চীনের ইতিহাসে এক বিশ্বজনীন শিখর
বিশ্ব ইতিহাসে খুব কম সময়ই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বাণিজ্যিক বিস্তার ও সৃজনশীল শক্তিকে চীনের তুঙ রাজবংশের (৬১৮ থেকে ৯০৭) মতো এতটা একত্র করেছিল। রাজদরবার একটি পেশাদার প্রশাসন গড়ে তোলে, সিল্ক রোডের বাণিজ্য পূর্ব এশিয়াকে দূরবর্তী বাজারের সঙ্গে যুক্ত করে, আর শিল্পকলার মান এমন উচ্চতায় পৌঁছায়, যা পরবর্তী বহু প্রজন্ম আজও উদ্যাপন করে। সে যুগের প্রাণকেন্দ্র ছিল ছাংআন—এক রাজধানী, যেখানে ইউরেশিয়ার নানা প্রান্ত থেকে বণিক, পণ্ডিত, ভিক্ষু ও কূটনীতিকেরা আসতেন।
সূচিপত্র
- চীনের ইতিহাসে এক বিশ্বজনীন শিখর
- তুঙরা কীভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল
- তুঙ আইনসংহিতা ও মন্ত্রণালয়
- মেধার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নির্বাচন
- সম্রাজ্ঞী উ ও শাসনব্যবস্থা
- মহাদেশগুলোকে যুক্ত করা অর্থনীতি
- ভূমি ও কর
- মুদ্রা, বাজার ও ঋণ
- সিল্ক রোড ও সমুদ্রপথ
- ছাংআন ও অন্যান্য শহরের জীবন
- সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ
- কবিতা ও গদ্য
- শিল্প ও কারুশিল্প
- সংগীত, নৃত্য ও ফ্যাশন
- বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ধারণা
- মুদ্রণ ও বই
- চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিদ্যা
- ধর্মবিশ্বাস ও বিদেশি যোগাযোগ
- তুঙ আমলে ধর্ম
- মিত্র, প্রতিদ্বন্দ্বী ও সীমান্ত
- সংকট ও পরিবর্তন
- আন লুশানের বিদ্রোহ
- বিপর্যয়ের পর সংস্কার
- তুঙ রাজবংশ এখনো কেন প্রাসঙ্গিক
- গবেষকেরা এখন যা জানতে পারছেন
- মূল বিষয়গুলো
তুঙরা সুই রাজবংশের কাছ থেকে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র উত্তরাধিকারসূত্রে পায় এবং তা স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে রূপ দেয়। সংস্কার করা আইনসংহিতা, মেধাভিত্তিক সরকারি চাকরিব্যবস্থা ও জনকল্যাণমূলক কাজে অঙ্গীকার—এসবের মাধ্যমে উচ্চাকাঙ্ক্ষী নগরগুলোর সঙ্গে বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনপদের সমন্বয় করা হয়। রাজবংশটি বিদেশি প্রভাবকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি প্রতিবেশীদের কাছে নিজেদের শাসন ও সংস্কৃতির আদর্শ ছড়িয়ে দেয়। আত্মবিশ্বাস ও আদান-প্রদানের এই মিশ্রণ ব্যাখ্যা করে, কেন জাপান ও কোরিয়া থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত তুঙ রাজবংশ আজও এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত, আর কেন জাদুঘরগুলো এখনো এর ইতিহাস তুলে ধরে।
তুঙরা কীভাবে শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল
সুই রাজবংশের পতনের পর লি ইউয়ান, যিনি সম্রাট কাওজু নামে পরিচিত, তুঙ রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ছেলে লি শিমিন—সম্রাট তাইজং—সীমান্ত স্থিতিশীল করেন, প্রতিভাবান কর্মকর্তাদের রাজদরবারে আনেন এবং বাস্তবমুখী শাসনের ধারা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁরা আইনকে পুনর্বিন্যস্ত করে স্পষ্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, নির্ভরযোগ্য মুদ্রা চালু করেন এবং শিক্ষার ও সরকারি পদে নিয়োগের জন্য মানসম্মত গ্রন্থ প্রকাশ করেন। সময়ের সঙ্গে রাজদরবার অভিজাত পরিবারগুলোর সঙ্গে ধ্রুপদি সাহিত্য ও প্রশাসনিক কাজে দক্ষতাসম্পন্ন উদীয়মান পণ্ডিতশ্রেণির ভারসাম্য রক্ষা করতে শেখে।
তুঙ আইনসংহিতা ও মন্ত্রণালয়
তুঙ আইনসংহিতায় বিস্তারিত বিধির সঙ্গে নমনীয় বিচারব্যবস্থার সমন্বয় ছিল; অপরাধীর উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতি অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করা হতো। এটি পরবর্তী চীনা রাজবংশগুলোর এবং চীনা রাষ্ট্রচিন্তা থেকে শিক্ষা নেওয়া পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য আদর্শ হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় প্রশাসন গঠিত ছিল তিন বিভাগ ও ছয় মন্ত্রণালয় নিয়ে। একটি বিভাগ নীতি প্রণয়ন করত, একটি তা পর্যালোচনা করত, আর অন্যটি কর্মী, রাজস্ব, আচার-অনুষ্ঠান, সেনাবাহিনী, বিচার ও জনকল্যাণমূলক কাজের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রণালয়গুলোর মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করত। এর ফলে দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ নজরদারি প্রতিষ্ঠিত হয়।
মেধার ভিত্তিতে কর্মকর্তা নির্বাচন
প্রথম দিকের দশকগুলোতে পারিবারিক বংশপরিচয়ের গুরুত্ব থাকলেও, রাজদরবার সাহিত্যিক দক্ষতা, ধ্রুপদি গ্রন্থের জ্ঞান এবং নীতিমালা লিখতে পারার সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা সম্প্রসারিত করে। পরীক্ষায় সফল হলে মর্যাদাপূর্ণ জিনশি ডিগ্রি এবং সরকারি পদে যাওয়ার সুযোগ মিলত। তুঙ সমাধিলিপির হাজার হাজার নমুনা নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় ধারাবাহিক পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে। সপ্তম শতকের শেষভাগের সংস্কারের পর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া কর্মজীবনে উচ্চ পদ পাওয়ার শক্তিশালী পূর্বাভাস হয়ে ওঠে। বংশপরিচয়ের গুরুত্ব আগের তুলনায় কমে যায়, যদিও পরীক্ষায় অকৃতকার্যদের ক্ষেত্রে বাবার অবস্থান তখনো সহায়ক ছিল।
সম্রাজ্ঞী উ ও শাসনব্যবস্থা
নিজ নামে চীন শাসন করা একমাত্র নারী উ জেতিয়ান যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিতে পরীক্ষাব্যবস্থা কাজে লাগান। কৃষি, করব্যবস্থা ও শিক্ষায় সংস্কারের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় শাসন শক্তিশালী করেন। তাঁর রাজদরবার জ্ঞানচর্চা ও ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করত এবং রাজবংশকে সংহত রাখা প্রশাসনিক রীতিগুলো চালু রেখেছিল। জনজীবনে তাঁর দীর্ঘ উপস্থিতি এমন এক সমাজে নারীর কর্তৃত্বের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে, যে সমাজ ছিল অভিজাত ও স্তরবিন্যস্ত, তবে দৈনন্দিন জীবনযাপনে তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত।
মহাদেশগুলোকে যুক্ত করা অর্থনীতি
তুঙ অর্থনীতির ভিত্তি ছিল শক্তিশালী কৃষি এবং প্রাণবন্ত বাজার। রাষ্ট্রীয় শস্যভান্ডার খাদ্যের দাম স্থিতিশীল রাখত, খাল দিয়ে কর হিসেবে সংগৃহীত শস্য রাজধানীতে আনা হতো, আর কৃষিবিষয়ক নির্দেশিকায় ব্যবহারিক কৌশল ছড়িয়ে পড়ত। বাণিজ্য এসব শক্তিকে আরও বাড়িয়ে তোলে। কাফেলা ও জাহাজে রেশম, চা ও মৃৎপাত্র বাইরে যেত; আর ঘোড়া, মসলা, কাচের জিনিস ও রুপা আসত, যা রাজদরবার ও নগরগুলোর রুচি মেটাত।
ভূমি ও কর
তুঙ শাসনের প্রথম দিকে শাসকেরা সমবণ্টিত ভূমিব্যবস্থার মাধ্যমে জমি পরিচালনা করতেন। পরিবারগুলোকে জমির প্লট বরাদ্দ দেওয়া হতো এবং তার বিনিময়ে খাজনা ও শ্রম দিতে হতো। নিবন্ধনের ওপর রাষ্ট্রের শক্ত নিয়ন্ত্রণ এবং বণ্টনের জন্য পর্যাপ্ত জমি থাকলেই ব্যবস্থাটি সবচেয়ে ভালো কাজ করত। অষ্টম শতকের মাঝামাঝি অস্থিরতার পর ৭৮০ সালে রাজদরবার দ্বৈত কর আইন চালু করে। বরাদ্দকৃত জমির পরিমাণ ও শ্রমের নির্ধারিত হিসাবের বদলে বছরে দুবার সম্পদ ও জমির ভিত্তিতে কর ধার্য করা হতো। এই পরিবর্তন স্থানীয় বাস্তবতা স্বীকার করে, নগদ কর আদায় সহজ করে এবং শহরে করের আওতা বাড়ায়।
মুদ্রা, বাজার ও ঋণ
স্থিতিশীল মুদ্রা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। রাজদরবার কাইইউয়ান তুংবাও মুদ্রা চালু করে, যা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। দূরবর্তী বাজারের মধ্যে নিরাপদে অর্থ পাঠাতে বণিক ও কর্মকর্তারা ‘উড়ন্ত নগদ’ নামে একধরনের অর্থ পাঠানোর নোটও ব্যবহার করতেন। শহরের অর্থনীতি পরিচালিত হতো প্রাচীরঘেরা পাড়ার মাধ্যমে, যেগুলো দিনে খোলা থাকত এবং রাতে বন্ধ হয়ে যেত। বড় বাজারে সরকারি দালাল, মাননিয়ন্ত্রণ ও প্রকাশ্যে টাঙানো দাম ছিল। এই ব্যবস্থা বড় পরিসরে বাণিজ্যকে উৎসাহিত করত, পাশাপাশি কারুশিল্পী গোষ্ঠী ও বণিক নেটওয়ার্কের বিকাশের সুযোগ দিত।
সিল্ক রোড ও সমুদ্রপথ
স্থলপথের ঐতিহ্যবাহী সিল্ক রোডের গুরুত্ব তখনো ছিল। তারিম অববাহিকা ও মধ্য এশিয়ার পথে যাত্রাবিরতির কেন্দ্র এবং সংরক্ষিত অঞ্চলগুলো নিরাপত্তা দিত। সামুদ্রিক বাণিজ্যও বাড়ে। দক্ষিণ উপকূলের গুয়াংঝৌতে আরব ও পারস্যের জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল; সেখানে শুল্ক দপ্তর ও দোভাষীরাও ছিলেন। সেখান থেকে এবং ইয়াংঝৌর মতো নদীবন্দর থেকে জাহাজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতে যেত। আমদানি করা পণ্য ও ধারণা খাবার, সংগীত, পোশাক ও অলংকারের রুচিতে পরিবর্তন আনে।
ছাংআন ও অন্যান্য শহরের জীবন
ছাংআন ছিল পরিকল্পিতভাবে সাজানো পাড়া ও সড়কের জাল, যা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ছিল এবং চারদিকে ছিল মঠ ও অভিজাতদের প্রাসাদ। শহরের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে ছিল দুটি বিশাল বাজার। পাড়ার ভেতরে পরিবারগুলো উঠোনঘেরা বাড়িতে বাস করত, কারুশিল্পীরা এলাকার দোকানে কাজ করতেন, আর গল্পকারেরা চায়ের দোকানে পরিবেশনা করতেন। শহরটি ছিল বহু ভাষা ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের আবাস। কোরিয়া ও জাপান, সোগদীয় কাফেলা-নগর, পারস্য ও ভারত থেকে অতিথিরা আসতেন। তাঁরা নতুন বাদ্যযন্ত্র, নাচ ও ধর্ম নিয়ে আসতেন, আর শহরটি সেসব গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল।
দ্বিতীয় রাজধানী লুওয়াং এবং নদীবন্দর ইয়াংঝৌ—এই দুই শহর ছাংআনের সঙ্গে মিলে বাণিজ্যের ত্রিভুজ গড়ে তোলে। তাদের রাস্তায় পাওয়া যেত বস্ত্র, কাগজ, কালি, বই, মৃৎপাত্র ও সূক্ষ্ম ধাতুশিল্পের জিনিস। পোলো খেলা দেখতে ভিড় জমত। রেস্তোরাঁয় পরিবেশন করা হতো নুডলস, খাসির মাংস, রুটি এবং আঙুর বা বাজরা থেকে তৈরি মদ। শৃঙ্খলা বজায় রাখতে রাতে চলাচলে বিধিনিষেধ থাকলেও দিনের শহুরে জীবন ছিল অত্যন্ত কর্মচঞ্চল। নগরজীবনে নারীরা ঘোড়ায় চড়া, পোলো খেলা এবং আগের যুগে এড়িয়ে চলা পোশাক পরার সুযোগ পেতেন।
সংস্কৃতির পূর্ণ বিকাশ
শিল্পকলায় শৃঙ্খলা ও স্বাধীনতার বিরল ভারসাম্য দেখা যায়। রাজদরবারের রুচির সঙ্গে বিদেশি প্রভাব মিশে এমন এক ধারা তৈরি করে, যা পূর্ব এশিয়ার মানদণ্ড হয়ে ওঠে।
কবিতা ও গদ্য
কবিতা হয়ে ওঠে সামাজিক যোগাযোগের ভাষা। ছন্দোবদ্ধ কবিতা এবং সংক্ষিপ্ত জুয়েজু রীতি আভিজাত্য ও বুদ্ধিদীপ্ততার পরিচায়ক ছিল। লি বাই পাহাড় ও মদ নিয়ে লিখেছেন হালকা মেজাজে। দু ফু কর্তব্য, বিয়োগ ও যুদ্ধের যন্ত্রণা তুলে ধরেছেন। ওয়াং ওয়েই প্রকৃতির সঙ্গে বৌদ্ধ ভাবনা মিলিয়েছেন। বাই জুই সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা নিয়ে সরল ভাষায় কবিতা লিখেছেন। কবিতায় দক্ষতা শুধু শৈল্পিক লক্ষ্য ছিল না, সরকারি পদ পাওয়ার জন্যও তা প্রয়োজন হতো। ফলে সাহিত্য সরকারি জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
শিল্প ও কারুশিল্প
ইয়ান লিবেন ও উ দাওজির মতো চিত্রশিল্পীরা অবয়ব ও ধর্মীয় চিত্রকলার আদর্শ স্থাপন করেন। বৌদ্ধ ভাস্কর্যে গুহামন্দিরের বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ থেকে শুরু করে ভক্তিমূলক ঘনিষ্ঠ প্রতিকৃতি—দুই ধরনের কাজই দেখা যায়। তুঙের মৃৎশিল্পীরা তিন রঙের প্রলেপে পারদর্শিতা অর্জন করেন, যা ঘোড়া, উট ও রাজদরবারের নারীদের জীবন্ত ঔজ্জ্বল্য দিত। সোনা ও রুপার থালা এবং পানপাত্রে লতাপাতা, আঙুর, ডানাওয়ালা প্রাণীসহ পশ্চিম এশিয়ায় উৎস থাকা নানা নকশার সঙ্গে পিওনি ফুল ও মেঘের ঘূর্ণি মিশে দেখা যায়। ব্রোঞ্জের আয়নায় ছিল মার্জিত নকশা। সমাধির মূর্তিগুলোতে নর্তকী, ঘোড়ার পরিচর্যাকারী, বিদেশি ও কর্মকর্তাদের অবয়ব উজ্জ্বল বিস্তারিতভাবে সংরক্ষিত আছে।
সংগীত, নৃত্য ও ফ্যাশন
রাজদরবারের সংগীত ও নৃত্যদল মধ্য এশীয় ছন্দ ও বাদ্যযন্ত্রের প্রভাব গ্রহণ করেছিল। নাশপাতির মতো আকৃতির তারবাদ্য পিপা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জমকালো শোভাযাত্রা, নাট্য পরিবেশনা ও আচার-অনুষ্ঠানের জাঁকজমক জনজীবনে দৃশ্যমান চাকচিক্য যোগ করত। ফ্যাশনেও পরিবর্তন আসে। চুলের সাজ উঁচু হয়, হাতা চওড়া হয়, প্রসাধন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। দেয়ালচিত্রে নারী অশ্বারোহী ও পোলো খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসী ও প্রাণবন্তভাবে দেখা যায়।
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ধারণা
কৌতূহলের সঙ্গে পৃষ্ঠপোষকতা যুক্ত হয়েছিল। অনুবাদ, কারিগরি নির্দেশিকা ও মন্দিরের গ্রন্থাগার অঞ্চল ও প্রজন্মের মধ্যে জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়।
মুদ্রণ ও বই
তুঙ আমলে কাঠের ব্লকে মুদ্রণ পরিণত রূপ পায়। মুদ্রকেরা ব্লক খোদাই করে অনেক কপি তৈরি করতে পারায় ধর্মীয় গ্রন্থ, বর্ষপঞ্জি ও প্রাথমিক পাঠ্যবই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ৮৬৮ সালে মুদ্রিত ‘ডায়মন্ড সূত্র’ এর উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। মুদ্রণের প্রসারে শহরে সাক্ষরতার হার বাড়ে এবং বিদ্যালয় ও পরীক্ষার জন্য প্রার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
চিকিৎসা ও জ্যোতির্বিদ্যা
চিকিৎসক সুন সিমিয়াও ‘হাজার স্বর্ণমুদ্রার সমমূল্যের ব্যবস্থাপত্র’ সংকলন করেন। এই বিশাল গ্রন্থে সতর্ক রোগনির্ণয়, ওষুধপ্রস্তুতি এবং বর্তমানে চিকিৎসা নীতিশাস্ত্র নামে পরিচিত বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাজদরবারের জ্যোতির্বিদেরা নক্ষত্রের মানচিত্র তৈরি করেন, বর্ষপঞ্জি আরও নিখুঁত করেন এবং সময় মাপার যন্ত্র বানান। পর্যবেক্ষণ উন্নত করতে ভিক্ষু ও কর্মকর্তারা যন্ত্র তৈরিতে একযোগে কাজ করেন। কৃষিবিষয়ক লেখায় ফলন বাড়ানোর জন্য সরঞ্জাম, সেচপদ্ধতি ও মাটির যত্নের বর্ণনা ছিল।
ধর্মবিশ্বাস ও বিদেশি যোগাযোগ
ধর্মীয় জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। রাষ্ট্র কনফুসীয় আচারকে মর্যাদা দিত এবং একই সঙ্গে বৌদ্ধ মন্দির ও দাওবাদী উপাসনালয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করত। বন্দর এলাকা ও বাণিজ্যপথ ধরে বিদেশি ধর্মও স্থান করে নেয়।
তুঙ আমলে ধর্ম
বৌদ্ধধর্ম শিল্পকলা ও নগরজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। মঠগুলো বিদ্যালয় ও চিকিৎসাকেন্দ্র চালাত, গ্রন্থাগার গড়ে তুলত এবং ভারতে তীর্থযাত্রায় পৃষ্ঠপোষকতা করত। দাওবাদ রাজকীয় অনুষ্ঠান ও উৎসবের রীতিকে প্রভাবিত করেছিল। নেস্টোরীয় খ্রিষ্টান, জরথুস্ত্রী ও মানিখীয়রা রাজধানী ও বাণিজ্যনগরগুলোতে উপাসনালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই মিশ্র পরিবেশে বিতর্কের পাশাপাশি সংশ্লেষও গড়ে ওঠে, আর মানুষ বিশ্বাস প্রকাশের নানা পথ পায়।
মিত্র, প্রতিদ্বন্দ্বী ও সীমান্ত
তারিম অববাহিকা ও তার বাইরের সংরক্ষিত অঞ্চলের মাধ্যমে রাজবংশটি ক্ষমতার বিস্তার ঘটায়। পশ্চিম তুর্কিদের পরাজিত করার পর রাজদরবার স্থানীয় শাসকদের স্বীকৃতি দেয় এবং বাণিজ্যপথ পাহারা দিতে চীনা সেনাপতিদের নিয়োগ করে। আধুনিক আফগানিস্তানের কিছু অংশের সঙ্গে মোটামুটি মিলে যাওয়া প্রবেশদ্বারস্বরূপ তুখারিস্তান অঞ্চলে একাধিক সামরিক প্রশাসন ও সেনাঘাঁটির মাধ্যমে তুঙ প্রভাব বিস্তার করে। অন্য সীমান্তে রাজদরবার তিব্বত, তৃণভূমির যাযাবর জোট এবং ভিয়েতনাম ও কোরিয়ার রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সামলাত। ৭৫১ সালে আব্বাসীয় খেলাফতের কাছে তালাসের যুদ্ধে পরাজয় মধ্য এশিয়ায় তুঙদের অগ্রযাত্রায় বিরতি আনে। পরবর্তী অনেক বিবরণে ওই ঘটনাকে কাগজ তৈরির কৌশল পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সামরিক অবস্থান সংকুচিত হলেও কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের মাধ্যমে পণ্য ও ধারণার চলাচল অব্যাহত ছিল।
সংকট ও পরিবর্তন
সমৃদ্ধির শেষ পর্যায়ের আড়ালে চাপ জমেছিল। সামরিক গভর্নরদের স্থানীয় ক্ষমতা বাড়ে, করের নথি দুর্বল হয় এবং রাজদরবারের রাজনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
আন লুশানের বিদ্রোহ
৭৫৫ সালে সেনাপতি আন লুশান রাজদরবারের বিরুদ্ধে সৈন্য পরিচালনা করেন। উত্তর চীনের সমভূমিজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং দুই রাজধানীই পতিত হয়। শরণার্থীরা দক্ষিণে পালিয়ে যায়। এই বিপর্যয়ে রাজস্বব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং আঞ্চলিক সেনাপতিরা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। তিব্বতিরা অল্প সময়ের জন্য ছাংআনে প্রবেশ করে। পুনরুদ্ধারে কয়েক বছর লেগেছিল, আর কেন্দ্রীয় শাসনের ক্ষমতা কমে যায়।
বিপর্যয়ের পর সংস্কার
বিদ্রোহের পর রাজদরবার পুরোনো শ্রমকর বদলে দ্বৈত কর আইন চালু করে। এতে স্বীকার করা হয় যে নগদভিত্তিক অর্থনীতি ও শহরের সম্পদ পুরোনো নিবন্ধনব্যবস্থাকে ছাড়িয়ে গেছে। প্রাদেশিক সামরিক গভর্নরদের ওপরও রাজদরবারের নির্ভরতা বাড়ে। স্বল্পমেয়াদে এতে সীমান্ত সুরক্ষিত হলেও পরবর্তী সম্রাটেরা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ৮৪৫ সালে মন্দির বন্ধের এক অভিযানে বৌদ্ধ সম্পত্তি ও ভিক্ষুদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়; উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় রাজস্বের সম্পদ পুনরুদ্ধার। এক প্রজন্ম পর হুয়াং চাওয়ের বিদ্রোহে বন্দর ও শহর পুড়ে যায় এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অবশিষ্ট শক্তিও ক্ষয় হয়। ৯০৭ সালে রাজবংশের অবসান ঘটে, তবে বহু প্রতিষ্ঠান, রুচি ও গ্রন্থ পরবর্তী যুগে টিকে থাকে।
তুঙ রাজবংশ এখনো কেন প্রাসঙ্গিক
তুঙ রাজবংশের উপস্থিতি আজও অনুভূত হয়। পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো এর আইনসংহিতা ও পরীক্ষাব্যবস্থার আদর্শ গ্রহণ করেছিল। চীনের আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার শিকড় এমন এক ব্যবস্থায়, যেখানে শিক্ষিত হয়ে রাষ্ট্রের সেবা করাকে পুরস্কৃত করা হতো। জাদুঘরের প্রদর্শনী কক্ষে তুঙ আমলের চিত্রকলা, সানছাই মূর্তি ও ঝলমলে রুপার নিদর্শন দেখা যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুঙ যুগের কবিদের নিয়ে চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে ‘জার্নি টু দ্য ওয়েস্ট’ অবলম্বনে গেম—বিভিন্ন মাধ্যমে নতুন করে আগ্রহ দেখা গেছে। প্যারিসে এক আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে শত শত প্রত্নবস্তু জড়ো করে নতুন দর্শকদের সামনে সে যুগ তুলে ধরা হয়, যা মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাসের এই সময়ের আবেদন কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
গবেষকেরা এখন যা জানতে পারছেন
নতুন গবেষণাপদ্ধতি ইতিহাসের বিবরণকে আরও পরিশীলিত করছে। ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত এক বড় গবেষণায় তিন হাজারের বেশি তুঙ সমাধিলিপি বিশ্লেষণ করে প্রজন্ম ধরে ব্যক্তিদের কর্মজীবনের অগ্রগতি অনুসরণ করা হয়েছে। তথ্য থেকে দেখা যায়, জন্মপরিচয় তখনো সহায়ক থাকলেও সপ্তম শতকের শেষভাগের পর সরকারি উচ্চ পদে যাওয়ার পথ হিসেবে পরীক্ষায় সাফল্য বংশপরিচয়কে ছাড়িয়ে যায়। অন্যভাবে বললে, তুঙদের পরিমার্জিত প্রতিষ্ঠানগুলো পারিবারিক নামের চেয়ে শিক্ষা ও কাজের দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। প্রাক-শিল্প সমাজে সামাজিক গতিশীলতা বোঝার ক্ষেত্রে এই আবিষ্কার সে যুগকে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ করে তুলেছে।
মূল বিষয়গুলো
- তুঙ শাসন ৬১৮ থেকে ৯০৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। সুই রাজবংশের পুনরেকত্রীকরণের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।
- তুঙ আইনসংহিতা এবং তিন বিভাগ ও ছয় মন্ত্রণালয় সুস্পষ্ট, পেশাদার সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলে।
- রাজবংশের শাসনামলে সাম্রাজ্যিক পরীক্ষা সম্প্রসারিত হয়; গবেষণায় দেখা যায়, সরকারি পদ পাওয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষায় সাফল্য বংশপরিচয়ের গুরুত্বকে ছাড়িয়ে যায়।
- সম্রাজ্ঞী উ জেতিয়ান কেন্দ্রীয় প্রশাসন শক্তিশালী করেন এবং প্রতিভাবানদের নিয়োগে পরীক্ষা কাজে লাগান।
- প্রথম দিকে সমবণ্টিত ভূমিব্যবস্থার মাধ্যমে জমি বরাদ্দের পর নতুন রাজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে ৭৮০ সালে দ্বৈত কর আইন চালু হয়।
- স্থিতিশীল মুদ্রা ও ‘উড়ন্ত নগদ’ ঋণ-ব্যবস্থার সহায়তায় স্থল ও সমুদ্রপথে বাণিজ্য সমৃদ্ধ হয়।
- ছাংআন ছিল সুপরিকল্পিত নগরব্যবস্থা, প্রাণবন্ত বাজার ও সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক জীবনসম্পন্ন বৈচিত্র্যময় মহানগর।
- কবিতা, চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও তিন রঙের মৃৎশিল্পের মান পূর্ব এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
- কাঠের ব্লকে মুদ্রণ, চিকিৎসাবিষয়ক সংকলন এবং জ্যোতির্বিদ্যা ও বর্ষপঞ্জিতে অগ্রগতি জ্ঞানের বিস্তার ঘটায়।
- বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্রে কনফুসীয়, বৌদ্ধ ও দাওবাদী ধারার পাশাপাশি বিদেশি ধর্মও সহাবস্থান করত।
- তালাসের যুদ্ধের মতো বিপর্যয়ে বিস্তার সীমিত হওয়ার আগে তুঙদের ক্ষমতা মধ্য এশিয়া পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
- আন লুশান ও হুয়াং চাওয়ের বিদ্রোহসহ বড় বিপর্যয়গুলো কেন্দ্রীয় শাসনকে দুর্বল করে রাজবংশের অবসান ঘটায়, তবে এর প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি টিকে থাকে।






