টোকিও, কিয়োটো ও ওসাকার বাইরে কেন ঘুরবেন
প্রথমবার জাপান ভ্রমণে যাওয়া অনেকের সফরের ছন্দ বেঁধে দেয় দেশটির এই তিন বড় শহর। সীমান্ত খুলে দেওয়ার পর পর্যটকের ভিড় রেকর্ড ছাড়িয়েছে; ২০২৪ সালের শুরুর দিকে এক মাসেই এসেছেন ৩০ লাখের বেশি পর্যটক। এতে কিয়োটোর গিয়ন এলাকার গলি থেকে মাউন্ট ফুজির দৃশ্য দেখার স্থান পর্যন্ত বিখ্যাত এলাকাগুলো ও দর্শনীয় স্থানে চাপ বেড়েছে। ভিড় সামলাতে চালু হয়েছে নতুন নানা ব্যবস্থা, যেমন দর্শনার্থীর সংখ্যা সীমিত করা, নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশমূল্য বাড়ানো এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যারিকেড বসানো। পর্যটকদের ছড়িয়ে পড়ে কম ঘোরা অঞ্চলগুলোও ঘুরে দেখার উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
সূচিপত্র
- টোকিও, কিয়োটো ও ওসাকার বাইরে কেন ঘুরবেন
- ২০২৫ সালে জাপান রেল পাস যেভাবে কাজ করে
- পশ্চিম জাপানে ১৪ দিনের ভ্রমণ: চারটি বিশেষ গন্তব্য
- গিফুর মাগোমে জুকু ও নাকাসেন্দোর আবহ
- যা দেখবেন ও যা চেখে দেখবেন
- পাসে যেভাবে যাবেন
- হিয়োগোর হিমেজি ও হোয়াইট হেরন ক্যাসল
- মূল দুর্গের বাইরেও
- পাসে যেভাবে যাবেন
- শিকোকুর কোচি ও তোসা ইস্পাতের কারুশিল্প
- বাজার, দুর্গ ও গুহা
- কী খাবেন এবং কখন
- পাসে যেভাবে যাবেন
- কিউশুর কাগোশিমা শহর, দিগন্তে সাকুরাজিমা
- বাগান, ভিলা ও দ্বীপের দৃশ্য
- পাসে যেভাবে যাবেন
- রেলযাত্রায় ভিড় এড়ানোর কৌশল
- আসন, লাগেজ ও স্টেশন-সংক্রান্ত ব্যবহারিক তথ্য
- খরচ ও পরিকল্পনার সুবিধা
- জেনে রাখুন
জাপানের রেল নেটওয়ার্কে এই পরিবর্তন সহজ। দ্রুতগতির শিনকানসেন লাইনে বড় শহরগুলো যুক্ত, আর লিমিটেড এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেন চলে দুর্গশহর, এদো যুগের ডাকপথের জনপদ, উপকূলীয় শহর ও আগ্নেয়গিরির উপসাগর পর্যন্ত। জাপান রেল পাসে এক টিকিটেই দূরপাল্লার একাধিক যাত্রা করা যায়, আগেভাগে আসন সংরক্ষণ করা যায় এবং এমন সব জায়গায় পৌঁছানো যায়, যেগুলো শান্ত, নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে সমৃদ্ধ এবং স্থানীয় খাবার, কারুশিল্প ও ইতিহাসে ভরপুর।
২০২৫ সালে জাপান রেল পাস যেভাবে কাজ করে
জাপান রেল পাস বিদেশি পর্যটক এবং বিদেশে বসবাসকারী যোগ্য জাপানি নাগরিকদের জন্য দেশজুড়ে ব্যবহারের টিকিট। টানা ৭, ১৪ বা ২১ ক্যালেন্ডার দিনের জন্য জেআর পরিচালিত অধিকাংশ ট্রেনে সীমাহীন যাত্রার সুযোগ দেয় এটি। এর আওতায় রয়েছে শিনকানসেন বুলেট ট্রেন, লিমিটেড এক্সপ্রেস, র্যাপিড ও লোকাল লাইন, হানেদা বিমানবন্দরগামী টোকিও মনোরেল এবং বাছাই করা জেআর ফেরি ও বাস। সবচেয়ে দ্রুত নোজোমি ও মিজুহো শিনকানসেন সাধারণত পাসের আওতায় পড়ে না, তবে আলাদা আপগ্রেড টিকিট নিয়ে পাসধারীরা এসব ট্রেনে উঠতে পারেন।
দুই ধরনের শ্রেণি রয়েছে। বেশির ভাগ পর্যটকের জন্য সাধারণ শ্রেণির আসনই যথেষ্ট; এতে পায়ের জন্য বেশ জায়গা এবং হেলান দেওয়া যায় এমন আসন রয়েছে। গ্রিন কারে আসন আরও প্রশস্ত, জায়গা বেশি এবং পরিবেশ তুলনামূলক নিরিবিলি। সরকারি সাইটে বর্তমান প্রাপ্তবয়স্কদের ভাড়া সাধারণ শ্রেণিতে ৭ দিনের জন্য প্রায় ৫০,০০০ ইয়েন, ১৪ দিনের জন্য ৮০,০০০ ইয়েন এবং ২১ দিনের জন্য ১,০০,০০০ ইয়েন। গ্রিন কারের ভাড়া ৭ দিনের জন্য ৭০,০০০ ইয়েন, ১৪ দিনের জন্য ১,১০,০০০ ইয়েন এবং ২১ দিনের জন্য ১,৪০,০০০ ইয়েন। পাসধারীদের জন্য আসন সংরক্ষণ বিনা মূল্যে; অনলাইনে সাধারণত এক মাস আগে পর্যন্ত আসন বুক করা যায়। স্যুটকেসের মাপ সাধারণ সীমার চেয়ে বড় হলে টোকাইডো, সানইয়ো ও কিউশু শিনকানসেনে আসনের সঙ্গে বড় লাগেজ রাখার জায়গাও সংরক্ষণ করা যায়।
পশ্চিম জাপানে ১৪ দিনের ভ্রমণ: চারটি বিশেষ গন্তব্য
পাস হাতে থাকলে পশ্চিম ও মধ্য জাপানে দুই সপ্তাহের ভ্রমণে ভিড় এড়িয়ে নানা ধরনের প্রাকৃতিক দৃশ্য ও সংস্কৃতি উপভোগ করা যায়। নিচের পথে আছে পাহাড়ি পদযাত্রা, ইউনেস্কো তালিকাভুক্ত দুর্গ, প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কারুশিল্প ও খাবার এবং কিউশুর উপক্রান্তীয় উপসাগরঘেঁষা শহর। টোকিও বা নাগোয়া থেকে যাত্রা শুরু করে পথে বদল সহজ রাখতে ঘড়ির কাঁটার দিকে এগোতে পারেন।
- গিফুর মাগোমে জুকু: ঐতিহাসিক নাকাসেন্দো পথে এদো যুগের ডাকপথের জনপদ। বনপথ ধরে সুমাগো পর্যন্ত হাঁটা যায়, আর খেতে পারেন স্থানীয় খাবার গোহেই মোচি।
- হিয়োগোর হিমেজি: হিমেজি দুর্গের শহর। সাদা অবয়বের জন্য দুর্গটির ডাকনাম ‘হোয়াইট হেরন ক্যাসল’; পাশাপাশি মাউন্ট শোশায় রয়েছে মন্দিরের নিরিবিলি পরিবেশ।
- শিকোকুর কোচি: সেটো ওহাশি সেতু পেরিয়ে পৌঁছানো যায়। কয়েক শতাব্দী ধরে চলা রোববারের বাজারে হাতে গড়া তোসা ছুরি এবং খড়ের আগুনে ঝলসানো কাটসুও নো তাতাকি মিলবে।
- কিউশুর কাগোশিমা শহর: সক্রিয় সাকুরাজিমা আগ্নেয়গিরির বিপরীত পারে উপসাগরের ধারে অবস্থিত। রয়েছে জাঁকজমকপূর্ণ সেনগান এন বাগান এবং উন্নত মানের কালো ওয়াগিউ স্টেক।
পুরো পথে ট্রেনযাত্রা মনোরম; দেখা মিলবে উপকূল, নদী, ধানখেত ও পাহাড়ি গিরিপথের। জনপ্রিয় সময়ের ট্রেনে জানালার পাশের আসন পেতে আগেভাগে সংরক্ষণ করুন। স্টেশনে ট্রেন বদলের সময় লাগেজ ডেলিভারি সেবা ব্যবহার করলে বোঝা কমবে।
গিফুর মাগোমে জুকু ও নাকাসেন্দোর আবহ
গিফু প্রিফেকচারের নাকাতসুগাওয়ার ওপরে বনঘেরা পাহাড়ে অবস্থিত মাগোমে জুকুতে গেলে মনে হয় যেন অতীতে ফিরে গেছেন। একসময় এদো ও কিয়োটোর মধ্যে নাকাসেন্দো পথে এটি ছিল ডাকপথের জনপদ। এখনও এখানে পাথর বাঁধানো গলি, জলচাকা এবং কাঠের জালিযুক্ত জানালাসহ বাড়ির সম্মুখভাগ দেখা যায়। খাড়া ঢাল বেয়ে ওঠা প্রধান সড়ক থেকে সেন্ট্রাল আল্পসের দৃশ্য চোখে পড়ে; বয়ে চলা পানির শব্দ পরিবেশে আনে প্রশান্তি।
যা দেখবেন ও যা চেখে দেখবেন
এখানেই জন্ম নেওয়া মেইজি যুগের লেখক শিমাজাকি তোসন সম্পর্কে জানতে তোসন মেমোরিয়াল মিউজিয়ামে যান। শাসক ও যাত্রীদের বিশ্রামস্থল হিসেবে শহরটির ভূমিকার নিদর্শন দেখতে যেতে পারেন মাগোমে ওয়াকি হোনজিন মিউজিয়ামে। অনেক পর্যটক নাকাসেন্দোর মাগোমে থেকে সুমাগো অংশে হাঁটেন। বন, ঝরনা ও গ্রামীণ জনপদের ভেতর দিয়ে যাওয়া এই ৮ কিলোমিটারের পথটি বেশ সহজ। পথে পথনির্দেশক চিহ্ন ও ভালুক তাড়ানোর ঘণ্টা রয়েছে। আরামে হাঁটলে দুই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে।
শিকে গাঁথা চালের পিঠা গোহেই মোচি খেয়ে শক্তি ফিরে পান; এর ওপর মিষ্টি-নোনতা মিসোর সস মাখানো হয়। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহকারী ও পাহাড়ে কাজ করা শ্রমিকদের শক্তি জোগাত এই খাবার। ঢালের ধারের ক্যাফেগুলোতে এটি সদ্য ঝলসে পরিবেশন করা হয়; সঙ্গে থাকে সোবা, মৌসুমি মিষ্টি ও পাহাড়ি সবজি।
পাসে যেভাবে যাবেন
টোকিও থেকে জেআর চুও লাইনের লিমিটেড এক্সপ্রেসে নাকাতসুগাওয়া স্টেশনে যান। নাগোয়া থেকে জেআর চুও মেইন লাইনের লোকাল বা র্যাপিড ট্রেনে প্রায় এক ঘণ্টায় নাকাতসুগাওয়া পৌঁছানো যায়। স্টেশন থেকে অল্প দূর বাসে মাগোমে যাওয়া যায়। এই পথে পাস ব্যবহার করা যাবে। সুমাগো পর্যন্ত হাঁটার পরিকল্পনা থাকলে বাসে ফিরে আসতে পারেন, অথবা স্থানীয় ট্যাক্সি নিতে পারেন। পথে কম হাঁটাচলা থাকতেই উপভোগ করতে সকালে রওনা দিন। আবহাওয়া দ্রুত বদলাতে পারে, তাই সঙ্গে পানি ও বৃষ্টির পোশাক রাখুন।
হিয়োগোর হিমেজি ও হোয়াইট হেরন ক্যাসল
১৯৯৩ সালে জাপানের প্রথম দিককার ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায় হিমেজি দুর্গ। এটি জাপানি দুর্গের ধ্রুপদি স্থাপত্যরীতির এক অনন্য নিদর্শন। সাদা প্লাস্টারের দেয়াল ও ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া ছাদ দেখে মনে হয় উড়ন্ত পাখি; সে কারণেই এর ডাকনাম হোয়াইট হেরন ক্যাসল। দুর্গ চত্বরজুড়ে রয়েছে প্রতিরক্ষার একাধিক প্রাচীরবেষ্টিত এলাকা, ফটক এবং আঁকাবাঁকা পথ, যা আক্রমণকারীদের অগ্রযাত্রা ধীর করার জন্য তৈরি। ভেতরে এখনও রয়েছে আসল কাঠের অংশ ও খাড়া সিঁড়ি। ওপরের তলাগুলো থেকে ঋতুভেদে শহর ও আশপাশের পাহাড়ের বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়।
মূল দুর্গের বাইরেও
পাশেই কোকো এন গার্ডেন। পুকুর ও চা-ঘরের চারপাশে সাজানো নয় ধরনের বাগান দুর্গের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার চমৎকার বিপরীত আবহ তৈরি করেছে। আরও নিরিবিলি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার জন্য রোপওয়েতে মাউন্ট শোশায় উঠে এনগিয়োজি মন্দিরে যেতে পারেন। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে দেখা এই মন্দির চত্বরে নির্দিষ্ট দিনে ধ্যান ও সূত্র অনুলিখনের আয়োজন হয়। বনঘেরা পরিবেশে রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা ও কাঠের হলঘর।
খাবারের জন্যও হিমেজি ভালো বিরতির জায়গা। কাছের আকাশি এলাকার আকাশিয়াকি চেখে দেখুন। ডিমসমৃদ্ধ গোলায় তৈরি হালকা এই অক্টোপাসের ডাম্পলিং সস দিয়ে না মেখে দাশি ঝোলে ডুবিয়ে খেতে হয়।
পাসে যেভাবে যাবেন
শিন-ওসাকা থেকে সানইয়ো পথে জেআর সাকুরা বা হিকারি ট্রেনে প্রায় ৩০ মিনিটে হিমেজি পৌঁছানো যায়। নোজোমি ট্রেন দ্রুততম, তবে পাসে চড়তে আলাদা আপগ্রেড টিকিট লাগবে। স্টেশন থেকে প্রশস্ত সড়ক ধরে সোজা হাঁটলেই হিমেজি দুর্গ। ভিড় কম থাকতেই মূল দুর্গ ঘুরে দেখতে সকালে খোলার সময় পৌঁছান। এরপর সকাল গড়িয়ে ট্যুর বাস আসতে শুরু করলে কোকো এন বাগানে গিয়ে নিরিবিলি পরিবেশ উপভোগ করুন।
শিকোকুর কোচি ও তোসা ইস্পাতের কারুশিল্প
শিকোকুর প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত কোচি পাহাড়, নদী ও ধীরস্থির জীবনযাত্রার জন্য পরিচিত। যাত্রাপথটিও আকর্ষণের অংশ। ওকায়ামা থেকে ট্রেন সেটো ওহাশি সেতু পেরিয়ে যায়। সেটো অন্তর্দেশীয় সাগরের ওপর সেতুর এই সারিতে দুই পাশে দেখা যায় দ্বীপের দৃশ্য। কোচির দিকে শেষ অংশে ট্রেন চলে নদী ও বনঘেরা পাহাড়ের পাশ দিয়ে।
বাজার, দুর্গ ও গুহা
ওতেসুজি অ্যাভিনিউ ধরে ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসছে কোচির রোববারের বাজার। বিক্রেতারা এখানে খামারের তাজা পণ্য, পথের খাবার এবং তোসা উচিহামোনো নামে পরিচিত হাতে গড়া তোসা ছুরি বিক্রি করেন। কারিগরেরা হাতুড়ি দিয়ে আগুনে পিটিয়ে ছুরি তৈরি করেন; এই পদ্ধতির সূত্রপাত তলোয়ার তৈরির কারুশিল্প থেকে। নানা ধরনের ইস্পাত ও আকৃতিতে ছুরিগুলো পাওয়া যায়, প্রায়ই সঙ্গে থাকে সাধারণ নকশার হাতল। ছুরি ধার দেওয়া ও যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে বিক্রেতারা পরামর্শও দেন।
আসল মূল দুর্গ ও প্রধান ফটক অক্ষত থাকা হাতে গোনা দুর্গগুলোর একটি কোচি দুর্গ। এর কাঠের ভেতরের অংশ দেখে বোঝা যায় সামন্তপ্রভুরা কীভাবে জীবনযাপন ও কাজ করতেন। প্রকৃতির সান্নিধ্য চাইলে কাছের কামিতে রিউগাদো গুহায় যান। বড় এই চুনাপাথরের গুহাটি নানা প্রকোষ্ঠের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে গেছে; সেখানে রয়েছে ঝুলন্ত পাথর ও ভূগর্ভস্থ স্রোত।
কী খাবেন এবং কখন
কোচি কাটসুও নো তাতাকির জন্য বিখ্যাত। স্থানীয়ভাবে ওয়ারায়াকি নামে পরিচিত এই খাবারে বনিটোর মোটা টুকরো জ্বলন্ত খড়ের আগুনে ঝলসে নেওয়া হয়। বাইরের অংশ সামান্য পোড়ানো হলেও ভেতরটা সাশিমির মতো কোমল থাকে। লবণ, ভিনেগার, সাইট্রাস ফল, রসুন ও ভেষজ দিয়ে পরিবেশন করা হয়। গ্রীষ্মের শুরু ও শরতের শেষভাগে বনিটো সবচেয়ে ভালো পাওয়া যায়। অনেক ইজাকায়ায় সামনে বসে ঝলসানোর দৃশ্য দেখা যায়।
পাসে যেভাবে যাবেন
হিমেজি থেকে জেআর ট্রেনে ওকায়ামা যান। সেখান থেকে জেআর শিকোকু লিমিটেড এক্সপ্রেস নানপুতে উঠে সেটো ওহাশি পেরিয়ে কোচি পৌঁছান। বিশেষ করে সপ্তাহান্তে আসন সংরক্ষণ করা ভালো। দ্বীপের দৃশ্য দেখতে ওকায়ামা ছাড়ার পর ট্রেনের ডান পাশের জানালার আসন বেছে নিন। গ্রীষ্মে ভারী বৃষ্টি ও টাইফুন হতে পারে, তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখুন এবং যাত্রার সময় বাড়তি সময় হাতে রাখুন।
কিউশুর কাগোশিমা শহর, দিগন্তে সাকুরাজিমা
প্রশস্ত উপসাগরের ধারে, সাকুরাজিমার মুখোমুখি কাগোশিমা। জাপানের সবচেয়ে সক্রিয় আগ্নেয়গিরিগুলোর একটি এই সাকুরাজিমা। উপসাগরের দৃশ্য ও মৃদু আবহাওয়ার জন্য শহরটির ডাকনাম ‘প্রাচ্যের নেপলস’। ছাই পড়ার পূর্বাভাস থেকে শুরু করে পুরো অঞ্চলজুড়ে খনিজসমৃদ্ধ উষ্ণ প্রস্রবণ পর্যন্ত, আগ্নেয়গিরিটি এখানকার দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করে। উপসাগর পেরিয়ে অল্প সময়ের ফেরিযাত্রাতেই বাষ্প ওঠা আগ্নেয়গিরির মুখ ও লাভাক্ষেত্রের কাছে পৌঁছানো যায়; সেখানে হাঁটার পথও রয়েছে।
বাগান, ভিলা ও দ্বীপের দৃশ্য
১৭শ শতকে শিমাজু বংশের তৈরি জাঁকজমকপূর্ণ ভিলা ও বাগান সেনগান এন। পুকুর, পাথরের লণ্ঠন ও মৌসুমি ফুলের ওপারে সাকুরাজিমাকে বাগানের দৃশ্যের অংশ করে সাজানো হয়েছে। চত্বরে রয়েছে মন্দির, বাঁশবন ও পাহাড়ি পথ। শহরের কেন্দ্রে জাদুঘরগুলোতে স্থানীয় ইতিহাস, শিল্পক্ষেত্রে অগ্রগতি এবং এদো যুগের শেষভাগে সাতসুমা অঞ্চলের ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।
মাংসপ্রেমীদের জন্য কাগোশিমা এক আদর্শ গন্তব্য। কুরোগিউ বা কাগোশিমা প্রিফেকচারের কালো ওয়াগিউ মিহি চর্বির শিরা ও গভীর স্বাদের জন্য সমাদৃত। অনেক রেস্তোরাঁয় গরুর মাংসের স্বাদ অক্ষুণ্ণ রাখতে সামান্য মসলা দিয়ে স্টেক হিসেবে পরিবেশন করা হয়। স্থানীয় কুরোবুতা শূকরের মাংস এবং মিষ্টি আলু থেকে তৈরি শোচু নামের পাতিত মদও খাবারের তালিকায় রয়েছে।
পাসে যেভাবে যাবেন
কোচি থেকে ওকায়ামায় ফিরে পশ্চিমে ফুকুওকার হাকাতার দিকে যান। সেখান থেকে কিউশু শিনকানসেনে উঠে কাগোশিমা চুও যান। দীর্ঘ পথে জানালার পাশের আসন ও বিদ্যুতের সকেট পেতে আসন সংরক্ষণ করুন। ছাই পড়ার সম্ভাবনা থাকলে হালকা মাস্ক ও চোখ রক্ষার চশমা সঙ্গে রাখুন এবং স্থানীয় সতর্কবার্তা দেখে নিন। আবার উত্তরে ফেরার আগে অঞ্চলটির কোনো উষ্ণ প্রস্রবণের শহরে গিয়ে বিশ্রাম নিতে পারেন।
রেলযাত্রায় ভিড় এড়ানোর কৌশল
সময় বেছে ভ্রমণ এবং রেলযাত্রার কয়েকটি অভ্যাস পিক মৌসুমেও সফরকে নিরুদ্বেগ রাখতে পারে।
- সম্ভব হলে পর্যটকের ভিড় কম এমন মাস বেছে নিন। গোল্ডেন উইকের পর মে, গ্রীষ্মের ছুটির আগে জুন, গরম কমার পর সেপ্টেম্বর এবং জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির মতো শীতের মাসগুলোতে বেশির ভাগ দর্শনীয় স্থানে ভিড় কম থাকে।
- সেদিন পাস ব্যবহার না করলে বিমানবন্দরেই এটি চালু করবেন না। সেখানে লাইন দীর্ঘ হতে পারে। সকালে শহরের কোনো স্টেশনে পাস চালু করুন।
- তারিখ ঠিক হওয়ামাত্র জনপ্রিয় শিনকানসেন ও লিমিটেড এক্সপ্রেস ট্রেনে আসন সংরক্ষণ করুন। দলবেঁধে গেলে পাশাপাশি আসন পেতে একসঙ্গে বুক করুন।
- সকালে যাত্রা করুন। প্রথম দিকের ট্রেনে ভিড় কম থাকে এবং বড় দর্শনীয় স্থানে ট্যুর বাস পৌঁছানোর আগেই আপনি সেখানে যেতে পারবেন।
- টোকাইডো বা সানইয়ো পথে অল্প দূরত্ব গেলে কিছুটা ধীরগতির কোদামা ট্রেন বিবেচনা করতে পারেন। দ্রুততম শ্রেণির ট্রেনের তুলনায় এতে প্রায়ই ভিড় কম থাকে।
- শহরের ভেতরে যাতায়াত ও ছোটখাটো কেনাকাটায় আইসি কার্ড ব্যবহার করুন। ওয়েলকাম সুইকা, পাসমো পাসপোর্ট বা ইকোকা কার্ড গেটে ট্যাপ করেই ঢোকা যায়, টিকিটের লাইনে দাঁড়াতে হয় না।
- এপ্রিলের শেষ ও মে মাসের শুরুর গোল্ডেন উইক, আগস্টের মাঝামাঝি ওবোন এবং নববর্ষের মতো ছুটির ব্যস্ত সময়ে ২০-৩০ দিন আগে ট্রেন বুক করুন। স্টেশনে ভিড় হতে পারে, তাই ট্রেন বদলের জন্য বাড়তি সময় রাখুন।
- বড় শহরে থাকার জন্য তুলনামূলক নিরিবিলি এলাকা বেছে নিন। টোকিওতে নিহোমবাসি, মারুনোউচি, মেগুরো, এবিসু বা ওচানোমিজু বিবেচনা করতে পারেন। কিয়োটোতে কিয়োটো গোশো, গোজো দোরি বা দক্ষিণ হিগাশিয়ামার প্রান্তের কাছাকাছি থাকুন।
আসন, লাগেজ ও স্টেশন-সংক্রান্ত ব্যবহারিক তথ্য
পাসে আসন সংরক্ষণ বিনা মূল্যে করা যায়, আর ইংরেজি ভাষার টিকিট মেশিনে প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন হয়। অনেক শিনকানসেনের কামরায় বৈদ্যুতিন বোর্ডে সংরক্ষিত ও অসংরক্ষিত আসনের তথ্য দেখানো হয়। কোনো কোনো সময় কিছু লাইনে আসন সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক, তাই পরিকল্পনার সময় তা যাচাই করুন।
পরিকল্পনা থাকলে লাগেজ সামলানো সহজ। প্রত্যেক যাত্রী দুটি ব্যাগ নিতে পারেন। টোকিও-ওসাকা-ফুকুওকা করিডরের শিনকানসেনে বড় স্যুটকেসের জন্য জায়গা সংরক্ষণ করতে হয়। স্টেশনে হাতখালি ঘুরতে চাইলে কয়েন লকার ব্যবহার করুন, অথবা পরের হোটেলে লাগেজ পাঠানোর সেবা নিন। সামান্য খরচে ট্রেন বদলের সময় চলাফেরা সহজ হয় এবং সিঁড়ি ওঠানামার ঝক্কিও থাকে না।
ট্রেনে কথা বলার সময় গলার স্বর নিচু রাখুন, ফোন নীরব রাখুন এবং ছোট ব্যাগগুলো ওপরের তাকের ওপর রাখুন। দূরপাল্লার ট্রেনে খাওয়া যায়। স্টেশনের একিবেন দোকানে স্থানীয় বিশেষ খাবার বিক্রি হয়, যার সঙ্গে আপনি যে পথে যাচ্ছেন সেই পথের যোগ রয়েছে।
খরচ ও পরিকল্পনার সুবিধা
একাধিক দূরপাল্লার যাত্রা থাকলে পাস সবচেয়ে বেশি লাভজনক। প্রায় ৮০,০০০ ইয়েনের ১৪ দিনের সাধারণ শ্রেণির পাসে টোকিও থেকে গিফু, হিমেজি, ওকায়ামা, কোচি, ফুকুওকা ও কাগোশিমা হয়ে আবার উত্তরে ফেরার শিনকানসেন যাত্রা করা যায়। আসনের শ্রেণি ও নির্দিষ্ট পথের ওপর নির্ভর করে আলাদা টিকিট কেনার তুলনায় সাশ্রয় হতে পারে। এখানে বর্ণিত পশ্চিম জাপান ভ্রমণপথ অনুসরণ করলে আলাদা টিকিট কেনার তুলনায় রেলভাড়ায় মোট ৬০,০০০ ইয়েনের বেশি সাশ্রয় হতে পারে।
হিসাবের বাইরেও পাসে ভ্রমণের দিনগুলো সহজ হয়। টিকিট কাউন্টারে না গিয়েই পরের ট্রেনে যাওয়া যায়, আবহাওয়ার কারণে পথ বদলানো যায় এবং বিকেল ফাঁকা থাকলে বাড়তি ভ্রমণও যোগ করা যায়। জাপানি ট্রেনের আরাম ও সময়ানুবর্তিতার সঙ্গে এই নমনীয়তা মিলেই নির্দিষ্ট পথের আলাদা টিকিটের বদলে পাস বেছে নেওয়ার অন্যতম বড় কারণ।
জেনে রাখুন
- জাপান রেল পাসে ৭, ১৪ বা ২১ দিনের জন্য জেআর ট্রেনে সীমাহীন যাত্রা করা যায়; রয়েছে সাধারণ ও গ্রিন কারের বিকল্প। নোজোমি ও মিজুহোতে চড়তে আলাদা আপগ্রেড টিকিট লাগবে।
- রেকর্ডসংখ্যক পর্যটকের ভিড় ছড়িয়ে পড়ে ঘোরার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। রেলে সহজেই পৌঁছানো যায়, পশ্চিম ও মধ্য জাপানের অঞ্চলগুলো ভিড় এড়ানোর শান্ত বিকল্প।
- চারটি বিশেষ গন্তব্য: এদো যুগের রাস্তা ও নাকাসেন্দোতে হাঁটার জন্য মাগোমে জুকু, ইউনেস্কো তালিকাভুক্ত দুর্গের জন্য হিমেজি, তোসা ছুরি ও বনিটোর জন্য কোচি, আর সেনগান এন ও সাকুরাজিমার দৃশ্যের জন্য কাগোশিমা।
- যাওয়ার পথ: মাগোমের জন্য চুও লাইন ধরে নাকাতসুগাওয়া, হিমেজির জন্য সানইয়ো শিনকানসেন, কোচির জন্য নানপু লিমিটেড এক্সপ্রেসে সেটো ওহাশি পেরিয়ে, আর কাগোশিমা চুওর জন্য কিউশু শিনকানসেন।
- ভিড় এড়ানোর সেরা কৌশল: মে, জুন, সেপ্টেম্বর বা শীতকালে ভ্রমণ, আগেভাগে আসন বুক, সকালের ট্রেনে যাত্রা এবং বিমানবন্দরে পাস চালু না করা।
- লাগেজের পরামর্শ: প্রয়োজন হলে শিনকানসেনে বড় লাগেজের জায়গা সংরক্ষণ করুন এবং স্টেশনে স্বচ্ছন্দে চলাফেরার জন্য ডেলিভারি সেবা ব্যবহার করুন।
- এ ধরনের দুই সপ্তাহের ভ্রমণে ভাড়া বাবদ ৬০,০০০ ইয়েনের বেশি সাশ্রয় হতে পারে; পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে পরিকল্পনা বদলানোর নমনীয়তাও পাওয়া যায়।






