বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে কেলেঙ্কারিতে ক্ষোভ বাড়ছে, দেশজুড়ে সমাবেশের প্রস্তুতি
বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে কথিত দুর্নীতি নিয়ে জনক্ষোভ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছাড়িয়ে ফিলিপাইনের রাজপথে নেমেছে। ২১ সেপ্টেম্বর ম্যানিলা ও অন্যান্য শহরে বড় বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র নাগরিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে বলেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, একটি স্বাধীন তদন্তে ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক মহলসহ যাঁরা অন্যায় করেছেন, তাঁদের সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে টেলিভিশনে প্রচারিত শুনানিতে নিম্নমানের বা অস্তিত্বহীন সরকারি কাজ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা শত শত কোটি পেসোর সঙ্গে জড়িত কথিত ঘুষের বিস্তারিত উঠে আসার পর এই বিক্ষোভের ডাক এসেছে। সম্প্রতি মেট্রো ম্যানিলা ও আশপাশের প্রদেশগুলোতে প্রবল বর্ষণে বন্যা পরিস্থিতি আরও ক্ষোভ বাড়িয়েছে, কারণ এসব প্রকল্পের অনেকগুলোর লক্ষ্য ছিল এলাকাবাসীকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করা।
সূচিপত্র
- বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে কেলেঙ্কারিতে ক্ষোভ বাড়ছে, দেশজুড়ে সমাবেশের প্রস্তুতি
- যে কারণে বিক্ষোভের সূত্রপাত
- কথিত অর্থের লেনদেনের চিত্র
- অস্তিত্বহীন প্রকল্প ও ব্যর্থ নির্মাণকাজ
- অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে চুক্তি কেন্দ্রীভূত
- ঘুষ ও বিলাসী জীবনযাপন
- মার্কোসের বার্তা, প্রতিশ্রুতি ও নীতিগত পদক্ষেপ
- নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ রাখার উদ্যোগ
- ২১ সেপ্টেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ
- বন্যার ঝুঁকি, জলবায়ুর চাপ ও ব্যর্থ প্রকল্পের মূল্য
- তদন্তে এখন পর্যন্ত যা উঠে এসেছে
- মার্কোসের সমর্থন ও রাজপথের উদ্দীপনা
- যা জানা জরুরি
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ২০২২ সাল থেকে দেশজুড়ে বন্যা প্রশমনে ব্যয় করা প্রায় ৫৪৫ বিলিয়ন পেসো। শুনানিতে আইনপ্রণেতা, গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের নাম এসেছে। নিরীক্ষক ও তথ্যদাতারা অস্তিত্বহীন প্রকল্প, ব্যয় বাড়িয়ে দেখানো এবং দুর্বল নথিপত্রের কথা জানিয়েছেন। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে গণপূর্তমন্ত্রীর পদত্যাগ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের দরপত্র স্থগিত এবং অবকাঠামো খাতে অর্থের অপচয় বন্ধে নতুন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।
২১ সেপ্টেম্বরের সমাবেশের আগে পুলিশ ও সেনাসদস্যদের সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। দিনটি প্রেসিডেন্টের প্রয়াত বাবা ফার্দিনান্দ মার্কোস সিনিয়রের ১৯৭২ সালে সামরিক আইন ঘোষণার বার্ষিকী। আয়োজকেরা বলছেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিই হবে সমাবেশের মূল বিষয়। গির্জার নেতা, শিক্ষার্থী সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন এবং দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। কর্মকর্তারা বলছেন, বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলে তা করতে দেওয়া হবে।
যে কারণে বিক্ষোভের সূত্রপাত
বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যাপক অর্থ তছরুপের অভিযোগ নিয়ে কংগ্রেসের তদন্তে বিষয়টি সামনে আসে। তদন্তকারীরা এমন প্রকল্পের কথা বলেছেন, যেগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই; এমন স্থাপনার কথা বলেছেন, যেগুলো নির্মাণ শেষ হওয়ার পরপরই অকেজো হয়ে পড়ে; আর এমন চুক্তির কথা বলেছেন, যেগুলোর পক্ষে যথাযথ কাগজপত্র নেই। নতুন বাঁধ, পাম্পিং স্টেশন ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন থেকে সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল—এমন এলাকাগুলো বারবার ডুবে যাওয়ায় ক্ষোভ বেড়েছে।
গত কয়েক দিনে ফিলিপাইনের বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করেছেন। আয়োজকেরা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বড় সমাবেশের ডাক দিয়েছেন। কেউ কেউ ১৯৮৬ সালের জনগণের গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক সড়ক ইডিএসএ এবং রিজাল পার্কে জনসমাগমের প্রত্যাশা করছেন। পুলিশ নিরাপত্তা পরিকল্পনা করেছে এবং সমাবেশের অধিকারকে সম্মান করার কথা জানিয়েছে।
জনসমালোচনা শুধু রাজপথে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যবসায়ী সংগঠন, ক্যাথলিক নেতারা এবং অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা তহবিলের কথিত অব্যবস্থাপনা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের অনেকে বলছেন, গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্মসূচিতে অর্থের অপচয় সাধারণ ফিলিপিনোদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাঁদের নিয়মিত টাইফুন, বৃষ্টিপাতের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং শহরাঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী বন্যার মুখোমুখি হতে হয়।
কথিত অর্থের লেনদেনের চিত্র
আইনসভায় শুনানিতে দেওয়া বিভিন্ন সাক্ষ্যে এমন এক অবকাঠামো কর্মসূচির কথা উঠে এসেছে, যা অবৈধ সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। বিস্তারিত বর্ণনায় পার্থক্য থাকলেও মূল অভিযোগটি স্পষ্ট: ঠিকাদার ও সরকারি কর্মকর্তারা এমন প্রকল্পে অর্থ দিয়েছেন, যেগুলো প্রত্যাশিত ফল দেয়নি, অতিরিক্ত দামে করা হয়েছে অথবা আদৌ নির্মিত হয়নি। পরে তাঁরা সেই অর্থের একটি অংশ ঘুষ হিসেবে নিয়েছেন।
অস্তিত্বহীন প্রকল্প ও ব্যর্থ নির্মাণকাজ
নিরীক্ষকদের ভাষ্য, সরেজমিন পরিদর্শনে এমন প্রকল্পের খোঁজ মিলেছে, যেগুলোর অস্তিত্ব শুধু কাগজে-কলমে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের কিছু স্থাপনা নিম্নমানের উপকরণে বা অদক্ষভাবে নির্মাণ করা হয়েছে। যে এলাকাগুলোর মানুষ বন্যা থেকে সুরক্ষা পাওয়ার আশা করেছিলেন, সেগুলোই বারবার প্লাবিত হয়েছে। বাসিন্দাদের কাছে বিষয়টি কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়। বন্যায় ছোট ব্যবসা ধ্বংস হয়, শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না এবং রোগ ছড়ায়। ভারী বৃষ্টিতে দুর্বল অবকাঠামো দ্রুতই দুর্বল শাসনের মূল্য প্রকাশ করে।
অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে চুক্তি কেন্দ্রীভূত
শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য বক্তব্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণের বাজেট বণ্টনে অস্বাভাবিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট এমন কিছু ঘটনার কথা বলেছেন, যেখানে অল্প কয়েকটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চুক্তির উল্লেখযোগ্য অংশ পেয়েছে। সরকারের প্রকাশ করা এক হিসাবে বলা হয়েছে, ২০২২ সাল থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা অর্থের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পেয়েছে ১৫টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতটা কেন্দ্রীভূত বরাদ্দ তদন্তকারীদের সন্দেহ জাগিয়েছে। দরপত্রে কারসাজি হয়েছে কি না, অথবা মধ্যস্থতাকারীরা চুক্তি পাইয়ে দিতে প্রভাব খাটিয়েছেন কি না, তা তাঁরা এখন খতিয়ে দেখছেন।
ঘুষ ও বিলাসী জীবনযাপন
সাক্ষীরা বলেছেন, তহবিল বরাদ্দে প্রভাব খাটানো বা কাজের পরিবর্তিত নির্দেশনা অনুমোদনের বিনিময়ে সরকারি কর্মকর্তা ও আইনপ্রণেতাদের কাছে নগদ অর্থ পৌঁছানো হয়েছে। অন্য সাক্ষ্যে অবৈধ উপার্জনের অর্থে জুয়া খেলা ও বিলাসবহুল পণ্য কেনার কথা বলা হয়েছে। অর্থের প্রবাহ শনাক্ত করতে ব্যাংক হিসাব, কর নথি এবং অন্যান্য কাগজপত্র খতিয়ে দেখা হবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
মার্কোসের বার্তা, প্রতিশ্রুতি ও নীতিগত পদক্ষেপ
প্রেসিডেন্ট মার্কোস এই পরিস্থিতিকে তাঁর প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা হিসেবে তুলে ধরেছেন। সাবেক সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আন্দ্রেস রেয়েসের নেতৃত্বে একটি নতুন স্বাধীন কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। কমিশন এক দশকের বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প খতিয়ে দেখবে, সাক্ষীদের তলব করবে, নথি চাইবে, শুনানি করবে এবং বিচারের জন্য মামলা সুপারিশ করবে। পর্যালোচনা চলাকালে সরকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের দরপত্রও স্থগিত করেছে। প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ২০২৬ সালের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাজেট বাতিল করে অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে স্থানান্তর করা হবে।
মার্কোস বারবার বলেছেন, তদন্তে বন্ধু ও পরিবারের সদস্যসহ কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। মানুষ কেন ক্ষুব্ধ, তা তিনি বোঝেন বলেও জানিয়েছেন। বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলে তিনি তাতে সমর্থন দিয়েছেন। এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান তুলে ধরে তিনি জনসাধারণের গভীর হতাশার কথা স্বীকার করেন এবং যাঁরা সরকারি অর্থ চুরি বা অপচয় করেছেন, তাঁদের জবাবদিহি দাবি করতে নাগরিকদের আহ্বান জানান।
পরিকল্পিত সমাবেশ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট বলেন, জনসাধারণের ক্ষোভের সঙ্গে তিনিও একমত।
প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বলেন: "আমি প্রেসিডেন্ট না হলে হয়তো তাদের সঙ্গে রাজপথে থাকতাম।"
তিনি আরও বলেন, বিক্ষোভকারীদের উচিত তাঁদের ক্ষোভকে জবাবদিহির জন্য আইনসম্মত দাবিতে রূপ দেওয়া।
বিক্ষোভকারীদের মার্কোস বলেন: "তাদের তোমাদের অনুভূতির কথা জানাও, তারা কীভাবে তোমাদের কষ্ট দিয়েছে, কীভাবে তোমাদের কাছ থেকে চুরি করেছে, তা জানাও। তাদের উদ্দেশে চিৎকার করো, সবকিছু করো, বিক্ষোভ করো—শুধু শান্তিপূর্ণ থেকো।"
সাবেক মন্ত্রী পদত্যাগ করার পর গণপূর্ত ও মহাসড়ক বিভাগে নতুন নেতৃত্ব এসেছে। প্রেসিডেন্টের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ভিন্স ডিজন দায়িত্ব নিয়েছেন। বুলাকান প্রদেশের কর্মকর্তাসহ কথিত অনিয়মে জড়িত ব্যক্তিদের তিনি সরিয়ে দিতে শুরু করেছেন। এই রদবদল থেকে বোঝা যায়, কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া কর্মসূচিটির নিয়ন্ত্রণ আবার নিজেদের হাতে নিতে চাইছে নির্বাহী বিভাগ।
নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ রাখার উদ্যোগ
ফিলিপাইনের সশস্ত্র বাহিনী ও জাতীয় পুলিশ বিক্ষোভের জন্য সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। কর্মকর্তারা একে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক বাহিনীর প্রধান যৌথ বিবৃতিতে নির্বাচিত সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারে সেনাদের প্রতি আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা জোর দিয়ে বলেছেন, সশস্ত্র বাহিনী পেশাদার, নির্দলীয় এবং কমান্ড কাঠামো মেনে সংবিধানের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ।
জনরোষকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা নিয়ে যোগাযোগবিষয়ক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন। সম্ভাব্য উসকানিদাতাদের বিষয়ে সতর্কবার্তার পর একজন উপমন্ত্রী বলেছেন, সহিংসতা শুরু হলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে। একই সঙ্গে তিনি সমাবেশ ও প্রতিবাদ জানানোর অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
২১ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা বলছেন, তাঁদের মূল দাবি দুর্নীতি ও জনজবাবদিহি নিয়ে, সরকার উৎখাত করা নয়। বিক্ষোভে শান্তিপূর্ণ আচরণ নিশ্চিত করতে শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী জোট ও নাগরিক সমাজের নেটওয়ার্কগুলো নির্দেশিকা ছড়িয়ে দিয়েছে।
২১ সেপ্টেম্বর কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিক্ষোভের দিনটি ১৯৭২ সালে মার্কোস সিনিয়রের সামরিক আইন ঘোষণার বার্ষিকী। ওই সময়ের সঙ্গে মানবাধিকার লঙ্ঘন, স্বজনপ্রীতি এবং ১৯৮৬ সালের জনগণের গণতান্ত্রিক অভ্যুত্থানে জ্যেষ্ঠ মার্কোসের ক্ষমতাচ্যুতির ঘটনা জড়িয়ে আছে। এ সময়ে বিক্ষোভ হওয়ায় সমাবেশগুলো ঐতিহাসিক তাৎপর্য পেয়েছে। গণসমাবেশ যেভাবে একসময় দেশের রাজনীতির গতিপথ বদলাতে এবং জনজবাবদিহিকে আন্দোলনের স্লোগানে পরিণত করতে সহায়তা করেছিল, এই দিনটি তা মনে করিয়ে দেয়।
অতীতের দুর্নীতি নিয়ে বিতর্কে মার্কোস পরিবারের নাম এখনও জড়িয়ে আছে। কর্মীদের যুক্তি, কয়েক দশকের সরকারি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও চুরি হওয়া সব সম্পদ উদ্ধার হয়নি। সমালোচকদের মতে, ভারসাম্য ও জবাবদিহির ব্যবস্থা জোরদার না করলে পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক নেটওয়ার্কগুলো এক প্রশাসনের পর আরেক প্রশাসনে নতুন করে গড়ে উঠতে পারে—বর্তমান বিতর্ক তা-ই দেখাচ্ছে।
সরকার বলছে, বর্তমান তদন্ত ভিন্ন; এতে স্বাধীন পর্যালোচনা এবং অর্থ কীভাবে ব্যয় হয়েছে তার প্রকাশ্য হিসাব দেওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত, কৌঁসুলিদের কাছে মামলা পাঠানোর গতি এবং মামলা দায়েরের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর দৃঢ়তার মধ্য দিয়ে এই প্রতিশ্রুতির পরীক্ষা হবে।
বন্যার ঝুঁকি, জলবায়ুর চাপ ও ব্যর্থ প্রকল্পের মূল্য
ফিলিপাইন টাইফুনপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। দেশটিতে ঘন ঘন টাইফুন আঘাত হানে এবং মৌসুমি ভারী বৃষ্টি হয়। মেট্রো ম্যানিলা ও প্রদেশগুলোর অনেক রাজধানী শহর নদীর বাঁধ, পানি ধরে রাখার জলাধার, পাম্পিং স্টেশন, কালভার্ট ও উন্নত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। এগুলো জটিল নেটওয়ার্ক। যথাযথ পরিকল্পনা, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ হলেই কেবল এগুলো কার্যকর থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টির তীব্রতা বাড়ছে। ভারী ঝড় কোনো শহুরে অববাহিকার ওপর থেমে থাকলে ভালোভাবে নির্মিত ব্যবস্থাও সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যেতে পারে। নিম্নমানের নির্মাণকাজ আরও দ্রুত ব্যর্থ হয়। এর মানবিক মূল্য ভয়াবহ। বাড়িঘর ডুবে যায়, জীবিকা ব্যাহত হয় এবং পানিবাহিত রোগ ছড়ায়। স্কুলে পড়াশোনার সময় নষ্ট হওয়া এবং সড়কের ক্ষতিও মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়।
অর্থ বিভাগ হিসাব করেছে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতির কারণে অর্থনীতির ক্ষতি হয়েছে ১১৮ বিলিয়ন পেসোর বেশি। এই অঙ্কে ক্ষতির কেবল একটি অংশ ধরা হয়েছে, কারণ বারবার বন্যা হওয়ার প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি ব্যয়ের অপচয় বন্ধ করা, প্রতি পেসোর বিনিময়ে মানসম্পন্ন কাজ নিশ্চিত করা এবং বর্তমান বৃষ্টিপাতের ধরন বিবেচনায় রেখে প্রকল্পের নকশা করলে নিচু এলাকায় বসবাসকারী লাখো মানুষের ঝুঁকি কমতে পারে।
তদন্তে এখন পর্যন্ত যা উঠে এসেছে
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের পৃথক তদন্তে ঠিকাদার ও গণপূর্ত বিভাগের কর্মীরা নজরদারির আওতায় এসেছেন। সাক্ষীরা কয়েক ডজন ব্যক্তির নাম বলেছেন। সিনেটররা এমন প্রকল্পের প্রমাণ দেখিয়েছেন, যেগুলোর বরাদ্দের সঙ্গে কাজের মিল নেই; পাশাপাশি তুলে ধরেছেন অপ্রতুল নথিপত্রসহ চুক্তির বিষয়ও। কিছু আইনপ্রণেতার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের কেউ অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, আবার কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি।
সরকারি নিরীক্ষকেরা উদ্বেগজনক একটি ধরন তুলে ধরেছেন। কিছু প্রকল্প বাজেটের হিসাব ও কাজ সমাপ্তির প্রতিবেদনে থাকলেও পরিদর্শক দল সেগুলোর অস্তিত্ব যাচাই করতে পারেনি। অন্যগুলো নির্মাণ শেষ হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নষ্ট হয়ে গেছে, যা নকশা বা নির্মাণসামগ্রীতে কারচুপির ইঙ্গিত দেয়। প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বুলাকানের মতো বন্যাপ্রবণ এলাকা পরিদর্শনের সময় তিনি অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখেছেন। কর্তৃপক্ষ বলছে, পর্যালোচনায় হাজার হাজার প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত হবে এবং প্রতিটিকে নিয়মসম্মত, নিম্নমানের বা ভুয়া হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হবে।
নতুন কমিশন সাক্ষীদের তলব করতে, নথি সংগ্রহ করতে এবং ন্যায়পাল ও বিচার বিভাগের কাছে মামলা সুপারিশ করতে পারবে। তবে নিজে থেকে শাস্তি দিতে পারবে না। গণপূর্ত, বাজেট ও অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের মতো সংস্থার পাশাপাশি ব্যাংক ও ঠিকাদারদের সহযোগিতার ওপরও কমিশনের কাজ নির্ভর করবে। সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী রোজেলিও সিংসন এবং বাগিও সিটির মেয়র বেঞ্জামিন মাগালং এই প্রচেষ্টায় পরামর্শ দিচ্ছেন। বেসরকারি খাতের নিরীক্ষা বিশেষজ্ঞ রোসানা ফাহার্দোকেও নথির সূত্র খুঁজে বের করা ও প্রমাণ জোরদারে সহায়তার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে।
মার্কোসের সমর্থন ও রাজপথের উদ্দীপনা
অনেক ফিলিপিনোর কাছে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের প্রতি প্রেসিডেন্টের সমর্থন নাগরিকদের আরও ব্যাপক অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থী নেতারা বলছেন, দৈনন্দিন জীবনে বন্যার প্রভাব এবং বাজেট ব্যয়ের ক্ষেত্রে জনআস্থা ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর তাঁরা গুরুত্ব দেবেন। গির্জার সংগঠনগুলো উপাসকদের প্রার্থনায় যোগ দিতে এবং বারবার ঝড়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মানুষের পাশে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছে।
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে যোগাযোগবিষয়ক এক কর্মকর্তা উসকানিদাতারা পরিস্থিতিকে নিজেদের দখলে নেওয়ার আশঙ্কা নিয়ে কথা বলেন।
যোগাযোগবিষয়ক উপমন্ত্রী ক্লেয়ার কাস্ত্রো "সরকারকে অস্থিতিশীল করতে চায় এবং যাদের অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে"—এমন লোকদের বিষয়ে সতর্ক করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করতে দেবে।
ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিনে হাজারো মানুষের সমাবেশের ছবি বিশ্বজুড়ে মনোযোগ আকর্ষণ করবে। আন্দোলনটি সংস্কারের দাবিতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে কি না এবং সরকার স্বচ্ছতা বজায় রাখে কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে এই রাজনৈতিক পরীক্ষার পরবর্তী ধাপ।
যা জানা জরুরি
- বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে কথিত দুর্নীতি নিয়ে ক্ষোভের জেরে ২১ সেপ্টেম্বর ম্যানিলাসহ বিভিন্ন স্থানে বড় বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
- প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এবং গত এক দশকের প্রকল্প তদন্তে সাবেক সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি আন্দ্রেস রেয়েসের নেতৃত্বে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করেছেন।
- নিরীক্ষা ও শুনানিতে অস্তিত্বহীন প্রকল্প, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে চুক্তি কেন্দ্রীভূত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। ২০২২ সাল থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠান তহবিলের উল্লেখযোগ্য অংশ পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
- সরকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের দরপত্র স্থগিত করেছে এবং ২০২৬ সালের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাজেট বাতিল করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে অর্থ স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
- সামরিক বাহিনী ও পুলিশ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। তারা বলেছে, সহিংসতা প্রতিরোধের পাশাপাশি সমাবেশের অধিকার রক্ষা করবে।
- অর্থ বিভাগের হিসাবে, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বন্যা নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতির কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১১৮ বিলিয়ন পেসোর বেশি।
- কমিশনের উপদেষ্টাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী রোজেলিও সিংসন, বাগিওর মেয়র বেঞ্জামিন মাগালং এবং নিরীক্ষা বিশেষজ্ঞ রোসানা ফাহার্দো।
- কমিশন নিজে থেকে শাস্তি দিতে পারে না, তাই তদন্তের প্রমাণ কৌঁসুলিদের কাছে পাঠানো হবে।
- বিক্ষোভের দিনটি সামরিক আইন ঘোষণার বার্ষিকী। অতীতের জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক তাৎপর্য পেয়েছে সমাবেশগুলো।






