গুরুত্বপূর্ণ চিপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ কেন নিল নেদারল্যান্ডস
নেদারল্যান্ডস সরকার নেক্সপেরিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এই বড় সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদক প্রতিষ্ঠানটির মালিক চীনের উইংটেক টেকনোলজি। কর্মকর্তারা বলছেন, ইউরোপে গাড়ি ও ইলেকট্রনিকসের জন্য অপরিহার্য চিপের সরবরাহ সুরক্ষিত রাখা এবং নেদারল্যান্ডস ও ইউরোপের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষাই এ পদক্ষেপের লক্ষ্য। দ্য হেগের ভাষায়, অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এই পদক্ষেপের লক্ষ্য নেক্সপেরিয়ার পরিচালনাগত ঝুঁকি মোকাবিলা করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পণ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ঠেকানো।
সূচিপত্র
নেক্সপেরিয়া বিপুল পরিমাণে তথাকথিত পরিণত প্রযুক্তির চিপ তৈরি করে। এগুলো ছোট হলেও অপরিহার্য ডায়োড, ট্রানজিস্টর, লজিক ডিভাইস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার যন্ত্রাংশ, যা গাড়ি, স্মার্টফোন, শিল্পকারখানার যন্ত্র ও গৃহস্থালি সরঞ্জামে ব্যবহৃত হয়। এসব যন্ত্রাংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালানো অত্যাধুনিক প্রসেসর নয়, তবে কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রম সচল রাখতে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুৎ রূপান্তরের একটি চিপের ঘাটতিতেই গাড়ি সংযোজনের লাইন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কার পর ইউরোপীয় নেতারা ঠিক এ ধরনের বিঘ্নই এড়াতে চান।
নেদারল্যান্ডসের এই আদেশের অর্থ পুরো প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা নয়। সরকারের ভাষ্য, উৎপাদন স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে এবং ঝুঁকি কমানোই এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। সরবরাহ বা নেদারল্যান্ডস ও ইউরোপের মাটিতে গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান সংরক্ষণে হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন কোম্পানি-সিদ্ধান্ত বাতিল বা আটকে দেওয়ার ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে। সংকটের সময় চিপের সরবরাহ অব্যাহত রাখা, প্রযুক্তি বিদেশে হারিয়ে যাওয়া ঠেকানো এবং ইউরোপের বহু উৎপাদককে সেবা দেওয়া কৌশলগত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটিকে স্থিতিশীল করাই এর লক্ষ্য।
পণ্যপ্রাপ্যতা আইন কী করে
এই হস্তক্ষেপের ভিত্তি হলো ১৯৫২ সালের ডাচ আইন ‘পণ্যপ্রাপ্যতা আইন’, যা গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়লে সরকারকে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা দেয়। জরুরি পরিস্থিতিতে অপরিহার্য পণ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রী কোম্পানির সিদ্ধান্তে সাময়িক তদারকি ও বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারেন। সরকারের ভাষ্য, নেক্সপেরিয়ায় পরিচালনাগত গুরুতর ঘাটতির আশঙ্কা জাগানো তাৎক্ষণিক কিছু সংকেত পাওয়ার পর সেপ্টেম্বরে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়। এসব ঘাটতি নেদারল্যান্ডস ও ইউরোপে কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান সংরক্ষণকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারত।
বাস্তবে এই আদেশের ফলে নেক্সপেরিয়ার ব্যবস্থাপনা সাময়িকভাবে বাইরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। পাশাপাশি, এক বছর পর্যন্ত সম্পদ, ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও কর্মীসংক্রান্ত পরিবর্তন স্থগিত রাখতে কোম্পানিটিকে বলা হয়েছে। কোম্পানির স্বার্থ বা সরবরাহের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত সিদ্ধান্ত মন্ত্রী আটকে দিতে বা বাতিল করতে পারেন। কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, এ পদক্ষেপে দৈনন্দিন উৎপাদনে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না। এর উদ্দেশ্য ব্যবসা স্থিতিশীল করা এবং এমন কোনো সংকটের ক্ষেত্রে ডাচ মেধাস্বত্ব রক্ষা করা, যা অন্যথায় চিপ সরবরাহ ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
পরিচালনাগত উদ্বেগ ও পরিচালনা পর্ষদে রদবদল
ডাচ কর্তৃপক্ষের উল্লেখ করা পরিচালনাগত সমস্যার জেরে নেক্সপেরিয়ার শীর্ষ পর্যায়ে ইতিমধ্যেই রদবদল হয়েছে। ইউরোপীয় নির্বাহীদের আবেদনের পর আমস্টারডাম এন্টারপ্রাইজ চেম্বার উইংটেকের প্রতিষ্ঠাতা ঝাং শুয়েঝেংকে নেক্সপেরিয়ায় তাঁর পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে। স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করতে আদালত ডাচ ব্যবসায়ী গুইদো ডিরিককে সিদ্ধান্তমূলক ভোটাধিকারসহ পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়। শিল্পবিষয়ক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থার মধ্যে কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনার সময় নেক্সপেরিয়ার প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা স্টেফান টিলগার অন্তর্বর্তী প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আদালতের নথিতেও দেখা যায়, ব্যবস্থাপনার উদ্দেশ্যে নেক্সপেরিয়ার অধিকাংশ শেয়ারের ওপর সাময়িক নিয়ন্ত্রণ একজন ডাচ আইনগত প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
নেক্সপেরিয়ার নেতৃত্ব ঘিরে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংবেদনশীলতা সরকারের পদক্ষেপের অনেক আগেই নজরে এসেছিল। ডাচ আদালতের এক রায়ে নথিভুক্ত বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, জুন মাসে মার্কিন কর্মকর্তারা দ্য হেগকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ঝাং তাঁর পদে থাকলে নেক্সপেরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের মুখে পড়তে পারে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় নিরাপত্তার কারণে বিধিনিষেধের আওতায় থাকা কোম্পানির তালিকায় উইংটেককে যুক্ত করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ওই বিধিনিষেধের আওতা সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে সম্প্রসারিত হয়। ফলে মালিকানার অবস্থা না বদলালে নভেম্বরের শেষ হওয়ার আগেই নেক্সপেরিয়াও এর আওতায় আসত।
নেক্সপেরিয়ার মূল প্রতিষ্ঠান উইংটেক এই হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ২০১৯ সালে নেক্সপেরিয়া অধিগ্রহণের পর থেকে তারা প্রযোজ্য সব আইন মেনে চলেছে। ডাচ পদক্ষেপের সমালোচনা করে এক বিবৃতিতে কোম্পানিটি বলেছে, এই পদক্ষেপ একটি






