজাহাজে ৬৪ জন দক্ষিণ কোরীয়কে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে; জোরপূর্বক, নাকি স্বেচ্ছায় তারা যুক্ত হয়েছিলেন, তা নির্ধারণে এখন তদন্ত চলছে।
- দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর প্রতারণাবিরোধী অভিযানে উদ্ধার বা গ্রেপ্তার কয়েক ডজন কোরীয়কে বহিষ্কারে সম্মত হয়েছে কম্বোডিয়া।
- প্রতারণা চক্রকে সহায়তার অভিযোগে কম্বোডিয়ার একটি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে; প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ করা হয়েছে।
- ভুক্তভোগীরা নির্যাতন, আটকে রাখা এবং ‘পিগ বাচারিং’, সেক্সটর্শন ও ভুয়া বিনিয়োগ প্রকল্পের মতো অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করার কথা জানিয়েছেন।
- সীমান্তপারের অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় আঞ্চলিক ফোরামগুলোতে সমন্বিত উদ্যোগের পক্ষে কথা বলবে দক্ষিণ কোরিয়া।






